পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা পেটটা একহাতে আঁকড়ে ধরে বরবেশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার পা দুটো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে পনেরো বছরের এক কিশোরী।
চারপাশে মানুষের ভিড়। পাঁচ মাস পর বিদেশ থেকে এলাকার মাতব্বরের বড় ছেলে রিফাত নিজের বিদেশি বউকে নিয়ে দেশে ফিরেছে—এই এক খবরই যেন পুরো গ্রামে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দিয়েছে। সকাল থেকেই একে একে মানুষজন ভিড় জমিয়েছে মাতব্বর বাড়িতে। কারও চোখে কৌতূহল, কারও মুখে ফিসফাস—সবারই যেন একটাই আগ্রহ, বিদেশি বউটাকে একনজর দেখা।
অথচ সেই বউ দেখতে এসে যে এমন এক দৃশ্যের মুখোমুখি হবে—কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি। কিশোরীর এলোমেলো চুল, চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু, কাঁপতে থাকা ঠোঁট আর পাঁচ মাসের স্পষ্ট গর্ভ—সবকিছু মিলিয়ে মুহূর্তেই চারপাশের হাসি-আনন্দ স্তব্ধ হয়ে গেল।
------"আপনে ক্যান এমন করলেন আমার লগে রিফাত ভাই? আপনে তো আমারে কইছিলেন, দ্যাশে আইসা আমারে বিয়া করবেন। আমাগো একখান সুন্দর সংসার হইবো, আমারে আপনের বাচ্চার মা বানাইবেন - তাইলে আইজ হগ্গলে ওই সোন্দর মাইয়াডারে আপনের বউ কইতাছে ক্যান? আপনের বউ তো হমু আমি, এই যে দ্যাহেন আমার প্যাটে আপনের বাচ্চা। আমি পাঁচ মাসের পোয়াতি রিফাত ভাই। আমাগো ভালোবাসার অংশ আমার প্যাটে দ্যাহেন।
কিশোরীর কথায় রাগী দৃষ্টি নিয়ে তাকালো রিফাত। চারপাশে লোকজন কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
হেডমাস্টারের মেয়ে রোদসী। এলাকার সবার পরিচিত মুখ। এতদিন ধরে ওর ফোলা পেটটা নিয়ে মানুষের মনে নানা প্রশ্ন থাকলেও কেউ মুখ খোলেনি। রোদসীর বাবা একজন সম্মানিত মানুষ, তাই মেয়েকে নিয়ে সরাসরি কিছু বলার সাহস কারও হয়নি। তবে আড়ালে- আবডালে কানাঘুষা কম ছিল না। কত লোকে কত কি বলতো আর আজ সেই সব ফিসফাস যেন হঠাৎ করেই সবার সামনে নগ্ন সত্য হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
------"চুপ কর পোড়ামুখী। কোন সাহসে তুই আমার চান্দের লাহান পোলাডার কপালে তোর ওই পাপরে গছাইতে চাইতাছস। তোর চেহারা দেখছস, দ্যাখলেই তো বমি আহে আর তুই কইতাছস আমার পোলা তোরে ভালোবাসে? ছাড় আমার পোলার পা ছাড়, সুন্দরী বউ আনছে আমার পোলায় আর তুই আইছস সংসারডা ভাইঙ্গা দেওনের লাইগা?
কথাটা বলেই রোদসীর চুলের মুঠি ধরে টেনে রিফাতের থেকে সরিয়ে নিলো রিফাতের মা। ব্যথায় ককিয়ে উঠলো মেয়েটা। পাঁচমাস আগে রিফাতই তো বলেছিল ওর সাথে একঘরে না থাকলে ও বুঝবে রোদ ওকে ভালোবাসেনা। মাত্র পনেরো বছরের এক মেয়ে সে, বুঝতে পারেনি পঁচিশ বছর বয়সের এক তাগড়া যুবকের ছলনা। রিফাত কত সুন্দর। এমন একটা মানুষকে কিভাবে ভুলে যাবে সে। ভালোবাসে তো, তাই আর কিছু না ভেবে বিশ্বাস করে নিজের সর্বস্ব উজার করে দিয়েছিল। তার দুদিন পর রিফাত দেশ ছেড়ে চলে গেলো। তবে যাওয়ার আগে বলেছিল, দেশে ফিরেই রোদকে ঘরে তুলবে কিন্তু আজ!
রিফাত পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখে কোনো কথা নেই। চোখে নেই পরিচিত সেই মায়া। যে মানুষটার একটা হাসির জন্য রোদসী দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছে, আজ সেই মানুষটাই যেন তাকে চিনতেই পারছে না। তা দেখে সহ্য হলো না রোদের, সে দুহাত দিয়ে রিফাতের মায়ের একটা হাত টেনে এনে তাতে সজোরে কামড় দিতেই তিনি ব্যথায় লাফিয়ে উঠে চুল ছেড়ে দিলেন।
রোদসী এক হাতে পেটটা ধরে অন্য হাতে আবারও শক্ত করে রিফাতের পা জড়িয়ে ধরল।
------"আমি তো গাঁয়ের মাইয়া, আপনের মতো এত শিক্ষা নাই আমার। কিন্তু এইটুকু বুঝি যারে একবার নিজের সবকিছু দেয়া যায়, হের লগেই জীবন কাটান লাগে। আপনের বিদেশে যাওয়ার আগের রাইতে আপনে যহন আমারে কইলেন আপনার লগে থাকনের কথা, আমি তো তহনই আপনেরে আমার স্বামী বইলা মানছি। তাইলে অহন এমন চুপ কইরা আছেন ক্যান? একবার খালি কন, আমি মিছা কই নাই। এই বাচ্চাডা আপনের,আপনে হের বাপ আর ওই সোন্দর মাইয়াডারে বাইর কইরা দ্যান। আমি তো আছি আপনের লাইগা , কন না রিফাত ভাই। খালি একবার কন?
এতক্ষণ চুপচাপ থাকলেও এবার আর চুপ থাকলো না রিফাত। নতুন বউয়ের সামনে এমন চুপ করে থাকলে সে সন্দেহ করবে, তাছাড়া নতুন বউ কি সুন্দর আর রোদ তো কালো। এতদিন ও রোদের সাথে টাইমপাস করেছে আর সেদিন রাতে সেটাও তো টাইমপাসের অংশ ছিলো কিন্তু কে জানতো মেয়েটা আবার এক রাতেই প্রেগন্যান্ট হয়ে যাবে। সে দুইহাত দিয়ে রোদসীকে টেনে দাঁড় করালো -
-----"দেখো রোদ, আমি অস্বীকার করছি না যে তোমাকে আমি ভালোবাসিনা। তোমাকে আমি ভালোবাসি কিন্তু সেটা বোন হিসেবে। প্রায়ই তুমি আমাদের বাড়িতে আসতে কারণ তোমার মা আমাদের বাড়িতে মাঝেমধ্যে মাকে টুকটাক কাজে সাহায্য করে। তাই আমিও কিছু বলিনি। কিন্তু তুমি আজ যেটা করছো, সেটা তো ঠিক নয়। তোমার গর্ভে কার না কার সন্তান, আর তুমি কিনা সেটা আমার ঘাড়ে চাপাতে চাইছো? তুমি যা বলছ, তার কিছুই সত্যি নয়, রোদসী। দেখো তোমার বাচ্চার বাবা কে, তাকে তুমি হাজির করো, আমি সবার সামনে কথা দিচ্ছি - নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দেবো তোমাদের। কিন্তু দয়া করে আমার নতুন বউয়ের সামনে এমন বিহেভ করিও না।
কথাটা শুনে যেন মেয়েটার বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে। এই মানুষটাই তো রাতের আঁধারে বাড়ির সবাইকে লুকিয়ে কত কাঁচের চুড়ি, লাল ফিতা দিয়ে গেছে। কতবার গাছের পেয়ারা, পাকা আম, বিলের শালুক তুলে এনে দিয়েছে। আর আজ সেই মানুষটা কিভাবে অস্বীকার করছে এগুলো? আর সহ্য করতে পারলো না রোদ। মাথা নাড়তে নাড়তে ফিসফিস করে বলল,
-------"না না, এইডা হইতে পারে না। আপনে এমন কথা কইতে পারেন না রিফাত ভাই! এত্তগুলা মাইনষের মইধ্যে খারায়া, এমন মিছা কথা কইয়েন না - আল্লাহ সইবো না।
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। সকলেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এমন ভাবে দেখছিল রোদকে যেন কোন এলিয়েন সে। কেউ অবাক হয়ে রিফাতের দিকে তাকিয়ে আছে, কেউ রোদসীর দিকে।
আর রোদসী? সে যেন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। চোখের পানি মুছে কাঁপা গলায় বলল,
------"হেইদিন তো ঝড় উঠছিল, আপনে ছাতা লইয়া যান নাই আমারে আনতে? আপনে তো আমারে কইছিলেন , আমি যদি আপনের কথা না শুনি তাইলে আপনে আমারে ভুইলা যাইবেন। আর কোনদিন আমার মুখ দ্যাখবেন না। মনে নাই আপনের? আপনেই তো কইছিলেন, আপনেরে যে আমি ভালোবাসি হেইডা বিশ্বাস করনের লাইগা ভালোবাসার প্রমাণ দিতে। আমি তো হেইডিন আপনেরে বিশ্বাস করছিলাম, রিফাত ভাই। অন্ধের মতো বিশ্বাস করছিলাম। তাইলে আইজ ক্যান এমনে মিছা কথাগুলা কইতাছেন?
একটু থামলো রোদ, একসাথে এতগুলো কথা বলতে গিয়ে যেন হাঁপিয়ে উঠেছে মেয়েটা। চোখ দিয়ে ঝর্নার মতো অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। রিফাত এবার কঠিন চোখে তাকাল।
-----"চুপ করো, রোদসী। আল্লাহর দোহাই লাগে। এমন মিথ্যা কথা বলিও না। চাচা আপনার মেয়েকে নিয়ে যান। আমার সংসার ভাঙতে আসছে ও, আপনি না শিক্ষিত মানুষ। একে তো কার পাপ পেটে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে তার উপর আবার এসে গছিয়ে দিচ্ছে আমারর ঘাড়ে। শিক্ষিত মানুষের পরিবার এমন হয়? ছিহ ভাবতেও ঘৃণা লাগছে আমার। নিয়ে যান আপনার মেয়েকে। আম্মু চলো।
কথাটা বলেই আর কোন কিছুর সুযোগ কাউকে দিলোনা রিফাত। গেটের দারোয়ান দিয়ে সবাইকে বের করে দিয়ে বাড়ির মূল গেট বন্ধ করে দিলো। তা দেখে চমকে উঠলো রোদ। হঠাৎ করেই তার কণ্ঠে কান্নার বদলে তীব্র অসহায়তা ফুটে উঠল।
------"রিফাত ভাই, দরজাডা খোলেন। আমারে আপনের মানা লাগবোনা, আআমি নয়তো কালী কিন্তু প্যাটের এই বাচ্চাডা তো নিষ্পাপ - হ্যারে মাইনা লন। হেয় তো আপনের বংশের, এরে ছাইড়া দিয়েন না। আল্লাহর গজব নাইমা আইবো, দয়া করেন। আমার কথাডা একবার শোনেন। আমি মিছা কইতাছি না, আল্লাহর কসম, মিছা কইতাছি না। এই বাচ্চাডা আপনের…”
উন্মাদের মতো কাঁদতে কাঁদতে ডাকতে লাগলো রোদ কিন্তু ভেতর থেকে কোনো উত্তর এলো না। শুধু বন্ধ দরজার ওপাশে মানুষের পায়ের শব্দ। তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
রোদসীর কণ্ঠও আস্তে আস্তে থেমে গেল। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে অবিরাম। এক হাত পেটের ওপর রেখে অন্য হাতটা দরজার গায়ে ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। পাঁচ মাসের এই সন্তানটুকুই যেন এখন তার পৃথিবীর শেষ সম্বল।
_______________________________________
সন্ধ্যে হয়ে গেছে অনেক আগেই । বাহাদুরগড়ের স্কুল মাঠে আজ যেন পা ফেলার জায়গাটুকুও নেই।
সকাল থেকেই মাঠজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। তবে বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই ভিড় যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। রেললাইনের ধারে বিস্তীর্ণ মাঠটাকে ঘিরে আজ মানুষের ঢল নেমেছে। দূরের গ্রামগুলো থেকেও দল বেঁধে মানুষ এসেছে খেলা দেখতে। কেউ এসেছে সাইকেলে, কেউ ভ্যানে, কেউবা মোটরসাইকেলে চেপে। মাঠের চারপাশে ছোট ছোট দোকান বসেছে—চা, মুড়ি, চানাচুর, ফুচকা থেকে শুরু করে ঠান্ডা পানীয়; সব মিলিয়ে পুরো জায়গাটা যেন একদিনের জন্য মেলার মাঠে পরিণত হয়েছে।
আজ বাহাদুরগড় বনাম বকুলতলার বহু প্রতীক্ষিত ফুটবল ফাইনাল। দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে সকাল থেকেই উত্তেজনা। মাঠের একপাশে বাহাদুরগড়ের সমর্থকদের গলায় স্লোগান, অন্যপাশে বকুলতলার সমর্থকদের চিৎকার। মাঝেমধ্যে দুই পক্ষের হাততালিতে পুরো মাঠ কেঁপে উঠছে। তবে আজকের আয়োজনকে অন্যসব দিনের চেয়ে আলাদা করে দিয়েছে আরও একটি বিষয়।
ঢাকা থেকে আসছেন ক্রীড়ামন্ত্রী কাব্য চৌধুরী।
এই বাহাদুরগড়েরই ছেলে তিনি। কাব্য চৌধুরী রাজনীতির অঙ্গনে খুব বেশি পুরোনো নন। মাত্র এক বছর হলো মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছেন। কিন্তু রাজনীতির মাঠে তার পরিচিতি নতুন নয়। ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে রাজনীতির নানা কর্মকাণ্ডে তাকে দেখা গেছে।
তার বাবা দেশের একজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য। সেই সুবাদে রাজনীতির পরিবেশে বেড়ে ওঠা কাব্য খুব অল্প বয়সেই শিখে নিয়েছেন মানুষের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, কীভাবে পরিস্থিতি সামলাতে হয়, আর সবচেয়ে বড় কথা—কীভাবে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে হয়।
আজ সেই কাব্যই নিজের এলাকার মানুষের সামনে ফিরেছেন মন্ত্রী হয়ে। তাই তাকে একনজর দেখার আগ্রহও কম নয়। চারদিকে মাগরিবের আজান পড়ে গেল, ঠিক এমন সময় মাঠের মূল প্রবেশপথের দিকে হঠাৎ মানুষের মধ্যে একটা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।
-----“মন্ত্রী আইছে!
কেউ একজন চিৎকার করে উঠতেই মুহূর্তের মধ্যে কথাটা ছড়িয়ে গেল পুরো মাঠে। দূর থেকে কয়েকটি গাড়ি এগিয়ে আসছে। সবার সামনে নিরাপত্তার গাড়ি। তার পেছনে কালো কাচে ঢাকা একাধিক গাড়ি। গাড়িগুলো মাঠের নির্ধারিত জায়গায় এসে থামতেই নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত চারপাশ সামলে নিল।
মুহূর্তের মধ্যে মাঠের একাংশে আলাদা নিরাপত্তাবলয় তৈরি হলো।
যারা এতক্ষণ খেলার দিকে তাকিয়ে ছিল, তাদের অনেকের চোখ এখন গাড়ির দিকে। কেউ মোবাইল বের করে ছবি তুলছে। কেউ সন্তানকে কোলে তুলে ধরছে—যেন দূর থেকেও মন্ত্রীকে ভালোভাবে দেখা যায়।
কয়েকজন বয়স্ক মানুষ নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে বলছে—
-----“আমাগো এলাকার পোলা, আইজ দ্যাশের মন্ত্রী! এতদিন হের বাপে আছিল এই গাঁয়ের একজন নামীদামী মানুষ আর আইজ তার পোলায় তার চাইতেও বেশি দামী মানুষ হইয়া গ্যাছে।
গাড়ির দরজা খুলে নামলেন কাব্য চৌধুরী। পরনে পরিপাটি পাঞ্জাবি, তার ওপর গাঢ় রঙের ওয়েস্টকোট। মুখে আত্মবিশ্বাসী স্থিরতা। সঙ্গে কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা এবং স্থানীয় নেতাকর্মী।
মাঠে পা রাখতেই স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এগিয়ে এসে তাকে স্বাগত জানালেন। কেউ ফুলের তোড়া দিলেন।
কেউ করমর্দন করলেন। কেউ সালাম দিয়ে বললেন—
------“স্যার, আপনেরে আমাগো এলাকায় দেইখা আমরা ম্যালা খুশি হইছি।
কাব্য চৌধুরীও মৃদু হেসে বললেন—
-----“আমিও তো এই এলাকারই ছেলে।ছোটবেলায় কত দাপিয়ে বেড়িয়েছি এই এই বাহাদুরগড়ের মাঠেঘাটে। আর আজ আপনাদের মাঝে আসতে পেরে আমারও ভালোই লাগছে।
কথাটা শুনে আশপাশের মানুষের মধ্যে যেন আরও এক দফা উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ল। তবে কাব্যের চারপাশের নিরাপত্তা, একের পর এক গাড়ি, সরকারি কর্মকর্তা আর প্রোটোকলের লোকজন স্পষ্ট করে দিচ্ছিল—
এই এলাকার সেই পরিচিত ছেলেটা এখন আর শুধু কাব্য চৌধুরী নয়। সে এখন দেশের ক্রীড়া মন্ত্রী কাব্য চৌধুরী। খেলা তখন শেষের দিকে। মাঠের দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে। একবার বাহাদুরগড় আক্রমণে যাচ্ছে, পরক্ষণেই বকুলতলা পাল্টা আক্রমণ করছে। দর্শকদের চিৎকারে মাঝেমধ্যে রেললাইনের ওপাশ পর্যন্ত শব্দ পৌঁছে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যার ঠিক আগমুহূর্তে বাজল শেষ বাঁশি।
বকুলতলা জয়ী।
এক মুহূর্তের মধ্যে বকুলতলার সমর্থকদের উল্লাসে পুরো মাঠ কেঁপে উঠল। কেউ মাঠে ছুটে গিয়ে খেলোয়াড়দের জড়িয়ে ধরছে। কেউ পতাকা হাতে দৌড়াচ্ছে। বিজয়ী দলের খেলোয়াড়দের মুখে আনন্দের ঝিলিক।
অন্যদিকে বাহাদুরগড়ের খেলোয়াড়দের মুখে হতাশা। কেউ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ হাঁটুতে হাত রেখে হাঁপাচ্ছে। মঞ্চের সামনে তখন স্থানীয় কয়েকজন আয়োজক, খেলোয়াড় আর গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ব্যস্ত। কাব্য চৌধুরীকে মঞ্চে ওঠার জন্য অনুরোধও করা হলো।
কাব্য খুশি হয়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যেতে নিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। কী যেন একটা চোখে পড়েছে তার।
মাঠের ঠিক পাশেই রেললাইন। কাব্যের দৃষ্টি ধীরে ধীরে সেদিকে আটকে গেল। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না সে। তারপর চোখ কুঁচকে তাকাতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল।
রেললাইনের মাঝখানে একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
লম্বা চুলগুলো পুরো খোলা। বাতাসে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে তার মুখ আর পিঠ ঢেকে দিচ্ছে। দুই হাত শরীরের দুপাশে মেলে রেখেছে—একদম পাখির ডানার মতো।
স্থির। অস্বাভাবিক রকমের স্থির।
কাব্য কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। এমন সময় দূর থেকে ভেসে এলো ট্রেনের তীক্ষ্ণ হুইসেল কিন্তু মেয়েটা সরলো না। কাব্য প্রথমে ভেবেছিল হয়তো এমনি দাঁড়িয়েছে কিন্তু ট্রেনের শব্দ বেড়ে যাওয়ার পরেও যখন মেয়েটা সরলো না, তখন কাব্যের মুখ মুহূর্তেই বদলে গেল।
রেললাইনের পাশে থাকা বড় বড় গাছের আড়ালে এখনো ট্রেনটাকে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু হুইসেলের শব্দ আর রেলের ওপর ভেসে আসা ক্ষীণ কম্পন বলে দিচ্ছে—ট্রেন খুব বেশি দূরে নেই।
-----“এই! এই মেয়ে সরে যাও, ট্রেন আসছে। এই...........
কাব্যের গলা বজ্রের মতো গর্জে উঠল। মাঠের মানুষের কথা থেমে গেল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাব্য রেললাইনের দিকে দৌড় দিল।
-------“এই কেউ ওই মেয়েটাকে সরাও! ট্রেন আসছে! বাঁচাও ওকে।
কাব্যের চিৎকারে মুহূর্তের মধ্যে চারপাশে হইচই পড়ে গেল। নিরাপত্তাকর্মীরা প্রথমে হতভম্ব হয়ে গেলেও পরক্ষণেই তার পেছনে ছুটল।
------“স্যার! দাঁড়ান।
স্থানীয় কয়েকজনও চিৎকার করতে করতে দৌড় দিল কাব্যের পিছনে ।
-------“মাইয়াডারে ধর! ট্রেন আইতাছে! ওই আপা! সইরা যান!
মাঠের কয়েকশো মানুষ তখন একসঙ্গে রেললাইনের দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে।
কেউ দৌড়াচ্ছে। কেউ শুধু দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে।
কাব্য ততক্ষণে নিরাপত্তার বলয় ভেঙে অনেকটা সামনে চলে গেছে।
------“এই মেয়ে! শুনতে পাচ্ছেন? সরে যান, নয়তো কাটা পড়বেন। সরুন।
মেয়েটা নড়ল না। হুইসেলের শব্দ আবারও শোনা গেল। এবার আরও কাছে।
ঠিক তখনই গাছের ফাঁক দিয়ে ট্রেনের সামনের আলো দেখা গেল। একটা তীব্র সাদা আলো অন্ধকার চিরে এগিয়ে আসছে। কাব্যের মুখের রঙ বদলে গেল।
-----“হায় আল্লাহ!
ট্রেন এখন আর দূরে নেই। সে দৌড়াতে দৌড়াতে বুঝতে পারল, মেয়েটার কাছে পৌঁছাতে তার হাতে বড়জোর কয়েক সেকেন্ড। পেছন থেকে নিরাপত্তাকর্মীরা চিৎকার করছে—
----“স্যার! ফিরে আসুন! ট্রেন আসছে, আপনি আঘাত পাবেন, স্যার!
কিন্তু কারো কথা কানে নিলো না কাব্য,সে যত জোড়ে পারল ছুটলো। ট্রেনের হুইসেল এবার কর্ণবিদারী।
মেয়েটা তখনও দাঁড়িয়ে। কাব্য এবার ভয় পেল।
সত্যিকারের ভয়। তার মনে হলো, আর কয়েক সেকেন্ড দেরি হলেই মেয়েটাকে তার চোখের সামনে—
না! সে সেই চিন্তাটাও শেষ করতে পারল না। শেষ শক্তিটুকু দিয়ে দৌড়ে গিয়ে মেয়েটার এক হাত চেপে ধরল সে। মেয়েটা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। কাব্য তাকে টেনে সরাতে গেল, কিন্তু মেয়েটা যেন সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ট্রেনের আলো তখন এতটাই কাছে যে কাব্যের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। ওদের আর ট্রেনের মাঝখানে তখন মাত্র কয়েক হাত দূরত্ব।
আর এক সেকেন্ডও দেরি করলো না সে এক হাত দিয়ে মেয়েটার কোমর জড়িয়ে ধরে দুজনেই লাফিয়ে পড়লো পাশের ঝাউ জঙ্গলের ভেতর। ঠিক সেই মুহূর্তেই—
গর্জন করে ট্রেনটা বেরিয়ে এলো। কাব্য মাটিতে পড়ে গিয়ে হাত দিয়ে নিজেকে সামলাল।
মেয়েটা তার থেকে কয়েক হাত দূরে গিয়ে শক্ত মাটিতে আছড়ে পড়ল। ততক্ষণে বাকি লোকজনও এসে গেছে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সবাই যেন বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এরপর ট্রেন চলে গেলে কেউ একজন চিৎকার করে উঠল।
------"ওই স্যার ঠিক আছে, তোরা মাইডারে কেউ ধর।
স্যার ঠিক আছেন?
কথাটা বলেই লোকটা এগিয়ে এসে কাব্যকে তুললো।
কাব্য দ্রুত উঠে দাঁড়াল। হাতের তালুতে ঘষা লেগে চামড়া উঠে গেছে। কনুইতেও আঘাত পেয়েছে। কিন্তু সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে ছুটে গেল মেয়েটার কাছে। মেয়েটা মাটিতে নিথর হয়ে পড়ে আছে। লম্বা চুলগুলো মুখের ওপর ছড়িয়ে আছে। কপালের একপাশে সামান্য রক্তের দাগ। চোখ বন্ধ।
কাব্য হাঁটু গেড়ে বসে তার মুখের সামনে হাত নেড়ে দেখল।
------“এই শুনতে পাচ্ছেন? কে আপনি?
কিন্তু কোনো সাড়া নেই। হঠাৎ করেই পায়ের দিকে নজর পড়তেই কাব্যের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।মেয়েটার পায়ের নিচে মাটি রক্তে ভিজে যাচ্ছে।
কিন্তু শুধু পা নয়—তার পরনের কাপড়ের নিচের দিকেও রক্তের দাগ ছড়িয়ে পড়েছে। মাটিতে গড়িয়ে পড়া রক্তের সঙ্গে ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে সেই লালচে দাগ। ভয় পেল কাব্য, ভয়ে চিৎকার করে উঠলো সে -
-----“পানি আনেন কেউ প্লিজ আর কবির অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করো। এখনই, এই মুহূর্তেই। উনি আঘাত পেয়েছে কবির, দ্রুত করো দ্রুত।
কাব্যের নিরাপত্তাকর্মীর মধ্যে একজন সঙ্গে সঙ্গে ফোন বের করল। চারপাশে তখন মানুষের বিশাল ভিড়। কেউ ভয়ে মুখে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করছে। ঠিক তখনই তাদের মাঝখানে একজন পুরুষ আতঁকে উঠবে -
------" আল্লাগো, এইডা তো আমাগো শফিক মাস্টারের মাইয়া - শালুক। ভালো নাম রোদসী। সকালে হ্যারে নিয়া মেলা কাহিনী হইছে, মাইয়াডা পাঁচ মাসের পোয়াতি। আল্লাহ গো হেই অবস্থায় রেললাইনে খাড়াই ছিল।
কাব্য এবার ধীরে ধীরে মেয়েটার পেটের দিকে তাকাল।
ঢিলেঢালা পোশাকের নিচেও পাঁচ মাসের গর্ভ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কাব্যের মুখের কঠোরতা মুহূর্তেই আরও গভীর হয়ে উঠল।
—“প্রেগন্যান্ট?”
কণ্ঠে এবার অবাক হওয়ার চেয়ে বেশি ছিল অস্বস্তি।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এলাকার এক বয়স্ক লোক দ্রুত মাথা নাড়লেন।
-----“হ স্যার। হেই মাইয়া নিজেই কইছে, হেয় পাঁচ মাসের পোয়াতি। আর মাইয়ার বয়সও তো বেশি না, চৌদ্দ-পনেরো হইবো।
কথাটা শুনে কাব্য কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল। চৌদ্দ-পনেরো বছর। পাঁচ মাসের গর্ভ। আর এই অবস্থায় একটু আগেই সে নিজের চোখের সামনে মেয়েটাকে চলন্ত ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে।
কাব্যের বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
কেন উঠল, সে জানে না। এই মেয়েটাকে সে চেনে না।
তার নামটুকুও মাত্র শুনেছে। তবুও অচেতন মুখটার দিকে তাকিয়ে তার ভেতরটা অদ্ভুত এক অস্বস্তিতে ভরে গেল। মেয়েটার কপালের ক্ষত থেকে আবারও সামান্য রক্ত গড়িয়ে নামল। তা দেখে আর অপেক্ষা করল না কাব্য।
সে এক ঝটকায় নিচু হয়ে রোদসীকে দুহাতে তুলে নিল।
চারপাশের মানুষজন বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
—“স্যার!”
কাব্যের নিরাপত্তাকর্মী এগিয়ে আসতেই কাব্য কঠিন গলায় বলল—
------“গাড়ি রেডি করো।
----“স্যার, অ্যাম্বুলেন্স আসছে তো—
-----“এটা গ্রাম কবির, শহর নয়। অ্যাম্বুলেন্স আসার অপেক্ষা করলে মেয়েটা এখানেই মারা পড়বে। তাই কথা না বাড়িয়ে গাড়ি বের করো, দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে ।
কাব্যের কণ্ঠে এমন দৃঢ়তা ছিল যে আর কেউ কোনো প্রশ্ন করল না। রোদসীর নিথর শরীরটা কাব্যের বুকের সঙ্গে এলিয়ে আছে। মেয়েটার লম্বা চুল ওর হাত বেয়ে নেমে এসেছে। এক হাত দিয়ে সে রোদসীর মাথাটা সাবধানে ধরে রাখল, অন্য হাতে শরীরটা শক্ত করে আগলে দ্রুত গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
চারপাশের ভিড় আপনাআপনি সরে যেতে লাগল।
কেউ ফিসফিস করে বলল—
-----“মন্ত্রী সাহেব নিজের গাড়িতে লইয়া যাইতাছে!”
কেউ আবার বলল—
-----“সফিক মাস্টাররে খবর দাও! তাড়াতাড়ি!
কাব্য কারও কথার দিকে তাকাল না। গাড়ির দরজা খুলে সে নিজেই রোদসীকে পেছনের সিটে শুইয়ে দিল। তার মাথার নিচে নিজের ভাঁজ করা ওয়েস্টকোটটা গুঁজে দিল, যেন ঝাঁকুনিতে মাথায় আরও আঘাত না লাগে।
তারপর ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বলল—
----“হাসপাতাল চলো। যত দ্রুত সম্ভব।
গাড়ি ছুটে বেরিয়ে গেল। পেছনে পড়ে রইল বাহাদুরগড়ের স্কুল মাঠ, হাজার মানুষের ভিড় আর রেললাইনের পাশে ঘটে যাওয়া সেই ভয়ংকর কয়েক মিনিট। কাব্যের দৃষ্টি বারবার চলে যাচ্ছিল রোদসীর দিকে।
অচেতন মেয়েটা নড়ছে না। চোখ বন্ধ। মুখ বিবর্ণ।
আর সেই ছোট্ট শরীরের ভেতরে পাঁচ মাসের একটি অনাগত প্রাণ নিঃশব্দে লড়াই করে যাচ্ছে। কাব্য নিজের অজান্তেই মুঠো শক্ত করল। কেন করলো জানে না। শুধু এটুকু জানে - যাই হয়ে যাক,
মেয়েটাকে বাঁচাতেই হবে।
চলবে,
#রোদ্দুরের_রেশ
#আরশিয়া_নূর
#সূচনা_পর্ব
[গল্পটা তোমাদের কেমন লাগবে আমি জানিনা কিন্তু শুরু করলাম আজকে। এটা অন্যান্য গল্পের থেকে আলাদা হবে। পড়ে জানিও সবাই কেমন হয়েছে, কমেন্টে বলিও কিন্তু ]