#মনটা_কথা_শোনে_না (২)
#লেখনীতে_মিথিলা_ইসলাম
সব নিয়মনীতি মেনে বিয়ে, দু'পক্ষের খাওয়া-দাওয়া সব সম্পন্ন হয়েছে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমেছে ধরনীর বুকে। বাহারি আলোকসজ্জায় পুরো হল হীরের মতো ঝলমল করছে। বরপক্ষ বিদায় নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। কনেপক্ষ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে দুই মেয়েকে বিদায় দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে সবার চোখের পানি যেন শুধু নিশিতার জন্যই, নীহারিকার জন্য নয়। নিশিতা বাবা-মাকে ধরে কাঁদছে, তারাও মেয়ের জন্য চোখের পানি ফেলছে। কিন্তু নীহারিকার জন্য কাঁদার কেউ আছে? নেই, তার জন্য এই বাড়িতে কেউ নেই। ঋত্বিক নীহারিকার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
নীহারিকা চোখে পানি নিয়ে সবার দিকে তাকায়। কিন্তু তার পানে কেউই তাকালো না। এবার সে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে। ভীড়ের মধ্যে থেকে তানিয়া সিদ্দিকী এসে নীহারিকাকে জড়িয়ে ধরে। নীহারিকা ফুপ্পিকে জড়িয়ে ধরে বলে,
– নিয়তি আমার বেলায় কেনো এত নিষ্ঠুর ফুপ্পি? সবসময় কেনো আমার সাথেই বেইমানি করে? মা-বাবা অন্তত আজকে আমাকে একটু ভালোবাসতে পারতো। কেনো বাসলো না ভালো আমাকে? আমার দোষটা কোথায় ফুপ্পি? আমি তাদের সন্তান এটাই কি আমার অপরাধ? আমার নিশিতা আপুকে হিংসা হয় ফুপ্পি। আপু না চাইতেও সব পেলো কিন্তু আমি তো চেয়েও কিছু পেলাম না। আমি চাই না হিংসা করতে। তারা আমাকে কখনো বুঝলোনা ফুপ্পি, বুঝলো না তারা আমাকে।
তানিয়া সিদ্দিকী কোনোরকম কান্না আঁটকে বললেন,
– কে বলেছে তোকে কেউ ভালোবাসে না? আমি তো অনেক ভালোবাসি আমার ছোট্ট নীহাকে। আর এখন তো ঋত্বিক আছে। আল্লাহ চাইলে আর সঠিক চিকিৎসা চললে সে খুব দ্রুতই সুস্থ হয়ে যাবে। দেখিস সে তোকে এতটা ভালোবাসবে যে দুনিয়ার আর কারো ভালোবাসা তোর লাগবে না। আল্লাহ তোকে অনেক অনেক সুখ দিবে। ততদিন পর্যন্ত তো ধৈর্য ধরতে হবে তাই না! আর যারা তোকে এতদিন অবহেলা করেছে তারা ঠিক একদিন তোর মূল্য বুঝবে।
নীহারিকা ফুপ্পিকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে থাকে। আর কত ধৈর্য ধরবে সে? ১৯ টা বছর কি কম নাকি? তার যে আর ধৈর্যে কুলোয় না। বউয়ের এত কান্না ঋত্বিকের আর সহ্য হচ্ছে না। কে কষ্ট দিয়েছে তার বউকে? তার পুতুলের মতো বউটা কাঁদছে কেনো?। সবশেষে আর না পেরে বলে,
– ও বউ তুমি কাঁদছো কেনো? তোমায় কে মেরেছে? আমাকে বলো, আমিও তাকে মেরে দিবো। তবুও তুমি কেঁদো না। তোমার কান্না আমার আর সহ্য হচ্ছে না।
নীহারিকা ভেজা চোখ নিয়ে ঋত্বিকের পানে অবাক হয়েছে তাকিয়ে থাকে। মাত্র কয়েকঘন্টার পরিচয়ে লোকটা তাকে এতটাই আপন করে নিয়েছে! যে এখন তার কান্না সহ্য হচ্ছে না। তানিয়া সিদ্দিকী নীহারিকার হাত আর ঋত্বিকের হাত এক করে বলে,
– এই যে দুজন দুজনার হাত ধরেছো এটা যেনো সারাজীবন অটুট থাকে। যত খারাপ সময়ই আসুক না কেনো দুজনে হাতে হাত রেখে মোকাবিলা করবে। তোমরা একে অপরের সব থেকে আপন। কেউ কখনো অপরকে কষ্ট দিবে না। দোয়া করি তোমরা অনেক অনেক সুখী হও।
সবাই বিদায় দেওয়ার জন্য হল থেকে বের হয়ে গেটের সামনে আসে। ইয়ামিন সিদ্দিকী বড়ো মেয়ে নিশিতাকে জামাইয়ের হাতে তুলে দেয়। শায়লা খানম কাঁদতে কাঁদতে মেয়েকে গাড়িতে বসায়। ঋভানের হাত ধরে কিছু বলেন। কিন্তু নীহারিকা দূর থেকে কিছু শুনতে পায় না। তানিয়া সিদ্দিকী ছাড়া তার সাথে কেউ নেই। ঋত্বিক আগেই গাড়িতে উঠে এক সাইডে চেপে বসে নীহারিকাকে বলে,
— ও বউ তাড়াতাড়ি আসো। দেখো আমি তোমার জন্য জায়গা রেখেছি। তুমি জলদি না আসলে অন্য কেউ বসে পরবে তো।
নীহারিকা তানিয়া সিদ্দিকীকে শেষ বারের মতো জড়িয়ে ধরে বলে,
– আসছি ফুপ্পি, ভালো থেকো। আমাকে ভুলে যেয়েও না তুমি। তাহলে আমি সইতে পারবো না। ভালোবাসি ফুপ্পি তোমাকে, অনেক বেশি।
তানিয়া সিদ্দিকী নীহারিকার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
– ধুর পাগলি তোকে ভুলবো কেনো? তুই যেমন ফুপ্পিকে ভালোবাসিস ফুপ্পিও তোকে তেমন ভালোবাসে। আর শোন যখনই ইচ্ছে হবে ঋত্বিককে নিয়ে আমার বাসায় চলে আসবি। আমি তোর অপেক্ষায় থাকবো।
– আচ্ছা যাবো। আসি এখন।
নীহারিকা গাড়িতে উঠে ঋত্বিক পাশে বসে। জানালার কাচ নামিয়ে শেষ বারের জন্য সবাইকে দেখে নেয়। একে একে বর পক্ষের সব গুলো গাড়ি স্টার্ট করা হয়েছে। হাতিরঝিল ছেড়ে মতিঝিলের উদ্দেশে রওনা হয়।
চোখ মুছে স্বাভাবিক হয়ে বসে। সে আর এই মানুষ গুলোর প্রতি কোনো পিছুটান রাখবে না। তাদের ভেবে আর কখনো কষ্ট পাবে না। যাদের কাছে তার কোনো মূল্য নেই সেখানে পিছুটান রাখার কোনো মানে নেই। আজ থেকে সকল ভালোবাসা, পিছুটান শুধু নিজের জন্য। নিজেকে ভালোবাসবে।
ঋত্বিক হঠাৎ করে নীহারিকার কাঁধে মাথা রেখে এক হাত জড়িয়ে ধরে। নীহারিকা চমকে উঠে। সে ভাবতে পারেনি ঋত্বিক এমন কান্ড করে বসবে। তার অস্বস্তি হচ্ছে। হাঁসফাঁস করে উঠে, ঢোক গিলে বলে,
— এমন করছেন কেনো? কি হয়েছে?
ঋত্বিক ঠোঁট উল্টে বলে,
— ভালো লাগছে না বউ।
নীহারিকা ভ্রু যুগল কুচকে বলে,
— কেনো, আপনার ভালো লাগছে না কেনো?
ঋত্বিক কাঁধ থেকে মাথা উঠায় কিন্তু হাত ছাড়ে না। নিচের দিকে তাকিয়ে বলে,
– তুমি এত কাঁদো কেনো?
নীহারিকা এবার ঋত্বিকের পানে তাকিয়ে বলে,
– আমি কাঁদলে আপনার খারাপ লাগে?
দুপাট্টার একটা কোনা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে বলে,
– হুম। তুমি আর কাঁদবে না, ঠিক আছে?
মুচকি হেসে নীহারিকা উত্তর দেয়,
— আচ্ছা আর কাঁদবো না।
মতিঝিল পৌঁছাতে আধঘন্টার মতো সময় লাগে। পারভিন মির্জা—ঋত্বিক ঋভানের মা সাথে আরও কিছু মহিলা দাঁড়িয়ে আছে বউদের বরণ করার জন্য। গাড়ি গুলো বাড়ির সামনে থামতেই ছোটরা সামনে এগিয়ে আসে ফুলের ডালা নিয়ে। বর বউ গাড়ি থেকে নামলেই তাদের ছিটিয়ে দিবে।
সবাই নামলেও দুই নতুন দম্পতির কেউ এখনো নামে নি। নীহারিকা নামার জন্য শাড়ির কুচি আঁচল সব ঠিক করে নেয়। রাজ তাদের জানালায় টোকা দিয়ে বলে,
– ঋত্বিক ভাই তোমার বউকে নিয়ে নেমে আসো। আগে তুমি নামবে এরপর বউকে হাত ধরে নামাবে।
অন্যদিকে ঋভান গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে। নিশিতা এখনো ভিতরের। সে লেহেঙ্গা পরেছে, খুব ওজন সেটার। ঋভানের হাতে হাত রেখে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়।
ঋত্বিক নেমে নীহারিকার দিকে ডান হাত বাড়িয়ে দেয়। বলে,
– বউ তুমি আমার হাত ধরে সাবধানে নেমে এসো।
স্বামীর হাত ধরেই নামে নীহারিকা। ছোটরা ফুল ছিটিয়ে নব দম্পতিদের ওয়েলকাম করে। পারভীন মির্জা দুই ভাইকেই বলে,
– বউমাদের নিয়ে সামনে আসো। বরণ করবো।
দুই ভাই এগিয়ে যায়। শাশুড়ীসহ আশেপাশে যারা ছিল সবাইকেই সালাম দেয় নিশিতা এবং নীহারিকা। পারভীন মির্জা দুই ছেলে আর ছেলের বউদের মিষ্টিমুখ করায়। তাদের উদ্দ্যেশে বলে 'দোয়া করি সুখী হও তোমরা'। একে একে বেশ কয়েকজন মিষ্টি খাইয়ে দেয়।
একজন মুরুব্বী যিনি সম্পর্কে ঋত্বিক আর ঋভানের নানু হয়। সে বলে,
– নানু ভাইয়েরা বউকে কোলে তুলে ঘরে নিয়ে যাও।
সেখানে একজন মেয়ে নয় মাসের একটা বাচ্চাকে কোলে করে দাঁড়িয়ে আছে। ঋত্বিক বুঝতে পারে না কিভাবে কোলে নিবে। ছোট বাচ্চাদের যেভাবে কোলে তুলে সেভাবে? কিন্তু এত বড়ো বউকে কি সেভাবে কোলে নেওয়া যায় নাকি। এরমধ্যে ঋভান নিশিতা কে কোলে তুলে নেয়।
ঋত্বিকও এবার বুঝতে পারে কিভাবে কোলে নিতে হবে। নীহারিকাকে কোলে তুলে ভাইয়ের পিছু পিছু যায়। স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে শশুর বাড়িতে প্রবেশ করে।
হল রুমে থাকা সোফায় নিশিতাকে বসিয়ে দেয় ঋভান। তার দেখাদেখি ঋত্বিকও নীহারিকাকে পাশের সোফায় বসিয়ে দেয়। ছোট বড়ো কাজিনরা নতুন বউদের ঘিরে ধরে। সেখানে গল্পের আসর জমে যায়। মাহিদ ছেলে কাজিন আর নতুন বরদের বলে,
–চলো আমরা সবাই ছাদে যেয়ে আড্ডা দেই।
রাজ ঋত্বিকের হাত ধরে বলে,
– চলো ছাদে যাবো।
ঋত্বিক আগের জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। রাজ আবার বলে,
– কি হলো, চলো।
দুদিকে মাথা নেড়ে ঋত্বিক বলে,
— না আমি বউকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। আমি চলে গেলে যদি বউ কাঁদে?
ঋত্বিকের কথায় সবাই উচ্চস্বরে হেঁসে উঠে। নীহারিকা বেশ লজ্জা পায়। রাজ আরেকটু বাড়িয়ে দিতে বলে,
– কি বড়ো ভাবি, আপনি কাঁদবেন?
নীহারিকা লজ্জায় মাথা নিচু করে নিয়েছে। সেভাবেই ডানে বামে মাথা নাড়ায়। অর্থাৎ সে কাঁদবে না। আরেক দফা হেঁসে উঠে সবাই। ঋত্বিক আর ঋভানকে নিয়ে সবাই ছাদে চলে যায়।
#চলবে?