#ফাগুনে_হাওয়া
#ইসরাত_জাহান
#পর্ব_৩
মিনহাজ আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ালো না। তৃধার রুম থেকে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে এলো সে। পুরো বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজলো, কিন্তু কোথাও মৃন্ময়ের দেখা পেলো না। শেষমেষ অস্থির পায়ে ছাদে এসে পৌঁছাতেই দেখল, কার্নিশ ঘেঁষে একা দাঁড়িয়ে আছে মৃন্ময়। মিনহাজ নিঃশব্দে পা ফেলে সামনে এগিয়ে গেলো।তারপর আলতো করে মৃন্ময়ের কাঁধের ওপর হাত রাখলো সে।
এদিকে, দীর্ঘক্ষণ একটানা কান্নার ফলে তৃধার প্রচণ্ড মাথা ব্যথা করছে। মিনহাজ চলে যাওয়ার পর সে নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়েছে, নতুন করে আর অশ্রু ফেলেনি। স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ কী মনে করে সে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। ঝাপসা চোখে নিচের দিকে তাকাতেই তৃধার দৃষ্টি আটকে গেলো। দেখল, মৃন্ময় ধীর পায়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে বিধ্বস্ত প্রায়। তার সেই চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে তৃধা এক অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করলো।
সময়ের চাকা নিজের নিয়মে চলতে চলতে এক সময় মিনহাজ আর মৃন্ময়ের প্রস্থানের লগ্ন ঘনিয়ে এলো। আর মাত্র দুদিন পরেই তাদের জার্মানির ফ্লাইট । চোখের পলকে এগারোটা দিন কীভাবে যে কেটে গেলো, তা ভাবতেই অবাক লাগে। তবে এই কদিন একটা আশ্চর্য এবং রহস্যময় ঘটনা সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। সেদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর মৃন্ময় আর একবারের জন্যও এই বাড়ির চৌকাঠ মাড়ায়নি। কেন সে নিজেকে এভাবে গুটিয়ে নিলো, তার পেছনের প্রকৃত কারণটা কারোরই জানা নেই।
মৃন্ময়ের এই বিষণ্ণ নীরবতা আর অনুপস্থিতি তৃধাকে ব্যাকুল করে তুলেছে। এই কদিনে সে অসংখ্যবার মিনহাজের কাছে গিয়েছে শুধু এটুকু জানার জন্য যে—মৃন্ময় কেন আসছে না? তার কী হয়েছে? কিন্তু মিনহাজের আচরণ তৃধাকে আরও বেশি বিস্মিত করেছে। সেই দিনের পর থেকে মিনহাজও যেন বদলে গেছে। তৃধার সাথে আগের মতো সেই স্বতঃস্ফূর্ত আলাপ কিংবা খুনসুটি—সবই যেন উধাও।
তৃধা বারবার চেষ্টা করেছে মিনহাজের সাথে আগের সেই সহজ সম্পর্কটা ফিরিয়ে আনতে, তাকে স্বাভাবিক করতে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। মিনহাজের শীতল গম্ভীরতার পর্দা এখনো সরেনি।
ছোটবেলা থেকেই ভীষণ আদরে আর আবদারে বড় হয়েছে তৃধা। পৃথিবীর কঠোরতা তাকে খুব একটা স্পর্শ করতে পারেনি বলে মনের কোণটা বড্ড নরম। তাই খুব ছোট ছোট অবহেলা বা তুচ্ছ ঘটনাও তাকে ভীষণ কষ্ট দেয়, বুকের ভেতরটা অভিমানে ভারী হয়ে ওঠে।
আজ সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় তৃধা জীবনে প্রথমবার মিথ্যে কথা বলল। কারো চোখের দিকে তাকিয়ে মিথ্যে বলার অভ্যাস তার নেই, তবুও আজ বলতে হলো। আসলে ওই দিনের সেই ঘটনার পর থেকেই একটা ভাবনা তৃধাকে কুরে কুরে খাচ্ছে—সেদিন মিনহাজকে মিনয়ের কথা বলার পর থেকেই মিনহাজ কেমন যেন বদলে গেছে। তার এই হুট করে কথা বন্ধ করে দেওয়াটা তৃধা মেনে নিতে পারছে না।
তৃধার কেন জানি মনে হচ্ছে, মিনয়ের সাথে দেখা করতেই হবে জানতেই হবে কেনো সে আমার সাথে দেখা করতে আসছে না । তাই সে মনে মনে শক্ত একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে—আজ সে মিনয়ের সাথে দেখা করতে মিনয়ের বাড়ি যাবে । ফলস্বরূপ, তৃধা আজ একাকী ড্রাইভার কাকার সাথে স্কুলে যাবে। তার বক্তব্য অনুসারে সে এখন অনেক বড় হয়েছে। সে একা একা সব কিছু করতে পারে। যা শুনে সবাই হাসাহাসি করলেও কেবল মিনহাজই ছিল নির্বিকার। দিয়ান তৃধার সাথে অনেক জোরাজোরি ও অনুরোধ করে যেতে চাইলো। কিন্তু তৃধা তার সিদ্ধান্তে অটল রইল। সে আজ একাই যাবে।
অবশেষে কেউই আর তৃধার সাথে পেরে উঠল না। তাই বাধ্য হয়েই সবাইকে সম্মতো হতে হলো। এরই মধ্যে তুহিন খন্দকার মিনহাজের উদ্দেশ্যে বললেন,
হ্যাঁ রে মিনহাজ, মৃন্ময়ের কি কিছু হয়েছে ? হঠাৎ বাবার মুখে মৃন্ময়ের প্রসঙ্গ শুনে, খাবার প্লেটে চলমান হাতটা সহসা থেমে গেলো। কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো বাক্য নির্গত হলো না।
তাতে যেন তুহিন খন্দকারের কপালে দু'তিনটি ভাঁজ পড়তে দেখা গেলো। তিনি আরও কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু তাকে কোনো কিছু বলতে না দিয়েই মিনহাজ খাওয়া শেষ বলে সিঁড়ি দিয়ে উপরে নিজের ঘরে চলে গেলো। এতে যেন সবাই অবাকই হলো। কেননা সেই শিশু শ্রেণি থেকে দুজনকে একসাথে দেখে আসছে, দুজন বন্ধু কম ভাই বেশি। হঠাৎ কী এমন হলো যার কারণে ছেলেটা আসা বন্ধ করে দিলো আর মিনহাজটাও তার কথা শুনতে চাইলো না। মিনহাজের এমন ব্যবহারে সবাই ভাবুক হলেও শুধুমাত্র তৃধার চোখ ছলছল করছে। মেয়েটা যথেষ্ট চেষ্টা করছে নিজের কান্না লুকিয়ে রাখার, কিন্তু কিছুতেই লুকিয়ে রাখতে পারছে না। এক সময় কান্না আটকাতে না পেরে ভ্যা ভ্যা করে সকলের সামনে কেঁদে দিলো। এতে করে কেউ তেমন একটা অবাক হলো না। কেননা সবাই জানে মৃন্ময় তৃধাকে ঠিক কতটা আদর করে। আর তৃধাও মৃন্ময়কে ঠিক কতটা পছন্দ করে। এরমধ্যেই ঋষিতা ফিক করে হেসে উঠলো। ঋষিতাকে হাসতে দেখে রায়হানও তাল মেলালো। ঋষিতা তো বলেই ফেললো দেখো বাবাই পিপি কান্না করছে বলে সে আবারও হাসতে লাগলো। তৃধা এবার কিছুটা লজ্জা পেলো। যতই হোক এরা তার ভাইয়ের ছেলেমেয়ে। এদের সামনে এভাবে কান্না করাটা তার উচিত হয়নি। নিজের ভুল বুঝতে পেরে সাথে সাথে সে তার হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছতে লাগলো।
তা দেখে রিয়ান এবং মাইশা সবাইকে তাড়া দিতে লাগলো। কারণ স্কুলের জন্য দেরি হয়ে যাচ্ছিল। ঋষিতা স্কুলে ভর্তি না হলেও রায়ানকে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয়েছে। তৃধাও খাওয়া শেষ করে নিজের ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর তুহিন খন্দকারের কাছে গেল। বাবাকে জড়িয়ে ধরে বিদায় জানিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। বাড়ি থেকে বের হতেই দেখতে পেলো ড্রাইভার কাকা গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কাছে যেতেই গাড়ির দরজাটা খুলে দিলো। তৃধাও কোনো বাক্য ব্যয় না করে গাড়িতে উঠে বসলো। তৃধা গাড়িতে উঠে বসতেই ড্রাইভার কাকা ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি চালু করলেন। কিছু দূর যাওয়ার পরে, রাস্তায় দুটি মোড় পরে। একটি হচ্ছে স্কুলে যাওয়ার পথ, আরেকটি হচ্ছে মৃন্ময়দের বাড়ি যাওয়ার পথ। তৃধা এবার উচ্চস্বরে চিৎকার করতে লাগলো, কাকা কাকা গাড়ি থামাও। হঠাৎ চিৎকারে তিনি চমকে উঠলেন। তৃধার কিছু হয়েছে কিনা তা জানার জন্য বলতে লাগলেন, মামনি তোমার কী হইছে, হঠাৎ চিৎকার করলা কেন? কোনো সমস্যা হইছে? গাড়ি ঘোরামু ? বাড়ি চলে যাইবা?
তৃধা কোনো কথা বললো না। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলতে শুরু করলো, কাকা আমি তো তোমার মেয়ের মতো, তাই না বলো? আমার কথা শুনে তার কাকা নিজের পান খাওয়া দাঁতগুলো বের করে হাসতে লাগলেন। আর বলতে লাগলেন, মেয়ের মতো কী বলছ আম্মা, তুমি তো আমার আরেকটা মেয়ে। কাকার মুখে এই কথা শুনে আনন্দে তৃধার চোখ ঝলমল করতে লাগল। তারপরে তৃধা বলতে লাগল, তাহলে আমি যা বলব সেটা করবে তো? ড্রাইভার কাকার কপালে এবার চিন্তার ভাঁজ পড়লো।
ড্রাইভার কাকার কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হলো। তিনি স্টিয়ারিংটা শক্ত করে ধরে কিছুটা সংশয় নিয়ে বললেন, "কী বলতে চাও বলো তো আম্মাজান ? তোমার মতলব তো সুবিধার ঠেকতাছে না।"
তৃধা এবার জানালার বাইরে থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে কাকার দিকে তাকালো। তার ১৩ বছরের কিশোরী মনে এখন এক বিশাল অভিমানের পাহাড় জমেছে। সে খুব করুণ স্বরে বলল, "কাকা, আপনি তো জানেন ওরা পরশুই জার্মানি চলে যাবে। অথচ মিনয় এই এগারোটা দিন একবারও আমাদের বাড়িতে পা রাখল না, আমার একটুও খোঁজ নিলো না । মিনহাজ টাও কেমন পাথর হয়ে আছে। আমি শুধু একটা বার মিনয়ের কাছে যাবে। আপনি আমাকে আজ স্কুল না, মিনয়দের বাড়িতে নিয়ে চলুন।"
কাকা চমকে উঠলেন। "সে কী কথা আম্মাজান! সাহেব জানলে তো আমার চাকরি থাকবে না। আর এই অসময়ে তুমি একা..."
তৃধা এবার কাকার হাতটা খপ করে ধরে ফেললো। তার চোখ দুটো ছলছল করছে। অতি আদরে বড় হওয়া মেয়েটার এই অবুঝ আকুতি এড়িয়ে যাওয়ার সাধ্য কাকার নেই। তৃধা বলতে লাগল, "কেউ জানবে না কাকা। আপনি তো আমার নিজের বাবার মতো। আপনি ছাড়া আমার কথা কে শুনবে? আমি শুধু দেখা করে চলে আসবো, কথা দিচ্ছি স্কুল ছুটির আগেই আপনি আমাকে নামিয়ে দেবেন।"
ড্রাইভার কাকা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই বয়সের মেয়েদের জেদ যে কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা তার অজানা নয়। অবশেষে তিনি হার মানলেন। স্কুলের পরিচিত পথ ছেড়ে গাড়িটা নিঃশব্দে মোড় নিলো মৃন্ময়দের বাড়ির দিকে।
মৃন্ময়দের বাড়ির গেটের সামনে যখন গাড়িটা থামল, তৃধার বুকের ভেতরটা দুরুদুরু কাঁপছে। ছোট থেকে কোনোদিন কোনো কাজে সে মিথ্যে বলেনি, কোনোদিন একা এভাবে কোথাও আসেনি। আজ যেন সে এক নিষিদ্ধ অভিযানে বেরিয়েছে। কাকা বিড়বিড় করে বললেন, "আমি গেটেই আছি আম্মাজান , তুমি জলদি চলে এসো।"
তৃধা গাড়ি থেকে নেমে ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকলো। বাগান ঘেরা এই বাড়িটা তার কত চেনা, অথচ আজ বাড়ির প্রতিটি ইট যেন এক অদ্ভুত নীরবতায় মোড়া। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিংবেলে আঙুল ছোঁয়াতেই তৃধার মনে হলো তার শরীরটা হিম হয়ে আসছে। এক অজানা ভয় আর একরাশ কৌতূহল নিয়ে সে দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো।
খানিক বাদে ভারী কাঠের দরজাটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে গেলো। আর দরজা খুলতেই তৃধার চোখের সামনে যে মানুষটা এসে দাঁড়ালো, তাকে দেখে সে বিস্ময়ে পাথর হয়ে গেলো।
এ যেনো সেই প্রাণোচ্ছল মৃন্ময় নয়, অন্য কেউ। গত এগারো দিনে মৃন্ময়ের চেহারায় যেন এক শতাব্দীর অবসাদ নেমে এসেছে। অগোছালো চুল, চোখের নিচে কালি পড়া দৃষ্টি আর একটা ছাইরঙা বিষণ্ণতা তার পুরো অবয়বকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তৃধাকে দেখামাত্র মৃন্ময়ের ফ্যাকাসে মুখটা আরও সাদা হয়ে গেলো। সে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
অস্ফুট স্বরে মৃন্ময় কেবল বলতে পারলো, "তৃধা? তুমি... এই সময়ে এখানে....
#ফাগুনে_হাওয়া
#ইসরাত_জাহান
#পর্ব_৪
তৃধার আকস্মিক উপস্থিতিতে মৃন্ময় যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। অস্ফুট স্বরে সে শুধু বলতে পারলো, "তুমি?"
তৃধা ভেজা চোখে মাথা নেড়ে সায় দিল, "হ্যাঁ, আমি..."
মৃন্ময় নিজেকে সামলে নিয়ে কিছুটা কঠোর হওয়ার চেষ্টা করল। গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল, "এই মুহূর্তে তুমি এখানে কী করছো? এখন তো তোমার স্কুলে থাকার কথা। সেখানে না গিয়ে তুমি এখানে এলে কেন?"
তৃধা কোনো উত্তর দিল না। সে পলকহীন দৃষ্টিতে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ফর্সা পুরুষটির দিকে তাকিয়ে রইল। মাত্র এগারোটা দিনে মানুষটা কতটা বদলে গেছে! চোখ-মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে,দেখে মনে হচ্ছে অসুস্থ।
তৃধার এই নীরবতা আর স্থির দৃষ্টি মৃন্ময়কে অস্বস্তিতে ফেলে দিলো। সে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই তৃধা মৃন্ময়ের হাতের ফাঁক গলে অনেকটা জেদ করেই বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়লো। মৃন্ময় মুহূর্তের জন্য হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। সে ভাবতেও পারেনি তৃধা এভাবে হুট করে ভেতরে ঢুকে যাবে। কারণ, ভেতরের পরিস্থিতি মোটেও স্বাভাবিক ছিল না। ড্রয়িং রুম জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ভাঙা কাঁচের টুকরো আর তছনছ হয়ে থাকা আসবাবপত্র। এক ধ্বংসস্তূপের প্রতিচ্ছবি যেন পুরো ঘরটা।
তেরো বছরের কিশোরী তৃধা চারপাশের এই বিশৃঙ্খলা বোঝার আগেই কয়েক পা এগিয়ে গেল। আর ঠিক তখনই ঘটল বিপত্তি। মেঝেতে পড়ে থাকা একটা ধারালো কাঁচের টুকরো তৃধার জুতোর তলা ভেদ করে সোজা পায়ে বিঁধে গেল।
"আহ্!"—তীব্র যন্ত্রণায় তৃধা চিৎকার করে উঠলো। মুহূর্তেই তার কান্নায় ঘরটা ভারী হয়ে উঠল।
তৃধার চিৎকার শুনে মৃন্ময় পাগলের মতো ছুটে এলো। দেখলো, মেয়েটি মেঝেতে হাঁটু ভেঙে বসে নিজের পা আঁকড়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মৃন্ময়ের বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। সে দ্রুত তৃধার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো। পরম মমতায় ওর পা-টা নিজের হাতের ওপর তুলে নিয়ে কাঁপা গলায় বললো,
"একদম নড়বে না! কী করতে গেলে এটা? কেন ভেতরে আসতে গেলে তৃধা? তুমি এখানে এসে বড্ড ভুল করে ফেলেছো তৃধা। তোমার এখানে আসা একদমই উচিত হয়নি তোমার ।
তৃধা যন্ত্রণার মাঝেই ওর দিকে তাকালো। কান্নার জন্য কথা আটকে আসছিলো তার, তবুও অভিমানী গলায় বললো, "তুমি পচা! তুমি অনেক খারাপ মিনয়। এগারো দিন ধরে তুমি আমাদের বাড়িতে আসো না কেন? আমার কথা কি একবারও মনে পড়েনি তোমার ? আমি এখানে ব্যথায় মরে যাচ্ছি আর তুমি আমাকে বকছো?"
মৃন্ময় কোনো কথা বললো না। তৃধার সাদা মোজাটা ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠছে দেখে তার হাত কাঁপতে লাগলো। সে অতি সন্তর্পণে কাঁচের টুকরোটা বের করে আনল। তৃধা ব্যথায় মৃন্ময়ের কাঁধটা খামচে ধরল। মৃন্ময় নিজের পকেট থেকে রুমাল বের করে ওর পা বেঁধে দিতে দিতে ধরা গলায় বললো,
"কাঁদবে না , এই তো হয়ে গেছে। তুমি আজ স্কুলে না গিয়ে এখানে কেন এলে বলো তো? কাকা তোমাকে নিয়ে এলো কেনো?"
তৃধা চোখের জল মুছে নাক টেনে বলল, "আমি কাকাকে বলেছি আমি এখন অনেক বড় হয়ে গেছি, আমি একা সব পারি। কিন্তু আমি তো আসলে কিছুই পারি না মিনয়। তুমি না থাকলে আমার কোনো কিছুই ভালো লাগে না। তুমি জার্মানি চলে গেলে আমি কার সাথে গল্প করব?"
মৃন্ময় তৃধাকে পাজাকোলা করে তুলে সোফায় বসিয়ে দিলো। ওর এই অবুঝ কথাগুলো শুনে মৃন্ময়ের চোখ দুটো ভিজে এলো। সে তৃধার কপালে হাত রেখে নরম গলায় বলল, "তুমি এখনো অনেক ছোট তৃধা। বড় হওয়ার অনেক জ্বালা। তুমি বরং এই ছোটই থাকো, বড় হওয়ার দরকার নেই।"
মৃন্ময়ের স্নেহের পরশ পেয়ে তৃধার কান্নার বেগ যেন আরও বেড়ে গেল। সে মৃন্ময়ের শার্টের হাতাটা খামচে ধরে হুট করে বলে বসল, "আমি ছোট নই মিনয়! সবাই আমাকে ছোট বলে কেন? আমি সব বুঝি। আর এই যে তুমি জার্মানি যাচ্ছ, আমি জানি তুমি সেখান থেকে ফিরে আর আমার কাছে আসবে না। আমাকে ভুলে যাবে।"
মৃন্ময় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে বললো, "ভুলে যাওয়ার মতো মানুষ কি তুমি? পাগলামি করো না তো। তুমি বড় হও, অনেক পড়াশোনা করো—"
মৃন্ময়ের কথা শেষ হতে দিল না তৃধা। সরাসরি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল, "আমি বড় হয়ে তোমাকে বিয়ে করতে চাই মিনয়! আমি তোমাকে অনেক পছন্দ করি। এই কথাটাই বলার জন্য আজ আমি স্কুল পালিয়ে এখানে এসেছি। তুমি কি আমায় সাথে করে নিয়ে যাবে?"
তৃধার মুখে এমন কথা শুনে মৃন্ময় যেন আকাশ থেকে পড়লো। কয়েক মুহূর্ত সে পাথরের মতো স্থির হয়ে রইল। তারপর একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মাথা নাড়ল। এই তেরো বছরের মেয়ের মাথায় এসব এল কোত্থেকে?
মৃন্ময় গম্ভীর হয়ে বলল, "তৃধা, এসব তুমি কী বলছো? তুমি কি জানো বিয়ের মানে কী? আজকালকার নাটক আর সিনেমায় এসব আজেবাজে কথা দেখে দেখে তোমাদের মাথাটা একদম বিগড়ে গেছে। এসব নিছক ছেলেমানুষি ছাড়া আর কিছুই না।"
তৃধা জেদ ধরে বলল, "এটা ছেলেমানুষি নয় মিনয়! আমি সত্যিই তোমাকে—"
"থামো তৃধা!"—মৃন্ময় এবার বেশ কড়া গলায় বলে উঠলো। "জীবনটা কোনো সস্তা রোমান্টিক সিনেমা নয়। তুমি এখনো দুনিয়ার রূঢ় বাস্তবতা দেখোনি। মানুষের মন বদলাতে সময় লাগে না, আর এই বয়সের ভালো লাগাগুলো কুয়াশার মতো—রোদ উঠলেই মিলিয়ে যায়। তুমি স্রেফ আবেগের বশে এসব বলছো।"
তৃধা অবুঝের মতো মাথা নাড়তে লাগল, ওর চোখে তখনো জল। সে বোঝাতে চাইল তার অনুভূতিটা সত্যি, কিন্তু মৃন্ময় আজ এক কঠিন শিক্ষক। সে তৃধাকে সোফা থেকে নামিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল, "আজ তুমি যা বললে, সেটা আমি ভুলে গেলাম। আর তুমিও ভুলে যাও। মানুষ যখন বড় হয়, তখন সে বুঝতে পারে জীবনটা কতটা কঠিন। তুমি এখন বাড়িতে যাও। ড্রাইভার কাকা বাইরে অপেক্ষা করছেন। মিনহাজ জানতে পারলে অনেক বড় অশান্তি হবে।"
তৃধার জেদের সামনে মৃন্ময় যেন দিশেহারা বোধ করছিলো। মেয়েটা সোফা কামড়ে ধরে বসে আছে, কিছুতেই নড়বে না। তার একটাই ভয়—মিনয় হারিয়ে যাবে। মৃন্ময় বুঝতে পারল, এই আবেগ কোনো যুক্তি দিয়ে দমানো সম্ভব নয়। তাই সে একটু অন্যভাবে চাল চালল।
মৃন্ময় তৃধার সামনে মেঝেতে বসলো। ওর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে খুব শান্ত আর গভীর চোখে ওর দিকে তাকালো। গলায় রাজ্যের নির্ভরতা নিয়ে বললো, "তৃধা, তুমি আমায় বিশ্বাস করো না?"
তৃধা চোখের জল মুছে ভেজা গলায় বললো, "করি তো।"
"তাহলে শোনো,"—মৃন্ময় একটা মেকি আশ্বাসের হাসি দিলো। "আমি তো এখন জার্মানি যাচ্ছি কেবল পড়াশোনার জন্য। আর তোমার বয়স তো মোটে তেরো! এই বয়সে কি বিয়ে হয় বলো? আমি কথা দিচ্ছি, যখন তোমার বিয়ের বয়স হবে, আমি জার্মানি থেকে ফিরে আসব। আর তখন আমরা বিয়ে করবো। রাজি?"
তৃধার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেলো। সে অস্ফুট স্বরে বলল, "সত্যি বলছো?বলেই বলেই মিনয় কে জড়িয়ে ধরলো। আর বলতে লাগলো তুমি ফিরে আসবে তো?"
মৃন্ময়ের পুরো শরীর কাঁপছে, যতই ভালো মানুষ হোক দিন শেষে সেও একজন পুরুষ,। বহু কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে মৃন্ময় এবার নিজেকে ছাড়াতে ছাড়াতে বলে উঠলো "অবশ্যই আসবো। আর দেখো, আমার সাথে তো মিনহাজও আছে। ও তো তোমার বড় ভাই, ও থাকতে আমি তোমাকে ফাঁকি দেব কীভাবে?"—মৃন্ময় খুব সুনিপুণভাবে মিনহাজের নামটা টেনে আনলো যাতে তৃধার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ না থাকে।
তেরো বছরের সরল কিশোরী মনটা নিমেষেই শান্ত হয়ে গেল। মিনহাজ আর মৃন্ময়ের বন্ধুত্বের ওপর ওর অগাধ বিশ্বাস। মৃন্ময়ের এই পাকা কথা তৃধার কাছে এক অলিখিত ধ্রুব সত্যের মতো মনে হলো। সে ভাবল, আর মাত্র কয়েকটা বছর তো! মিনয় ফিরে এলেই তো সব ঠিক হয়ে যাবে।
তৃধা এবার একটা লম্বা শ্বাস ফেলে শান্ত হলো। মৃন্ময় ওকে পাজাকোলা করে তুলে বাড়ির বাইরে রাখা গাড়িতে বসিয়ে দিল। তৃধা জানালা দিয়ে মৃন্ময়ের হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, "আমি কিন্তু তোমার জন্য অপেক্ষা করব মিনয়। তুমি একদম পাল্টাবে না তো?"
গাড়িতে ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে মৃন্ময় হঠাৎ কিছু একটা ভাবলো, ভাবনা শেষে তৃধার হাতটা আলতো করে চেপে ধরলো। ওর চোখেমুখে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য। তৃধা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। মৃন্ময় কিছুটা সময় নিয়ে বলল, "আমি তোমাকে কথা দিলাম তৃধা, তোমার বিয়ের বয়স হলে আমি ফিরে আসব। কিন্তু তার আগে আমার একটা শর্ত আছে। তুমি কি তা পূরণ করতে পারবে?"
তৃধা উৎসুক হয়ে বলে উঠল, "কী শর্ত মিনয়? তুমি যা বলবে আমি তাই করবো। শুধু বলো কী করতে হবে?"
মৃন্ময় খুব ভালো করে জানতো, তৃধা ছোটবেলা থেকেই ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে এসেছে। স্টেথোস্কোপ আর সাদা অ্যাপ্রনই ছিল ওর নেশা। কিন্তু ওকে নিজের থেকে দূরে সরাতে এবং ওর মনে একটা জেদ তৈরি করতে মৃন্ময় এক নিষ্ঠুর চাল চাললো। সে কিছুটা অবহেলার সুরে বলে বসল, "আমার একটা স্বপ্ন আছে তৃধা। যদি তুমি সেটা পূরণ করতে পারো, তবেই আমি তোমাকে বিয়ে করবো। নয়তো নয়।"
তৃধা রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল, "কী সেই স্বপ্ন?"
মৃন্ময় তৃধার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে শীতল গলায় বলল, "আমার স্বপ্ন একজন 'পাইলট'কে বিয়ে করা। আমার বউ হবে আকাশজয়ী এক সাহসী পাইলট। এখন তুমি যদি ডাক্তার হওয়ার জেদ ছেড়ে একজন পাইলট হতে পারো, তবেই আমার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসো। আমি শুধু একজন পাইলট তৃধাকেই গ্রহণ করবো।"
তৃধা যেন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেললো। তার দুচোখ বড় বড় হয়ে গেল। সে ভাবতেও পারেনি মৃন্ময় এমন কিছু একটা চেয়ে বসবে যা তার এতদিনের লালিত স্বপ্নের ঠিক উল্টো। সে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে মৃন্ময়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। মুহূর্তের মধ্যে তার সাজানো পৃথিবীটা যেন ওল্টপাল্ট হয়ে গেলো।।
মৃন্ময় তৃধার মাথায় হাত রেখে শেষবারের মতো বললো, "পাইলট হতে অনেক পরিশ্রম আর সাহসের প্রয়োজন তৃধা। তুমি কি পারবে তোমার স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে আমার স্বপ্ন পূরণ করতে? যদি পারো, তবেই আমার জন্য অপেক্ষা কোরো।"
তৃধা কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার কিশোরী মনে তখন এক বিশাল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। একদিকে তার আজীবনের স্বপ্ন 'ডাক্তার' হওয়া, আর অন্যদিকে তার ভালোবাসার মানুষটির অদ্ভূত এই শর্ত। মৃন্ময় টেনে তৃধাকে গাড়িতে উঠিয়ে দে। গাড়িটা যখন চলতে শুরু করলো, তৃধা জানালার কাঁচের ওপাশে মৃন্ময়ের আবছা অবয়বটার দিকে তাকিয়ে রইলো।
মৃন্ময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল গাড়িটা দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। সে মনে মনে বলল, "ক্ষমা কোরো তৃধা। ডাক্তার হওয়ার যে স্বপ্ন তুমি দেখো, তা যেন আমার এই মিথ্যে শর্তের চাপে হারিয়ে না যায়। আমি জানি তুমি জেদি। আমার ওপর অভিমান করেই তুমি তোমার লক্ষ্যে পৌঁছাবে। আর ততদিনে আমি তোমার জীবন থেকে অনেক দূরে চলে যাব....