ফন্ট সাইজ:
থিম:
আড়ালে আবডালে শুধুই তুই

৪৫তম পর্ব

লেখক: রাহা ইসলাম

#আড়ালে_আবডালে_শুধুই_তুই 

#কলমে_রাহা_ইসলাম 
#পর্ব_৪৪ ( প্রথম অংশ)
লাল গালিচাজুড়ে ছড়িয়ে আছে টুকটুকে লাল গোলাপের পাপড়ি। দু'পাশের ঝলমলেবাতির আলোয় পুরো পথটা যেন স্বপ্নের কোনো রাজপথের মতো দীপ্তিময় হয়ে উঠেছে।
ঠিক তখনই অভ্র নিঃশব্দে এসে রাহার পেছনে দাঁড়াতেই, পিছনে না ফিরেও রাহা বুঝে গেল—মানুষটা কে। সেই চিরচেনা সুগন্ধ, সেই পরিচিত উপস্থিতি তার হৃদয়কে মুহূর্তেই জানান দিল অভ্রের আগমনের কথা। যেন অজান্তেই সে অভ্রের অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। অভ্র তার আশপাশে থাকলেই রাহা অনায়াসে টের পায়—তার ব্যক্তিত্বময় পুরুষটি ঠিক তার কাছেই কোথাও রয়েছে।
অভ্র ধীর পায়ে রাহার পাশে এসে দাঁড়াল। রাজকীয় ভঙ্গিতে নিজের হাতটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করল।কিন্তু রাহা যেন এখনো কোনো মোহময় স্বপ্নের জগতে আটকে আছে। সে একই জায়গায় নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তা দেখে অভ্র মৃদু হেসে বলে উঠল,
—"কী হলো, মাই কুইন? এভাবে থমকে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? এগিয়ে যা… আজ থেকে তোর প্রতিটা স্বপ্ন, প্রতিটা ইচ্ছে পূরণ করার দায়িত্ব এই অভ্রের। তোর জীবনের কোনো চাওয়া, কোনো স্বপ্ন আমি অপূর্ণ থাকতে দেব না। কারণ তোর হাসির জন্য আমি অসম্ভবকেও সম্ভব করতে প্রস্তুত।”
রাহা কয়েক কদম এগিয়ে হঠাৎ খেয়াল করল, অভ্রও তার ঠিক পিছু পিছু হাঁটছে। সে থেমে ঘুরে দাঁড়াতেই অভ্র ভ্রু উঁচিয়ে বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকাল।
— কী হলো, থেমে গেলি কেন?
রাহা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— "আপনি পেছনে কেন? আমার পাশে পাশে হাঁটুন।"
অভ্র মৃদু হেসে মাথা নাড়ল,
— উহু… তুই আমার রাণী। আমি তোর রাজা হতে চাই না, চাই তোর আজীবনের অনুগত প্রজা হয়ে থাকতে। তুই যেদিকেই পদচারণা করবি, আমি নিঃশব্দে তোর ছায়াসঙ্গী হয়ে সেদিকেই উপস্থিত হব। আমার হৃদয়-রাজ্যের সিংহাসনে একমাত্র অধিষ্ঠাত্রী ‘রাহা’। 
আর আমি? আমি শুধু তোরই এক নিবেদিত প্রজা—যে নিজের সমগ্র পৃথিবী, সমস্ত স্বপ্ন আর অস্তিত্ব তোর চরণে উৎসর্গ করে দিতে প্রস্তুত। তোর এক চিলতে হাসিই আমার রাজত্বের পরম প্রাপ্তি, আর তোর ভালোবাসাই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র প্রেরণা, একমাত্র অস্তিত্বের মানে।
রাহা মিষ্টি হেসে বলল,
— "তাহলে আপনার রাণীর আদেশ, এখনই তার হাত ধরে সামনে এগিয়ে যাবেন।"
অভ্র ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
— "জো হুকুম, মেরি বেগম!"
দু'জনে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। অভ্রের একটিমাত্র ইশারায় মুহূর্তের মধ্যে দুই পাশে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল ত্রিশজন তরুণী, সবার হাতভর্তি রঙিন ফুলের পাপড়ি। তারা যত সামনে এগোতে লাগল, ততই তাদের ওপর ঝরে পড়তে লাগল ফুলের বৃষ্টি।
অভ্রের হাতের মুঠোয় বন্দী রাহার হাতটা আজ আর কারও জন্য নয়—এটা এখন সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত অধিকার। তাদের মাঝখানে আজ কোনো বাধা নেই। আর ভবিষ্যতে যদি কোনো বাধা মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহসও করে, তবে অভ্র সেটাকে শিকড়সহ উপড়ে ফেলবে, একেবারে অস্তিত্ব সহ কারে।
অভ্র রাহার হাতটা আলতো করে ধরে সামনে এগিয়ে চলেছে। আর রাহা ঘাড় ঘুরিয়ে একদৃষ্টিতে অভ্রের দিকে তাকিয়ে হাঁটছে। হঠাৎই অসাবধানতাবশত সামনে হোঁচট খেতে নিলে অভ্র মুহূর্তেই তাকে নিজের দিকে টেনে সামলে নিল।
অভ্রের চোখ পড়তেই দেখল, রাহার জুতোর হুক খুলে গেছে। রাহা নিচু হয়ে সেটি ঠিক করতে যেতেই অভ্র তাকে থামিয়ে দিল। এরপর নিজেই নিচু হয়ে রাহার পা নিজের দিকে টেনে নিতে চাইলে, রাহা তড়িঘড়ি করে বাধা দিয়ে বলল,
—"আপনি আমার থেকে বড়, আপনার এইভাবে নিচু হওয়াটা ঠিক না। আমি নিজেই পারব… প্লিজ, পায়ে হাত দেবেন না।”
অভ্র সঙ্গে সঙ্গে ধমকের সুরে বলে উঠল,
— “একদম চুপ! কয়দিন পর কোথায় কোথায় হাত রাখব, তারই ঠিক নেই; আর এখন বলছ পায়ে হাত দিবেন না?”
অভ্রের এমন দুষ্টু কথায় রাহার গাল লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে উঠল।
অভ্র ধীরে তার পা নিজের উরুর ওপর তুলে নিল। অত্যন্ত যত্নে ঝুঁকে জুতোর খুলে যাওয়া হুকটি লাগিয়ে দিল। তারপর পথের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে পকেট থেকে লাল ফিতেটা বের করে আলতো করে রাহার চোখ বেঁধে দিল।
রাহা বিস্মিত কণ্ঠে বলতে গেল,
— “অভ্র… ভা…”
কিন্তু তার আগেই অভ্র নিজের তর্জনী রাহার ঠোঁটের ওপর রেখে ফিসফিস করে বলল,
— “শশ… আর একটা কথাও নয় জান"।
কথাটি শেষ হতেই অভ্র নিজের হাতে থাকা লাল কাপড়ের ফিতেটা আলতো করে রাহার চোখে বেঁধে দিল। তারপর কোনো পূর্বাভাস না দিয়েই হুট করে তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল।
অপ্রস্তুত হয়ে রাহা দু'হাত বাড়িয়ে শক্ত করে অভ্রের গলা জড়িয়ে ধরল। অভ্রও তাকে বুকে আগলে নিয়ে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। একেবারে তিনতলা পর্যন্ত সে লিফটের সাহায্যও নিল না।
রাহাকে কোলে নেওয়াটা যেন তার ভীষণ প্রিয় একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যেন এই ছোট্ট, নরম-সরম লিলিপুটটাকে বুকে তুলে নেওয়ার মাঝেই তার এক অদ্ভুত প্রশান্তি লুকিয়ে আছে।
আর রাহার যেই পালকের মতো হালকা ওজন! তাকে কোলে নিয়ে চাইলে অনায়াসেই কয়েক ঘণ্টা দৌড়ে পাড়ি দেওয়া যায়।
সাফা আর অবন্তিকার চোখে তখন আনন্দের দীপ্তি চিকচিক করছে। অভ্র যে তাদের প্রাণের বান্ধবীকে এতটা নিঃস্বার্থ আর গভীরভাবে ভালোবাসতে পারে, তা তারা কখনো কল্পনাও করেনি।
তারা সামনে এগিয়ে যেতেই সাফা আর জায়ানও তাদের পিছু নিল। পেছনে রয়ে গেল অবন্তিকা আর জারিফ।
অবন্তিকা এক পা বাড়িয়ে আবার থেমে গেল। জারিফ কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঘুরে তাকাল।
অবন্তিকা তখনও সামনের দিকে চেয়ে, বুকের বাঁ পাশে হাত চেপে ধরে আবেগমাখা কণ্ঠে বলে উঠল
—"হায়ে, ম্যায় মার জাওয়া…! তুম দোনো নে তো মেরা দিল হি জিত লিয়া!"
জারিফও গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি টেনে বলল—
"মার জাইয়ে, বিচ্ছু! আপকো বাঁচকে রেহনে কা কোই হক নেহি।"
কথাটা বলেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না সে। উদাস ভঙ্গিতে সামনে এগিয়ে গেল, আর অবন্তিকা হতভম্ব হয়ে তার চলে যাওয়া দেখতে লাগল।আবার সম্বিত ফিরে পেতেই ভ্রু কুঁচকে রাগী গলায় বলে উঠল,
"এই অসভ্য হাতি! আমার খুশিটাও কি আপনার সহ্য হয় না ?" — 
সামনে হাঁটতে হাঁটতেই জারিফ একটুও না ফিরে নির্লিপ্ত স্বরে জবাব দিল—
" একদমই না!"
কথাটা শুনে অবন্তিকা ঠোঁট ফুলিয়ে ক্ষুব্ধ ভঙ্গিতে বলে উঠল—
--"হিংসুটে হাতি একটা! আপনার জন্মই হয়েছে মানুষের খুশিতে পানি ঢালার জন্য!"
বলে সে-ও দ্রুত পা চালিয়ে তার পিছু নিল, আর জারিফের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
জায়ান ইচ্ছে করেই জারিফ আর অবন্তিকাকে একটু একান্ত সময় দেওয়ার জন্য সাফার সঙ্গে গল্পে মেতে উঠল।
সে মৃদু হেসে প্রশ্ন করল, — "আচ্ছা, আপনার জীবনে কী কখনও ভালোবাসা এসে ধরা দিয়েছে?"
প্রশ্নটা শুনে সাফা হঠাৎই স্তব্ধ হয়ে গেল। এক মুহূর্তে তার মনের পর্দায় ভেসে উঠল জারিফের মুখ। অজান্তেই তার দৃষ্টি গিয়ে থামল দূরে দাঁড়িয়ে তর্কে মশগুল জারিফ আর অবন্তিকার দিকে।
কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে সে গভীর নিশ্বাস ফেলে বলল,
 — "ভালোবাসা কোনোদিন আমার দরজায় কড়া নাড়েনি… তবে কাউকে ভালো লেগেছিল। কিন্তু সেই অনুভূতিকেও ভাগ্য আমার করে দেয়নি। কিছু মানুষকে শুধু দূর থেকে ভালোবেসেই যেতে হয়, কাছে পাওয়ার সৌভাগ্য সবার কপালে লেখা থাকে না।"
কথাগুলো বলার সময়ও তার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল তাদের দিকেই, আর চোখের গভীরে লুকিয়ে ছিল একরাশ না-পাওয়ার বিষণ্নতা।
জায়ান সাফার দৃষ্টির অনুসরণ করে তাকাতেই দেখল, সে একদৃষ্টিতে জারিফ আর অবন্তিকার দিকে চেয়ে আছে। তার চোখজোড়ায় স্পষ্ট ফুটে উঠেছে একরাশ চাপা বেদনা আর না-পাওয়ার হাহাকার। মুহূর্তেই জায়ান যেন তার কষ্টের কারণটা কিছুটা আঁচ করতে পারল, তবে কিছুই প্রকাশ করল না।
ঠোঁটের কোণে এক মৃদু অথচ অর্থবহ হাসি টেনে সে সাফার আরও একটু কাছে এগিয়ে এসে বলল,
— "ওদের একসঙ্গে ভীষণ মানায়, তাই না?"
সাফা ঠোঁটে ফিকে হাসি ফুটিয়ে উত্তর দিল,
— "হুম… খুবই মানায়।"
জায়ান আবার প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
— "কী মনে হয়, ওদের মধ্যে কখনও কিছু হতে পারে?"
সাফা এবার বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বলল,
— "কেন হবে না?"
— "কিন্তু ওরা তো একসঙ্গে হলেই শুধু ঝগড়া করে!"
সাফা গভীর দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
— "ঝগড়ার আড়ালেই তো সবচেয়ে গভীর ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে। যে মানুষটার ওপর আমাদের কোনো অনুভূতি থাকে না, তার সঙ্গে আমরা কখনও এভাবে রাগ করি না, অভিমান করি না। কিছু সম্পর্কের শুরুটা হয় তর্ক দিয়ে, কিন্তু শেষটা গিয়ে থামে ভালোবাসায়।"
তার কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক দৃঢ়তা, যেন কথাগুলো শুধু জায়ানকে নয়, নিজের মনকেও বুঝ দিলো।
 জায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
— "তাহলে আপনি ভালোবাসায় বিশ্বাস করেন?"
সাফা একবার তার দিকে তাকিয়ে আবার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল জারিফ আর অবন্তিকার দিকে।
— "বিশ্বাস করি বলেই তো দূর থেকে কারও সুখ দেখে হাসতে পারি… ।
জায়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
— "সব ভালোবাসার কী পূর্ণতা পাওয়া জরুরি?"
সাফা ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষণ্ন হাসি টেনে উত্তর দিল,
— "না। কিছু ভালোবাসা পূর্ণতা পাওয়ার জন্য আসে না, শুধু মানুষকে বদলে দেওয়ার জন্য আসে। কিছু মানুষ আমাদের জীবনে থেকে যায় না, কিন্তু তাদের জন্য অনুভূতিটা সারাজীবন থেকে যায়।”
জায়ান কিছুক্ষণ নীরব থেকে হঠাৎ প্রশ্ন করল,
— "যদি নতুন করে কেউ আপনাকে ভালোবাসতে চায়… তাকে কী একটা সুযোগ দেবেন?”
এমন কথায় সাফা ফট করে জায়ানের দিকে তাকাল। তার চোখে মুহূর্তেই ভেসে উঠল বিস্ময় আর অজস্র প্রশ্ন।
জায়ান অবশ্য দৃষ্টি সরাল না। ঠোঁটের কোণে রহস্যময় এক হাসি ঝুলিয়ে সে ধীর কণ্ঠে বলল,
— "কী হলো? এমনভাবে তাকাচ্ছেন কেন?"
সাফা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— "মনে হচ্ছে… আপনার কথার আড়ালে অন্য কোনো কথা লুকিয়ে আছে।”
তখনই অবন্তিকার তীক্ষ্ণ, খুনসুটিভরা কণ্ঠ ভেসে এলো—
"কিরে লাইলী-মজনু, আর কত দাঁড়িয়ে থাকবি? প্রেমালাপ শেষ হলে আমাদের দিকেও একটু নজর দিস!”চল এবার।
সাফাও সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— "চুপ কর, অসভ্য মেয়ে! সব সময় শুধু খেপানোর ধান্দা!"
বলতে বলতেই সে এগিয়ে গিয়ে অবন্তিকার পাশে দাঁড়াল, 
আর অবন্তিকা দুষ্টু হেসে সামান্য বাঁকা হয়ে সাফার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা জায়ানের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে ইশারা করল। হয়তো বুঝাতে চাচ্ছে,কি হয়েছে..!
জায়ানও ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটিয়ে হাতের আঙুল তুলে ইশারায় বুঝিয়ে দিল— 'অল রাইট,।
দু'জনের সেই নীরব বোঝাপড়া দেখে মনে হচ্ছিল, তারা যেন কোনো গোপন পরিকল্পনার সঙ্গী। 
____________
অভ্র আলতো করে রাহাকে কোল থেকে নামিয়ে ছাদের উপর দাঁড় করিয়ে দিল। চোখের বাঁধনটা খুলে দিতেই সামনের দিক তাকিয়ে রাহার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। মনে হচ্ছিল, হৃদস্পন্দনের শব্দটা চারপাশেও শোনা যাচ্ছে,
সামনে যেন এক টুকরো স্বপ্নের রাজ্য! অত্যন্ত নান্দনিকভাবে সাজানো একটি টেবিল, যার ওপর সারি সারি সুস্বাদু খাবার রাজকীয় আয়োজনে পরিবেশিত। চারপাশে জ্বলছে অসংখ্য সুগন্ধি ক্যান্ডেল, তাদের মৃদু আলো আর মোহনীয় সুবাস পুরো পরিবেশটাকে করে তুলেছে আরও বেশি মায়াবী ও রোমাঞ্চকর।
রাহা যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। কী বলবে, কী করবে—সবকিছুই যেন ভুলে বসেছে। এমন আয়োজন তার কল্পনার সীমানাকেও ছাড়িয়ে গেছে। অভ্র তার জন্য এত কিছু করেছে—এটা ভাবতেই তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক অনুভূতিতে কেঁপে উঠল।
সে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল, চোখজোড়া বিস্ময়ে স্থির, ঠোঁট সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। পুরো মানুষটা যেন প্রাণহীন কোনো পুতুল, কিংবা সময়ের গণ্ডিতে আটকে পড়া এক মূর্তি—শুধু অপলক দৃষ্টিতে সেই স্বপ্নময় দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে আছে।
টেবিলের পেছনে ছোট্ট একটি স্টেজ, তবে তার সৌন্দর্য ছিল চোখ ধাঁধানো। স্টেজের পেছনজুড়ে অসংখ্য তাজা ফুল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশাল এক লাভ-শেপ, । মাঝখানে নিপুণভাবে বসানো রয়েছে কিছু ঝলমলে লাইটিং, যদিও সেগুলো এখনও জ্বালানো হয়নি।
চারপাশে বইছে স্নিগ্ধ সন্ধ্যার মৃদুমন্দ বাতাস, যেন প্রকৃতিও আজ তাদের এই মুহূর্তটাকে আরও রঙিন করে তুলতে ব্যস্ত।
অভ্র ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে এসে এক হাত বাড়িয়ে টেবিলের দিকে ইশারা করল, যেন নীরব ভাষায় বলছে— "এগিয়ে চল। এই আয়োজন শুধুই তোর জন্য।"
টেবিলের সামনে পৌঁছাতেই সে ভদ্রভাবে একটি চেয়ার টেনে দিল এবং চোখের ইশারায় বসতে বলল। রাহাও কোনো কথা না বলে ধীরে বসে পড়ল।
কেন যেন সবকিছুই তার কাছে অবাস্তব, স্বপ্নের মতো লাগছে। এ যেন তার বহুদিনের লালিত কোনো কল্পনা, কোনো গোপন ইচ্ছের বাস্তব রূপ।
সে একদৃষ্টিতে অভ্রের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখজোড়ায় বিস্ময়, মুগ্ধতা আর না-বলা হাজারো অনুভূতির ঝিলিক স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। যেন সে এখনও বিশ্বাসই করতে পারছে না— তার স্বপ্নগুলো সত্যিই আজ বাস্তবের রূপ নিয়েছে।
অভ্র হঠাৎ উঠে এসে রাহার পেছনে গিয়ে তার কানের পাশে আলতো করে তিনটি টকটকে লাল গোলাপ গুঁজে দিল। তারপর আবার সামনে এসে একদৃষ্টে তাকিয়ে মুগ্ধ কণ্ঠে বলে উঠল,
— "এবার… একদম পারফেক্ট লাগছে মাই লেডি। এখন তোকে দেখে মনে হচ্ছে সন্ধ্যার আকাশ থেকে কোনো পরী নেমে এসেছে।"
রাহার এভাবে তাকিয়ে থাকা দেখে 
অভ্র প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে দুষ্টু হেসে বলল ,
"কী ব্যাপার, আজ কি আমাকে একটু বেশিই হ্যান্ডসাম দেখাচ্ছে জান?”
রাহা মৃদু হেসে চোখ নামিয়ে নিল। তারপর আবার অভ্রের দিকে তাকিয়ে নরম কণ্ঠে বলে উঠল,
— "মাশাআল্লাহ… আমার জামাই তো বরাবর হ্যান্ডসাম!"
কথাটা শুনে অভ্রের ঠোঁটের কোণেও এক চিলতে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল।
অভ্র নিজ হাতে খাবার তুলে চামচটা রাহার দিকে বাড়িয়ে দিতেই রাহার চোখ দুটো চিকচিক করে উঠল। মুহূর্তেই সেখানে জমে উঠল একরাশ আনন্দাশ্রু।
অভ্র নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল তার প্রিয়তমার দিকে। যেন এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকে হৃদয়ের গভীরে গেঁথে নিচ্ছে। তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য ছিল—নিজের ভালোবাসার মানুষটার চোখে সুখের ঝিলিক দেখা। সে প্রতিটি অনুভূতি, প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি স্পন্দন রাহার সঙ্গে একাত্ম হয়ে অনুভব করছিল।
"কিরে জান, হা কর। না হলে কিন্তু আর একটুও খাবার পাবি না।"
অভ্রের কথায় রাহা মিষ্টি করে হেসে মুখ খুলতেই সে আলতো করে এক চামচ খাবার তার মুখে তুলে দিল। দ্বিতীয়বার খাবার দিতে যেতেই রাহা নিজেই চামচটা নিয়ে অভ্রের দিকে বাড়িয়ে দিল।
হঠাৎ কী যেন মনে পড়তেই সে বলে উঠল, — "উপস! সরি…"
বলে তাড়াতাড়ি চামচটা নামিয়ে রেখে আরেকটি চামচ নিতে গেল। কিন্তু অভ্র তার হাতটা আলতো করে ধরে থামিয়ে দিয়ে বলল,
— "উহু… ওটাই লাগবে।"
কথাটা বলেই সে সেই একই চামচে খাবার তুলে নিজের মুখে দিয়ে দিল।
রাহা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে বলে উঠল, 
— "আরে… এটা তো এঁটো!"
অভ্র ঠোঁটের কোণে গভীর হাসি ফুটিয়ে নরম গলায় বলল,
— "তোর সবকিছুই আমার কাছে অমূল্য, প্রিয়। এখানে এঁটো বলে কিছু নেই। তুই আমার, তোর সবটুকুও আমার। আমাদের ভালোবাসায় পুরোনো বলে কোনো শব্দ নেই; প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটা অনুভূতি আমার কাছে প্রতিদিন নতুন হয়ে ধরা দেয়।"
খাওয়া শেষ হতেই অভ্র ধীরে ধীরে রাহার হাত ধরে তাকে নিয়ে স্টেজের দিকে এগিয়ে গেল।
স্টেজের মাঝখানে এনে তাকে দাঁড় করিয়ে দিল। চারপাশের আলো, মৃদু বাতাস আর ভালোবাসায় ভরা সেই পরিবেশে হঠাৎই অভ্র তার সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল…
আর রাহা বিস্ময়, আবেগ আর অজানা এক সুখের শিহরণ নিয়ে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল তার প্রিয় মানুষটার দিকে ।
ঠিক তখনই হঠাৎ করে আকাশের বুক চিরে ভেসে এলো হেলিকপ্টারের গম্ভীর শব্দ। প্রথমে সবাই অবাক হয়ে উপরের দিকে তাকাল। মুহূর্তের মধ্যেই দেখা গেল—দুটি হেলিকপ্টার ছাদের ঠিক ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে চক্কর দিচ্ছে।
পরের মুহূর্তেই যেন অলৌকিক কিছু ঘটে গেল।
হেলিকপ্টার দুটির দরজা থেকে ঝরনার ধারার মতো ঝরে পড়তে লাগল অসংখ্য টুকটুকে লাল গোলাপের পাপড়ি। লাল পাপড়িগুলো বাতাসে ভেসে ঘুরপাক খেতে খেতে নেমে আসছিল অভ্র আর রাহার ওপর। পুরো আকাশ যেন রক্তিম ভালোবাসায় রঙিন হয়ে উঠল।
চারপাশে উপস্থিত সবাই বিস্ময়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে সেই দৃশ্য দেখছিল। মনে হচ্ছিল, স্বয়ং প্রকৃতিও আজ তাদের ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে গোলাপের বৃষ্টি নামিয়েছে।
রাহা আর অভ্র—দু'জনেরই হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুততায় ছুটে চলেছে। আর ঠিক তখনই, অভ্রকে নিজের সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে দেখে রাহা যেন বজ্রাহত হয়ে গেল। বিস্ময়ে তার চোখদুটি বড় হয়ে উঠল, যেন সে কোনো অলৌকিক দৃশ্য দেখছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে মাহাদী ও বাঁধনের ফোন একসঙ্গে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি আকস্মিক নোটিফিকেশন। দু'জনই কৌতূহলভরে তাতে ক্লিক করতেই তাদের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল—সেখানে সরাসরি লাইভ টেলিকাস্ট সম্প্রচারিত হচ্ছে!
চলবে……

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন