ফন্ট সাইজ:
থিম:
আড়ালে আবডালে শুধুই তুই

৪৬তম পর্ব

লেখক: রাহা ইসলাম

#আড়ালে_আবডালে_শুধুই_তুই 

#কলমে_রাহা_ইসলাম 
#পর্ব_৪৪ (শেষ অংশ)
অভ্রের শ্বাস-প্রশ্বাস এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছে যে তার সমগ্র শরীর হালকা কাঁপছে। আজ সে তার সতেরো বছরের নিঃশর্ত, গভীর ভালোবাসার পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ ঘটাতে চলেছে।এই দিনটির জন্য সে কত প্রতীক্ষা করেছে, কত স্বপ্ন বুনেছে, কত আকাঙ্ক্ষা আর বাসনা হৃদয়ের গভীরে লালন করেছে—তার কোনো হিসাব নেই। অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আজ তার দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে।
আজ তার হৃদয়ের একমাত্র অধিকারিণী, তার একান্ত প্রিয় নারীকে, বছরের পর বছর বুকের গহীনে জমিয়ে রাখা না-বলা অনুভূতি, অব্যক্ত প্রেম আর লুকিয়ে রাখা কথাগুলো উজাড় করে বলার পালা।
অভ্র ধীর ভঙ্গিতে নিজের একটি হাত রাহার দিকে বাড়িয়ে দিল।
রাহাও একরাশ কৌতূহল আর অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে নিজের কোমল হাতটি তার হাতের ওপর রাখল।
মুহূর্তেই অভ্র সেই হাত খানা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল, যেন আর কোনোদিন ছেড়ে দিতে চায় না। 
চারপাশের সবকিছু তখন নিস্তব্ধ, শুধু দু'জনের দ্রুত হৃদস্পন্দনের শব্দ যেন বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
রাহার চোখে চোখ রেখে, গভীর নিশ্বাস নিয়ে অভ্র তার বহুদিন ধরে হৃদয়ে লুকিয়ে রাখা কথাগুলো বলতে শুরু করল,
– “সতেরো বছর ধরে আমার প্রতিটা প্রার্থনায়, প্রতিটা হাসিতে আর প্রতিটা স্বপ্নে শুধু তুই ছিলি। হাজার মানুষের ভিড়েও আমার চোখ তোকেই খুঁজে ফিরেছে। ভালোবাসার আসল অর্থ আমি বুঝেছি তোকে দেখার পর।
আমি তোকে ভালোবাসার কোনো কারণ খুঁজি না,  
কারণ তুই আমার কাছে কারণেরও উর্ধ্বে।
আমি চাই প্রতিটি সকাল তোর হাসি দিয়ে শুরু হোক, আর প্রতিটি রাত তোর নাম ভেবে শেষ হোক। তোর সাথে ঝগড়া, অভিমান, হাসি-কান্না—সবকিছু নিয়েই একটা পুরো জীবন কাটাতে চাই।আর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তোর হাতটা ধরে রাখতে চাই।
আমি নিখুঁত নই, কিন্তু তোকে সারাজীবন আগলে রাখার প্রতিশ্রুতি দিতে পারি। তাই আজ শুধু একটা প্রশ্ন—এই সতেরো বছরের অপেক্ষাটাকে কি তুই সারাজীবনের গল্পে বদলে দিবি? তুই
কি আমার জীবনের শেষ ঠিকানা হবি? তোর নামের পাশে আমার নামটা কি সারাজীবনের জন্য লিখতে দিবি জান??”
অভ্রের কথাগুলো শুনে রাহার চোখ বেয়ে অনায়াসেই অশ্রুধারা নেমে এলো। দু'জনই অপলক দৃষ্টিতে একে অপরের চোখে হারিয়ে রইল।
পাশ থেকে অবন্তিকা আর সাফা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল—
'কাম অন, রাহা! জাস্ট সে ইয়েস!'
জারিফ ও জায়ানের ঠোঁটের কোণে তখন প্রশান্তির এক তৃপ্ত হাসি লেগে আছে।
ঠিক তখনই হঠাৎ করে পুরো আকাশজুড়ে রঙিন আতশবাজি ফুটে উঠল। তাদের পেছনের লাইটিংয়ে জ্বলে উঠল—
"উইল ইউ বিমাই সোলমেট?”
পরমুহূর্তেই আকাশে ভেসে উঠল 'রাহা' নামটি।
রাহা যেন একের পর এক সুখের ঝটকা খাচ্ছে। কী বলবে, কী করবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।
রাহা অভ্রের হাত দু'টো আঁকড়ে ধরে তার সামনে নিজেও হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। চোখ বেয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছে। কান্নাভেজা মুখে মাথা নেড়ে কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল,
"ইয়েস, আই উইল…" 
রাহার মুখ থেকে কথাটা শোনা মাত্রই অভ্রের ভেতর যেন প্রবল বজ্রাঘাত নেমে এলো। এক শীতল স্রোত তার সমগ্র শরীরজুড়ে কাঁপন তুলে দিল। দীর্ঘদিনের জমে থাকা কষ্ট, অপেক্ষা আর যন্ত্রণাগুলো মুহূর্তেই তার হৃদয়কে তোলপাড় করে দিল। শুকিয়ে আসা গলায় ঢোক গিলে কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল,
— “সে দ্যাট অ্যাগেইন, জান”।
রাহা আবারও মৃদু হেসে বলল,
—“ইয়েস, আই উইল”।
অভ্রের চোখে তখন অবিশ্বাস আর আকুলতার ছাপ।
—“ওয়ান মোর… প্লিজ”।
এবার আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না রাহা। সমস্ত অনুভূতি এক করে জোরে চিৎকার করে বলে উঠল,
— “ইয়েস! আই উইল বি ইয়োর সোলমেট”।
কথাটা কানে আসতেই অভ্র যেন পৃথিবীর সমস্ত সুখ নিজের মুঠোয় পেয়ে গেল। আর এক মুহূর্তও নিজেকে আটকে রাখতে না পেরে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল রাহার দিকে। শক্ত করে তাকে বুকে জড়িয়ে নিল, 
যেন এই মানুষটাকে আর কখনো হারাতে চায় না।
তার চোখের কোণ বেয়ে টলমল করা কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আবেগে কাঁপতে থাকা কণ্ঠে অভ্র ফিসফিস করে বলে উঠল,
— “আই লাভ ইউ, রাহা… আই লাভ ইউ সো মাচ”। 
রাহাও এবার সব দ্বিধা-সংকোচ ভেঙে অভ্রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আবেগমাখা কণ্ঠে বলে উঠে, 
—“আই লাভ ইউ টু, অভ্ররাজ”।
ঠিক তখনই একজন তাদের সামনে মখমলি বাক্সে রাখা এক জোড়া কাপল রিং এগিয়ে দিল।
আংটিগুলো ছিল প্লাটিনামের তৈরি, যার মাঝখানে বসানো ঝলমলে ডায়মন্ড। চারপাশজুড়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হিরের খচিত কারুকাজে সেগুলো যেন হাজারো তারার আলো একত্রে ধারণ করে আছে। নরম আলোর ছোঁয়ায় হিরেগুলো চিকচিক করে উঠছে, যেন তাদের ভালোবাসারই দীপ্তিময় প্রতিচ্ছবি।
অভ্র গভীর মুগ্ধতায় রাহার বাম হাতের অনামিকায় আংটিটি পরিয়ে দিল। আলতো করে তার আঙুলে অধর ছুঁইয়ে দিল। আংটির ভেতরে সূক্ষ্ম অক্ষরে খোদাই করা ছিল— “A”
এরপর কাঁপা হাতে, অথচ পরিপূর্ণ ভালোবাসা নিয়ে রাহাও অভ্রের আঙুলে আংটিটি পরিয়ে দিল। সেই আংটির গায়ে খচিত ছিল— “R”
মুহূর্তেই চারপাশ হাততালির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল।
অভ্র রাহাকে পাশে দাঁড় করিয়ে নিজে স্টেজের একপাশে গিয়ে ক্যামেরার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির বিজয়ী হাসি ফুটে উঠল।
— “কেমন লাগল তোদের। বিন্দুমাত্র লজ্জা-শরম থাকলে আজকের পর আর আমাদের পেছনে পড়ে থাকবি না। আর তোদের যদি ছেলে-মেয়ের এতই অভাব হয়, বলিস— আমি ব্যবস্থা করে দেব”।
কথাটা শুনে মাহাদী আর বাঁধন দু'জনই রাগে ফেটে পড়ল। হাতে থাকা ফোন দুটো সজোরে ছুড়ে মারল তারা।
মাহাদী দাঁতে দাঁত চেপে, রক্তচক্ষু নিয়ে বলে উঠল,
— “এবার তোকে আমি সত্যিই শোধে-আসলে বুঝিয়ে দেব, অভ্র”!
