#ফাগুনে_হাওয়া
#ইসরাত_জাহান
#সূচনা_পর্ব
ছোট ছোট পায়ে পুরো ড্রয়িং রুম জুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছে পাঁচ বছর বয়সের তৃধা। তার পেছন পেছন ঘুরছে তার তিন বড় ভাই—দিয়ান, শিয়ান আর মিনহাজ। বোনকে ধরতে গিয়ে তাদের নাজেহাল অবস্থা দেখে সোফায় বসে হেসে কুটিকুটি হচ্ছে রিয়ানা আর মাইশা। সম্পর্কে তারা তৃধার বড় ভাবি, দিয়ান আর শিয়ানের স্ত্রী।
এদিকে তৃধার থামার কোনো নামই নেই। দৌড়াতে দৌড়াতে এক পর্যায়ে সে বাড়ির প্রধান দরজার দিকে ছুট দিল। তা দেখে তিন ভাইও পিছু নিল তার। ঠিক দরজার কাছে পৌঁছাতেই হুট করে কোনো এক শক্ত জিনিসের সাথে ধাক্কা খেল তৃধা। পড়ে যাওয়ার ভয়ে সে সাথে সাথে সামনে থাকা বস্তুটিকে দুই হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
বেশ কিছুক্ষণ পার হওয়ার পর যখন দেখল সে পড়ে যায়নি, আর যা সে ধরে ঝুলে আছে সেটি কোনো শক্ত জড় বস্তু নয়, তখন সে পিটপিট করে চোখ মেলল। চোখের সামনে ভেসে উঠল কালো রঙের একটি কাপড়। দৃষ্টি উপরে তুলতেই দেখতে পেল দীর্ঘদেহী এক যুবককে। ভালো করে তাকাতেই চিনতে পারল সে—এ তো তার ভাইদের বন্ধু মৃন্ময়!
চেনা মানুষ দেখে তৃধা তৎক্ষণাৎ তাকে ছেড়ে দিল। তারপর কোমরে হাত দিয়ে পাকা পাকা গলায় বলল, "মিনয়, তুমি এচেছো?" (মৃন্ময়, তুমি এসেছ?)
কিশোর বয়সী মৃন্ময় এতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে এই ছোট্ট মানবীটির কাণ্ড দেখছিল। সে এবার হাঁটু গেড়ে বসে তৃধার দুই হাত নিজের মুঠোয় ভরে বলল, "হ্যাঁ এসেছি তো। কিন্তু..."
"কিন্টু কি মিনয়?" বলেই তৃধা নিজের বৃদ্ধাঙ্গুল মুখে পুরে চুষতে লাগল।
মৃন্ময় হাসল। "তুমি এখনো আমাকে মিনয় বলো! কিন্তু আমার নাম তো মিনয় নয়।"
তৃধা অবাক হয়ে বাচ্চা গলায় বলে উঠল, "টাহলে তুমাল নাম কি?"
"আমার নাম তো মৃন্ময়। কিন্তু তুমি আমায় কী বলো বলতো?"
তৃধা আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিল, "আমি তো সেটাই বলচি, তুমি মিনয়!"
মৃন্ময় আর তৃধার এই দুষ্টুমি দেখে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা দিয়ান, শিয়ান আর মিনহাজ হো হো করে হেসে উঠল। তা দেখে তৃধা রাগে ফেটে পড়ল। দুই কোমরে হাত রেখে বলল, "তুমলা আবাল আমাল কতা শুনে হাচি দিচ্ছো! দাঁলাও, আমি একনই গিয়ে বাবাইকে ছব বুলে দিবো।"
গাল ফুলিয়ে তৃধা হনহন করে ড্রয়িং রুমের অন্য প্রান্তে পা বাড়াল। লক্ষ্য তার প্রিয় ‘বাবাই’ তুহিন খন্দকার। মৃন্ময় এখনো সেখানেই হাঁটু গেড়ে বসে তৃধার অভিমানী প্রস্থান দেখছিল। শিয়ান হাসতে হাসতে বলল, "মৃন্ময়, তুই তো আসতেই ছোট মহারানীর রোষানলে পড়লি! আজ আর তোর রক্ষে নেই।"
মৃন্ময় ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়িয়ে হাসল। "ওর এই রাগটাই তো আসল সৌন্দর্য। দেখো, একটু পরেই আবার মিনয় মিনয় করে আমার ঘাড়েই উঠবে।"
তৃধা ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে সোজা বাবা তুহিন খন্দকারের কোলের ওপর চড়ে বসল। তিনি পেপার সরিয়ে অবাক হয়ে তাকালেন। "কী হয়েছে আমার রাজকন্যার? কপালে চিন্তার ভাঁজ কেন?"
তৃধা নালিশ শুরু করল, "বাবাই, তুমাল ছেলেলা খুব পচা! আমি মিনয়কে পচন (প্রশ্ন) কলছি, আর তারা হাচি দিচ্ছে। তুমি তাদের বকে দাও!"
তুহিন সাহেব হেসেই ফেললেন। "এত বড় সাহস! মিনহাজ-দিয়ানদের আমি আজই কান ধরে ওঠবস করাব। কিন্তু মা, মিনয়টা আবার কে?"
তৃধা বিরক্ত হয়ে বলল, "ওই যে, লম্বা মিনয়! তুমি চেনো না? ও এখন আমাল সাথে কতা বলছে না, শুধু বলছে নাম নাকি মিনয় না।"
ঠিক এই সময়েই মৃন্ময় আর বাকিরা ঘরে প্রবেশ করল। মৃন্ময়কে দেখেই তৃধা বাবার পাঞ্জাবির আড়ালে মুখ লুকাল। মৃন্ময় চোখ টিপে বলল, "কী হলো তৃধা বুড়ির? বাবাইকে সব বলে দিয়েছ?"
তৃধা আড়চোখে একবার মৃন্ময়কে দেখল, তারপর ফিসফিস করে বাবাকে বলল, "বাবাই, তুমি মিনয়কে বলো আমাকে একটা চককেট দিতে, টাহলে আমি মাফ কলে দিবো।"
তৃধার এই ‘শর্তযুক্ত ক্ষমা’ শুনে ঘরে হাসির রোল পড়ে গেল। যা দেখে তৃধা আবারো গাল ফুল কিন্তু যেই না, মৃন্ময় পকেট থেকে একটা বড় ডেইরি মিল্ক বের করলো সাথে সাথেই তৃধার সব রাগ জল। এক মুহূর্তের মধ্যে বাবার কোল থেকে নেমে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল মৃন্ময়ের কোলে। তৃধা এখন মৃন্ময়ের কাঁধে চড়ে পরম তৃপ্তিতে চকলেট চিবোচ্ছে আর ভাইদের দিকে তাকিয়ে বিজয়ী হাসি দিচ্ছে।
একটু পর তৃধা মৃন্ময়ের কলার শক্ত করে ধরে আবদার করল, "মিনয় আমাল জন্য বাইক আনছে? আমি বাইকে চলবো।"
দিয়ান হেসে বলল, "মিনয় তো আজ গাড়ি নিয়ে এসেছে রে পুঁচকি।"
তৃধা গম্ভীর হয়ে মৃন্ময়ের কোল থেকে নামার চেষ্টা করল। "গালি কেন আনছো? আমি বাইকে চলবো। তুমি পচা মিনয়!"
মৃন্ময় পরিস্থিতি সামলাতে দ্রুত বলল, "আরে শোনো! আজ গাড়ি করে আমরা সবাই আইসক্রিম খেতে যাব। অনেক বড় আইসক্রিম! যাবে না?"
আইসক্রিমের কথা শুনে তৃধার মুখটা মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। "ঠত্যি? অনেক বল আইচক্রিম?" সে আবার মৃন্ময়ের গলা জড়িয়ে ধরল। বিকেলের পড়ন্ত রোদে তৃধার মিষ্টি হাসি আর ‘মিনয় মিনয়’ ডাকটা পুরো বাড়িটাকে যেন এক মায়ার বাঁধনে বেঁধে ফেলল।
সময়ের চাকা ঘুরে গেছে সাতটি বছর। সেই চঞ্চল তৃধা এখন কৈশোরে পা রেখেছে। ১৩ বছর বয়সী তৃধার শৈশবের সেই আধো-আধো কথাগুলো হারিয়ে গেছে, কিন্তু দুষ্টুমি আর চপলতা বেড়েছে কয়েক গুণ। পড়াশোনার ফাঁকে তার নতুন নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘কোরিয়ান ড্রামা’। ওপার জগতের সেই মায়াবী প্রেমের গল্পগুলো দেখতে দেখতে তৃধার কিশোরী মনে এখন নতুন এক অনুভূতির আনাগোনা।
মৃন্ময় তালুকদারের বর্তমান বয়স এখন ২৫। শৈশবের সেই ১৭ বছরের কিশোরটি এখন এক সুঠাম যুবক। তৃধার কাছে সে এখন কেবল ভাইয়ের বন্ধু নয়, বরং তার সবটুকু অধিকারের কেন্দ্রবিন্দু। যত দিন যাচ্ছে, মৃন্ময়ের প্রতি তার এই আকর্ষণ কোনো এক নিষিদ্ধ মোহের মতো ডালপালা মেলছে।
বারান্দায় বসে ফোনে কোরিয়ান ড্রামা দেখছিল তৃধা। স্ক্রিনের কিউট হিরোদের জায়গায় বারবার তার মৃন্ময়ের মুখটাই মনে পড়ছিল। ঠিক তখনই ড্রয়িং রুম থেকে মৃন্ময়ের গলার আওয়াজ কানে এল। তৃধা এক ঝটকায় ফোন বন্ধ করে আয়নার সামনে দাঁড়াল। চুলগুলো একটু গুছিয়ে নিয়ে ঠোঁট টিপে হাসল সে।
ড্রয়িং রুমে ঢুকে দেখল দিয়ান আর মৃন্ময় সিরিয়াস কথা বলছে। তৃধা গম্ভীর মুখে মৃন্ময়ের ঠিক পাশের সোফাটায় গিয়ে বসল। মৃন্ময় মুচকি হেসে দিয়ানের সাথে কথা চালিয়ে যেতে লাগল। তৃধার এবার অভিমান হলো। আগে তো মৃন্ময় আসা মাত্রই তাকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিত। এখন কি সে বড় হয়ে গেছে বলে মৃন্ময় তাকে এড়িয়ে চলছে?
নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে তৃধা হুট করে মৃন্ময়ের ল্যাপটপ ব্যাগটা নিজের কোলের ওপর টেনে নিল। মৃন্ময় কথা থামিয়ে অবাক হয়ে তাকাল। "কী ব্যাপার তৃধা? ব্যাগ নিয়ে কী করবে ?"
তৃধা ঘাড় ত্যাড়া করে বলল, "তুমি আসবে বলেই তো আমি কতগুলো কাজ জমিয়ে রেখেছি জানো? আমার অঙ্কগুলো করে দিতে হবে। আর তুমি সেই তখন থেকে ভাইয়ার সাথে কথা বলেই যাচ্ছ! আমি কি এখানে সাজানো পুতুল?"
মৃন্ময় হো হো করে হেসে উঠল। সেই পরিচিত হাসি, যা শুনলে তৃধার বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে। মৃন্ময় আদুরে গলায় বলল, "আচ্ছা বাবা, মাফ চাইছি। কিন্তু তুমি তো এখন বড় হয়েছ, ক্লাস সেভেনে পড়ো। এখনো কি সেই ছোট্ট তৃধার মতো রাগ করলে চলে?"
তৃধা মনে মনে বলল, ‘বড় হয়েছি বলেই তো রাগটা বেশি হয়, তুমি সেটা বোঝো না কেন?’ বাইরে মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, "আমি বড় হইনি, তোমার জন্য আমি সারাজীবন ওই পাঁচ বছরের তৃধাই থাকব। এখন চলো, আমাকে ওই চ্যাপ্টারটা বুঝিয়ে দেবে।
"মৃন্ময় যখন তৃধার পড়ার ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তৃধা তখন পা টিপে টিপে তার পেছনে হাঁটছিল। তুহিন খন্দকার ড্রয়িং রুমের ইজি চেয়ারে বসে দূর থেকে দৃশ্যটা দেখলেন। তার মাতৃহীন ছোট মেয়েটার সবটুকু আবদার এই মানুষটাকে ঘিরেই। তৃধার জন্মের সময় ওর মা যখন না ফেরার দেশে চলে গেলেন, তুহিন সাহেব ভেবেছিলেন এই মেয়েটাকে হয়তো একা বড় হতে হবে। কিন্তু দিয়ান, শিয়ান আর মিনহাজ—তার তিন ছেলে আর মৃন্ময় সেই অভাবটা কখনো বুঝতে দেয়নি।
পড়ার টেবিলে মৃন্ময় অংক খাতাটা টেনে নিল। তৃধা উল্টো দিকের চেয়ারে বসে চিবুকে হাত দিয়ে একদৃষ্টে মৃন্ময়ের দিকে তাকিয়ে রইল। চশমার আড়ালে মৃন্ময়ের গভীর চোখ জোড়া যখন খাতার পাতায় নিবদ্ধ, তৃধার মনে হলো কোরিয়ান ড্রামার সব হিরোদের চেয়েও এই মানুষটা অনেক বেশি মায়াবী। ১৩ বছরের ব্যবধানটা যেন এই মুহূর্তে একটা অদৃশ্য দেয়াল, যা শুধু তৃধাই অনুভব করতে পারছে।
মৃন্ময় কলম ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, "কী হলো? অংক কি আমি একাই করব? তুমি কি শুধু হা করে আমাকেই দেখবে?"
তৃধা অপ্রস্তুত হয়ে চোখ সরিয়ে নিল। চট করে বইয়ের পাতায় মুখ গুজে গাল ফুলিয়ে বলল, "মিনয়, তুমি আগে কত কিউট ছিলে! এখন দিনদিন কেমন যেন খিটখিটে প্রফেসরদের মতো হয়ে যাচ্ছ। চশমাটা কি না পরলে হয় না?"
মৃন্ময় শব্দ করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে তৃধার কিশোরী মনে যেন গিটারের তারে টংকার লাগল। মৃন্ময় চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে তৃধার দিকে ঝুঁকে এল। "বলো কি! চশমা না পরলে তো আমি চোখে ঝাপসা দেখি।
তৃধা হঠাৎ খুব সিরিয়াস হয়ে গেল। নিচু স্বরে বলল, "তুমি ঝাপসা দেখো বলেই তো আমি ভয় পাই। যদি একদিন আমাকেও ঝাপসা দেখো? যদি চিনতে না পারো?"
মৃন্ময় থমকে গেল। ছোট তৃধার মুখে এমন গভীর কথা সে আগে কখনো শোনেনি। সে কি বুঝতে পারছে এই কিশোরীর মনে কীসের ঝড় বইছে? মৃন্ময় আলতো করে তৃধার মাথায় হাত রাখল। যে স্পর্শে একসময় তৃধা শান্ত হতো, এখন সেই স্পর্শেই তার শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়।
মৃন্ময় নরম গলায় বলল, "তৃধা, দুনিয়ার সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেলেও আমার এই পিচ্চি বন্ধুটাকে আমি কখনো ভুলবো না।
তৃধা মনে মনে হাসল। কিন্তু সে জানে, সে আর সেই পাঁচ বছরের শিশুটি নেই যে একটা চকোলেট পেলেই সব ভুলে যাবে। সে এখন তার রাজকুমারের অপেক্ষা করতে শিখেছে। আর তার সেই রাজকুমার যে তারই সামনে বসে আছে, তা মৃন্ময় তালুকদার কবে বুঝবে?
বাইরে তখন সন্ধ্যার ছায়া নামছে। তুহিন খন্দকার ড্রয়িং রুম থেকে হেঁকে বললেন, "মৃন্ময়, পড়া শেষ হলে চা খেয়ে যাস কিন্তু!"
তৃধা মুচকি হেসে খাতাটা টেনে নিল। মনে মনে বলল, ‘বাবাই, তুমি জানো না—মৃন্ময় এখন আর শুধু চা খেতে আসে না, সে আমার স্বপ্নের ভাগ নিতে আসে।’
#চলবে.....
#ফাগুনে_হাওয়া
#ইসরাত_জাহান
#পর্ব_২
পড়ার টেবিলের সেই শান্ত পরিবেশটা বেশিক্ষণ প্রশান্ত রইল না। বাড়িতে মিনহাজের আগমনে নিমেষেই শান্ত পরিবেশটা বিষাদে ভরে গেল, যখন ড্রয়িং রুম থেকে মিনহাজের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। মৃন্ময় আর তৃধা দুজনেই সেদিকে পা বাড়ালো।
ড্রয়িং রুমে তুহিন সাহেব সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছেন, আর মিনহাজ হাতে একটি খাম নিয়ে খুশিতে আত্মহারা। সে মৃন্ময়কে দেখেই আলিঙ্গন করলো।
"মৃন্ময়! আমাদের ভিসার অনুমোদন চলে এসেছে রে! অবশেষে আমরাও আমাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবো। ঠিক দুই সপ্তাহ পর আমাদের জার্মানি যাওয়ার ফ্লাইট । মাস্টার্সের জন্য স্কলারশিপটা শেষমেশ হয়েই গেলো!"
মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়িতে আনন্দের জোয়ার বয়ে গেলো। দিয়ান আর শিয়ান মিনহাজকে অভিনন্দন জানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। কিন্তু সেই আনন্দ-উল্লাসের মাঝে একজনের পৃথিবী যেন থমকে গেলো। আর সে হলো তৃধা। তৃধার কানে শুধু একটা কথাই বাজছে—‘দুই সপ্তাহ পর’। যে মানুষটাকে ছাড়া তার একটি দিনও চলে না, যাকে দেখার অপেক্ষায় সে সারাটা দিন মুখিয়ে থাকে, সে তাকে ছেড়ে এতটা দূরে চলে যাবে? তাও আবার অনির্দিষ্টকালের জন্য?
মৃন্ময় হাসিমুখে সবার সাথে কথা বলছিল, কিন্তু হঠাৎ তার নজর পড়ল দূরে এক কোণায় দরজার পাশে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা তৃধার উপরে। সে এগিয়ে এসে তৃধার চিবুক ছুঁয়ে বললো, "কী হলো ম্যাডাম? তোমার ভাইয়া আর আমি দেশের বাইরে যাচ্ছি, আমাদের স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে। শুনে খুশি হওনি?" বলেই উত্তরের আশায় মৃন্ময় তৃধার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। কিন্তু তৃধা কোনো উত্তর দিল না। তার বড় বড় চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। মৃন্ময়ের এই 'যাওয়ার আনন্দ' তাকে তীরের মতো বিঁধছে। সে হঠাৎই মৃন্ময়ের হাতটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে নিজের ঘরের দিকে দৌড়ে চলে গেলো।
তৃধার এই আকস্মিক আচরণে মৃন্ময় যেন খুব বেশিই বিস্মিত হলো, কেননা ছোট থেকে আজ পর্যন্ত রাগ জেদ দেখালেও, এরকম ব্যবহার তৃধা কখনোই তার সাথে করেনি।
এরই মধ্যে মিনহাজ পিছন থেকে এসে তার কাঁধে হাত রেখে বলতে লাগলো, "কিরে তুই এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? কিছু হয়েছে?"
মৃন্ময় মুখে একটি মিথ্যা হাসি টেনে এনে বললো, "কই নাতো, কি হবে আবার?" বলেই কথাটা ঘুরিয়ে নিলো।
এরই মধ্যে মিনহাজ খেয়াল করলো। এখানে সবাই থাকলেও তৃধা নেই। এটা যেন পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য। যেই মেয়ে বাড়িতে একটি ব্যবসায়িক সভাতেও সারাক্ষণ আমাদের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়, এই মেয়ে আজ এত চেঁচামেচির পরেও এখানে এলো না, ব্যাপারটা যেন তার কাছে কেমন ঠেকলো।
সকলেই তখন কীভাবে কী করতে হবে, সে পরিকল্পনায় মগ্ন ; কিন্তু ভিন্ন দুই পুরুষ একই তরুণীকে নিয়ে চিন্তিত। তরুণীর আকস্মিক এই পরিবর্তনে দুজনই উদ্বিগ্ন। দুজন পুরুষের ক্ষেত্রেই সম্পর্কটি ভিন্ন ; একজনের বোন , আরেকজনের কী হয় তা সে নিজেও জানে না। তরুণীটি কি কেবলই তার বন্ধুর বোন , নাকি এর গভীরে মনের মধ্যে অন্য কোনো চাওয়া-পাওয়ার উন্মোচন ঘটেছে, যা সে নিজেই অবগত নয়?
মিনহাজকে এমন গম্ভীর দেখে দিয়ান ও শিয়ান জিজ্ঞেস করল, "কী ব্যাপার, হঠাৎ এত গম্ভীর হয়ে গেলি? কিছু কি ঘটেছে?" মিনহাজ উত্তর দিল, "না, কিছু হয়নি। তোমরা বরং কথা বলো, আমি একটু আসছি।" এই বলে সে উঠে দাঁড়ালো। তা দেখে রিয়ানা ও মাইসা বলল, "তোমরা কাকে কী বলছো? ও তো ওর বোনের কাছে যাচ্ছে। ভাই চলে যাবে শুনেই তো রেগে মেগে বোম হয়ে আছে। ভাইদের ছাড়া ওর চলে নাকি? ভাই দেশের বাইরে চলে যাবে শুনেই তো ও দৌড়ে পালালো।" এতক্ষণে যেন সকলের হুঁশ ফিরল।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির বাইরে গাড়ির শব্দ ভেসে আসতেই সবার কান খাড়া হয়ে গেল। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই ছোট ছোট পায়ের ধুপধাপ শব্দে নিস্তব্ধতা ভেঙে চুরমার!
পাঁচ বছরের রায়ান আর তিন বছরের ঋষিতা যেন ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে সোজা তুহিন খন্দকারকে জাপ্টে ধরলো। সমস্বরে চিৎকার করে উঠলো, "দাদাভাই, আমরা এসে গেছি!"
তুহিন খন্দকার খুশিতে ডগমগ হয়ে দুই নাতি-নাতনিকে দুই কোলে তুলে নিলেন। তিন বছরের ঋষিতা তার পাকা পাকা কণ্ঠে আদুরে ভঙ্গিতে বললো, "দাদাভাই, তুমি জানো আমি তোমাকে কত মিস করেছি?"
নাতনির কথা শুনে তুহিন খন্দকার বেশ নাটকীয় ভঙ্গি করলেন। চোখ কপালে তুলে অবাক হওয়ার অভিনয় করে বললেন, "ওরে আমার দাদুভাইটা! আমাকে মিস করেছে বুঝি? তা আমার দাদুভাইটা আমাকে ঠিক কতখানি মিস করেছে, বল তো শুনি?"
ঋষিতা উত্তর দেওয়ার আগেই পাশ থেকে রায়ান বলে উঠল, "দাদাভাই, ও একদম মিথ্যে কথা বলছে! ও তোমাকে একটুও মিস করেনি। আসলে আমিই তোমাকে সবচেয়ে বেশি মিস করেছি।"
ভাইয়ের মুখে এমন অপবাদ শুনে ঋষিতা তক্ষুনি খেপে গিয়ে তর্ক শুরু করে দিলো, "একদম না! আমিই বেশি মিস করেছি। তুমি তো আসার সময় ঘুমিয়ে ছিলে, আমিই শুধু দাদাভাইয়ের কথা ভাবছিলাম!"
ব্যস, ড্রয়িং রুমের সবার সামনেই শুরু হয়ে গেলো দুই ভাই-বোনের সেই অম্লমধুর লড়াই। সোফায় বসে থাকা বাড়ির বাকি সবাই হোহো করে হেসে উঠলেন। তুহিন খন্দকার নাতনি আর নাতির এই মিষ্টি ঝগড়া আর কলকাকলি বুকে চেপে ধরে হাসিমুখে সবার মাঝখানে গিয়ে বসলেন। পুরো ঘরটা যেন মুহূর্তেই এক চিলতে স্বর্গে পরিণত হলো।
রায়ান হচ্ছে রিয়ানা ও দিয়ানের একমাত্র ছেলে । আর ঋষিতা হচ্ছে মাইশা ও শিয়ানের একমাত্র মেয়ে।
এতকিছুর পরও মিনহাজ নির্বিকার। কাউকে কিছু না জানিয়ে সে একাই তৃধার কক্ষের দিকে অগ্রসর হলো। তা দেখে মৃন্ময়ও তার অনুসরণ করলো। যেটা মিনহাজের দৃষ্টিসীমার বাহিরে রয়ে গেলো।
দোতলার একদম শেষ কক্ষটিই তৃধার। মিনহাজ ধীর পদক্ষেপে তৃধার কক্ষের দিকে অগ্রসর হলো। দ্বার উন্মুক্তই ছিল। তাই মৃদু কেশে মিনহাজ তৃধার কক্ষে প্রবেশ করলো।
ঘরে কেউ প্রবেশ করেছে তা বুঝতে পেরেই তৃধা নিজের চোখমুখ মুছে অশ্রু লুকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো কে এসেছে। মিনহাজকে দেখতে পেয়েই তৃধা কৃত্রিম হাসির চেষ্টা করলো। আর বলতে লাগলো ভাইয়ু তুই এখানে, কোন প্রয়োজন। বলেই হাসার চেষ্টা করলো।
মিনহাজ লক্ষ্য করলো সবই। আর এটাও বোঝার চেষ্টা করলো তার বোনটা ঠিক কতটা বড় হয়েছে। যার ফলস্বরূপ সে এখন কান্নাও লুকাতে চাইছে।কিন্তু মুখে কোন কথাই বললো না।
মৃন্ময় বাইরে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে তাদের ভাইবোনের কথোপকথন শুনতে লাগলো। সে মনে মনে অনেক কষ্ট পেয়েছে, সে কখনো প্রত্যাশা করেনি তৃধা তার সাথে এমন আচরণ করবে। কোনো কারণ ছাড়াই সে মেয়েটিকে অনেক বেশিই ভালোবাসে। নীরবে তার সকল আবদার মেনে নেয়। কিন্তু হঠাৎ আজকের ব্যবহারটা মৃন্ময় কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। সে বারবার নিজেকে বোঝাতে চাইছে তৃধা অনেক ছোট, সে জেনে বুঝে কিছুই করেনি। কিন্তু মন সেটা বুঝতে নারাজ। সেখানে চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে। কেন হচ্ছে সে জানে না। সে এটাই বুঝতে পারছে না যে তৃধা তো শুধুমাত্র তার বন্ধুর বোন। তারপরও কেন মেয়েটার প্রতি তার এতটা টান। তার ভাবনার মাঝেই সে শুনতে পেল তৃধার রিনরিনে কণ্ঠস্বর। সে বলছে -
ভাইয়ু, আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। বুকের ভেতর কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। আমার খুব কান্না পাচ্ছে। আমার এমন কেন হচ্ছে, তুই কি বলতে পারবি ?
মিনহাজ মৃদু হাসার চেষ্টা করল। যতই সে স্বপ্নের কথা বলুক, তার কাছে সবচেয়ে দামি হলো তার বোন। ছোটবেলায় সে যখন খেলতে যেত, কত মানুষকে দেখতো বোনের হাত ধরে খেলতে নিয়ে যায়, কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তা দেখে তার কী যে কষ্ট হতো! মাঝে মাঝে তো বাড়ি এসে কান্নাকাটিও করতো। আর মায়ের কাছে আবদার করতো যেন তাকে একটা বোন এনে দেওয়া হয়। তার ধারণা ছিল—সবারই তো বোন আছে, তাহলে তার কেন নেই? সে তো এটাও ভেবে বসত যে, তার বাবা-মা ইচ্ছে করেই তাকে বোন এনে দিচ্ছে না। সেই সব কথা মনে পড়তেই তার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
মিনহাজকে এমন নীরব দেখে, তৃধা এবার মিনহাজের শার্টের হাতা ধরে নাড়াতে লাগলো। আর অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলতে লাগলো, কী হয়েছে ভাইয়ু, কথা বলছিস না কেন? আমার কথায় কি তুই আঘাত পেয়েছিস?বলেই সরল চোখে মিনহাজকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো।
মিনহাজার আর কোন কথাই বলতে পারলো না। মা মারা যাওয়ার পর, সে সব সময়ই চেষ্টা করেছে বোনকে সর্বোচ্চটা দেওয়ার। মিনহাজ আলতো করে তৃধার মাথায় হাত রাখল। যে বোনটির জন্য সে একসময় শৈশবে বায়না ধরেছিলো, আজ সেই বোনটি তার সামনে দাঁড়িয়ে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। মিনহাজ শান্ত স্বরে বলল, "তৃধু, জীবনটা তো স্থবির নয় রে। পাখি বড় হলে যেমন বাসা ছাড়ে, আমাদেরও স্বপ্নের পেছনে ছুটতে হয়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সম্পর্কগুলো শেষ হয়ে যায়। আমি যেখানেই থাকি না কেন, তোর এই ভাইটা সবসময় তোর ছায়া হয়ে থাকবে।" আর তোকে তো বলেছিলাম, স্কলারশিপ নিয়ে দেশের বাইরে পড়তে পাঠানোটা মায়ের স্বপ্ন ছিলো। এখন তুই কি চাস মায়ের স্বপ্ন টা অসম্পূর্ণ থেকে যাক?
তৃধা কোনো কথা বলল না, শুধু মিনহাজের বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। কিছুক্ষণ ওভাবেই পড়ে থেকে আবারও ঘাড় উঁচিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকালো। আর মিনহাজকে অবাক করে দেওয়ার মতো একটা কথা বলে বসলো। তৃধার কথাটা কিছুটা এমন ছিলো, তাহলে মিনয়কে রেখে যা। ওকে কেন নিয়ে যাচ্ছিস? তুই জানিস না মিনয়কে ছাড়া আমি থাকতে পারি না।
তৃধার মুখে এমন কথা শুনে মিনহাজ যেন জমে পাথর হয়ে গেলো। সে বিশ্বাসই করতে পারছিলো না, তার এই ছোট্ট তৃধা তাকে এই কথা বলছে।
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মৃন্ময় এই কথা শোনার পর, সে যেন দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু , সে অদ্ভুত কিছু অনুভব করলো। সে অনুভব করলো যে এতক্ষণ পর্যন্ত বুকের মধ্যে যে চিনচিনে ব্যথাটা হচ্ছিল, তা হঠাৎই কেমন গায়েব হয়ে গেছে। সেইখানে এখন ভর করেছে অদ্ভুত এক শীতলতা।
মৃন্ময় আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। দ্রুত সে বাড়ির ছাদে চলে গেলো। আর এইদিকে মিনহাজ এখনো তৃধার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো। সে যেনো নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। তৃধা কি জানে সে এইমাত্র ঠিক কি বলেছে। সে নিজের ভাইকে চলে যেতে বলছে আর তার ভাইয়ের বন্ধুকে থেকে যেতে বলছে।
#চলবে....