ফন্ট সাইজ:
থিম:
মনটা কথা শোনে না

১ম পর্ব

লেখক: মিথিলা ইসলাম

একই দিনে একই বাড়িতে ছোট বোনের বিয়ে হলো এক পাগলের সাথে আর বড়ো বোনের বিয়ে হলো একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের সাথে। বড়ো বোনের ভাসুরের সাথেই বিয়ে হলো ছোট বোনের। এ কেমন নিয়তি! বড়োই আশ্চর্যজনক। একটি পরিবার কী করে তাদের দুই সন্তানকে দুই চোখে দেখে? হ্যাঁ হয়তো পারে। না পারলে কি আর ছোট মেয়েটার সাথে এমন করতে পারতো? এমন তো না যে মেয়েটার শারীরিক, মানসিক কোনো সমস্যা আছে! কিছুই না মেয়েটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং সুস্থ।

বড়ো বোন নিশিতা সিদ্দিকী তার জামাই ঋভান চৌধুরীর সাথে ফটোশুট করতে ব্যস্ত আর অন্যদিকে ছোট বোন নীহারিকা সিদ্দিকী জামাই ঋত্বিক চৌধুরীর সাথে চুপচাপ বসে আছে। ঋত্বিকের হাতে মাঝারি সাইজের একটা টেডিবিয়ার। অনুভূতিহীন দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে নীহারিকা। না আনন্দ আর না কষ্ট।
সবাই ঋত্বিকের কন্ডিশন নিয়ে আলোচনা করছে।কবুল বলার আগ পর্যন্তও কোনো আত্মীয়স্বজন জানতো না যে বড়ো ছেলে মানসিক ভারসাম্যহীন। সমাজ যাকে পাগল বলে আখ্যায়িত করে। অন্যান্য বিয়ের মতোই গেট ধরা হয় কিন্তু তখন শুধু ঋভান সেখানে উপস্থিত ছিল। ঋত্বিকের কথা জিজ্ঞেস করলে বরপক্ষ জানায় সে অনেক অসুস্থ বোধ করছে তাই এখন আসবে না।
নিশিতা, নীহারিকার কাজিনরা এটা মানতে চাচ্ছিল না। কিন্তু ইয়ামিন সিদ্দিকী সকলকে থামিয়ে দিয়েছেন। তাই সবাই আর ঋত্বিককে নিয়ে কোনো কিছু বলেনি। সব নিয়মনীতি মেনে বরকে ভিতরে আনা হয়। ক্যামেরাম্যান কিছু ফটোশুট করে বরের। এরপর বরপক্ষ বিয়ে পড়ানোর জন্য তাড়া দিতে থাকে।
ফুলের পর্দার একপাশে দু-বোন বসে আছে। অন্য পাশে শুধু ঋভান. ঋত্বিককে আনতে গিয়েছেন তাদের বাবা রহমান চৌধুরী। বাবার হাত ধরে সে একজন স্বাভাবিক মানুষের মতোই হেঁটে এসেছিল। এরপর কাজি ঋত্বিক আর নীহারিকার বিয়ে পড়ানো শুরু করে। নীহারিকাকে যখন কবুল বলতে বলা হয় তখন সে মা-বাবার দিকে তাকায় কিন্তু তারা তাদের বড়ো মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত। ছোট ফুফু তানিয়া সিদ্দিকী নীহারিকার কাঁধে হাত রেখে তাকে আশ্বাস দেয়। কিছুটা সময় নিয়ে সেও কবুল বলে।
ঋত্বিককে যখন কবুল বলতে বলা হয় তখন সে তার বাবার দিকে তাকায়, রহমান চৌধুরী ছেলের কানে কানে কিছু বলে। কাজি আবার বললে ঋত্বিকও সুন্দর করে তিনবার কবুল বলে দেয়। তারপর দুজন রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করে। নিশিতা আর ঋভানের বিয়ে টাও ভালো ভাবে সম্পূর্ণ হয়।
তবে যখন পর্দা সরিয়ে বউয়ের মুখ দেখতে বলা হয় তখন ঋত্বিক বেঁকে বসে। রহমান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলে “ না আমি দেখবো না। তুমি না বললে তোমার কথা শুনলে চকলেট দিবে, কই দিলে না তো। আমি তো তোমার কথা মতো কবুল বলেছি তাহলে চকলেট দিচ্ছো না কেনো? চকলেট না দিলে কিন্তু আমি বউকে দেখবো না” সবার তখন মাথায় হাত, ঋত্বিক কী বলছে এসব? স্বাভাবিক ছিল শুধু ইয়ামিন সিদ্দিকী, শায়লা খানম আর নিশিতা। কারণ তারা আগে থেকেই সব জানতো। নীহারিকার চোখ থেকে দুফোঁটা পানি গড়িয়ে পরে।
এরপর বর কনেদের স্টেজে নিয়ে বসানো হয়। নিশিতা তো ছবি তুলতেই ব্যস্ত। তার ভালোবাসার মানুষের সাথেই তার বিয়ে হয়েছে। আর তার এই পূর্ণতার জন্য নীহারিকা বলি হলো।
ঋত্বিক তার পুতুলটা সোফার একপাশে রেখে চকলেট ছিলে তাতে কামর বসায়। মাত্রই তাকে তার মামাতো ভাই চকলেটটা দিয়ে গেছে। পাশ থেকে সে নীহারিকার ফুঁপানোর শব্দ শুনে বলে,
– ও বউ তুমি কাঁদছো কেনো? তোমাকে কেউ চকলেট দেয়নি বলে? আচ্ছা ঠিক আছে কেঁদো না, তুমি আমার সাথে ভাগ করে খাও। তুমি তো আমার বউ হও তোমার সাথে ভাগ করে খেতে আমার সমস্যা নেই। দাদু বলেছে বর বউ একে অপরের বন্ধু।
কথা গুলো বলে নীহারিকার দিকে চকলেট বাড়িয়ে দেয়। মুখের সামনে চকলেট দেখে কান্না ভেজা চোখে ঘার ঘুরিয়ে ঋত্বিকের দিকে তাকায় নীহারিকা। আস্তে করে বলে,
– আমি খাবো না চকলেট, আপনি খান।
– কেনো খাবে না? আমি আগে খেয়েছি বলে রাগ করেছো?
নীহারিকা চোখ মুছে বলে,
– না রাগ করিনি। এমনিই খাবো না।
                                      ❀
বর-কনেদের জন্য বিশাল দুইটা ডালা সাজানো হয়েছে—মাঝখানে আস্ত খাসি, চারপাশে পোলাও, রোস্ট, কাবাব, ফ্রাই, ডিম আর হরেক রকমের পদ। দুটো টেবিল একইরকম ভাবে সাজানো হয়েছে। নিশিতা আর ঋভান যেই টেবিলে বসেছে সেখানে বেশ অনেক মানুষের ভীড়। কিন্তু নীহারিকা আর ঋত্বিক এর টেবিলে ভীড় তুলনামূলক কম। যে ক'জন আছে তারা বরপক্ষের লোক। কণেপক্ষের একটা কাকপক্ষীও সেখানে নেই।
ঋত্বিক আর নীহারিকা পাশাপাশি বসে আছে। সামনে বড়ো শাহী ডালা সাজানো। ঋত্বিক এখন একদম চুপচাপ বসে আছে। সে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। নীহারিকার একটি হাত ঋত্বিকের কোলের উপর এবং সেটা নিয়ে খেলা করছে। কখনো আঙ্গুল গুণছে তো আবার নরম হাতটি টিপে দিচ্ছে। নীহারিকা একবার ছাড়িয়ে নিতে চেয়েছিল কিন্তু ঋত্বিক ছাড়েনি।
এবার সবাই খাওয়ার জন্য বলে। নীহারিকা এবং ঋত্বিক দুজনেরই হাত ধুয়ানো হয়। ছোট্ট লোকমা তুলে আস্তে আস্তে খেতে শুরু করে নীহারিকা। কিন্তু ঋত্বিক খাচ্ছে না ব্যাপারটা নীহারিকা খেয়াল করলেও কিছু বলে না। ঋত্বিকের এক কাজিন রাজ বলে,
– ঋত্বিক ভাই তুমি খাচ্ছো না কেনো?
ঋত্বিক ঠোঁট দুটো ফুলিয়ে বাচ্চাদের মতো করে বলে,
– বউ একা একাই খাচ্ছে, আমাকে খাইয়ে দিচ্ছে না কেনো? আমি বউয়ের হাতে খাবো।
নীহারিকা কথাটা শুনে চমকে উঠে। এই লোক বলে কি! সাজগোছ, ভারী শাড়ি জুয়েলারি পরে তার নিজেরই তো খেতে কষ্ট হচ্ছে। আর হুট করে অচেনা একজনকে খাইয়ে দেওয়া যায় নাকি? যদি হয় প্রাপ্ত বয়স্ক একজন পুরুষ। নীহারিকা বুঝতে পরে সবাই তার দিকে আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। সে আমতা আমতা করে বলে,
– আ...আমি কী করে...
রাজ বলে উঠে,
– আরে ভাবি সমস্যা কই আপনারই তো স্বামী। একটু খাইয়ে দিন না নাহলে আজকে আর কিচ্ছু মুখে দিবে না।
স্বামী? হ্যাঁ লোকটা নীহারিকার স্বামীই তো। বাবা-মার ইচ্ছায় কিছুক্ষণ আগেই তো এই লোকটার নামে কবুল বলেছে। আজকে থেকে ঋত্বিক চৌধুরীই তার সব থেকে আপন। কিন্তু তার এই সম্পর্কে ধারণা নেই। কিভাবে কাটবে বাকিজীবন? আদৌও কখনো সুস্থ হবে ঋত্বিক? কখনো কি তাকে বুঝবে? ভালোবেসে আগলে নিবে?
জানে না, কিচ্ছু জানে না নীহারিকা। সে আর কিছু ভাবতে পারছে না। সে মুক্তি চায় এই সিদ্দিকী বাড়ি থেকে।
– কী হলো বউ, খাইয়ে দাও আমাকে।
ঋত্বিকের কথা শুনে নীহারিকা নিজের সাথে সাথে তাকেও খাইয়ে দেয়। যদিও শুরুতে তার অস্বস্তি হচ্ছিল কিন্তু পরে আর খারাপ লাগে না। খাইয়ে সুন্দর করে মুখটাও মুছিয়ে দেয়। রহমান চৌধুরী নীহারিকার কাজে বেশ খুশি হন। বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঋত্বিকের কাছ থেকে তার পুতুলটা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। রাজ বলেছে সারাক্ষণ পুতুল নিয়ে পরে থাকলে বউ নাকি রাগ করে চলে যাবে। তাই নিজ ইচ্ছায় দিয়ে দিয়েছে। বউকে ঋত্বিকের খুব পছন্দ হয়েছে। পুতুলের জন্য তো আর বউ হারালে চলবে না।
সারিকার মাথাব্যথা করায় পার্কিং লটে এসেছে। গাড়িতেই ব্যগের মধ্যে ঔষধ আছে। ঔষধ খেয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখে সীটের মধ্যে আরও একটি ব্যাগ। কৌতূহলবশত সেটা খুললেই দেখতে পায় সেখানে দুটো নিকাহনামা আর দুটো আয়না। এগুলোতো ঋভান অনলাইন থেকে আনিয়েছে।হায় আল্লাহ গাড়ি থেকে নামার সময় সবাই ভুলে গেছে। ব্যাগটা নিয়ে সারিকা কনভেনশন হলে প্রবেশ করে। ঋভান আর নিশিতা তখন স্টেজে বসা ছিল সাথে তাদের কিছু ফ্রেন্ডস।
– ঋভান ভাই তুমি দেখি এগুলোর কথা ভুলে গেছো।
এরপর তাড়াতাড়ি করে আবার বউয়ের মাথায় ঘোমটা দেওয়া হয়। নিশিতা আর ঋভান আগে সই করে। সুন্দর করে সেটার ভিডিও এবং ফটোশুট করা হয়। রাজ ঋত্বিককে একটা ভিডিও দেখিয়ে সুন্দর করে বুঝিয়ে দেয় কিভাবে কি করতে হবে।
নিকাহনামাটা খুললেই সেখানে অনেক কিছু লেখা দেখা যায়। বর-বউয়ের নামসহ তাদের বিয়ের তারিখও আছে। মাঝ বরাবর বর বউয়ের নাম
                        Ritwik Chowdhury
                                      &
                          Niharika Siddiqui
ভালো ভাবেই সম্পূর্ণ হয় সবটা। এবার আয়না ধরে আগে ঋত্বিককে জিজ্ঞেস করা হয়। সারিকা বলে,
– ভাই আয়নাতে কী দেখতে পাচ্ছো?"
ঋত্বিক অবুঝের মতো বলে,
– আমার বউকে ♡
একই ভাবে নীহারিকাকেও জিজ্ঞেস করা হয়,
– আয়নাতে কী দেখতে পাচ্ছো ভাবী?
একটু ভেবে নীহারিকা বলে,
– আমার নিয়তি।
#মনটা_কথা_শোনে_না (সূচনা)
#লেখনীতে_মিথিলা_ইসলাম

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন