ফন্ট সাইজ:
থিম:
আড়ালে আবডালে শুধুই তুই

৫৬তম পর্ব

লেখক: রাহা ইসলাম

#আড়ালে_আবডালে_শুধুই_তুই 

#কলমে_রাহা_ইসলাম 
#পর্ব_৫১ (তৃতীয় অংশ) 
পুলিশকে আগেই ফোন করে পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন আরাফ শিকদার। অল্প সময়ের মধ্যেই দূর থেকে পুলিশের সাইরেনের তীক্ষ্ণ ও কর্কশ শব্দ ভেসে এলো।
সেই শব্দ কানে পৌঁছাতেই অভ্রের বাবা-মায়ের হৃদয় যেন মুহূর্তেই কেঁপে উঠল। আতঙ্ক, দুশ্চিন্তা এবং অনিশ্চয়তার এক শীতল স্রোত তাদের গ্রাস করল। তাদের একমাত্র সন্তান অভ্র—যে তাদের সকল স্বপ্ন, আশা এবং জীবনের প্রধান অবলম্বন। যদি এই মিথ্যা অপবাদ, কুৎসা ও ষড়যন্ত্রের জালে সে জড়িয়ে পড়ে, তবে তার ভবিষ্যৎ, সম্মান ও ক্যারিয়ার মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে।
আফসানা খান কাঁপা ও উদ্বিগ্ন কণ্ঠে এগিয়ে এসে বললেন,
— "এসব কী বলছ, বাবা? আমরা তোমাকে বিশ্বাস করি... সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করি।"
অন্যদিকে পরিস্থিতির ভয়াবহতা তাৎক্ষণিকভাবে অনুধাবন করলেন আমান খান। তাঁর অভিজ্ঞ দৃষ্টি এক ঝলকেই বুঝে নিল—এ মুহূর্তে আবেগ নয়, প্রয়োজন সুপরিকল্পিত বিচক্ষণতা। তিনি নীরবে ইশারা করলেন, যেন অভ্রকে দ্রুত বাড়ির ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। কারণ এই মুহূর্তে সে এখানে থাকলে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পরিবর্তে আরও উত্তপ্ত ও বিস্ফোরক হয়ে উঠতে পারে। উত্তেজিত জনতা, পুলিশের উপস্থিতি এবং ষড়যন্ত্রকারীদের কূটচালের মধ্যে সামান্য ভুলও পুরো ঘটনাকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা আর নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না।
অভ্র ধীর, ভারাক্রান্ত পদক্ষেপে এগিয়ে গেল ঠিক সেই স্থানের দিকে, যেখানে কয়েক মুহূর্ত আগেও তার চাচ্চু দাঁড়িয়ে ছিলেন। খাদের অতল গহ্বরের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে। দু’চোখ বেয়ে অনবরত অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছে, অথচ মুখে নেই কোনো আর্তনাদ—নিস্তব্ধতাই যেন তার বুকভাঙা যন্ত্রণার ভাষা হয়ে উঠেছে।
কিছুক্ষণ পর ভাঙা, রুদ্ধ কণ্ঠে সে বলল,
— "বাবা... দ্রুত ফোর্সের ব্যবস্থা করুন। যা করা প্রয়োজন করুন... আমি আমার চাচ্চুকে চাই। তাঁকে যেভাবেই হোক ফিরিয়ে আনুন।"
কথাগুলো বলেই যেন অভ্রের ভেতরের শেষ আশ্রয়টুকুও ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
সেদিনের পর থেকেই অভ্র তার বাবা-মাকে ‘তুমি’ নয়, ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করা শুরু করল। একটি মাত্র ঘটনার অভিঘাত তার সম্পর্কের সমীকরণ, অনুভূতি এবং সম্বোধনের উষ্ণতাকেও নিঃশব্দে বদলে দিয়েছিল।
এরপর আর একটি শব্দও উচ্চারণ না করে সে ধীর পায়ে সেখান থেকে চলে গেল। আফসানা বেগমও উৎকণ্ঠায় তার পিছু নিলেন। এই মুহূর্তে ছেলেটির মানসিক অবস্থা এতটাই বিপর্যস্ত যে, তিনি আশঙ্কা করছিলেন—কোনো আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত না নিয়ে বসে।
অন্যদিকে আমান খান একজন চেয়ারম্যান হওয়ায় প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত সুদৃঢ়। তিনি বিলম্ব না করে সরাসরি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে অতি দ্রুত উদ্ধারকারী বাহিনী ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল।
এদিকে পুলিশকে এগিয়ে আসতে দেখে মুহূর্তের জন্য আরাফ শিকদারের বুকের ভেতর অস্বস্তির ঢেউ বয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের কুটিল বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে সে মুখে উৎকণ্ঠার মুখোশ পরে উচ্চস্বরে বলে উঠল,
— "আমার বিজনেস পার্টনার এইমাত্র খাদে পড়ে গেছেন! আপনাদের তো সব জানিয়েছি।দয়া করে দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করুন। এক মুহূর্তও দেরি করবেন না!"
কথাগুলো বলেই সে একবার আমান খানের দিকে অর্থবহ দৃষ্টিতে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে যেন স্পষ্ট বার্তা লুকিয়ে ছিল—কিছুক্ষণ আগের হুমকি, উত্তেজনা ও সংঘর্ষের সমস্ত চিহ্ন সে মুহূর্তেই দক্ষতার সঙ্গে আড়াল করে ফেলেছে। এখন সে নিজেকেই উদ্বিগ্ন, নির্দোষ এবং অসহায় একজন সহকর্মী হিসেবে সবার সামনে উপস্থাপন করতে প্রস্তুত।
পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতেই আমান খান আরাফ শিকদারকে সবার আড়ালে একপাশে ডেকে নিলেন। তাঁর দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, সম্মান—সবকিছু যেন মুহূর্তেই ভেঙে পড়েছে। অসহায়, অনুনয়ভরা কণ্ঠে তিনি বললেন,
— "ভাই... অভ্র এখনও ছোট। রাগের মাথায় ভুল করে ফেলেছে। আমি আপনার কাছে অনুরোধ করছি, ভিডিওটা ডিলিট করে দিন।"
আরাফ শিকদারের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক শীতল, কুটিল হাসি।
— "বিনিময়ে আমি কী পাব?"
আমান খান কিছুক্ষণ নির্বাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
— "মানে?"
— "মানে খুবই সহজ। পৃথিবীতে কোনো কিছুরই মূল্য ছাড়া লেনদেন হয় না। আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন না, এত বড় একটা অস্ত্র আমি বিনা স্বার্থে নষ্ট করে ফেলব?"
তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— "আপনি কিছু চাইবেন, আর আমি চোখ বন্ধ করে দিয়ে দেব—এতটা বোকা আমি নই। যতই হোক, আমি আগে একজন ব্যবসায়ী... তারপর একজন শিক্ষক।"
আমান খানের চোখে ঘৃণা আর বিস্ময়ের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
— "আপনি একজন শিক্ষক হয়ে আপনার শিক্ষার্থীদেরও কি এই নীতিই শেখান? মানবতা, নৈতিকতা, বিবেক—এসব কি আপনার কাছে কেবল বইয়ের পাতায় লেখা শব্দ?"
আরাফ শিকদারের মুখের হাসিটা আরও গাঢ় হয়ে উঠল।
— "আপনাকে আমাকে নীতিকথা শোনাতে বলিনি। অতিরিক্ত কথা বললে কিন্তু এই ভিডিওটা মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়বে। তখন আপনার ছেলের সম্মান, ভবিষ্যৎ, পরিচয়—সবকিছু ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।"
কথাগুলো যেন আমান খানের বুকে ধারালো অস্ত্রের মতো বিদ্ধ হলো। ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি আর একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারলেন না। সমস্ত অপমান, ক্ষোভ আর অসহায়তা নীরবে গিলে ফেললেন।
আরাফ শিকদার এবার নিজের আসল দাবিগুলো সামনে আনল।
— "প্রথম শর্ত—আপনার ছোট ভাইয়ের ব্যবসার পঞ্চাশ শতাংশ শেয়ার আমার নামে হস্তান্তর করবেন।"
অগত্যা ছেলের ভবিষ্যৎ বাঁচানোর তাগিদে সেই অপমানজনক শর্তেও নীরবে সম্মতি জানালেন আমান খান।
কিন্তু এখানেই থামল না আরাফ শিকদার।
সে ঠান্ডা, হিসেবি কণ্ঠে বলল,
— "দ্বিতীয় শর্ত... রাহার বিয়ে হবে আমার ছেলে মাহাদীর সঙ্গে।"
এই কথাটি শুনে আমান খান স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর চোখে একসঙ্গে ফুটে উঠল বিস্ময়, করুণা এবং ঘৃণা। কিছুক্ষণ নির্বাক দৃষ্টিতে আরাফ শিকদারের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীর কণ্ঠে বললেন,
— "আপনি যা বলছেন, তা কি আপনি নিজেই উপলব্ধি করছেন? অভ্র রাহাকে ছাড়া নিজের জীবন কল্পনাও করতে পারে না। ওদের সম্পর্ক সম্পর্কে আপনি সবই জানেন।"
একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি আবার বললেন,
— "তবুও আমি একটি প্রতিশ্রুতি দিতে পারি। আগে রাহা প্রাপ্তবয়স্ক হোক। এরপর যদি সে নিজের ইচ্ছায় মাহাদীকে বিয়ে করতে চায়, আমি কখনোই বাধা দেব না। তবে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত আমি নেব না। কাউকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হবে না।"
আরাফ শিকদার কয়েক মুহূর্ত নীরবে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে বিজয়ীর হাসি ফুটিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
— "ঠিক আছে... আপাতত এটুকুই যথেষ্ট। ডিল ফাইনাল।”
সারারাত উদ্ধারকারী দল, পুলিশ এবং স্থানীয় মানুষ মিলে খাদের প্রতিটি কোণা তন্নতন্ন করে খুঁজেও আরমান খানের কোনো সন্ধান পেল না। রাত যত গভীর হতে লাগল, সবার মনেও ততই বাড়তে লাগল আশঙ্কার কালো ছায়া।
কিন্তু কেউ জানত না—সেই গভীর খাদের নিচ দিয়েই চলে গেছে একটি দুর্গম, নির্জন গোপন সড়ক। বছরের পর বছর ধরে সেই পথ ব্যবহার করে চোরাকারবারিরা অবৈধ মালামাল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাচার করে।
ঠিক সেই সময় চোরাই মালভর্তি একটি ট্রাক ধীরগতিতে সেই পথ অতিক্রম করছিল।
হঠাৎই—
ধাম!
বিকট শব্দে ওপর থেকে একটি ভারী দেহ এসে সজোরে আছড়ে পড়ল ট্রাকের মালবোঝাই অংশের ওপর। আকস্মিক অভিঘাতে পুরো ট্রাক কেঁপে উঠল।
খাদে পড়ার সময় আরমান খানের মাথা ধারালো পাথরে সজোরে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল। সেই আঘাতে মাথা ফেটে অবিরাম রক্তক্ষরণ শুরু হয়। রক্তে ভিজে যাচ্ছিল তাঁর চুল, মুখ এবং শরীর। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও ক্ষীণ শ্বাসপ্রশ্বাস তখনও চলছিল।
হঠাৎ হওয়া প্রচণ্ড শব্দে ট্রাকচালক ভড়কে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই ব্রেক কষে গাড়ি থামিয়ে দিল। কী ঘটেছে বুঝতে না পেরে সে দ্রুত ট্রাকের ওপর উঠে গেল।
উপরে উঠতেই তার চোখ বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল।
একজন মানুষ রক্তাক্ত অবস্থায় নিথর হয়ে পড়ে আছেন। ট্রাকের গায়ে গড়িয়ে পড়া রক্ত চারপাশ লাল করে তুলছে। তবে ভালো করে লক্ষ্য করতেই বুঝতে পারল—লোকটির বুক এখনও খুব ধীরে ধীরে ওঠানামা করছে। অর্থাৎ তিনি এখনও বেঁচে আছেন।
চালক তাড়াতাড়ি তার কাছে ছুটে গেল। আরমান খান তখন উপুড় হয়ে পড়ে ছিলেন এবং অস্পষ্টভাবে যেন কিছু বিড়বিড় করছিলেন। লোকটি সাবধানে তাঁকে সোজা করে শুইয়ে দিল।
রক্তে ঝাপসা, নিভু-নিভু চোখদুটি কষ্ট করে একবার খুললেন আরমান খান। তাঁর ঠোঁট কাঁপছিল, নিঃশ্বাস ছিন্নভিন্ন হয়ে আসছিল। ট্রাকচালক কানটা তাঁর মুখের কাছে নিয়ে যেতেই ক্ষীণ, ভাঙা স্বরে কয়েকটি শব্দ ভেসে এলো—
— "আমাকে... বাঁচান... আমার... একটা ছোট্ট মেয়ে আছে... আমাকে অভ্রকে বাঁচান... ওরা... ওরা আমাকে মেরে ফেলবে..."
এইটুকুই।
এরপরই তাঁর চোখ দুটো ধীরে ধীরে বুজে এলো। শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ল। তিনি গভীর অচেতনতার অতল অন্ধকারে তলিয়ে গেলেন।
রক্তাক্ত, অচেতন মানুষটির অসহায় অবস্থা দেখে ট্রাকচালকের বুকটা হুহু করে উঠল। মুহূর্তের জন্য সে দ্বিধায় পড়লেও শেষ পর্যন্ত মানবিকতাই জয়ী হলো। নিজের ট্রাকটি দ্রুত তাদের গোপন আস্তানায় ফিরিয়ে রেখে, কোনো ঝুঁকি না নিয়ে অন্য একটি গাড়ির ব্যবস্থা করল। এরপর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে আরমান খানকে নিয়ে ছুটল চট্টগ্রামের একটি অপেক্ষাকৃত নির্জন বেসরকারি হাসপাতালে।
হাসপাতালে পৌঁছাতেই কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সরা রোগীর পরিচয় জানতে চাইলেন।
নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখতেই ট্রাকচালক শান্ত কণ্ঠে বলল,
— "উনি... আমার বড় ভাই।"
— "নাম?"
এক মুহূর্ত ইতস্তত করে সে উত্তর দিল,
— "আযহার হোসেন।"
সেই পরিচয়েই হাসপাতালের কাগজপত্র সম্পন্ন করা হলো। এরপর জরুরি ভিত্তিতে শুরু হলো চিকিৎসা। একের পর এক পরীক্ষা, স্যালাইন, অক্সিজেন ও প্রাথমিক চিকিৎসা চলতে লাগল। চিকিৎসকদের পুরো দল জীবন বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ পর অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে এলেন দায়িত্বরত চিকিৎসক। তাঁর মুখের গাম্ভীর্যই পরিস্থিতির ভয়াবহতার ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
গভীর, সংযত কণ্ঠে তিনি বললেন,
— "রোগীর শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। অবিলম্বে রক্তের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে। মস্তিষ্কেও আঘাতের লক্ষণ রয়েছে। আগামী চব্বিশঘণ্টা পার না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছুই বলা সম্ভব নয়। এই সময়টুকুই সবচেয়ে সংকটাপন্ন।"
একটু থেমে তিনি আরও বললেন,
— "আরও একটি বড় সমস্যা রয়েছে... রোগীর রক্তের গ্রুপ O নেগেটিভ। এটি অত্যন্ত বিরল (রেয়ার) রক্তের গ্রুপ। যত দ্রুত সম্ভব এই গ্রুপের রক্ত সংগ্রহ করতে না পারলে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।"
ডাক্তারের প্রতিটি শব্দ যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করল ট্রাকচালকের বুকে। মুহূর্তের মধ্যেই সে বুঝে গেল—এখন শুরু হয়েছে সময়ের সঙ্গে এক নির্মম লড়াই।
ডাক্তারের কথা শেষ হতেই ট্রাকচালক এক মুহূর্তও দেরি করল না। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
— "ডাক্তার সাহেব... আমার রক্তের গ্রুপও O নেগেটিভ। প্রয়োজন হলে আমার রক্ত নিন। যতটুকু দরকার, আমি দিতে প্রস্তুত আছি।"
কথাটি শুনেই চিকিৎসকদের মুখে আশার ক্ষীণ আলো ফুটে উঠল। আর কোনো বিলম্ব না করে দ্রুত তার রক্তের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করা হলো। সবকিছু ঠিক থাকায় সঙ্গে সঙ্গেই রক্ত সংগ্রহ করে আরমান খানের শরীরে সঞ্চালন শুরু করা হলো।
রক্তদান শেষ হওয়ার পর ট্রাকচালক উৎকণ্ঠিত চোখে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— "তাহলে... উনি কি বেঁচে যাবেন?"
ডাক্তার গভীর নিশ্বাস ফেলে শান্ত কণ্ঠে বললেন,
— "এ মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। তিনি সুস্থ হয়ে উঠতেও পারেন, আবার জটিলতাও দেখা দিতে পারে। সবকিছু নির্ভর করছে আগামী চব্বিশঘণ্টার ওপর।"
একটু থেমে তিনি আবার বললেন,
— "আরেকটি বিষয়... অনেক সময় গুরুতর মস্তিষ্কে আঘাতপ্রাপ্ত রোগী পরিচিত বা আপনজনের কণ্ঠস্বর, স্পর্শ কিংবা উপস্থিতিতে ইতিবাচক সাড়া দেন। তবে এখনই কিছু নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বাকি সব মহান আল্লাহর ইচ্ছা। আপনারা দোয়া করবেন।"
ডাক্তারের কথাগুলো শুনে ট্রাকচালকের বুকটা আরও ভারী হয়ে উঠল।
একবার তার মনে হলো, সংবাদপত্র কিংবা পুলিশের মাধ্যমে এই অজ্ঞাত ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা উচিত। হয়তো তাঁর পরিবার খোঁজ পেয়ে যাবে।
কিন্তু পরক্ষণেই কানে যেন আবার প্রতিধ্বনিত হলো সেই অস্পষ্ট, কাঁপা কণ্ঠ—
"আমাকে বাঁচান... আমার একটা ছোট্ট মেয়ে আমার অভ্র আছে.আর ওরা আমাকে মেরে ফেলবে..."
কথাগুলো মনে পড়তেই তার বুকের ভেতর অজানা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। যদি সত্যিই কেউ এই মানুষটিকে হত্যা করতে চায়, তাহলে পরিচয় প্রকাশ করা মানেই হয়তো মৃত্যুকে আরও কাছে ডেকে আনা।
অবশেষে অনেক ভেবেচিন্তে সে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিল।
লোকটির প্রকৃত পরিচয় ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর—সবকিছু সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে।
এখন একটাই লক্ষ্য—
যেভাবেই হোক মানুষটিকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা।
আর সেই উদ্দেশ্যেই সে চিকিৎসকদের উদ্দেশে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— "টাকার কথা একদম ভাববেন না। যত খরচই হোক, চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা যেন না হয়। আমার ভাইকে বাঁচানোর জন্য যা যা করা দরকার, সবই করুন।”
অন্যদিকে নানার বাড়িতে ফিরেই অভ্র নিজেকে ঘরে সম্পূর্ণরূপে আবদ্ধ করে ফেলল। দরজাটি ভেতর থেকে বন্ধ করে সে নিস্তব্ধ ঘরে একা বসে ঘটনার প্রতিটি মুহূর্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে লাগল।
শৈশব থেকেই অভ্র ছিল তীক্ষ্ণ মেধাসম্পন্ন, বিচক্ষণ এবং পরিস্থিতি বিশ্লেষণে অসাধারণ দক্ষ। সামান্য অসঙ্গতিও তার দৃষ্টি এড়াত না। তাই পুরো ঘটনাটাই তার কাছে অস্বাভাবিক, পরিকল্পিত এবং রহস্যে ঘেরা বলে মনে হচ্ছিল।
কিন্তু সবকিছুর চেয়েও একটি বিষয় তার হৃদয়কে সবচেয়ে বেশি ক্ষতবিক্ষত করছিল—
তার নিজের বাবা-মাও কি তাকে বিশ্বাস করতে পারলেন না?
এই একটি প্রশ্নই বারবার তার বুকে ধারালো ছুরির মতো বিদ্ধ হচ্ছিল।
অবশেষে জমে থাকা যন্ত্রণা, ক্ষোভ, অপমান আর অসহায়তা একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলো।
প্রচণ্ড রাগে অভ্র ঘরের ভেতর যা কিছু হাতের কাছে পেল, একের পর এক ছুড়ে ভাঙচুর করতে শুরু করল। ফুলদানি, বই, টেবিল ল্যাম্প, কাচের শোপিস—মুহূর্তের মধ্যেই সবকিছু চুরমার হয়ে মেঝেজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। ঘরজুড়ে শুধু কাঁচ ভাঙার বিকট শব্দ আর তার দমবন্ধ করা আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
শব্দ শুনে আফসানা বেগমসহ বাড়ির সবাই আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ে এলেন। দরজায় অবিরাম ধাক্কা দিতে দিতে কাঁদো কাঁদো গলায় বলতে লাগলেন,
— "অভ্র... বাবা, দরজাটা খোল। প্লিজ, একবার দরজাটা খোল।"
ভেতর থেকে বজ্রগর্জনের মতো চিৎকার করে উঠল অভ্র—
— "চলে যান সবাই! কেউ আমার কাছে আসবেন না। আমি কাউকে দেখতে চাই না। কেউ দরজায় ধাক্কা দেবেন না!"
তার কণ্ঠে জমে থাকা অভিমান, ক্রোধ আর ভাঙা হৃদয়ের আর্তনাদ স্পষ্ট হয়ে উঠল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই নির্বাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ আর সাহস করে একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না।
এদিকে সারারাত ধরে উদ্ধারকারী দল, পুলিশ এবং স্থানীয় লোকজন নিরলসভাবে খাদের প্রতিটি ইঞ্চি তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোনো মরদেহের সন্ধান পেল না। যেন মানুষটি হঠাৎ করেই পৃথিবীর বুক থেকে রহস্যজনকভাবে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
অন্যদিকে খাদের নিচ দিয়ে যে গোপন সড়ক দিয়ে প্রতিদিন চোরাই মালামাল পরিবহন করা হতো, ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই সেই চক্রের সদস্যরা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে ফেলেছিল। তারা বুঝে গিয়েছিল—খুব শিগগিরই পুলিশ পুরো এলাকা ঘিরে তল্লাশি চালাবে।
ফলে রাত গভীর হওয়ার আগেই তারা সেখানে থাকা প্রতিটি ট্রাক ও যানবাহন দ্রুত সরিয়ে ফেলে। এরপর পুরো আস্তানাটি সম্পূর্ণ খালি করে প্রধান গেট শক্তভাবে বন্ধ করে দেয়। বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনো উপায়ই রইল না যে কয়েক ঘণ্টা আগেও সেখানে অবৈধ কর্মকাণ্ড চলছিল।
আর সেই কারণেই পুলিশের চোখ এড়িয়ে গেল সেই গুরুত্বপূর্ণ সূত্র—যে সূত্রটি হয়তো আরমান খানের বেঁচে থাকার একমাত্র প্রমাণ হয়ে উঠতে পারত।
সেদিন সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত উদ্ধারকারী দল, পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা নিরলসভাবে খাদের প্রতিটি অংশ গভীরভাবে তল্লাশি চালায়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান পরিচালনা করেও আরমান খানের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। অবশেষে রাত ফুরিয়ে দিনের আলো ফুটে উঠল এবং সম্ভাব্য সব স্থান পরিদর্শন সম্পন্ন হলে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করা হয়।
পরদিন দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদপত্রের শিরোনামে প্রকাশিত হয়—
"বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আরমান খান, চেয়ারম্যান আমান খানের মেজো ভাই, দুর্ঘটনাবশত ভারসাম্য হারিয়ে গভীর খাদে পড়ে নিখোঁজ।"
সংবাদে আরও উল্লেখ করা হয়—
"ঘটনার পর টানা বারো ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারী দল ব্যাপক তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করলেও এখন পর্যন্ত তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।"
উদ্ধারকারী দলের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, তিনি সম্ভবত খাদের একেবারে গভীরতম অংশে ছিটকে পড়েছেন—যেখানে পৌঁছানো অত্যন্ত দুর্গম, বিপজ্জনক এবং প্রায় অসম্ভব। এ কারণেই অধিকাংশ মানুষ ধরে নেন, আরমান খানের বেঁচে থাকার আর কোনো সম্ভাবনা নেই।
ধীরে ধীরে গুজব, কানাঘুষা এবং অনুমানই বাস্তবতার স্থান দখল করে নেয়। সবার দৃষ্টিতে আরমান খান তখন আর কেবল একজন নিখোঁজ ব্যক্তি নন—তিনি যেন এক অঘোষিত মৃত্যুর শিকার।
পরদিন ভোর হতেই অভ্র নিজের ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো। সারারাত না ঘুমানোর কারণে তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে, মুখমণ্ডলে স্পষ্ট ক্লান্তি ও মানসিক বিপর্যয়ের ছাপ স্পষ্ট।
বাইরে এসেই শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে প্রথম কথাটি বলল—
— "আমি একবার সেই খাদে যেতে চাই।"
আফসানা বেগম ছেলের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বললেন,
— "বাবা, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, উদ্ধারকারী দল—কেউ কোনো চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি। সারারাত খুঁজেও তারা কিছুই পায়নি। তুই সেখানে গিয়ে আর কী করবি?"
অভ্র কোনো আবেগ প্রকাশ না করে ঠান্ডা ও সংযত স্বরে জবাব দিল,
— "এর কৈফিয়ত আমি আপনাকে দিতে বাধ্য নই।"
ঠিক তখনই ঘরে প্রবেশ করলেন আমান খান।
গত এক রাতের ব্যবধানে যেন তিনি কয়েক বছরের বেশি বয়স্ক হয়ে গেছেন। চোখের নিচে গভীর কালচে দাগ, মুখমণ্ডলে অবসাদের ছাপ, আর বুকভরা শোক ও অসহনীয় যন্ত্রণার ভার তাঁকে সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। নিজের ভাইয়ের নিখোঁজ হওয়ার বেদনা, চারপাশের চাপ এবং অনিশ্চয়তা তাঁকে ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
ঘরে প্রবেশ করতেই অভ্রের শেষ কথাটি তাঁর কানে পৌঁছাল।
মুহূর্তের মধ্যেই জমে থাকা শোক, ক্ষোভ ও অসহায়তা বিস্ফোরিত হয়ে উঠল।
তিনি রুদ্ধ ও ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠলেন—
— "নিজেই মানুষটাকে খাদে ফেলে দিয়ে এখন আবার সেখানে যেতে চাস? কী দেখতে চাস? নিজের কাজের পরিণতি?"
বাবার মুখ থেকে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ যেন জ্বলন্ত তীরের মতো অভ্রের বুকে বিদ্ধ হলো।
সে নির্বাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আঘাত ছিল এই একটিই সত্য—
তার নিজের বাবাও তাকে বিশ্বাস করলেন না।
যে মানুষটির বিশ্বাসকে সে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় মনে করত, সেই মানুষটিই আজ কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাকে অপরাধীর আসনে দাঁড় করিয়ে দিলেন।
সেই মুহূর্তে অভ্র অনুভব করল, বাইরের পৃথিবীর ভুল বোঝাবুঝি সহ্য করা যায়... কিন্তু নিজের বাবার অবিশ্বাস একজন সন্তানের হৃদয়কে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
অভ্র আর একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। নিঃশব্দে বাবার দিকে শেষবারের মতো তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ছিল গভীর অভিমান, ভাঙা বিশ্বাস এবং অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণা।
এরপর ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।
অভ্র চলে যেতেই আফসানা বেগম নিজেকে আর সংযত রাখতে পারলেন না। ক্ষোভ, কষ্ট ও মমতার মিশ্রিত কণ্ঠে তিনি আমান খানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— "এসব আপনি কী বললেন? ছেলেটা তো বারবার বলছে, সে কিছুই করেনি। তাহলে কেন ওকে না শুনেই দোষী সাব্যস্ত করছেন? একবারও কি ওর কথাটা বিশ্বাস করার চেষ্টা করলেন না?"
আমান খান দু’হাতে নিজের মাথা চেপে ধরলেন। তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো, চোখ অশ্রুতে ভিজে উঠল।
— "তুমি বুঝতে পারছ না, আফসানা... আমার ভাই নেই! আমি কী জবাব দেব সাথীকে? কী বলব ওকে? বলব, আমি নিজের ভাইকেও রক্ষা করতে পারলাম না?"
শেষ কথাগুলো বলতে বলতে তাঁর গলা রুদ্ধ হয়ে এলো।
তিনি ক্লান্ত, ভেঙে পড়া শরীরটা সোফার ওপর এলিয়ে দিলেন। মনে হচ্ছিল, এক রাতেই জীবনের সমস্ত শক্তি, সাহস ও স্থিরতা যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে।
আফসানা বেগম আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত তাঁর পাশে এগিয়ে এলেন।
— "আপনার কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে?"
আমান খান ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে অত্যন্ত ক্লান্ত কণ্ঠে বললেন,
— "প্লিজ... আমাকে একটু একা থাকতে দাও। এখন কারও সঙ্গে কথা বলার মতো শক্তি আমার নেই।"
কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি আবার বললেন,
— "আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ঢাকায় ফিরে যাব। এখানে আর থাকার কোনো প্রয়োজন নেই..."
শেষ কথাগুলো বলার সময় তাঁর কণ্ঠে ছিল পরাজয়ের বেদনা, শোকের ভার এবং এক গভীর শূন্যতার প্রতিধ্বনি। যেন তিনি শুধু একজন ভাইকেই হারাননি—হারিয়েছেন নিজের ভরসা, নিজের শক্তি, নিজের একাংশ।
অভ্র অসাধারণ দৃঢ়তা ও অদম্য সাহস নিয়ে আবারও ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা দিল। তার চোখে তখন আর কোনো অশ্রু ছিল না—বরং ছিল সত্য উদ্ঘাটনের অটল সংকল্প।
ঘটনাস্থলে পৌঁছেই সে একজন অভিজ্ঞ অনুসন্ধানকারীর মতো চারপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ শুরু করল। রাস্তার কিনারায় দাঁড়িয়ে নিচের অতল গহ্বরের দিকে তাকাল। চোখ যতদূর যায়, ততদূর পর্যন্ত শুধু ঘন জঙ্গল, বিশাল পাথর আর মৃত্যুর মতো নীরবতা। এত গভীরে কিছুই স্পষ্টভাবে দেখা সম্ভব নয়।
কিন্তু অভ্রের দৃষ্টি সেখানে আটকে রইল না।
সে আশপাশের প্রতিটি চিহ্ন, প্রতিটি পদচিহ্ন, প্রতিটি অস্বাভাবিকতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। হঠাৎই তার নজরে এলো পাহাড়ের গা ঘেঁষে নিচের দিকে নেমে যাওয়া একটি সরু কাঁচা রাস্তা।
রাস্তার দিকে তাকিয়েই তার মনে প্রশ্ন জাগল—
"এই পথে কি নিয়মিত যানবাহন চলাচল করে?"
ভাবতে ভাবতেই সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল রাস্তার শেষ প্রান্তে থাকা লোহার গেটটির দিকে।
গেটের সামনে পৌঁছে অভ্র থমকে দাঁড়াল।
একদিন আগেও যেখানকার গেট খোলা ছিল, সেখানে এখন মোটা লোহার নতুন তালা ঝুলছে। চারপাশ লতাপাতা ও ঝোপঝাড় দিয়ে এমনভাবে ঢেকে রাখা হয়েছে, যেন বহুদিন ধরেই এটি পরিত্যক্ত।
দৃশ্যটি অভ্রের সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করে তুলল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই সূর্যের তীক্ষ্ণ আলো কোনো কিছুর ওপর প্রতিফলিত হয়ে তার চোখে এসে লাগল।
সে নিচে তাকাতেই দেখল, গেটের একপাশে ধুলোমাখা মাটির ওপর একটি সোনালি আংটি ঝকঝক করছে।
অভ্র দ্রুত সেটি হাতে তুলে নিল।
আংটিটি দেখেই তার বুক কেঁপে উঠল।
"এটি সে হাজার মানুষের ভিড় থেকেও চিনে নিতে পারবে। এটি তার চাচ্চু আরমান খানের আংটি।”
মুহূর্তের মধ্যেই তার মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো।
সে নিচু হয়ে চারপাশ আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।
তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক রহস্যময়, আত্মবিশ্বাসী হাসি।
সে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
— "তার মানে... চাচ্চু সরাসরি গভীর খাদে পড়েননি। তিনি এই রাস্তার দিকেই এসেছিলেন।"
তার দৃষ্টি আবার মাটির ওপর ছুটে বেড়াতে লাগল।
— "আর যদি সত্যিই এখানে পড়ে থাকেন... তাহলে এখানে রক্তের চিহ্ন থাকার কথা। কোনো না কোনো প্রমাণ অবশ্যই থেকে যাওয়ার কথা..."
এক মুহূর্তের জন্য সে চোখ বন্ধ করল। তারপর চোখ খুলে তার দৃষ্টি আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
কারণ সে বুঝে গেছে—
এই জায়গাটাই পুরো ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রথম সূত্র।
ভাবতেই অভ্রের ঠোঁট হাসি ফুটে উঠে,
আংটিটি দৃঢ়ভাবে মুঠোয় চেপে ধরে অভ্র এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে দ্রুত ছুটে বেড়াতে লাগল। তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল—গত রাতে কোনো অজ্ঞাত পরিচয়ের গুরুতর আহত রোগী ভর্তি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া।
তাড়াহুড়ো করে হাসপাতালের করিডোর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎই একজন মধ্যবয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে তার সজোরে ধাক্কা লাগে।
ভারসাম্য হারিয়ে অভ্র প্রায় মাটিতে পড়ে যেতে নিলে লোকটি দ্রুত হাত বাড়িয়ে তাকে দৃঢ়ভাবে ধরে ফেলেন।
লোকটির দৃষ্টি তখন নিবিড়ভাবে স্থির হয় অভ্রের মুখে।
ছেলেটির পরনের পোশাক এলোমেলো ও ধুলো-ময়লায় বিবর্ণ। চুল সম্পূর্ণ উস্কোখুস্কো। চোখের নিচে গভীর কালচে দাগ, গাল বসে গেছে, আর দু’চোখে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে কয়েক রাতের নির্ঘুম ক্লান্তি ও তীব্র মানসিক যন্ত্রণার ছাপ।
মুহূর্তেই লোকটির মনে প্রশ্ন জাগে—
"একজন অল্পবয়সী ছেলের এমন বিধ্বস্ত অবস্থা কেন?"
অভ্র নিজেকে সামলে নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে বলল,
— "ধন্যবাদ, আঙ্কেল।"
এরপর আর এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে দ্রুত সামনে এগিয়ে যেতে উদ্যত হলো।
কিন্তু লোকটি তাকে থামিয়ে শান্ত ও স্নেহময় কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
— "কী হয়েছে বাবা? তোমার এমন অবস্থা কেন?"
অভ্র মৃদু, মলিন একটুখানি হাসি দিয়ে মাথা নাড়ল।
— "কিছু না, আঙ্কেল। আমাকে সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ।"
এইটুকু বলেই সে প্রায় দৌড়ে রিসেপশনের দিকে চলে গেল।
হাঁপাতে হাঁপাতে কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
— "গত রাতে... আরমান খান নামে কোনো রোগী এখানে ভর্তি হয়েছেন?"
রিসেপশনে থাকা কর্মীরা কম্পিউটারে তথ্য যাচাই করে কিছুক্ষণ পর মাথা নেড়ে উত্তর দিলেন,
— "না, এই নামে কোনো রোগী ভর্তি নেই।"
উত্তরটি শোনামাত্র অভ্রের বুকের ভেতর যেন শেষ আশার প্রদীপটুকুও নিভে গেল। পুরো শরীর হঠাৎ করেই নিস্তেজ হয়ে এলো।
সে পাশের একটি বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়ল। মাথা দু’হাতের মাঝে চেপে ধরে নিঃশব্দে শূন্য দৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল।
এদিকে সেই মধ্যবয়স্ক ব্যক্তিটি এতক্ষণ দূর থেকেই অভ্রের প্রতিটি আচরণ গভীর মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
অবশেষে তিনি ধীর পায়ে এগিয়ে এসে অভ্রের সামনে দাঁড়ালেন।
মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি ধীরে ধীরে এসে অভ্রের পাশে বসলেন। স্নেহভরে তার মাথায় হাত রেখে নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
— "আরমান খান তোমার কে হন?"
অভ্র শূন্য দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
— "আমার চাচা।"
— "তিনি এখন কোথায়?"
অভ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচু স্বরে উত্তর দিল,
— "জানি না..."
লোকটি কপাল কুঁচকে আবার প্রশ্ন করলেন,
— "জানি না মানে কীভাবে?"
অভ্রের গলা ভারী হয়ে এলো।
— "গত রাতে... তাঁকে হারিয়ে ফেলেছি।"
__”তোমায় নাম অভ্র..?”
__ “হ্যাঁ আপনি কীভাবে জানলেন”?
কথাটি শুনে লোকটির চোখে এক ঝলক বিস্ময় ফুটে উঠল। কিছুক্ষণ নীরবে অভ্রের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি ধীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন,
— "তোমার চাচার কি কোনো শত্রু ছিল?”
অভ্র বিস্মিত চোখে তাঁর দিকে তাকাল।
— "মানে?"
লোকটি চারপাশে একবার সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে নিচু স্বরে বললেন,
— "চলো... আমার সঙ্গে আসো। তোমাকে কিছু দেখাতে চাই।"
অভ্র কিছুটা সতর্ক হয়ে গেল।
— "কিন্তু... আপনি কে?"
লোকটি শান্ত স্বরে জবাব দিলেন,
— "আমার নাম জয়নাল। তুমি আমাকে চিনবে না। তবে বিশ্বাস করো, আমি তোমার কোনো ক্ষতি করবো না।"
অভ্র কয়েক মুহূর্ত দ্বিধায় দাঁড়িয়ে রইল। তারপর অজানা এক বিশ্বাসে লোকটির সঙ্গে পা মেলাল।
কিন্তু শরীর যেন আর তার সঙ্গ দিচ্ছিল না।
গত একদিনের দিনের মানসিক আঘাত, নির্ঘুম রাত এবং অবিরাম ছুটে বেড়ানোর ক্লান্তিতে তার দুই পা প্রায় অবশ হয়ে আসছিল। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন তার জন্য অসহনীয় যন্ত্রণার সমান হয়ে উঠছিল।
দেখে মনে হচ্ছিল, যেন কেউ নির্মমভাবে তার পায়ে আঘাত করেছে। হাঁটার শক্তিটুকুও যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। তবুও নিজের সমস্ত কষ্ট উপেক্ষা করে, বুকভরা একফোঁটা আশাকে আঁকড়ে ধরে সে জয়নালের পিছু পিছু এগিয়ে চলল।
দেখে মনে হচ্ছিল, রাতভর একফোঁটা খাবারও তার পেটে পড়েনি। চোখে এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমের ছোঁয়া লাগেনি। সারারাত আর সারাদিন নিরন্তর দৌড়ঝাঁপ, উৎকণ্ঠা, কান্না আর মানসিক যন্ত্রণায় ছেলেটির শরীর যেন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। প্রতিটি পদক্ষেপেই তার ক্লান্ত, অবসন্ন শরীর টাল খাচ্ছিল; তবুও বুকভরা এক চিলতে আশাকে আঁকড়ে ধরে সে এগিয়ে চলছিল।
কিছুক্ষণ পর তারা আইসিইউর সামনে এসে দাঁড়াল।
জয়নাল ধীরে ধীরে কাচঘেরা কেবিনের দিকে আঙুল তুলে ইশারা করলেন।
— "ওদিকে তাকাও..."
কিন্তু অভ্রের চোখ যেন আর উঠছিল না। বুকের ভেতর অজানা এক ভয়, আশঙ্কা আর আতঙ্ক জমাট বেঁধে ছিল। সে যেন সাহসই পাচ্ছিল না কাচের ওপাশে তাকানোর।
মনে হচ্ছিল—
যদি যাকে দেখার জন্য এতক্ষণ ছুটে বেড়াল, তিনি সেখানে না থাকেন?
আবার পরক্ষণেই আরেকটি ভয় তাকে গ্রাস করল
যদি সত্যিই তিনি থাকেন... কিন্তু এমন অবস্থায় থাকেন, যা দেখার মতো মানসিক শক্তিও তার আর অবশিষ্ট নেই?
দু'চোখ ধীরে ধীরে ভিজে উঠল। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা ক্রমেই তীব্র হতে লাগল। তবুও কাঁপতে থাকা শরীর আর ভারী হয়ে আসা পা নিয়ে সে ধীরে ধীরে কাচের দিকে মুখ ফেরাতে শুরু করল।
চলবে……

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন