ফন্ট সাইজ:
থিম:
আফসানায়ে জ্বিনান

৪১তম পর্ব

লেখক: মীরা রায়াদ

#আফসানায়ে_জ্বিনান

#মীরা_রায়াদ

পর্ব-৪১

[কপি করা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। উপন্যাসটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। উপন্যাসটি ভালো লাগলে রিভিউ দিবেন এবং শেয়ার করে অন্যকে পড়ার জন্য উৎসাহ করবেন। সকলে রেসপন্স করবেন।]

রাত অনেক গভীর। আকাশে মস্তো বড় চাঁদ দেখা যাচ্ছে। তার থেকে কিছুটা দূরত্বে একটি তারাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চারিদিকে শুনশান নীরবতা। সিলা রাজ্যের প্রবেশদ্বারে বেশ কিছু সংখ্যক প্রহরীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মশালের টিমটিমে আলোয় প্রবেশদ্বার থেকে কিছু দূরত্বে দুটি অবয়বকে দেখা গেল। তারা এদিকেই আসছে। প্রহরীরা ভাবলো শত্রু অথবা গুপ্তচর। তাই তারা সতর্ক হয়ে গেল। অবয়ব দুটি যত কাছাকাছি এলো তত তারা স্পষ্ট হলো প্রহরীদের নিকট। দেখা মিলল ভিন্ন একটি ঘটনার। আরদার ও মেহমেত খুব ধীরে এগিয়ে আসছে। প্রহরীরা একে অন্যের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। এই সময়ে এত রাতে তারা দুজন একসাথে কেন? ওরা প্রবেশদ্বারের কাছে এলে সকলে সম্মান জানালো, কিন্তু প্রশ্ন করল না কেউ। আরদার আগ বাড়িয়ে জানতে চাইলো,

-আমার অনুপস্থিতিতে কোনরূপ সমস্যা দেখা দিয়েছিল কি?

-জ্বি না মহারাজ।

-আর তোমাদের শেহজাদি? সে ঠিক আছে?

-জ্বি। আপনার কথা অনুযায়ী আপনি যাওয়ার পর রাজ্য থেকে না কাউকে বের হতে দেয়া হয়েছে, আর না কাউকে রাজ্যে প্রবেশ করতে দেয়া হয়েছে। শেহজাদির উপরও কঠিন নজরদারি রাখা হয়েছে সর্বক্ষণ। বাকিটা মন্ত্রীমশায় দেখেছেন।

আরদার সন্তুষ্ট হলো। মেহমেতও স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। আমালিয়াকে নিয়ে তারা সকলে ভীষণ চিন্তায় রয়েছে।

-বেশ তোমরা সর্বক্ষণ সতর্ক থেকো। আর কাল আমার সাথে একবার দেখা করে যেও। তোমাদের এই পরিশ্রমের উপহার তোমরা অবশ্যই পাবে।

তার কথায় প্রহরীদের খুশির অন্ত রইল না। তারা আবারো তাকে সম্মান জানালো। মেহমেতও ভারী খুশি হলো আরদারের উদারতায়। তারা দাঁড়ালো না, পা বাড়ালো রাজ্যের অভ্যন্তরে। যেতে যেতে তাদের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কথা হলো। সব থেকে বেশি আলামিয়াকে নিয়ে হলো। দুই ভাই এক মেয়েতে আসক্ত। মেহমেত বোঝে আরদারের ভালোবাসা ভীষণ পবিত্র। আমালিয়াকে সে খুব ভালবাসে। কিন্তু তার হাতে কোনো উপায় নেই। মেয়েটি আমালিয়া ব্যতীত অন্য কোনো নারী হলে মেহমেত তাকে জোর করে হলেও আরদারের জন্য নিয়ে আসতো। কিন্তু মেয়েটি যে তার ভালোবাসা, তার স্ত্রী। আমালিয়াকে অন্য কারো সাথে সে কল্পনাও করতে পারে না। সেখানে অন্য কোনো পুরুষকে দিয়ে দেয়া! সম্ভব। এসব কথা মেহমেত কল্পনাতেও ভাবতে পারে না। তারা দুজন আমালিয়ার কামরার সামনে এসে দাঁড়ালো। প্রহরীরা সেখানে পূর্ব থেকে রয়েছে। মেহমেতকে দেখে তারা শুরুতেই বলল,

-আপনার প্রবেশে নিষেধ রয়েছে জ্বিনে বাদশাহ।

মেহমেত তাদের সকলকে একবার ভালো করে দেখে নিল। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সকলের হাঁটু কাঁপিয়ে দিতে যথেষ্ট। আরদার বলল,

-তাকে যেতে দেয়া হোক। এটি আমার আদেশ।

-কিন্তু মহারাজ…

-আমার ওপর একটি কথাও না।

-জ্বি মহারাজ।

সকলে বিনয়ের সাথে বলল। আরদার চোখের ইশারায় মেহমেতকে শান্ত থাকতে বলে প্রহরীদের প্রশ্ন করল,

-শেহজাদি কামরা থেকে বেরিয়ে ছিল?

-জ্বি না মহারাজ। সে আজ সম্পূর্ণটা সময় কামরাতে অবস্থান করেছে। সাথে শেহজাদির অনুচর মিগিও।

-কোনো সমস্যা দেখা দিয়ে ছিল কি?

-জ্বি না।

মেহমেত জানে কোনো সমস্যা হওয়ার কথাও না। কারণ আজ সভায় আমালিয়ার পরিবর্তে আরদার উপস্থিত থাকবে এই কথাটি আমালিয়া, মিগি, আরদার ও মেহমেত ব্যতীত কেউ জানতো না। সুতরাং বাকি সকলে ভেবেছিল আমালিয়া সভায় উপস্থিত থাকবে। যদি কোনো ভাবে জানতে পারত আমালিয়া একা সিলা রাজ্যে থাকবে তাহলে অবশ্যই সে হামলার শিকার হতো। আরদার প্রহরীদের সাথে কথা শেষ করে মেহমেতের দিকে তাকালো। মেহমেতকে শাসিয়ে বলল,

-আপনার জন্য অনেক বড় ঝুঁকি নিয়েছি আজ। ভালোয় ভালোয় বউকে বুঝিয়ে নিয়ে যাবেন। আর ভুলেও আমার কথা বলবেন না। নয়তো দেখা যাবে আপনার বউ আমাকে রাজ্য ছাড়া করবে।

আরদারের কথায় মেহমেত মুখ লুকিয়ে হাসলো। মেহমেত লুকিয়ে হাসলেও আরদার ওর হাসি দেখে ফেলল। সাথে সাথে নাক ফুলিয়ে ছোট ছোট চোখ করে বলল,

-একদম হাসবেন না ভাই। আমি ফাঁসলে আপনাকে নিয়ে ফাঁসবো বলে দিলাম। কেউ তো আবার তার বউকে ভীষণ ভয় পায়। এমনিতেই আপনার বউ রেগে আছে। আরো একটু বলে রাগিয়ে দিতে বেশি কষ্ট করতে হবে না আমার। তাছাড়া ইনসানদের মতো জ্বিনরাও আজকাল অকৃতজ্ঞ হয়ে যাচ্ছে দেখছি।

মেহমেতের হাসি হাসি মুখটা ধপ করে নিভে গেল। হ্যাঁ সে আমালিয়াকে ভয় পায়। প্রতিটি পুরুষই তার বউকে ভয় পায় এটা বিশেষ বড় ব্যাপার না। কিন্তু তাই বলে আরদার এভাবে বলবে? তাকে ভয় দেখাবে? কি দিন এলো জ্বিনে বাদশাহের? সে সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

-সময় আমারও আসবে। তখন আপনাকে দেখে নেব। এখন বউকে দেখে আসি।

বলে সে ধীরে আমালিয়ার কক্ষের দরজাটি ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করলো। আবার খুব সাবধানে শব্দ না করে চাপিয়ে দিল। মেহমেত যেতেই আরদারের এতক্ষনে ফুটে ওঠা হাসি মিলিয়ে গেল। চোখে মুখে ফুটে উঠল না পাওয়ার বেদনা। দরজার দিকে বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে পা বাড়ালো উল্টো দিকে। হেঁটে এগিয়ে গেল প্রাসাদের শেষ মাথায়। এখান থেকে চাঁদটি বড় অপূর্ব লাগে। আরদার চাঁদটির দিকে তাকিয়ে রইলো এক দৃষ্টিতে। মনে মনে সৃষ্টিকর্তার কাছে অভিযোগ জানাতে লাগলো বাচ্চাদের মতো।

ওদিকে মেহমেত দরজা বন্ধ করে দরজার সাথে মাথা ঠুকে দাঁড়িয়ে রইলো বেশ কিছু সময়। পরপর বুক চিরে বেরিয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস। সে এবং আরদার একে অন্যের সাথে অভিনয় করে যাচ্ছে। কিছুই হয়নি এমন এক অভিনয়। যা ধীরে ধীরে ভীষণ অস্বস্তিকর হয়ে যাচ্ছে। মেহমেতের ভারী অপরাধবোধ হলো। অথচ সে আরদারের জন্য কিছু করতে পারছে না। মেহমেত এবার ঘুরে দাঁড়ালো। আমালিয়া বিশাল বড় পালঙ্কে ঘুমিয়ে আছে। মেহমেতের মনে হলো বিশাল বড় আকাশে এক টুকরো চাঁদ যেন তার সামনে। পরীর মতো লাগছে তার বউকে। মেহমেত মাথা চুলকে হাসলো। মনে মনে বলল,

-পরীই তো আমার বউ।

মেহমেত পা বাড়ালো সম্মুখে। আরদার আজ যেমন তাকে এখানে নিয়ে আসতে পারল, পূর্বে কি পারতো না? অযথা তাকে অনেকগুলো দিন পোড়ানো হলো। আজ পূর্ণিমা নয়। তবুও চাঁদের আলো পূর্ণিমা রাতের মতো। মাথার কাছের মস্তো বড় জানালাটি সম্পূর্ণ খোলা। সেখান থেকে চাঁদের আলো আমালিয়ার চোখে মুখে পড়ছে। মেহমেত গিয়ে আমালিয়ার পাশে বসলো। মেয়েটি দুহাত একসাথে বেঁধে গালের নিচে দিয়ে ঘুমাচ্ছে। যার কারণে ঠোঁট দুটি সামান্য ফাঁকা হয়ে আছে। কি যে সুন্দর লাগলো মেহমেতের কাছে! আমালিয়া রেগে না থাকলে এতক্ষনে হামলে পড়ত সে মেয়েটির ওপর। মেহমেত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করলো আমালিয়াকে। অতঃপর আপনা-আপনি কপালে ভাঁজ পড়ল। স্বাস্থ্য বেড়েছে নাকি? হাহ! তাকে কষ্টে রেখে পাষাণী বেশ ভালই আছে তবে! মেহমেতের মেজাজ খিঁচে গেল হঠাৎ। মন চাইলো টেনে তুলে কয়েকটা কামড় দিতে। কিন্তু সে এই কাজ এখন করলে ভারী মুসিবতে পরতে হবে। সে এবার বিছানা থেকে নিচে নেমে বসলো। বিছানার ওপর ডানহাতের কনুই রেখে গালে হাত রেখে ভীষণ ভালোবাসা নিয়ে তাকিয়ে রইলো আমালিয়ার দিকে। আমালিয়াকে আদুরে লাগছে বেশ। এত মিষ্টি মেয়ে তার বউ ভাবলেই মন পুলকিত হয়ে ওঠে। আচ্ছা তাদের বাচ্চা হলে তারা কি আমালিয়ার মতো মিষ্টি হবে? হ্যাঁ হবে হয়তো। হয়তো না, হতেই হবে। আমালিয়ার মতো মিষ্টি হওয়া ছাড়া উপায় নেই। তার মতো হলে কি যে হবে ভেবেই মেহমেতের মাথায় হাত। অতঃপর মনে মনে ভেবে নিল সকল ঝামেলা শেষ হলে দ্রুত বাচ্চা নেওয়ার কথাটি সে আমালিয়াক জানাবে। অনেকগুলো বাচ্চা নেবে। ঘর ভর্তি তাদের বাচ্চা নিয়ে আমালিয়া বসে থাকবে আর সে ওদের মন ভরে দেখবে। আনমনে মেহমেত হেসে উঠলো। কি সব চিন্তা ভাবনা-করেছে সে? আমালিয়া জানতে পারলে তার খবর আছে।

আমালিয়া গভীর নিদ্রায় মগ্ন। তবুও তার মনে হচ্ছে কেউ তাকে দেখছে। শুধু দেখাতে সীমাবদ্ধ নেই, রীতিমত চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে। নাকে পরিচিত একটি সুবাস ভেসে আসতেই আমালিয়ার কপালে ভাঁজ সৃষ্টি হলো। মেহমেত সবাটাই লক্ষ্য করছিল এতক্ষন। ভাবল হয়তো কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখছে আবার। তাই নরম হাতে যত্ন করে কপালের ভাঁজ সোজা করতে নিলেই আমালিয়া খপ করে তার হাতটি ধরে চোখ খুলে তাকালো। মেহমেত ভারী ভয় পেল। বুকের মাঝে রীতিমত ঢোল পেটাচ্ছে। আমালিয়া খুব শক্ত করেই হাতটি ধরে আছে। তার ছোট ছোট নখগুলো মেহমেতের হাতে দেবে আছে। সেদিকে কারো খেয়াল নেই। আমালিয়া যদিও মেহমেতকে এখানে আশা করেনি। সে ভেবেছিল শত্রু পক্ষের কেউ তাই ভয় পেয়ে এভাবে করেছে। কিন্তু মেহমেতকে দেখে সে ভীষণ অবাক হয়েছে। হাত ছেড়ে মুহূর্তে উঠে বসে বলল,

-আপনি এখানে?

অতঃপর আশেপাশে তাকিয়ে মিগিকে খুঁজলো। ওর এখানে কোথাও থাকার কথা ছিল। কিন্তু নেই কেন? মেহমেত ঢোক গিললো। আমালিয়া কি ভয়ানক রেগে যাবে এবার? মেঝেতে বসে থেকেই বলল,

-বউজান।

আমালিয়া গলা শুকিয়ে এসেছে। বুক কেঁপে কেঁপে উঠছে। কতগুলো দিন পর মেহমেতকে সে দেখতে পেল। তবুও ছুঁয়ে দিতে ভয়। কাছে যেতে অস্বস্তি। আমালিয়া মেহমেতের দিকে তাকালো না। চোখ এদিক-ওদিক করলো। অথচ মেহমেতের দৃষ্টি আমালিয়াতে স্থির। আমালিয়া বুঝলো, তার ভীষণ কান্না পেল। কিন্তু ভেঙে পড়ল না। শক্ত গলায় বলল,

-আপনি এখানে কেন? কিভাবে ঢুকলেন? মিগি, মিগি কোথায়?

মেহমেত অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইল আমালিয়ার দিকে। মিগিকে সে পূর্বেই আমালিয়াকে একা ছেড়ে যেতে বলে ছিল। কিন্তু এই কথা এখন বললে আমালিয়া কি তাকে আস্ত রাখবে?

-আমার দিকে তাকান বউজান।

আমালিয়া তাকালো না। মেহমেতকে পাশ কাটিয়ে নামতে চাইলো। কিন্তু মেহমেত সেই সুযোগ দিলো না। আমালিয়ার দুপাশে হাত রেখে আমালিয়াকে আটকে দিল। মেহমেত হাঁটু গেড়ে বসা। সে প্রায় আমালিয়ার মুখোমুখি। আমালিয়ার দুপাশে বিছানার ওপর তার দুহাত। আমালিয়ার পা মেঝেতে। মেহমেতের এমন করায় আমালিয়া ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠলো। শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট জিভ দিয়ে ভিজিয়ে কাঁপা গলায় বলল,

-ফিরে যান মেহমেত।

আমালিয়ার চোখ মেঝের দিকে। মেহমেত ওর দিকে তাকিয়ে কষ্ট করে একটু হাসার চেষ্টা করলো। পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালোভাবে তাকিয়ে মেঝেতে আসন পেতে বসল। অতঃপর খুব যত্ন করে আমালিয়ার পা দুটি হাতে তুলে নিজের কোলের ওপর রাখলো। আমালিয়া সাথে সাথে কেঁপে উঠলো। দ্রুত পা সরাতে চাইলো কিন্তু মেহমেত দিল না। চেপে ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। মোমের মতো পা দুটি। নরম, কোমল। মেহমেত আচমকা আমালিয়াকে চমকে দিয়ে মাথা নামিয়ে পায়ে চুমু খেলো। আমালিয়া ছিটকে পা সরিয়ে নিল। চোখ গুলো বড় বড় হয়ে আছে তার। ডানহাতে বুকের কাছের জামা খাঁমচে ধরে রেখেছে। ধুকপুক ধুকপুক শব্দে সারা শরীর কাঁপিয়ে দিচ্ছে তার। বিস্ময়ে কথা বলতে ভুলে গেল। মেহমেত এ কি কাজ করলো? আজ পর্যন্ত কখনো এমন পাগলামো করেছে? আমালিয়া লক্ষ্য করলো মেহমেত এখনো মাথা নিচু করে একই ভাবে বসে আছে। কয়েকবার ঢোক গিলে নিজেকে সামলে নিয়ে আমালিয়া রেগে বলল,

-মাথা খারাপ হয়েছে আপনার? কি করছেন এসব? সরুন, আমাকে যেতে দিন। আপনি নিজের মাঝে নেই।

মেহমেত সত্যি নিজের মাঝে নেই। আমালিয়া সরতে বললেও সরলো না, বরং মাথা তুলে ছলছল চোখে তাকালো। চোখে তার কষ্টের জল। যা গড়িয়ে পরতে রইলো। আমালিয়া হতভম্ব হয়ে গেল। বুঝতে পারল একটু বেশি করে ফেলেছে। মেহমেত আবারো দুহাতে এমালিয়ার দুপা জাপটে ধরলো। আমালিয়ার উরুর উপর মাথা রেখে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

-একটু জড়িয়ে ধরবেন?

এতটুকু বলতেই তার কষ্ট হয় গেল যেন। জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে বামহাত বাড়িয়ে আমালিয়ার ডানহাত ধরলো। সেই হাতটি টেনে নিজের বুকে চেপে ধরে বলল,

-অনেকগুলো দিন এখানে শান্তি নেই। একটু শান্তি দিবেন? একটু! আপনার ভালোবাসার অভাবে মরে যাচ্ছি আমি। একটু ভালোবাসেন না আমায়। আপনার এই দূরত্ব আমি আর নিতে পারছি না বউজান।

বলতে বলতে মেহমেত কেঁদে ফেলল। সে আমালিয়ার দিকে কাতর নয়নে তাকিয়ে। আমালিয়ার যে কি ভীষণ অসহায় লাগলো তখন। বুকের মাঝে ভারী কিছুর চাপ অনুভব করলো সে। নিজেকে আর দমাতে পারল না। শক্ত খোলস ঝেড়ে ফেলে মেহমেতের বুকে আঁচড়ে পড়ল। মেহমেতের ঘাড়ে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠলো। এতদিন বুঝি একা মেহমেতেই কষ্ট পেয়েছে? সে পায়নি? সে আরো বেশি পেয়েছে। মেহমেতকে বারবার ফিরিয়ে দিতে কি ভীষণ কষ্ট হয়েছে তার। সেসব হিসাব কি কেউ রেখেছে? মেহমেত দীর্ঘদিন পর আমালিয়াকে বুকে পেয়ে যেন প্রাণ ফিরে পেল। চোখ বন্ধ করে আমালিয়াকে জড়িয়ে ধরে পরে রইলো। বুকের গতি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলেছে। তবুও তার ভালো লাগছে। শান্তি পাচ্ছে। এই শান্তির অভাবেই তার মতো বিচক্ষণ বাদশাহ একের পর এক ভুল করে গিয়েছে। মেয়েটাকে ছাড়া তার চলে না। একটুও চলে না। মরে যাবে সে আমালিয়াকে ছাড়া। একদম বাঁচবে না। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মেহমেত হাতের চাপ বাড়ালো। যত বাড়ালো তত আমালিয়ার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগলো। একপর্যায়ে পেটে চাপ পরতে সে নিজেকে ছাড়াতে চাইলো। কিন্তু মেহমেত ছাড়লো না। বরং আরো শক্ত করে ধরলো। তার ভয় করছে খুব। আবারো যদি আমালিয়ার দূরত্ব বাড়ায়? সে আতঙ্কিত। আমালিয়া হয়তো বুঝলো। ধীরে মেহমেতের পিঠে হাত রেখে বলল,

-আস্তে, আমি ব্যাথা পাচ্ছি মেহমেত। কোথাও যাচ্ছি না আমি। আস্তে ধরুন।

মেহমেত কথা রাখলো। ধীরে ধীরে হাতের বাঁধন ঢিলে করলো, কিন্তু পুরোপুরি ছেড়ে দিলো না। অতঃপর চোখের পলকে আমালিয়ার কোমরের দুপাশ চেপে উঁচু করে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে দিয়ে আমালিয়ার গলায়, বুকে মাথা গুজলো। বিষয়টি এতটাই দ্রুত হলো যে আমালিয়া বুঝে ওঠার পূর্বে সবটা হয়ে গেলো। শরীরের মাঝে শিরশিরে এক অনুভূতি অনুভব করলো। মেহমেতের বাম হাত আমালিয়ার কোমর পেঁচিয়ে আছে আর ডান হাত আমালিয়ার পিঠে। আমালিয়া মুচকি হেসে মেহমেতের ঘন চুল গুলোর মাঝে ডানহাত ঢুকিয়ে আদর দিয়ে বুলিয়ে দিতে লাগলো। মেহমেতের চোখ বন্ধ। আমালিয়ার আদরে তার ঘুম ঘুম পাচ্ছে। অনেকগুলো দিন সে ঠিক ভাবে ঘুমাতে পারে না। তার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে ঘন হয়ে এলো। ভারী ভারী নিঃশ্বাস পড়তে দেখে আমালিয়া এবার মুখ খুলল।

-মেহমেত, ঘুম পেয়েছে?

-উম।

মেহমেতের আদুরে স্বীকারোক্তি। আমালিয়া আবারো নরম ভাবে জানতে চাইলো,

-খেয়ে ছিলেন রাতে?

মেহমেত খায়নি। সে আজকাল খায় না ঠিক ভাবে। এত এত চিন্তায় সে খেতে পারে না। কিন্তু তা স্বীকার করল না। তাহলে দেখা যাবে আমালিয়া তাকে নিজের থেকে ছাড়াতে উঠে-পরে লাগবে।

-হুম।

আমালিয়া ভাবল হয়তো সত্যি বলেছে। সে ওতো কিছু ভাবলো না। একহাত চুলের মাঝে রেখে অন্যহাত মেহমেতের পিঠে রেখে ধীরে ধীরে বুলাতে বুলাতে বলল,

-তবে বিছনায় উঠে ঘুমান। এভাবে কষ্ট হচ্ছে না আপনার।

-উহু।

তার ছোট উত্তর। বোঝা যাচ্ছে ভীষণ ক্লান্ত সে। কষ্ট হচ্ছে না বললেও আমালিয়া মানলো না। মেহমেতকে জোর করতে লাগলো বিছানায় ওঠার জন্য। অতঃপর এবার মেহমেত মাথা তুলে আমালিয়ার চোখে চোখ রেখে বলল,

-আর আপনি?

মেহমেতের চোখ লাল। কান্নার কারণে না কি ক্লান্তির কারণে আমালিয়া বুঝলো না। যদিও সে প্রশ্ন করেছে একটি কিন্তু তার চোখ যেন জানতে চাইছে অন্য কিছু। আমালিয়া লাজুক চোখে তাকালো। বুঝতে পারলেও ধরা দিলো না। মুখে বলল,

-আমি আছি পাশে। আপনি উপরে উঠে ঘুমান।

মেহমেত আমালিয়া চালাকি খুব সহজে ধরে ফেলল। আমালিয়ার চোখের দিকে গাঢ় ভাবে তাকিয়ে আরো একটু কাছাকাছি গেল। ঠোঁটে ছোট একটি নরম চুমু এঁকে বলল,

-থাকবেন তো?

আমালিয়া চোখ নামিয়ে বলল,

-হুম।

মেহমেত কথা বাড়ালো না। সে আমালিয়াকে দুহাতে কোলে তুলে নিয়ে উঠে দাড়ালো। এরপর খুব সাবধানে আমালিয়াকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ঝুঁকে আমালিয়ার কপালে চুমু খেয়ে আমালিয়ার পাশের জায়গাটি দখল করে নিল। আমালিয়া মেহমেতেকে পাশে শুতে দেখে সাথে সাথে ওর দিকে পিঠ দিয়ে জানালার দিকে মুখ করে ঘুরে গেল। মেহমেত কিছুই বলল না। উল্টো আমালিয়াকে দুহাতে জাপটে ধরে আমালিয়ার খোলা চুলে মুখ গুঁজে চোখ বন্ধ করে নিল। আমালিয়া মেহমেতের অলক্ষ্যে মুচকি হাসলো। তার দৃষ্টি খোলা আকাশের দিকে। কিন্তু মনের মাঝে কত শত চিন্তা। কিছু মুহূর্ত পর আমালিয়া নিজে থেকে মেহমেতের দিকে আরও কিছুটা সরে গেল। তার পিঠ মেহমেতের বুকের সাথে লেগে আছে। আমালিয়ার দারুন লাগলো। সে লক্ষ্য করলো মেহমেতের বাম হাত তার পেটের ওপর। সে মেহমেতের সেই হাতের ওপর নিজের হাতটি রেখে মিহি গলায় বলল,

-আপনাকে একটি কথা বলার আছে মেহেমত।

ওপর পাশ থেকে কোনো উত্তর এলো না। সে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। তার বড় বড় নিঃশ্বাস আমালিয়ার চুল পেরিয়ে ঘাড়ে, গলায় পরছে। এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ল? আসল কথাটিই যে এখনো বলা হলো না তাকে। ভারী মন খারাপ হলো আমালিয়ার। বাচ্চার কথা মেহেমতকে বলার জন্য মন উসখুস করছে। চোখ বন্ধ করে ভেবে নিলো, কাল ঘুম থেকে উঠে সর্বপ্রথম সে মেহমেতকে এই কথাটি বলবে। আর কোনো লুকোচুরি নয়। এবার দুজন মিলেমিশে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়বে।

চলবে___

[মেহমেত-আমালিয়াময় পর্ব ছিল আজ। রেগুলার দিচ্ছি তবুও আপনাদের রেসপন্সে আমি হতাশ।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন