#মৃগতৃষ্ণা---২৩ (কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ 🚫)
#লেখিকা-মেহরুমা নূর
★সবার মাথায় যেন এক প্রকার বাজ পড়লো। বিস্ফোরিত চোখে তাকালো সবাই জুবায়েদের দিকে। জুবায়েদের চোখে মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট বিদ্যমান। ভয়ে মাথা ঘেমে গেছে তাঁর। সামছুল মজুমদার ছেলের দিকে তাকিয়ে ক্ষুব্ধ কন্ঠে বললেন।
--জুবায়েদ,শাকিল কি বলছে এসব? তারমানে তুমি? তুমি তোমার নিজের ভাইকে মেরেছ? কেন?
জুবায়েদ ভয়ার্ত কন্ঠে বললো।
--না না বাবা আমি নাঈমকে মারিনি। সত্যি বলছি। আমি নিজের ভাইকে কেন মারতে যাবো? বাবা বিশ্বাস করো আমি মারিনি ওকে।
শাকিল বলে উঠলো।
--কিন্তু আপনার হাতের ছাপ তো পাওয়া গেছে। সেক্ষেত্রে সন্দেহ আপনার ওপরেই যায়। এখন সত্যি সত্যি বলুন কেন মেরেছেন নাঈম কে। দেখুন ভালোই ভালোই বললে আপনারই ভালো। নাহলে আমাদের বলাতে বাধ্য করলে সেটা খুব একটা সুখকর হবেনা আপনার জন্য। তাই নিজের অপরাধ বয়ান করুন। বলুন কেন মেরেছেন নাঈম কে?
জুবায়েদ এবার কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো।
--শাকিল আমি সত্যি বলছি আমি নাঈমকে মারিনি। আমি আমার ভাইকে কেন মারবো?
--তাহলে আপনার হাতের ছাপ কিভাবে এলো ওর শার্টে? শুধু তাই নয়। ওর শরীরে হালকা আঘাতের লাল দাগও আছে। তারমানে তো এই দাঁড়ায় যে,আপনি ওর কাছে গিয়েছিলেন। আর হয়তো ওকে মারতে গিয়ে ওর সাথে কোন প্রকার হাতা পাই করেছেন। তখনই আপনার হাতের ছাপ লেগেছে।
--হ্যাঁ মানছি,আমি গিয়েছিলাম ওর কাছে। তবে ওকে খু,ন করতে যাইনি।
--তো কি করতে গিয়েছিলেন?
জুবায়েদ ভীতু গলায় বললো।
--আ আসলে আমি ওকে পেপার সই করাতে গিয়েছিলাম।
সামছুল মজুমদার কপাল কুঁচকে বললেন।
--কিসের পেপার?
--আমাদের পূর্ব পাড়ার ওই দুই বিঘার বড়ো জমিনের কাগজটায়। যেটা ছোটবেলায় আমাদের সুন্নাতে খাতনার সময় দাদা আমাদের দুই ভাইয়কে উপহার দিয়েছিল। ওই জমিনটায় আমার একটা ফ্যাক্টরি করার ইচ্ছা। কিন্তু দুইজনের নামে থাকায় সমস্যা ছিল। যেহেতু নাঈমকে সবাই মৃত ভেবে নিয়েছিলাম তাই আর সমস্যা থাকতো না। তবে হঠাৎ ওর ফিরে আসায় আবারও ওই চিন্তা থাকে। তাই আমি সুযোগ বুঝে রাতে ওর কাছে ওই পেপার নিয়ে যাই সই করাতে। ওকে বুঝিয়ে বলি সবটা। তবে ও বেঁকে বসে। সইতে করতে রাজি হয়না ও। আমার অনেক বলার পরও রাজি হয়না ও। কথায় কথায় রাগ উঠে যায় আমার। তখন ওর সাথে একটু হাতাহাতি হয় আমার। অবস্থা বেগতিক দেখে আমি তখন চলে আসি ওর কাছ থেকে। ব্যাচ এতটুকুই হয়েছিল। আর কিছু না। সত্যি বলছি।
সামছুল মজুমদার হঠাৎ এগিয়ে এসে জুবায়েদের গালে সজোরে একটা থাপ্পড় মেরে দিয়ে বললো।
--লজ্জা করে না তোর? এতো লোভ তোর? ছেলেটা ফিরতে না ফিরতেই তুই নিজের কার্য সিদ্ধি করতে গেছিস? তোর সাহস কি করে হলো এতবড় বেইমানি করার?
জাহানারাও ছেলের এমন কাজে আহত হলেন। দুঃখ প্রকাশ করলেন খুব । শাকিল আবার বললেন।
--আচ্ছা তখন টাইম কতো ছিলো?
--রাত ১২ টার আগে হবে।
--হুম ঠিক আছে। আপাতত আপনার কথা মানলাম। তবুও থানায় এসে আপনাকে একটা অফিসিয়াল স্টেটমেন্ট দিতে হবে। আজকের মতো আসি তাহলে। দরকার হলে আবার আসবো।
__
আরও একটি সপ্তাহের ইতি ঘটলো। নাঈমের কেসে আর তেমন নতুন কোন আপডেট হয়নি। ধীরে ধীরে সবকিছু আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। জাহানারাও এখন অনেক টা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। যদিও তার ক্ষত কখনো পুরণ হবার নয়। তবুও সময়ের সাথে সবকিছু সয়ে যায়।সেও সংসার জীবনে নিজেকে ব্যাস্ত করতে শুরু করেছে।
পঙ্খি তৈরি হচ্ছে কলেজে যাওয়ার জন্য। আজ পরিক্ষার সাজেশন দেওয়ার কথা আছে। তাই আজ কলেজে যাচ্ছে সে। যদিও এখন তার কলেজে যাওয়া নিয়ে আর কোন শর্তের বেড়াজালে থাকতে হয়না। এখন যে সে আর আগের জীবনে নেই। সে এখন ইন্ধনের রাজরানী। ইন্ধন বলে দিয়েছে, পঙ্খি চাইলে রোজই কলেজে যেতে পারে। এখন আর কোন বাঁধা নেই তাঁর। তবুও পঙ্খি রোজ যায়না। শুধু জরুরি কিছু হলেই যায়। তৈরি হয়ে বাইরে রাস্তায় এসে সিএনজি দাঁড় করানো দেখতে পেল। ইন্ধনই ওর জন্য ঠিক করে দিয়ে গেছে। সিএনজির দিকে যেতে নিলেই হঠাৎ পঙ্খি সেই বয়স্ক মহিলাকে আবারও দেখতে পেল। সামনের বটগাছের পেছন থেকে ওদের বাড়ির দিকে উঁকি দিচ্ছে। আজ তো এই মহিলাকে ধরেই ছাড়বে সে।পঙ্খি চুপিচুপি অন্য দিক দিয়ে ঘুরে গিয়ে মহিলার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। পেছন থেকে খপ করে মহিলার হাত চেপে ধরলো। মহিলাটি চমকে উঠে পেছনে ঘুরে তাকালো। পঙ্খির কাছ থেকে ছোটার চেষ্টা করলো সে। পঙ্খি শক্ত করে ধরে থেকে বললো।
--আজ পালাতে পারবেন না আপনি। আগে বলুন কে আপনি?আর এভাবে চোরের মতো এখানে এসে কি দেখেন? কি করতে চান আপনি? সত্যি করে বলুন।নাহলে কিন্তু পুলিশে দিবো আপনাকে। বলুন আপনার উদ্দেশ্য কি? দেখুন আমি এই বাড়ির বউ। আর আমি থাকতে এই বাড়ির কোন ক্ষতি হতে দেবনা আমি।
পঙ্খির শেষের কথায় মহিলাটি বিস্ময় ভরা চোখে তাকিয়ে বললো।
--বউ? তুমি এই বাড়ির বউ? কার বউ?
--জহির মজুদারের ছেলে,ইন্ধন মজুমদারের বউ আমি ।
পঙ্খির কথায় মহিলাটির মুখভঙ্গি কেমন বদলে গেল। কেমন অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে রইলো সে পঙ্খির পানে। চোখের ভাষায় কেমন মায়া দেখতে পেল পঙ্খি। মহিলাটি এক হাত পঙ্খির গালে আলতো করে রেখে বললো।
--তুমি জহিরের বেটার বউ? হত্যি কইতাছাও?
--জ্বি। কিন্তু আপনি বলুন এখানে রোজ রোজ কি করতে আসেন আপনি? আর ডাক দিলে পালিয়ে যান কেন? উদ্দেশ্য কি?
মহিলাটি মলিন হেঁসে বললো।
--ভয় পাইও না। আমি এহেনে চুরি করতে আসিনাই।
--তাহলে কেন আসেন?
--সেডো তো কইবার পারমু না আমি। তয় তোমাক একখান কথা কই ভালো কইরা হুইনা রাহো। তোমার স্বামীর উপর অনেক কালো ছায়া ভর করে আছে। হের আশেপাশে শত্রুর মেলা। এই শত্রু কোন বাইরের কেউ না। নিজেরই কেউ। ওঁৎ পাইতা বইসা আছে। সুযোগ পাইলেই তোমার স্বামীরে মাইরা ফালাইবো। তুমি চোখ কান খোলা রাইখো।কারোর ওপর বিশ্বাস করবা না। তোমার স্বামীর সুরক্ষা তোমার হাতে। নিজের স্বামীরে রক্ষা করো।
মহিলাটির কথায় থমকে গেল পঙ্খি। সে বিস্মিত কন্ঠে বললো।
--কি বলছেন এসব? কে মারবে তাঁকে?
--এডো তো কইবার পারমু না। তুমি সময় হইলেই জইনা যাইবা।
হঠাৎ পেছন থেকে সিএনজি ড্রাইভার পেছন থেকে ডেকে উঠে বললো।
--ভাবি যাইবেন না? দেরি হইয়া যাইতাছে তো।
পঙ্খি পেছনে তাকিয়ে বললো।
--এইতো আসছি। আর পাঁচ মিনিট দাঁড়ান।
কথা শেষ করে সামনে তাকাতেই দেখলো সেই মহিলা আর নেই। চমকে গেল পঙ্খি। ভুতের মতো মুহুর্তেই কোথায় চলে গেল সে? আর কি বলছিল এসব? উনার জীবনের ওপর সংকট আছে? কেউ উনাকে মেরে ফেলতে চায়? কথাগুলো ভাবতেও যেন হৃদয় থমকে যাচ্ছে পঙ্খির। মহিলা কি সত্যি বলছিল? কিন্তু কে মারতে চায় উনাকে? মহিলাটি তো নাম বলে গেলনা। এসব যদি সত্যি হয় তাহলে কি করবো আমি? কিভাবে রক্ষা করবো উনাকে? ভয়ে অন্তর আত্মা কেঁপে উঠল পঙ্খির।মহিলাটির কথা বারবার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো।ইন্ধনের কিছু হলে বাঁচবে কিভাবে ও? না না ইন্ধন কে ও কিছু হতে দিবেনা। কিছু না।
সিএনজিতে বসেও মাথায় শুধু ওই মহিলার বলা কথাই চলছে। মন অশান্ত হয়ে উঠছে পঙ্খির।হঠাৎ ইন্ধনের চিন্তায় মন ভারী হয়ে উঠছে। আজ সকাল সকালই বের হয়েছে সে। বললো নির্বাচনের জন্য প্রচার সবামেশ আছে আজকে। যাওয়ার পর আর একবারও ফোন করেন সে। এই সাধারণ ব্যাপার টাও যেন কেমন ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াল পঙ্খির কাছে। সে দ্রুত ফোন বের করে ইন্ধনের নাম্বারে কল দিলো। কিন্তু ইন্ধনের ফোন রিসিভ হলোনা। ভয়ের মাত্রা বৃদ্ধি পেল। অশান্ত মনে এলোমেলো দুশ্চিন্তা এসে হানা দিতে লাগলো। বারবার মহিলার কথাই মনে পড়তে লাগলো। ওর রাজপুত্র ঠিক আছে তো? ফোন কেন ধরছে না? কিছু হলো নাতো?
ভাবনার মাঝেই হঠাৎ পঙ্খি দেখলো রাস্তার পাশে স্কুল মাঠে বিশাল সমাবেশ। ইন্ধনের সমাবেশ তো এখানেই হওয়ার কথা। কথাটা মনে আসতেই পঙ্খি দ্রুত চালককে সিএনজি থামাতে বললো। সিএনজি থামলে পঙ্খি চালককে বললো।
--চাচা আমি দুই মিনিট পরেই আসছি। আপনি একটু অপেক্ষা করেন।
পঙ্খি দ্রুত পায়ে ভীড়ের দিকে এগিয়ে গেল। ইন্ধনকে সহিসালামত না দেখা পর্যন্ত ওর শান্তি হবে না। তাই ভীড় ঠেলে সামনে এগিয়ে গেল সে। ভীড় ঠেলে কিছুদূর এগুতেই কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তির দেখা পেল সে। বুক ভরে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলো পঙ্খি। হ্যাঁ ওর ইন্ধন সহিসালামত আছে। ওইতো মঞ্চে মাইকের সামনে ভাষণ দিচ্ছে সে। কতো সুন্দর হাসিমাখা মুখটা তাঁর। সকালে পঙ্খির দেওয়া কালো পাঞ্জাবি টা পড়েছে। পাঞ্জাবির বোতাম গুলো নিজের হাতে লাগিয়ে দিয়েছিল সে। তাঁর সুদর্শন স্বামী টা এই পাঞ্জাবিতে আরও সুদর্শন লাগছে। কতো সুন্দর করে বক্তৃতা দিচ্ছে। গ্রামবাসীর নানান উন্নয়নের কথা বলছে সে। জনসমাগম দেখে বোঝা যাচ্ছে তাকে লোকজন অনেক পছন্দ করছে। করবেই নাই বা কেন। সে যে মানুষ টাই এমন। পঙ্খি মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থেকে দেখছে তাঁর রাজপুত্রকে। পঙ্খি ভাবছে ইন্ধন হয়তো ওকে দেখেনি। তবে তার ধারনাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে দিলো ইন্ধনের পরবর্তী কাজে। ইন্ধন বক্তৃতা প্রদানের মাঝেই সুকৌশলে পঙ্খির দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপ মেরে দিলো। অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো পঙ্খি। লাজুকভাবে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে লাগলো কেউ দেখেছে কিনা। তবে ইন্ধনের এই দুষ্টুমি পঙ্খি ব্যাতিত কেউই ধরতে পারেনি। পঙ্খি মাথা নিচু করে লাজুক হাসলো। লোকটা সত্যি খুব দুষ্টু।
ইন্ধন কে দেখে পঙ্খির মনের অশান্তি অনেক টা কমে গেছে। এবার সে শান্ত মনে আবারও ফিরে যেতে লাগলো। ভীড় এড়িয়ে বাইরে আসতে নিলেই হঠাৎ কারোর উচ্চস্বরে আওয়াজ শুনতে পেল। কেউ একজন ভীড়ের মাঝ থেকে কেু বলে উঠলো।
--আরে ভাই এতো মেহনতের কি দরকার? আমাদের সব ভোট আপনার। শুধু বদলে আপনার বউকে এক রাতের জন্য আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন।
এমন বিশ্রী কথা শুনে থমকে গেল পঙ্খি। পেছনে ঘুরে ইন্ধনের দিকে তাকাতেই ওর আত্মা উড়ে গেল ওর। ততক্ষণে ইন্ধন ভয়ংকর রুপ ধারণ করেছে। চোখে মুখে রক্ত জমে গেছে তার। সে স্টেজ থেকে এক লাফে নিচে নেমে এলো। দৌড়ে তেড়ে গেল সেই কুকথা বলা ছেলেটার দিকে। ছেলেটাও পালানোর চেষ্টায় দৌড় দিলো। কিন্তু ইন্ধনের থাবা থেকে বাঁচতে পারলোনা সে। ইন্ধন ভীড়ের মাঝেই দৌড়ে গিয়ে ছেলেটিকে ধরে ফেললো। তারপর আর কি! মাথায় রক্ত উঠে যাওয়া ইন্ধনের হাত থেকে এখন ছেলেটাকে আর ছাড়ানো অসম্ভব।অনেক লোক মিলেও ইন্ধন কে সরাতে পারছেনা। এদিকে কিছুলোক ভীড়ের মাঝে এসে সবার সাথে মারপিট শুরু করে দিলো। মুহুর্তেই যেন রণক্ষেত্রে পরিণত হলো জায়গাটা। দুই দলের মাঝে তুমুল দাঙ্গা শুরু হয়ে গেল। পঙ্খির ভয়ে হাত পা জমে গেল। হঠাৎ যেন বোধশূন্য হয়ে পড়লো সে। মাথায় শুধু ইন্ধনের চিন্তা তাঁর। সে দাঙ্গার মাঝে পাগলের মতো ইন্ধন কে খুঁজতে লাগলো। মারামারির মাঝে সে কোন দিকে যাবে বুঝতে পারছে না। অন্য দলের লোকেরা এলোমেলো ভাবে ইট পাটকেল আর কাচের বোতল ছুঁড়ে মারছে। পঙ্খির হাত পা থরথর করে কাঁপছে। মাথা ঘুরছে তাঁর। কোথায় ইন্ধন? ওর কিছু হলো নাতো? এই ভাবনাগুলোই মেরে ফেলছে তাঁকে। সংঘর্ষের মাঝেই ছুটছে ইন্ধনকে খুঁজতে। একটু পরে দেখতে পেল ইন্ধন কে। সে এখনো ওই ছেলেটাকে উন্মাদের মতো মেরেই যাচ্ছে। র,ক্তে জর্জরিত হয়ে গেছে ছেলেটার পুরো শরীর। পঙ্খি উচ্চস্বরে চিল্লিয়ে বললো।
--ইন্ধনননন............
ইন্ধনের হাত এবার থামলো। চমকে তাকালো সে পঙ্খির পানে। এই দাঙ্গার মাঝে পঙ্খিকে দেখে ঘাবড়ে গেল সে। ওতো ভেবেছিল পঙ্খি চলে গেছে। চারদিক থেকে কাচের বোতল ছুঁটে আসছে। ইন্ধন এবার ছেলেটাকে ফেলে পঙ্খির পানে দৌড়ে এলো। পঙ্খির কাছে এসে অস্থির কন্ঠে বললো।
--তুমি এখনো এখানে কি করছ? যাওনি কেন?
পঙ্খি অতিরিক্ত ঘাবড়ে যাওয়ার দরুন কিছু বলতেই পারছেনা। ইন্ধন দেখলো পঙ্খির দিকে কেউ কাচের বোতল ছুঁড়ে মারলো। ইন্ধন দ্রুত বেগে পঙ্খিকে টান দিয়ে বুকের মাঝে আগলে নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে পড়লো। যার ফলে বোতল টা এসে ইন্ধনের পিঠে লাগলো। পঙ্খির হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠল।সে আতঙ্কিত হয়ে দুই হাতে ইন্ধনের মুখ ধরে ভয়ার্ত কন্ঠে বললো।
--কককি হয়েছে আপনার?
--কিছু হয়নি আমার। ঠিক আছি আমি। আগে চলো এখান থেকে বের হই।
পঙ্খি ইন্ধনের পিঠে হাত লাগাতেই দেখতে পেল পিঠ র,ক্তে ভিজে গেছে। ওর হাতের সাথে র,ক্ত লেগে আছে। র,ক্ত মাখা হাতের দিকে তাকিয়ে কেঁদে উঠলো পঙ্খি। হাতটা তাঁর থরথর করে কাঁপছে। কণ্ঠনালী যেন চিপে ধরেছে কেউ। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে সে বললো।
--র র র,ক্ত....
ইন্ধন পঙ্খিকে শান্ত করার জন্য বললো।
--রিলাক্স পঙ্খি। এটা কিছুই না। আগে আমাদের এখান থেকে বের হতে হবে।
পঙ্খির কানে যেন কোন আওয়াজ ঢুকছে না। কেমন যেন অনুভূতি শূন্য হয়ে পড়লো সে। শুধু তাঁর হাতে লাগা ইন্ধনের র,ক্তের দিকে তাকিয়ে আছে সে। ইন্ধন পাশ থেকে হাতে একটা লাঠি উঠিয়ে নিলো। এক হাতে পঙ্খিকে আগলে নিলো,আরেক হাতে লাঠি নিয়ে সামনের সব আক্রমণকারীকে প্রতিহত করে ধীরে ধীরে সংঘর্ষের মধ্য থেকে বেড়িয়ে এলো তাঁরা।
দূর থেকে এসব দেখে বিশ্ব জয়ের হাসি দিলো জুবায়েদ। সে পরিকল্পনায় সফল হয়ে গেছে। এবং সামনেও যা প্ল্যান করেছে তাই হবে। ইন্ধন কে তো পরাজিত করেই ছাড়বে সে।
__
বিছানায় শুয়ে আছে ইন্ধন। ডাক্তার এসে তাঁকে ব্যান্ডেজ করে দিয়ে গেছে। তার শিয়রে দুই পাশে দুই রমনী অশ্রু বিসর্জন করে নদী নালা বানিয়ে দিচ্ছে। একজন জননী, আরেকজন তাঁর স্ত্রী। ইন্ধন এদের কান্ড দেখে মুচকি হেঁসে বললো।
--তোমাদের দুজনের মাঝে কান্নার কোন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে? মানে যে যতো বেশি কাঁদতে পারবে সে ফাস্ট প্রাইজ পাবে? এমন কিছু হলে বলে দাও। তোমাদের দুজনকেই বিজয়ী ঘোষণা করে দিলাম। শুধু বিজয়ী না।একেবারে গোল্ড মেডেল দিয়ে দিলাম। তবুও দয়া করে কান্না বন্ধ করো। এই সামান্য আঘাতের চেয়ে তোমাদের চোখের বন্যাতেই তো আমাকে ডুবিয়ে মেরে ফেলবে।
রাবেয়া আঁচলে নাক মুছে বললো।
--সবকিছুই তোর কাছে মজা তাইনা? তোর কিছু হয়ে গেলে আমি কি করতাম? তুই ছাড়া আর কে আছে আমার? মায়ের কান্না তোর কাছে বন্যা মনে হয়?
--আচ্ছা বাবা হয়েছে তো। এখন একটু থামোনা প্লিজ। আমি ঠিক আছি তো।
--আচ্ছা তুই আরাম কর। আমি তোর খাওয়ার জন্য কিছু নিয়ে আসি।
রাবেয়া চলে গেলেন। ইন্ধন এবার পঙ্খির পানে তাকিয়ে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলো। পঙ্খি কাল বিলম্ব না করে ইন্ধনের বুকে আলতো করে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে উঠলো। ইন্ধন পঙ্খির মাথায় হাত বুলিয়ে বললো।
--তুমি কিন্তু রুলস বারবার ভেঙেই যাচ্ছো। এটা কিন্তু ঠিক না পঙ্খি।
পঙ্খি জানে ইন্ধন এসব ওর মন ভালো করার জন্য বলছে। কিন্তু ওর মন যে এসবে ভুলছে না। ওর মাথায় চলছে ওই মহিলার কথাগুলো।আজকের এই ঘটনার পর যেন ওই মহিলার কথাগুলো আরও বেশি অশান্ত করছে ওঁকে। ওর ইন্ধনের ওপর কি সত্যিই কোন কালো ছায়া আছে? আমি কিভাবে সেই ছায়া দূর করবো?
হঠাৎ নিচ থেকে উচ্চস্বরে কেউ ইন্ধনের নাম ধরে ডাকলো। ডাক শুনে দুজনেই একটু হকচকিয়ে উঠলো। ধীরে ধীরে ইন্ধন পঙ্খিকে নিয়ে বাইরে এলো। বাইরে শাকিলকে দেখে ইন্ধন ভ্রু কুঁচকে বললো।
--কিরে তুই হঠাৎ?
--আসলে যে ছেলেটাকে তুই মেরেছিস তার পরিবার তোর নামে কেস করেছে। ছেলেটার অবস্থা ক্রিটিকাল। তোকে আমার সাথে যেতে হবে।
শাকিলের কথায় যেন পঙ্খির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। রাবেয়াও হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। ইন্ধন ওদের শান্ত না দিয়ে বললো।
--আরে কাঁদছ কেন? রাজনীতি করতে গেলে এসব হবেই।তোমরা চিন্তা করোনা। কিছু হবেনা আমার।
ইন্ধন এগুতে নিলেই পঙ্খি হাত টেনে ধরলো। ইন্ধন তাঁকেও চোখের ইশারায় শান্তনা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে চলে গেল শাকিলের সাথে। পঙ্খি ধপ করে নিচে বসে পড়লো। তার ইন্ধনের ওপর যে সত্যি কালো ছায়া নেমে এসেছে। এখন কিভাবে সে বাঁচাবে তাঁকে।
চলবে....
গল্পের লেটেস্ট আপডেট পেতে আর গল্প নিয়ে যেকোনো আলোচনা আড্ডা দিতে আমার গ্রুপে জয়েন হওয়ার আমন্ত্রণ রইল। নিচে গ্রুপ লিংক দেওয়া হলো। জয়েন হতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন। 👇
গ্রুপ
https://facebook.com/groups/170529085281953/