অন্যদিকে বাঁধনও ক্রোধে ফুঁসতে লাগল। তার চোখেমুখে প্রতিশোধের আগুন স্পষ্ট।
এই বিয়ে সে কিছুতেই হতে দেবে না, কিছুতেই না!
_________________
অভ্র, রাহা আর তার বান্ধবীদের গাড়িতে তুলে দিয়ে বলল যেন তারা সোজা বাসায় চলে যায়।
তার এখন হাসপাতালে যেতে হবে।
‘হাসপাতাল’ শব্দটা শুনেই রাহার বুকটা ধক করে উঠল। মুখভর্তি আতঙ্ক নিয়ে সে তাড়াতাড়ি বলে উঠল
—“হাসপাতালে কেন যাবেন? কার কী হয়েছে? আমিও আপনার সঙ্গে যাব”?
অভ্র মৃদু হেসে তাকে আশ্বস্ত করল,
—“কারও কিছু হয়নি, জান। তুই একদম চিন্তা করবি না। খুব শিগগিরই আমি বাসায় ফিরে আসব।
রাহারা চলে যেতেই নিরাপত্তার জন্য জারিফকেও তাদের সঙ্গে পাঠানো হলো, যাতে পথে কোনো ধরনের অসুবিধা না হয়।
আর অভ্র? হাতে শক্ত করে পেনড্রাইভটা ধরে জায়ানের সঙ্গে মুখভরা প্রশান্তি আর আনন্দের দীপ্তি নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দিল।
আজকের এই অপার্থিব, সুন্দর মুহূর্তটা সে একজন বিশেষ মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চায়।
_________________
বাড়িতে ফিরেই রাহা ফ্রেশ হয়ে বসতে না বসতেই দেখে শিফা আর আয়াত তার অপেক্ষায় আছে।
রাহাকে এত খুশি দেখে শিফা ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠল,
 — “ক্যান্ডেললাইট ডিনার! উহু, বনু… কেমন কাটল”?
রাহা লজ্জায় টুকটুকে লাল হয়ে গেল। বড় আপুদের সামনে কী বলবে বুঝে উঠতে পারছিল না। তবুও মৃদু হেসে বলল, 
— “আজ তোমার ভাই আমাকে প্রপোজ করেছে, আপু”।
কথাটা শুনেই শিফা আনন্দে চিৎকার করে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই সে রাহাকে জড়িয়ে ধরে পুরো ঘর ঘুরতে লাগল। আর আয়াত বিছানায় বসে তাদের কাণ্ড দেখে মিটিমিটি হাসছিল।
রাহা হেসে বলল,
 — “আরে আপু, পরে যাব তো! এবার থামো”।
শিফা সঙ্গে সঙ্গে রাহাকে নামিয়ে দিল। দু'জনেই ফট করে বিছানায় বসে পড়ল। তিনজনের মুখেই তখন তৃপ্তির উজ্জ্বল হাসি।
আয়াত মুচকি হেসে বলল, 
— “আচ্ছা, আজকের জন্য এতটুকুই থাক। বাকিটা কালকে বিস্তারিত শুনব। এখন একটু বিশ্রাম নে”।
পুরো বাড়ি তখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন। প্রায় রাত একটা বাজে, তখন অভ্র বাসায় ফিরল। চারপাশে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতার চাদর। পরদিন আবার তাদের মেহেদির অনুষ্ঠান।
রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল অভ্র। কিন্তু আজ যেন তার চোখে ঘুমের কোনো ছোঁয়াই নেই।
কিছুক্ষণ অস্থিরভাবে এপাশ-ওপাশ করার পর আর থাকতে না পেরে সে নিঃশব্দে চলে গেল রাহার রুমে।
ভেতরে ঢুকে দেখে, রাহা আর আয়াত নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। চাঁদের মোলায়েম আলোয় রাহার শান্ত মুখটা আরও মায়াবী লাগছে।
রাহার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে অভ্র মনে মনে বলল,
— আমার ঘুম চুরি করে নিয়ে নিজে কী নিশ্চিন্তে, কী প্রশান্তিতে ঘুমাচ্ছে"।
রাহাও মাত্র এক ঘণ্টার মতো হলো ঘুমিয়েছে। সারাদিনের ঘটনাগুলো ভাবতে ভাবতেই কিছুক্ষণ আগে সে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমিয়েছে। প্রচণ্ড ক্লান্ত থাকায় ঘুমটাও বেশ গভীর হয়েছে।অভ্র যখন আলতো করে রাহাকে কোলে তুলে দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে আসছিল, ঠিক তখনই আয়াত চোখ মেলে তাকাল। দৃশ্যটা দেখে তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। কিছু না বলেই আবার চোখ বন্ধ করে নিল সে।
নিজের ঘরে এনে অভ্র খুব যত্ন করে রাহাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর নিজেও তার পাশে শুয়ে পড়ে মাথাটা আলতো করে রাহার বুকে রেখে দিল। মুহূর্তেই যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি তাকে ঘিরে ধরল। নিজের প্রিয় মানুষের বুকে মাথা রেখে ঘুমানোর চেয়ে বড় শান্তি বোধহয় আর কিছুতেই নেই।
চোখ বন্ধ করে অভ্র মনে মনে বলল,
— “তোর আরেকটা স্বপ্ন পূরণ করার সময় এসে গেছে, জান। আমাদের বিয়ের দিন তোর জন্য আমার তরফ থেকে এটাই হবে সেরা উপহার”।
এরপর সে আরও শক্ত করে রাহাকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিল।কিন্তু এতটা আঁকড়ে ধরায় রাহার যেন দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। বুকের ওপরও ভারী কিছু অনুভব হচ্ছিল। তাই ঘুমের মধ্যেই সে অস্বস্তিতে নড়েচড়ে উঠল।
অভ্রের চোখে তখন সবে ঘুম নেমে এসেছে। ঠিক সেই সময় রাহার অস্থির নড়াচড়ায় তার ঘুমটা ভেঙে গেল।বিরক্ত হয়ে অভ্র বলে উঠল,
— “স্টুপিড! এত নড়াচড়া করছিস কেন? একটু শান্তিতে ঘুমাতে দে”!
ধমকটা শুনেই ফট করে চোখ খুলে ফেলল রাহা। চোখ খুলতেই সে থমকে গেল। তার বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়ে আছে অভ্র। সে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে, আর অভ্র মুখ উঁচু করে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
রাহা বিস্ময়ে হতবাক! চারপাশে একবার তাকিয়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করল, সে কোনো স্বপ্ন দেখছে না তো? কিন্তু এ তো সত্যি! অভ্র এখানে এলো কীভাবে?
সে বারবার পলক ফেলছে। উঠে বসতে যেতেই টের পেল, একচুলও নড়তে পারছে না।
অভ্র গম্ভীর স্বরে বলল,
— “মেজাজ গরম করবি না কিন্তু। অনেক কষ্টে শান্ত আছি, আমাকে শান্তই থাকতে দে”।
এবার রাহা বুঝল, সবকিছুই বাস্তব।
সে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— “আপনার মতো এত ভারী মানুষের ওজন আমার মতো একটা মেয়ে কীভাবে বহন করবে? আমার তো এসবের কোনো অভ্যাস নেই। এবার সরুন”।
অভ্রের ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
— “অভ্যাস থাকবে কী করে? অভ্যাস করানোর মতো কেউ ছিল নাকি? আমি যদি দেশে থাকতাম, এতদিনে তোকে সব অভ্যাস করিয়ে দিতাম। তবে এখনও দেরি হয়নি… আজ থেকে শুরু করে দে। এখন থেকেই আমার ভার নেওয়ার অভ্যাস করে নে”।
রাহা বলে উঠল,
— “আচ্ছা, ওয়েট, আপনি দেশে ছিলেন না কেন”?
প্রশ্নটা শুনতেই অভ্র হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। অতীতের কিছু তিক্ত স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। হাতের মুঠি ক্রমশ দৃঢ় হয়ে উঠল, আর কপালের রগগুলো স্পষ্টভাবে ফুলে উঠল।
রাহা অভ্রের বদলে যাওয়া অভিব্যক্তি গভীরভাবে লক্ষ্য করল। এখন সে অন্তত নিশ্চিত—কিছু একটা ঘটেছিল। এমন কিছু, যা অভ্রকে পুরো নয় বছর দেশের বাইরে থাকতে বাধ্য করেছে। শুধু পড়াশোনা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও কোনো অন্ধকার সত্য? আর তার সামান্য প্রশ্নেই এমন প্রতিক্রিয়ার কারণটা তাকে জানতেই হবে।
অভ্র সরে যেতে উদ্যত হতেই রাহা আলতো করে তার মুঠোবদ্ধ হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।
— “রিল্যাক্স”।
মৃদু স্বরে বলেই সে অভ্রের মাথাটা টেনে নিজের বুকে চেপে ধরল।
রাহার এই অপ্রত্যাশিত স্নেহময় আচরণে অভ্রের দেহের সমস্ত কঠোরতা ধীরে ধীরে গলে যেতে লাগল। তার শক্ত হয়ে থাকা মুঠি শিথিল হয়ে এলো, কপালের টানও মিলিয়ে গেল। যেন রাহার বুকে মাথা রাখতেই তার অস্থির হৃদয়টাও একটু শান্তির আশ্রয় খুঁজে পেল।
রাহা খুবই ধীরগতিতে নিজের আঙুলগুলো অভ্রের চুলে চালিয়ে বিলি কেটে দিতে লাগল। আজ সেখানে কোনো জোর, কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; সবটুকুই তার নিজের ইচ্ছায়, নিজের মনের টানে।
মুহূর্তটা এতটাই শান্ত আর প্রশান্ত ছিল যে, একসময় অজান্তেই দু'জনের চোখে ঘুম নেমে এলো। একে অপরের উষ্ণতার মাঝে জড়িয়ে তারা দু'জনই গভীর নিদ্রায় তলিয়ে গেল।
_____________
"বিয়ের পর রাহাকে নিয়ে আমি এই দেশে থাকব না।"
অভ্রের কণ্ঠে উচ্চারিত কথাটি যেন মুহূর্তেই পুরো ড্রয়িংরুমে এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের সৃষ্টি করল। 
চারপাশের পরিবেশ থমথমে হয়ে উঠল।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন অভ্রের বাবা-মা।
অন্যদিকে, নাজিরা বেগম, রাহার আম্মুকে নিয়ে বাইরে গিয়েছেন। ঘরে ছিলেন শুধু রাহার ছোট আব্বু।
আর আয়াত, সাফা, রাহা ও তার দুই বান্ধবীকে নিয়ে ইভান গেছে পার্লারে।
অভ্রের কথা শুনে রাহার ছোট আব্বু বলে উঠলেন,
— "এসব কী বলছিস, অভ্র?"
অভ্র দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল,
— "আমি একদম ঠিকই বলছি, ছোট চাচ্চু।"
ছেলের মুখে এমন কঠিন সিদ্ধান্তের কথা শুনে আফসানা বেগম যেন ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার হয়ে গেলেন। তিনি ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন এবং চোখ বেয়ে নীরব অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়তে লাগল।
এবার আমন খান গম্ভীর স্বরে বললেন,
— "কেন এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছ, অভ্র? নয়টা বছর তো আমাদের থেকে দূরেই কাটিয়ে এলে। এবারও কি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে?"
অভ্রের চোখে তখন জমে থাকা অভিমান আর ক্ষোভ স্পষ্ট।
— "আমি কি নিজের ইচ্ছায় দূরে ছিলাম? আপনারাই তো আমাকে বাধ্য করেছিলেন!"
আমান খান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— "কেন সেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, সেটা তুই খুব ভালো করেই জানিস, অভ্র।”
— "আপনারা এখনও আমাকে বিশ্বাস করেন না, আমি জানি। তবে আর মাত্র দুটো দিন… এই অবিশ্বাসের অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটবে। যাদের জন্য আমি আমার প্রাণের মানুষটার থেকে বছরের পর বছর দূরে ছিলাম, এবার তাদেরও বোঝার সময় এসেছে—প্রিয়জনকে হারিয়ে, তার থেকে দূরে থেকে বেঁচে থাকার যন্ত্রণা ঠিক কেমন!"
অভ্রের কণ্ঠ ক্রমশ ভারী হয়ে উঠল।
— "প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটা নিঃশ্বাসে আমি সেই কষ্টটা অনুভব করেছি, চেয়ারম্যান সাহেব।"
আমন খান ব্যথিত স্বরে বললেন,
— "অভ্র, তুমি ভুল বুঝছ। আমরা কেউই তোমাকে অবিশ্বাস করিনি। সেদিনের পরিস্থিতি এমনই ছিল যে আমরা বাধ্য হয়েছিলাম ওই সিদ্ধান্ত নিতে। সবকিছুই করেছি তোমার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা ভেবে।"
অভ্র তিক্ত হাসল।
— "উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ? মাই ফুট! আমার কথা শোনার প্রয়োজনই তো আপনারা মনে করেননি। আমার অনুভূতি, আমার সত্য—কোনোটারই মূল্য আপনাদের কাছে ছিল না।"
একটু থেমে সে দৃঢ় কণ্ঠে আবার বলল,
— "তাই আজ আমিও আপনাদের কোনো কথা শুনব না। আমি আমার বিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাব। তবে যাওয়ার আগে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করেই যাব… যেন আর কখনো কেউ আমার সত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস না পায়।"
আসান খান বলে উঠলেন,
–“কি এমন সত্যি অভ্র?
আর দুটোদিন অপেক্ষা করো চাচ্চু,প্লিজ আর কিছু জিজ্ঞেস করো না।
কথাগুলো বলেই অভ্র আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। প্রচণ্ড অভিমান আর জমে থাকা ক্ষোভ বুকে নিয়ে সে দ্রুত স্থান ত্যাগ করল। তার চলে যাওয়ার শব্দটুকুও যেন ড্রয়িংরুমের নিস্তব্ধতাকে আরও ভারী করে তুলল।
 আসান খান ও ভাতিজাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। তখনই তার একটা জরুরী ফোন আসলে বাহিরে চলে যায়।
এদিকে অভ্রের মা এতক্ষণ নীরবই ছিলেন। তিনি কোনো কথা বলেননি, শুধু সবার কথা গভীর মনোযোগে শুনে গেছেন। তারা তো সবসময়ই ছেলের মঙ্গল চেয়েছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অভ্রের মনে তাদের নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণা জন্ম নিয়েছে। এখন তাকে থামানোর ক্ষমতা একমাত্র রাহারই আছে।
চোখের কোণের অশ্রুবিন্দু মুছে স্বামীর দিকে দৃঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি বললেন,
— “তুমি কোনো দুশ্চিন্তা কোরো না। অভ্র কোথাও যাবে না।”
আমান খান বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
— মানে?
তিনি মৃদু কিন্তু আত্মবিশ্বাসী হাসি দিয়ে বললেন,
— এবার যা করার, রাহাই করবে।
স্ত্রীর কণ্ঠের অটল বিশ্বাস দেখে তিনিও নিশ্চিন্ত হয়ে তার কথায় সম্মতি জানালেন।
কিছুক্ষণ পর রাহারা বাসায় ফিরতেই চারপাশ যেন মুহূর্তেই প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠল।
সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো রাহার দিকে। অলিভ সবুজ রঙের শাড়িতে আজ তাকে অপার্থিব সুন্দর লাগছে। তার সঙ্গে মানানসই দোপাট্টা আর স্নিগ্ধ ফুলের গহনা যেন তার সৌন্দর্যে অন্যরকম এক মাধুর্য যোগ করেছে। আজ যেহেতু মেহেদী অনুষ্ঠান, তাই ভারী সাজসজ্জার বদলে সে বেছে নিয়েছে একেবারে সরল অথচ মোহনীয় আয়োজন।
আর বাকিরাও রঙের সামঞ্জস্য রেখে ভিন্ন ভিন্ন নকশার শাড়িতে নিজেদের সাজিয়ে নিয়েছে।
সবাই ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছে, শুধু অভ্রের অপেক্ষায়।
হঠাৎই আফসানা বেগম মুচকি হেসে এগিয়ে এলেন রাহার কাছে। তারপর দুই হাত ঘুরিয়ে নজর কাটার ভঙ্গিতে থু থু দিয়ে বললেন,
— “আল্লাহ আমার ছেলের বউটাকে সব বদনজর থেকে হেফাজত করুন। কারও কুদৃষ্টি যেন না লাগে আমার পরীর মতো বউমার গায়ে।”
তার কথায় রাহার গাল লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। মাথা নিচু করে মৃদু হাসল সে।
আফসানা বেগম গর্বভরা কণ্ঠে রাহার দিকে তাকিয়ে ইচ্ছে করেই বলতে শুরু করলে,
— “আমার ছেলে কিন্তু ছোটবেলা থেকেই সবার থেকে আলাদা। আমার ছেলে আমার গর্ব, আমার অহংকার। আমার ছেলের মতো ছেলে লাখে নয়, কোটিতে একটা পাওয়া যায়। আমার ছেলে কখনো ভুল মানুষকে নিজের জীবনে জায়গা দেয় না, আর যাকে একবার আপন করে নেয়, তাকে সারাজীবন বুক দিয়ে আগলে রাখে। তাই বলছি, আমার ছেলের মতো জীবনসঙ্গী পাওয়া সত্যিই সবার কপালে জোটে না। আর আমার ছেলে যেহেতু তোকে নিজের করে নিয়েছে, তাহলে বুঝে নেয় তুই কতটা ভাগ্যবতী।”
কথাগুলো শুনে রাহার ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি ফুটে উঠল।রাহা বারবার তার শাশুড়ি, অর্থাৎ বড় আম্মুর মুখে 'আমার ছেলে, আমার ছেলে' কথাটা শুনছিল। অবশেষে আর চুপ থাকতে না পেরে হঠাৎ করেই বলে উঠল—
Jab tak beta mummy bole
Tab tak beta tera hai
Tab tak beta tera hai
Ab tera beta darling bole
Ab tera beta mera hai
Ab tera beta mera hai
Beta beta mat kar saasu
Ab tera beta mera hai!
রাহার মুখে এমন গান শুনে সবাই প্রথমে হতবাক হয়ে গেল। যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য পুরো পরিবেশটাই চুপ হয়ে গেলো। পরক্ষণেই চারপাশ জুড়ে হাসির ফোয়ারা ছুটে গেল।
রাহার বড় আম্মু তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বললেন, — 
"আহা! এ তো দেখি একেবারে ডাঁটপাকা মেয়ে! বয়সটা যতই কম হোক, কথাবার্তা আর চালচলনে একেবারে পাকা! মেয়েটা যেমন চটপটে, তেমনি ভীষণ দুষ্টুও!"
তার কথা শেষ হতেই উপস্থিত সবাই আবারও হো হো করে হেসে উঠল। কেউ হাসতে হাসতে পেট চেপে ধরেছে, কেউ চোখের কোণে জমে ওঠা পানিটুকু মুছে নিচ্ছে।
আর এদিকে রাহা? লজ্জায় যেন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চাইছে। তার ফর্সা গাল দুটো টকটকে লাল আভায় রাঙা হয়ে উঠেছে। মাথা নিচু করে সে ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর অসহায় দৃষ্টিতে একবার সবার দিকে তাকাচ্ছে ।
তখনই সবাই দেখতে পেল, অভ্র ধীর পায়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তার পরনে সাদা পাঞ্জাবির ওপর অলিভ রঙের নকশাদার কোটি, পায়ে কালো লোফার। 
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রাহার দিকে তাকিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে সে মুচকি হেসে বলে উঠল,
— "ইয়েস, জান! আই অ্যাম অলওয়েজ রেডি টু কল ইউ… ডার্লিং।"
অভ্রের কণ্ঠস্বর কানে যেতেই রাহা লজ্জায় মাথা আরও নিচু করে ফেলল। আর অভ্র এসে তার ঠিক পাশে দাঁড়াতেই যেন চারপাশের সমস্ত আলো-ঝলমল, কোলাহল আর মানুষের ভিড়কে হার মানিয়ে দিল তাদের জুটি। দু'জনকে পাশাপাশি দেখে উপস্থিত সবার দৃষ্টি মুহূর্তেই তাদের ওপর গিয়ে স্থির হলো।
চারদিকে হাসি-ঠাট্টা, খুনসুটি আর আনন্দের রেশ আরও গাঢ় হয়ে উঠল। আর সেই প্রাণোচ্ছল পরিবেশের মাঝেই লজ্জায় রাঙা রাহার মুখখানা যেন সবার ঠোঁটে নতুন করে হাসির উপলক্ষ হয়ে দাঁড়াল। তার নত চোখ, লাল হয়ে ওঠা গাল আর মিষ্টি অপ্রস্তুত ভাব মুহূর্তটাকে আরও মোহময়, স্নিগ্ধ ও হৃদয়ছোঁয়া করে তুলল।
___________
মাহাদী আর বাঁধন তৃপ্ত মুখে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলো। তাদের চোখেমুখে ফুটে উঠেছে এক অদ্ভুত উল্লাস। পরিকল্পনার অর্ধেক ইতোমধ্যেই সফল হয়েছে, আর বাকি অংশটুকুও এই দু'দিনের মধ্যেই সম্পন্ন হয়ে যাবে।
তারপর… তাদের বহু প্রতীক্ষিত মানুষ দু'জনও আর দূরে থাকবে না।
একবার পরস্পরের দিকে তাকাতেই দু'জনের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক রহস্যময়, কুটিল হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিতে যেন লুকিয়ে ছিল কোনো অজানা ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত, কোনো গোপন পরিকল্পনার বিজয়ের পূর্বাভাস।
চলবে……

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন