ফন্ট সাইজ:
থিম:
রোদ্দুরের রেশ

২য় পর্ব

লেখক: আরশিয়া নূর

#রোদ্দুরের_রেশ [২]

#আরশিয়া_নূর

[অনুমতি ব্যতিত কপিকরা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ 🚫]

রাত ঠিক আটটা।

বাহাদুরগড় মূলত একটা মফস্বল শহর। শহর বলা হলেও বড় শহরের মতো এখানে আধুনিক হাসপাতাল, উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা কিংবা জরুরি রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা—কোনোটাই নেই। হাতে গোনা দু-একটা ছোট ক্লিনিক আর একটি নামমাত্র হাসপাতালই ভরসা এই এলাকার মানুষের।

গুরুতর কিছু হলে বাহাদুরগড়ের মানুষজনের একটাই পথ—রোগীকে দ্রুত শহরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া।

কিন্তু আজ সেই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেছে। ক্রীড়ামন্ত্রী কাব্য চৌধুরী নিজে যখন আহত মেয়েটাকে কোলে করে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে, তখন হাসপাতালের সামনের চিত্রটাই বদলে গেছে। গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গেই কাব্যের নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত হাসপাতালের প্রবেশপথ খালি করে দিয়েছিল। স্থানীয় লোকজনের ভিড় সামলাতে হাসপাতালের কর্মীদের সঙ্গে তার নিরাপত্তাকর্মীরাও নেমে পড়েছে। কেউ যেন অযথা ভেতরে ঢুকে পরিস্থিতি আরও জটিল না করে, সেদিকেও কড়া নজর রাখা হচ্ছে।

এই ছোট্ট হাসপাতালটার চিকিৎসকরা নিজেদের সাধ্যমতো ছোটাছুটি করছেন রোদসীর জন্য। মেয়েটাকে হাসপাতালে আনা হয়েছে প্রায় ঘন্টা পেরিয়ে গেছে কিন্তু চিকিৎসকরা এখনো কিছু বলেননি। করিডোরে জরুরি বিভাগের বাহিরে অস্থিরভাবে পায়চারি করছে ক্রীড়ামন্ত্রী কাব্য চৌধুরী।

তার চারপাশে নিরাপত্তাকর্মী। স্থানীয় কয়েকজন গণ্যমান্য মানুষ। হাসপাতালের কর্মচারী। কৌতূহলী কিছু মানুষ। কিন্তু এত মানুষের মাঝেও কাব্যকে ভীষণ একা লাগছে। তার ডান হাতের তালুতে এখনো রেললাইনের পাশের শক্ত মাটি লেগে আছে। তখন মেয়েটাকে নিয়ে অমন ঝাপিয়ে পড়ায় কনুইয়ের চামড়া উঠে গেছে। পাঞ্জাবির একপাশে কাদা লেগে শুকিয়ে শক্ত হয়ে আছে।

কেউ একজন কয়েকবার তাকে বসতে বলেছে।

কিন্তু কাব্য বসেনি। তার চোখ বারবার সেই বন্ধ দরজাটার দিকে চলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে দরজাটা খুললেই হয়তো কেউ এসে বলবে—

“ভয়ের কিছু নেই, মেয়েটা ঠিক আছে।”

এই একটা কথার জন্যই যেন তার সমস্ত অপেক্ষা। ঠিক তখনই হাসপাতালের মূল দরজার সামনে হঠাৎ একটু হৈচৈ ভেসে এলো। কাব্যের নিরাপত্তাকর্মীদের ভিড় ঠেলে কবির দ্রুত ভেতরে ঢুকল। সোজা কাব্যের সামনে এসে থামল।

------“স্যার, মেয়েটার বাবা আসেনি।

কাব্যের ভ্রু কুঁচকে গেল।

------“আসেনি মানে? তুমি নিজে যাওনি? বলোনি তাকে যে, তার মেয়ের এই অবস্থা?

-------“জি। আমি নিজে থেকে সবটা বলেছি স্যার কিন্তু উনি তবুও আসেননি। এমনকি মেয়েটার মা আসতে চেয়েছিলেন কিন্তু তাঁকেও আসতে দেননি। ঘরের ভেতরে আটকে দিয়ে সামনে তালা মেরে রেখেছেন।

কথাটা শুনে কাব্যের মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো সে, তারপর হতাশ চোখে খুব ধীর গলায় বলল,

------“একটা মেয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে আর বাবা আসতে চাননি? এটা কেমন বাবা, কবির?”

চারপাশের কয়েকজন লোক চুপ হয়ে গেল। কিন্তু কাব্য যেন আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

------“শুনলাম উনি নাকি শিক্ষক মানুষ! কিন্তু একজন শিক্ষক এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কিভাবে হতে পারে? নিজের মেয়ে মরতে বসেছে আর উনি এলেন না?

কবির এবার ইতস্তত করতে করতে বলল,

------“স্যার যেমনটা ভাবছেন তা না, উনি খারাপ মানুষ না। আসলে.....

কাব্য তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।

-----“আমি তোমার কাছে লোকটার চরিত্রের সার্টিফিকেট চাইনি। আমি জানতে চেয়েছি, সে তার মেয়ের পাশে নেই কেন। আর মেয়েটা তো প্রেগন্যান্ট, তাহলে শুধু তার বাবার বাড়ি নয়, নিশ্চয়ই শ্বশুরবাড়ির লোকও আছে কিন্তু তারা কোথায়?

কবির কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল। তারপর নিচু স্বরে বলল,

------“স্যার ব্যাপারটা আপনি যত সহজ ভাবছেন তা নয় একটু অন্যরকম। একটু শান্ত হয়ে বসুন, আমি বলছি সবটা।

কবিরের চোখে কিছু একটা ছিলো, তা দেখে আর কোন প্রশ্ন করলো না কাব্য। জরুরি বিভাগের বাইরে ওয়েটিং বেঞ্চে বসলো। তা দেখে শুকনো ঢোক গিলল কবির, এরপর একে একে রোদের সাথে হওয়া সকল বিষয় তুলে ধরলো। সবটা শুনে কাব্য স্তব্ধ। কবিরের মুখ থেকে শেষ কথাটুকু বের হওয়ার পর কাব্য আর কোনো কথা বলল না।

কয়েক সেকেন্ড আগেও যে মানুষটা একের পর এক প্রশ্ন করছিল, সেই কাব্য হঠাৎ করেই সম্পূর্ণ নিশ্চুপ হয়ে গেল। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল জরুরি বিভাগের বন্ধ দরজাটার দিকে।

কবির একটু থামলো তারপর আবার বলল-

------“আমাদের শহর আর গ্রামের মাঝে অনেক পার্থক্য আছে স্যার। গ্রামের মানুষ যেমন সহজসরল হয়, ঠিক তেমনি তাদের মানসম্মানের ভয়ও বেশি। সমাজের কাছে তাদের সন্তানের চেয়েও, সম্মান বড়। শফিক মাস্টারের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে স্যার। মেয়ের এই অবস্থাটা উনি মেনে নিতে পারেননি। উনি স্কুলের হেডমাস্টার। এলাকায় সম্মান আছে। মেয়ের এই ঘটনা তার কাছে পরিবারের কলঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটাকে উনি বাড়িতে জায়গা দেননি, সে গিয়েছিল কিন্তু সফিক সাহেব কুকুরের মতো দূরদূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। উনি নাকি মেয়েকে বলেছেন—মরে যেতে।

কাব্যের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন করে উঠল।

কয়েক সেকেন্ড সে কোনো কথা বলল না। তার চোখের সামনে আবার সেই রেললাইনটা ভেসে উঠল। অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছোট্ট শরীর।

খোলা চুল। দুই হাত দুপাশে। আর সামনে ছুটে আসা ট্রেন। সেই মেয়েটা বাঁচতে চায়নি—এ কথা বললে হয়তো ভুল হবে। কিন্তু সে চারপাশের লোকজনের থেকে আঘাত পেয়ে এতটাই ভেঙে পড়েছিল যে বেঁচে থাকার কারণটুকুও আর খুঁজে পাচ্ছিল না।

কাব্য খুব আস্তে বলল,

-----“এই কারণেই মেয়েটা রেললাইনে দাঁড়িয়েছিল। তখন তো কিছু বুঝিনি কিন্তু এখন সবটা পরিষ্কার আমার কাছে।

কেউ কোনো উত্তর দিল না। কাব্য চোখ নামিয়ে নিজের হাতের দিকে তাকাল। এই হাত দিয়েই সে কয়েক মিনিট আগে মেয়েটাকে টেনে ধরেছিল। আর এক মুহূর্ত দেরি হলে— আর ভাবতে পারলো না সে। একবার গভীর শ্বাস নিয়ে শুধু বলল-

------“তুমি আবার যাও কবির, তালা খুলে মেয়েটার মাকে এখানে নিয়ে আসো। যেভাবেই হোক, আধঘন্টার মধ্যে আমি তাকে এখানে দেখতে চাই।

কবির মাথা নাড়তে যাবে, তার আগেই কাব্য আবার বলল,

------“আর শফিক মাস্টারকেও খুঁজে বের করো।

কবির থমকে গেল। “স্যার?”

কাব্যের চোখে তখন আর মন্ত্রীর সেই স্থিরতা নেই।

বরং সেখানে একটা অদ্ভুত ক্ষোভ।

-----“আমি দেখতে চাই, কীভাবে একজন বাবা নিজের মেয়েকে মরতে বলে ঘরে বসে থাকতে পারে। তার মেয়ে তো ছোট, এই বয়সে এসে মেয়ে ভুল করেছে কি না, সেটা পরে বিচার করা যেত। কিন্তু একটা পনেরো বছরের মেয়েকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া কোনো বাবার অধিকার হতে পারে না।

কথাটা শেষ করেই কাব্য আবার হাসপাতালের দরজার দিকে তাকাল। ঠিক তখনই ভেতর থেকে একটা নার্স দ্রুত বেরিয়ে এল। কাব্য সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল।

------“কী হয়েছে? মেয়েটা ঠিক আছে তো?

নার্স একটু ঘাবড়ে গেল কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

-----“রোগীর অবস্থা ভালো না স্যার। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। ডাক্তার সাহেব এখনও পরীক্ষা করছেন। তবে আপনারা সবকিছু তৈরি রাখুন, শহরে নিতে হতে পারে। অবস্থা খুবই আশংকাজনক।

কাব্যের মুখ মুহূর্তে শক্ত হয়ে গেল।

“বাচ্চা?”

নার্স এক মুহূর্ত থামল।

-----“এখনো বলা যাচ্ছে না স্যার। বয়স কম তো, তার উপর এভাবে আঘাত পেয়েছে।

কাব্য চোখ বন্ধ করে ফেলল। মাত্র পনেরো বছরের একটা মেয়ে। নিজের জীবনের কী-ই বা বুঝেছে সে?

তার ওপর পাঁচ মাসের একটা সন্তান। যে সন্তান পৃথিবীতে আসার আগেই নিজের মায়ের সঙ্গে মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে

ধীরে ধীরে চোখ খুলল সে।

-------“ডাক্তারকে বলুন, যা যা করার দরকার এখানেই এখনই শুরু করতে। শহরের ব্যবস্থা করছি আমি।

নার্স মাথা নাড়ল। কাব্য এবার কবিরের দিকে তাকাল।

-----“শহরের হাসপাতালে ফোন হয়েছে?

“জি স্যার।”

“বেড?”

“রেডি রাখছে।”

“অ্যাম্বুলেন্স?”

“রওনা হয়েছে।”

কাব্য একবার ঘড়ির দিকে তাকাল।

“কত সময় লাগবে?”

“প্রায় চল্লিশ মিনিট।”

কাব্যের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

------“চল্লিশ মিনিট অনেক সময়, তুমি আমাদের একটা গাড়ি প্রস্তুত রাখো। এম্বুলেন্স আসতে আসতে ডাক্তার যতক্ষণ পারেন মেয়েটাকে এখানে যতক্ষণ ট্রিটমেন্ট দেয়া সম্ভব দিক। কিন্তু হুট করেই যদি বলে এখানে আর সম্ভব নয় তাহলে —অ্যাম্বুলেন্সের জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে না।”

কাব্য থামল। তারপর ধীরে বলল,

-----“আমাদের একটা গাড়িতে অক্সিজেনের ব্যবস্থা করো। প্রয়োজনীয় মেডিকেল সাপোর্ট যা লাগে নিয়ে যাবে। আর শহরের হাসপাতালকে বলো, আমরা রওনা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন প্রস্তুত থাকে।

কবির মাথা নেড়ে সরে গেল। কাব্য আবার সেই বন্ধ দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত যে মেয়েটাকে সে চিনতই না, এখন তার জন্য নিজের গাড়ি, নিজের নিরাপত্তা, নিজের ক্ষমতা—সবকিছু ব্যবহার করতে তার একটুও দ্বিধা হচ্ছে না।

কেন? সে জানে না। হয়তো মেয়েটার বয়সটা বারবার তার মাথায় ঘুরছে। পনেরো বছর। হয়তো সে দেখেছে, মেয়েটা মরতে চায়নি—শুধু ভাগ্য তাকে মৃত্যুর দোরগোড়ায় নিয়ে এসেছে আর কোথাও আশ্রয় খুঁজে পায়নি সে ।

ওর ভাবনার মাঝেই হাসপাতালের করিডোর দিয়ে ছুটে এলেন এক নারী। চুল এলোমেলো। চোখে আতঙ্ক।

পায়ের স্যান্ডেল পর্যন্ত নেই। দৌড়াতে দৌড়াতে তিনি শুধু একটাই কথা বলছেন—

“আমার মাইয়া কই? আমার শালুক, আমার মাইয়া কই?”

কাব্য ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। নারীটি হাঁপাতে হাঁপাতে এসে জরুরি বিভাগের সামনে দরজায় হাত রেখে কেঁদে ফেললেন। তারপর কাঁপা গলায় বললেন—

“ডাক্তার সাব, আমার শালুক কই? কই সে? আমার মাইয়া বাঁচবো তো?”

_________________________________________

রাত ঠিক নয়টা।

ধানমন্ডির শান্ত, অভিজাত এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক বাংলো বাড়ি—কাব্যকুঞ্জ। উঁচু দেয়ালে ঘেরা বাড়িটার মূল ফটকের বাইরে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা। ভেতরে প্রশস্ত সবুজ লন, দুপাশে ছাঁটাই করা গাছপালা আর আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বাড়িটা দূর থেকেই জানান দেয়—এই বাড়ির মানুষটির পরিচয় সাধারণ নয়।

কাব্যকুঞ্জের বিশাল ড্রয়িংরুমে অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর আলম। টিভি চলছে কিন্তু সেদিকে কোন খেয়াল নেই তার, বারবার হাতঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন তিনি। দুপুরের দিকে ছেলেটা বাহাদুরগড়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। নিজের এলাকার একটা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাবে—এমনটাই জানিয়েছিল কাব্য। অথচ এতটা সময় পেরিয়ে গেলেও ছেলের কাছ থেকে একটা ফোন পর্যন্ত আসেনি। তাই দুঃশ্চিতায় অস্থির হয়ে আছেন তিনি।

জাহাঙ্গীর আলম সাধারণত অযথা দুশ্চিন্তা করেন না। রাজনীতির মানুষ তিনি। জীবনে কত সংকট, কত বিপদ, কত অনিশ্চয়তা সামলে এসেছেন। কিন্তু নিজের সন্তানের ব্যাপারে সেই মানুষটাও অদ্ভুত রকম দুর্বল।

আর কাব্য?ছেলেটা যত বড়ই হোক, বাবার চোখে এখনো সেই ছোট্ট ছেলেটাই।

সোফায় বসে আবারও ফোনটা হাতে নিলেন তিনি। কাব্যের নম্বরটায় চাপ দিতে যাবেন, ঠিক তখনই টিভির পর্দায় ভেসে উঠল ব্রেকিং নিউজ।

“নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলন্ত ট্রেনের সামনে থেকে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা নারীকে উদ্ধার করলেন ক্রীড়ামন্ত্রী কাব্য চৌধুরী।”

জাহাঙ্গীর আলমের আঙুল থেমে গেল। চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল টিভির পর্দায়। পরের মুহূর্তেই পর্দায় ভেসে উঠল সেই দৃশ্যের ভিডিও। বাহাদুরগড় স্কুলের থেকে একটু দূরে রেললাইনের পাশে মানুষের ভিড়।

তারপর কাব্য।

মাটিতে পড়ে থাকা এক মেয়েকে দুহাতে তুলে নিচ্ছে সে। পাঞ্জাবিতে কাদা, হাতে রক্তের দাগ। মুখে ভয় আর উৎকণ্ঠার ছাপ। নিজের নিরাপত্তার কথা একবারও না ভেবে মেয়েটাকে বাঁচাতে ছুটে যাচ্ছে।

জাহাঙ্গীর আলমের বুকের ভেতরটা হঠাৎ গর্বে ভরে উঠল। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল।

------“এটাই তো চাই বাবা, এটাই তো চাই। এই ভালো কাজ গুলো করার শিক্ষাই তো দিয়েছি তোকে।

কণ্ঠটা অজান্তেই নরম হয়ে এলো তার । ছোটবেলা থেকেই কাব্যকে তিনি একটা কথাই শিখিয়েছেন—

ক্ষমতা শুধু মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করার জন্য নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্যও। আজ এত বছর পর মনে হলো, ছেলেটা ছোটবেলা থেকে কথাটা শুধু শুনেই রাখেনি। নিজের জীবনে ধারণও করেছে। টেলিভিশনের নিচে স্ক্রল চলতে লাগল—

“ঘটনার সময় নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে ক্রীড়ামন্ত্রী কাব্য চৌধুরী নিজেই রেললাইনে ছুটে যান।”

জাহাঙ্গীর আলমের বুকটা আরও ফুলে উঠল। এমন সময় তার ফোন বেজে উঠল। একজন পরিচিত রাজনৈতিক সহকর্মী কল করেছে।

-----“আসসালামু আলাইকুম জাহাঙ্গীর ভাই। আপনার ছেলে আজ যা করেছে, সত্যি বলছি—গর্ব করার মতো ছেলে আপনার।

জাহাঙ্গীর আলম হেসে বললেন,

------“ধন্যবাদ, দোয়া করবেন ওর জন্য।

কথাটা বলে কল কেটে ফোনটা রাখার আগেই আরেকটা কল। তারপর আরেকটা। কেউ কাব্যের সাহসের প্রশংসা করছে। কেউ বলছে, এমন মন্ত্রীই দরকার। কেউ আবার সরাসরি বলছে—

------“আপনার ছেলে আজ সত্যিই আপনার মুখ উজ্জ্বল করেছে।

প্রতিটা কথার সঙ্গে জাহাঙ্গীর আলমের বুকের ভেতরটা আরও একটু করে গর্বে ভরে উঠছিল। তিনি আবার টেলিভিশনের দিকে তাকালেন। পর্দায় তখন কাব্যের পুরোনো কোনো বক্তব্য দেখানো হচ্ছে। জাহাঙ্গীর আলম নিঃশব্দে হাসলেন। তারপর ফোনটা হাতে নিয়ে ছেলের নম্বরে কল দিলেন। একবার। দুবার। তিনবার।কিন্তু কোনো উত্তর নেই। মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে কপালে ভাঁজ পড়ল তার।

------“কি করছিস বাবা, ফোন ধরছিস না কেন ? একবার তো ধর, চিন্তা হচ্ছে ভীষণ।

কথাটা বলেই আবার কল করলেন তিনি কিন্তু আবারও একই অবস্থা। জাহাঙ্গীর আলম এবার কিছুটা চিন্তিত হলেন। কাব্য ফোন না ধরার ছেলে নয়। বিশেষ করে এত বড় একটা ঘটনা ঘটার পর। কিছুক্ষণ ভেবে তিনি কবিরের নম্বরে কল দিলেন। একবার রিং হয়ে কেটে গেল, এরপর আবার কল করলে দ্বিতীয়বার রিং হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ওপাশ থেকে ফোন ধরলো কবির।

------“আসসালামু আলাইকুম স্যার।

------“ওয়ালাইকুম আসসালাম। কতক্ষণ থেকে কল করছি, ধরছিলে না কেন? কাব্য কোথায়?

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা দিয়ে কবির বলল-

------“স্যার, উনি হাসপাতালেই আছেন। আমি হাসপাতালের গেটে আর চারপাশে এত মানুষের হৈচৈ তাই শুনতে পাইনি স্যার।

জাহাঙ্গীর আলমের ভ্রু কুঁচকে গেল।

-----“মেয়েটার কী অবস্থা?

------“চিকিৎসা চলছে কিন্তু অবস্থা একটু আশঙ্কাজনক।

কথাটা শুনে জাহাঙ্গীর আলমের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।

------“কাব্য কোথায় বললে?

-----“জরুরি বিভাগের বাইরে আছেন।

একটু থেমে কবির বলল,

------“আপনি চাইলে স্যারের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিচ্ছি। কথা বলবেন, দিবো?

------“হুম দাও।

কবির ফোনটা হাতে নিয়ে হাসপাতালের করিডোরে অপেক্ষারত কাব্যের দিকে এগিয়ে গেল। কাব্য তখনও জরুরি বিভাগের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।

চোখ স্থির সেই দরজায়। কবির কাছে এসে নিচু গলায় বলল,

-----“স্যার, আপনার বাবার ফোন।

কাব্য ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল। এখানে আসার পর তাকে জানিয়ে দেয়ার কথা ছিল কিন্তু এতোসব এর মাঝখানে মাথা থেকেই বেরিয়ে গেছে কল করার কথা। সে হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিল।

ওপাশ থেকে কাব্য কিছু বলার আগেই জাহাঙ্গীর আলমের কণ্ঠ ভেসে এলো—

-----"বাবা, তুই ঠিক আছিস তো?

কাব্য কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীর গলায় বলল,

-----“আমি ঠিক আছি আব্বু।

জাহাঙ্গীর আলম চোখ বন্ধ করলেন। স্বস্তির একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক থেকে। কিন্তু পরের কথাটা বলার আগেই কাব্যের দৃষ্টি আবার চলে গেল জরুরি বিভাগের বন্ধ দরজাটার দিকে। সেখানে এখনো লাল আলো জ্বলছে। আর দরজার ওপাশে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে এক অচেনা পনেরো বছরের মেয়ে।

------“তোকে নিয়ে আমার খুব গর্ব হচ্ছে বাবা। আজ মনে হচ্ছে, তুই সত্যিই আমার যোগ্য সন্তান হয়ে উঠেছিস!

জাহাঙ্গীর আলমের কণ্ঠে এবার আর আগের উত্তেজনা নেই। বরং গর্ব আর ভালোবাসায় ভরা এক অদ্ভুত কোমলতা। কাব্য কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বাবার কথাগুলো শুনেও তার মুখে কোনো হাসি ফুটল না। চোখের সামনে তখনো ভেসে আছে রোদসীর নিথর মুখটা।

-----“আমি এখন যোগ্যতা নিয়ে ভাবছি না, আব্বু। আমার মেয়েটাকে নিয়ে চিন্তা হচ্ছে ভীষণ। ওর বয়সই বা কত? পনেরো বছর। অথচ এই বয়সেই একটা সন্তান পেটে নিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। মেয়েটাকে যখন রেললাইনের ওপর দেখলাম…....”

কাব্য থেমে গেল। গলার ভেতর জমে থাকা কথাগুলো যেন আর বের হতে চাইছে না। কয়েক সেকেন্ড পর খুব নিচু স্বরে বলল,

-----“জানি না কেন, মেয়েটাকে দেখার পর থেকেই ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হচ্ছে, ওকে বাঁচাতে না পারলে নিজের কাছেই অপরাধী হয়ে থাকব। মেয়েটা ভালো হয়ে যাবে তো আব্বু ?

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এলো। জাহাঙ্গীর আলম ছেলের কণ্ঠের উদ্বেগটা স্পষ্ট বুঝতে পারলেন। এই সেই কাব্য, যে ছোটবেলা থেকেই নিজের কষ্ট কাউকে বুঝতে দেয়নি। অথচ আজ একজন অচেনা মেয়ের জন্য তার কণ্ঠে এমন অসহায়তা। বাবার বুকটা কেমন করে উঠল। তিনি শান্ত, কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,

------“হবে বাবা। ইনশাআল্লাহ, মেয়েটা ভালো হবে। তুই চিন্তা করিস না। তুই তোর দিক থেকে যতটুকু করার দরকার, তার চেয়েও বেশি করেছিস। এখন ডাক্তাররা তাদের কাজ করুক। আর তুই শুধু মেয়েটার পাশে থাক। সময়মতো শহরে নিয়ে যাওয়ার দরকার হলে নিয়ে যাবি। ভালো চিকিৎসার জন্য যা যা লাগে, ব্যবস্থা করবি।

কাব্য নীরবে শুনছিল।

-----“আর শোন বাবা, কোনো প্রয়োজন হলে আমাকে সঙ্গে সঙ্গে জানাবি। কোনো ডাক্তার, কোনো হাসপাতাল, কোনো ব্যবস্থা—যেটার দরকার হবে, আমাকে বলবি। আমি আমার জায়গা থেকে যতটুকু পারি করব। মেয়েটার চিকিৎসার ক্ষেত্রে যেন কোনো কিছুর অভাব না হয়। দরকার হলে ইফতিকে কল কর, ও তো একজন গাইনি বিশেষজ্ঞ, ও নিশ্চয়ই কিছুটা হলেও সাহায্য করতে পারবে তোকে।

কাব্য এবার ধীরে মাথা নিচু করল।

----“ঠিক আছে আব্বু ।

জাহাঙ্গীর আলম কিছুক্ষণ চুপ থেকে এবার কণ্ঠটা একটু কঠিন করলেন।

-----“তবে একটা কথা মনে রাখিস, নিজের দিকেও খেয়াল রাখবি।

কাব্য মৃদু ভ্রু কুঁচকাল।

------“আমি ঠিক আছি বাবা। সময়মতো খাবারও খেয়েছি, চিন্তা করিও না।

-----“তুই ঠিক আছিস কি না, সেটা শুধু তুই বললেই হবে না। আমাদেরও বুঝতে হবে। মনে রাখিস কাব্য -

তুই এখন শুধু আমার ছেলে না, তুই দেশের একজন মন্ত্রী। রাজনীতির মাঠে তোর চারপাশে বন্ধু যেমন আছে, শত্রুরও অভাব নেই। আজকের মতো হুট করে নিজের নিরাপত্তার কথা ভুলে গিয়ে কোনো ঝুঁকি নিবি না। মানুষের জন্য কাজ করবি, অবশ্যই করবি। কিন্তু নিজেকে হারিয়ে দিয়ে নয়।

কাব্য এবার সামান্য হাসল।

—“তুমি তো আমাকে ছোটবেলা থেকে শিখিয়েছো, মানুষের বিপদে পিছিয়ে যেতে নেই।

জাহাঙ্গীর আলমও মৃদু হাসলেন।

-----"শিখিয়েছি, অস্বীকার করছি না। কিন্তু সাথে এটাও শিখিয়েছি—সাহসী মানুষ আর বেপরোয়া মানুষের মধ্যে পার্থক্য কেমন হয়।

কাব্য কিছু বলল না। বাবার কথাটা যেন বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে লাগল। ওপাশ থেকে আবার ভেসে এলো জাহাঙ্গীর আলমের কণ্ঠ—

-----“তুই আমার ছেলে। তোর জন্য আমার সবসময় গর্ব হয়, আজও হলো। কিন্তু শুধু গর্ব দিয়েই কি সবসময় বাবাদের মন ভরে? বাবারা যেমন সন্তান নিয়ে গর্ব করতে চায়, তেমন চায় তার সন্তানটা সবসময় ভালো থাকুক, নিরাপদে থাকুক। বুঝেছিস?

কাব্য চোখ তুলে জরুরি বিভাগের বন্ধ দরজাটার দিকে তাকাল। তারপর খুব আস্তে বলল,

------“বুঝেছি আব্বু। তবে তুমি কিন্তু মেয়েটার জন্য দোয়া করিও আর আম্মুকেও বলে দিও যেন দোয়া করে দেয়।

জাহাঙ্গীর আলমের বুকটা ভারী হয়ে এলো।

-----“করছি তো বাবা। আল্লাহ সবকিছুই ভালো করুক। রাখছি তাহলে, সাবধানে থাকিস।

জাহাঙ্গীর আলম কথাটা বলেই কল কেটে ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখলেন। ঠোঁটের কোণে তখনো হালকা হাসি। ছেলের সঙ্গে কথা বলার পর বুকের ভেতর জমে থাকা দুশ্চিন্তাটাও যেন অনেকটা হালকা হয়েছে। ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলো ইফতি।

হাতে হাসপাতালের ব্যাগ। গলায় এখনো ঝোলানো স্টেথোস্কোপটা, খুলে নেওয়ার সময়টুকুও যেন পায়নি। সারাদিনের ক্লান্তি মুখে থাকলেও চোখেমুখে আজ অন্যরকম উচ্ছ্বাস।

বাবাকে দেখেই সে প্রায় ছুটে এসে বলল,

—“আব্বু!”

জাহাঙ্গীর আলম মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

-----“কী হয়েছে মা? এত খুশি দেখাচ্ছে কেন তোকে?

ইফতি ব্যাগটা সোফার ওপর রেখে উত্তেজিত গলায় বলল,

-----“তুমি নিউজ দেখেছো?কাব্য আজ কী করেছে?

জাহাঙ্গীর আলম মৃদু হেসে বললেন,

-----“দেখেছি তো।

----“শুধু দেখেছো? কেউ কল করেনি? আমি তো ভাইয়ের প্রশংসা শুনতে শুনতেই হয়রান হয়ে গেছি।

আমি ডিউটি শেষ করে বের হওয়ার সময় সবাই আমাকে থামিয়ে থামিয়ে কাব্যের কথা বলেছে। কি প্রশংসা করছিল ভাইয়ের জানো?

কথাগুলো বলতে বলতে ইফতির মুখে গর্বের হাসি ফুটে উঠল।

----“আমার তো মনে হচ্ছিল, হাসপাতালের সবাই যেন আমার ভাইকে নিয়ে গর্ব করছে আর তার সঙ্গে আমাকে তার বোন, আমাকে নিয়েও!

জাহাঙ্গীর আলম হেসে মেয়ের দিকে তাকালেন।

-----“তুই তো ওর আদরের বোন। গর্ব তো করবেই।

ইফতি এবার বাবার পাশে এসে বসল।

-----“না বাবা, সত্যি বলছি খুব প্রাউড ফিল হচ্ছে ভাইয়ের জন্য।

ইফতি একটু থামল। তারপর হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই জিজ্ঞেস করল,

-----“আচ্ছা, কাব্য এখন কোথায়? ওর সঙ্গে কথা হয়েছে তোমার? আমি কয়েকবার কল করেছি কিন্তু ও রিসিভ করলো না।

জাহাঙ্গীর আলমের মুখের হাসিটা একটু নরম হয়ে গেল।

----“হ্যাঁ। একটু আগেই কথা হলো।

----“কী বলল? ঠিক আছে ও, কিছু খেয়েছে?

-----“কাব্য ঠিক আছে, খাবারও খেয়েছে কিন্তু মেয়েটাকে নিয়ে চিন্তা করছে।

ইফতির চোখের উচ্ছ্বাস মুহূর্তেই একটু থেমে গেল।

----“মেয়েটার অবস্থা কি খুব খারাপ?

জাহাঙ্গীর আলম ধীরে মাথা নাড়লেন।

----“হ্যাঁ। তবে কাব্য আছে ওর সঙ্গে। শহরের হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করছে। আমি ওকে বলেছি, যা যা লাগে করতে।

ইফতি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মৃদু গলায় বলল,

-----“নিউজে তো দেখলাম, মাত্র পনেরো বছরের একটা মেয়ে আবার পাঁচ মাসের প্রেগন্যান্ট? মেয়েটার চিকিৎসা যত দ্রুত সম্ভব ভালো হাসপাতালে হওয়া দরকার বাবা। এই বয়সে এমন অবস্থায় রক্তক্ষরণ হলে ঝুঁকি অনেক।

ইফতির ডাক্তারসুলভ চিন্তা মুহূর্তেই মুখে ফুটে উঠল।

জাহাঙ্গীর আলম মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,

----“কাব্য সেটাই করছে। শহরের হাসপাতালে সব প্রস্তুত রাখতে বলেছে।

ইফতি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ড্রয়িংরুমের ভেতর কয়েক মুহূর্ত নেমে এলো নিস্তব্ধতা। টেলিভিশনের পর্দায় তখনো কাব্যের সেই দৃশ্যই বারবার দেখানো হচ্ছে।

__________________________________________

রাত ঠিক দশটা।

বাহাদুরগড়ের ছোট্ট হাসপাতালটার সামনে তখনও মানুষের ভিড় কমেনি। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেলেও হাসপাতালের সামনে যেন সময় থমকে আছে। আর কাব্য? সে এখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে।

প্রায় দুই ঘণ্টা। এই দুই ঘণ্টায় নিজের হাতের ক্ষতটুকুর কথাও তার মনে পড়েনি। হঠাৎ জরুরি বিভাগের দরজা খুলে একজন চিকিৎসক দ্রুত বেরিয়ে এলেন। কাব্য সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে গেল।

“ডাক্তার?”

চিকিৎসক মুখের মাস্কটা একটু নিচে নামিয়ে ক্লান্ত গলায় বললেন,

-----“স্যার, রোগীর অবস্থা খুব একটা ভালো না। আমরা যতটুকু সম্ভব এখানেই চিকিৎসা দিয়েছি, কিন্তু ওর আরও উন্নত চিকিৎসা দরকার। শহরে নিন, যত দ্রুত সম্ভব।”

কাব্য এক মুহূর্ত দেরি করল না। কবিরকে ডাকতেই কবিল বলল সবকিছু তৈরি আছে। ইফতির সাথেও কথা বলেছে সে, ইফতি নিজে সঙ্গে থেকে সবকিছু গুছিয়ে নেবে। সবটা শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো কাব্য, এরপর কিছু একটা ইশারা করতেই কবির বেরিয়ে গেল। এরই মধ্যে হাসপাতালের সামনে দাঁড়ানো অ্যাম্বুলেন্সের লাল আলো ঘুরতে শুরু করেছে। কয়েকজন নার্স ও হাসপাতালের কর্মচারী দ্রুত স্ট্রেচার বের করে আনল।

কিছুক্ষণ পর জরুরি বিভাগের দরজা খুলে গেল।স্ট্রেচারে শুয়ে রোদসীকে বাইরে আনা হলো। মেয়েটার চোখ বন্ধ। মুখটা অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে। কপালের পাশে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। নাকে অক্সিজেনের নল। হাতে স্যালাইন চলছে। শরীরটা এতটাই নিস্তেজ যে দেখে মনে হচ্ছে, এই ছোট্ট মেয়েটার ভেতরে প্রাণটুকুও বুঝি খুব কষ্টে টিকে আছে।

রোদসীর মা স্ট্রেচারটা দেখেই ছুটে এলেন।

-----“ও শালুকরে! আম্মা, আম্মা দেহো আমি আইছি, একবার চক্ষু দুইডা খোলো, দেহো আমারে। ও শালুক! তুমি ভয় পাইও না মা। তোমার কিছু হইবো না। আমি আছি।

এমন সময় হঠাৎ অ্যাম্বুলেন্সের দরজা খোলা দেখে তিনি স্ট্রেচার টেনে ধরলেন -

------“তোমরা আমার মাইয়ারে কই লইয়া যাইতাছো?খারাও তোমরা, নিও না আমার মাইয়ারে। একলা নিও না, আমিও যামু। আমার মাইয়ার লগে আমিও যামু।

ঠিক তখনই কাব্য শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,

----“আপনার মেয়ের ট্রিটমেন্ট এর জন্য নেয়া হচ্ছে, ভয় পাবেন না। আপনি আমার সঙ্গে আসুন।

নারীটা থমকে গেলেন।সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লেন তিনি।

-----“না বাবা, আমি আমার মাইয়ার লগেই যামু। হেয় একা ভয় পাইবো।

কাব্য কয়েক সেকেন্ড রোদসীর দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর নরম স্বরে বলল,

-----“আপনার মেয়ের সঙ্গে নার্স থাকবে। আপনার মেয়েকে একা পাঠাচ্ছি না। ভরষা রাখুন আমার উপর।

তারপর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কবিরের দিকে তাকাল।

-----“কবির। তুমি অ্যাম্বুলেন্সে ওঠো। মেয়েটার দিকে খেয়াল রাখবে। কোনো সমস্যা হলে আমাকে সঙ্গে সঙ্গে জানাবে। আর এই হাসপাতাল থেকে একজন নার্সও যাবে। পুরো পথ ওর সঙ্গে থাকবে।

কবির মাথা নাড়ল।

----"ওকে স্যার। আমি আছি।

কাব্য আবার রোদসীর মায়ের দিকে ফিরল।

-----“আপনি আমার সঙ্গে আসুন। আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।

কথাটা শুনে নারীর বুকটা কেঁপে উঠল।

----“আমার লগে?”

“জি।”

কাব্যের কণ্ঠে এবার কোনো কঠোরতা নেই।

----“আপনার মেয়ের ব্যাপারে কিছু বিষয় আমার জানা দরকার। সবকিছু ঠিকমতো জানতে হবে আমাকে। তাহলে ওকে সাহায্য করাও সহজ হবে।

নারীটা চুপ করে রইলেন। মুহূর্তখানেক আগেও তিনি এই মানুষটাকে শুধু দূর থেকে দেখেছেন—মন্ত্রী, বড় মানুষ, অনেক নিরাপত্তার লোকজন যার চারপাশে।

কিন্তু গত দুই ঘণ্টায় তিনি দেখেছেন অন্য একজন কাব্যকে। যে মানুষটা তার মেয়েকে নিজের হাতে রেললাইনের পাশ থেকে তুলে এনেছে। যে নিজের গাড়ি, নিজের লোকজন, নিজের ক্ষমতা—সবকিছু ব্যবহার করছে তার মেয়েকে বাঁচানোর জন্য। এমনকি এখনো পর্যন্ত লড়ে যাচ্ছে, সেই মানুষটাকে তো ভরষা করাই যায়।

তার চোখ আবার ভিজে উঠল। তিনি ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বললেন, ----আইচ্ছা চলো।

কাঁপা ঠোঁট থেকে শুধু এই একটুকু শব্দই বের হলো তার। তারপর তিনি চোখ মুছে কাব্যের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করলেন। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বেজে উঠল। লাল আলো ঘুরতে ঘুরতে গাড়িটা ধীরে ধীরে হাসপাতালের সামনে থেকে বেরিয়ে গেল। তার পেছনেই কাব্যের গাড়ি। কাব্য গাড়িতে ওঠার আগে একবার অ্যাম্বুলেন্সটার দিকে তাকাল। তারপর দরজা খুলে রোদসীর মাকে ভেতরে বসতে দিল।

উনি উঠে বসতেই নিজে পাশে বসে দরজাটা বন্ধ করার আগে খুব নিচু স্বরে বলল—

-----“ভয় পাবেন না। আপনার মেয়েকে আমরা শহরে নিয়ে যাচ্ছি। এখন ওর চিকিৎসাটাই সবচেয়ে জরুরি।

নারীটা কাব্যের দিকে তাকিয়ে রইলেন। চোখে ভয় এখনো আছে। মেয়েকে হারানোর ভয়। কিন্তু সেই ভয়টার ভেতর কোথাও যেন সামান্য ভরসাও জন্মেছে।

তিনি ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বললেন—

----“আল্লাহ আপনের ভালো করুক বাবা। আমার মাইয়াডার জন্য আপনে আইজ যা করছেন, মাইনষের নিজের মানুষ হইয়াও এডি করতো না।

কাব্য কোনো উত্তর দিল না। শুধু একবার চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল। তারপর ড্রাইভারকে বলল—

“চলো।”

সামনে এম্বুলেন্স আর কাব্যের গাড়ি পাশাপাশি বাহাদুরগড়ের অন্ধকার রাস্তা পেরিয়ে ছুটে চলল শহরের দিকে। আর পিছনের গাড়িতে ওর সহকর্মীরা।

জানালার বাইরে অন্ধকার ছুটে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে রাস্তার পাশের দু-একটা দোকানের আলো গাড়ির কাচে এসে পড়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।

গাড়ির ভেতরটা অস্বাভাবিক নীরব। রোদসীর মা আঁচলের এক প্রান্ত মুঠো করে ধরে বসে আছেন। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে কান্নায়। বারবার তার দৃষ্টি চলে যাচ্ছে সামনে ছুটে চলা অ্যাম্বুলেন্সটার দিকে। সাইরেনের শব্দটা যতবার কানে আসছে, ততবারই যেন তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছে। কাব্য কিছুক্ষণ চুপচাপ মহিলার দিকে তাকিয়ে রইল।

এই নারীটার চোখে ভয় আছে। শুধু মেয়েকে হারানোর ভয় নয়—আরও কিছু একটা। যেন এতদিন বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা কোনো ভার আজ হঠাৎ করেই ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কাব্য ধীরে ধীরে বলল,

-----“আন্টি। আমি জানি, আপনাদের পারিবারিক বিষয় নিয়ে কথা বলার অধিকার আমার হয়তো নেই। কিন্তু আজ যা হয়েছে, সেটা আর শুধু পারিবারিক বিষয় নেই। আপনার মেয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছে। ওর বয়স মাত্র পনেরো বছর। তার ওপর পাঁচ মাসের গর্ভবতী। এত বড় একটা বিষয় আমি এমনি এমনি ছেড়ে দিতে পারি না।”

রোদসীর মা ভয় পেলেন। ফ্যাকাশে চোখে কাব্যের দিকে তাকিয়ে হত মুঠো করে চেপে ধরলেন শাড়ির আঁচল। তা দেখে কাব্য একটু থামল তারপর নরম গলায় বলল,

------“আপনি ওর মা। একটা মেয়ে পৃথিবীর সবাইকে সব কথা বলতে না পারলেও নিজের মাকে অনেক কিছুই বলে। হয়তো সরাসরি বলেনি, হয়তো লুকিয়ে বলে, হয়তো কান্নার মধ্যে দিয়ে বুঝিয়ে দেয়। যেভাবেই হোক মায়ের কাছে মেয়েরা হয় খোলা বইয়ের মতো। সেই দিক থেকে রোদও নিশ্চয়ই আপনাকে কিছু বলেছে। এখন আপনি ওর বিষয়ে যা জানেন, সব আমাকে বলুন।

মহিলা মাথা নিচু করে রইলেন। কাব্য এবার আরও আশ্বস্ত করার স্বরে বলল,

----“ভয় পাবেন না। এখানে ভয় পাওয়ার মতো কিছু হয়নি, আমি আপনার পাশে আছি। নির্দিধায় বলুন আমাকে সব।

মহিলার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর কাঁপা গলায় বললেন,

-----“আমার মাইয়ার নাম রোদসী এহতেশাম। ডাকনাম শালুক। বাপের বড় মাইয়া। অনেক আদর কইরা নামডা রাখছিল হের বাপে। আমার শালুক বকুলতলা স্কুলে নয় কেলাসে পড়ে। অহন বয়স পনেরো। আর চার মাস পর ষোলো হইবো।

কাব্য মাথা নাড়ল।

-----“আন্টি, ওর নাম, পড়াশোনা, বয়স—এসব পরে বলবেন। আপনি আমাকে ওর প্রেগন্যান্সির বিষয়টা বলুন। কীভাবে এই অবস্থাটা হলো?

মহিলার বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।

“কইতাছি বাজান”

গলার স্বরটা কেঁপে উঠল।

-----“গেরামের মাতব্বরের বাড়ি আর আমাগো বাড়ি এক লগেই। হেরা আমাগো মত নয়, ম্যালা বড়লোক হেরা। মাঝেমইধ্যে হেগো বাড়িতে কোনো কাম থাকলে আমি হাতে হাতে সাহায্য করি। শালুকও তো বড় হইছে, তাই বেশি কাম থাকলে হেরেও আমার লগে লইয়া যাইতাম। কাম শ্যাষ হইলে কোনোদিন টাকা দিতো আবার কোনদিন ধান চাইল দিতো।

কাব্য নীরবে শুনতে লাগলো।

----“রিফাত হেই মাতব্বরের বড় পোলা। পোলাডা পড়ালেখা জানা। দেখতে-হুনতেও ভালাই। শালুকের লগে মাঝেমধ্যে ইয়ারকি-ফাজলামি করত। আমরা ভাবতাম, পাশের বাড়ির পোলা, নিজের ভাইয়ের মতোই তো। তাই কিছু মনে করি নাই। কিন্তু তিন মাস আগে হঠাৎ দেখি শালুক খায় না। খাবারের গন্ধে বমি আহে। মাছের গন্ধ নিবার পারে না। সকালে উঠলেই বমি।

আমি ভাবলাম, জন্ডিস হইছে। শরীরডাও কেমন জানি শুকাইয়া যাইতাছিল। কিন্তু মাইয়াডা কিছু কয় না।

কথাটা বলতে বলতে থামলেন তিনি, আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন।

------“হেরপর একদিন রাইতে দেহি অর বাপের মোবাইল দিয়া কার লগে জানি কথা কইতাছে। পথথমে আমি গায়ে লাগাইনাই কিন্তু যহন রিফাতের নাম কইলো আর কইলো, হেয় দুইমাসের পোয়াতি - তহন যেন মাথার উপরে আকাশ ভাইঙ্গা পড়ল বাবা।

কাব্য নিঃশব্দে বসে রইল। মহিলা এবার কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

-----“আমি আমার মাইয়াডারে হেইদিন ম্যালা মারছি। আমাগো গরুর ঘাস পিডানি লাঠি দিয়া জানোয়ারের মতন পিডাইছি। তারপর জিগাইছি—কী হইছে? কার বাচ্চা? কেমনে কি হইলো?

থেমে গেলেন তিনি। কাব্য শান্ত হয়ে শুনতে লাগলো।

----“শালুক পথথমে কিছুই কইতে চায় নাই। শুধু কাঁনতাছিল। পরে যহন বুঝল আমার কাছ থেইকা লুকাইতে পারবো না, তখন কইল বাচ্চাডা রিফাতের।

কাব্যের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে ধীরে বলল,

“তারপর?”

-----“তারপর আমি সব জানবার চাইছিলাম। কইল, ম্যালাদিন হইছে, একবছরের মতো সম্পর্ক অগো।

একবছর ধইরা আমার মাইয়া লুকাইয়া লুকাইয়া প্রেম করছে হের লগে। আমি মা হইয়াও কিছুই টের পাই নাই।”

কাব্য এবার খুব ধীরে বলল,

------“আপনি পরে কী করেছিলেন?

মহিলার চোখে তখন ভয়াবহ এক স্মৃতির ছাপ।

------“পরে সবডা যহন জানতে চাইলাম তহন কইলো, রিফাত আর অর বিয়া হইছে।

চমকে উঠলো কাব্য - বিয়ে হয়েছে?

-------“হ বাজান বিয়া হইছে। পাঁচ মাস আগে রিফাত বিদেশ যাওনের দুইদিন আগে বিয়া হইছে

কাব্য এবার পুরোপুরি তার দিকে ফিরে বসল।

মহিলা বললেন,

-----“সেদিন মেলা ঝড়-বৃষ্টি আছিল। অন্য গায়ে আমাগো এক আত্মীয় মইরা গেছিল। সবাই হেনে গেছিলাম। বাড়িতে শালুক একলা আছিল। সেদিন রাইতে রিফাত ওরে ডাইকা লইয়া যায়।

কথাটা বলতে গিয়ে মহিলা থেমে গেলেন। তার চোখে ভয়। কাব্য বুঝতে পারল—এরপরের কথাগুলো হয়তো সহজ হবে না। তাই বলতে সে নরম স্বরে বলল,

-----“সময় নিন। তাড়াহুড়ো নেই। পানি খাবেন?

মহিলা মাথা নাড়লো। কাব্য পাশ থেকে নিজের পানির বোতলটা এগিয়ে দিলো তার দিকে। তিনি পানি খেয়ে

কয়েকবার গভীর শ্বাস নিয়ে আবার বলা শুরু করলেন।

------“রিফাত শালুকের লগে খারাপ কাম করতে চাইছিল। কিন্তু আমার মাইয়া রাজি হয় নাই। কইছে এইডি পাপ—বিয়া ছাড়া কিছুই সম্ভব না।”

কাব্যের বুকের ভেতরটা যেন আরও ভারী হয়ে গেল।

পনেরো বছরের একটা মেয়ে। এই বয়সে প্রতারকের ফাঁদে পড়েছে কিন্তু তবুও নিজের সীমাটা বুঝেছে।

আর সেই সীমাকে সম্মান করার বদলে—ছিহ।

“তারপর কী হলো আন্টি?”

------“হের পরেও রিফাত শালুকরে জোর করছে, প্রেমের প্রমাণ চাইছে কিন্তু মাইয়া আমার গলে নাই। তখন রিফাত কইছে, সে শালুকরে বিয়া করব। হেরপর

ওর চেনা কয়জন বন্ধুরে নিয়া এলাকার মোল্লার কাছে গিয়া মসজিদের মধ্যে বিয়া পড়াইছে।

কথাটা শুনে কাব্য কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ হয়ে রইল।

তারপর ভ্রু কুঁচকে বলল-

-------“এত ছোট একটা বাচ্চা মানুষের বিয়ে মৌলভী দিয়ে দিলো?

------“হ। রিফাত টাকা দিছিল মোল্লারে, হের লাইগা হেয় রাজি হইয়া এডি করছে। শালুক ভয় আছিল। হেইদিন বিয়ার পর রিফাত দুইদিন আছিল শালুকের লগে।হেরপর রিফাত বিদেশ চইলা গেল।

কাব্য দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। মনে পড়ল কবিরের বলা কথাগুলো। রিফাতের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল মেয়েটা। বারবার বলছিল—

-----“আপনের বউ তো হমু আমি”

তখন কথাগুলোকে হয়তো সবাই পাগলামি ভেবেছিল।

কিন্তু এখন—কাব্য বুঝতে পারছে, মেয়েটা মিথ্যা বলছিল না। তার কাছে সত্যিই একটা স্মৃতি ছিল।

হয়তো একটা মসজিদ। কয়েকজন সাক্ষী। একজন মৌলভী। আর একটা শিশুসুলভ বিশ্বাস—যে রিফাত তাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে মেনে নেবে।

কাব্যের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ তৈরি হলো।

মহিলা আবার বলতে শুরু করলেন,

-----“সবডা শুইনা আমার মাথায় যেন কিছুই আছিল না বাবা। কী করুম বুঝি নাই। একদিকে মাইয়া অল্প বয়সে বিয়া করছে, তার ওপর পোয়াতি। শালুকের বাপের ম্যালা রাগ, হেয় জানতে পারলে মাইরাই ফালাইতো মাইয়ারে । তাই কাউরে কিছু কই নাই। ভাবছিলাম রিফাত দেশে আইলে ওরে ধইরা বসুম। কইবাম—আমার মাইয়ারে বিয়া করছস, এখন ঘরে তোল।

মহিলা কাঁপা হাতে চোখ মুছলেন।

-----“প্রমাণের জইন্যে আমি সেই মোল্লার কাছে গেছিলাম। উনি স্বীকার করছে, বিয়া পড়াইছেন। হেরপর রিফাতও আমার লগে কথা কইছে। আমারে কইছে অহনি কাউরে জানানোর দরকার নাই। আমি দেশে আসি, হেরপর শালুকরে ঘরে তুলুম কিন্তু আইজ আমার মাইয়াডারে অস্বীকার করলো।

-----“ও বিয়ে করলেই তো হবে না আন্টি, ওকে রোদের দায়িত্ব নিতে হবে। ওর অনাগত সন্তানের দায়িত্ব নিতে হবে। রোদ যে ওর স্ত্রী তার প্রমাণ তো আছেই তাই না?

------"না বাজান। কোনো কিছু নাই, মাসখানেক আগে মোল্লা মইরা গেছে আর সাক্ষী ক্যাডা ক্যাডা আছিল হেইডা তো আমি জানিনা। আর অহন রিফাতও বউ লইয়া আইছে।

তারপর হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি। যেন এতক্ষণ ধরে বুকের মধ্যে আটকে রাখা কান্নাটা আর সামলাতে পারলেন না।

-----“আমার মাইয়াডা ভিতু বাবা। গেরামের সামনে দাঁড়াইয়া বিয়ার কথা কইতে পারে নাই। ভাবছিল, রিফাত নিজেই সব কইবো। আমিও তো রিফাতের কথা হুনছিলাম তাই কাউরে জানাইনাই কিন্তু অহন, অহন তো সব উল্টায় গেল বাজান। হে তো উল্টা আমার মাইয়ারে অস্বীকার করল। সবাইর সামনে কইল, বাচ্চা কার না কার। আমার মাইয়া নাকি মিছা কইতাছে।

মহিলা আর কথা বলতে পারলেন না। কাব্যের চোখের সামনে আবার রোদসীর মুখ ভেসে উঠল। হুট করেই কাব্যের কি হলো কে জানে? সে পকেট থেকে ফোন বের করে কল করলো কবিরের নাম্বারে। কিছুক্ষণের মধ্যেই কলটা রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে ভেসে এলো কবিরের গলা —

-----“স্যার? ফোন করলেন যে, কিছু হয়েছে?

------“অ্যাম্বুলেন্সটা থামাও।

হকচকিয়ে গেল কবির, কিছু বুঝতে না পেরে বলল-

------“স্যার? কি হয়েছে? কেন থামাবো এম্বুলেন্স?

-----“একদম প্রশ্ন করবে না আমাকে? থামাতে বলেছি, থামাও।

কথাটা বলেই কল কেটে দিলো কাব্য। রোদসীর মা অবাক হয়ে কাব্যের দিকে তাকালেন। ভয় পেলেন এই বুঝি মেয়েটার চিকিৎসা থামিয়ে দেবেন মন্ত্রীমশাই। ওনার এমন অসহায় চাহনি হয়তো বুঝলো কাব্য, তাই নরম গলায় বলল-

-----“আপনার শালুকের পাশে এই মূহুর্তে আপনাকে দরকার আন্টি। ও আপনাকে পাশে পেলে একটু হলেও বাঁচার আশা করবে, তাই আপনি ওর সঙ্গে থাকুন। আমি এম্বুলেন্সে তুলে দিচ্ছি আপনাকে।

মহিলা আর কিছু বলল না। কিছুক্ষণ পর সামনে থাকা অ্যাম্বুলেন্সের লাল আলো ধীরে ধীরে থেমে গেল।

কাব্যের গাড়িও তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজা খুলতেই কাব্য নেমে রোদসীর মাকে নামিয়ে দিলো। তারপর অ্যাম্বুলেন্সের সামনে গিয়ে বললেন-

------“আপনি ওর সঙ্গে যান।

কবির ইতিমধ্যে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমে এসেছে।

কাব্য তার দিকে তাকিয়ে বলল,

-----“কবির, তুমি এখানে থাকছ না। আমার সঙ্গে এসো।

তারপর কাব্য পেছনে থাকা নিজের নিরাপত্তাকর্মীদের দিকে তাকাল।

-----“তোমরা সবাই অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে যাবে। আমার গাড়ির পিছু নেবে না কেউ। এক্সট্রা কোন প্রশ্ন করবে না, চুপচাপ যা বলছি তাই করবে।

একজন সঙ্গে সঙ্গে বলল, “ওকে স্যার।

কাব্য আবার বলল,

-----“হাসপাতালে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত কোনো কিছুর যেন কমতি না হয়। ডাক্তার যা চাইবে, সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা করবে। প্রয়োজন হলে শহরের হাসপাতালের লোকজনকে আগেই জানাবে। আর আমি আপুকে বলে রেখেছি, ও বাকিটা বুঝে নেবে।

সবাই হা করে তাকিয়ে আছে কাব্যের দিকে। মানুষটা কি করতে চাইছে কে জানে? কিন্তু কেউ প্রশ্ন করলো না। কাব্য একবার মাথা উঁচিয়ে রোদসীকে দেখে নিলো, তারপর বলল -

------“এই যে মেয়েটার মা তোমাদের সঙ্গে যাচ্ছে, তার খেয়ালও রেখো। তিনি যেন এক মুহূর্তের জন্যও একা না থাকে।

------“জি স্যার।

রোদসীর মা এম্বুলেন্স এ উঠে বসলেন, তারপর কাব্যের দিকে তাকিয়ে বললেন -

------“তুমি কই যাইতাছ বাজান?তুমি আমাগো লগে আইবানা?

কাব্য মৃদু হেসে বলল,

------“আমার একটু কাজ আছে। সেগুলো সেরেই আমি চলে আসবো।

মহিলার চোখে আবার ভয় ফুটে উঠল। “কিন্তু…”

কাব্য এবার তার কাঁধের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,

-----“আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আপনার মেয়েকে ছেড়ে দিচ্ছি না। সকল কিছু ব্যবস্থা করা আছে। ভরষা রাখুন আমার উপর, সব ঠিক হয়ে যাবে।

এই কথাটুকুতেই আশ্বস্ত হলো রোদের মা। সবকিছু দেখে নিয়ে আবার এম্বুলেন্স যেন মহিলাকে আশ্বস্ত করল। সবকিছু একবার ভালো করে দেখে নিয়ে এম্বুলেন্স এর দরজা নিজ হাতে বন্ধ করে দিলো কাব্য।

অ্যাম্বুলেন্স আবার সাইরেন বাজিয়ে ছুটে গেল শহরের দিকে। তার পিছন পিছন কাব্যের লোকজনও চলে গেল। ফাঁকা রাস্তায় শুধু রইলো কাব্য, কবির আর তাদের গাড়িটা।

কাব্য কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে নিজের গাড়ির দিকে ফিরল সে। ড্রাইভারের আসনে কবির উঠতেই পাশের দরজা খুলে উঠে পড়ল কাব্য।

কবির ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে গাড়িটা ঘুরিয়ে আবার আবার বাহাদুরগড়ের দিকে চলতে শুরু করল গাড়ি।

কয়েক মিনিট কেউ কোনো কথা বলল না। কবিরের মাথায় তখন একটা প্রশ্ন ঘুরছে। শেষ পর্যন্ত আর চুপ থাকতে না পেরে সে বলেই ফেলল,

-----“স্যার, আমরা কোথায় যাচ্ছি?”

কাব্য জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। মুখে অদ্ভুত একটা গম্ভীর ভাব। সে ধীরে ধীরে বলল,

-----“আজ একজনের বাসর রাত আছে কবির, সেখানেই যাচ্ছি। বেচারা এত কষ্ট করে বিয়ে করলো,

বাসর রাতে কি খালি হাতে হাতে তাকে বাসর করতে দেয়া যায়?

কবির পুরোপুরি হতভম্ব।

-----“স্যার, আপনি কি করতে চাইছেন বলুন তো?

কাব্য এবার হালকা গলায় বলল,

-----“উপহার দিতে হবে কবির, উপহার।

কবির কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

-----“কী উপহার?

কাব্য আর উত্তর দিলো না। কবির বুঝে গেল এই মুখ থেকে আর কোন কথা বের হবে না। তাই নিজের মতো করে ড্রাইভ করতে লাগলো সে। গাড়িটা অন্ধকার রাস্তা ধরে অন্য এক দিকে মোড় নিল। পেছনে কোথাও একটা অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

আর কাব্যের চোখের সামনে আবারও ভেসে উঠছে—

রেললাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মেয়েটার মুখ। অসহায় রোদসী এহতেশামের মুখ।

চলবে,

[ আজ দেয়ার কথা ছিলো না, তবুও দিলাম। এটাতে ১.২ কে লাইক কমপ্লিট করলে, পরবর্তী পর্ব দিবো। বেশ বড় করে কিন্তু পর্ব দিয়েছি, সবাই গঠনমূলক কমেন্ট করিও ]

Happy Reading.......... 😉

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন