ফন্ট সাইজ:
থিম:
মনটা কথা শোনে না

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: মিথিলা ইসলাম

#মনটা_কথা_শোনে_না (৬)

#লেখনীতে_মিথিলা_ইসলাম

গভীর রাত। পুরো বাড়ি ঘুমে তলিয়ে আছে। চারদিকে শুনশান নীরবতা। দূর থেকে কয়েকটা কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ শোনা যাচ্ছে। নিস্তব্ধতার জন্য ফ্যানের ক্ষীণ আওয়াজটাও বিরক্তিকর ঠেকছে। কালকে ক্লান্ত থাকায় ঘুমিয়ে পড়লেও আজ ঘুম আসছে না নীহারিকার। হঠাৎ জায়গা বদল হলে ঘুমটা চোখে ধরা দিতে চায় না। ডান পাশে কাত হয়ে টিকটক দেখছে সে। ঋত্বিক হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে।

আজকাল টিকটকের ট্রেন্ডিং ভিডিও হিসেবে একটা ভিডিও বেশ ভাইরাল। সবাই সেই ভিডিও রিক্রিয়েট করছে। আর সেটা হলো পাছু ড্যান্স। সবাই পাছু দুলিয়ে দুলিয়ে সেই ভিডিও করতে হুমরি খেয়ে পরেছে। এই অল্প সময়ের মধ্যে ৮-৯টা ভিডিও ফিডে এসেছে। নীহারিকা বেশ বিরক্ত এতে।

ইশ! আবার সেই ভিডিও। নীহারিকা বিরক্ত হয়ে যেই না টিকটক থেকে বের হবে তখনই পিছন থেকে ঋত্বিকের আওয়াজ ভেসে আসে।

— বউ মেয়ে গুলোর কি লজ্জা নেই? এভাবে পাছু দুলিয়ে নাচছে কেন?

নীহারিকা আতকে উঠে শুয়া থেকে এক লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। ড্যাবড্যাব করে ঋত্বিকের পানে তাকিয়ে রয়।সে তো ভেবেছিল মহাশয় হয়তো ঘুমে কাতর। কিন্তু এ তো তার পিছনে শুয়ে শুয়ে টিকটক দেখছিল। এখন ইনোসেন্ট মুখ করে কেমন করে তাকিয়ে আছে দ্যাখো! নীহারিকা জিজ্ঞেস করে,

— আপনি ঘুমান নি?

ঋত্বিক বাচ্চাদের মতো করে বলে,

— না, আমি ঘুম আসছিল না তাই তো তোমার সাথে ভিডিও দেখছিলাম

নীহারিকা তেতে উঠে বলে,

— একটু আগে যেনো কি বললেন! 'বউ মেয়ে গুলোর কি লজ্জা নেই? এভাবে পাছু দুলিয়ে নাচছে কেনো? এই আপনি ওদের পাছু দেখেছেন এতক্ষণ?

ঋত্বিক মিনমিনে স্বরে বলে,

— হ্যাঁ, আর আমি একা নাকি তুমিও তো দেখছিলে।

নীহারিকা এবার বেশ রেগে যায়। বলে,

— কিহ! এই আমি না আপনার বউ। আপনি আমারটা রেখে অন্যদের পাছু দেখছেন?

ঋত্বিক বেশ ইনোসেন্ট মুখ করে বলে,

— তাহলে কি তোমারটা দেখবো?

চেঁচিয়ে উঠে নীহারিকা,

— আমারটা দেখবেন মানেহ?

— ও বউ এমন করছো কেনো? তুমিই তো বললে আমি তোমারটা রেখে অন্য কারো পাছু দেখছি।

নীহারিকা এবার বেশ থতমত খেয়ে যায়। তখন যে মুখ ফস্কে কি না কি বলে ফেলেছে! তবুও নিজের দোষ স্বীকার না করে বলে,

— অসভ্য! আপনাকে কারোর পাছু দেখতে হবে না। নিজেরটা দেখুন গে হাজার বার।

— ভিডিওর মেয়েগুলোই তো দেখাচ্ছিল। আমি দেখলে কি হবে?

নীহারিকা রেগে এবার বালিশ ছুড়ে মেরে বলে,

— চুপ করুন আপনি।

ঋত্বিক ঠোঁটে আঙুল রেখে বলে,

— আচ্ছা।

রাগে এখনো ফোঁসফোঁস করছে নীহারিকা। লোকটার কত্ত বড়ো সাহস! এতক্ষণ অন্য মেয়েদের পাছু দেখছিল। তার পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে রাগে। যদি সুস্থ হতো তাহলে এক বাড়ি দিয়ে সব স্মৃতি ভুলিয়ে দিত।

বউকে রেগে যেতে দেখে ঋত্বিক বেশ ভয় পেয়েছে। বুঝতে পারছেনা কি করবে। তারমধ্যে প্রচন্ড খিদে পেয়েছে। রাতের খাবারের সময় অল্প কিছু খেয়ে উঠে গিয়েছিল। কিন্তু এখন খিদের কথা বললে যদি নীহারিকা রেগে যায়। কিন্তু না বলেও তো পারছে না। একটু ভেবে সাহস করে বলেই ফেললো,

— বউ আমার না খুব খিদে পেয়েছে। আর থাকতে পারছি না।

নীহারিকা মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে। ঋত্বিক মুখটা একটু খানি হয়েছে খিদের জ্বালায়। তার বেশ মায়া লাগে। কাছে এগিয়ে এসে চুলে হাত রেখে বলে,

— কি খাবেন?

ঋত্বিক বেশ আনন্দের সাথে বলে,

— তোমার হাতের নুডলস রান্না খাবো।

নীহারিকা বিচলিত হয়ে বলে,

— এখন?

— হ্যাঁ।

— কিন্তু আমি তো জানি না কোথায় কি রাখা আছে। আর এত রাতে কাকে ডেকে তুলবো!

ঋত্বিক বুঝদারের মতো বলে,

— কেনো আমি আছি না! আমরা দুজন মিলে খুঁজলে পেয়ে যাবো। চলো রান্না ঘরে যাই।

— ঠিক আছে চলুন।

ফোনের ফ্ল্যাশ অন করে ঋত্বিককে নিচে নেমে আসে। ফোনের আলো ছাড়া আর কোনো আলো নেই। সবাই দরজা আঁটকে ঘুমে মগ্ন। পা টিপে টিপে দুজনে রান্না ঘরে প্রবেশ করে। বাতি জ্বালিয়ে দরজা ভিড়িয়ে দেয়। এবার সব কিছু খুঁজতে শুরু করে।

নীহারিকা ঋত্বিক কে উঁচু ক্যাবিনেট গুলোতে নুডলস খোঁজার দায়িত্ব দিয়েছে। তার ধারণা সেখানে খুঁজলেই নুডলস পাওয়া যাবে।

নীহারিকা ফ্রিজ থেকে দু-তিন ধরনের সস বের করে। একটি ঝুড়িতে পেঁয়াজ, মরিচ পায়। খাঁচি থেকে দুটো ডিম নেয়। কিন্তু এখনো নুডলস খুঁজে পায়নি ঋত্বিক। এক সাইডে না পেয়ে এবার অন্য সাইডে আসে। মাঝের ক্যাবিনেটে পেয়েও যায়। বড়ো এক ডিবিতে নুডলসের প্যাকেট গুলো।

নীহারিকা ডিবিটা নামাতে বলে। ঋত্বিক নিচের দিকে তাকিয়ে ডিবিটা জোরে টান মারে। এতে করে পাশে থাকা আটার ডিবিটায় ধাক্কা লেগে সেটা ঋত্বিকের মাথার উপর পরে। নীহারিকা হতভম্ব হয়ে যায়। সে বুঝে উঠতে পারে না কি থেকে কি হয়ে গেলো। হাতে নুডলস আর মাথার উপর আটার ডিবি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে ভীষণ ফানি লাগছে। নীহারিকা তাড়াতাড়ি করে ফোনে একটা ছবি তুলে নেয়।

এরপর হাত থেকে নুডলস নিয়ে রাখে। মাথা থেকে আলতো হাতে আটা গুলো ঝাড়তে শুরু করে। কিন্তু এত গুলো আটা কি আর ঝাড়লে যায়! তাই সে ঋত্বিককে বলে,

— আপনি এখন এখানে চুপচাপ বসে থাকুন।

— আমাকে কি ভূতের মতো লাগছে বউ?

নীহারিকা মুখ টিপে হাসে। বলে,

— না, খুবই সুন্দর লাগছে আপনাকে।

— তাহলে তুমি হাসছো কেনো?

— এমনি। আপনি এখন চুপচাপ বসুন তো। আমি তাড়াতাড়ি করে এগুলো পরিষ্কার করে রান্নাটা সেরে ফেলি। তারপর ঘরে গিয়ে গোসল করে নিয়েন। নাহলে এগুলো যাবে না।

— আচ্ছা ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি করবে বউ, আমার অনেক খিদে পেয়েছে।

— ঠিক আছে।

একটা ঝাড়ু আর বেলচা দিয়ে আটা গুলো তুলে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। সুন্দর হাত ধুয়ে আগে কাটাকুটি করে। ঋত্বিক তখন অপলক দৃষ্টিতে বউকে দেখে যাচ্ছে। আর নীহারিকা তার কাজে ব্যস্ত। খুব দ্রুত রান্না করার চেষ্টা করছে। কারণ ঋত্বিকের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে কতটা ক্ষুদার্ত সে। ২০ মিনিটের মধ্যেই খুব সিম্পল ভবে রান্নাটা শেষ করে করে নীহারিকা। এরপর রান্না ঘরের লাইট অফ করে বেরিয়ে আসে। অন্ধকারের মধ্যেই আগে আগে যেতে শুরু ঋত্বিক। নীহারিকা তার থেকে বেশ খানিকটা দূরে। এক হাত আর আরেক প্লেট নিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে আসছে।

এই রাত্রি বেলা হঠাৎ করেই মাহিদের খুব কাশি শুরু হয়। কিন্তু উঠে দেখে জগে এক ফোঁটা পানিও নেই। তাই অগত্যা জগ নিয়ে রুম থেকে বের হয়। হাতে করে ফোনটাও আনে না। আবছা আলোয় করিডর পেরিয়ে সিঁড়ির সামনে আসতেই ভয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠে।

কিছু না বুঝে ঋত্বিকও পাল্টা চিৎকার শুরু করে। নীহারিকা কোনোমতে লাইট জ্বালিয়ে দেয়। ওদের চিৎকার শুনে সকলে হন্তদন্ত হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে।

সিঁড়ির পাশে দাঁড়ানো মাহিদ। আর তার বরাবরই সিঁড়িতে আটা মাখা মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঋত্বিক। সবাই তার এই অবস্থা দেখে হতভম্ব হয়ে যায়। এই ছেলে এমন আটা দিয়ে মাখল কি করে?

নিচে সিঁড়ির এক কোণে দাঁড়ানো নীহারিকাকে কেউ তখনো খেয়াল করেনি। সবাই ঋত্বিকের হা করে তাকিয়ে আছে।

শারজাহান চৌধুরী নীহারিকা কে খেয়াল করেন। সে এগিয়ে এসে বলে,

— নীহারিকা মামনি ওর এই অবস্থা কেনো?

নীহারিকা মিনমিন করে বলে,

— নুডলস খুঁজতে যেয়ে।

সবাই এক সাথে বলে উঠে,

— মানেহ?

নীহারিকা পুরো ঘটনা খুলে বলে। হাসবে নাকি কাঁদবে এটা নিয়ে সবাই কনফিউজড। ঋভান সবার আগে হো হো করে হেসে ওঠে। তার দেখাদেখি সকলে উচ্চ স্বরে হেসে ওঠে। নীহারিকা আর ঋত্বিক বেশ লজ্জা পায়। শারজাহান চৌধুরী পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বলে,

— আচ্ছা যা হওয়ার হয়েছে। সবাই এখন ঘুমোতে যাও। আর নীহারিকা মামনি তুমিও ওকে নিয়ে ঘরে চলে যাও। দুজনে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।

— ঠিক আছে বাবা। শুভ রাত্রি।

— শুভ রাত্রি মামনি।

সবাই হাসতে হাসতে নিজেদের রুমে যায়। মাহিদও পানি নিতে নিচে নামে। যেই ভয় পেয়েছে বেচারা। জ্বর না চলে আসে। ঘরে যেয়ে আগে ভাগেই প্যারাসিটামল খেতে হবে। নীহারিকা আর ঋত্বিকও নিজেদের রুমে আসে। ইশ! কত লজ্জায় পড়তে হলো সবার সামনে।

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন