#আড়ালে_আবডালে_শুধুই_তুই
#কলমে_রাহা_ইসলাম
#পর্ব_৫১(দ্বিতীয় অংশ)
আরাফ শিকদারের এমন রূপ দেখে
রাহার বাবা বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠলেন,
— "আপনি এমন করছেন কেন?"
— "কেমন করছি?"
— "আপনার আচরণ, ভঙ্গি—কোনোটাই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। আপনার মানসিক অবস্থাও মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।"
আরাফ শিকদার ঠোঁটের কোণে এক শীতল, রহস্যময় হাসি টেনে বরফশীতল কণ্ঠে বলল,
— "কারণ, তোর সামনে আজ স্বয়ং মৃত্যুদূত দাঁড়িয়ে আছে।"
রাহার বাবার চোখ বিস্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে উঠল।
— "মানে...!
— "হ্যাঁ। তোকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আমি অনেক আগেই নিয়ে ফেলেছিলাম।যেদিন আমরা ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে একসঙ্গে রওনা দিয়েছিলাম, সেদিনই পুরো পরিকল্পনাটা মাথায় এঁকে ফেলেছিলাম। আজ এখানে আসার আগেই সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত করে রেখেছিলাম। পরিকল্পনা ছিল–মাহাদী আর আমি তোর সঙ্গে বের হব, কিন্তু মাঝপথে আমি আর আমার ছেলে আগে নেমে যাব। এরপর পরিকল্পিত সড়ক দুর্ঘটনার মাধ্যমে তোর মৃত্যুকে নিছক দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া হবে।"
হঠাৎই থেমে তার ঠোঁটের কোণে আরও নিষ্ঠুর এক হাসি ফুটে উঠল।
"মানুষ যখন রাগে অন্ধ হয়, তখন শয়তানের আর বেশি কিছু করতে হয় না।”
— "তবে শেষ পর্যন্ত আর সেই ঝামেলাও করতে হলো না। ভাগ্য যেন আমার পক্ষেই ছিল। অভ্র নিজের হাতেই পুরো কাজটা আমার জন্য অনেক সহজ করে দিয়েছে। আমার আর হাত নোংরা করারও প্রয়োজন পড়েনি।”
রাহার বাবা রাগ আর অবিশ্বাসে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠলেন,
— "তুই পাগল হয়ে গেছিস নাকি, বাস্টার্ড! কীসব প্রলাপ বকছিস? আমি তোর কী ক্ষতি করেছি যে আমার প্রাণটাই নিতে চাইছিস?"
আরাফ শিকদার ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের হাসি টেনে শীতল কণ্ঠে বলল,
— "ক্ষতি? আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সর্বনাশটাই তুই করেছিস। মীরসরাইয়ে যে বিশাল ফ্যাক্টরিটা আমার হওয়ার কথা ছিল, যার জন্য কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছি, বছরের পর বছর পরিকল্পনা করেছি, সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন ছিল—শেষ মুহূর্তে তোর ভাই 'দিচ্ছি, দিচ্ছি' বলে পুরো প্রজেক্টটাই তোর হাতে তুলে দিল। বল তো, এটা কি ন্যায় হয়েছে? আমার জায়গায় তুই থাকলে কি এটা মেনে নিতে পারতিস?"
রাহার বাবা হতবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছে না।
কিছুক্ষণ পর তিনি কষ্টভরা গলায় বললেন,
— "এই সামান্য সম্পত্তি আর ব্যবসার জন্য তুই এতটা নিচে নেমে গেছিস? একজন নির্দোষ মানুষকে খুন করার পরিকল্পনা করেছিস? লোভ তোকে মানুষ থেকে অমানুষ বানিয়ে দিয়েছে, আরাফ!"
আরাফ শিকদার মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— "না... এখনও সব শেষ হয়নি। অভ্র আমার কাজটা আরও সহজ করে দিয়েছে। ছেলেটার জেদটা সত্যিই প্রশংসা করার মতো। তবে সেই জেদই ওর মৃত্যুর কারণ হবে।"
সে চোখে হিংস্র দৃষ্টি নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— "ভাবছি, তোকে সরানোর পর অভ্রকেও চিরতরে শেষ করে দিই। এক ঢিলে দুই পাখি মারা হবে। তখন আমার পথে আর কোনো বাধাই অবশিষ্ট থাকবে না।”
রাহার বাবা রক্তচক্ষু করে গর্জে উঠলেন,
— "খবরদার! আমার অভ্রের নাম মুখেও আনবি না। আমার যদি কিছু হয়, এই ছেলেটাই তোকে ছেড়ে কথা বলবে না। ওকে আমার চেয়ে ভালো আর কেউ চেনে না। ও নিজের মানুষকে রক্ষা করতে নিজের জীবনটাও বাজি রাখতে দ্বিধা করবে না।"
কথা শেষ হতেই আরাফ শিকদার অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
— "হা... হা... হা...! এত বিশ্বাস? ঠিক আছে, একেবারে মেরে ফেলব না। তবে এমন শাস্তি দেব, বেঁচে থেকেও প্রতিটি নিঃশ্বাসে মৃত্যুর যন্ত্রণা অনুভব করবে। তিলে তিলে ক্ষয়ে যাবে, প্রতিটি ক্ষণে নিজের অস্তিত্বকে অভিশাপ দেবে। আমার ছেলেকে মারার দুঃসাহস দেখিয়েছে, তাই না?"
রাহার বাবা তড়িঘড়ি করে বললেন,
— "দেখ, অভ্র এখনও ছোট। রাগের মাথায় ভুল করে ফেলেছে। ইচ্ছে করে কিছু করেনি।"
আরাফ শিকদারের চোখে তখন প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে।
— "ওর হয়ে আর সাফাই গাইতে হবে না। আমি সব জানি। আর এখন প্রমাণও আমার হাতেই আছে।"
সে পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি টেনে বলল,
— "এই নে... নিজের চোখেই দেখে নে।"
ফোনের স্ক্রিনটা রাহার বাবার সামনে তুলে ধরতেই ভিডিওটি চলতে শুরু করল।
ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—প্রচণ্ড রাগে অভ্র আরাফ শিকদারকে ধাক্কা দিচ্ছে। ধাক্কা খেয়ে আরাফ নিচে পড়ে যাচ্ছে। অভ্র তাকে ধরে রেখেছিল কিংবা তিনি নিচে ঝুলে ছিলেন—সেই অংশটুকুর কোনো অস্তিত্বই নেই। পুরো ঘটনাটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন অভ্র ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছে।
আরাফ শিকদার শয়তানি হাসি হেসে বলল,
— "বলেছিলাম না? একটা ভিডিও কত সহজে সত্যিকে মিথ্যায়, আর মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করতে পারে। এবার দেখ, এই ভিডিও দিয়েই কীভাবে অভ্রর জীবনটা আমি ধ্বংস করে দিই।"
রাহার বাবা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও চোখে চোখ রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলেন,
— "মৃত্যু সামনে দাঁড়িয়ে আছে বলেই কি ভেবেছিস আমি ভেঙে পড়ব? ভুল ভাবছিস। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও আমার সাহস, আমার তেজ এক বিন্দুও কমেনি।”
রাহার বাবা ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
— "বাঘ মৃত্যুর মুখেও মাথা নত করে না, আরাফ। ওরা মরতে জানে, ভয় পেতে নয়।”
কথাটি শুনেই আরাফ শিকদার উচ্চস্বরে হেসে উঠল।
— "ওহ্ তাই নাকি? তাহলে দেখ, সেই বাঘকে আমি কীভাবে অসহায় বিড়ালে পরিণত করি। যদি তা না পারি, তবে আমার নামও আরাফ শিকদার নয়!"
বলেই তার চোখে জ্বলে উঠল উন্মত্ত প্রতিহিংসার আগুন। কণ্ঠস্বর আরও কঠোর, আরও বিষাক্ত হয়ে উঠল।
— "তুই মরবি। তারপর তোর ছোট ভাই। এরপর অভ্র। একে একে সবাই।"
সে ঠান্ডা হাসল।
— "শেষে তোর মেয়েটাকে আমার ছেলের বউ বানাব। তখন তোর সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র মালিক হবে আমার পরিবার।"
আরাফ ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
— "মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর হলো—সব হারিয়ে বেঁচে থাকা। অভ্রকে আমি সেই শাস্তিই দেব।ওকে আমি এমনভাবে ধ্বংস করব, যাতে সে নিজের নামটাও ভুলে যায়। ওর সম্মান, পরিচয়, ভবিষ্যৎ—সব ছাই করে দেব। ওকে এমন অসহায় করে তুলব যে নিজের বাড়িতেও তার ঠাঁই হবে না। সবাই ওকে ঘৃণার চোখে দেখবে।"
আরমান খান মরিয়া হয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠলেন,
— "দেখ আরাফ... আমার যা কিছু আছে—ফ্যাক্টরি, ব্যবসা,জমিজমা,সম্পত্তি—সবকিছু তোকে লিখে দেব। তবু প্লিজ, এমনটা করিস না। আমার অভ্রের কোনো ক্ষতি করিস না... আমার ছোট ভাইয়ের দিকেও হাত বাড়াবি না। আমি সব ছেড়ে দিতে রাজি আছি।"
আরাফ শিকদার ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— "হুঁ! এখন প্রাণের ভয়ে এসব বলছিস। পরে সুযোগ পেলেই আবার আমার গলায় ছুরি ধরবি। আমি কি এতটাই বোকা?"
আরমান খান অসহায় দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় আবার বললেন,
— "বিশ্বাস কর... আমি কথা দিচ্ছি। আমার সমস্ত সম্পত্তি তোকে দিয়ে দেব। শুধু আমার পরিবারটার কোনো ক্ষতি করিস না।"
কথাটা শেষ করারও সুযোগ পেলেন না তিনি।
আরাফ শিকদারের ঠোঁটের কোণে বিকৃত হাসি ফুটে উঠল।
ধীরে ধীরে সে মুঠিটা আলগা করে দিল।
– “আআআআ...!”
বুকফাটা সেই চিৎকারটা মুহূর্তেই পাহাড়ের বুক চিরে প্রতিধ্বনিত হলো।
এক পলকেই আরমান খানের দেহটা অতল অন্ধকার খাদের মধ্যে তলিয়ে গেল।
চারপাশে নেমে এলো এমন এক মৃত্যু-নীরবতা, মনে হলো প্রকৃতিও কয়েকটা মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেছে।
তারপর…
দূর থেকে অভ্রকে আসতে দেখেই আরাফ শিকদারের চোখে মুহূর্তের জন্য বিজয়ের ঝিলিক খেলে গেল।কিন্তু পরক্ষণেই সে নিখুঁত অভিনয়ে নিজের চেহারার ভাব পাল্টে ফেলল।
ঠোঁটের পৈশাচিক হাসিটা মুছে গেল। চোখে ফুটে উঠল নকল আতঙ্ক, আর গলা দিয়ে বের হলো ভাঙা কান্না।
ঠিক তখনই দৌড়াতে দৌড়াতে সেখানে পৌঁছে গেল অভ্র, আমান খান ও আফসানা বেগম।
সামনে তাকিয়েই অভ্র থমকে গেল।
শুধু খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে আরাফ শিকদার।
অভ্রর বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই শূন্য হয়ে গেল।
ঘামে ভিজে গেছে পুরো শরীর। বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। কিন্তু সামনে এসে চোখে পড়ল এক বিভীষিকাময় দৃশ্য।
চাচা কোথাও নেই...
খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে শুধু আরাফ শিকদার।
ঠিক তখনই যেন অভ্রর চারপাশ থমকে গেল। পৃথিবীটা নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল। চোখের মণি বিস্ফারিত, মুখের সমস্ত রক্ত যেন মুহূর্তেই শুকিয়ে গেল।
পরের মুহূর্তেই তার দুই হাঁটু ভেঙে গেল।
ধপ করে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে। কাঁপতে থাকা দুই চোখ স্থির হয়ে রইল সেই গভীর, অন্ধকার খাদটার দিকে…
পরিস্থিতি অনুধাবন করেই এক নিমেষে নিজের মুখোশ বদলে ফেলল আরাফ শিকদার। মুহূর্ত আগেও যার ঠোঁটে ছিল পৈশাচিক তৃপ্তির হাসি, পরক্ষণেই সে বুক চাপড়ে বিলাপ শুরু করল। চোখেমুখে কৃত্রিম শোকের ছাপ ফুটিয়ে অভ্রর দিকে আঙুল তুলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল,
— "অভ্র...! তুমি এটা কী করলে? কেন করলে? তোমার রাগ কি এতটাই বেশি ছিল? মাহাদী তো শুধু রাহাকে ধরতে গিয়েছিল! সেই কারণেই না হয় তোমার চাচ্চু তোমাকে একটা থাপ্পড় মেরেছিল। তাই বলে তুমি ওকে এমন ধাক্কা দিলে? তুমি কীভাবে পারলে, অভ্র? নিজের রাগের বশে তুমি একজন নির্দোষ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিলে!"
আরাফ শিকদার এমনভাবে কথাগুলো বলছিল, যেন পুরো ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সে-ই। তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া প্রতিটি অশ্রুবিন্দুও ছিল নিখুঁত অভিনয়ের অংশ।
এদিকে আমান খান ছুটে এসে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়েই বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠলেন,
— "ভাই...! আমার ভাই...!"
তিনি উন্মাদের মতো চারদিকে তাকাতে লাগলেন। কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ভাঙা কণ্ঠে বলতে লাগলেন,
— "এ কী সর্বনাশ হয়ে গেল! কীভাবে হলো এসব? আমি তো নিজের চোখে দেখলাম, তোরা দাঁড়িয়ে কথা বলছিলি। এরই মধ্যেই সবকিছু শেষ হয়ে গেল কীভাবে?"
কথাগুলো বলতে বলতে তাঁর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো। বুকের ভেতর জমে থাকা হাহাকার আর কান্না একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলো। অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি অসহায়ের মতো খাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন এখনও বিশ্বাসই করতে পারছেন না—নিজের ভাই আর নেই।
আফসানা বেগমও নিজেকে সামলাতেপারলেন না। তিনি ভেঙে পড়লেন। বুকফাটা কান্নায় চারদিক ভারী হয়ে উঠল। চোখের পানি মুছতে মুছতে কাঁপা কণ্ঠে বলতে লাগলেন,
— "না...! এটা হতে পারে না। আমার ছেলে এমন কাজ কোনোদিনও করতে পারে না। আমি আমার অভ্রকে চিনি। ও রাগ করতে পারে, প্রতিবাদ করতে পারে, কিন্তু ইচ্ছে করে একজন মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে না। কখনোই না...!"
আরাফ শিকদার গম্ভীর মুখ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ধীরে ধীরে নিজের মোবাইল ফোনটি বের করে সবার সামনে তুলে ধরল।
— "বিশ্বাস না হলে নিজেরাই দেখুন।"
ভিডিওটি চালু হতেই সবার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল ফোনের স্ক্রিনে।
ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—অভ্র প্রচণ্ড রাগের মাথায় আরাফ শিকদারকে ধাক্কা দিচ্ছে। ধাক্কা খেয়ে তিনি নিচের দিকে পড়ে যাচ্ছেন...
ঠিক তখনই ভিডিওটি হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল।
পরবর্তী অংশ—যেখানে সত্যিটা লুকিয়ে ছিল, যেখানে অভ্র তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল—সেটা আর কেউ দেখতে পেল না। নিখুঁতভাবে সম্পাদিত সেই ভিডিও পুরো ঘটনাটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করছিল, যেন সমস্ত দোষ একমাত্র অভ্ররই।
ভিডিওটি শেষ হতেই চারপাশে নেমে এলো এক দমবন্ধ করা নীরবতা।
এখন কী হবে?
রাহাকে কী বলা হবে?
সাথীকে কীভাবে এই ভয়ংকর খবর জানানো হবে?
ঘটনাটি যদি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সবাই তো অভ্রকেই দোষী ভাববে। আইনও হয়তো প্রথমে এই ভিডিওকেই প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করবে। যদিও সে এখনও প্রাপ্তবয়স্ক নয়, তবুও আইনি জটিলতা, বিচার, জিজ্ঞাসাবাদ আর সমাজের নির্মম অভিযোগ—সবকিছুর ভার গিয়ে পড়বে তার কাঁধে।
আফসানা বেগমের বুকটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছিল।
একদিকে নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে পরিবারের ওপর নেমে আসা অকল্পনীয় বিপর্যয়।
একজন মা হয়ে তিনি কোন দিকটা সামলাবেন?
ছেলের নির্দোষিতা প্রমাণ করবেন, নাকি পরিবারের এই অসহনীয় শোককে বুকে নিয়ে বেঁচে থাকার শক্তি খুঁজবেন?
এ যেন এমন এক দুঃস্বপ্ন, যেখান থেকে জেগে ওঠারও কোনো উপায় নেই।
এতক্ষণ ধরে একের পর এক মিথ্যা অভিযোগ, অপবাদ আর নির্মম নাটক নীরবে সহ্য করছিল অভ্র। কিন্তু আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারল না। বুকের ভেতর জমে থাকা ক্রোধ যেন মুহূর্তেই আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হলো।
চারপাশে চোখ পড়তেই মাটিতে পড়ে থাকা ইটের একটি ভাঙা টুকরো তুলে নিল সে।
পরের মুহূর্তেই সমস্ত শক্তি দিয়ে সেটি ছুড়ে মারল আরাফ শিকদারের কপাল লক্ষ্য করে।
ঠাস!
ইটের টুকরোটি সজোরে গিয়ে আঘাত করল তার কপালে।
— "আআআআআ...!"
বিকট আর্তচিৎকার দিয়ে কপাল চেপে ধরল আরাফ শিকদার। আঘাতের স্থানে সঙ্গে সঙ্গেই রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এলো। টলতে টলতে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল সে।
এদিকে অভ্র যেন আর নিজের মধ্যে নেই। রক্তাভ চোখ, ফুলে ওঠা শিরা, ক্ষোভে কাঁপতে থাকা শরীর নিয়ে হিংস্র বাঘের মতো আরাফ শিকদারের দিকে তেড়ে গেল।
ঠিক তখনই আফসানা বেগম আর আমান খান ছুটে এসে দুজন মিলে শক্ত করে তাকে আটকে ধরলেন।
তবুও অভ্র ছটফট করতে করতে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল। ক্রোধে তার পুরো শরীর কাঁপছে।
— " ছাড়ো আমাকে! আজ এই কুত্তার বাচ্চাকে আমি জীবিত ছাড়ব না! জানোয়ার! তুই-ই আমার চাচ্চুকে মেরেছিস! তুই-ই আমাকে ওখান থেকে সরিয়ে দিয়েছিলি! তুই-ই তো বলেছিলি বাবা-মাকে ডেকে আনতে! সবকিছু তুই পরিকল্পনা করে করেছিস! এখন আবার আমার ওপর মিথ্যে অপবাদ চাপাচ্ছিস? কেন? কেন এত মিথ্যে বলছিস? বল! আজ তোকে আমি ছাড়ব না!"
প্রতিটি শব্দের সঙ্গে অভ্র আরও উন্মত্ত হয়ে উঠছিল। তার চোখ থেকে টপটপ করে অশ্রু ঝরছে, কিন্তু সেই অশ্রুর চেয়েও ভয়ংকর ছিল তার বুকভরা ক্রোধ, অসহায়ত্ব আর প্রিয় মানুষকে হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণা।
কপাল থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত হাতের তালু দিয়ে মুছতে মুছতে আরাফ শিকদার অসহায় ভঙ্গিতে আমান খান ও আফসানা বেগমের দিকে তাকিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
— দেখেছেন, ভাই সাহেব? দেখেছেন, ভাবি? ছেলেটা কতটা উগ্র হয়ে গেছে! এখনও ওর রাগ একটুও কমেনি। আমি তো শুধু ওনাকে বাঁচাতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ততক্ষণে উনি নিচে পড়ে যাচ্ছিলেন। বলুন, তখন আমি আর কী-ই বা করতে পারতাম?
তার প্রতিটি শব্দে ছিল সুচারুভাবে সাজানো অসহায়ত্ব; অথচ অন্তরে সে যেন নিজের ষড়যন্ত্রের সাফল্যে উল্লসিত হচ্ছিল।
এমন নির্লজ্জ মিথ্যাচার শুনে অভ্রর শরীর রাগে কাঁপতে লাগল। তার চোখ দুটো রক্তিম হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছিল, আর এক মুহূর্ত সুযোগ পেলেই সে লোকটার গলা চেপে ধরবে।
ঠিক তখনই...
ঠাস!
আমান খানের হাতের সজোর চড় এসে পড়ল অভ্রর গালে।
আঘাতের তীব্রতায় অভ্র কয়েক পা পিছিয়ে গেল। সে অবিশ্বাসে নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
পরক্ষণেই বুকফাটা কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল,
— ওই জানোয়ারটা মিথ্যে বলছে! আমি ধাক্কা দিইনি! আমি শুধু চাচ্চুর হাতটা সরাতে গিয়েছিলাম। চাচ্চু ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যেতে নেয়। কিন্তু উনি পুরোপুরি পড়ে যাননি! আমি নিজেই ওনাকে ধরে রেখেছিলাম। বারবার এই লোকটাকে সাহায্য করতে বলেছি। ও ইচ্ছে করেই সাহায্য করেনি... ও-ই চাচ্চুকে মেরে ফেলেছে!
অভ্রর কণ্ঠে ছিল সত্যের আর্তনাদ। কিন্তু সেই সত্যকে সমর্থন করার মতো কোনো প্রমাণ তার হাতে ছিল না।
কারণ ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য।
সেখানে শুধু অভ্রর ধাক্কা দেওয়ার মুহূর্তটুকুই রয়েছে। এরপর কী ঘটেছিল, কীভাবে সে চাচ্চুকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল—সেই অংশটুকু পরিকল্পিতভাবে কেটে ফেলা হয়েছে।”
আফসানা বেগম আর আমান খান ছেলের চোখের ভাষা দেখে বুঝতে পারছিলেন, সে মিথ্যে বলছে না। কিন্তু ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নির্মম দৃশ্য যেন তাদের বিশ্বাসকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছিল।
একদিকে সন্তানের প্রতি অগাধ আস্থা...
অন্যদিকে চোখের সামনে থাকা সেই ভিডিও—যেটি যেন অভ্রকেই অপরাধী প্রমাণ করছে।
ভেঙে পড়লেন আমান খান।
কাঁপতে কাঁপতে তিনি এগিয়ে গিয়ে আরাফ শিকদারের দুই হাত শক্ত করে ধরে অনুনয়-বিনয়ের সুরে বললেন,
— ভাই সাহেব... আমি আপনার কাছে হাতজোড় করে অনুরোধ করছি। দয়া করে এই ঘটনাটা কাউকে বলবেন না। একটু সময় দিন... প্লিজ।
বাবার কথা শুনে অভ্র যেন বজ্রাহত হয়ে গেল।
— বাবা! তুমি ওর কাছে মিনতি করছ কেন? আমি কিছুই করিনি! আমি নির্দোষ!
আমান খান দাঁতে দাঁত চেপে কঠোর কণ্ঠে বললেন,
— তুই চুপ কর, অভ্র!
— কেন চুপ থাকব? আমি তো কোনো অপরাধ করিনি! আমি সত্যি বলছি!
এবার আমান খানের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।
— তোর মুখের কথায় কী হবে? মানুষ কথা নয়, প্রমাণ বিশ্বাস করে। আর প্রমাণ... প্রমাণ তো আজ তোর বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়ে আছে!
বাবার মুখে এমন নির্মম কথা শুনে অভ্র নির্বাক হয়ে গেল।
মুহূর্তের জন্য মনে হলো, তার পায়ের নিচের মাটিটাও যেন সরে গেছে।
যেখানে পুরো পৃথিবী তাকে ভুল বুঝলেও সে বিশ্বাস করেছিল—অন্তত তার বাবা তাকে বিশ্বাস করবেন।
কিন্তু আজ...
নিজের বাবার কণ্ঠেই সে শুনল সন্দেহের রায়।
সেই মুহূর্তে অভ্রর চোখের ভেতরকার আলো যেন নিভে যেতে শুরু করল।
অভ্রর ঠোঁট কাঁপছিল। চোখ দুটো অশ্রুতে ঝাপসা হয়ে এসেছে। বাবার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাঙা, কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল,
— "তুমি... তুমি আমায় বিশ্বাস করো না, বাবা...?"
কথাটি উচ্চারণ করতেই যেন বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত বেদনা একসঙ্গে ভেঙে পড়ল। চোখ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়তে লাগল অশ্রু।
তার কণ্ঠে ছিল না কোনো রাগ, না কোনো প্রতিবাদ—ছিল শুধু ভেঙে যাওয়া এক সন্তানের অসীম যন্ত্রণা আর প্রিয় বাবার বিশ্বাস হারানোর গভীর আর্তনাদ।
— "পুরো পৃথিবী আমার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেলেও আমি কখনো ভাবিনি, তুমি আমাকে অবিশ্বাস করবে। তুমি তো জানো, আমি কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু করতে পারি না। তুমি-ই যদি আমাকে বিশ্বাস না করো, তাহলে আমি কার কাছে আমার নির্দোষিতা প্রমাণ করব, বাবা?"
সেই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার ভাষা যেন মুহূর্তের জন্য হারিয়ে ফেললেন আমান খান।
আমান খান চোখ বন্ধ করে গভীর এক শ্বাস নিলেন। বুকের ভেতরটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে, তবুও কঠিন বাস্তবতাকে সামনে রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
— বিশ্বাস করি... কিন্তু এই মুহূর্তে শুধু বিশ্বাস দিয়ে কিছু হবে না। এখন পরিস্থিতি আমাদের বিরুদ্ধে। তুই আর একটা কথাও বলবি না। আমাকে সবকিছু সামলাতে দে।
কথাগুলো ছিল কঠোর, কিন্তু প্রতিটি শব্দের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অসহায় বাবার অসহনীয় যন্ত্রণা।
অভ্র নির্বাক হয়ে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে তাকাল আফসানা বেগমের দিকে।
তার চোখে তখন একটাই আকুতি—মা... অন্তত তুমি আমাকে বিশ্বাস করো।
কিন্তু আফসানা বেগমও নির্বাক। চোখ বেয়ে শুধু অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। পরিস্থিতির নির্মমতা যেন তাঁর মুখের সমস্ত ভাষা কেড়ে নিয়েছে।
মায়ের সেই নীরবতা অভ্রর বুকের ভেতর শেষ আশার প্রদীপটুকুও নিভিয়ে দিল।
সে তিক্ত এক হাসি হেসে মাথা নিচু করল। তারপর অশ্রুসিক্ত চোখে দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠল,
— ঠিক আছে... যখন তোমরা কেউই আমাকে বিশ্বাস করছ না, তখন আমার নির্দোষিতা আমাকে নিজেকেই প্রমাণ করতে হবে। আমি নিজেই পুলিশের কাছে যাব। আমি নিজেই সব বলব। আমি পালিয়ে বেড়ানোর মানুষ নই। যদি অপরাধী হই, শাস্তি মাথা পেতে নেব। আর যদি নির্দোষ হই, তাহলে সত্য একদিন না একদিন অবশ্যই প্রকাশ পাবে।
কথাগুলো বলার সময় অভ্রর কণ্ঠ কেঁপে উঠছিল, কিন্তু তার চোখে তখন ফুটে উঠেছিল এক অদম্য দৃঢ়তা। নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করার সংকল্প যেন তাকে মুহূর্তেই আরও কঠিন, আরও অটল করে তুলেছিল।
ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে এল পুলিশের সাইরেনের শব্দ।
আরাফ শিকদারের ঠোঁটের কোণে আবারও ফুটে উঠল সেই চিরচেনা হাসি।
চলবে……