ফন্ট সাইজ:
থিম:
ওয়েলকাম টু পলিটিক্স

২য় পর্ব

লেখক: মারিয়াম

ওয়েলকাম টু পলিটিক্স 

jannatun Ferdous Ziba 
পূর্ব ২ 
কথাটা শুনে কয়েকজন ছেলের মুখ সঙ্গে সঙ্গে শক্ত হয়ে গেল। রিদয় নিচু গলায় "বেশি বাড়তেছে" বলে ফিসফিস করলো। নয়ন ঠোঁট কামড়ে মজা দেখার ভঙ্গিতে বসে রইলো।
এমির এবার আর তর্ক বাড়াল না। সে এবার এক হাত দিয়ে আরেক হাতের তালু কচলাতে কচলাতে মাথা সামান্য কাত করে বলল,
- আঁহ... তোমাকে সরি বলবো, রাইট? কিন্তু কেন বলবো? উমহু... এক্সপেইন করো। এক্সপেইন পছন্দ হলে ভেবে দেখবো।
কথাটা বলেই ঠোঁটের কোণে কুটিল হাসি টেনে তাকিয়ে রইল সে।
জিবা ধীরে মাথা নাড়ল।
-এখানে এক্সপেইন করার মতো তেমন কিছু নেই, সিনিয়র। পুরো ঘটনাটা তো আপনার চোখের সামনেই ঘটেছে। বরং বলা যায়, ঘটনাগুলোর বেশিরভাগই আপনার কারণেই ঘটেছে।
একটু থেমে এমিরের চোখের দিকে তাকালো জিবা।
-সেক্ষেত্রে এখানে আমাকে হেনস্তা করার ক্ষেত্রে আপনার অবদান সবচেয়ে বেশি। নিঃসন্দেহে আপনি সবার চাইতে এগিয়ে। সেটা আপনিও জানেন, আর আমিও জানি। তাই এখানে সরিটা সবার আগে আপনারই বলার কথা ছিল, কী বলেন?
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে আবার বলল,
-অবশ্য সরি বলাটাই আসল বিষয় না। আসল বিষয় হলো, ভুল করে অনুতপ্ত হওয়া। তবে আমার মনে হয় না আপনি অনুতপ্ত হচ্ছেন, বা ভবিষ্যতে হবেন। তাই আপনার সরি আপনার কাছেই রাখুন, আমার লাগবে না।
পুরো জায়গাটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন মেয়েও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে জিবার দিকে। এমির কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে রইল জিবার দিকে। তারপর হঠাৎ নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে মাথা দুলিয়ে বলে উঠল,
-বাহ্... দারুণ বললে তো। আই লাইক ইট।
দ্বীপ সাথে সাথে এমিরের কাঁধ চেপে ধরল।
-কী বলছিস তুই এসব?
কিন্তু এমির কোনো উত্তর দিল না।
জিবা ব্যাগটা ঠিক করে নিল।
-ধন্যবাদ, সিনিয়র।
-তাহলে আজকের মতোন আসি। এমনিতেই অনেক জ্ঞান দিলেন আমায়। জ্ঞানের পরিধিও বেশ বাড়লো, এক কথায় ভীষণ উপকৃত হলাম। সত্যিই, সময়টা বেশ শিক্ষণীয় ছিল। তবে...
তারপর একপলক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
- আর কিছুক্ষণ পরই আমার ক্লাস শুরু হবে। তাই আজ আর আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করছি না। চলি আসসালামু আলাইকুম।
কথাটা বলেই আর দাঁড়াল না সে। জিবা ঘুরে হাঁটা শুরু করতেই পেছন থেকে ভেসে এলো এমিরের কণ্ঠ,
-হেই জুনিয়র...
জিবার পা থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল সে। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল।
-পরিচিত না হয়েই চলে যাচ্ছো যে?
জিবা মনে মনে বিদ্রুপের হাসি হাসল। তাইতো... জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়ররা। যেখানে জাবির নাম টানলেই মানুষের মাথায় একসাথে ভেসে ওঠে র্যাগিং, ছাত্ররাজনীতি, ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, মারামারি, হানাহানি- সেখানে তাকে ডেকে এমনি এমনিই ছেড়ে দেবে নাকি? তারপর আবার সে কিনা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিনিয়রদের মুখের ওপর তর্ক করেছে!
জিবার ভাবনায় ছেদ পড়ল এমিরের কণ্ঠে।
-হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমরাও এসো লাইনে দাঁড়াও। একে একে সকলের সাথে পরিচিত হবো ভাইয়া।
বলেই বুকের উপর ডান হাত চেপে ধরল এমির।
পাশে থাকা কয়েকজন ছেলেও হেসে উঠল সঙ্গে সঙ্গে। কারো মুখে কৌতুক, কারো চোখে কৌতূহল। যেন সকালের নিরস সময়টায় নতুন এক বিনোদন পেয়ে গেছে সবাই। জিবা ধীরে ধীরে চারপাশে চোখ বুলালো।
কখন যে এত মানুষ জড়ো হয়েছে বুঝতেই পারেনি সে। একটু আগেও যেখানে জায়গাটা মোটামুটি ফাঁকা ছিল, এখন সেখানে ছোটখাটো ভিড় জমে গেছে। কিছু ছেলে দূরে দাঁড়িয়ে মোবাইল হাতে তাকিয়ে আছে, কয়েকজন মেয়ে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছে। কারো চোখে বিস্ময়, কারো চোখে মজা নেওয়ার আগ্রহ। আশেপাশের গুঞ্জনগুলো কানে আসতেই অস্বস্তিটা আরও বাড়ল জিবার।
-ওই মেয়েটাই না?
-নতুন মনে হয়...
চোখেমুখ শক্ত করে নিঃশব্দে একটা শ্বাস ফেলল জিবা।
এই ভার্সিটিতে চান্স পাওয়ার পর থেকেই কত মানুষ কত কথা বলেছে তাকে। কেউ বলেছে, "জাবিতে পলিটিক্স অনেক বেশি।" কেউ সাবধান করেছে সিনিয়রদের নিয়ে। আবার কেউ কেউ তো সরাসরি বলেছিল, চাবি বা রাবিতে ভর্তি হতে। অন্তত ঝামেলা একটু কম হবে। তখন এসব কথাকে খুব একটা কানে তোলেনি সে। কারণ তার বিশ্বাস ছিল- ভালো খারাপ সব জায়গাতেই আছে। তাছাড়া কয়েকজন মানুষের জন্য পুরো একটা প্রতিষ্ঠানকে বিচার করা ঠিক না। আর সবচাইতে বড় কথা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটা ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল ছিল না তার কাছে। শুধু একটা ডিগ্রি পাওয়ার জায়গাও না। এই জায়গাটা তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এতটাই গুরুত্বপূর্ণ... যার কারণে এত কিছু জেনেও পেছনে ফিরে তাকানোর কথা ভাবেনি সে।
-কী হলো? এসো।
জিবার ধ্যান ভাঙল এমিরের কথায়। আর সাত-পাঁচ ভাবলো না সে, এগিয়ে গেলো সামনের দিকে। এমিরের আশেপাশে থাকা উশৃংখল ছেলেগুলো হঠাৎই কেমন ভদ্র ব্যবহার করছে। জিবা অবাক হলো না -মুখোশের আড়ালের মারপ্যাঁচ বেশ বুঝলো মেয়েটা।
মুহূর্তের মধ্যে দ্বিতীয়বার চোখাচোখি হওয়ায় দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলেছিল জিবা আর এমিরের। চোখ সাড়ালো জিবা। তবে এমির একই দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে স্বাভাবিক গলায় বললো,
-তা তোমার নাম কি জুনিয়র?
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসার আগেই এমিরের ডান হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটা কেঁপে উঠল স্বশব্দে। ফোনের দিকে চোখ পড়তেই ভ্রু কুঁচকে গেল এমিরের। স্ক্রিনে গোটা গোটা ইংরেজি অক্ষরে লেখা-"Saniat Vai" নামটা দেখার সাথে সাথেই ফোনটা রিসিভ করে এক হাত দিয়ে কানে চেপে ধরল এমির। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল ছেলেটা। তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে রাশভারী কণ্ঠে বলল,
-ওকে ভাই আসছি। জাস্ট ৫ মিনিট।
এতক্ষণের মেকি হাসিটা গায়েব হয়ে গেছে মুখ থেকে। চোখমুখে ভর করেছে নিদারুণ কাঠিন্য। দ্বীপের দিকে শুধু একবার চোখ তুলে ইশারা করল এমির। ইশারা বুঝতে দেরি হলো না কারোরই। সাথে সাথেই ছেলেগুলো উঠে দাঁড়াল।
–সাইড।
শব্দটা উচ্চারিত হতেই আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেমেয়েরা দ্রুত সরে দাঁড়াতে শুরু করল।
তবে জিবাকে আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেশ বিরক্ত হলো ঋভান। সে এবার ভ্রু কুঁচকে কড়া গলায় বলল,
– এই মেয়ে, তোমাকে কি আবার আলাদাভাবে দাওয়াত দিতে হবে নাকি? সরে দাঁড়াও।
জিবা সরল না। আগের জায়গাতেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আশেপাশের ছেলেরা কিছু বলতে এগিয়ে আসতেই হাত তুলে থামিয়ে দিল এমির।
ফোনটা এখনো কানে চেপে রেখেই জিবার পাশ ঘেঁষে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল সে। যাওয়ার সময় একবার কড়া দৃষ্টিতে তাকাল জিবার দিকে। নাম না জানা কোনো পারফিউমের স্মেল নাকে আসতেই গা গুলিয়ে উঠলো জিবার। মেয়েটা চোখ উঁচিয়ে তাকালো সামনের ব্যক্তিটির দিকে। এমির জিবার দিকেই দৃষ্টি আবদ্ধ রেখে সিঁড়ি থেকে নামলো। তবে সেই দৃষ্টি সাধারণ ছিলো না। এমিরের পেছন পেছন একে একে প্রায় বিশ-পঁচিশজন ছেলে ধুপধাপ পা ফেলে নিচে নামলো।
আসিফ বিরবির করে আওড়াল,
মেয়েটার কপালে চরম দুঃখ আছে তা আজ হোক কাল হোক কিংবা পরশু।
কথাটা শেষ করেই বাকিদের সাথে তাল মিলিয়ে স্থান পরিত্যাগ করে আসিফ।
জিবা এখনো সেখানেই ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে হঠাৎ কি থেকে কি ঘটে গেলো বুঝে উঠতে পারলো না মেয়েটা। আশেপাশের কথোপকথন আর ফিসফিসানিও বাড়লো বৈকি। জিবা একটা শ্বাস টেনে নিচে নামতেই বেশ কয়েকটা মেয়ে ঘিরে ধরলো জিবাকে।
-এই যে, ওরা তোমাকে কি বললো গো?
- তুমি কি ফাস্ট ইয়ারের?
-আচ্ছা তোমাকে ডেকেছিলো কেন? র্যাগ দিতে নাকি?
-ঐসব বাদ দে, এই মেয়ে তোমার মাথায় কি সমস্যা আছে নাকি? দ্বীপভাই যখন সবাই কে সরে দাঁড়াতে বললো তখন সড়লে না কেন হুম?
-হ্যাঁ তুই ঠিকই বলেছিস। কিছু মনে করো না কিন্তু তোমার উচিত ছিলো সরে দাঁড়ানো। রাজনীতির মাঠে মানুষ ছায়া ডিঙানোও মনে রাখে জানোই তো।
-আরে তোরা চুপ কর, মেয়েটা মনে হয় নতুন।
কারো চোখে কৌতূহল, কারো চোখে অদ্ভুত আগ্রহ, আবার কারো চোখে নিছকই হিসাব।
প্রশ্নগুলো ঘটনাপন্থী নয়, বরং বিচারমূলক। যেন জিবার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ছাত্রলীগের সামনে তার দাঁড়িয়ে থাকাটাই।
জিবা এবার ঠোঁট চেপে ধরলো। খুব করে বলতে ইচ্ছে করছিল-আমি কিছুই চায় না, কিছুই জানি না, শুধু এটুকু জানি আমি নিজের জায়গাতে ঠিক। আমি তো ভুল কিছু করিনি বরং যা করেছি তা অনেক কম ছিলো। এটা রাজনীতির মাঠ পরে, সবার আগে এটা একটা বিশ্ববিদ্যালয়, এটা একটা শিক্ষাকেন্দ্র।
কিন্তু চারদিকের দৃষ্টিগুলো এত ভারী যে কথাগুলো গলায় এসে আটকে গেলো। বেশ কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা কে বরণ করে দাঁড়িয়ে ছিলো মেয়েটা। কিন্তু সে চুপ থাকলেও চুপ থাকেনি আশেপাশের কন্ঠস্বরগুলো।
কিছুক্ষণ পর মেয়েগুলো নিজস্ব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ায় ভিড় ধীরে ধীরে কমতে লাগলো। ভিড় কমার সাথে সাথেই দূর থেকে মিহিয়াকে দেখতে পেলো জিবা। মিহিয়া হাত নাড়িয়ে ডাকছে তাকে।
সেদিকে চোখ পড়তেই বাকি মেয়েগুলোর অবান্তর প্রশ্নগুলোকে পেছনে ফেলে দ্রুত সেদিকে এগিয়ে গেলো সে। জিবা সামনে যেতেই মিহিয়া এসে জাপটে জড়িয়ে ধরলো।
-বান্ধবী...
জিবা কিছুক্ষণের জন্য" থ" মেরে গেল।
–––
-ফ্ল্যাশব্যাক-
সকাল সাড়ে ন'টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেটের সামনে এসে নেমে দাঁড়ালো জিবা। চেহারায় সাজ বলতে তেমন কিছুই নেই। শরীরে সাদা রঙের একটি শুভ্র আনারকলি, যার লম্বা ঘের হাঁটুর বেশ খানিকটা নিচ পর্যন্ত নেমে এসেছে। মাথায় পরিপাটি করে টানা ওড়না। সাধারণ সাজেও মেয়েটার মধ্যে এমন এক ধরনের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ছিল, যা চোখ এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। মেয়েটার দৃষ্টি এলোমেলো, চারিদিকে হৈচৈপূর্ণ পরিবেশ। গেট পার হতে হেঁটে চলা ছাত্রছাত্রীদের ভিড়, বাইসাইকেল আর মোটরসাইকেলের আওয়াজ, পাশের রাস্তার গাড়ির হর্ণ-সবকিছু মিলিয়ে কোলাহলপূর্ণ অবস্থা। 
রাস্তা পার হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করলো জিবা। মূল চওড়া পথ ধরে এগোতে গিয়েই তার চোখে পড়লো চারপাশের বড় বড় গাছ, ছায়াঘেরা বেঞ্চ, লাল ইটের ফ্যাকাল্টি ভবন আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকা লাইব্রেরির ভবন। ক্যাম্পাসে প্রচুর ছাত্রছাত্রী। কেউ ক্লাসে যাচ্ছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরছে, কেউ নিজের কাজে ব্যস্ত। কিন্তু জিবা এসবের দিকে বেশি মনোযোগ দিল না। নিজের ডিপার্টমেন্ট খুঁজে নেওয়ার উদ্দেশ্য এগিয়ে গেলো সামনের দিকে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বিভাগটি খুঁজে পেল সে।
ভেতরে ঢুকেই কয়েক সেকেন্ড চারপাশটা পরখ করে নিলো জিবা। সামনের বেঞ্চগুলোতে বসার জায়গা নেই। তাই আর অযথা সময় নষ্ট না করে পেছনের দিকে এগিয়ে গেলো মেয়েটা।
এত মানুষের ভিড়ের মধ্যেও কয়েকজনের দৃষ্টি কিছুক্ষণ থেমে রইলো তার দিকে। যদিও এসব তার জন্য নতুন কিছু নয়। ছোটবেলা থেকেই অপরিচিতদের এমন দৃষ্টি আর বাড়তি কৌতূহলের সঙ্গে পরিচিত সে।
ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে শেষের দিকের একটি বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়লো জিবা। মেয়েটার মধ্যে সবসময় একটা নির্দিষ্ট সংযম ছিল। কথাবার্তায়, চলাফেরায়, এমনকি আচরণেও। অহংকার নয়, বরং নিজের আলাদা একটা জগৎ আছে তার। প্রয়োজনের বেশি কথা বলা কিংবা নিজেকে প্রমাণ করার কোনো তাগিদ কখনো অনুভব করেনা সে। তাছাড়া প্রত্যেক মানুষের জীবনের কিছু অধ্যায় একান্তই তার নিজের। তাই অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে অযথা মন্তব্য করার অভ্যাসও তার নেই। তবে জিবার নীরবতাকে তার দুর্বলতা ভাবা ভুল। সে নিজে থেকে কখনো ঝামেলায় জড়ায় না ঠিকই, তবে অন্যায় কিংবা অসম্মানের সামনে চুপ করে মেনে নেওয়াও তার স্বভাবের অংশ নয়। জীবনের দীর্ঘ উনিশটা বছর অনেক কিছুই শিখিয়েছে তাকে। তাই মানুষের কথার চেয়ে তাদের আচরণ পড়তেই সে বেশি অভ্যস্ত।
কিছুক্ষণ পর তার পাশে এসে বসল একটি নতুন মুখ। জিবা স্বাভাবিকভাবেই মেয়েটির দিকে তাকালো।
খুব বেশি সাজসজ্জা নেই তার মধ্যে। পোশাক-আশাকে এক ধরনের পরিপাট্য আর সরলতা ফুটে উঠছে। শ্যামবর্ণের মুখটায় অদ্ভুত এক মায়া, ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মিষ্টি হাসিটা প্রথম দেখাতেই নজর কাড়ার মতো। মেয়েটা বসেই প্রথমে হাত বাড়িয়ে দিল।
-হাই আমি মিহিয়া রহমান। আমি কি এখানে বসতে পারি?
-হ্যাঁ অবশ্যই বসো।
মিহিয়া পাশে বসে বলল,
-আমি নতুন তো তাই একটু নার্ভাস। অপরিচিত পরিবেশ। এখানে আমার কোন ফ্রেন্ডও ভর্তি হয়নি, আমি একাই।
-আমিও।
মিহিয়া হালকা হেসে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
-ওহ্ তাহলে আমরা কি ফ্রেন্ড হতে পারি?
মিহিয়ার চোখে খাঁটি আগ্রহ।
জিবা হালকা হাসল। এক মুহূর্তের জন্য কী বলা উচিত ভেবে উঠতে পারল না।
এর মধ্যেই মিহিয়া বলে উঠল,
-কি হলো, ফ্রেন্ড বানাবে না আমায়?
জিবা এবার আস্তে মাথা নেড়ে, ডান হাতটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
-বানাবো না কেন? অবশ্যই বানাবো। তাছাড়া এমনিতেই এখানে আমারও কোন ফ্রেন্ড নেই।
জিবা হাতটা এগিয়ে দেওয়ার সাথে সাথেই মিহিয়া একেবারে হামলে পড়লো হাতের ওপর। হাতটা শক্ত করে ধরে ঝুঁকিয়ে ঝুঁকিয়ে বললো
-সত্যি? থ্যাংকস, কিন্তু তোমার নাম কি বান্ধবী?
জিবা মেয়েটির বাচ্চাসুলভ আচরণ দেখে অজান্তেই হাসলো।
-আমায়রা জিবা।
ওহ্ নাইস নেইম-তবে একটু আনকমন। এর আগে আমি এই নাম শুনিনি, তুমিই ফার্স্ট।
জিবা মুচকি হাসলো।
মিহিয়া মেয়েটা ভীষণ বন্ধুসুলভ। কয়েক মিনিটের মধ্যেই জিবার সাথে খুব ভালো একটা বন্ডিং তৈরি হয়েছে মিহিয়ার। বেশ কিছুক্ষণ গল্প করল দু'জনে।
তাদের আলাপ জমে উঠতেই প্রফেসর সবাইকে চুপ করার জন্য অনুরোধ করলো। চারপাশের গুঞ্জন মুহূর্তেই থেমে গেল। জিবা আর মিহিয়াও কথাবার্তা থামিয়ে সামনে তাকাল।
-আজ তোমাদের প্রথম ক্লাস, তাই মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে দু-একটা জরুরি কথা বলবো।
–––
ক্যাম্পাসের পরিবেশটা আজ একটু বেশিই কোলাহলপূর্ণ। একের পর এক বাইক, প্রাইভেট কার আর বিভিন্ন যানবাহন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকছে। এমন সময় দূর থেকে একটি পার্ল-হোয়াইট রঙের রোলস রয়েস ঘোস্ট ধীরগতিতে এসে গেটের সামনে থামল। তার ঠিক পেছনেই সারিবদ্ধভাবে এসে দাঁড়াল কয়েকটি স্পোর্টস বাইক। দৃশ্যটা মুহূর্তেই আশপাশের মানুষের দৃষ্টি কাড়ল। বিশেষ করে সদ্য ভর্তি হওয়া জুনিয়রদের। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো মুখদের কাছে ব্যাপারটা নতুন কিছু নয়। গাড়িটা আর বাইকগুলো দেখেই তারা বুঝে গেল, কার আগমন ঘটেছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলো তিনজন যুবক-এমির দিলসান তালুকদার, আকাশ নওরোজ আর দ্বীপ সরকার।
তিনজনকে দেখা মাত্রই চারপাশে কিছুটা চাপা ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেল। তবে সেসব বিন্দুমাত্র কানে তুললো না এমির। সোজা গটগট পায়ে হাঁটা ধরলো সামনের দিকে। ট্যাটু করা বাম হাতটা দিয় গাড়ি থেকে নেমে এমির একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর ট্যাটু আঁকা বাম হাতে সানগ্লাসটা চোখে পরতে পরতে গম্ভীর স্বরে বলল,
-গাড়িগুলো পার্ক করে আয়।
বাইকে থাকা ছেলেগুলো কোনো কথা না বলে ইঞ্জিন স্টার্ট করল। মুহূর্তেই তারা পার্কিংয়ের দিকে এগিয়ে গেল। এদিকে এমির ধীর অথচ দৃঢ় পদক্ষেপে সামনে এগিয়ে যেতে লাগল। পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি উচ্চতার ছেলেটার চলনে ছিল এক ধরনের স্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস, যা ভিড়ের মাঝেও তাকে আলাদা করে তোলে। গুটিয়ে রাখা সাদা শার্টের হাতার নিচে দৃশ্যমান শক্ত বাহু, পরিপাটি ক্লিন-শেভড মুখ আর অগোছালো স্টাইলে সেট করা চুল-সব মিলিয়ে তার মধ্যে ছিল এক ধরনের বেপরোয়া আকর্ষণ। শরীর থেকে ভেসে আসা হালকা পারফিউমের ঘ্রাণ, বাম হাতে থাকা ঘড়ি আর কানে ছোট্ট সিলভার রিং-সবকিছুতেই ছিল তার নিজস্ব এক ধরনের স্টাইল। তবে যুবকটির চেহারার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো তার ঐ গভীর বাদামী চোখজোড়া। লোকমুখে শোনা যায়, পুরুষদের নাকি অতিরিক্ত ফর্সা হতে নেই; শ্যামবর্ণেই সুপুরুষ লাগে। অথচ এই ছেলেটাকে দেখলে কথাটা বিশ্বাস করা মুশকিল। এ যেন প্রচলিত নিয়মের বাইরে থাকা একচিলতে ব্যতিক্রম।
এমির ভার্সিটির ফেমাস বয়দের মধ্যে অন্যতম। তবে তার এই পরিচিতি শুধুমাত্র আকর্ষণীয় চেহারা কিংবা কোটিপতি বাবার প্রভাবের কারণে তৈরি হয়নি। হয়েছে তার নিজ যোগ্যতায়। যদিও এমিরের কিছু কিছু আচরণকে যোগ্যতার কাতারে ফেলা নিছকই বোকামি। তবুও সত্যি বলতে ছেলেটার নিজস্ব কিছু পরিচয় রয়েছে। এই যে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের টপ সিনিয়রদের একজন। তার পাশাপাশি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক।
তবে এমির দেখতে সুদর্শন বলেই যে মেয়েরা তার পেছনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকে, বিষয়টা তেমন নয়। একদিকে অর্থের প্রভাব, অন্যদিকে রাজনীতির শক্ত অবস্থান-সবকিছু তার হাতে থাকা সত্ত্বেও পুরো বিশ্ববিদ্যালয় চিরুনি তল্লাশি চালালেও এমন একটা মেয়ে পাওয়া কঠিন, যে জেনেশুনে এই ছেলের প্রেমে পড়বে। কারণটা অবশ্য দিনের আলোর মতোই পরিস্কার। নিজের পায়ে কুড়াল মারার ইচ্ছে কার'ই বা আছে? সহজ ভাষায় বলতে গেলে, অনুভূতি তো দূরের কথা। এমির আর তার পরিচিত রাজনৈতিক মহলকে একসঙ্গে দেখলেই নানান অজুহাতে ইনিয়ে-বিনিয়ে কেটে পড়ার ধান্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
বাইরে থেকে অবশ্য দৃশ্যটা ভিন্ন। খালি চোখে চারপাশের ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সিনিয়র-জুনিয়র সবাই এমিরের আর ছাত্রলীগের প্রতি স্বাভাবিকভাবে শ্রদ্ধাশীল। তবে সে শ্রদ্ধা নিতান্তই লোক দেখানো। আসল খেলা আর কৃতিত্ব আর ক্ষমতার মাঠে। কারণ ছাত্রলীগ বর্তমানে ক্যাম্পাসে এমন এক অবস্থানে, যেখানে তাদের উপস্থিতি শুধু হল কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ক্যাম্পাসের বাইরের পরিসরেও তাদের উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তাছাড়া এমিরের দলটাও যথেষ্ট শক্তিশালী। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় প্রতিটি শিক্ষার্থীই জানে-এই প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে থাকা মানে নিজের জন্য একটা নিরাপত্তার বলয় তৈরি করা, আবার একইসঙ্গে ক্যাম্পাসে নিজের অবস্থান শক্ত করার একটা সুযোগ।
এমিরের পাশে পাশে হাঁটছে তার কলিজার দুই বন্ধু
-আকাশ আর দ্বীপ।
আকাশের সঙ্গে এমিরের পরিচয় কলেজ জীবনের শুরুতে হলেও, দ্বীপের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব সেই ছোটবেলা থেকেই। শুধু বন্ধুত্ব নয়, সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্কটা রক্তের সম্পর্কের চেয়েও গভীর হয়ে উঠেছে। শ্যামবর্ণের ছেলেটা হাইটে পারফেক্ট, আর আকর্ষণীয় গড়নের অধিকারী। বন্ধুমহলের বাইরে দ্বীপকে খুব কমই হাসতে দেখা যায়। পরনে বাদামি রঙের শার্ট, হাতে দামি ঘড়ি।
তবে এমিরদের তিন বন্ধুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হাসিখুশি আর প্লেবয় স্বভাবের ছেলে হলো আকাশ। দ্বীপের ঠোঁটে যেমন খুব একটা হাসি দেখা যায় না, তার ঠিক উল্টো আকাশের মুখে সবসময় লেগে থাকে এক চওড়া হাসি। বারো মাসই কোনো না কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে থাকে আকাশ। তবে তার কাছে সেসব শুধুই সময় কাটানোর মাধ্যম। আকাশের ভাষ্যমতে, ফ্লার্টিং নাকি তার রক্তেই মিশে আছে-তাই ও এসব ছাড়া থাকতে পারে না। জিন্স আর হালকা রঙের টি-শার্টের সঙ্গে স্টাইলিশভাবে কাটা চুল তাকে দিয়েছে এক ধরনের বেপরোয়া, আকর্ষণীয় লুক।
৩জন একসাথে হাঁটতে হাঁটতে পাশের দিক থেকে একের পর এক সালাম আর গুড মর্নিং প্রতিধ্বনি কানে এলো। কিছুক্ষনের মধ্যে এমিরের সামনে একদল ছেলে এসে হাজির হলো। এমির পা থামিয়ে - একপলক তাকালো তারপর দ্বিধাহীন হাসলো। ছেলেগুলো এমির, দ্বীপ আর আকাশের সাথে একে একে হ্যান্ডসেক, কোলাকুলি ইত্যাদির মাধ্যমে কুশল বিনিময় করলো। ছেলেগুলো ছাএলীগের সক্রিয় সদস্য।
নয়ন হাসিমুখে বলে,
-আসতে কোন অসুবিধা হয়নি তো ভাই।
এমির অল্পবাক্যে না জানায়। ইতিমধ্যে বাইকার ছেলেগুলোও এসে এমিরের পাশে দাঁড়ায়।
আসিফ একটা শ্বাস টেনে বলে,
-ভাই ফ্লাইট থেকে নেমে সরাসরি এখানে আসা তোদের উচিত হয়নি। এককাজ কর বাসায় গিয়ে আগে ফ্রেশ হয়ে আয়। রিল্যাক্স ফিল হবে।
এমির হালকা হেসে বলে,
-চিল ব্রো আই এম নট টাইয়ার্ড। আমি প্রতিদিন নতুন করে রিস্টার্ট নেয়। সো এনজয়..
বলেই চোখ টিপ দেয়।
সকলেই জানে এমির কেমন ঘাড় ত্যারা স্বভাবের। তাই কেউ আর পুনরায় আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে গেলো না। শামীম ছেলেটা সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,
-তাহলে চলেন ভাই আমরা ক্লাসে যাই।
ছেলেটার কথা শুনে উপস্থিত প্রত্যেকে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। শামীম অবাক হয়ে চারপাশে তাকালো -সবাই এমনভাবে হাসছে যেন, সে দারুণ মজার একটা জোকস বলে ফেলেছে।
আকাশ ছেলেটার ঘাড়ে থাপ্পড় দিয়ে বলে,
-আরে ব্রো, আমরা ক্লাস নিতে আসি করতে না।
আকাশের কথায় সবাই হা হা করে হেসে উঠে।
দ্বীপ নির্ভীক কণ্ঠে বললো,
-মালটা কে রে? নতুন নাকি?
উপস্থিতরা মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানালো। 
এমির মুখে হাসি প্রশস্ত টেনে, ছেলেটার হাত ধরে নিজের পাশে আনলো। তারপর কাঁধে হাত রেখে বললো,
-নো প্রবলেম ব্রো, ইফ ইউ আর উইথ দ্যা ডেভিল'স টিম, দ্যা অ্যাঞ্জেল ইজ বাউন্ড টু বিকাম দ্য ডেভিল।
উপস্থিত সবাই দ্বিতীয় বারের মতো শব্দ করে হাসলো। আকাশ ফোন থেকে মুখ তুলে বললো,
চল বটতলা যায়।
এমির শান্তভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। বাকিদের কাছেও প্রস্তাবটা ভালো লাগে। কয়েকদিন পর একসাথে আড্ডা দেওয়া যাবে না হয়।
পরিচিতিমূলক ক্লাসটা শেষ হয়েছে বেশ অনেকক্ষণ আগেই। স্যার-ম্যাডামরা সংক্ষিপ্ত কিছু বক্তব্য আর দরকারি নির্দেশনা দিয়েই ছেড়ে দিয়েছেন সবাইকে। আপাতত কারও কোনো তাড়া নেই।
জিবা আর মিহিয়া দু'তলার করিডোর দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছে। মিহিয়ার হাতে দুইটা ভ্যানিলা ফ্লেভারের কোন আইসক্রিম। এইমাত্র ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে এপাশটায় এসেছে তারা। মিহিয়া আইসক্রিমে এক কামড় দিয়ে জিবার মুখের সামনে ধরে। জিবার ঠোঁটে ক্রিম লাগতেই সে বাম হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে ক্রিমটা মুছে বলে,
-খাবো না।
মিহিয়া পা থামিয়ে জিবার দিকে তাকায়,
- কি রে তুই এই না বললি আমরা বেস্ট ফ্রেন্ড। তাহলে আমার খাওয়া আইসক্রিম খেতে ঘেন্না করছিস কেন?
জিবা পেছন ফিরে মিহিয়ার দিকে তাকায় তার থেকে কিছুটা দূরত্বে মেয়েটা। পায়ের গতির অসামঞ্জস্যতা হওয়ায় এই দূরত্ব।
-কি বলো, ঘেন্না করবো কেন?
মিহিয়া জিবার সামনে এসে দাঁড়ায়,
-তাহলে খাচ্ছিস না কেন?
জিবা হালকা মাথা নাড়িয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
-আরে আমি আইসক্রিম খায় না।
মিহিয়া চোখ-মুখ কুঁচকে জিবার দিকে তাকিয়ে বলে,
-থাক আমার মুখের টা খেতে হবে না। এটা খা।
বলেই মিহিয়ার বাম হাতে থাকা আইসক্রিমটা বাড়িয়ে দেয় জিবার দিকে।
জিবা এক হাত মাথায় দিয়ে বলে,
-হায় আল্লাহ! এই মেয়েকে আমি কেমন ভাবে বুঝাবো যে আমি আইসক্রিম খাই না।
মিহিয়া এবার অবাক দৃষ্টিতে জিবার দিকে তাকিয়ে বলে,
-সত্যিই খাস না?
জিবা এবার মিহিয়ার দিকে তাকিয়ে ঘনঘন মাথা নাড়িয়ে বলে,
-সত্যিই খায় না।
মিহিয়া এবার হাঁটতে হাঁটতে বলে,
-কিন্তু কেন খাস না?
-আমি ক্রিম জাতীয় কোন খাওয়ার খাইনা। আর দুধ দেওয়া কিছু তো আরোই খাইনা।
কিন্তু জিবার এই সহজ উত্তরটা মিহিয়া সহজভাবে মেনে নিতে পারি না। তাই তো দিগ্বিদিক হারিয়ে প্রশ্ন করে বসে,
-বইন তুই আদৌ মেয়ে তো?
জিবা মিহিয়ার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বলে,
-কেন কোনো সন্দেহ আছে?
মিহিয়া জিবাকে আগাগোড়া স্ক্যান করে বলে,
এমনিতে... সন্দেহ করার কোন অপশন নেই। সবটা দেখে তো ঠিকঠাকই লাগছে।
মিহিয়ার এমন কথায় জিবা হালকা শব্দ করে হাসে। জিবা আর মিহিয়া হাঁটার পাশাপাশি টুকটাক গল্প করছে। এতক্ষণে বেশ ভাব জমেছে দুজনের। যদিও শুরুটা মিহিয়ার পক্ষ থেকেই ছিল। কিন্তু এখন দুজন-দুজনের সাথে একেবারে ফ্রি হয়ে উঠেছে।
জিবা আর মিহিয়া ধীরে ধীরে দুই-তলার করিডোর ধরে নেমে আসে। সিঁড়ির মাঝখানে ছোট্ট ল্যান্ডিং-এ পৌঁছে তারা কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়ায়। দেয়ালের সামনে ছোট্ট জায়গায় ঝুলানো নোটিসটি তাদের চোখে পড়ে। ভার্সিটির সিঁড়ির মাঝে মাঝেই বিভিন্ন জায়গাতেই এই ধরনের কাগজ লাগানো। এতোক্ষণ বিষয়টাকে এড়িয়ে গেলেও। এই মুহূর্তে জিবার কাছে মনে হল কাগজটা তো গুরুত্বপূর্ণও হতে পারে। একবার পড়ে দেখতে ক্ষতি কী? তাছাড়া পড়াশোনা জানার জেনারেল ফাইদা তো এটুকুই। জিবা এগিয়ে যায়।
মিহিয়া জিবার পাশে দাঁড়িয়ে বলে,
-কি হলো দাঁড়ালি যে?
-নোটিসটা কিসের একটু দেখি।
মিহিয়া কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে,
-ধুর এসব আবার কে দেখে? এটা কি দেখার জিনিস নাকি?
জিবা আর কথা বাড়ালো না। 
নতুন কাগজ বোঝায় যাচ্ছে কিছুদিন আগে লাগানো, সাদা ব্যাকগ্রাউন্ড, কালো প্রিন্ট-উপরেই লেখা: Notice for Freshers -
জিবা থেমে যায়। অজান্তেই চোখ আটকে যায় লেখাগুলোয়।
নোটিসটা পড়তে পড়তে জিবার কপাল ধীরে ধীরে কুঁচকে আসে-
ডিপার্টমেন্টে শৃঙ্খলা ও সৌহার্দ্য বজায় রাখার স্বার্থে সকল নবাগত শিক্ষার্থীদের নিচের বিষয়গুলো মেনে চলার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।
লাইনটা নিরীহ শোনালেও নিচের কথাগুলো কেমন অস্বস্তি ঢেলে দিচ্ছে
🔹বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পাশাপাশি সিনিয়র শিক্ষার্থীদের প্রতিও যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সিনিয়রদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বজায় রাখতে হবে।
🔹ডিপার্টমেন্টের বিভিন্ন বিষয়ে সিনিয়রদের দেওয়া পরামর্শ ও নির্দেশনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
🔹নিজেদের পরিচয় (নাম, ব্যাচ, সেকশন ও প্রয়োজনীয় তথ্য) সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে এবং পরিচয় জানতে চাইলে তা প্রদান করতে হবে।
এই পর্যায়ে জিবা হালকা ঠোঁট চেপে ধরে। প্রয়োজনীয় তথ্য? মানে কী...?
তার দৃষ্টি কিছুক্ষণ ওই লাইনেই আটকে রইল।
নাম, ব্যাচ, সেকশন-এগুলো জানা স্বাভাবিক। সিনিয়র হিসেবে এগুলো জানতেই পারে। কিন্তু প্রত্যেক মানুষের নিজের একটা ব্যক্তিগত পরিসর থাকে। সেটা কেন বলতে হবে? এখানে প্রয়োজনের সীমাটা ঠিক কোথায়?
সে ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে আবার নোটিসটার পরের অংশের দিকে তাকাল।
🔹ডিপার্টমেন্টে চলাফেরার সময় শালীনতা, ভদ্রতা ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
🔹নির্দিষ্ট কোনো সময় বা স্থানে উপস্থিত থাকার জন্য বলা হলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
🔹পারস্পরিক বোঝাপড়া ও ভালো সম্পর্ক বজায় রাখাই উভয়পক্ষের সবার জন্য মঙ্গলজনক। এবং উভয়পক্ষের মধ্যে সুসম্পর্ক ও সহযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় রাখাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
এই নিয়মগুলো নবাগতদের সুবিধা ও গাইডলাইনের উদ্দেশ্যেই প্রণীত।
–Department Seniors
শেষ লাইনের নিচে ছোট করে লেখা-
For better bonding and cooperation.
জিবা ধীরে একটা শ্বাস নেয়। মিহিয়া জিবার পাশে দাঁড়িয়ে ফোন স্ক্রল করছে। নোটিসটা পড়া শেষ হলেও চোখ সরাতে পারে না। জিবা হালকা হেসে নিজে নিজেই বিড়বিড় করে আওড়ালো, 
নিঃসন্দেহে কাগজটা খুব গোছালো, ভদ্র, নিখুঁত আর মার্জিত ভাষাতে লেখা হয়েছে। কিন্তু শব্দের ফাঁকে ফাঁকে পরিকল্পিত ভাবে বেশ কিছু জোরালো ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এই যে যখন ডাকবে তখনই যেতে হবে, যা বলবে তাই করতে হবে। যা জিজ্ঞেস করবে তার উত্তর দিতে হবে। আবার কোন প্রকার প্রশ্নও করা যাবে না। আর প্রশ্ন করলে তা আবার তর্ক হিসেবে বিবেচিত হবে। তাছাড়া সিনিয়রদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। আর সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হলে আবার এই নিয়মগুলো মানতে হবে। অর্থাৎ পরিশেষে পুরো বিষয়টি মিলে এই দাঁড়ালো যে, এই নিয়ম গুলো মানলেই সিনিয়র দের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করা যাবে। আর না মানলে অসুবিধায় পড়তে হবে। এক কথায়, পুরো নোটিসটা ঠান্ডা মাথায় খুব হিসেব করে সাজানো হয়েছে। শব্দগুলো যতটা নরম, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ইঙ্গিতগুলো ঠিক ততটাই স্পষ্ট। সরাসরি কিছু বলা হয়নি, তবুও কথার ভাঁজে ভাঁজে এক ধরনের চাপ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। চট করে কেউ ধরতেই পারবে না।
চলবে... 

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন