ফন্ট সাইজ:
থিম:
মনটা কথা শোনে না

৭ম পর্ব

লেখক: মিথিলা ইসলাম

#মনটা_কথা_শোনে_না (৭)

#লেখনীতে_মিথিলা_ইসলাম

রুমের এমাথা থেকে ওমাথা পায়চারি করছে নীহারিকা। ইশ কালকে সকালে সবাই কি বলবে! সব ঋত্বিকের দোষ।

নুডলস টেবিলের উপর ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রেখেছে। ঋত্বিক গেছে গোসল করতে কিন্তু এখনো বের হওয়ার নামগন্ধ নেই। সেখানে আবার ঘুমিয়ে পড়লো নাকি। নীহারিকা চিন্তিত হয়ে দরজায় টোকা দেয়। তবে খুলে না। তাই এবার ডাকতে শুরু করে,

— ঋত্বিক, ঋত্বিক শুনছেন?

খট করে দরজাটা খুলে নীহারিকা কিছু বুঝে উঠার আগেই ঋত্বিক টেনে ভিতরে নিয়ে যায়। নীহারিকা বুঝে উঠতে পারলো না কি থেকে কি হয়ে গেলো। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। গায়ে সাবান পানি নিয়েই ছোট্ট একটা টুলের উপর বসে পড়ে। নীহারিকার দিকে শরীর মাজুনিটা এগিয়ে দিয়ে বলে,

— একটু ডলে দাও তো বউ। পিঠ আর ঘাড়ের গুলো আমি উঠাতে পারছি না। অনেক চেষ্টা করেছি। হাতের নাগাল পাই না।

নীহারিকা শাওয়ার জেল ভালো মতো মাখিয়ে সব আটা পরিষ্কার করে দেয়। চুল গুলো কেমন যেনো আঠা আঠা হয়ে গেছে। তাই সুন্দর করে শ্যাম্পু করে দিয়ে বের হয়ে আসে। পরনের জামা কিছুটা ভিজে গেছে। তাই ফ্যানের নিচে সেই অংশটুকু মেলে দিয়ে বসে থাকে। এখন কাপড় চেঞ্জ করার কোনো ইচ্ছে নেই। তার কাছে বিরক্তিকর কাজ হচ্ছে জামা-কাপড়ে চেঞ্জ করা। এত্তো বিরক্ত লাগে বলার বাইরে।

ঋত্বিক বের হলে খেতে শুরু করে দুজন। নীহারিকা অল্প একটু খেয়ে আর খায় না। পুরোটা তৃপ্তির সাথে খেয়ে শেষ করে ঋত্বিক। পানি পান করে নীহারিকার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলে,

— অনেক অনেক ইয়াম্মি হয়েছে।

— তাই?

— হুম। এখন থেকে কিন্তু খেতে ইচ্ছে করলেই তুমি রান্না করে দিবে। আমি অন্য কারো রান্না করাটা খাবো না।

— আচ্ছা ঠিক আছে।

❀

আজকে বৌভাত। তাই ব্যস্ততা অনেক বেশি। প্রোগ্রামটা খুব বেশি বড়ো হবে না। ঘরোয়াভাবে হবে। শুধুমাত্র দু'পক্ষের লোকজন থাকবে। নীহারিকা আর ঋত্বিক এখনো ঘুমে। আজকে বৌভাত তাদের সে খেয়াল নেই। পারভীন মির্জা তার ভাইয়ের মেয়েকে ওদের ডেকে আনতে বলে।

অনেকবার দরজায় টোকা দেওয়ার পর সেই শব্দে নীহারিকার ঘুম ভাঙ্গে। সে ঘুম ঘুম চোখে দরজা খোলে। মাহিরা তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হতে সেখান থেকে চলে যায়। নীহারিকা এবার ঋত্বিককে উঠানোর কাজে লেগে পড়ে। এই ফাজিল পুরুষের সহজে ঘুম ভাঙ্গে না।

মিনিট পাঁচেক ডাকার পরও যখন কোনো কাজ হয় না। তখন নীহারিকা হাতের তালুতে পানি নিয়ে ছিটিয়ে দেয়। ধড়ফড় করে উঠে বসে ঋত্বিক বলে,

— বউ, বউ আমাদের ছাদ ফুটো হয়ে গেছে।

নীহারিকা বাজখাঁই গলায় বলে,

— কিচ্ছু হয়নি। আমি পানি মেরেছি।

ঋত্বিক কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে,

— তুমি পঁচা বউ। আমাকে ঘুমোতে দিলে না।

— হ্যাঁ আমি পঁচা। এখন উঠুন তাড়াতাড়ি।

— না, আমি উঠবো না। আরো ঘুমাবো।

নীহারিকা এবার পা ধরে টানতে শুরু করে। ঋত্বিক বেচারা এবার থাকতে না পেরে উঠে বসে। ঠেলে ধাক্কিয়ে ফ্রেশ হতে পাঠায় নীহারিকা।বিছানাটা সুন্দর করে গুছিয়ে রুম ঝাড়ু দিয়ে ফেলে। ঋত্বিক বের হলে নীহারিকাও কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে।

বাড়ির অন্যান্য সবার নাশতা করা শেষ। তাই নীহারিকা আর ঋত্বিকের নাশতা রুমেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। খাওয়া যখন শেষের দিকে তখন সারিকা এসেছিল পার্লারে যাওয়ার জন্য। কিন্তু নীহারিকা না করে দিয়েছে। আজকে আর বেশি মেক আপ করবে না। তাই আজকের সাজটুকু নিজেই সাজবে। তাছাড়া প্রোগ্রামও খুব বেশি বড় নয়।

দুপুর ৩ টার কাছাকাছি বাজে। নীহারিকা আজকে শিফনের একটি শাড়ি পড়েছে। শাড়ি জিনিসটা তার খুব বেশি প্রিয়। হালকা সেজে চুল কার্ল করে ছেড়ে দিয়েছে। একে একে সব গহনা পরে নেয়। আজকে ভারী গহনাগুলো আর পরে না। এই সাজের সাথে যা যা মানিয়েছে তাই পড়েছে।

আয়নার সামনে রঙ ঢঙ করে কয়টা ছবি তুলে। আয় হায়! তাকে কত সুন্দর লাগছে। মাশাআল্লাহ!

তখন ঋত্বিক রুমে আসে। সে এতক্ষণ বাহিরে ছিলো। কারণ নীহারিকা সাজবে বলে তাকে রুম থেকে বের করে দিয়েছে। তাই ড্রয়িং রুমে বসে চিপস খেতে খেতে কার্টুন দেখতে মগ্ন ছিল। কিন্তু সেটাও কারো সহ্য হলো না, জোর করে উপরে পাঠিয়ে দিয়েছে।

— বউ তুমি এত সেজেছো কেনো?

— কিহ! আমি বেশি মেকআপ করেছি?

হঠাৎ এমন রেগে যাওয়ায় ঋত্বিক চমকে উঠে। সে আমতা আমতা করে বলে,

— না মানে কোথাও যাবে তুমি?

— আজকে না আমাদের বৌভাত।

বেশ ভাবনায় পড়ে যায় ঋত্বিক। বৌভাত আবার কী? তাই সে জিজ্ঞেস করে,

— বৌভাত কী? তুমিই তো আমার বউ। বউ আবার ভাত হয় কি করে।

এখন কীভাবে বৌভাতের মানে বুঝাবে সেটা ভাবতে থাকে নীহারিকা। সব শেষে কিছু না পেয়ে বলে,

— এটা একটা অনুষ্ঠানের নাম। বিয়ের পরের দিন বরের বাড়িতে হয়।

— আচ্ছা নামটা বৌভাত না হয়ে তো অন্য কিছুও হতে পারতো। কেনো হলো না?

— উফফ! এই আপনি চুপ করুন তো। আর যান এই পোশাক গুলো তাড়াতাড়ি পরে আসুন।

ঋত্বিক এবার বাধ্য ছেলের মতো তাই করে। জামাকাপড় নিয়ে সেগুলো চটজলদি পড়ে ফেলে।

নীহারিকার কানের একটি দুল খুলে যাওয়ায় সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে সেটা ঠিক করতে থাকে। তখন পিছন দিকে ঋত্বিক এসে গ্লাসে রাখা কিছু তাজা জিপসিফুল দেখতে পায়। সেখান থেকে বেশ কয়েকটা ফুল নিয়ে নীহারিকার চুলে গুঁজে দেয়। জানে না সে কেনো কাজটি করলো। তবে তার অনেক ইচ্ছে হচ্ছিল, বারবার মনে হয়েছে ফুল গুলো লাগালে খুব সুন্দর লাগবে।

এই কাজে নীহারিকা অনেক খুশি হয়। তার কাজ শেষ হলে ঋত্বিককে সেখানে বসিয়ে দেয়। চিরুনি দিয়ে সুন্দর ঋত্বিকের চুল গুলো আচঁড়ে দেয়। মুখে ক্রিম মেখে, ঠোঁটে ভেসলিন লাগিয়ে যেই না সরে আসতে যাবে। তখনই মাথা উঁচু করে ঋত্বিক। এরফলে থুতনিতে বেশ ব্যথা পায় নীহারিকা। ব্যথায় 'উহহ' করে উঠলে ঋত্বিক সেখানটা আলতো করে ধরে বলে,

— সরি বউ আমি বুঝতে পারিনি। বিশ্বাস করো আমি তোমাকে ইচ্ছে করে ব্যথা দেইনি। তুমি ব্যথা পাবে জানলে আমি একটুও উঁচু হতাম না। সরি।

বলতে বলতে প্রায় কেঁদে ফেলে। নীহারিকা তড়িঘড়ি করে সামলে নেয়।

— হয়েছে, হয়েছে আমি বুঝতে পেরেছি আপনি ইচ্ছে করে দেন নি। অসাবধানতার জন্য হয়ে গেছে। ইট’স ওকে মাই ডিয়ার।

মুগ্ধনয়নে তাকিয়ে থাকে ঋত্বিক। নীহারিকার কোমরে হাত রেখে থুতনিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে,

— তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে বউ। একদম প্রিন্সেসের মতো। আর এইযে পাপ্পি দিয়ে দিলাম দেখো ব্যথা তাড়াতাড়ি সেরে যাবে।

চুমু দেওয়ার মুহূর্তটায় নীহারিকা যেন হঠাৎ করেই থমকে যায়। কয়েক সেকেন্ডের জন্য কী করা উচিত, কী বলা উচিত কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল, তারপর লজ্জায় ধীরে ধীরে নেমে গেল মেঝের দিকে। গালজোড়া মুহূর্তেই উষ্ণ হয়ে উঠেছে। অস্বস্তিতে আহত জায়গাটার ওপর হাত রেখে আঙুলগুলো অকারণে নাড়াচাড়া করতে থাকে।

এই প্রথম কোনো পুরুষ এতটা আপন হয়ে তার কাছে এসেছে। অথচ ঋত্বিকের আচরণে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোনো দ্বিধা নেই আছে শুধু শিশুর মতো সরল এক মায়া। সেই সরলতাই যেন নীহারিকাকে আরও বেশি অপ্রস্তুত করে দিচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর সাহস করে চোখ তুলে তাকাল সে। ঋত্বিকের চোখে তখনও সেই নিষ্পাপ চাহনি। নীহারিকার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। চোখ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেও পারল না। লোকটার এই মায়াবী সরলতার কাছে সে যে দিন দিন একটু একটু করে হেরে যাচ্ছে, সেটা আজকাল নিজের কাছেও আর অস্বীকার করতে পারে না।

♡

সময় গড়িয়ে দুপুর থেকে বিকেল হয়েছে। প্রোগ্রামটাও বেশ জমজমাট। সিদ্দিকী বাড়ির সকলে এসে উপস্থিত হয়েছে। নীহারিকা কারো সাথেই কথা বলেনি।এক কথায় পাত্তা দেয়নি। আজকে সে ছবি তুলতে ব্যস্ত। নিশিতা নিজের কথা ভুলে শুধু বোনের কান্ডই দেখে যাচ্ছে। এটা তার সেই বোন? যে সব সময় চুপচাপ আর একা থাকতো। মেয়েটা কি সব কিছু মেনে নিয়েছে?

ইয়ামিন সিদ্দিকী আর শায়লা খানমও বেশ অবাক হয়েছে নীহারিকার এই পরিবর্তন দেখে। তারা ভেবেছিল হয়তো তাদের দেখলে কেঁদেকেটে ভাসিয়ে দিবে। বাড়িতে যাওয়ার জন্য বায়না করবে।কিন্তু এখন তো আর উল্টোটা দেখা যাচ্ছে।

বাড়ির সবার এই রিঅ্যাকশন থেকে নীহারিকার মনের ভেতর পৈচাশিক আনন্দ হচ্ছে। এতদিন তো সে সবার অবহেলা সহ্য করে এসেছে। এখন থেকে তাদের পালা। দেখুক কেমন লাগে ইগনোর করলে। আর কোনো দরদ, ভালোবাসা নেই। তবে হ্যাঁ তাঁদের প্রতি সে কৃতজ্ঞ। জন্ম দিয়েছে, পেলে-পুষে এতটা বছর বড়ো করেছে। সম্ভব হলে সেই সব চুকিয়ে দিত। কিন্তু এটা সম্ভব না।

#চলবে?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন