ফন্ট সাইজ:
থিম:
ওয়েলকাম টু পলিটিক্স

১ম পর্ব

লেখক: মারিয়াম
ওয়েলকাম টু পলিটিক্স 
jannatun Ferdous Ziba 
পূর্ব ১ 

সকালের হালকা সূর্যের আলো শহীদ মিনার প্রাঙ্গণের সিঁড়িতে এসে পড়ছে। সিঁড়ির ওপর বসে আছে এমির। পাশেই দ্বীপ আর ঋভান। শুধু তিনজন নয়, প্রায় বিশ-পঁচিশজন ছাত্রলীগের একটা গ্রুপ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছে সিঁড়িতে। হালকা আড্ডা দিচ্ছে, সকলের হাতেই স্ন্যাক, আর হালকা কিছু খাবার। পুরো শহীদ মিনারসহ, আশেপাশের এলাকা যেন একপ্রকার তাদের প্রভাবের আঞ্চলিক ক্ষেত্র।

জিবা বটতলার কাছে এসে একবার এদিক-ওদিক তাকালো। আশেপাশে মিহিয়া মেয়েটার কোনো ছায়া অব্দি নেই। মুখে একরাশ বিরক্তি টেনে আরেকটু এগিয়ে গেলো সে। শহীদ মিনার প্রাঙ্গণের সামনে দিয়ে যেতে গেলেই হঠাৎ পেছন থেকে একটা শক্ত পুরুষালী কন্ঠ ভেসে এলো,
-স্টপ জুনিয়র!
জিবা শুনলো তবে থমকালো না। কারণ একটাই পেছনে থাকা তথাকথিত সিনিয়ররা তাকে নিয়ে ইতিমধ্যেই কথা বলাবলি শুরু করেছে। যা স্পষ্ট কানে এসেছে তার। যদিও এসব দেখে চুপচাপ সহ্য করা মেয়েদের তালিকায় সে পড়েনা। তবে জাবির মতো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে এসব নিয়ে খুব একটা বারাবাড়ি করার ইচ্ছে নেই তার। সে যদি এখন সিনিয়রদের ডাকে সাড়া দিয়ে, আগ বাড়িয়ে পরিচিত হতে যায়। তাহলে অযথা একটা হাঙ্গামা তৈরি হবে। নতুন জীবনে আবারো কিছু অভিশাপ আর কুনজর পরবে। কি দরকার এত কিছুর? তার চেয়ে ভালো আগেপাছে না তাকিয়ে। কোন কথা না শোনার ভান করে, আপাতত সবটা এড়িয়ে যাওয়া।
সামনের মেয়েটির এমন অভদ্রতা দেখে ভিষণ বিরক্ত হলো এমির। এমিরের পাশে থাকা ছেলেগুলো এতকিছুর পরও মেয়েটিকে থামাতে ব্যর্থ হয়ে, একপর্যায়ে বলাবলি শুরু করল,
-কলিজাটা দেখ, ভাই ডাকল ফিরেও তাকাল না।
-আমরা যে সিনিয়র কোন পাত্তাই দিচ্ছে না।
একেক জনের একেক কথায় মেজাজ টা খারাপ হয়ে গেল এমিরের। এমিরের পেছন থেকে রিদয় একপ্রকার চিল্লিয়ে বলল,
-এই যে, লাল দোপাট্টা কথা কানে যায় না নাকি?
-ও হ্যালো এত ভাব কিসের?
এমির ভেবেছিলো এবার মনে হয় মেয়েটি ফিরে তাকাবে। তাই তো বিনাবাক্যে Perrier এর ক্যানটা চেপে ধরেছিলো ঠোঁটের উপর। তবে না, মেয়েটি তার ধারণাকে একশো পারসেন্ট ভুল প্রমান করে দিয়ে এবারো থামল না। বরং পায়ের গতিবেগ আরো বাড়াল। মস্তিষ্ক তড়াৎ করে জ্বলে উঠলো এমিরের। মুখে থাকা কোল্ডড্রিংস টুকু আর গেলা হলো না। কোল্ডড্রিংসটা হটড্রিংস এ রূপান্তরিত করে মুখ থেকে পুনরায় বোতলে ঢেলে, স্থির নিশানায় ছুঁড়ে মারল মেয়েটার দিকে।
ঘটনাটা এতটাই তাৎক্ষণিক ঘটেছে যে, কেউ কিছু বোঝার আগেই বোতলটা প্রবল বেগে ছুটে গিয়ে সজোরে ধাক্কা খেলো মেয়েটার হাঁটুতে।
আচমকা এমনটা হওয়ায় খোই হারালো জিবা। পড়তে পড়তে কোনমতে সামলে নিলো নিজেকে। তবে এবার আর শেষরক্ষা হলো না। স্থির হয়ে দাঁড়ানোর আগেই perrier এর বোতলটার সাথে পা বেঁধে সজোরে ছিটকে পড়লো মাটিতে। মৃদুশব্দে আঁ করে উঠলো তৎক্ষণাৎ। বোতলে থাকা কোল্ডড্রিংস টুকু অনেক আগেই জায়গা করে নিয়েছে মাটিতে। মুহূর্তের মধ্যেই একাধিক হাসাহাসির শব্দ কর্ণপ্রহরে প্রবেশ করলো জিবার।
রাকিব জোরে জোরে হাসতে হাসতে ঢলে পড়লো আসিফের কাঁধের ওপর। নয়ন হেসে বলল,
-ভাই, ভাই লাইভ দেই, রেকর্ডার অন আছে।
রিদয় নয়েনের কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
-হ্যাঁ ভাই কর, কর।
সাব্বির হালকা মাথা নেড়ে বলল,
-থাক ভাই ছাড় না...এটা একটু বেশিই হয়ে যাবে।
তবে সাব্বিরের কথায় পাত্তা দিল না নয়ন। ফোনের ক্যামেরা অন করল অবিলম্বে। এমির একবার চোখ তুলে তাকালো নয়নের দিকে। তৎক্ষণাৎ নয়নের হাতে ধরা ফোনটা আপনা-আপনিই নিচে নেমে এলো।
ব্যথা আর তীব্র অপমানবোধে ন্যানোসেকেন্ড সে অবস্থাতেই রইল জিবা। তারপর আস্তে আস্তে খিঁচে রাখা চোখজোড়া পিটপিট করে খুলে পেছনে ফিরে তাকালো সে। কয়েক সেকেন্ড চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে, হাত-পা ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়াল জিবা। নিজের সারা শরীরে একবার চোখ-বুলিয়ে নিল। জামাসহ ওড়নাটার বেশ কিছুটা অংশ ভিজে গেছে।"না এবার আর চুপ করে থাকা যায় না। বেশি মুখ গুঁজে চললেই আরো পেয়ে বসবে এরা। প্রচন্ড রাগ আর বিরক্তিতে চোখ মুখ খিঁচে নিজেকে ধাতস্থ করল জিবা। আশেপাশের কিছু চোখ স্থির হয়েছে বর্তমান ঘটনায়। শুধু স্থির হয়ে আছে বললে ভুল হবে, জিবাকে নিয়ে রীতিমতো হাসাহাসি আর ট্রল করছে তাঁরা। তা দেখে চোখ-মুখ শক্ত হয়ে এলো জিবার। হাঁটুতে জ্বালা করছে সামান্য, তবে তাঁর আত্মসম্মানের জ্বালাটা তীব্র।
মেয়েটাকে উঠে দাঁড়াতে দেখে এমির বাঁকা হাসলো। একহাত বাঁকিয়ে ইশারা করে বলল,
-কাম ইন।
আশেপাশের মন্তব্য, হাসাহাসি আর তার দিকে স্থির একাধিক দৃষ্টি দেখে রাগ তীব্র হলো জিবার। তার উপর আবার আশেপাশের কিছু ছেলেমেয়ে ইতোমধ্যেই দাঁড়িয়ে দেখতে শুরু করেছে সবটা। সবকিছু মিলিয়ে বেশ অস্বস্তি আর অপমানবোধ ঘিরে ধরলো তাকে। তবে সে বরাবরই শান্ত স্বভাবের একটা মেয়ে। হুটহাট রাগ দেখানো তার স্বভাবে নেই। তাইতো একটা গভীর শ্বাস টেনে, এক হাতে ব্যাগ টাকে ঠিক করে। সামনের দিকে এগিয়ে গেল জিবা।
এমির মাথা নেড়ে কি যেন একটা ইশারা করল। সে ইশারা বুঝলো প্রত্যেকেই। জিবা এসে তাঁদের সামনা-সামনি দাঁড়ানো মাত্রই নিজেদের মধ্যে ফিসফিসানি শুরু করল ছেলেগুলো। বর্তমানে তাদের আলোচনার মূল টপিক, সামনে উপস্থিত যুবতীর সৌন্দর্য। না চাইতেও সেদিকে কর্ণপাত করল এমির। সচরাচর সে মেয়েদের দিকে তাকায় না, ওসব অভ্যাস কোনকালেই নেই তার। মেয়ে মানুষের জাত তার একদমই অপছন্দ। তবে নিজের দলের ছেলেদের মুখে মেয়েটার এত প্রশংসা শুনে একপ্রকার বাধ্যহয়েই সামনের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল এমির। যতই হোক তার সাথে বেয়াদবি করেছে মেয়েটা, চেহারাটা ভালোমতোন দেখে রাখা প্রয়োজন। সামনে দৃষ্টি স্থির রেখেই উঠে দাঁড়াল এমির। অতি সূক্ষ্ম নজরে বেশ কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরখ করল সামনে উপস্থিত যুবতীটিকে।
-না খুব একটা খারাপ না। মানতেই হবে, তার দলের ছেলেদের চোখ ভালো।
- ফাস্ট ইয়ার?
-জ্বী।
ভার্সিটিতে প্রথম দিন তাইনা?
- না, দ্বিতীয় দিন।
এমির মৃদু হেসে উঠল,
- দুই দিন... আর দুই দিনেই সিনিয়রদের সাথে বেয়াদবি করা শুরু করে দিয়েছ?
একটু থেমে আবার বলল,
-এতক্ষণ ধরে যে সিনিয়রা ডাকছিল। কথা কানে যাচ্ছিল না? নাকি শুনেও না শোনার ভান করছিলে?
চারপাশের কয়েকজন চুপ হয়ে গেল।
জিবা শান্ত গলায় বলল,
-শুনেছি।
এমিরের হাসিটা একটু থেমে গেল।
পাশ থেকে ঋভান বলে উঠল,
-তাহলে থামলে না কেন?
-প্রয়োজন মনে হয়নি।
কথাটা শুনে কয়েকজন একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।
-সমস্যা নেই আজকের পর থেকে মনে হবে। নোটিশটা এখনো চোখে পড়ে নি মনে হয়...এই কারো কাছে কপি থাকলে দে তো...
সাথে সাথে সবাই পকেট হাতরাতে শুরু করল। এক পর্যায়ে শামীম ছেলেটা পেয়েও গেল। সে ঋভানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল ভাই... সাথে সাথে ঋভান শামীমের হাত থেকে কাগজটা নিয়ে এমির হাতে দিল। আর এমির কাগজটা হাতে পাওয়া মাত্রই কাগজটা নিয়ে ছুঁড়ে মারল জিবার মুখের ওপর। জিবা চোখ বন্ধ করে বাম হাত দিয়ে কাগজটা মুখ থেকে সরালো। একপলক তাকালো সাদা কাগজটার দিকে। না এই কাগজটা চিনতে এক সেকেন্ডও সময় লাগল না মেয়েটার। এটা তার ডিপার্টমেন্টের সিঁড়ির সামনে লাগানো সেই কাগজটা। যেখানে ঠান্ডা মস্তিষ্কে নিজের আধিপত্য জাহির করেছিল নাম না জানা কোন একদল সিনিয়র।
জিবা কাগজটার দিকে তাকিয়ে শীতল হাসলো। যেই হাসিতে এক বিন্দুও শব্দ হলো না।
-ওহ্... তাহলে এই মহৎ উদ্যোগের হুকুমনামার কারিগর আপনি?
জিবার কথায় এমিরের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
-কারিগর?
শব্দটা যেন একটু উপভোগ করল সে।
-বলা যায়।
তারপর কাগজটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে শান্ত গলায় বলল,
- তবে এটাকে হুকুমনামা বলবে, নাকি গাইডলাইন... সেটা যার যার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে।
একটু থেমে জিবার চোখের দিকে তাকাল,
-তবে একটা কথা মানতেই হবে... তুমি নোটিশটা শুধু পড়োনি, বেশ মন দিয়ে বিশ্লেষণও করেছো। আশা করি এরপর থেকে এই বিশ্লেষণী ক্ষমতাটা কাজে লাগিয়ে সিনিয়রদের সঙ্গে ভদ্র আচরণ করবে।
-যাক, এবার তাহলে কাজের কথায় আসি।
-তো যে কারণে তোমাকে ডাকা...
বলেই এমির এবার এক হাত তুলে সিঁড়ির ওপর ছড়িয়ে থাকা খালি চিপসের প্যাকেট, কোল্ড ড্রিংকের ক্যান আর টিস্যুগুলোর দিকে ইশারা করল।
-এগুলো একটু পরিষ্কার করে দাও তো, জুনিয়র।
জিবা একবার সিঁড়ির দিকে তাকালো। তারপর নিজের ভেজা জামার দিকে। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ব্যাগের চেইন খুলল সে। চারপাশে থাকা ছেলেগুলো ভাবলো, মেয়েটা বোধহয় সত্যিই পরিষ্কার করতে যাচ্ছে।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই ব্যাগ থেকে একটা টিস্যুর প্যাকেট বের করে এমিরের দিকে বাড়িয়ে দিল জিবা।
-নিন।
ভ্রু কুঁচকে গেল এমিরের।
-কি?
-আপনারাই তো ফেলেছেন। তাই নিয়ম মোতাবেক আপনাদেরই পরিষ্কার করা উচিত। তাছাড়া নিজের কাজ নিজে করা সুন্নাত।
জিবার কথা শুনে পেছন থেকে রিফাত বলে উঠল,
- ভার্সিটিতে নতুন তো তাই সিনিয়রদের সামনে কেমন আচরণ করা উচিত, সেটাও জানে না। বোকা মেয়ে, অযথাই তর্ক করছে। তা সিনিয়রদের সাথে লাগতে আসলে পারবা তো, পাখি?
কথাটা বলার সাথে সাথেই শব্দ করে হেসে উঠল কয়েকজন।
রাকিবও তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হেসে বলল,
-আরে সমস্যা নাই ভাই। বড় আপুরা আছেন না? তাদের কানে শুধু কথাটা তোলার অপেক্ষা। তারপর তারা নিজ দায়িত্বেই শিখিয়ে দেবে সবটা।
ছেলেগুলোর দিকে ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে তাকাল জিবা। কথাবার্তা যেমন, অঙ্গভঙ্গিও ঠিক তেমন।
এমির অবশ্য টিস্যুর প্যাকেটটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে টিস্যুটা নিল। দৃশ্যটা দেখে উপস্থিত কয়েকজন প্রায় হাঁ করে তাকিয়ে রইলো। টিস্যুর প্যাকেটটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখল এমির। তারপর মাথা তুলে বলল,
-আমার বলা কথাগুলো মনে হয় এখনো ঠিকভাবে মাথায় ঢোকেনি।
জিবা শান্ত চোখে তাকিয়ে রইল।
-ঢুকেছে। তবে আমি কেন করব?
এমিরের ঠোঁটের হাসিটা একই রকম রইল।
-কেন করবে?
একটু থেমে মাথা সামান্য কাত করল সে।
-উমমম... আমি বলেছি তাই করবে।
জিবার ভ্রু কুঁচকে গেল।
-আপনি বললেই করতে হবে না কি?
কথাটা শুনে এমির কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর জিভ দিয়ে গালের ভেতরটা ঠেলে জিবার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল।
-না। আমি বললেই করতে হবে না।
একটু থেমে শান্ত গলায় বলল,
-তবে সিনিয়ররা বললে নিশ্চয়ই করতে হবে। আর আমারা এই ভার্সিটির সিনিয়র।
এমিরের পেছন থেকে রাকিব বলে উঠল,
-একেবারে ঠিক বলছেন ভাই। তা কথা কী ক্লিয়ার, মামনি? নাকি আরেকটু বুঝাই বলতে হবে?
জিবা হালকা হাসল।
-সিনিয়র? মানে আপনারা?
বলেই আঙুল তুলে সবাইকে দেখাল জিবা।
-তো সিনিয়র হওয়ার দরুন আপনারা আমাকে যা খুশি করতে বলবেন, আর আমাকে তাই করতে হবে? কিন্তু কেন করতে হবে? আপনাদের নামের পাশে সিনিয়রের ট্যাগ আছে বলে, নাকি আপনারা আমার চেয়ে পৃথিবীর আলো দু-চার বছর আগে দেখেছেন বলে?
দ্বীপ এবার মখ খলল। 
-এই মেয়ে, এত নাটক করছো কেন? সিনিয়ররা যা করতে বলেছে, চুপচাপ সেটা করে দিলেই তো হয়।
এবার মুখ খুলল জিবা।
– হ্যাঁ, আপনারা আমার সিনিয়র।
একটু থেমে এমিরের চোখের দিকে তাকাল সে।
-তবে সিনিয়র হওয়ার মানে এই নয় যে, আপনাদের কথায় আমাকে উঠতে-বসতে হবে।
মেয়েটার কথাগুলো শুনে ধীরে ধীরে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল এমিরের। চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে জিবার মুখের দিকে। যেখানে এই ক্যাম্পাসে তার নাম শুনলেই যেখানে মানুষ রাস্তা বদলে ফেলে, সেখানে এই মেয়েটা কিনা তাকে মানুষ বলেই গণ্য করছে না। ভয় পাওয়া তো দূরের কথা, চোখেমুখে সামান্য দ্বিধার ছাপও নেই।
যদিও এই মূহুর্তে তার প্রচণ্ড রাগ হওয়ার কথা। আর হচ্ছেও। তবুও অদ্ভুতভাবে রাগের পাশাপাশি অন্য কিছুও অনুভব করছে সে। কৌতূহল? নাকি বিস্ময়? এমির নিজের মনেই হিসেব মেলানোর চেষ্টা করল। নাকি মেয়েটা এখনো জানেই না সে কার সঙ্গে কথা বলছে? আচ্ছা এত সাহস আসছে কোথা থেকে? নাকি ভয় নামক জিনিসটার সঙ্গেই আজ পর্যন্ত পরিচয় হয়নি মেয়েটার?
এমিরের মুখে দিকে একবার তাকিয়েই দ্বীপ কড়া কণ্ঠে বলে উঠল,
– এই মেয়ে, অনেকক্ষণ ধরে তোমাকে সহ্য করছি। সিনিয়রদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতে হয়, জানো না তুমি?
জিবা একটুও পিছপা হলো না। তার চোখে আগুনের ঝলক দেখা দিল।
– হ্যাঁ, জানি সিনিয়র। তবে আপনারা জানেন না, জুনিয়রদের সঙ্গে ঠিক কেমন ব্যবহার করতে হয়।
এমির এখনো শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে।
আসিফ বিরক্ত হয়ে বলে উঠল,
-ম্যানার্স জানো না দেখছি। তা কোন হলে থাকো? যে সিনিয়র আপুরা ম্যানার্স শেখাতে পারেনি?
জিবা কোন ভঙ্গিতা ছাড়াই উত্তর দিল।
-কোন হলেই না। আমি বাসা থেকে আসি।
এবার এপাশ থেকে দ্বীপ ধমকের সুরে বলল,
-এজন্যই এতো অভদ্র আর বেয়াদব।
এই পর্যায়ে সত্যিই রেগে গেল জিবা। তবুও জোর করে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,
-বেয়াদব? বেয়াদবির কী করলাম আমি, সিনিয়র? বেয়াদবি কাকে বলে, আদৌ জানেন আপনারা? একা একটা মেয়েকে হাঁটতে দেখে নানারকম অঙ্গভঙ্গি করাকে বেয়াদবি বলে। শিষ বাজিয়ে বাজে ইঙ্গিত দেওয়াকে বেয়াদবি বলে। একটা মেয়ের গায়ে পানি ছুড়ে মারাকে বেয়াদবি বলে। আর সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্কটাকে টেনে র‍্যাগ দেওয়াকেটাকেও বেয়াদবি বলে। কিন্তু এর মধ্যে একটা কাজও তো আমি করিনি। তাহলে এবার বলুন, বেয়াদবের কাতারে কে পড়ল? আমি, নাকি আপনারা?
দ্বীপ তেতে উঠে দু-ধাপ সামনে এগিয়ে এল।
-স্টপ! বেয়াদব মেয়ে কোথাকার! তুমি জানো আমরা কে? এই ভার্সিটির শুধু সিনিয়র না, সিনিয়রদেরও বাপ আমরা। সো, বি কেয়ারফুল!
শেষের কথাটা আঙুল উঁচিয়ে বলল সে।
তবে দ্বীপের কথায় জিবার চোখেমুখে ভয়ের কোনো ছাপ দেখা গেল না। বরং একদম স্বাভাবিক গলায় বলল,
– ওহ, তাই নাকি? আগে বলবেন না! এখানে আপনারা পড়েন না, আপনাদের বাচ্চারা পড়ে। আপনারা স্রেফ গার্ডিয়ান। অবশ্য সেদিক দিয়ে ধরতে গেলে, আপনারা আমার বেশ সিনিয়রই।
জিবার কথাটা আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করল।
আসিফ এবার আগের চেয়েও আরও কড়া গলায় বলে উঠল,
-এই মেয়ে, কার সঙ্গে কীভাবে কথা বলছো, কোনো সেন্স আছে?
উপস্থিত বেশ কয়েকজন ভালোরকম ক্ষেপে উঠল মেয়েটার এমন আচরণে। তবে কেউ কেউ বরাবরের মতোই লাইভ নাটক দেখতেই বেশি ব্যস্ত। এসব নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে তাদের পরিচয় ছাত্র নয়, ছাত্রলীগ।
সেই সূত্র ধরেই সাব্বির বিরবির করে বলল,
-কত বড় সাহস এই সামান্য মেয়ের! ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে এমন আচরণ করে!
এতক্ষণে মেয়েটাকে পর্যবেক্ষণ করা শেষ করল এমির। পা টলিয়ে আবারও বসে পড়ল সিঁড়ির উপর। সাথে সাথেই চোখের কোণে খেলে গেল অদ্ভুত এক হাসি। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেখানে তাদের কোনমতে দূর থেকে সালাম দিয়েই কেটে পড়ে সেখানে এই মেয়েটা যেন আসলেই উল্টো প্রজাতির।
ভয় দেখানো হয়েছে।
কাজ হয়নি।
ধমক দেওয়া হয়েছে।
কাজ হয়নি।
ছাত্রলীগের পরিচয়ও শুনেছে।
তবুও কাজ হয়নি।
মেয়েটা এখনো একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে। যেন সামনে বসে থাকা ছেলেগুলো কোনো ক্ষমতাবান নেতা নয়, বরং তার ক্লাসের সাধারণ কিছু ছাত্র। বিষয়টা ধীরে ধীরে মজার লাগতে শুরু করল এমিরের।
আজ পর্যন্ত অনেক বেয়াদব ছেলে দেখেছে সে। কিন্তু এমন জেদি আর বেয়াদব মেয়ে খুব কমই চোখে পড়েছে তার।
জিবা এখনো রাগি দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। তা দেখে এমির হঠাৎ মধুমাখানো সুরে বলে উঠল,
-উফ কুলডাউন জুনিয়র।
তারপর একটু থেমে স্লো ভয়েজে যোগ করল,
-এতরাগ ভালো না..। যাগগে, প্রথম প্রথম ভার্সিটিতে এসেছো কই সিনিয়রদের সাথে একটু আলাপ-টালাপ জমাবে, একটু পরিচিত হবে না তো... ছাড়ো, অবশ্য আমারই ভুল হয়েছে। হঠাৎ করে তোমাকে ডেকে কাজবাজ করতে বলা, একদমই উচিত হয়নি আমার। আগে বরং পরিচিত হওয়া উচিত ছিল। কি বলো?
আশপাশের সবাই হা করে তাকিয়ে আছে এমিরের দিকে। অবশ্য শয়তানের মুখে এমন ফেরেস্তাপনা কথা শুনলে যে কারোরই হা করে থাকার কথা।
তবে জিবার চোখেমুখের কোন পরিবর্তন হলো না।
তা দেখে কুটিল হাসলো এমির। এমির জিবার দিকে মাসুম দৃষ্টি রেখে বলে,
-কিছু মনে করো না ওকে। ভুল যখন আমাদের, তখন সংশোধন করার দায়ভারটাও তো আমাদেরই। তাইনা?
এই সবাই সরি বল ছোট আপু কে।
দুই হাত নাড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কথাটা শেষ করলো এমির।
এমিরের এহেন আচরণে উপস্থিত প্রত্যেকে বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে। তবে এমিরের ঠান্ডা আর নিষ্ক্রিয় আচরণ সকলকেই ভাবতে বাধ্য করল। সে ঠান্ডা মাথার খেলোয়াড় মারামারির সময় মারামারি। আর ব্রেন খাটেনোর সময় ব্রেন খাটানো। মোট কথায় কারণ ছাড়া এমির কখনোই কোন কাজ করে না। তা জানে প্রত্যেকেই। তাইতো নিজেদের মধ্যেই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলো ছেলেগুলো।
তবে এটুকু সময় যেন সহ্য হলো না এমিরের। সে এবার তীব্র কণ্ঠে বলল,
-কি হলো সরি বল।
সাথে সাথেই চারপাশ থেকে কয়েকটি সম্মিলিত কণ্ঠে একসাথে "সরি" শব্দটা ভেসে এলো জিবার কানে। চারদিক থেকে অনিচ্ছুক কয়েকটা গলা ভেসে এলো পরপরই।
-সরি...
-সরি আপু...
শব্দগুলো যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল খুব দ্রুতই, কিন্তু তবুও মেয়েটার চোখেমুখে জমে থাকা তীব্র অসন্তুষ্টির ছাপ এতটুকুও কমলো না। মুখ শক্ত করে সামনের দিকেই তাকিয়ে রইল সে। যেন এই ক্ষমা চাওয়াটা তার কাছে যথেষ্ট না।
বিষয়টা চোখ এড়ালো না এমিরের।
সিঁড়ির ওপর আধশোয়া ভঙ্গিতে বসে থাকা ছেলেটা ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসল। তারপর জিভ দিয়ে গাল ঠেলে কপাল খানিকটা কুঁচকে জহুরির মতো দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে। আশেপাশে থাকা ছেলেগুলোও কৌতূহলী চোখে কখনো জিবার দিকে, কখনো এমিরের দিকে তাকাচ্ছে। সকালের নরম রোদ এসে পড়েছে শহীদ মিনারের সাদা সিঁড়িতে, আর সেই আলোর মাঝেই যেন অদ্ভুত এক ঠান্ডা উত্তেজনা জমে উঠেছে পুরো পরিবেশে। এমির মাথা কাত করে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,
– কি হলো জুনিয়র? হ্যাপি না? ওরা সরি বলাতে তুমি খুশি হওনি মনে হচ্ছে।
জিবা কোনো কথা বলল না। শুধু ধীরভাবে মাথা দুলাল। মেয়েটার এমন নির্লিপ্ত ভঙ্গি দেখে এমির ভু কুঁচকাল।
-সবাই তো সরি বললোই... আর কী চাও?
জিবা নাক-মুখ সামান্য কুঁচকে শান্ত গলায় বলল,
-উমহু... সবাই তো বলে নি।
মুহূর্তেই আশেপাশের পরিবেশটা আবার থমথমে হয়ে উঠল।
এমিরের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গিয়ে জায়গা নিলো কড়া এক কাঠিন্য। ধীরে ধীরে আশেপাশে তাকিয়ে সে বলল,
-কে, কে বলেনি?
জিবা এবার একটুও ইতস্তত না করে সরাসরি এমিরের চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন স্পষ্ট জেদ আর আত্মসম্মানের দীপ্তি।
-আপনি।
শব্দটা উচ্চারিত হতেই চারপাশ যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। পাশে বসে থাকা কয়েকজন ছেলে প্রায় একসাথেই "কী?" বলে উঠল। কারো চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেছে, কেউ আবার হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। মুহূর্তেই চারপাশে চাপা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল।
-পাগল নাকি?
-এমির ভাইরে সরি বলতে বলছে।
এধরনের ফিসফিসানি ভেসে বেড়াতে লাগলো চারপাশে। এই ক্যাম্পাসে মীর মোশাররফ হল মানেই আতঙ্ক। আর এমির মানে সেই আতঙ্কের মাপকাঠি। সে এমন একটা ছেলে, যার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহসই খুব কম মানুষের আছে। সেখানে এই সাধারণ চেহারার নতুন মেয়েটা এসেই কিনা সরাসরি তার কাছেই ক্ষমা দাবি করছে!
সব গুঞ্জনের মাঝেই এমির ধীরে ধীরে ঘাড় কাত করল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি স্থির হলো জিবার চোখে। কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলল না সে। শুধু তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ এক হাত উঁচু করে ঠান্ডা গলায় বলল,
-স্টপ এভরিওয়ান।
সাথে সাথেই চারপাশের ফিসফাস থেমে গেল।
এমির এবার খুব ধীরে ধীরে হাসল। সেই হাসিতে মিষ্টতা ছিল, কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিপজ্জনক ধারটাও স্পষ্ট।
-কী বললে?
জিবা একচুলও না সরে একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল।
-কেন? শুনতে পাননি?
এমির দাঁত চেপে ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
– হুম, শুনেছি। তবে তোমার মুখ থেকে আবার শুনতে চাইছি।
জিবা এবার ছোট্ট করে মুচকি হাসল। সেই হাসিতে ভয় ছিল না, বরং ছিল বিদ্রুপ।
-কেন? এতক্ষণ কী আমি অন্যের মুখ ধার করে কথা বলছিলাম নাকি?
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাব্বির এবার প্রায় হাঁ করে তাকিয়ে রইল। রিদয় নিচু গলায় বলল "শেষ!"
দ্বীপ বিরক্তিতে দাঁত কামড়ে বলল,
– তুই ওকে সহ্য কেন করছিস?
এমির ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে গভীর একটা শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। তারপর নিচু, ভারী কণ্ঠে বলল,
-কী বললে? রিপিট।
জিবা ভ্রু কুঁচকে বলল,
-না তো, রিপিট বলিনি। বললাম আমি কি অন্যের মুখ ধার করে কথা বলছিলাম নাকি?
এবার সত্যিই রাগটা চেপে রাখতে কষ্ট হচ্ছিল এমিরের। চোয়ালের পাশের রগ ফুলে উঠেছে স্পষ্ট। তবুও আশ্চর্যজনকভাবে সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল। ধীরে ধীরে চোখ খুলে স্থির গলায় বলল,
-তার আগে কী বললে?
জিবা বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বলল,
-অনেক কিছুই তো বললাম। কিন্তু আমার বলা কোন কথাটা আপনার এত পছন্দ হলো যে আবার শুনতে চাইছেন?
চলবে... 

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন