#আফসানায়ে_জ্বিনান
#মীরা_রায়াদ
পর্ব-৪২(শেষ পর্ব)
[কপি করা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। উপন্যাসটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। উপন্যাসটি ভালো লাগলে রিভিউ দিবেন এবং শেয়ার করে অন্যকে পড়ার জন্য উৎসাহ করবেন। সকলে রেসপন্স করবেন।]
ভোরের স্নিগ্ধ, নরম পরিবেশে আমালিয়া, মেহমেত ঘুমিয়ে আছে। পরিবেশ ঠান্ডা। মেহমেত এখনো আমালিয়াকে পিছন থেকে আঁকড়ে ধরে আছে। রাতে এক মুহূর্তের জন্য তার হাতের বাঁধন আলগা হয়নি। কি এত আতঙ্ক সে নিজেই ভালো বলতে পারবে। আমালিয়ার কপালে ভাঁজ। সে এখনো ঘুমে কিন্তু অস্বস্তির জন্য সেই ঘুম দীর্ঘস্থায়ী যে হবে না তা বোঝা যাচ্ছে। পুরোটা রাত তার এভাবে একপাশ হয়ে ঘুমাতে হয়েছে। যার দরুন একপাশ ব্যাথায় লেগে আছে। নড়েচড়ে উঠলো এবার আমালিয়া। মেহমেতের হাতের মাঝে থেকেই সোজা হয়ে শুলো। ঠিক সেই মুহূর্তে আসমান থেকে একগুচ্ছ নীল রশ্মি তেড়ে আমালিয়ার শরীরে এসে মিলিয়ে গেল। নিদ্রায় বিভোর আমালিয়া হঠাৎ যন্ত্রণায় গুঙিয়ে উঠলো। তীব্র ব্যাথায় ছটফট করে উঠলো। চোখ খুলে মেহমেতের হাত সরিয়ে দ্রুত উঠে বসলো। চোখ থেকে তার টপটপ করে পানি গড়িয়ে পরছে। পেটে হাত চেপে আমালিয়া শব্দ করে কেঁদে উঠলো। সারা শরীর তার জ্বলে যাচ্ছে। আমালিয়ার গোঙানির শব্দে পূর্বেই মেহমেতের ঘুম ছুটে গিয়েছিল। আমালিয়াকে কাঁদতে দেখে মেহমেত লাফিয়ে উঠলো। ঘুম থেকে ওঠার দরুন তার মাথা ঠিকঠাক কাজ করলো না। কিন্তু আমালিয়াকে যন্ত্রণায় কাতরাতে দেখে কাছে টেনে নিলো। অস্থির হয়ে জানতে চাইলো,
-কি হয়েছে? কাঁদছেন কেন?
ব্যাথায় আমালিয়া কথা বলতে পারলো না। তার মনে হচ্ছে শিরায় শিরায় কিছু ছুটে চলছে। এই যন্ত্রণা সহ্য করার মতো না। মেহমেত বারেবারে ওর মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। কিছু মুহূর্ত পর আমালিয়া অনুভব করলো নিজের মাঝে অদ্ভুত এক শক্তি। সে নিজের হাত দুটি চোখের সামনে এনে ধরল। সেখান থেকে নীল রঙ্গা রশ্মি বের হচ্ছে। মেহমেত চোখ বড় বড় করে তাকালো। আমালিয়ার সম্পূর্ণ শরীর থেকে নীল রঙের রশ্মি বের হচ্ছে। এসব কি? মেহমেত খুব সাবধানে আমালিয়ার কাঁধে হাত রাখলো। আমালিয়া এবার ধীরে ধীরে শান্ত হলো। ভেজা চোখ নিয়ে মেহমেতের দিকে তাকিয়ে নাক টেনে বলল,
-শরীর জ্বলছিল খুব। এসব কি মেহেমেত? মনে হচ্ছিল মরে যাব।
এসব কি মেহমেত নিজেও বুঝতে পারছে না। তবে সে এই বিষয়ে ভাবার পূর্বে আমালিয়ার শেষের কথায় অসম্ভব রেগে গেলো। ধমক দিয়ে বলল,
-কি কথা এসব? ভালো কিছু বলা যায় না?
আমালিয়া করুন চোখে তাকালো। তার আঁখিতে আবারো জল ছলছল করছে। মেহমেত ফোস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। আমালিয়াকে টেনে বুকে ফেলে মাথায় যত্ন করে হাত বুলিয়ে বলল,
-দুঃখিত, এভাবে বলতে চাইনি। কিন্তু এবার আমার দোষ না। সকাল সকাল এসব কথা কেউ বলে? আপনি জানেন না আপনি আমার কাছে কি বউজান। আপনাকে ছাড়া এক মুহূর্ত আমার কাছে অভিশপ্ত মনে হয়। সেখানে আপনার এই কথাটি আমি ভালোভাবে নিতে পারিনি বউজান।
আমালিয়া মেহমেতের বুকে মুখ লুকিয়ে নাক টানলো। সে তো কথাটি এমনই বলেছে। কি সব যে হচ্ছে আজকাল তার সাথে! মাথা ঠিক রাখতে পারছে না। কিন্তু তাই বলে মেহমেত যে কথাটি ভালোভাবে নিবে না সে কথা কি আমালিয়া জানতো? অদ্ভুত একটা লোক। সবাই কি চিরকাল বেঁচে থাকে? একদিন না হয় একদিন তাকেও এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে যেতে হবে। তখন কি করবে এই লোক? আমালিয়া আবারো নিজের পেটে হাত রাখলো। গতদিনের থেকে আজ তার পেট বেশি ভারী লাগছে। ফুলেছে অনেকটা। বোঝা যাচ্ছে এখন। অথচ গতকালও এমন কোনো লক্ষণ দেখা দেয়নি। এর কারণ অবশ্য, সাধারণ বাচ্চাদের থেকে জ্বিনদের বাচ্চা দ্রুত বিকশিত হয়। এছাড়া তার গর্ভে থাকা সন্তান তার শরীরের শক্তি চুষে নিচ্ছে প্রতিনিয়ত। যার কারণে অন্যান্য জ্বিনদের সন্তানের তুলনায় তার সন্তান একটু বেশিই বিকশিত হচ্ছে। জ্বিনে বাদশাহ মেহমেতের সন্তান বলে কথা। তার হয়তো দুনিয়াতে আসার তারা বেশি। কথাটি ভেবে আমালিয়া মুচকি হাসলো। অতঃপর মেহমেতের বুকের বাম পাশে হাত রেখে আদুরে গলায় বলল,
-মেহমেত।
-হুম।
মেহমেতের সম্মোহনী গলা। সে চোখ বন্ধ করে জড়িয়ে আছে আমালিয়াকে। অন্য কেউ তার নাম মুখে উচ্চারণ করলে মেহমেতের ভীষণ রাগ হয়। কিন্তু আমালিয়ার মুখে কি ভীষণ সুন্দর শুনতে যে লাগে! মেহমেতের শান্তি শান্তি লাগে খুব।
-একটা কথা বলার ছিল আপনাকে।
আমালিয়া মিনমিনিয়ে বলল। মেহমেত এবার বলল,
-হুম,শুনছি। আপনি বলুন।
আমালিয়ার লজ্জা লাগছে। কিভাবে এই কথা বলবে সে? মেহমেতের বুকে থেকেই হাসফাস করে উঠলো। মুখ ফুটে কিছু বলার পূর্বে দরজার বড় বড় ধাক্কার শব্দ ভেসে এলো। চকিতে আমালিয়া মেহমেতের থেকে সরে গিয়ে দরজার দিকে তাকালো। মেহমেত নিজেও তাকালো। এই সময়ে এভাবে কে দরজা ধাক্কাচ্ছে? সে এবার আমালিয়ার দিকে তাকালো। আমালিয়াও এবার মেহমেতের চোখে চোখ রাখল। এরই মাঝে আবারো খুব জোড়ে দরজায় ধাক্কা পড়ল। মেহমেত ভারী বিরক্ত হলো। চোখে মুখে বিরক্তের ছাপ দেখা গেল। দরজার ওপাশের ব্যক্তি হয়তো ভীষণ ব্যস্ত। তার বিন্দুমাত্র অপেক্ষা করার ধৈর্য নেই। সে এবার লাগাতার দরজা ধাক্কাতে লাগলো। মেহমেত না পারতে আমালিয়াকে ছেড়ে উঠে দাড়ালো। দরজার দিকে পা বাড়ানোর পূর্বে আমালিয়াকে চোখের ইশারায় কিছু বোঝালো। আমালিয়া দ্রুত নিজের পোশাক ঠিক করে নিল। মেহমেত রয়ে সয়ে দরজা খুলল। অবাক করা বিষয় দরজার ওপর পাশে টোটো এবং আরদার দাঁড়িয়ে। মেহমেত টোটোকে দেখে ভীষণ অবাক হলো। চোখ তুলে আরদারের দিকে তাকিয়ে দেখলো আরদারের চোখেমুখে ঘোর অমাবস্যা।
-টোটো! তুমি এখানে? এই সময়? সব ঠিক আছে তো?
টোটো প্রচুর হাঁপাচ্ছে। সে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। মেহমেতের পায়ের কাছে লুটিয়ে পরে বলল,
-বাদশাহ, আজলান আর নেই।
মেহমেত এতক্ষণে খেয়াল করল টোটোর শরীর র*ক্তাক্ত। কি হয়েছে বুঝতে পারল না। ও দ্রুত টোটোকে ধরে ফেলল। ততক্ষনে আমালিয়াও এগিয়ে এসেছে। সে টোটোকে এভাবে দেখে বিচলিত। মেহমেত ওকে দুহাতে আগলে নিয়ে জানতে চাইলো,
-তোমার এই অবস্থা কেন টোটো? আর দাদাজান! দাদাজান নেই মানে?
এই কথাটি শোনার পর আমালিয়ার বুক যেন কেউ খাঁমচে ধরলো। কিছু একটা আন্দাজ করতে পেরে আতঙ্কিত হলো। টোটো বড় কষ্ট করে বলল,
-তাকে হত্যা করা হয়েছে বাদশাহ। আমি সেখানে উপস্থিত হওয়ার পূর্বেই তিনি তার নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। এবং আমার চোখের সামনে তার শরীর জ্বালিয়ে দেয়া হয়। আমি বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করলে তারা আমার ওপরও হামলা করে। আমি কোনো ভাবে পালিয়ে এসেছি।
মেহমেতের হাত ঢিলে হয়ে এলো। শরীর অসম্ভব কেঁপে উঠলো। এই তো দুদিন পূর্বে অজলান তাকে বলেছিল সে, এসব থেকে দূরে কোথাও যেতে চায়। নিজের মতো থাকতে চায়। তাকে প্রয়োজন হলে সে নিশ্চয়ই মেহমেতকে সাহায্য করতে ফিরে আসবে। মেহমেত বাঁধা দেয়নি আজলানকে। যেতে দিয়েছিল। কিন্তু কে জানতো, এই যাওয়াই শেষ যাওয়া হবে? আমালিয়া ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। দুচোখ বেয়ে দরদর করে জল গড়িয়ে পরছে। মনে পড়ল গতকাল দুপুরের কথা। সে এবং মিগি দুপুরের খাবার খেয়ে সবেই একটু শুয়ে ছিল। দুজনের চোখেই তখন হালকা তন্দ্রা। সেই সময় আমালিয়ার সাথে স্বপ্নের মাধ্যমে আজলান সংযোগ করে। আমালিয়া ঘুমের মধ্যেই দেখতে পায় সে সেই স্থানে ছিল যেখানে প্রথম দিন শক্তি ফিরে পাওয়ার পর আজলানের সাথে সাক্ষাৎ হয়। আজলান উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে ছিল। আমালিয়া ধীরে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখলো,
-জনাব।
আজলান আমালিয়ার দিকে তাকিয়ে ছোট করে হাসি দিলো। আমালিয়া চারিপাশে অবাক হয়ে তাকিয়ে জানতে চাইলো,
-আমি এখানে কিভাবে এলাম জনাব? আমি তো সিলা রাজ্যে নিজের কামরায় ছিলাম। আর আপনি এখানে?
-তোমাকে আমিই এখানে এনেছি আমালিয়া। এসো আজ তোমাকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার রয়েছে।
আমালিয়া এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
-গুরুত্বপূর্ণ কথা?
আমালিয়া তখন আজলানের ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে। আজলান দৃষ্টি আমালিয়ার দিকে দিয়ে বেশ কিছুক্ষন দেখলো ওকে। অতঃপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-রেগে আছো আমার ওপর?
আমালিয়া প্রতিউত্তর করল না। সে রেগে নেই কারো ওপর কিন্তু কষ্ট পেয়েছে। মেলিসাকে হারিয়ে আঘাত পেয়েছে।
-আমরা তোমাকে ঠকাতে চায়নি আমালিয়া। মেহমেত তোমাকে ভীষণ ভালবাসে। তাছাড়া আমিও তোমাকে সন্তান সমতুল্য ভাবি। আমার কাছে মেলিসা যেমন তুমিও তেমন।
-আমি রেগে নেই জনাব। তবে আপনাদের কাজে কষ্ট পেয়েছি। সব থেকে বড় কথা মেহমেত না হয় আমার চিন্তায় অন্ধ ছিল কিন্তু আপনি? আপনি কিভাবে মেলিসার জীবন ঝুঁকিতে ফেলে ওকে জ্বিনরাজ্যে পাঠালেন? আজ আমার জন্য মেলিসাকে নিজের জীবন দিতে হলো।
-তুমি তো জানো, আমার মেয়েটা বড্ড নরম মনের ছিল। তাকে যখন আমি জানালাম তোমার বিপদের কথা তখন সে নিজেই তোমার কাছে আসতে চাইলো। আমি বাধা দিতে পারিনি আমালিয়া।
এতটুকু বলে আজলান থামলো। নীরবে বসলো একটি পাথরের ওপর। অতঃপর আবারো বলতে শুরু করলো,
-তাছাড়া মেলিসা তোমার সাথে ভীষণ হাসি-খুশি থাকতো আমালিয়া। আমি খুশি এই ভাবে, সে তার শেষ সময়ে তোমার সাথে কাটাতে পেরেছে। যতটুকু সময় আমরা নিয়ে এসেছি তার বেশি কেউ পাবো না। সুতরাং তোমার কারণে হয়েছে এটা ভাবা বন্ধ করো। তার মৃত্যু পূর্ব থেকে নির্ধারিত ছিল আমালিয়া।
আজলানের প্রতিটি কথা সত্য, তবুও আমালিয়ার মানতে কষ্ট হলো। কান্না পেল, গলায় ব্যাথা হল। তবুও নিজেকে শক্ত খোলসে বেঁধে রাখলো।
-আমার ধারণা মেলিসা জেনে ফেলেছিল কে এসবের পিছনে রয়েছে। তাই তাকে অকালে প্রাণ হারাতে হলো।
আজলানের কথায় আমালিয়া চমকে উঠলো। এই কথাটি সেও ভেবেছিল। কোথাও না কোথাও তার মনে হয়েছিল মেলিসা সবটা জানে বলেই তাকে এভাবে মারা হয়েছে। আজলান দূর আকাশের পানে তাকিয়ে বলল,
-আমরা কে, কখন, কিভাবে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে পাড়ি জমাবো বলা যায় না। তাই আজ তোমাকে এখানে ডেকেছি আমালিয়া।
আজলান থামলো। তাকালো আমালিয়ার দিকে। আমালিয়ার তুখোড় দৃষ্টি পূর্ব হতেই আজলানের ওপর।
-তুমি মানো আর না মানো, তোমার জন্ম বিশেষ কারণে হয়েছে। এখন সিদ্ধান্ত তোমার। হয় সৃষ্টি না হয় ধ্বংস। তুমি নিজেকে ভালো পথে ব্যবহার করবে নাকি খারাপ পথে সেটা পুরোপুরি তোমার ওপর। তবে সর্বদা মনে রাখবে, তোমার সামনে কঠিন সময় আসতে চলেছে আমালিয়া। সিদ্ধান্ত ভেবে নিও। আমার বিশ্বাস তুমি সৃষ্টির কাজে আসবে বলেই তোমার জন্ম। আমার মেলিসার ত্যাগ বিফলে যেতে দিও না। আর একটি কথা, কখনো আমার মৃ*ত্যু হলে আমি আমার শক্তি তোমাকে দিয়ে যাবো। ভবিষ্যতে অবশ্যই তোমার কাজে আসবে।
-মানে?
-সময় হলে বুঝতে পারবে। এখন তুমি যাও আমালিয়া। আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে।
-আপনি এখন কোথায় জনাব?
আজলান কেমন করে যেন তাকালো আমালিয়ার দিকে। আমালিয়া সেই চোখের আর্তনাদ বুঝলো না। আজলান ভারী গলায় শান্ত ভাবে বলল,
-অনেক দূর।
এরপর সে চোখ বন্ধ করে নিল। সাথে সাথে আমালিয়ার ঘুম ভেঙে গিয়ে ছিল। সে তখন ভেবেছিল হয়তো পূর্বের ন্যায় স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বুঝলো ওটা কোনো স্বপ্ন ছিল না। গতকাল আজলান সত্যিই তার সাথে সাক্ষাৎ করেছিল। এবং আজলান যে আর বেঁচে নেই তার প্রমাণ আমালিয়ার শরীরে থাকা এই নতুন শক্তি। আমালিয়া এবার নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। মুখে হাত চেপে শব্দ করে কেঁদে উঠলো। কি থেকে কি হয়ে গেলো? তাদের জীবনে এ কোন বিপদ নেমে এলো? আজলান কি পূর্ব হতে অবগত ছিল? তাই তাকে কাল ওভাবে ডেকেছিল? কিছু কি সে বুঝতে পারে ছিল? কতশত প্রশ্ন অথচ যার কাছে করতে চায় সেই মানুষটি আর নেই। মেহমেত দরজার পাল্লার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে স্তব্দের ন্যায় বসে আছে। আমালিয়াকে যে সান্তনা দিবে সেই শক্তিটুকু তার মাঝে অবশিষ্ট নেই। আজলান তার কাছে শুধু একজন ব্যক্তি ছিল না। আজলান তার একটি আবেগ ছিল। যখন কেউ ছিল না তার পাশে তখন আজলান তার সাথে ছিল। সঠিক পথ দেখিয়ে ছিল। কত হাজার স্মৃতি রয়েছে তার সাথে মাহমেতের। মানুষটি তাকে না জানিয়ে ফাঁকি দিতে পারল? সে কেন সেদিন আজলানকে যেতে দিলো? কেন কেন? মেহমেত কাঁদতে চাইলো কিন্তু পারল না। তার চোখ অসম্ভব লাল হয়ে উঠলো। আমালিয়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। আর কেউ নেই তার এই মেয়েটি ছাড়া। আপন বলতে আর কেউ নেই। সে ধীরে ধীরে একা হয়ে যাচ্ছে। ভেঙে পড়লে চলবে না। তার শেষ সম্বল, তার ভালবাসাকে বাঁচাতে হবে। রক্ষা করতে হবে। আরদার অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে আমালিয়া দিকে। মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে হিচকি তুলে ফেলেছে। থেকে থেমে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। মেহমেতের দিকে তাকিয়ে তার আরো বেশি খারাপ লাগলো। তার ভাই একটু সুখের মুখ দেখা শুরু করলেই কেন একের পর এক দুঃখ তাকে জড়িয়ে নেয়? আজলানের মৃ*ত্যুতে যে মেহমেত খুব ভেঙে পড়েছে তাকে দেখলেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু এখন ভাঙার সময় নয়। আরো বড় বিপদ যে তাদের দিকে তেড়ে আসছে। কিন্তু কিভাবে বলবে সেই কথা মেহমেতকে?
-ভাই।
মেহমেত তার লাল লাল চোখগুলো আরদারের ওপর স্থির করলো। আরদার শুকনো ঢোক গিললো।
-আপনাকে যেতে হবে। হামলা হয়েছে। শয়তানেরা যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে। তারা ময়দানের দিকে আসছে। ইফরিত গোত্রের রাজাকে হত্যা করে তার রাজ্য দখলে নিয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু গোত্র শয়তানদের সাথে মিশে আমাদের বিপক্ষে গিয়েছে।
মেহমেতের চোয়াল শক্ত। হাত মুষ্টিবদ্ধ। তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। অনেক হয়েছে। এবার না হয় মরবে নয়তো মারবে। মেহমেত দ্রুত নিজের হাত বাড়িয়ে টোটোর ক্ষত ঠিক করে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। আমালিয়া ওকে উঠতে দেখে আতঙ্কিত হলো খুব। চটজলদি বসা অবস্থায় মেহমেতের হাত আঁকড়ে ধরল। কান্নার দরুন ওর পুরো মুখ লাল হয়ে আছে। চোখ ফোলা। মুখের কাছের কিছু সংখ্যক চুল ভিজে লেপ্টে আছে মুখে। থেকে থেকে ছোট্ট শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। তার চোখে মুখে স্পষ্ট ভয়। মেহমেতকে হারানোর ভয়।
-কোথায় যাচ্ছেন আপনি? দয়া করে যাবেন না। আমি আর কাউকে হারাতে চাই না মেহমেত। আমার মাঝে সেই শক্তি নেই।
মেহমেতের হাতের উল্টো পিঠে কপাল ঠেকিয়ে হুহু করে কেঁদে ফেলল আমালিয়া। শরীরটা ভীষণ কাঁপছে ওর। মেহমেতের খুব মাথা হলো। যেতে মন মানলো না। বুকের মাঝে খচখচানি অনুভব করলো। সে নিজের হাতটি আমালিয়ার মাথায় রেখে ভীষণ যত্ন করে বুলিয়ে দিল। বসে বুকে টেনে নিলো। আরদার সাথে সাথে ওর চোখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলো। আরদার মানতে নারাজ হলেও এটাই সত্যি যে তার কষ্ট হচ্ছে। মেহমেত আমালিয়াকে কাছাকাছি দেখে তার বুক পুড়ছে। মেহমেতের প্রতি প্রচুর হিংসা হচ্ছে। এটি ভীষণ লজ্জাজনক তার নিকট।
-এভাবে অবুঝ হতে নেই বউজান। আপনার স্বামীর কাঁধে অনেক বড় দায়িত্ব। সে আপনার স্বামী হওয়ার পূর্বে একজন বাদশাহ। আমার দায়িত্ব সকলের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তাছাড়া শয়তানরা জয় লাভ করলে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। ইনসান ও জ্বিনরা পাপাচারে লিপ্ত হবে। একজন বাদশাহের স্ত্রীর চোখে অশ্রু মানায় না। আপনি এভাবে ভেঙে পড়লে আমি নিজেকে কিভাবে শক্ত রাখবো? আপনি আমার দুর্বলতা না হয়ে, আমার শক্তি হয়ে উঠুন বউজান।
মেহমেত নিজে মুখে বললেও তার মন সেই কথাগুলোকে সায় দিচ্ছে না। মন চাচ্ছে সকল কিছু ছেড়ে ছুড়ে আমালিয়াকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যেতে। কিন্তু তা যে সম্ভব নয়। তবে মনে মনে ভেবে নিলো, এই সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে বাদশাহের দায়িত্ব সে উপযুক্ত কাউকে বুঝিয়ে দিয়ে আমালিয়াকে নিয়ে সে পারি জমাবে অজানায়। যেখানে তারা দুজন একটি সুন্দর, স্বাভাবিক সংসার গড়তে পারবে। আমালিয়া দুহাতে মেহমেতকে শক্ত করে আঁকড়ে আছে। মন বলছে ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে। মেহমেত জোর করে ওকে ছেড়ে উঠলো। অতঃপর হাক ছেড়ে মিগিকে ডাকলো। মিগি সাথে সাথে সেখানে উপস্থিত হলো। মেহমেত মিগি ও টোটোকে আদেশ দিল আমালিয়াকে দেখে রাখতে। যত যাই হোক আমালিয়াকে সুরক্ষিত রাখতে। এরপর চোখ বন্ধ করে কিছু একটা পড়লো। আবারো চোখ খুলে দুহাত সামনে নিয়ে দুটি তালি দেয়ার সাথে সাথে আমালিয়ার সম্পূর্ণ কামরাটি একটি বলয়ের মাঝে সুরক্ষিত হয়ে গেলো। মেহমেত আমালিয়ায় কাছে গিয়ে এগিয়ে গিয়ে ওকে দুহাতে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নেয়। আজ মেহমেতের মনটা অদ্ভুত রকমের অশান্ত। খারাপ কিছু হওয়ার সংকেত দিচ্ছে। আমালিয়াকে নিয়ে সে খুব চিন্তিত। বুক থেকে আমালিয়াকে তুলে দুহাতের আজলায় ওর মুখটি নিলো মেহমেত। ভীষণ মায়াবী মুখখানা সে মন ভরে দেখে নিল। ঠোঁট নামিয়ে কপালে, গালে, চোখে অসংখ্য চুমু খেয়ে আবারো জড়িয়ে ধরে বলল,
-আপনি আমার জান বউজান। আপনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছি। আমার জানের খেয়াল রাখবেন। যুদ্ধ থেকে ফিরে আমি আমার বউজানকে যেন সুরক্ষিত পাই। আপনাকে নিয়ে পৃথিবীতে যাওয়া হলো না। এবার ফিরে ইনশাল্লাহ দীর্ঘ সময়ের জন্য নিয়ে যাবো। শুধু আজ আমার কথাটি রাখবেন। এই বলয় থেকে বের হবেন না। যত যাই হোক না কেন বের হবেন না। যদি আমিও আসি তাও না। এই বলয় অতিক্রম করে অশুভ শক্তি ভিতরে প্রবেশ পারবে না। তাই কারো প্রয়োজন হলে সে আসবে, কিন্তু আপনারা তিনজন বাইরে যাবেন না। মনে থাকবে?
আমালিয়া কান্নারত মুখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে মাথা উপর-নিচ করলো। অর্থাৎ সে বুঝতে পেরেছে এবং স্বামীর আদেশ সে অক্ষরে অক্ষরে পালনও করবে। মেহমেত ওকে ছেড়ে দিয়ে আর দাঁড়ালো না। বড় বড় পায়ে হারিয়ে গেলো। আরদারও ছুটলো ওর সাথে। ওদের গমন পথ থেকে ভেসে এলো কিছু কথা,
-আমি আমার রাজ্যে যাচ্ছি আরদার। আপনি আপনার সৈন্যদের প্রস্তুত করে ময়দানে আসুন।
-জ্বি ভাই।
মেহমেত যেতেই আমালিয়া আবারো কেঁদে উঠলো। মিগি, টোটো দুজনই তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলো কিন্তু লাভ হলো না। মেহমেতের জন্য তার চিন্তা হচ্ছে। সে সুরক্ষিত থাকুক। আর কিছু চাই না।
______
বারযাখ ময়দান,
লক্ষ্য লক্ষ্য জ্বিনদের সামনে মেহমেত হওয়ায় ভেসে রয়েছে। এই সেই ময়দান যেখানে 57 বছর পূর্বে মেহমেত ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ছিল। আবারো সেখানে সে উপস্থিত। কিন্তু ভিন্ন একটি উদ্দেশ্য নিয়ে। দূর হতে হওয়ায় ভেসে আসছে শয়তানদের আগমনী বার্তা। মেহমেত কঠিন দৃষ্টিতে তাকালো সেদিকে। এরপর সম্মুখে দাঁড়ানো জ্বিনদের উদ্যেশ্যে বলল,
-ইফরিত রাজাকে হত্যা করা শয়তানদের নিঃশেষ করতে হবে আমাদের। নয়তো একদিন আমাদের সকলের পরিণতি ইফরিত রাজার মতো হবে। আজ আমাদের উদ্দেশ্য কেবল শয়তানের বিনাশ করা। হয় আমরা থাকবো না হয় শয়তানেরা। দেহে প্রাণ যতক্ষন থাকবে লড়ে যাব সবাই। শয়তানদের শেষ করেই ছাড়বো। জান লাগিয়ে দিন সকলে, এটি আপনাদের বাদশাহের আদেশ।
মেহমেতের কথায় সকলে একসাথে বলে উঠলো,
-জ্বি বাদশাহ, দেহে প্রাণ থাকা পর্যন্ত আপনার ঢাল হয়ে লড়ে যাব আমরা।
মেহমেত খুশি হলো। তার বিশ্বাস সত্যের জয় হবেই। আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছে। সুতরাং চিন্তার কোনো বিষয় নেই। শুধু আমলিয়া তার কথা মেনে সুরক্ষিত থাকুক। এরই মাঝে লক্ষ্য করা গেল কোটি কোটি শয়তান তাদের দিকে তেড়ে আসছে। মেহমেত শূন্য থেকে নিচে নেমে এলো। আরদার তার পাশে। শয়তানদের ছুটে আসার তালে বারযাখ ময়দান ধুলায় ভরে গেলো। বিশাল বড় এই ময়দানের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্ত স্পষ্ট দেখা যায় না। ধুলায় ভরপুর ময়দানে মেহমেত তবুও দেখলো ছোট ছোট পিঁপড়ার মতো শয়তানদের আগমন। যদিও জ্বিনরা শয়তানদের তুলনায় সংখ্যায় কম, কিন্তু মেহমেত মনোবল হারালো না। সকলকে আদেশ দিলো আমলার জন্য। অতঃপর শুরু হলো এক র*ক্ত যজ্ঞ যুদ্ধ। যেখানে কেউ কারো থেকে কম যায় না। মেহমেত তার পারদর্শী হাতে দুটি তলোয়ার নিয়ে শত শত শয়তানকে একাই বধ করতে লাগলো। তার হিংস্রতায় সকলের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। কিন্তু মেহমেত থামলো না। সে তলোয়াল চালিয়ে গেল দক্ষতার সাথে।
অন্যদিকে, আমালিয়া সিলা রাজ্যে নিজ কামরায় বসে মনে প্রাণে আল্লাহ তায়ালা আনহুর কাছে প্রার্থনা করে যাচ্ছে। তার হাতে তাসবিহ। মনের মাঝে ভয়, আশঙ্কা। বারবার প্রার্থনা করছে কেন জ্বিনদের জয় হয়। টোটো, মিগি মেঝেতে। আমালিয়া বিছানায় পা তুলে বসা। তার ডান হাতে তাসবিহ আর বাম হাতে পেটে। সে অনুভব করলো পেট আগের তুলনায় আরো কিছুটা ফুলে উঠেছে। মুচকি হেসে আবারো দোয়ায় ব্যস্ত হলো সে। এমন সময় আমালিয়ার দরজায় এসে দাঁড়ালো কেউ। ডাকলো,
-মহারানী।
আমালিয়া চোখ তুলে সেদিকে তাকালো। মুখ থেকে বের হলো,
-জায়াদ্রা!
-আমি এসে গিয়েছি মহারানী। যুদ্ধ ময়দানের ভয়াবহ অবস্থা। জ্বিনদের হার নিশ্চিত। শয়তানেরা আপনার দিকে ধেয়ে আসছে। হুজুর আপনাকে নিয়ে সুরক্ষিত স্থানে যেতে বলেছেন।
জায়দ্রা সামনের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে কথাগুলো বলে উঠলো। ভিতরে প্রবেশ করতে চাইলো, কিন্তু পারল না। কোনো এক শক্তি তাকে প্রবল শক্তি দিয়ে বাঁধা দিল। যার দরুন সে ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ল। ব্যাথা পেলে খুব। তবুও উঠে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে তাকালো। আবারো প্রবেশ করতে চাইলো কিন্তু একই ভাবে বাঁধাগ্রস্ত হলো। সে এবার অবাকতার সাথে আমালিয়ার দিকে তাকালো। আমালিয়ার মাঝে কোনো রূপ অনুভূতি নেই। সে স্থির, অনুভূতি শূন্য চোখে তাকিয়ে জায়াদ্রার দিকে। জায়দ্রা আমালিয়ার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো,
-এটি?
আমালিয়া এবার বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালো। সামনে এগিয়ে গিয়ে বলল,
-আপনার হুজুর পূর্ব হতেই আমার সুরক্ষার ব্যবস্থা করে গিয়েছে জায়াদ্রা। এই সুরক্ষা বলয় অতিক্রম করে আপনি কিংবা আপনার কোনো শয়তান আমার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবেন না।
জায়াদ্রা চমকে উঠলো আমালিয়ার কথায়। সে চোখেমুখে অসহায়ত্ব ফুটিয়ে বলল,
-আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে মহারানী। আমার শয়তান বলতে? আমি শয়তানদের কেউ না। আপনাকে নিশ্চয়ই কেউ ভুল বুঝিয়েছে। আমাকে সত্যিই হুজুর আপনার সুরক্ষার জন্য পাঠিয়েছে।
আমালিয়া প্রতিউত্তর করল না। তার চোখ অসম্ভব ঠান্ডা। জায়াদ্রকে নাড়িয়ে দিয়ে বলল,
-সেদিন রাতে যেদিন আমাকে অপহরণ করা হয়েছিল সেদিন আমার জ্ঞান ছিল। আমি সবটা শুনে ছিলাম জায়াদ্রা। এরপরও বলবেন আমাকে কেউ ভুল বুঝিয়েছে?
জায়াদ্রার চোখ হঠাৎ করে জ্বলে উঠলো। অসম্ভব রাগে হিসহিস বলল,
-পূর্ব হতে জানেন তবে?
এবারও আমালিয়া উত্তর দিলো না। উল্টো প্রশ্ন করে বসলো,
-মেলিসার কি দোষ ছিল জায়াদ্রা? তাকে কেন মারলেন?
জায়াদ্রা এবার এদিক ওদিক পায়চারি করতে করতে হিংস্র স্বরে বলল,
-মেরেছি বেশ করেছি। বড্ড শখ জেগেছিল আমার কাজে বাগরা দেয়ার। শেষ করে দিয়েছি একদম। তাছাড়া সে রাতে ওই মেয়েটাও আমাকে দেখে নিয়ে ছিল। ওকে না মারলে আমার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতো? আমি জানতাম তোমার শক্তি জাগ্রত করতে হলে তোমার কাছের কাউকে শেষ করতে হবে। সেই রাগ, কষ্ট থেকে হলেও তুমি নিজের আসল শক্তিকে সামনে আনবে। হলোও তাই। তুমি এখন অপার শক্তির মালকিন। চারপাশটা দেখো আমালিয়া। এই দুনিয়া তোমার জন্য নয়। এই দুনিয়া ভালোদের জন্য নয়। ভালোদের সকলে কষ্ট দেয়। যেভাবে তোমার মাবাবার সাথে অন্যায় হয়েছে, ঠিক সেভাবে তোমার সাথেও অন্যায় হবে। তুমি আমার সাথে চলো আমালিয়া। তুমি আমার কাছে ভালো থাকবে।
জঘন্য! জঘন্য একটি ব্যক্তি জায়াদ্রা। আপনি থেকে সরাসরি এখন তুমি! আর কি সব বলছে সে আমালিয়াকে? আমালিয়া কি এতটাই বকা? হ্যাঁ শক্তি তার মাঝে থাকলে সে জায়াদ্রার কথায় প্রভাবিত হতো। কিন্তু জায়াদ্রা তো জানে যে
না শক্তি এখন তার সন্তানের মাঝে। তাই এসব বলে বিশেষ লাভ হবে না। আমালিয়া সবটাই জানে সবটা। সেদিন জ্ঞান হারানোর পূর্বে আমালিয়া জায়াদ্রাকে দেখেছিল। সকলের তার প্রতি অনুগত হওয়া, সম্মান জানানো দেখে আমালিয়া কিছুটা সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু সেই সন্দেহ পুরোপুরি সত্য রূপ নিলো যখন সুলেমান জায়াদ্রার কথা স্বীকার করে নিলো। আমালিয়া প্রচুর কষ্ট পেয়েছিল তখন। বুঝে নিয়েছিল মারিদ রাজ্য তার জন্য নিরাপদ নেই। তাছাড়া জায়াদ্রাকে বুঝাতে হলেও তাকে মেহমেতের থেকে দূরত্ব বাড়াতে হতো। তাই সাময়িক সময়ের জন্য সে সিলা রাজ্যে চলে এসেছিল। সে ভেবেছিল এই ব্যাপারে মেহমেতের সাথে কথা বলবে কিন্তু তার কাছে যে কোনো প্রমাণ ছিল না। তাছাড়া জায়াদ্রা মেহমেতের ভীষণ বিশ্বস্ত লোক। মেহমেত যে তাকে ভাইয়ের মতো ভাবে তাও জানতো। তাই সে ভেবেছিল যা করার সে করবে কিন্তু তার আগেই কি থেকে কি হয়ে গেলো। আমালিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিষ্পাপ মেয়েটার কোনো দোষ ছিল না। অথচ কিছু না করেও জঘন্য চক্রান্তের শিকার হলো।
-আর জনাব? তাকে কেন মারলেন?
-কে? ওহ ওই হাইব্রিড সন্তান আজলান? ওকে তো আরও আগে মারা উচিত ছিল আমার। ওর কারণেই তো মেহমেত শয়তান শক্তি থেকে মুক্তি পেয়েছে। নয়তো এতদিনে সে আমাদেরই একজন থাকতো।
-অথচ এত কিছু করেও আপনি শূন্য। কিছুই লাভ হলো কি?
-হবে অবশ্যই হবে। এবার আমি এই দুনিয়ার ওপর রাজ করব। সকলের ওপর শয়তানদের রাজ থাকবে। শুধু শয়তানদের। এই দিনটির জন্য কত অপেক্ষা করো ত্যাগ জানো? নিজের শক্তি নিজের রাজ্য ছেড়ে সাধারণ এক চাকর সেজে কতগুলো বছর কাটিয়ে দিয়েছি। শয়তান থেকে নিজেকে জ্বিন হিসাবে থাকতে হয়েছে। শুধু তোমার অপেক্ষায় আমালিয়া, শুধু তোমার অপেক্ষায় ছিলাম আমি। এবার আমি হবো এই ব্রহ্মান্ডের সর্বশক্তিমান। আমি হবো সকলের একমাত্র আশ্রয়। তোমার আমার শক্তি মিলেমিশে এক হলে আমাদের কেউ থামাতে পারবে না। এসো আমালিয়া আমার সাথে এসো। তোমাকে আমি রানী বানিয়ে রাখবো। এই দুনিয়ার রানী। যা চাও সব পাবে। তুমি শুধু আমার সাথে হাত মিলাও। তোমার ঐ শক্তি আমাকে দাও আমালিয়া।
জায়াদ্রাকে উদ্ভ্রান্তের মতো লাগলো। আমালিয়ার মেহমেতের জন্য খুব কষ্ট লাগলো। যখন সে জানতে পারবে ভাইয়ের মতো ভালোবাসার জায়াদ্রা তার পিঠ পিছে ষড়যন্ত্র করছে তখন তার কি অবস্থা হবে? আমালিয়া ছোট করে নিঃশ্বাস ছেড়ে গিয়ে বসলো বিছানায়। আবারো তাসবিহ পাঠ করতে করতে চোখ বন্ধ করে আয়েশি ভঙ্গিতে বলল,
-যদি সামর্থ্য থেকে তবে এই বলয় অতিক্রম করে আমাকে নিয়ে যান।
তার কণ্ঠে স্পষ্ট আত্মবিশ্বাস। সে জানে মেহমেত যখন তার সুরক্ষার জন্য জাদু করেছে, তার মানে সেই জাদু ভাঙার শক্তি স্বয়ং আল্লাহর আদেশ ছাড়া সম্ভব নয়। টোটো যত দেখছে তত বেশি অবাক হচ্ছে। জায়াদ্রা সকল কিছুর জন্য দায়ী? তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। যে জায়াদ্রা সকল পরিস্থিতে মেহমেতের ঢাল হয়ে ছিল সেই জায়াদ্রা মেহমেতের ক্ষতির চেষ্টা করেছে? আমালিয়ার বলা কথাটি জায়াদ্রার বড় গায়ে লাগলো। সে রাগে হিংস্র হয়ে সুরক্ষা বলয় ভাঙার চেষ্টা করলো। কিন্তু সফল হলো না। যদিও টোটো এবং মিগি ভয়ে ছিল। তবে আমালিয়া একদম শান্ত। তার শুধু মেহমেতকে নিয়ে চিন্তা হচ্ছে। সে একে একে বুঝতে পরছে তার মা, ইলারা, দাদি, মেলিসা, আজলান সকলে জায়াদ্রার জঘন্য পরিকল্পনার জন্য নিজেদের প্রাণ হারিয়েছে। মন চাইলো এখনি জায়াদ্রাকে শেষ করে দিতে কিন্তু সে এখন চাইলেও কিছু করতে পারবে না। তার মাঝে পর্যাপ্ত শক্তি নেই। জায়াদ্রা পারল না সুরক্ষা বলয় ভাঙতে। সে ব্যর্থ হয়ে থেমে গেল। কোমরে আড়াআড়ি ভাবে ঝুলিয়ে রাখা তলোয়ার বের করে এবার বলয়ের ওপর আঘাত করার চেষ্টা করলো কিন্তু তবুও বলয় অক্ষত অবস্থায় রইলো। জায়াদ্রা বুঝতে পারল মেহমেত মারাত্মক জাদু করেছে এবার। বিন্দুমাত্র ফাঁকফোকর রাখেনি। হঠাৎ হোহো করে হেসে উঠলো। আমালিয়া বন্ধ চোখ খুলে তাকালো এবার। জায়াদ্রা রেগে আছে ভীষণ কিন্তু তার মুখটি হাসি হাসি। দাঁতে দাঁত চেপে আমালিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-তোমার স্বামী ভীষণ চতুর জানো তো আমালিয়া। তাকে আমি হালকা ভাবে নিয়ে খুব অন্যায় করেছি। সে তোমাকে খুব ভালবাসে। নয়তো কেউ নিজের জীবনের সাথে যুক্ত করে বলয় তৈরি করে বউকে রক্ষা করতে চায়? এমন বিপদেও কি ভীষণ বুদ্ধি। মানতেই হবে সে বাদশাহ হওয়ার যোগ্য।
আমালিয়া এবার চমকে উঠলো। থমকে গেলো তার পৃথিবী। মেহমেত, মেহমেত এমন যদি করেছে? শুধুমাত্র তাকে সুরক্ষিত রাখতে? অর্থাৎ সে যতক্ষন জীবিত থাকবে এই বলয় কেউ ভাঙতে পারবে না। এমন কঠিন সময়েও আমালিয়ার বড্ড ভালোবাসা পেলো মেহমেতের প্রতি। আমালিয়া এবার আয়েশ করে বিছানায় অর্ধ শায়িত হয়ে মুচকি হেসে গর্ব করে বলল,
-সে আমার স্বামী, জ্বিনে বাদশাহ। সে তার জনগণ ও স্ত্রীকে কিভাবে সুরক্ষিত রাখতে হয় তা ভালো ভাবে জানে। পারল তাকে হারিয়ে দেখান।
আমালিয়া এই শান্ত, দাম্ভিক রূপ জায়াদ্রার নিতে পারল না। তার বড্ড রাগ হলো। রেগে অস্থির হয়ে বলল,
বেশ তবে আগে আপনার সেই স্বামীকেই না হয় শেষ করে আসি। এরপর না থাকবে এই বলয় আর না থাকবে আপনার স্বামী। তখন আপনার এই অহংকার কোথায় থাকে আমিও দেখব। আমি আসব আবারো আসবো। আপনার স্বামীকে নিজ হাতে শেষ করে আপনাকে নিতে অবশ্যই আসবো।
কথাগুলো বলে জায়াদ্রা কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে চলে গেলো। আমালিয়া এতক্ষন যতই সাহস দেখাক না কেন এখন তার খুব ভয় করছে। ভীষণ ভয় করছে। কি হবে? জায়াদ্রা যদি সত্যিই মেহমেতের কোনো ক্ষতি করে দেয়? মেহমেতের শক্তি এখনো সিরেন্থার মাঝে। সে পূর্বের মতো শক্তিশালী নেই। কি হবে ভেবে ভেবে অস্থির হয়ে উঠল আমালিয়া।
_______
-ভাই, আমাদের সৈন্যরা দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেকেই শহীদ হয়েছে। তাছাড়া আহতের সংখ্যা বেড়ে চলেছে।
তলোয়ার চালাতে চালাতে কথাগুলো বলল আরদার। মেহমেত একবার নিজের আশেপাশে দেখে নিল। তার সম্পূর্ণ শরীর র*ক্তে মাখা।
চেহারা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। ভয়ানক লাগছে তাকে। আরদারের অবস্থাও কম নয়। সে এর পূর্বে জ্বিনদের সাথে বহুবার লড়েছে। কিন্তু শয়তানদের বিরুদ্ধে এই প্রথমবার। মেহমেতের সাথে পাল্লা দিয়ে সে নিজেও পাষাণের মতো শয়তানদের একে একে র*ক্তাক্ত করতে উঠে পরে লেগেছে। এ যেন এক নেশা, র*ক্তের নেশা। হঠাৎ করে এক অতর্কিত আঘাত এসে তার ঘাড়ে পরে। মুহূর্তে তার তলোয়ার মাটিতে পরে যায়। র*ক্তাক্ত হয় তার শরীর। লুটিয়ে পরতে নিলে মেহমেত দুহাতে ধরে ফেলে থাকে। ফি*নকি দিয়ে রক্ত পরছে। ব্যাথায় ছটফটিয়ে উঠলো আরদার। যন্ত্রণায় তার মুখ নিল হয়ে এসেছে। মেহমেত আরদারের কাঁধে হাত চেপে সামনে তাকালো। তার চোখ লাল। রাগে মাথার রগগুলো ধপধপ করছে। চোয়াল ভীষণ শক্ত। বুকের মাঝে অজস্র ব্যাথা। মানতে পারছে না। মানতে পারছে না এই ব্যক্তি তার সাথে বেইমানি করেছে।
-জায়াদ্রা।
দাঁতে দাঁত চেপে রূঢ় কন্ঠে বলল মেহমত। জায়াদ্রার ভীষণ মজা পেল এই দৃশ্য দেখে। সে দাঁত বের করে হাসলো। মেহমেতকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-ভালো আছেন হুজুর? আমাকে মনে আছে তো?
-বেঈমান, বন্ধ করো এই নাটক।
-হাহাহা। নাটক! হ্যাঁ, নাটক। দীর্ঘ কয়েক শত শতাব্দী ধরে নাটক করতে করতে আমিও বিরক্ত বাদশাহে মেহমেত।
-কেন করলে এমন জায়াদ্রা?
-কেন করলাম? সে তো আপনার বোঝা উচিত।
-বুঝি এবং জানিও।
-আমিও বুঝেছিলাম আপনি বুঝতে পেরেছেন। গতকাল আপনার সেই দৃষ্টি, একের পর এক আমার থেকে লুকিয়ে করা কাজ বুঝিয়ে দিয়ে ছিল আপনি আমাকে সন্দেহ করছেন। তাই তো লুকোচুরি খেলার সমাপ্তি ঘটিয়ে এই যুদ্ধের আয়োজন।
-সন্দেহ নয় জায়াদ্রা, আমি নিশ্চিত ছিলাম তুমিই সেই বেঈমান। যে আমার মা-বাবা, দাদা-দাদিকে মেরেছে। আমাকে এতিম বানিয়ে গুটি বানিয়ে খেলেছে। সবটা পূর্বেই আমি বুঝে গিয়ে ছিলাম। শুধু অপেক্ষা করেছি। দেখতে চেয়েছি তুমি আর ঠিক কতটা নিচে নামতে পারো। কি পেলে এসব করে জায়াদ্রা? কি পেলে? ভেবেছো কি এসব করলেই তুমি জিতে যাবে?
-জিতে তো আমি গিয়েছি। আর অনেক কিছু পেয়েছিও বাদশাহে মেহমেত। আমার যা যা চাই সবটাই পেয়েছি। আর সামনে যা যা দরকার সব আদায় করে নেবো আমি। আপনি তো জানেন শয়তানেরা নিজ স্বার্থের জন্য সব কিছু করতে পারে।।
মেহমেতের গলা কাপছে। নিজেকে শক্ত রাখবে বলে প্রতিজ্ঞা করেও বিশেষ লাভ হচ্ছে না। আরদার নেতিয়ে পরেছে। মেহমেত দ্রুত ওর কাঁধে হাত রেখে জাদু করে ক্ষত ঠিক করার চেষ্টা করলো কিন্তু কাজ হল না। বারবার করলো কিন্তু ক্ষত যেমন ছিল তেমনই রয়েছে। মেহমেত ভারী অবাক হলো এতে। আজ পর্যন্ত তার জাদু কখনো বিফলে যায়নি। তাহলে এবার কেন এমন হচ্ছে? জায়াদ্রা ওর এই অবস্থায় আবারো উচ্চ স্বরে হেসে উঠলো।
কি জাদু কাজ করছে না? করবেও না।
অতঃপর নিজের হাতের চকচক রূপালী তলোয়ারটি মেহমেতের সামনে ধরে বলল,
-এই যে দেখছেন, এই তলোয়ারটি! এটি একটি বিশেষ শক্তি সম্পন্ন তলোয়ার। এই তলোয়ারের বিশেষত্ব কি জানেন? এই তলোয়ারটিও সিরেন্থার মতো সাতটি শিশুর বলির মাধ্যমে প্রাপ্ত। সিরেন্থার মতো শক্তিশালী না হলেও কম কিছু নয়। এবং এটি দ্বারা কাউকে আঘাত করা হলে দুনিয়ার কোনো জাদু সেই আঘাত ঠিক করতে পারে না। সিরেন্থাকে ভুলে না গেলে অবশ্যই আপনি বুঝবেন এই তলোয়ারের ক্ষমতা। এটি যতক্ষন আমার হাতে রয়েছে আমাকে কেউ হারাতে পারবে না। আপনার পরাজয় নিশ্চিত বাদশাহে মেহমেত। আমালিয়া এবং আমালিয়ার শক্তি শুধু আমার হবে।
মেহমেত চুপচাপ শুনল। দুজন সৈন্যকে হুকুম দিলো আরদারকে সুরক্ষিত ভাবে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে। তারা আরদারকে নিয়ে যেতেই মেহমেত দুহাতে তলোয়ার নিয়ে উঠে দাড়ালো। জায়াদ্রার সম্মুখীন হয়ে বলল,
-হয়তো আমার কাছে আমার শক্তি নেই। হয়তো আমার কাছে সিরেন্থা নেই। তবে আমার সাথে আল্লাহ রয়েছে। আর আমার বিশ্বাস আল্লাহ কখনো অন্যায়কে জিততে দিবে না। তাতে তুমি যত ক্ষমতাবান হও না কেন, আল্লাহর ওপর কেউ না। যদি আল্লাহ চায় অবশ্যই আমি তোমাকে শূন্য হাতে শেষ করবো।
জায়াদ্রা তাচ্ছিল্য করে বলল,
-আপনার আল্লাহ আমার কিছুই করতে পারবে না। আমি এখন তার থেকেও বেশি শক্তিশালী। দেখা যাক আমার জয় হয় নাকি আপনার আল্লাহর।
এরপর শুরু হলো সেই দীর্ঘ অপেক্ষিত যুদ্ধ। যার জন্য মেহমেত পূর্ব হতে তৈরি ছিল। কিন্তু যত সময় যেতে লাগলো জায়াদ্রার শক্তি ও তলোয়ার দুটোই মেহমেতের ওপর ভারী হতে লাগলো। জায়াদ্রার এক একটি আঘাত মেহমেতের শরীরে ক্ষতের সৃষ্টি করতে লাগলো। ওদিকে মেহমেতের ক্ষতের সাথে সাথে আমালিয়ার কামরায় থাকা বলয় ধরে ধীরে ভাঙতে লাগলো। আমালিয়া শুধু দোয়া করতে লাগলো আল্লাহর কাছে। কিন্তু ধীরে ধীরে বলয় প্রায় ভেঙে যাচ্ছিল যখন তখন সে মেঝেতে আসন পেতে বসে চোখ বন্ধ করে জাদু করতে লাগলো। নিজের শরীর থেকে আজলানের দেয়া শক্তি বের করে হতে নিলো। এরপর উঠে জানালার কাছে গিয়ে হাওয়ার তৈরি একটি তীর ধনুক বানিয়ে তাতে সেই শক্তিগুলো রেখে আসমানের দিকে ছুঁড়ে দিলো। অপেক্ষা করল বলয় ঠিক হওয়ার। তার পেটে থাকা সন্তান খুব ধীরে ধীরে শক্তি নিজের মাঝে গ্রাস করে। যার দরুন সকালে পাওয়া শক্তি এখনো তার শরীরে রয়েছে। আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া জানালো এ জন্য সে।
বারযাখ ময়দানে,
জায়াদ্রার আঘাতে মেহমেত মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। তার শরীরে তলোয়ারের আঘাতের অসংখ্য ক্ষত। শেষ মুহূর্তে জায়াদ্রা যখন মেহমেতের গলায় তলোয়ারটি চালাতে গেলো ঠিক তখনি আসমান থেকে একগুচ্ছ নিল রশ্মি এসে মেহমেতের শরীরে প্রবেশ করলো। জায়াদ্রার তলোয়ার থেমে গেলো। সে স্থির সেই রশ্মির দিকে তাকিয়ে। কি হলো বুঝতে পারলো না। রশ্মিটি মেহমেতের শরীরে প্রবেশের সাথে সাথে মেহমেত যন্ত্রণায় ছটফটিয়ে উঠলো। কাতরাতে লাগলো। তার ছটফটানি দেখে জায়াদ্রা খুশি হলেও কারণ বুঝলো না। অতঃপর কিছু সময়ের মাঝে মেহমেত শান্ত হয়ে গেলো। তার শরীরে এখন আগের থেকে বেশি শক্তি অনুভব করতে পারছে। মুহূর্তে সে উঠে বসলো। তার শরীর থেকে এখনো র*ক্ত ঝড়ছে। ক্ষত পুরোপুরি না সারলেও পূর্বের তুলনায় ভালো লাগছে। ঘটনা কি বুঝতে সমস্যা হলো না। মনে মনে নিজ স্ত্রীর চতুরতার ভীষণ খুশি হলো। জায়াদ্রা অবাকের ওপর অবাক। কি হচ্ছে বুঝতে পড়ল না। তার অবাকতার মাঝে মেহমেত আঘাত করে বসলো। সতর্ক না থাকার দরুন মেহমেতের করা একের পর এক আঘাতে সে ক্ষত-বিক্ষত। কিন্তু তাকে দমিয়ে রাখা যেন অসম্ভব প্রায়। মেহমেত চালাকি করলো। কয়েক জন রাজাদের চোখের ইশারায় কিছু একটা বুঝালো। অতঃপর সকলে মিলে একের পর এক তাকে আঘাত করতে লাগলো। সকলে মিলে আঘাত করায় জায়াদ্রা প্রতিরোধ করতে পারল না। যার ফলে সে বেশ অনেকটাই আঘাত প্রাপ্ত। জায়াদ্রা দ্রুত সেখান থেকে সরে গেলো। নিজের সৈন্যদের আদেশ দিলো সবাইকে শেষ করে দিতে। যুদ্ধ ভয়ানক রূপ নিয়েছে। জ্বিনদের অধিকাংশ শহীদ হয়েছে। শয়তানরা জ্বিনদের ঘিরে রেখেছে। মেহমেত তবুও থেমে নেই। হার নিশ্চিত জেনেও সামনে যাকে পাচ্ছে আঘাত করে যাচ্ছে অন্ধের মতো। আমালিয়া এতো সময় টোটোর শক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের ময়দানে চলতে থাকা দৃশ্য দেখছিল। পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে। যেকোনো মুহূর্তে মেহমেতরা হেরে যাবে। মনে মনে ভীষণ বড় একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। আজলান হয়তো এর ব্যাপারেই তাকে অবগত করতে চেয়েছিল। বুক চিরে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার। হাতটি পেটের ওপর রেখে বলল,
-চিন্তা করো না সোনা, হয় আজ বাবারই হবে।
মিগি তার পাশেই বসে ছিল। তার চোখে মুখে চিন্তা। মেহমেতের জন্য চিন্তা। তাদের অনুচর গুলো মালিকের খুব অনুগত হয়। মালিকের যে জিনিস ভীষণ প্রিয় হয় তাদেরও সেই জিনিস প্রিয় হয়। যদি মালিক কাউকে ভালোবাসে তবে তারাও সেই ব্যক্তিকে খুব ভালবাসে। এই যেমন মেহমেত তাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে। তাই তো টোটো মেহমেতের থেকে আমালিয়াকে বেশি ভালোবাসে, মান্য করে। ঠিক তেমনই মিগির ক্ষেত্রেও। সে আমালিয়ার থেকে মেহমেতকে বেশি ভালোবাসে। কারণ আমালিয়া নিজের থেকেও বেশি মেহমেতকে ভালবাসে।
-মিগি, এদিকে আসো।
আমালিয়া মিগিকে কাছে ডাকলো। মিগি তার নরম শরীরটি নিয়ে আমালিয়ার আরো কাছ ঘেঁষে বসলো। আমালিয়া তার ছোট ছোট হাত দুটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে মায়া মায়া গলায় বলল,
-তুমি ভীষণ ভালো মিগি। আমি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট। আমি জানি তুমি মেহমেতকে নিয়ে চিন্তিত। চিন্তা করো না তার কিছু হবে না। আমরা আছি তো তার সাথে। তাই না? আমরা মেহমতের কিছু হতে দিবো না। তুমি আমার অনুচর মিগি। আমি যেহেতু মেহমেতকে সাহায্য করতে পারছি না। সুতরাং তোমার উচিত আমার হয়ে তাকে সাহায্য করা।
-কি করতে হবে শেহজাদি? আপনি শুধু আদেশ দিন।
আমালিয়ার চোখ ছলছল করে উঠলো। ঠোঁট নাড়িয়ে মিগির মাথায় ভালোবেসে চুমু খেলো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। মিগি ভীষণ খুশি হলো। আমালিয়া কখনো তাকে এভাবে আদর করেনি। তাই আজ এতটুকু আদরে সে ভীষণ খুশি হলো। আমালিয়ার শরীরের সাথে শরীর মিশিয়ে আমালিয়ার উষ্ণতা খুঁজলো। আমালিয়ার ভীষণ কান্না পেল। সে বিড়বিড়িয়ে বলল,
-দুঃখিত মিগি।
কিন্তু মিগিকে বলল,
তুমি ময়দানে যাও মিগি। মেহমেতকে সাহায্য করো। আমি আদেশ দিচ্ছি তোমাকে।
মিগি মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। কিন্তু টোটো বাঁধা দিল। সে বলল,
-মিগি আপনার সাথে এখানে থাকুক মহারানী। আমি বরং যাই।
-না টোটো। তোমার এখানে দুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। মিগি তুমি যাও।
মিগি আমালিয়ার আদেশ পেয়ে চলে গেল। আমালিয়া বেশ অনেকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে উঠে দাড়ালো। টোটোকে বলল,
-চলো টোটো আমাদের একটি স্থানে যেতে হবে গুরুত্ব পূর্ণ কাজে।
কিন্তু মহারানী, বাদশাহ আপনাকে এই কক্ষ ছেড়ে -বের হতে নিষেধ করেছে। আমি এই অন্যায় করতে পারব না।
-তবে আমি একাই যায়? কি বলো যাবো?
-না না।
টোটো ভয় পেলো। আমালিয়াকে একা ছাড়ার ভুল সে কখনো করতে পারবে না। কিন্তু মেহমেত যে বারণ করে গেলো? এখন কি করবে? আমালিয়া ওকে চিন্তিত দেখে সামনে পা বাড়ালো। তা দেখে টোটোও তাড়াহুড়ো করে আমালিয়ার সাথে পা বাড়ালো। আমালিয়া জানতো টোটো তার কথার অবাধ্য হবে না। কিন্তু মিগি? সে অবশ্যই হবে। মেহমেতের কথার বাইরে সে এক পাও রাখবে না। তাছাড়া যে কাজে সে যাচ্ছে সেই কাজে সে মিগিকে নিতে চায় না। এর থেকে বরং মিগি মেহমেতের কাছে থাকুক কিছু সময়। ওর ভালো লাগবে।
আমালিয়া, টোটো দাঁড়িয়ে আছে পঞ্চম আসমানে। এখানে আসার পথে টোটো প্রশ্ন করে করে তার মাথা ব্যাথা করে দিয়েছে। সে এখনো চুপ নেই। বুঝতে পারছে না এখানে কেন এসেছে আমালিয়া। আমালিয়া চারিদিকে চোখ বুলিয়ে খুঁজলো কিছু একটা। নাহ কোথাও তো দেখছে না। আফসানায়ে জ্বিনান বইতে যে এই স্থানটির কথাই বলা হয় ছিল। তাহলে কোথায় সেই দরজা। আমালিয়া মেঘের ওপর দিয়ে আরো কিছুটা পথ অতিক্রম করলো। অতঃপর দেখা মিলল কাঙ্ক্ষিত সেই দরজা। নূরাযালের সেই দরজা যার ওপরে রয়েছে সিরেন্থা। আমালিয়া খুশি হলো। তার চোখে মুখে খুশির আভা ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু পাশে দাঁড়ানো টোটো খুশি হতে পারল না। সে আতঙ্কিত। এত সময় ন বুঝলেও এই দরজাটি দেখে সে বুঝতে পেরেছে আমালিয়া এখানে কোন উদ্দেশ্যে এসেছে। সে নিজের লোমশ শরীরটি নিয়ে আমালিয়ার পায়ের সাথে মিশে গেলো। আমালিয়া দরজা থেকে চোখ সরিয়ে এবার টোটোর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো। হাঁটু গেড়ে টোটোর সামনে বসে টোটোর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিলো। আমালিয়ার চোখে পানি। তার ভয় করছে। সে যা করতে যাচ্ছে তা করতে ভীষণ সাহস লাগে। কিন্তু এছাড়া উপায় কি? বুক কাপছে। গর্ভে সন্তানের জন্য মন কাদছে। মেহমেতকে এক পলক দেখার জন্য হাঁসফাঁস লাগছে। কিন্তু….কিন্তু তা যে আর সম্ভব নয়। টোটো বারবার তার শরীর নাড়িয়ে বোঝাচ্ছে এমন না করতে। আমালিয়া চোখে পানি নিয়ে টোটোর শরীরে ঠোঁট ছোঁয়ালো। মিষ্টি স্বরে বলল,
-তুমিও খুব ভালো টোটো। আমাকে ভীষণ ভালোবাসো। আমার সাথে থাকার জন্য তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এটাই আমার ভবিতব্য। আমার জন্ম হয়েছেই এই উদ্দেশ্যে। যদি আজ আমি নিজেকে ত্যাগ না দিই তবে শয়তানরা জিতে যাবে। এরপর কি হবে তুমি নিশ্চয়ই জানো? আমি চাই না আমি শক্তি কোনো খারাপ হাতে পড়ুক। তোমাকে বড় একটি দায়িত্ব দিয়ে গেলাম। আমার মেহমেতকে সামলে নিও। আমি যাওয়ার পর তাকে বলে দিও, তাকে আমি ভীষণ ভালবাসি। এতটাই ভালবাসি যে, তার জন্য আমি আমার সন্তানকে ত্যাগ করতে দ্বিতীয়বার ভাবিনি। তাকে জানিয়ে দিও আমার না বলা কথাটি। সে বাবা হতে চলে ছিল টোটো। আমি তার সন্তানকে দুনিয়াতে আনতে পারিনি।
টোটো চমকে উঠলো। সন্তান? আমালিয়া সন্তানসম্ভবা? টোটো দ্রুত নিজের রূপ পরিবর্তন করে মেহমেতের রূপ নিল। আমালিয়া সেই মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলো। টোটো নিজের অজান্তেই আমালিয়ার একটি ইচ্ছা পূরণ করে দিলো। আমালিয়া তার কাঁপা কাঁপা হাতটি উঠিয়ে মেহমেত রূপি টোটোর গালে রাখলো। টোটো কেঁদেই দিলো এবার। অনুরোধ করে বলল,
-এমন করবেন না মহারানী। বাদশাহ আপনাকে ছাড়া বাঁচবে না। সে আপনাকে প্রচুর ভালবাসে। আমার কথাটি শুনুন দয়া করে। আপনাদের সন্তানের কথা ভাবুন।
-তোমার কি মনে হয় টোটো, মেহমেত হেরে গেলে আমার সন্তান দুনিয়ার আলো দেখতে পারবে? তাকে আমার গর্ভেই শেষ করে দেয়া হবে। সে আমার শক্তি নিজের মাঝে চুষে নিচ্ছে টোটো। জায়াদ্রা না চায় তার সে(পেটে হাত রেখে) থাকলে কখনো সম্ভব নয়।
-কিন্তু মহারানী…
-তুমি আমাকে শেষবারের জন্য আমালিয়া ডাকতে পারো। এখানে মেহমেত নেই।
টোটো এবার ডুকরে কেঁদে ফেলল। এ কেমন পরীক্ষা ছিল সৃষ্টিকর্তা তাদের? তার দ্বারা এ কোন পাপ হয়ে গেলো। সে কেন আমালিয়াকে বাঁধা দিতে পারছে না। অতঃপর টোটোর কিছু মনে পড়ল এমন করে আমালিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
-আপনি চাইলেও নিজেকে ত্যাগ দিতে পারবেন না আমালিয়া। যারা পবিত্র একমাত্র তারাই নূরাযাল অতিক্রম করতে পারবে। আর আপনি যদি সন্তানসম্ভবা হয়ে থাকেন তবে আপনি…
আমালিয়া ভেবেছিল এই ব্যাপারে। তবে সে নিশ্চিত এই দরজা সে অতি সহজে অতিক্রম করতে পারবে।
-জানি টোটো। তবে আমি পবিত্র না হলেও আমার গর্ভে ধারণ করা সন্তান কিন্তু পবিত্র।
শেষ আশাটিও বিফলে গেলো। আমালিয়া টোটোকে ছেড়ে উঠে দাড়ালো। নূরাযালের দিকে পা বাড়িয়ে বলল,
-সিরেন্থা হাতে পেলে সে নিজের মাঝে থাকবে না টোটো। আর আমি নেই জানতে পারলে সে আরো হিংস্র হয়ে উঠবে। তাকে বলবে বেশি হিংস্রতা না করতে। আমি এসব পছন্দ করি না। তাকে বলবে কাজ সম্পন্ন কয়ে গেলে সিরেন্থাকে যত্ন করে তুলে রাখতে। প্রয়োজন ব্যতীত ব্যবহার না করাই ভালো। তুমি জানো তাকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। আমাকে নিরাশ করো না। যে দায়িত্ব তোমাকে দেয়া হলো তা মন দিয়ে পালন করো। আমার মেহমেতকে দেখে রেখো।
এরপর ছোট ছোট পায়ে টোটোকে কান্নারত অবস্থায় রেখে আমালিয়া এগিয়ে গেল তার মৃত্যুর দিকে। টোটো ততক্ষন তাকিয়ে রইলো যতক্ষন আমালিয়া দরজা ভেদ করে ওপারে চলে না গেল। আমালিয়া ঠিক ছিল, সে খুব সহজে দরজাটি অতিক্রম করেছে। বিন্দুমাত্র সমস্যা হয়নি। টোটো সেই দৃশ্য মেনে নিতে পারল না। ওভাবে হাঁটু গেড়ে মুখে হাত চেপে গেলে ফেলল। আমালিয়া, আমালিয়া আজ অনেক বড় ত্যাগ দিলো। নিজের জীবনের সাথে সাথে নিজের সন্তানকে সে সকলের ভালোর জন্য ত্যাগ দিলো।
আমালিয়া যখন দরজা ভেদ করে এপারে এলো তখন তার চোখ ছানাবড়া। এপার-ওপারের দৃশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওপাশে আকাশ আর এপাশে জমিন। গাছ-পালা, পাখি, ফুল-ফলে পরিপূর্ণ একটি জঙ্গল। ভীষণ সুন্দর। অপূর্ব! যা দেখলে শুধু দেখতেই মন চায়। চোখ ধাঁধানো মায়া। আমালিয়া এগিয়ে গেলো। সামনে একটি ঝিল। স্বচ্ছ জলে পরিপূর্ণ একটি ঝিল। ঝিলের পানি এতটাই স্বচ্ছ যে ঝিলে থেকে মাছগুলো স্পষ্ট দৃশ্যমান। সেই ঝিলের ঠিক মাঝে একটি বড় গাছ। গাছটির পাতাগুলো ছোটছোট এবং স্বর্ণের মতো জ্বলজ্বল করছে। গাছটির নাম আমালিয়া জানে না তবে সে এই গাছটিকে পূর্বেও দেখেছে। স্বপ্নে দেখেছিল। তার মনে আছে। স্বপ্নে সে এই গাছটি স্পর্শ করার সাথে সাথে শরীরে আগুন লেগে যায়। এরপর আমালিয়ার আরো একটি স্বপ্নের কথা মনে পড়লো। তার কোলে একটি বাচ্চা ছিল। সেই বাচ্চাটি সহ তার শরীরে আগুন লেগে যায়। আমালিয়া দ্রুত পেটে হাত রাখে। এর মানে কি স্বপ্নগুলো পূর্বাভাস ছিল, তাকে সতর্ক করার জন্য। অথচ সে তখন বুঝতে পারেনি। ঠিক সেই মুহূর্তে আমালিয়া নিজের পেটে তার সন্তানের অস্তিত্ব অনুভব করে প্রথমবারের মতো। আমালিয়া কেঁদে উঠলো হঠাৎ। সে ভয়ানক স্বার্থপর হলো আজ। বাচ্চার কথা না ভেবে পা বাড়ালো সামনের দিকে। তার ত্যাগই পারে দুনিয়াকে কালো আঁধার থেকে রক্ষা করতে। আমালিয়া ঝিলের পানি অতিক্রম করে গাছটির নিচে গিয়ে দাঁড়ালো। পাতাগুলো থেকে আসা রশ্মি চোখ ঝলসে দিতে চাইছে। আমালিয়া বাম হাত পেটে রেখে ডান হাত বাড়িয়ে ঝুলন্ত গাছের পাতায় হাত রাখলো। বিড়বিড়িয়ে বলল,
-দুঃখিত সোনা। মা আপনাকে দুনিয়ার আলো দেখাতে পারল না। মা ভীষণ দুঃখিত। মা আপনাকে খুব ভালবাসে। আমরা বাবাকে রক্ষা করতে পেরেছি। চলুন এবার আমাদের যাওয়ার সময় এসেছে।
মুহূর্তে আমালিয়ার সম্পূর্ণ শরীরে আগুন জ্বলে উঠলো। আর কিছু সময়ের মাঝে তার দগ্ধ ছাই বাতাসের সাথে মিলিয়ে গেলো। সাথে সাথে গাছটির পরিবর্তে একটি চক্র দেখা গেল। যার মাঝে র*ক্ত রঙ্গা সিরেন্থা। সিরেন্থা আজ মুক্ত। সে তার মালিকের কাছে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। হাওয়ার বেগে সে ছুটে চলল মেহমেতের উদ্দেশ্যে। টোটো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো সেই দৃশ্য। সিরেন্থা মুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ আমালিয়া আর নেই।
অন্যদিকে বারযাখ ময়দানে যখন মেহমেত শয়তানদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত তখন মিগি সেখানে উপস্থিত হয়ে নিজেও যুদ্ধে লিপ্ত হয়। মেহমেত তাকে এখানে দেখে খুব অবাক। কিন্তু প্রশ্ন করার সময় কথায়। তাদের ওপর ঘোর বিপদ যে। তারা শয়তানদের মারলেও বিশেষ লাভ হচ্ছে না। তাদের সংখ্যা কোনো ভাবেই কমানো যাচ্ছে না। মেহমেতরা এখন সংখ্যায় খুব কম। হাতে গোনা ৫০/৬০ জন রয়েছে। এই কয়জন মিলে এত কোটি শয়তানদের সাথে মোকাবিলা করা অসম্ভব প্রায়। তার সাথে থাকা সকলেই প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছে। মেহমেত নিজেও প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছে। তবুও তার চেষ্টা আমালিয়াকে সুরক্ষিত রাখার। ঠিক সে সময় মিগি ডেকে উঠল।
-বাদশাহ।
মেহমেত অস্র চালাতে চালাতে তাকালো মিগির দিকে। তার হাত এক সেকেন্ডের জন্যও থেমে নেই। তবে মিগিকে দেখে থেমে গেলো। যার ফলে কয়েকটি আঘাত তার শরীরে পড়ল। মিগি ধীরে ধীরে ছাইয়ে পরিণত হয়ে তার চোখের সামনে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। মেহমেত ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল। ধীরে বলল,
-আমালিয়া।
মিগির ততক্ষন কিছু হওয়ার কথা নয় যতক্ষন আমালিয়া ঠিক থাকবে। তার মানে? মেহমেত একদম নিস্তব্ধ। তার মাঝে নড়চড় নেই। বুকের মাঝে খচখচানি বেড়ে বলল। মেহমেতকে নিস্তেজ হতে দেখে জায়াদ্রা এগিয়ে এলো। মোক্ষম সুযোগ কাজে লাগাতে তলোয়ার উঠিয়ে আঘাত করতে চাইলো। ঠিক সেই মুহূর্তে আসমান ছিঁড়ে শো শো শব্দ করে সিরেন্থা মেহমেতের হাতে এলো। মেহমেত একমুহুর্ত অপেক্ষা করল না। তাকালো না পর্যন্ত। সে দক্ষ হাতে সিরেন্থা চালিয়ে দিল জায়াদ্রার গর্দানে। সাথে সাথে জায়াদ্রার ধরে থেকে মাথা আলাদা হয়ে মাথাটা মাটিতে পরে গেলো। শরীরটা তখনও স্থির দাঁড়িয়ে। হাতের তলোয়ারটিও পড়ে গেলো নিচে। মেহমেত হঠাৎ গর্জে উঠলো ভয়ংকর রূপে। সেই গর্জনে সকলে কেঁপে উঠলো। জায়াদ্রার মাথা কেটেও যেন তার আয়েশ মেটেনি। পেট বরাবর লাথি দিয়ে শরীরটি মাটিতে ফেলে পাগলের মতো তলোয়ার চালাতে লাগলো। আরদার তখন ফিরছিল যুদ্ধ ময়দানে। মেহমেতের এই বিধ্বংসী রূপ দেখে তার রুহ পর্যন্ত কেঁপে উঠলো। এর পূর্বেও সে এভাবে মেহমেতকে দেখেছে। দ্রুত পা চালিয়ে কাছে গিয়ে মেহমেতের হাতে সিরেন্থা দেখে কয়েক পা পিছিয়ে গেলো। সিরেন্থা! মেহমেতের কাছে কেন? তবে কি আমালিয়া? নাহ্! এ কি করলো বকা মেয়েটি? মেহমেতের অবস্থা দেখে রীতিমত সকল শয়তানেরা পালানোর পাঁয়তারা করলো কিন্তু মেহমেতের হিংস্রতা থেকে কেউ রক্ষা পেলো না। সে চিৎকার করে বলল,
-আপনাকে না পেলে আমি সব ধ্বংস করে দিবো। কসম সব ধ্বংস করে দিবো। কিচ্ছু অবশিষ্ট রাখবো না। পাষাণ, নির্দয় মেয়ে। আমাকে একা ছেড়ে চলে গেলেন কিভাবে? আমি কাউকে ছাড়ব না। যে দুনিয়ার কারণে আপনি আমার হলেন না সেই দুনিয়াই আমি রাখবো না। আআআআআআ।
পরবর্তী সময় জুড়ে বারযাখ ময়দানে চলল মেহমেতের মারাত্মক হিংস্রতা। যে তার সামনে এসেছে তাকেই শেষ করেছে। এমনকি আরদারকেও আঘাত করে বসেছে। আরদার মাটিতে বসে তার ভাইয়ের হিংস্রতা দেখলো। আগের বার মেহেমতকে সামলানোর মানুষ ছিল কিন্তু এবার? এবার কি হবে?
-মেহমেত।
মেহমেতের পাগলামি থেমে গেলো আমালিয়ার কন্ঠ পেয়ে। তাকে থামতে দেখে গুটি কয়েক যে শয়তানেরা ছিল তারা প্রাণ নিয়ে পালালো। মেহমেত পিছু ফিরে চাইলো। ওই তো তার আমালিয়া দাঁড়িয়ে। কি স্নিগ্ধ লাগছে। সে তলোয়ারটি ফেলে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো আমালিয়াকে। বাচ্চাদের মতো কেঁদে বলল,
-আমি ভেবেছিলাম আপনাকে হারিয়ে ফেলেছি। খুব ভয় পেয়েছিলাম। আপনি কোথায় গিয়ে ছিলেন। আমি…আমি….
কান্নার দরুন সে থেমে থেমে বলল। আমালিয়া বড় কষ্টে এবার মুখ খুলল।
-মহারাজ, আমি টোটো।
মেহেমেত ঠেলে টোটোকে সরিয়ে দিলো। তার চোখে বিস্ময়। টোটোর কাছে তার মেজাজ খারাপ হলো। আবারো হিংস্র রূপ নেয়ার পূর্বে টোটো বলল,
-মহারানী আমাকে এমনটা করতে বলেছে মহারাজ। সে আপনাকে কিছু কথা জানাতে বলেছে।
-আমালিয়া?
-জ্বি।
-তুমি তার সাথে ছিল?
-জ্বি মহারাজ। আমি তাকে বাঁধা দিয়েছিলাম কিন্তু সে কারো কথা শোনার মেয়ে নয়।
কথাটি বলতে বলতে টোটো কেঁদে ফেলল। তার চোখের জল বলে দিচ্ছে তার মনের কষ্ট। মেহমেত কিছুই বলল না। টোটো একে একে মেহেমতকে সবটা জানালো যা আমালিয়া তাকে জানাতে বলে ছিল। শেষে যখন জানতে পারল আমালিয়া সন্তানসম্ভবা ছিল তখন মেহমেত তাচ্ছিল্যের একটি হাসি দিলো। চোখে পানি জমলো। মনে মনে বলল,
-বেঈমান।
নিজের সাথে সাথে তার সন্তানকেও নিয়ে গেল পাষাণী। তার ভালোবাসার এই দাম দিলো মেয়েটা। সে তার সন্তানের আসার সংবাদটিও পেল না। বুকের মাঝে জ্বলে পুড়ে গেল। অথচ সে কাউকে দেখলো না। সবাইকে পিছে ফেলে চলল অজানার পথে। দূরে রক্তাক্ত মাঠে পরে রইলো সিরেন্থা। যার জন্য এত লড়াই, এত ত্যাগ। আহা, জীবন বড়ই বিচিত্র। পাওয়ার আগ পর্যন্ত যার জন্য আমাদের এত আহাজারি, পাওয়ার পর তার দাম দিতে জানি না। আরদার তাকিয়ে রইলো মেহেমতের যাওয়ার পথে। হাত বাড়িয়ে তুলে নিলো সিরেন্থা। এটি এখন সর্বোচ্চ সতর্কতা সাথে সুরক্ষিত রাখতে হবে।
দূর আকাশে আফসানায়ে জ্বিনান বইয়ে আমালিয়ার অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো। শব্দ করে বন্ধ হলো বইটি। বড়ই র*ক্তাক্ত এক ইতিহাস ছিল এই প্রেমগাথায়। ভালোবাসা, ধোঁকা, রাগ, অভিমান ও ত্যাগের মাধ্যমে আমালিয়া বিদায় নিল সকলের থেকে।
পরিশিষ্ট:
উঁচু পর্বতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এক সুদর্শন যুবক। আজ পূর্ণিমার রাত। আকাশে মস্তো বড় চাঁদের দেখা মিলেছে। মৃদু-মন্দ হাওয়া বইছে। যুবকটি পিছে হাত বেঁধে চাঁদের দিকে তাকিয়ে। হয়তো কোনো কিছুর অপেক্ষায় রয়েছে। কিছু মুহূর্ত পর অন্য একটি যুবক এগিয়ে এলো ধীর পায়ে। ভীষণ উৎফুল্ল হয়ে বলল,
-ভাই, সে এসেছে। তার আগমন বার্তা কি আপনি শুনতে পাচ্ছেন?
আরদারের বলা কথায় মেহমেত চোখ বন্ধ করে নিল। কানে ভেসে এলো সদ্য জন্ম নেয়া একটি বাচ্চার ছোট গলার চিৎকার। মেহেমতের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। চোখ বন্ধ অবস্থায় ভীষণ মুগ্ধ করা গলায় বলল,
-স্বাগতম বউজান। আফসানায়ে জ্বিনানে আপনাকে আবারো স্বাগতম।
সমাপ্ত.
[শেষ শেষ শেষ। অবশেষে আমার মাথায় প্রেসার দেয়া উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটলো। ৭০০০+ শব্দ। একসাথে লিখে শেষ করে দিলাম। মনে হলো আপনাদের আর অপেক্ষা না করাই। অর্ধেক রিচেক দেয়া হয়েছে। সময় হয়ে গিয়ে ছিল বলে তাড়াহুড়ায় সবটা দিতে পারিনি। এবার যে যত পারো গালি দাও দেখি🤧। আগামী দুই দিন আমি অনলাইনে আসবোই না। দেখা হবে নতুন একটি গল্প নিয়ে। সকলে ভালো থাকবেন। নতুন বছর সকলের খুব সুন্দর কাটুক। আমার জন্য দোয়া করবেন। ওকে টাটা।