ফন্ট সাইজ:
থিম:
আড়ালে আবডালে শুধুই তুই

৫৭তম পর্ব

লেখক: রাহা ইসলাম

#আড়ালে_আবডালে_শুধুই_তুই 

#কলমে_রাহা_ইসলাম 
#পর্ব_৫১ (শেষ অংশ) 
অবশেষে বুকভরা সাহস সঞ্চয় করে অভ্র ধীরে ধীরে চোখ তুলে কাচের ওপাশে তাকাল।
পরের মুহূর্তেই তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
আইসিইউর বেডে নিথর হয়ে শুয়ে আছেন তার চাচ্চা—আরমান খান।
মুখে অক্সিজেন মাস্ক। পুরো মাথাজুড়ে মোটা ব্যান্ডেজ। শরীরের বিভিন্ন স্থানে সাদা ব্যান্ডেজের আবরণ। অসংখ্য তার ও চিকিৎসা-যন্ত্রের সঙ্গে সংযুক্ত দেহটি যেন মৃত্যুর সঙ্গে এক নীরব সংগ্রামে লিপ্ত।
অভ্রের ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
কষ্ট, অবিশ্বাস এবং গভীর ভালোবাসায় ভরা কণ্ঠে সে ফিসফিস করে ডাকল—
— "চা... চাচ্চু..."
শব্দটি ঠোঁট ছেড়ে বেরোতেই তার শরীরের সমস্ত শক্তি যেন মুহূর্তেই নিঃশেষ হয়ে গেল।
ঠিক তখনই জয়নাল দ্রুত তাকে ধরে ফেললেন।
অভ্র আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে জয়নালকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুকফাটা আর্তনাদে কেঁদে উঠল।
এই কান্না পরাজয়ের ছিল না—
এটি ছিল মৃত্যুর মুখ থেকে প্রিয় মানুষটিকে জীবিত ফিরে পাওয়ার স্বস্তির কান্না।
অনেকক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে অভ্র তাড়াহুড়ো করে বলল,
— "আঙ্কেল... আপনার ফোনটা দিন। আমি বাসায় খবর দিই।"
জয়নাল তাকে থামিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন,
— "তার আগে তোমার কিছু জানা দরকার।"
এরপর তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব বিস্তারিতভাবে জানালেন—কীভাবে তিনি আরমান খানকে রক্তাক্ত অবস্থায় ট্রাকের ওপর পড়ে থাকতে দেখেছিলেন, কীভাবে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন, এবং জ্ঞান হারানোর আগে আরমান খান কাঁপা কণ্ঠে যা যা বলেছিলেন।
জয়নালের প্রতিটি কথা শুনে অভ্রের মুখের রং বদলে গেল।মুহূর্তেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রতিটি সূত্র যেন এক সুতোয় গাঁথা হয়ে গেল।
সে বুঝে গেল—
এই পুরো ঘটনার পেছনে রয়েছে একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। এবং সেই ষড়যন্ত্রের মূল হোতা কে, তা আর তার কাছে অজানা রইল না।
তবে প্রতিশোধের আগুন সে সেখানেই নিজের ভেতর চেপে রাখল।
না—
এখন প্রতিশোধের সময় নয়।এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তার চাচ্চার সুস্থ হয়ে ওঠা।
মনে মনে সে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করল—
"চাচ্চু সুস্থ হয়ে ফিরুন। তারপর একে একে প্রতিটি অন্যায়ের হিসাব আমি কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেব। কাউকেই এক বিন্দুও ছাড় দেব না।"
প্রায় বারো ঘণ্টা পর দায়িত্বরত চিকিৎসক আইসিইউ থেকে বেরিয়ে এলেন।
উদ্বিগ্ন অভ্র দ্রুত তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ডাক্তার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
— "আপাতত আশঙ্কা কিছুটা কেটেছে। রোগীর শরীরে সাড়া রয়েছে। তবে মাথায় গুরুতর আঘাতের কারণে তিনি কোমায় আছেন। কখন জ্ঞান ফিরবে, আদৌ ফিরবে কি না—এ মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।"
ডাক্তারের কথায় অভ্রের বুক আবারও ভারী হয়ে উঠল।
সে জয়নালের দিকে ফিরে গভীর কৃতজ্ঞতায় বলল,
— "আঙ্কেল... আজ থেকে আপনি আর কোনো চোরাচালানের গাড়ি চালাবেন না। আমি আপনার জন্য একটি সম্মানজনক কাজের ব্যবস্থা করব।"
একটু থেমে সে আইসিইউর দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— "আর যতদিন আমার চাচ্চা সুস্থ না হন, ততদিন তাঁর সমস্ত দায়িত্ব আপনার । তবে বাইরে কেউ তাঁর প্রকৃত পরিচয় জানবে না। সবাই জানবে তিনি আপনার বড় ভাই। আপাতত চাচ্চু এই পরিচয়েই চট্টগ্রামে থাকবেন। যতদিন না তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হচ্ছেন, ততদিন তাঁর পরিচয় গোপনই থাকবে।"
শেষ কথাগুলো বলার সময় অভ্রের চোখে আর কোনো অশ্রু ছিল না।
সেখানে জ্বলছিল কেবল এক অটল প্রতিজ্ঞার আগুন।
গভীর অথচ দৃঢ় কণ্ঠে অভ্র বলল,
— “ডাক্তারদের প্রয়োজনীয় সব তথ্য জানানো হবে। চিকিৎসার জন্য যত অর্থের প্রয়োজন হবে, আমি তা বহন করব। তবে কোনো অবস্থাতেই তারা যেন এই বিষয়ে মুখ না খোলে। চাচ্চুর পরিচয় কিংবা এই ঘটনার কোনো তথ্যই বাইরে প্রকাশ করা যাবে না। চিকিৎসার ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের অবহেলা না হয়—আমি সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চাই।
আপাতত সবাই জানুক, চাচ্চু বেঁচে নেই। কারণ তাঁর বেঁচে থাকার খবর ফাঁস হলে যারা এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত, তারা আবারও তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা করতে পারে। তাই আপাতত সবাই বিশ্বাস করুক—তিনি আর বেঁচে নেই। উপযুক্ত সময় এলে আমি নিজেই সবার সামনে পুরো সত্য প্রকাশ করব। তার আগে নয়।”
কথাগুলো শেষ করেই অভ্র জয়নালের ঠিকানা ও ফোন নম্বর সংগ্রহ করল। এরপর এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে দৃঢ় পদক্ষেপে হাসপাতাল ত্যাগ করল।
অভ্র চলে যাওয়ার পরও জয়নাল কিছুক্ষণ স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে রইল।
এত অল্প বয়সে এমন অসাধারণ দূরদর্শিতা, প্রখর প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও অবিচল মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় সে আগে কখনো দেখেনি। জীবনের নির্মম বাস্তবতা যেন সময়ের আগেই ছেলেটিকে পরিণত করে তুলেছে। অজান্তেই অভ্রের প্রতি তার মনে জন্ম নিল গভীর শ্রদ্ধা, অগাধ বিশ্বাস ও এক অদ্ভুত মুগ্ধতা।
পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিল।
অভ্রের প্রতিটি নির্দেশ তার কাছে অঙ্গীকারের মতো। তাই আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সে নির্দেশগুলো অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের কাজে লেগে পড়ল।
এদিকে রাতের অন্ধকার কাটতেই এক বিভীষিকাময় সংবাদ দাবানলের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
খবরটি সাথী বেগমের কানে পৌঁছাতেই তাঁর বুক চিরে বেরিয়ে এল এক হৃদয়বিদারক আর্তনাদ। মুহূর্তের মধ্যেই তিনি জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন।
সৌভাগ্যক্রমে ঠিক সেই সময় বাড়িতেই উপস্থিত ছিলেন নাজিরা বেগম। তিনি তড়িঘড়ি ছুটে এসে সাথী বেগমকে সামলানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু ততক্ষণে পুরো বাড়িজুড়ে নেমে এসেছে শোক, আতঙ্ক, আহাজারি ও স্তব্ধতার এক গভীর বিষণ্ন পরিবেশ। চারদিকে যেন মৃত্যু-নীরবতা নেমে এসেছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চেয়ারম্যান আমান খানের মেজো ভাই আরমান খান গতরাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সভায় অংশ নিতে চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন। সভা শেষে তিনি বড় ভাইয়ের শ্বশুরবাড়িতে যান। পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় ঘুরতে বের হলে একপর্যায়ে পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় আকস্মিকভাবে ভারসাম্য হারিয়ে গভীর খাদে পড়ে যান।
ঘটনার পরপরই উদ্ধারকারী দল ও স্থানীয় প্রশাসন টানা কয়েক ঘণ্টা ধরে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করলেও তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি।
ফলে সংশ্লিষ্ট সকলেই প্রায় নিশ্চিত হয়ে যান—
আরমান খান আর বেঁচে নেই।
সংবাদটি দ্রুত গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তেই আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী, গ্রামবাসী, পরিচিতজন এবং অসংখ্য সহানুভূতিশীল মানুষ একে একে চেয়ারম্যানের বাড়িতে ছুটে আসতে শুরু করলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো বাড়িটি শোকাহত মানুষের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। চারদিকে নেমে এল এক ভারী, স্তব্ধ ও হৃদয়বিদারক শোকের আবহ, যেন প্রতিটি দেয়ালও নীরবে কান্নায় ভেঙে পড়ছে।
সাথী বেগমের মানসিক অবস্থা তখন প্রায় ভেঙে পড়ার মতো। কখনো বুক চাপড়ে বুকফাটা বিলাপে ভেঙে পড়ছেন, কখনো মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে অঝোর ধারায় কাঁদছেন, আবার কখনো দু'হাত আকাশের দিকে তুলে অসহায় কণ্ঠে আর্তনাদ করে বলছেন—
— "এখন আমার কী হবে...? আমার মেয়েটার কী হবে...? হে আল্লাহ...! আমাদের ওপর এত বড় সর্বনাশ কেন করলে...? কী অপরাধ ছিল আমাদের...?"
তাঁর সেই হৃদয়বিদারক আহাজারি, অসহায় আর্তচিৎকার আর সীমাহীন মাতৃহৃদয়ের হাহাকার যেন উপস্থিত প্রত্যেকের বুক বিদীর্ণ করে দিচ্ছিল। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো পরিবেশ আরও শোকাচ্ছন্ন, ভারাক্রান্ত ও নিস্তব্ধ হয়ে উঠল।
অন্যদিকে, সংবাদটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অভ্র, তার বাবা-মা এবং ছোট চাচ্চুরা আর এক মুহূর্তও দেরি করেননি। প্রথম উপলব্ধ জরুরি ফ্লাইটেই তারা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে পৌঁছে যান।
চেয়ারম্যান বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে পৌঁছাতেই তারা দেখতে পেলেন—বাড়ির বাইরে উৎসুক জনতার ঢল নেমেছে। পুরো এলাকাজুড়ে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। ভেতরেও আত্মীয়-স্বজন, পরিচিতজন, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তির উপস্থিতিতে পরিবেশ হয়ে উঠেছে ভারাক্রান্ত, গম্ভীর ও শোকমগ্ন।
পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নিরাপত্তারক্ষীরা পুরো বাড়িটিকে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে নিয়ে নিয়েছে। পরিবারের সদস্য ও একান্ত ঘনিষ্ঠজনদের বাইরে কাউকেই ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছিল না। প্রধান ফটকের সামনেই সাধারণ মানুষকে আটকে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল তারা।
অভ্রদের গাড়িটি চেয়ারম্যান বাড়ির সামনে এসে থামতেই নিরাপত্তারক্ষীরা দ্রুত এগিয়ে এল। তখনই তারা চারপাশে জটলা করে থাকা জনতাকে সুশৃঙ্খলভাবে সরিয়ে একটি নিরাপদ প্রবেশপথ তৈরি করল। এরপর সর্বোচ্চ সম্মান ও সতর্কতার সঙ্গে অভ্রদের বাড়ির ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো।
বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতেই আফসানা বেগম আর নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেন না। তিনি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে সাথী বেগমকে দৃঢ়ভাবে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
পরক্ষণেই দুই নারীর বুকফাটা আহাজারি, হৃদয়বিদারক বিলাপ এবং সীমাহীন শোকের আর্তনাদে পুরো পরিবেশ আরও ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। তাঁদের কান্না উপস্থিত প্রত্যেকের হৃদয়ে গভীর শোকের ঢেউ তুলল।
অন্যদিকে, এক কোণে নিথর ও গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন আমান খান ও আসান খান। তাঁদের চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল গভীর বেদনা, অসহনীয় শোক, উৎকণ্ঠা, অসহায়ত্ব এবং এক অদৃশ্য মানসিক বিপর্যয়ের ছাপ। যেন ক্ষণিকের মধ্যেই জীবনের সমস্ত দৃঢ়তা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
ঠিক তখনই মাহাদীর বাবা তাঁর পুরো পরিবারসহ সেখানে উপস্থিত হলেন।
মুখে গভীর শোকের ছায়া, চোখে কৃত্রিম অশ্রুর আভা, ঠোঁটে সহানুভূতির অভিনয়—ভদ্রতা, সমবেদনা ও শোকের মুখোশটি তিনি নিখুঁতভাবে বজায় রেখেছেন। তাঁর অভিনয় এতটাই নিখুঁত ছিল যে উপস্থিত কারও পক্ষেই বোঝার উপায় ছিল না—এই শোকাবহ ঘটনার প্রকৃত রচয়িতা তিনিই।
মাহাদীর মা এগিয়ে এসে সাথী বেগমকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
আর মাহাদী...
সে এখনো তার বাবার পৈশাচিক ষড়যন্ত্র, নির্মম কূটচাল কিংবা সুপরিকল্পিত এই ভয়ংকর প্রহসনের সামান্যতম সত্য সম্পর্কেও সম্পূর্ণ অজ্ঞ।
সে এখনো বিশ্বাস করে বসে আছে—এটি নিছকই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
সে জানেই না, যাকে সে নিজের আদর্শ পিতা হিসেবে শ্রদ্ধা করে এসেছে, সেই মানুষটিই পর্দার আড়াল থেকে এই বিভীষিকাময় ঘটনার প্রতিটি দৃশ্য নির্মম নিষ্ঠার সঙ্গে পরিচালনা করেছেন।
অন্যদিকে অভ্রের শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় দমিত ক্রোধ দাবানলের মতো দাউদাউ করে জ্বলছিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে পাথরের মতো জমে গেছে, দাঁত কিড়মিড় করছে, দু’মুঠো হাত এতটাই শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ যে আঙুলের গিঁটগুলো সাদা হয়ে উঠেছে। রক্তাভ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে চারপাশে তাকিয়ে ছিল।
সে খুঁজছিল শুধু একজনকেই...
তার পরিকে।
হঠাৎই তার দৃষ্টি এক জায়গায় গিয়ে স্থির হয়ে গেল।
সাথী বেগমের আঁচলের আড়ালে গুটিসুটি মেরে বসে আছে ছোট্ট রাহা। দুই হাতে মায়ের শাড়ির আঁচল এমন শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে, যেন সেটিই তার একমাত্র আশ্রয়। মায়ের বুকফাটা আহাজারি ও অঝোর কান্না দেখে শিশুটিও আতঙ্ক, বিভ্রান্তি ও অসহায়ত্বে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
ভয়ে তার ছোট্ট শরীরটি থরথর করে কাঁপছে।
অশ্রুসিক্ত নিষ্পাপ চোখে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সে বারবার কাঁপা কণ্ঠে শুধু একটিই শব্দ উচ্চারণ করছে—
— “মা... মা...”
সেই নিষ্পাপ আর্তনাদ, সেই অসহায় কান্না অভ্রের বুকে যেন হাজারো ধারালো ছুরির মতো বিঁধে গেল।
মুহূর্তের মধ্যেই তার ভেতরে জমে থাকা দমিত ক্রোধ, সীমাহীন যন্ত্রণা ও গভীর মমতা একাকার হয়ে উঠল।
দৃশ্যটি আর এক মুহূর্তও সহ্য করতে পারল না অভ্র।
এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে সে দ্রুত এগিয়ে গেল। এক নিমিষেই গভীর স্নেহে এক টানে দুই হাত বাড়িয়ে রাহাকে নিজের বুকে টেনে নিল।
রাহাকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই অভ্রের মনে হলো—অসংখ্য ঝড়, রক্তক্ষয়, বিশ্বাসঘাতকতা, নির্মম বাস্তবতা এবং জীবন-মৃত্যুর কঠিন লড়াই পেরিয়ে তার সমস্ত শান্তি, প্রশান্তি, স্বস্তি ও বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ যেন এই একজন মানুষের মধ্যেই নিহিত।
সে অত্যন্ত কোমলভাবে রাহার চোখের জল মুছে দিয়ে কপালে আলতো চুমু এঁকে ফিসফিস করে বলল,
— "আমার পরিটা কাঁদে না... আমার জান বাচ্চা... আমি তো আছি, তাই না? তোর অভ্র ভাই থাকতে তোকে কেউ কষ্ট দিতে পারবে না। সব ঠিক করে দেব আমি। যে-ই তোর হাসিটা কেড়ে নিতে চাইবে, তার বিরুদ্ধে পুরো পৃথিবীর সঙ্গেও লড়ে যাব। তাই আর একফোঁটাও কাঁদবি না... যতক্ষণ আমি আছি, ততক্ষণ কোনো বিপদও তোকে ছুঁয়ে যাওয়ার সাহস পাবে না।”
অভ্রের বুকে উষ্ণ ও নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে ধীরে ধীরে রাহার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না থেমে আসে। দীর্ঘ সময়ের অঝোর অশ্রু ও অবিরাম কান্নায় ক্লান্ত তার ছোট্ট চোখ দুটি একসময় আপনাআপনিই বুজে যায়। পরমুহূর্তেই সে অভ্রের বুকে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত ও নির্ভার অবস্থায় গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়।
অভ্র এক মিনিটের জন্যও তাকে নামিয়ে রাখে না। গভীর মমতা, সীমাহীন স্নেহ ও অসীম যত্নে তাকে বুকে আগলে রেখেই ধীর পদক্ষেপে নিজের কক্ষে ফিরে যায়।
প্রায় চব্বিশ ঘণ্টারও বেশি সময় পর সে আবার তার প্রাণের চেয়েও প্রিয় মানুষটিকে নিজের বুকে ফিরে পেয়েছে। এত সহজে সেই উষ্ণতা, সেই প্রশান্তি ও সেই অমূল্য সান্নিধ্য থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার কোনো শক্তি তার ছিল না।
তার মনে হতে থাকে, বুকে নিবিড়ভাবে আশ্রয় নেওয়া এই ছোট্ট প্রাণটিই যেন তার সমগ্র পৃথিবী, তার অস্তিত্বের সারমর্ম, সমস্ত সুখ-শান্তি, শক্তি এবং বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
রুমে প্রবেশ করেই অভ্র রাহাকে বুকে আগলে ধীরে ধীরে রকিং চেয়ারটিতে গিয়ে বসল।
চেয়ারটি মৃদু ছন্দে দুলছিল। সেই শান্ত দোলার সঙ্গে যেন অভ্রের বুকের ওঠানামাও একাকার হয়ে গিয়েছিল। কখনো সে নিজের বুকে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা রাহার নিষ্পাপ, শান্ত মুখখানির দিকে গভীর মমতায় তাকিয়ে থাকছিল, আবার কখনো মাথাটা চেয়ারের পেছনে এলিয়ে দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে সিলিংয়ের দিকে চেয়ে থাকছিল।
কিন্তু তার অন্তরের ভেতর তখন চলছিল এক ভয়ংকর তোলপাড়।
অসংখ্য প্রশ্ন, অগণিত সংশয়, সীমাহীন ক্ষোভ, অসহনীয় যন্ত্রণা, গভীর অপমানবোধ এবং প্রতিশোধের আগুন তার অন্তরকে ক্ষতবিক্ষত করে তুলছিল।
তবুও...
সে নীরব।
না...
এখন কোনো আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত নয়।
প্রথমে সম্পূর্ণ সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে। চাচ্চু সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে নিজ মুখে সবকিছু প্রকাশ না করা পর্যন্ত এই ঘটনার একটি শব্দও কারও কানে পৌঁছাতে দেওয়া যাবে না।
এমনকি...
নিজের বাবা-মাকেও নয়।
নিমেষে মধ্যেই অভ্রের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চোখের গভীরে জমাট বাঁধল এক অটল, অবিচল সংকল্প।
মনে মনে সে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করল—
"যারা ক্ষণিকের জন্যও আমাকে বিশ্বাস করতে পারেনি।যারা সামান্যতম সত্য যাচাই না করেই আমাকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। তাদের প্রত্যেককে আমি সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাব। আমার নীরবতাকে তারা দুর্বলতা ভেবেছে। অথচ এই নীরবতারও একটি ভাষা আছে, একটি প্রতিশোধ আছে। আর সেই উত্তর দেবে সময় নিজেই।"
এরপরও সে দীর্ঘক্ষণ সিলিংয়ের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
কখন যে নির্ঘুম একদিন-একরাতের অবসাদ, অসহনীয় মানসিক চাপ, অমানুষিক ক্লান্তি আর অবিরাম লড়াইয়ের ভার তাকে নিঃশব্দে ঘুমের অতলে তলিয়ে নিয়ে গেল, সে নিজেও টের পেল না।
হঠাৎ...
দরজায় মৃদু টোকা পড়ার শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল।
চলবে……

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন