#রোদ্দুরের_রেশ [ ৬ ]
#আরশিয়া_নূর
[অনুমতি ব্যতিত কপিকরা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ 🚫]
দুপুর দুটো বাজে।
লাঞ্চ সেরে নিজের চেম্বারে এসে বসেছে ইফতি। হাসপাতালের ব্যস্ততা আগের মতোই আছে। করিডোরজুড়ে রোগী আর স্বজনদের আনাগোনা, নার্সদের ছুটোছুটি, দূর থেকে ভেসে আসা বিভিন্ন কক্ষের দরজা খোলার শব্দ—সব মিলিয়ে চারপাশে একটানা ব্যস্ততা।
অথচ ইফতির মনটা যেন আজ অন্য কোথাও পড়ে আছে।
রোদসীকে বারোটার দিকেই হাসপাতাল থেকে নিয়ে গেছে কাব্যরা। জাহাঙ্গীর আলম অবশ্য মেয়েটাকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেননি। তাঁর যুক্তি ছিল, রোদসীকে আলাদা করে একটা বাসা ভাড়া করে দেওয়া হোক। সেখানে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা থাকবে, সার্বক্ষণিক একজন লোক তার দেখাশোনার জন্য থাকবে। খাবার, চিকিৎসা, পোশাকআশাক কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় যত খরচ—সবকিছুর দায়িত্ব তিনি নিজেই নেবেন।
কিন্তু কাব্য তাঁর কোনো কথাই কানে নেয়নি।
এই প্রথমবার সরাসরি বাবার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে অটল হয়েছে সে। আর সেই কারণেই জাহাঙ্গীর আলম ভীষণ রেগে আছেন। তার ওপর জাকিয়া চৌধুরী তো আছেনই—একটু সুযোগ পেলেই আগুনে ঘি ঢালার মতো করে বিষয়টাকে আরও বড় করে তুলছেন।
ইফতি জানে না, ওই ছোট্ট মেয়েটার ভাগ্যে সামনে কী অপেক্ষা করছে। একদিকে নিজের বাবা তাকে ঘরে নিতে চাইছেন না, অন্যদিকে কাব্য তাকে সরাসরি নিজেদের বাড়িতে নিয়ে গেছে। এত বড় একটা পরিবারের মধ্যে, এত মানুষের মাঝে মেয়েটা কীভাবে থাকবে—কে জানে!
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ইফতির বুক থেকে।
নিজের ভাবনা সরিয়ে টেবিলের ওপর রাখা পেশেন্ট ফাইলগুলোয় একবার চোখ বুলিয়ে দেখল সে। তারপর টেবিলে রাখা কলিং বেলটা চাপ দিয়ে নিজের এটেনডেন্টকে ভেতরে ডাকল।
লোকটা ভেতরে ঢুকতেই ইফতি বলল—
----“বাইরে যদি কোনো পেশেন্ট অপেক্ষা করে থাকে, তাহলে পাঠিয়ে দাও এখনি। আজ একটু দ্রুত বাড়ি ফিরতে চাই।
এটেনডেন্ট মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো। ঠিক তখনই ইফতির ফোনটা বেজে উঠল।
শব্দটা কানে যেতেই হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলে নিল সে। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল মুখের অভিব্যক্তি। এতক্ষণ যে মুখটায় চিন্তার ছাপ ছিল, সেখানে হঠাৎ করেই ফুটে উঠল মৃদু একটা হাসি।
এটেনডেন্ট দরজার কাছে যেতেই আবার পিছনে ডাকলো ইফতি -
-----“সাইফ শোনো।
-----"জ্বী ম্যাম।
------"এখন নয়। বিশ মিনিট পর থেকে পেশেন্ট পাঠাও, আমার জরুরি একটা কল এসেছে।
-----“ওকে, ম্যাডাম।
কথাটা বলেই সাইফ বেরিয়ে গেল। ইফতি এবার ফোনটা রিসিভ যাবে, ঠিক তখনই কলটা কেটে গেল।
ভ্রু কুঁচকে কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল সে। পরক্ষণেই আবারও ফোনটা বেজে উঠল।
ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও স্পষ্ট হলো ইফতির।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটার দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে অবশেষে কলটা রিসিভ করল সে—
------“কি ব্যাপার স্যার? ঘন্টাখানেক আগেই তো কথা হলো , এরমধ্যেই আবার মিস করা শুরু করেছেন?
ইফতির কথা শুনে হেসে ফেললো সাফওয়ান। তারপর দুষ্টমি করে বলল-
------“সে তো দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টাই মিস করি। কিন্তু তাতে বা লাভ হয় কি, তুমি তো আর পাশে নেই যে একটু মন ভরে দেখবো তোমায়।
কথাটা শুনেই ইফতির ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও গভীর হলো। এতক্ষণ যে মেয়েটার মুখে রোদসীকে নিয়ে চিন্তার ছাপ ছিল, মুহূর্তেই সেখানে নরম একটা প্রশান্তি এসে বসেছে।
-----“ফাজলামি বাদ দাও,কেন কল করেছো সেটা বলো? পেশেন্ট আছে আমার।
ফোনের ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ভেসে এলো।
------“বুঝলাম। আমি আরও ভাবছি একটু কথা বলবো তোমার সাথে কিন্তু তুমি তো পেশেন্ট নিয়ে বসে গেছো।
ইফতি মৃদু হেসে চেয়ারটায় একটু হেলান দিয়ে বসল।
-----“আরে নাহ, আজ একটু সময় নিয়েছি। বিশ মিনিট পেশেন্টও নিচ্ছি না।
------“বাহ! তাহলে আজকে ভাগ্য ভালো আমার। তোমার সঙ্গে একটু কথা বলার সুযোগ তো পেলাম।
ইফতি কিছু বলল না। দুই বছর ধরে এই মানুষটার সঙ্গে সম্পর্ক তার। সম্পর্কটা খুব স্বাভাবিকভাবে শুরু হয়নি, বরং অনেকটা নীরবতায়, লুকোচুরিতে, ভয় আর দ্বিধার ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে ওদের প্রেম।
সাফওয়ান তার ফুপাতো ভাই। জাকিয়া চৌধুরীর ছেলে। পরিবারের কাছে তারা এখনো শুধু কাজিন।
কিন্তু গত দুই বছর ধরে একে অপরের কাছে ওরা কাজিনের চেয়েও অনেক বেশি কিছু।
সাফওয়ানের গলা আবার ভেসে এলো—
-----“আচ্ছা, রোদের কী অবস্থা?
ইফতির মুখের হাসিটা মুহূর্তেই একটু মলিন হয়ে গেল।
----“রোদকে আজকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে গেছে।
-----“কোথায়?
-----“আমাদের বাড়িতে।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর সাফওয়ান একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল—
-----“আমাদের বাড়িতে? মামা রাজি হয়েছেন?
ইফতি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
----“না। একদমই না।
চেয়ারের হাতলে আঙুল চালাতে চালাতে ইফতি ধীরে ধীরে বলল—
-----“বাবা চাচ্ছিলেন রোদকে আলাদা একটা বাসা ভাড়া করে দিতে। সব খরচ উনিই বহন করবেন। সঙ্গে সবসময় একজন লোক থাকবে, মেয়েটার দেখাশোনা করবে। হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর অন্তত ওর থাকার জায়গা নিয়ে যেন কোনো সমস্যা না হয়, সেটাই উনার চিন্তা ছিল।
সাফওয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—
------“ভালোই তো চেয়েছিল মামা, তাহলে কাব্যকুঞ্জে কেন নিয়ে গেল?
-----“বললাম তো, কাব্য বাবার কথা শোনেনি।
ইফতির কণ্ঠে এবার একটু ক্লান্তি মিশে গেল।
------“এই প্রথম মনে হয় বাবার কোনো কথা ও অমান্য করল। বাবা ভীষণ রেগে আছেন। তার ওপর ফুপি তো আছেই। সারাক্ষণ কীভাবে কী করলে বিষয়টা আরও বড় করা যায়, সেটাই ভাবছে।
-----“মানে?
-----“মানে, রোদকে নিয়ে বাড়িতে ঝামেলা শুরু হয়েছে। ফুপি তো একদমই পছন্দ করছে না মেয়েটাকে। আজ সকালেও ইরার সঙ্গে মায়ের সামনে কথা কাটাকাটি হলো। গ্রামের মেয়ে বলে যেন মানুষ হিসেবেই গণ্য করতে চাইছে না।
সাফওয়ানের গলায় বিরক্তি ফুটে উঠল।
-----“আম্মু আবার শুরু করেছে?
ইফতি হালকা একটা নিঃশ্বাস ফেলল।
----“তুমি তো তোমার আম্মুকে চেনো।
------“হুম, চিনি। আর তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে আজ আবার বাড়িতে গিয়ে নতুন কোনো যুদ্ধ দেখতে হবে।
ইফতি একটু হেসে ফেলল।
-----“যুদ্ধ না বলে নাটক বলো। তবে রোদকে নিয়ে আমি সত্যিই চিন্তায় আছি।
-----“কেন?
-----“মেয়েটা খুব ভেঙে পড়েছে সাফওয়ান। আজ হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময়ও খুব কাঁদছিল। ওর নিজের বাবা তাকে বাড়িতে নিতে চাইছে না, স্বামী মারা গেছে, মা-ও সঙ্গে থাকতে পারছে না। এত অল্প বয়সে একটা মেয়ের ওপর এতকিছু চলে গেছে যে...”
কথাটা শেষ করতে পারল না ইফতি। গলার স্বরটা কেমন ভারী হয়ে এলো। সাফওয়ানও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নরম গলায় বলল—
-----“তুমি ওর পাশে থেকো। অন্তত ও যেন মনে না করে যে পৃথিবীতে ওর কেউ নেই।
ইফতি মৃদু হেসে বলল—
-----“চেষ্টা তো করছি। আমি, আম্মু, ইরা সবাই ওর দলে শুধু বাবাই একটু বেঁকে বসেছে।
-----“আর কাব্য?
-----“কাব্যও ওর পাশে আছে। তবে ও নিজেও অনেক কিছু নিয়ে অস্থির। গত সাতদিন রোদের সামনে যায়নি।
-----“কাব্যকে আমি বুঝি। ও এমনিতেই নিজের ভেতরের কথা কাউকে বলে না। আর এই মেয়েটা তো এমনিতেই অসহায়, তার উপর আবার সেদিনের ওর বাবার কথাগুলো ছেলেটাকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
—“হুম।”
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে থাকল। নীরবতাটা অস্বস্তিকর ছিল না। বরং দুজনের দীর্ঘদিনের অভ্যাসের মতোই স্বাভাবিক। ফোনের ওপাশে মানুষটার নিঃশ্বাসের শব্দটুকুও ইফতির কাছে অদ্ভুত আপন।
কিছুক্ষণ পর সাফওয়ান হঠাৎ জিজ্ঞেস করল—
----“আচ্ছা, তোমার কাজ শেষ হয়েছে?
ইফতি সামনের টেবিলে ছড়িয়ে থাকা ফাইলগুলোর দিকে তাকাল।
------“না, হয়নি।
-----“আর কতক্ষণ লাগবে?”
-----“জানি না। কয়েকজন পেশেন্ট আছে। তারপর কিছু রিপোর্ট দেখতে হবে। কিন্তু কি হয়েছে বলো তো? কেন জানতে চাইছো?
সাফওয়ান মৃদু হেসে বলল—
----“আজ একটু শপিং করতে চেয়েছিলাম তোমাকে নিয়ে।
ইফতির চোখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল।
----“শপিং?
-----“হুম। অনেকদিন হলো তোমাকে নিয়ে কোথাও যাওয়া হয় না। ভাবলাম আজ একটু বের হবো। তুমি কাজ শেষ করলে তোমাকে নিয়ে শপিং করব, তারপর একসাথেই ফিরব।
ইফতি একটু চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করল—
-----“একসাথে ফিরবে মানে? আমাদের বাড়ি যাবে?
-----“হুম। তোমাদের বাড়ি যাবো।
-----“কেন?
-----“মেয়েটাকে দেখতে যাবো। মামি বলল মেয়েটা নাকি বেশ সরল। দেখতে ইচ্ছে করছে ভীষণ আর বাড়িতে কী অবস্থা সেটাও দেখতে হবে। তার ওপর অনেকদিন তোমার সঙ্গে ঠিকমতো সময় কাটানো হয় না। তাই এবার কয়েকদিন থাকবো কাব্যকুঞ্জে।
ইফতি মুচকি হাসল।
-----“বাহ, বিয়ের আগেই ঘর জামাই থাকার প্ল্যান- করছো?
------“মোটেও না। এখন মামার বাড়ি হিসেবে যাচ্ছি কিন্তু যখন বিয়ে করবো, তখন জামাই হবো বুঝেছ মেয়ে?
হাসলো ইফতি, তারপর দুষ্টমি করে বলল-
-----“তা শপিংয়ের জন্য কত ঘণ্টা সময় বরাদ্দ রেখেছো?
-----“তুমি যতক্ষণ চাও।
-----“মিথ্যা। তুমি যে ধৈর্যহীন মানুষ, তুমি ঘন্টার পর ঘন্টা ঘুরবে শপিংমলে?
সাফওয়ান হেসে উঠল।
------“মোটেও না। ভালোবাসি তোমাকে ইতু, আর ভালোবাসলে মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টাও অপেক্ষা করে। কত মানুষ তো বছরের পর বছরও সময় পার করে - তাহলে আমি সামান্য একটু সময় অপেক্ষা করতে পারবো না? ঠিক পারবো দেখে নিও তুমি?
ইফতি হেসে মাথা নাড়ল।
-----“আচ্ছা, দেখা যাবে। তবে আমার পেশেন্ট আছে।
কাজ শেষ করে তোমাকে কল করি?
-----“অবশ্যই। কাজ আগে। তবে মনে করে জানিও কিন্তু?
ইফতি কিছু বলার আগেই সে আবার যোগ করল—
-----“তুমি তো আবার কাজের চাপে সব ভুলে যাও। তারপর আমি সারাদিন বসে বসে তোমার ফোনের অপেক্ষা করি।
কথাটায় অভিমান ছিল সামান্য, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল ভালোবাসা। ইফতি ঠোঁট কামড়ে হাসল।
-----“আচ্ছা বাবা ভুলব না। কল করবো তোমাকে?
-----“প্রমিজ করো?
-----“প্রমিজ।
------“ঠিক আছে। তাহলে আমি রেডি হচ্ছি।
-----“এখনই?
------“হুম। নারায়ণগঞ্জ থেকে যেতে তো সময় লাগবে।
------“ওকে।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে এলো। তারপর সাফওয়ানের গলায় মৃদু হাসি। ইফতির বুকের ভেতরটা কেমন নরম হয়ে গেল। কত অদ্ভুত, সারাদিন কত মানুষের কষ্ট, কত রোগ, কত দায়িত্ব—সবকিছুর ভেতর থেকেও এই একটা মানুষ কয়েকটা কথায় তার ক্লান্ত মনটা একেবারে অন্যরকম করে দিতে পারে। ইফতি আস্তে করে বলল—
----“আচ্ছা, এখন রাখো। কাজ করি।
-----“ঠিক আছে। আর হ্যাঁ—”
-----“আবার কী?
-----“ফোন করতে ভুলবে না।
ইফতি হেসে ফেলল।
-----“বললাম তো, ভুলব না।
-----“ওকে। বাই।
----“বাই।
কলটা কেটে গেল। ইফতি কয়েক সেকেন্ড ফোনটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে দিল। ঠোঁটের কোণে এখনও লেগে আছে সেই মৃদু হাসি। কিন্তু পরক্ষণেই চোখ চলে গেল সামনে পড়ে থাকা ফাইলগুলোর দিকে।
হাসিটা খুব বেশি সময় স্থায়ী হলো না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাইলটা নিজের দিকে টেনে নিল ইফতি।
বাইরে তখনও রোগীদের ভিড়। বিশ মিনিটের সময়টা প্রায় শেষের দিকে। ইফতি নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিল। ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলো আপাতত একপাশে থাক। কারণ এই মুহূর্তে চেম্বারের দরজার ওপাশে অপেক্ষা করছে আরও অনেক মানুষ—যাদের কাছে ইফতি শুধু একজন প্রিয় মানুষ নয়, একজন ডাক্তারও।
_________________________________________
বিকেল পাঁচটা বাজে।
কাব্যকুঞ্জে আজ যেন রীতিমতো ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেছে। সকাল থেকে তো বাড়ির সবাই এমনিতেই ব্যস্ত থাকে, কিন্তু রোদসীকে নিয়ে আসার পর সেই ব্যস্ততা যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। একের পর এক মানুষ ছুটে বেড়াচ্ছে এদিক-ওদিক। কারও হাতে নতুন জিনিসপত্র, কেউ রুম গোছাচ্ছে, কেউ আবার বারবার এসে দেখে যাচ্ছে কোথাও কোনো কিছুতে সমস্যা আছে কি না।
বাড়ির গেস্ট রুমটাই আপাতত রোদসীর জন্য ঠিক করা হয়েছে। ঘরটা এমনিতেই বেশ বড়। জানালার পাশে হালকা রঙের পর্দা, একপাশে বড় বিছানা, পাশে বেডসাইড টেবিল, আলাদা আলমারি, ড্রেসিং টেবিল—সব মিলিয়ে অতিথিদের থাকার জন্য যথেষ্ট আরামদায়ক।
কিন্তু কবিতা চৌধুরীর কাছে এতটুকু আরামই যথেষ্ট মনে হয়নি। রোদসী এখন শুধু একজন অতিথি নয়।
সে বাড়ির নতুন একজন মানুষ। তার ওপর মেয়েটা অন্তঃসত্ত্বা। বয়সও মাত্র পনেরো। তাই তার থাকার ঘরটাকে যতটা সম্ভব নিরাপদ করে তুলতে রোদকে আনার পর থেকেই লেগে পড়েছেন কবিতা চৌধুরী।
কবিরকে মার্কেটে পাঠিয়ে, তিনি রোদসীর ব্যবহারের প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুই আনিয়েছেন। নতুন বিছানার চাদর, বালিশ, কম্বল, নরম তোয়ালে, প্রয়োজনীয় পোশাক, স্যান্ডেল, প্রসাধনীর কিছু জিনিস, ব্যক্তিগত ব্যবহারের সামগ্রী—এমনকি রোদসী যাতে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সহজেই হাতের কাছে পায়, সেজন্য আলাদা একজন নতুন গৃহপরিচারিকাও ঠিক করেছেন।
তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ঘরের নিরাপত্তায়। ওয়াশরুম থেকে শুরু করে বিছানার চারপাশ পর্যন্ত মেঝেতে নরম পাপস বিছানো হচ্ছে। দুজন মানুষ সহ, কবির এসব করছে আর কবিতা চৌধুরী নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সবকিছু দেখছেন।
-----“ওই পাপসটা আরেকটু ভালো করে বিছাও কবির। কোণটা উঠে আছে দেখছো? ওখানে পা আটকে যেতে পারে।
কবির সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে পাপসের উঁচু হয়ে থাকা অংশটা ঠিক করে দিল। কবিতা চৌধুরী এবার ওয়াশরুমের দিকে তাকালেন।
সেখানেও আলাদা করে নরম, পানি শোষণ করতে পারে এমন পাপস বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। দরজার সামনে যেন একটুও পানি জমে না থাকে, সেজন্যও ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ইরা একপাশে দাঁড়িয়ে মায়ের এই ব্যস্ততা দেখছিল।
শেষ পর্যন্ত সে আর না পেরে হেসে বলল—
----“আম্মু, তুমি কি রোদকে গেস্ট রুমে রাখছো, নাকি রাজকীয় মহলে? মানুষ প্রেগন্যান্ট হলে বোধহয় এত্ত আদর পায় তাই না আম্মু?
কবিতা চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের দিকে তাকালেন।
------“ইয়ার্কি মারাস তুই ? তোর মাথায় এইটুকু জ্ঞান থাকলে তো বুঝতি এসব। একটা পনেরো বছরের মেয়ে নিজের বাড়ি থেকে বের হয়ে এখানে এসেছে। তার ওপর পেটে বাচ্চা। এই বয়সে ওর কীভাবে চলাফেরা করতে হয়, কীসে বিপদ হতে পারে—ও নিজেও সব জানে না। তাহলে আমাদের তো একটু বেশি সাবধান হতেই হবে।
ইরা আর হাসল না। বরং মায়ের কথায় মুখটা নরম হয়ে গেল। কবিতা চৌধুরী আবার রুমটার দিকে তাকিয়ে বললেন—
-----“পানি পড়ে গেলে যেন পা পিছলে না যায়, বিছানা থেকে নামার সময় যেন হোঁচট না খায়, রাতে যদি ঘুম থেকে উঠে ওয়াশরুমে যায় তাহলেও যেন সমস্যা না হয়—এই জিনিসগুলো ছোট মনে হলেও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কবির মাথা নেড়ে বলল—
-----“সব দেখে দিচ্ছি ম্যাডাম। আর ওয়াশরুমেও গ্র্যাব বার লাগানোর লোককে বলে দিয়েছি। আজকের মধ্যেই লাগিয়ে দেবে।
----“ভালো। আর বিছানার পাশে একটা ছোট লাইট রাখবে। রাতে যেন পুরো ঘর অন্ধকার না থাকে।
—“জি।”
কবিতা চৌধুরীর চোখ তখনও ঘরের প্রতিটি কোণ ঘুরে ঘুরে দেখছে। কোথাও কোনো ধারালো জিনিস পড়ে আছে কি না, কার্পেটের কোনো অংশ ভাঁজ হয়ে আছে কি না, বিছানার পাশে হাঁটার জায়গাটা যথেষ্ট ফাঁকা কি না—সবকিছুই তিনি খুঁটিয়ে দেখছেন।
ইরা মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল—
-----“আম্মু, তুমি কিন্তু সত্যিই ওকে নিজের মেয়ের মতো করে ফেলেছো।
কবিতা চৌধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন—
-----“মেয়ের মতো করে ফেলেছি না। মেয়ে হিসেবেই দেখছি।
ঠিক তখনই দরজার কাছে এসে দাঁড়াল রোদসী। এতক্ষণ ধরে ইরার ঘরে বসে ছিল সে। কিন্তু তার জন্য এত আয়োজন হচ্ছে—এটা যেন এখনো ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না সে। তাই নিজেই উঠে এসেছে দেখার জন্য।
নিজের জীবনে কখনো কেউ তার জন্য এভাবে ঘরের প্রতিটা কোণ নিরাপদ করে দেয়নি। কেউ কখনো তার পা পিছলে যেতে পারে ভেবে মেঝেতে পাপস বিছিয়ে দেয়নি। কেউ কখনো তার আরাম হবে কি না, রাতে ঘুম ভাঙলে আলো পাবে কি না—এসব নিয়ে এতটা ভেবে দেখেনি। যদিও সে এতদিন তো আর এখানে ছিলো না কিন্তু অন্য কোথাও থাকলেও তো প্রেগন্যান্ট ছিলোই।
-----“রোদ্দুর , ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? ভেতরে এসো।
রোদসী ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকল। তার চোখ তখনও চারপাশে ঘুরছে। নতুন চাদর। নতুন বালিশ। আলমারিতে নতুন কাপড়। টেবিলের ওপর পানির বোতল। পাশে কিছু ফল। আর মেঝেজুড়ে নরম পাপস।
রোদসী আস্তে করে বলল—
----“আমার লাইগা এত কিছু কইরা ফেলছেন?
কবিতা চৌধুরী মৃদু হেসে এগিয়ে এসে তার মাথায় হাত রাখলেন।
----“কোথায় এতকিছু করলাম মা, এই তো সামান্য। আরও কিছু দরকার হলে বলিও।
রোদসী কিছু বলতে পারল না। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। কবিতা চৌধুরী মুচকি হাসলেন, তারপর রোদের হাত ধরে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বললেন -
-----“এখন থেকে এই ঘরটা তোমার। নিজের ঘর মনে করে থাকবে। কোনো কিছু লাগলে কাউকে বলতে লজ্জা পাবে না। আর একা একা কোনো কাজ করতে যাবে না, বুঝেছো?
রোদসী ধীরে মাথা নাড়ল।
—“জি।”
-----“আর ওয়াশরুমে যাওয়ার সময় সাবধানে যাবে। তাড়াহুড়ো করবে না। মেঝে ভেজা থাকলে সঙ্গে সঙ্গে কাউকে ডাকবে। যদিও পাপস দেয়া হয়েছে, তবুও সাবধান থাকা ভালো।
রোদসী আবার মাথা নাড়ল। কবিতা চৌধুরী তার পেটের দিকে একবার তাকিয়ে খুব সাবধানে বললেন—
-----“আমার ইফতি যখন হয়েছে তখন এতটা যত্ন কেউ করেনি আমায়। কাব্যের ফুপিরা কখনো খেয়াল রাখেনি আমার। প্রেগন্যান্ট অবস্থায় এতটা আঘাত সহ্য করেছি যে, আমার এখনো কষ্ট হয় ওসব মনে হলে। একটা মেয়ের মা হওয়ার জার্নিটা মোটেও সহজ নয়। এই সময় সবাইকেই দরকার হয়, কতকিছু খেতে, করতে মন চায় কিন্তু সমাজের কিছু মানুষের কথার জন্য ওরা নিজেদের কথাগুলো ভেতরেই দাফন করে। আমিও করেছিলাম কিন্তু আমি চাইনা তুমি আমার মতো হও। তোমার যখন যা করতে হয় করবে, আমি সবসময় তোমার পাশে আছি। কিছু খেতে ইচ্ছে হলে কখনো লজ্জা করবে না। কারণ এখন থেকে শুধু নিজের না, তোমার ভেতরের ছোট্ট মানুষটার কথাও তোমাকে ভাবতে হবে।
রোদসীর হাত অজান্তেই নিজের পেটের ওপর চলে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠল হাসপাতালের সেই দুপুরটা। ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ফুটে উঠল।
কবিতা চৌধুরী সেটা দেখে মৃদু হেসে বললেন—
------“এই তো গুড গার্ল। হাসলে তোমাকে অনেক সুন্দর লাগে। এভাবেই হাসিখুশি থাকবে সবসময়।
রোদসী লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল। ঠিক তখনই—
নিচের ড্রয়িংরুম থেকে বেশ জোরে একটা শব্দ ভেসে এলো। শব্দটা এতটাই আকস্মিক ছিল যে ঘরের সবাই চমকে উঠল। ইরা সঙ্গে সঙ্গে দরজার দিকে তাকাল। কবিরের হাতের জিনিসটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। কবিতা চৌধুরীও স্থির হয়ে গেলেন।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলল না। তারপর নিচ থেকে মানুষের গলার আওয়াজ ভেসে আসতে শুরু করল। প্রথমে অস্পষ্ট। তারপর ধীরে ধীরে পরিষ্কার।
কবিতা চৌধুরীর মুখটা মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল।
----“আবার কী হলো?
ইরা মায়ের দিকে তাকাল।
----“মনে হয় আব্বু এসেছে, ভাইয়া তো বাসায় নেই। নাকি এসেছে আর তার সাথেই রাগারাগি করছে আব্বু?
কবিতা চৌধুরী কিছু বলার আগেই বাইরে থেকে দ্রুত পায়ে ছুটে এলো বাড়ির এক কাজের মেয়ে। দরজার কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—
-----“ম্যাডাম বড় স্যার এসে সবকিছু আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলছেন। খুব রেগে আছেন তিনি।
কবিতা চৌধুরী কপাল কুঁচকে তাকালেন।
----“কেন?
মেয়েটা একটু ইতস্তত করে রোদসীর দিকে তাকাল।
তারপর নিচু গলায় বলল—
-----“বড় স্যার বলছেন, রোদ আপুকে কেন এই বাড়িতে আনা হইছে। উনি তো মানা করছিলেন। তবুও তার কথা অমান্য করা হলো কেন?
কথাটা শুনতেই রোদসীর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
তার চোখ অজান্তেই কবিতা চৌধুরীর দিকে চলে গেল।
মেয়েটার চোখে এক মুহূর্তে লজ্জা আর অপরাধবোধ এসে জমল। মনে হলো, তার জন্যই বুঝি এই বাড়িতে এত ঝামেলা। কবিতা চৌধুরী সেটা বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে রোদসীর দিকে এগিয়ে এলেন।
------“এই যে গুলবাহার, তুমি এসব নিয়ে একদম ভাববে না। কেউ কিছু বললে তোমার জন্য বলছে না। বুঝেছো?সবটা আমি বুঝে নেবো, তুমি এখানে থাকো, বাহিরে আসবে না।
রোদসী কিছু বলল না। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। কবিতা চৌধুরী এবার কবিরের দিকে তাকালেন।
-------“কাব্যকে কল দাও কবির। ওকে বলো যত কাজই থাক, এখনই যেন চলে আসে। ইরা আয় আমার সাথে, আর এই যে তোমরা - মেয়েটাকে আমার একা ছাড়ো, কোন পুরুষকে ওর সাথে থাকতে হবে না। পরে আসবে আবার এখন চলো।
কবির কাব্যকে কল করে আসতে বলে নিজেও ওদের সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন। গেস্ট রুমের দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। রোদসী একা হয়ে গেল ঘরটায়।
নিচে তখন পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত।
ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন জাহাঙ্গীর আলম। তাঁর মুখ রাগে লাল নয়, বরং অস্বাভাবিক গম্ভীর। সামনে সোফায় বসে জাকিয়া চৌধুরী। তার মুখে যেন বহুদিনের জমে থাকা অভিযোগের সুযোগ এসে গেছে। কবিতা চৌধুরী আর কবিররা নিচে নামতেই জাহাঙ্গীর আলম তাকালেন।
-----“কবিতা, আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম। মেয়েটাকে এখানে আনা যাবে না। তবুও কার অনুমতি নিয়ে ওকে এখানে এনেছো?
কণ্ঠটা কঠিন, কিন্তু অপমানজনক নয়। কবিতা চৌধুরী শান্ত গলায় বললেন—
------“এই বাড়িটা তোমার একার নয় ইফতির বাবা? আমারও সংসার এটা। আর আমার সংসারে কাউকে আনতে হলে তোমার থেকে পারমিশন নিতে হবে আমার? তাছাড়া মেয়েটার যাওয়ার জায়গা নেই। কোথায় ফেলবো ওকে?
-----“জায়গা নেই মানে?
রেগে গর্জন করে উঠলেন জাহাঙ্গীর আলম।
-----“আমি কি ওকে রাস্তায় ফেলে দিতে বলেছি? নাকি বলেছি ওর কোন দায়িত্ব নেয়া হবে না। আমি নিজে ওর দায়িত্ব নিতে চেয়েছি। আলাদা বাসা ভাড়া করে দেব। প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা করব। সারাক্ষণ একজন মানুষ ওর সঙ্গে থাকবে। চিকিৎসা থেকে শুরু করে যা যা প্রয়োজন, সব আমি দেব। তবুও কাব্যকুঞ্জে কেন আনলে ওকে?
জাকিয়া চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে কথাটা ধরে ফেললেন।
-----“এই কথাটাই তো আমি সকাল থেকে তোর বউকে বলছি ভাই, কিন্তু কবিতা আমার কথা শুনলে তো! আমাদের কাব্য অবিবাহিত একটা ছেলে, তার উপর পুরুষ মানুষ - একজন মেয়ে বাড়িতে রাখলে কি হবে বুঝতে পারছিস? বাইরের লোকে কি বলবে এটা দেখে? আর একটা বাইরের মেয়ের জন্য আমাদের বাড়ির নিয়মকানুন সব বদলে যাবে কেন? আজ গেস্ট রুম, কাল কী হবে? কাল দেখবি মেয়েটা এই বাড়িরই একজন হয়ে বসে আছে।
কবিতা চৌধুরী এবার জাকিয়া চৌধুরীর দিকে তাকালেন।
-----“ও একটা অসহায় বাচ্চা মেয়ে আপা। এভাবে কথা বলো না। তোমার ঘরেও তো মেয়ে আছে, তুমি নিজে একজন মেয়ের মা হয়ে এভাবে কেন বলছো?
-----“বাচ্চা মেয়ে? কে বাচ্চা মেয়ে কবিতা? যে মেয়ে মাত্র পনেরো বছর বয়সে বেরিয়ে গিয়ে পেট বাঁধাতে পারে, সে কি এখনও বাচ্চা আছে নাকি? তাছাড়া ওর পেটের বাচ্চাটা জারজ সন্তান কিনা, সেটা কে জানে।
-----"ফুপি। মুখ সামলে কথা বলো?
রোদের অপমান সহ্য করলো না ইরা। রাগে গর্জে উঠে এগিয়ে এসে দাড়ালো জাকিয়া চৌধুরীর সামনে।
-------"কার সন্তানকে তুমি জারজ সন্তান বলছো? রোদের? কিন্তু ওর সন্তান তো জারজ নয়, সেটা আব্বুও প্রমাণ পেয়েছে। কি আব্বু প্রমাণ পাওনি তুমি?
শেষ কথাটা জাহাঙ্গীর আলমের দিকে তাকিয়ে বলল ইরা। তা শুনে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলেন জাকিয়া চৌধুরী।
------“তা এতই যখন প্রমাণ মিলেছে তাহলে ওর বাবা ওকে ঘরে নিলো না কেন? কেন ওকে আনতে হলো আমাদের বাসায়? কাব্যকুঞ্জ কি ফকিরদের আস্তানা নাকি যে যাকে তাকে এখানে এনে তুলতে হবে? কাব্য তো এমন ছিলো না, তোর বউই ওর মাথাটা খেয়েছে জাহাঙ্গীর।
জাহাঙ্গীর আলম এবার আরও বেশি ক্ষুব্ধ হলেন।
------“তোমরা থামবে? কি শুরু করলে? মেয়েটাকে আমি অপছন্দ করিনা, ওর বিরুদ্ধেও না আমি। আমি শুধু বলছি, কাব্যকুঞ্জে ওকে রাখা উচিত নয়।
তারপর একটু ধীরে বললেন—
-----“কাব্য একজন মন্ত্রী। তার ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি বিষয় এখন আর শুধু ব্যক্তিগত থাকে না। মানুষ কথা বলবে। সংবাদমাধ্যমে কথা উঠতে পারে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সুযোগ নেবে। সমাজের কথা আমি ভয় পাচ্ছি না, কিন্তু কাব্যের অবস্থান আর দায়িত্বের কথা আমাকে ভাবতেই হবে।
কবিতা চৌধুরী স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন—
-----“মানুষের কথা ভেবে যদি একটা অসহায় মেয়েকে আশ্রয় না দিই, তাহলে এত বড় বাড়ি রেখে লাভ কী?
জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
-----“আমি কিন্তু ওকে আশ্রয় দিতে মানা করিনি , কবিতা। বারবার আমি বলছি অন্য কোথাও ব্যবস্থা করতে। নিরাপদ জায়গা। ভালো জায়গা। চাইলে আমি নিজে দেখে দেব সব।
কবিতা এবার একটু নরম গলায় বললেন—
-----“কিন্তু ও নিজের বাড়ির মতো একটা জায়গা দরকার। কেন বুঝতে পারছো না?
জাহাঙ্গীর আলম আর কোনো কথা বললেন না কবিতা চৌধুরীর সঙ্গে। কবিরের দিকে তাকালেন।
-----“কাব্য কোথায় কবির?
----“বাইরে গেছে স্যার। ছোট স্যারের কি নাকি একটা জরুরি কাজ আছে।
-----“ওকে আসতে বলো। ওর সঙ্গে কথা বলব আমি ।
কবিতা চৌধুরী কিছু বলতে যাবেন, তার আগেই জাকিয়া চৌধুরী আবার বলে উঠলেন—
-----“কাব্যকে তুই যতই বোঝা ভাই, ও শুনবে না। ও এখন ওই মেয়েটাকে নিয়ে এতটাই আবেগী হয়ে গেছে যে নিজের অবস্থানটাও ভুলে যাচ্ছে। আর ওর কথা কিই বা বলবো, ওই অপয়া মেয়েটাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। ওদের মতো মেয়েদের চোখের পানিটাই বিশাল অস্ত্র, ওরা কুমিরের কান্না কেঁদে একটা সহজসরল ছেলেকেও নিজেদের বশে নিতে পারে। তুই বরং কাব্যের আশায় না থেকে বের করে দে মেয়েটাকে।
ইরা বিরক্ত হয়ে তাকাল। কিন্তু জাহাঙ্গীর আলম আর কোনো উত্তর দিলেন না। তার চোখেমুখে রাগের চেয়ে চিন্তাই বেশি। ওদিকে ওপরতলায় একা বসে ছিল রোদসী। নিচের কথাগুলোর কিছু কিছু শব্দ তার কানে আসছিল। সবকিছু পরিষ্কার বুঝতে না পারলেও একটা বিষয় বুঝতে পারছিল—
তার জন্য ঝামেলা হচ্ছে। মেয়েটা বিছানার এক কোণে বসে নিজের আঙুল মুঠো করে ধরে রাখল। মনে মনে শুধু একজন মানুষকেই খুঁজছিল সে। মন্ত্রী মশাই। মানুষটা তো এই বাড়িতে রেখে যাওয়ার আগে বলেছিল
“কেউ কিছু বললে আমি সামলে নেব।”
তাহলে আজ তিনি কোথায়? কেন নেই? কেন তার জন্য সবাইকে এত কথা শুনতে হচ্ছে? সে তো আসতে চায়নি কিন্তু তিনিই তো জোর করে আনলেন এখানে। রোদসী ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিজের পেটের ওপর হাত রাখল।
-----“তোর জন্যই কি এত ঝামেলা হইতেছে রে বাজান? দেখছস তোর মায়ের কপাল, যেইহানে যায় ওইহানেই একটা ক্যাচাল বাজে।
ওর কথা শেষ হতেই শব্দ করে ঘরের দরজাটা খুলে গেল। রোদসী চমকে তাকাল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মাহা। যখন ও এখানে এসেছে তখনও মেয়েটা কিভাবে যেন দেখছিল কিন্তু কিছু বলেনি। আর এখনও সেই একই ভাবে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। চোখে মুগ্ধতা নেই বরং সেখানে জমে আছে তীব্র বিরক্তি।
সে ঘরে ঢুকেই চারপাশে তাকাল। নতুন বিছানা।
নতুন কাপড়। নতুন জিনিসপত্র। মেঝেতে নরম পাপস। যদিও সবটা এখনো ভালো করে বিছানো হয়নি কিন্তু সব তো ওর জন্যই। সবকিছু দেখে মাহার বুকের ভেতরের হিংসাটা আরও জ্বলে উঠল। কাব্য কোনোদিন তাকে এভাবে যত্ন করেনি। কখনো জিজ্ঞেস করেনি সে আরামে আছে কি না। কখনো তার জন্য পুরো একটা ঘর এভাবে সাজানো হয়নি।
অথচ এই মেয়েটা? একদিনও হয়নি বাড়িতে এসেছে, আর সবাই যেন তাকে মাথায় তুলে রেখেছে! এই মেয়েটার জন্যই জাহাঙ্গীর আলম আর কাব্যের কথা কাটাকাটি হয়েছে। রোদসী ওর মুখের দিকে ফ্যাকাশে চোখে তাকিয়ে আছে। তা দেখে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো মাহা, তারপর ঠান্ডা গলায় বলল—
-----“বাহ! বেশ তো আছো দেখছি। পুরোই রাজকীয় জীবন। কাক থেকে ময়ূর হওয়ার চেষ্টা করছো তাহলে?
রোদসী কিছু বলল না। মাহা আরও এগিয়ে এলো।
-----“তোমার জন্য পুরো বাড়িতে ঝামেলা চলছে, আর তুমি এখানে রানির মতো বসে আছো?
রোদসী মাথা নিচু করল।
----“আমি তো কুনো ঝামেলা করতে চাই নাই। আমি তো এইহানে আইতেই চাইনাই কিন্তু মন্ত্রীমশাই আর হের মায় তো লইয়া আইলো আমারে।
------“চাওনি? তোমার জন্যই মামা আর কাব্যের মধ্যে ঝামেলা হচ্ছে। তুমি আসার পর থেকে বাড়িতে কি এতটুকুও শান্তি আছে?
রোদসীর ঠোঁট কেঁপে উঠল। সে কিছু বলতে চাইল।
কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না। মাহার চোখ তখন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
------“তোমার জন্য কাব্য নিজের বাবার কথাও শুনছে না। তোমার জন্য বাবা ছেলের মধ্যে চির ধরেছে আর আর তুমি এখানে বসে বসে আরাম আয়েশ করছো!
রোদসীর চোখে পানি এসে গেল। তবুও সে চুপ করে রইল। তার মনে শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—মন্ত্রী মশাই কোথায়? তিনি তো বলেছিলেন, কেউ কিছু বললে সামলে নেবেন। তাহলে আজ কেন নেই?
মাহা চেয়েছিল রোদ কিছু বলুক, ওকে নিয়ে কাব্যের এত আদিখ্যেতা সহ্য হচ্ছে না ওর। কাব্য তো ওর তাহলে কাব্য এই মেয়েটাকে নিয়ে এত মাথা ঘামাবে কেন? হঠাৎ আরও রেগে গেল সে। রাগের মাথায় এগিয়ে এসে রোদসীর হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।
-----“তোমার জন্যই সব ঝামেলা হচ্ছে বেয়াদব মেয়ে। কার না কার সন্তান গর্ভে নিয়ে এখন এসেছ কাব্যের ঘাড়ে বসে মহারানীর মতো চলতে? তা হচ্ছে না, আমি হতে দেব না। এসো আমার সাথে।
রোদসী ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল।
-----“আহ্ ছাড়েন! আঘাত পাইতাছি আমি, কই লইয়া যান আমারে?
-----“তোমাকে কোথাও নেবো না, তুমি জাহান্নামে যাও কিন্তু তার আগে এই বাড়ি থেকে বের হও!
কথাটা বলেই রোদসীর হাত ধরে টান দিল মাহা। রোদসী বাধা দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। ভারী শরীর নিয়ে হঠাৎ টান খেয়ে উঠে দাঁড়াতেই তার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেল। কিন্তু সেদিকে তাকালোও না মাহা, সে দরজার সামনে এসে সজোরে ধাক্কা মারলো রোদকে।
ঘরে সকল পাপস বিছানো হয়নি এখনি, দরজার সামনে পালা করে রাখা হয়েছিল সেগুলো। মাহার ধাক্কা খেয়ে সেই পাপসগুলোর একটার ওপর পা পড়তেই পাপসটা সামান্য সরে গেল। আর তাতে পা হড়কে গেল রোদসীর।
ভয়ে রোদসীর চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। অজান্তেই এক হাত পেটের ওপর চলে গেল। আর মুহূর্তের মধ্যেই সামনের দিকে মুখ থুবড়ে পড়ল রোদ।
#রোদ্দুরের_রেশ
#আরশিয়া_নূর
#বোনাস_পর্ব [অনুমতি ব্যতিত কপিকরা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ 🚫]
মাহা ধাক্কা মারার পর সামনের দিকে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল রোদ কিন্তু তার শরীরটা মেঝেতে আছড়ে পড়ার আগেই একটা শক্ত হাত, ওর হাতের কব্জি টেনে এক ঝটকায় নিজের দিকে নিয়ে তাকে জাপটে ধরল। তবে রক্ষা করতে পারলো না। নিজের বুকের সাথে ওর পিঠ লাগতেই পাপস গুলোর উপরে আছড়ে পরলো দুজনেই।
—“রোদ!”
ইফতির আতঙ্কিত চিৎকারে কেঁপে উঠল পুরো করিডোর। দৌড়ে গিয়ে রোদকে আগলে নিলো ইফতি কিন্তু ততক্ষণে সাফওয়ানের হাতের কনুইয়ের ছাল উঠে রক্ত গড়িয়ে পড়া শুরু করেছে।
দরজার সামনে ছড়িয়ে থাকা নরম পাপসগুলোর ওপর পড়ায় কোনো আঘাত লাগেনি রোদের তবুও ভয় পেয়ে গিয়েছিল সে। আর সেটা এতটাই যে কয়েক সেকেন্ড নড়তেও পারল না।
তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। চোখ দুটো বিস্ফারিত।
এক হাত এখনও নিজের পেটের ওপর শক্ত করে চেপে ধরে আছে। সাফওয়ান নিজের ক্ষতের দিকে তাকালো না, সে দ্রুত উঠে বসে রোদসীর দিকে তাকাল।
-----“রোদ? তুমি ঠিক আছো?
রোদসী উত্তর দিতে পারল না। ভয়ে তার ঠোঁট কাঁপছে।
সাফওয়ানের বুকও ধুকপুক করছে। এক মূহুর্ত চোখ বন্ধ করলো সে। সঙ্গে সঙ্গে চোখের সামনে ভেসে উঠলো কয়েক সেকেন্ড আগের দৃশ্যটা ।
সে আর ইফতি কিছুক্ষণ আগেই কাব্যকুঞ্জে এসেছে। নিচে জাহাঙ্গীর আলম আর কবিতা চৌধুরী কথা কাটাকাটি করছিল কিন্তু ওসব শুনতে ইচ্ছে হয়নি ওদের। তাই কারও সঙ্গে কথা না বলে সরাসরি রোদসীকে দেখতে ওপরে উঠছিল তারা। ইফতির সঙ্গে হাসতে হাসতে করিডোর দিয়ে এগিয়ে আসার সময়ই হঠাৎ রোদসীর আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর কানে আসে।
সেই শব্দের দিকে তাকাতেই চোখ বড়বড় হয়ে যায় দুজনের। দরজার সামনে মাহা রোদসীর হাত ধরে টানতে টানতে পরক্ষণেই তাকে ধাক্কা দিল। আর সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে এসে রোদকে ধরেছে সাফওয়ান। সে
কল্পনাও করতে পারেনি, তার নিজের ছোট বোন এমন কিছু করতে পারে।
ভাগ্যিস ওরা নিচে দাঁড়ায়নি, চলে এসেছিল নাহলে কি যে হতো! আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে ধীরে ধীরে রোদকে ডাকলো সে -
-----“রোদ! আমার দিকে তাকাও।
রোদসী ধীরে ধীরে মুখ তুলল। তার চোখে পানি জমে আছে। ইফতি আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। তাকে দুহাতে শক্ত করে ধরে নিজের দিকে টেনে নিয়ে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিল।
-----“কিছু হয়েছে? কোথাও ব্যথা পেয়েছো? বলো আমাকে? পেটে ব্যথা পেয়েছ?
রোদসী কাঁপা গলায় বলল—
-----“না ব্যথা পাইনাই। তয় ভয় পাইছি আমি, ওই আপায় জোরে ধাক্কা মারছে আমারে।
ইফতির বুকটা কেঁপে উঠল। সে আরও শক্ত করে রোদসীকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলো।
------“কিছু হবে না। দেখো আমি আছি। ভয় পেও না, আর কেউ কোনোদিন আঘাত করবে না।
রোদসী এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
------“আমি তো কিছু করি নাই আপা, আমি তো এইহানে আইতেই চাই নাই। মন্ত্রীমশাই জোর কইরা লইয়া আইছে। আমি কারও লগে ঝামেলা করবার চাই নাই কিন্তু ওই আপা আইসাই ঝামেলা করলো।
ইফতির চোখে এক মুহূর্তের জন্য আগুন জ্বলে উঠল।
সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে মাহার দিকে তাকাল। মাহা তখনও দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। মুখের রাগ কিছুটা মিলিয়ে গেছে। সম্ভবত ঘটনাটা এতদূর গড়াবে, সে নিজেও ভাবেনি।
কিন্তু সাফওয়ান ভাবার সময় দিল না কাউকে।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ তখন মাহার দিকে। একদম স্থির। অস্বাভাবিক ঠান্ডা।
মাহা ভাইয়ের সেই দৃষ্টি দেখে এক মুহূর্ত থমকে গেল।
-----“ভাইয়া, আমি—”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই শক্তপোক্ত বলিষ্ঠ হাতের থাপ্পড় গিয়ে পড়লো ওর নরম গালে। থাপ্পড়টা এতটা জোরে মারলো সাফওয়ান যে, তার শব্দ করিডোরের চারপাশে প্রতিধ্বনি হতে লাগলো। থাপ্পড়ের চোটে মাহার মুখ একপাশে ঘুরে গেল।
চোখ বিস্ফারিত হয়ে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল সে। তারপর গালে হাত দিয়ে ধীরে ধীরে সাফওয়ানের দিকে তাকাল।
-----“ভাইয়া! তুমি আমাকে মারলে?
সাফওয়ানের কণ্ঠ এবার গর্জে উঠল।
-----“তুমি কী করেছো, সেটা তোমার মাথায় আছে? দিনকে দিন অমানুষ এ পরিণত হচ্ছো, এই শিক্ষা পেয়েছ তুমি?
মাহার চোখে পানি জমে উঠল।
-----“আমি ওকে মারতে চাইনি, কিন্তু ওই তো—”
—“চুপ!”
সাফওয়ানের গর্জনে মাহা থেমে গেল।
-----“তুমি একটা অন্তঃসত্ত্বা বাচ্চা মেয়েকে ধাক্কা দিয়েছো! একটা পনেরো বছরের মেয়েকে! আর তুমি বলছো, মারতে চাওনি? নিজের বয়স তো তেইশ বছর চলে , তবুও কি জ্ঞান বুদ্ধি হয়নি? এতটুকু একটা বাচ্চা মেয়ের সাথে পশুর মতো আচরণ করেছো।
মাহা এবার কাঁপা গলায় বলল—
-----“ওর জন্য বাড়িতে ঝামেলা হচ্ছে ভাইয়া। মামা আর কাব্যের মধ্যে—”
------“তো? কি হয়েছে তাতে? ওদের ঝামেলা ওরা বুঝে নেবে,তাই বলে তুমি তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবে?
সাফওয়ানের চোখ রাগে লাল হয়ে উঠেছে। সে মাহার দিকে এমনভাবে তাকাল যে, মাহা যদি আর একটা বলে তাহলে হয়তো এখানেই ছিঁড়ে ফেলবে ওকে। মেয়েটা ভয়ে আর কিছু বলল না। ইফতি তাকালো এবার মাহার দিকে।
------“মাহা, তুমি আমার ছোট বোন। আমি তোমাকে ভালোবাসি বলেই যে তোমার অন্যায়কে প্রশ্রয় দেব—এটা ভেবো না। আজ তুমি যেটা করলে সেটা আশা করিনি তোমার থেকে।
মাহার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ঠিক তখনই নিচ থেকে একসঙ্গে কয়েকজনের ছুটে আসার শব্দ শোনা গেল।
প্রথমে এগিয়ে এলেন কবিতা চৌধুরী। তার ঠিক পেছনে জাহাঙ্গীর আলম, জাকিয়া চৌধুরী, ইরা এবং কবির। করিডোরের সামনে এসে কয়েক সেকেন্ড থমকে গেল সবাই।
গেস্ট রুমের দরজার পাশে বসে ইফতির বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে রোদসী। একপাশে গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাহা। তার গালে স্পষ্ট লালচে ছাপ।
আর সামনে দাঁড়িয়ে রাগে ফুসছে সাফওয়ান। ওরা সবাই নিচে তর্কাতর্কি করছিল, হুট করেই ইফতির চিৎকার শুনে ছুটে এসেছে সকলেই।
চারপাশে ওদের এমন চাহনি দেখে জাহাঙ্গীর আলমের ভ্রু কুঁচকে গেল।
------“এখানে কী হয়েছে? ইফতি চিৎকার করলে কেন?
কেউ কিছু বলার আগেই জাকিয়া চৌধুরী এগিয়ে এসে মাহাকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে, মেয়ের গালে হাত রাখলেন।
-----“মাহা! গাল এমন লাল হয়ে আছে কেন? কে মেরেছে তোকে?
মাহা মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। কোন উত্তর দিলো না। জাকিয়া চৌধুরী এবার সাফওয়ানের দিকে তাকালেন।
—“সাফওয়ান?”
সাফওয়ানও কোনো উত্তর দিল না। তার নীরবতাই যথেষ্ট ছিল বুঝিয়ে দেয়ার যে, সে মাহার গায়ে হাত তুলেছে। জাকিয়া চৌধুরীর মুখ মুহূর্তেই বদলে গেল।
-----“তুই তোর নিজের বোনকে মেরেছিস? এরকম একটা মেয়ের গায়ে হাত তুলেছিস তুই?
------“হ্যাঁ মেরেছি।
সাফওয়ানের শান্ত উত্তর। জাকিয়া চৌদুরী যেন বিশ্বাসই করতে পারলেন না। কারণ সাফওয়ান মিহি আর মাহাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে। এই দুই বোন ওর দুই নয়নের আলো, সে কখনো বোনের গায়ে হাত তুলতে পারে - তা যেন কল্পনাও করতে পারছেন না তিনি।
জাহাঙ্গীর আলম ইফতিকে জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে এখানে এখানে। ইফতি একে একে সবকিছু খুলে বলল। কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেল সকলেই। কবিতা চৌধুরী এগিয়ে এসে ইফতির থেকে আগলে নিলেন রোদকে। মনে মনে হাজারবার নিজেকে দোষ দিলেন এটা ভেবে যে, মেয়েটাকে একা রেখে যাওয়া উচিত হয়নি। ওর পাশে অন্তত একজনকে রেখে যাওয়া উচিত ছিলো।
সবটা শুনে সবার রোদের জন্য খারাপ লাগলেও জাকিয়া চৌধুরীর সেসব কিছুই হলো না, উল্টো তিনি সাফওয়ানের উপরে গর্জে উঠলেন মাহার গায়ে হাত তোলার জন্য।
------“একটা বাইরের মেয়ের জন্য তুই তোর আদরের বোনের গায়ে হাত তুলেছিস সাফওয়ান ? এই মেয়েটা তো অপয়া, ওর জন্য বাড়িতে সকাল থেকে শান্তি নেই। ও আসার পর থেকে সবাই শুধু ওকে নিয়েই ব্যস্ত। এখন আবার আমার মেয়ের গায়েও হাত উঠছে!
ইফতির মুখ শক্ত হয়ে গেল। ও কিছু বলতে নিলো কিন্তু তার আগেই সাফওয়ান বলল—
------“খবরদার আম্মু, কথাটা ঘুরিয়ে বলবে না। নিজের মেয়ে যে দোষটা করেছে, সেটা আগে স্বীকার করতে শেখো তারপর কথা বলবে।
জাকিয়া চৌধুরী রোদের দিকে তাকালেন। তারপর মুখটা বাঁকা করে তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন -
------“কী ঘুরিয়ে বলছি আমি? এই যে মেয়েটা ওর জন্য কোথায় শান্তি আছে বলতো? নিজের গ্রামে বাপ মায়ের মুখে চুনকালি মেখেছে, এতটাই বেহায়া যে বাপ রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে গেছে। ওখান থেকে আমার ভাই দয়া করেছে বলেই এখানে আসতে পেরেছে আবার এখন এখানেও অশান্তি করছে? ওর তো চরিত্রের ঠিক নাই, আবার কিনা ওর হয়ে সাফাই গায় আমারই ভাইয়ের বউ।
সাফওয়ানের কণ্ঠ আরও দৃঢ় হলো।
------“মা তুমি আমাকে গর্ভে ধারণ করেছো, জন্ম দিয়েছ, বুকের দুধ খাইয়ে বড় করেছে তার জন্য তোমার প্রতি শ্রদ্ধার শেষ নেই আমার। সবসময় আল্লাহ ও রাসূলের পর তোমার স্থান আমার কাছে। কিন্তু আজ এই মূহুর্তে এমন কিছু বলিও না, যাতে তোমাকে আমার ঘেন্না হয়। যাতে সকলের সামনে তোমাকে মা বলে ডাকতে আমার বিবেকে বাধে।
------"সাফওয়ান!
বিষ্ফোরিত নয়নে চেয়ে চিৎকার করে উঠলেন জাকিয়া চৌধুরী।
------"কি বলছিস তুই এসব, মাথার ঠিক আছে? একটা বাহিরের মেয়ের সামনে অপমান করছিস আমাকে? তোর মাকে?
------"করছি না মা, করতে বাধ্য হচ্ছি। তুমি তোমার মেয়ের গালে থাপ্পড়ের সামান্য দাগ দেখে এভাবে চিৎকার করছো, অথচ তোমার মেয়ে যে অন্যায়টা করলো সেটা কেন দেখছো না? রোদ যতই ছোট হোক, সে নিজেও তো একজন হবু মা। আজ যদি তোমার মেয়ের জন্য ওর গর্ভের সন্তানের কোন ক্ষতি হত তাহলে কি করতে তুমি? যদি সময় মতো ওকে আমি না ধরতাম, তাহলে তুমি কি ওর সন্তানকে ওর কোলে দিতে পারতে? কেন এতবড় অন্যায় করলো তোমার মেয়ে,জানতে চেয়েছ একবারও?
জাকিয়া চৌধুরী মুহূর্তের জন্য থেমে গেলেন। কিন্তু কবিতা চৌধুরী আর রোদের সামনে দমে যেতে তিনি নারাজ। তাই বিরক্ত গলায় বললেন—
------“ধাক্কা দিয়েছে মানে? এমনি এমনি তো আর কিছু করেনি, নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে। নিশ্চয়ই এই মেয়েটা এমন কিছু করেছে—”
—“আম্মু!”
সাফওয়ানের কণ্ঠ এবার এতটাই কঠিন হলো যে জাকিয়া চৌধুরী কেঁপে উঠলেন।
-----“তুমি না জেনে একটা কথাও বলবে না। আমি নিজের চোখে দেখেছি মাহা ওর হাত ধরে টানছে। রোদ কিছু করেনি, ও মাহার থেকে বাঁচার চেষ্টা করছিল কিন্তু মাহা না ছেড়ে দরজার সামনে ওকে ধাক্কা দিয়েছে।
এতক্ষণ ধরে চুপচাপ মা ছেলের কথা শুনছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। এবার আর চুপ থাকতে পারলেন না তিনি, মাহার দিকে তাকালেন।
------“সাফওয়ান যা বলছে এটা কি সত্যি মাহা?
মাহা কিছু বলল না। তার চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। কবিতা চৌধুরীর মুখটা মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল। তিনি রোদকে ইফতির হাতে ছেড়ে ধীরে ধীরে মাহার দিকে এগিয়ে গেলেন।
-----“তুমি জানো মেয়েটা অন্তঃসত্ত্বা? পনেরো বছরের বাচ্চা মেয়ে একটা ও, তবুও তুমি ওকে ধাক্কা দিলে?
মাহা ফিসফিস করে বলল—
-----“আমি রেগে গিয়েছিলাম। ওর জন্য কাব্য আর মামার ঝগড়া হয়েছে। তাই রেগে গিয়ে -"
-----“রেগে গেলেই মানুষ, হত্যা করার অধিকার পেয়ে যায়? তুমি আজ যেটা করেছো, এটা তো হত্যার শামিল মাহা?
কবিতা চৌধুরীর প্রশ্নে মাহার মুখ আরও ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ইফতি তখনও রোদসীকে বুকে আগলে বসে আছে। তার চোখে রাগ। জাকিয়া চৌধুরী আর কিছু বললেন না। ইরা এগিয়ে এসে রোদকে ধরলো -
------“আম্মু,এসব ঝামেলা পরে করিও। এখন ওকে আগে ঘরে নিয়ে বসাও। ওকে চেক করা দরকার। ও ভয় পেয়েছে। পেটে কোথাও ব্যথা পেয়েছে কি না সেটাও তো দেখতে হবে।
জাহাঙ্গীর আলম দ্রুত রোদসীর দিকে তাকালেন।
এই প্রথমবার রোদসীর জন্য তার চোখে স্পষ্ট উদ্বেগ ফুটে উঠল।
-----“কোথাও ব্যথা পেয়েছো তুমি ?
রোদসী ধীরে মাথা নাড়ল।
------“না ব্যথা পাইনাই কিন্তু কনুই ছিলা গ্যাছে।
কণ্ঠটা এতটাই দুর্বল ছিল যে কবিতা চৌধুরীর বুকটা কেঁপে উঠল। তিনি এগিয়ে এসে রোদসীর মাথায় হাত রাখলেন।
-----“কিছু হবে না মা। ঘরে ফাস্ট এইড বক্স আছে, ইফতি ড্রেসিং করিয়ে ওষুধ লাগিয়ে দেবে।
জাকিয়া চৌধুরী এবার বিরক্ত হয়ে বললেন—
-----“এত আদিখ্যেতার কী আছে? মেয়েটা তো ঠিকঠাকই আছে।
ইফতির চোখ মুহূর্তেই জাকিয়ার দিকে ঘুরে গেল।
------“ফুপি, প্লিজ। আর ঝামেলা বারিও না। ও সিম্পল নয়, তাই অযথা কথা বলো না।
কণ্ঠটা নিচু ছিলো কিন্তু স্পষ্ট সতর্কতা ছিল সেখানে।
ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এলো। জাহাঙ্গীর আলম কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে মাহার দিকে তাকালেন।
-----“মাহা, নিচে যাও। নিজের ঘরে গিয়ে রেস্ট নাও, আপা তুমিও যাও।
মাহা মাথা তুলে তাকাল।
—“মামা—”
-----“আমি বলেছি তো, নিচে যাও।
জাহাঙ্গীর আলমের কণ্ঠটা উঁচু ছিল না কিন্তু এতটাই কঠিন ছিল যে মাহা আর কোনো কথা বলল না। চোখের পানি মুছতে মুছতে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। জাকিয়া চৌধুরীও মেয়ের পেছনে যেতে উদ্যত হলেন। কিন্তু যাওয়ার আগে একবার রোদসীর দিকে তাকিয়ে এমন একটা দৃষ্টি দিলেন, যাতে স্পষ্ট বোঝা গেল—
এই গল্প এখানেই শেষ নয়। ওরা চলে গেলে রোদসীকে ঘরে নিয়ে বসালো কবিতা চৌধুরী আর ইরাকে পাঠালো ফাস্ট এইড বক্স আনতে। কবিরও বেরিয়ে গেলে জায়গাটা মুহূর্তেই ফাঁকা হয়ে গেল। দাঁড়িয়ে রইলো শুধু ইফতি আর সাফওয়ান।
ইফতি করুণ চোখে সাফওয়ানের হাতের কনুইয়ের দিকে তাকাতেই সাফওয়ান মাথা নেড়ে মুচকি হাসল। চোখের ইশারায় যেন তাকে আশ্বস্ত করে বলল—
----“এখন কোনো কান্না নয়। আমি সম্পূর্ণ ঠিক আছি। এটাতেও ওষুধ লাগিয়ে নেব।
কথাটা বুঝিয়েই এক সেকেন্ড দেরি করল না সাফওয়ান। সোজা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল সে। ড্রয়িংরুমে গিয়ে ওষুধ লাগিয়ে নেওয়া যাবে। এখানে দুজনকে একসঙ্গে দেখলে মানুষ উল্টাপাল্টা কথা ছড়াতে এক মুহূর্তও সময় নেবে না।
তবে সিঁড়িতে গিয়ে হঠাৎই থমকে দাঁড়াল সাফওয়ান। কি যেন একটা মনে হতেই
পেছন ফিরে তাকাল সে। ইফতি এখনো সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকেই।
দৃশ্যটা দেখে সাফওয়ানের ঠোঁটে আবারও মুচকি হাসি ফুটে উঠল।
চারপাশে একবার সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে দুহাত তুলে বুকের সামনে হার্টের আকৃতি বানাল। তারপর ইফতির উদ্দেশে উড়িয়ে দিল একটা ফ্লাইং কিস। এরপর আর না দাঁড়িয়ে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে হাসিমুখেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল সে।
আর ওপরে রেখে গেল—
ছলছল চোখে দাঁড়িয়ে থাকা তার প্রেমিকা, তার প্রেয়সী—একজন ডাক্তারকে।
_________________________________________
সন্ধ্যা ছয়টা বাজে।
কাব্যকুঞ্জের ড্রয়িংরুমে অস্বাভাবিক এক নীরবতা নেমে আছে। বাইরে সন্ধ্যা নেমেছে অনেকক্ষণ। বিশাল কাঁচের জানালার ওপাশে আকাশের শেষ আলোটুকুও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। বাড়ির ভেতরের আলো জ্বলে উঠেছে, কিন্তু সেই আলোও যেন আজ ঘরের ভারী পরিবেশটাকে হালকা করতে পারছে না।
সোফায় বসে আছেন জাহাঙ্গীর আলম। তার মুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর। সোফার একপাশে জাকিয়া চৌধুরী। কিছুটা দূরে বসে আছে ইফতি। সাফওয়ানও আছে, কিন্তু তার মুখেও কোনো হাসি নেই। আরেক পাশে বসে আছে ইরা আর তার পাশে মাথা নিচু করে বসে আছে মাহা।
মাহার গালের লালচে দাগটা এখনো পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। ঘরে কেউ তেমন কথা বলছে না। সবাই শুধু একজন মানুষের অপেক্ষা করছে। তখন কবির কল করে আসতে বললেও নিজের প্রফেশনাল কাজে এতটাই বিজি ছিলো কাব্য যে, বাড়ি আসার সময় হয়নি। এরপর তো ঘটে গেল রোদ আর মাহার এমন একটা কাহিনি।
তারপর থেকে ইরা বেশ কয়েকবার কাব্যকে ফোন করেছে কিন্তু ফোন রিসিভ হয়নি। এরপর আধঘন্টা আগে শেষবার যখন ফোন করলো তখন রিসিভ করেছে কাব্য আর এরপর ফোনে সবকিছু খুলে বলেছে সে। বাড়িতে কী নিয়ে ঝামেলা হয়েছে। জাহাঙ্গীর আলমের আপত্তি। জাকিয়া চৌধুরীর কথাগুলো। মাহার রোদসীর সঙ্গে ঝামেলা। আর সবচেয়ে বড় কথা—
মাহা রোদসীকে ধাক্কা দিয়েছে। প্রথম কথাগুলো আমলে নেয়নি কাব্য, কিন্তু যখন শুনলো রোদ আঘাত পেয়েছে তখন খুব বেশি কথা বলেনি। শুধু একবার বলেছে—
—“ সবাইকে ড্রয়িংরুমে বসতে বল, আমি এখনি আসছি।
এরপর থেকে সকলেই অপেক্ষা করছে কাব্যের জন্য। ইরা সদর দরজার দিকে তাকিয়ে হাতে থাকা ফোনটার দিকে একবার তাকালো - ০৬:১৩ বাজে। আধঘন্টা পেরিয়ে গেছে, আরও কখন আসবে কাব্য?
ওর ভাবনার মাঝেই বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। তার প্রায় কয়েক সেকেন্ড পর প্রধান দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল কাব্য। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
কিন্তু যে মানুষ ওকে ভালোভাবে চেনে, সে বুঝতে পারবে—কাব্যের এই নীরব মুখটাই সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক।
জাকিয়া চৌধুরী সোজা হয়ে বসলেন। জাহাঙ্গীর আলম ছেলের দিকে তাকালেন। মাহাও মাথা আরও নিচু করল। কিন্তু কাব্য কারও দিকে তাকাল না। কেউ তাকে কিছু বলার সুযোগও পেল না। ড্রয়িংরুমে ঢুকেই কাব্য প্রথম প্রশ্ন করলো—
—“রোদ কোথায়?”
কণ্ঠটা শান্ত, অস্বাভাবিক শান্ত। ইফতি দ্রুত বলল—
-----“গেস্ট রুমে। আম্মুর কাছে আছে রোদ।
আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না কাব্য। বাবার দিকে তাকাল না। ফুপি কিংবা মাহার দিকে তাকাল না। বাড়িতে কী হয়েছে, কে কী বলেছে—এসব কিছু জানারও প্রয়োজন মনে হলো না তার। সে শুধু খবরটা নিলো এরপর ঘুরেই দ্রুত পায়ে, প্রায় দৌড়েই সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
উপরতলায় পৌঁছাতে তার খুব বেশি সময় লাগল না। দোতলার করিডোরের শেষ মাথায় গেস্ট রুম। সেখানে গিয়ে এক মুহূর্তও থামল না সে। দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
আর ঠিক তখনই ওর চোখ পড়লো বিছানার উপর। মাথার লম্বা চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে বিছানার উপরে হাটুতে মুখ রেখে চুপ করে বসে আছে রোদ। এক পা দুপা ককরে এগিয়ে গিয়ে ওর সামনে দাঁড়াতেই —
বিছানার ওপর বসে থাকা রোদসী মুখ তুলে তাকাল।
কান্নাভেজা চোখদুটো দেখে ভিতরে কিছু একটা হলো কাব্যের। কথা বলতে গিয়েও পারলো না। মনে হলো কেউ যেন শ্বাসনালী শক্ত করে চেপে ধরে আছে। কিন্তু রোদ থেমে থাকলো না। এতক্ষণ ধরে তো অপমান, লাঞ্ছনা, আঘাতের কষ্টে সে কাঁদছিলই কিন্তু কাব্যকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই তার চোখের ভেতরের জমে থাকা আতঙ্কটা যেন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ল।
আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না সে।
—“মন্ত্রীমশাই!”
বলে ডেকে প্রায় ছুটে গিয়ে কাব্যের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল রোদসী। কাব্য এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।
সে যেন বুঝতেই পারল না কী ঘটল। শুধু বুঝলো কোন এক পনেরো বছরের কিশোরী মেয়ে ঝড়ের বেগে আছড়ে পড়েছে ওর বুকে। তার বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে আছে একটা মানুষ। ছোট্ট একটা মেয়ে।
রোদসীও এতকিছু ভাবতে যায়নি। কাব্য ওর চেনা কেউ নয়, কোন আপন মানুষ নয়, নয় কোন প্রেমিক কিন্তু তবুও এই মানুষটাকে দেখেই সে আর নিজেকে আটকাতে পারেনি। বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েই, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেই বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে।
কাব্যের শরীরটা আরও শক্ত হয়ে গেল। তার হাত দুটো মাঝআকাশে স্থির হয়ে রইল। এই প্রথমবার কোনো একজন মেয়ে এতটা কাছে এসেছে তার। এই মেয়েটা তো তার কেউ নয়। তার স্ত্রী নয়। প্রেমিকা নয়।
কোনো আত্মীয়ও নয়।
সে শুধু একজন অসহায় মেয়ের দায়িত্ব নিয়েছে।
তাহলে—তার বুকের ভেতরটা এমন কেঁপে উঠছে কেন?
ইরা যখন ফোনে বলেছিল—
“ভাইয়া, রোদকে ধাক্কা মেরেছে মাহা আপু।”
কথাটা শোনার পর থেকেই কেন তার ভেতরটা এত অস্থির হয়ে উঠেছিল? কেন বারবার মনে হচ্ছিল মেয়েটা হয়তো কোথাও আঘাত পেয়ে তার মন্ত্রী মশাইকে খুঁজেছে? কেন সে কোনো কথা না শুনে, নিজের প্রফেশনাল কাজের এতবড় একটা মিটিং ফেলে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে এসেছে? কেন গাড়ির প্রতিটা সিগন্যালে তার অসহ্য লাগছিল?
আর এখন—
মেয়েটার চোখের পানি কেন তার বুকের ভেতরে এমন অদ্ভুত একটা যন্ত্রণা তৈরি করছে? জানেনা কাব্য, কিছু জানেনা সে। শুধু জানে এই মেয়েটাকে এখন থামাতে হবে। আর একটু ওর চোখ থেকে পানি পড়লে কাব্য নিজেই বোধহয় মরে যাবে!
কাব্য ধীরে ধীরে হাত তুলল। তারপর এক হাত দিয়ে রোদসীর মাথার পেছনটা আগলে ধরল। আর এক হাত খুব সাবধানে রোদের কাঁধে রেখে ডাকল।
—“রোদ...”
রোদসী কাঁদতে কাঁদতে আরও শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরল কাব্যকে কিন্তু উত্তর দিল না। কাব্যের কপাল কুঁচকে গেল। সে দ্রুত নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল—
-----“কোথাও ব্যথা পেয়েছো?
রোদসী কোনো উত্তর দিল না। তার কান্না আরও বেড়ে গেল। কাব্যের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
সে আবার বলল—
----“রোদ, আমার দিকে তাকাও।
মেয়েটা তাকাল না। কাব্য এবার একটু শক্ত গলায় বলল—
-----“কিছু জিজ্ঞেস করছি তো? বলো না, ব্যথা পেয়েছো?
তবুও কোনো উত্তর নেই। শুধু কাঁদছেই মেয়েটা।
কাব্য এবার সত্যিই অস্থির হয়ে উঠল। তার হাত দুটো অনিচ্ছাসত্ত্বেও রোদসীর শরীরের চারপাশে একটু শক্ত হয়ে গেল। এরপর নরম স্বরে সে ডাকলো।
-----“গুলবাহার! শুনছো আমাকে? মন্ত্রী মশাই কিছু জানতে চাইছে তো, বলো প্লিজ।
ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো। রোদকে ঘরে বসিয়ে রেখে ওয়াশরুমে গেছিলেন
কবিতা চৌধুরী। কিন্তু বেরিয়ে এসে সামনে তাকাতেই থমকে গেলেন তিনি। কয়েক সেকেন্ড সামনের দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তার ছেলে আর তার বুকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ছোট্ট রোদসী। কাব্যের মুখে স্পষ্ট উদ্বেগ। আর রোদসীর মুখ পুরোপুরি লুকানো কাব্যের বুকে। কবিতা চৌধুরীর চোখে মুহূর্তের জন্য বিস্ময় ফুটে উঠল।
তিনি যেন কিছু বুঝতে চাইলেন ওদের দুজনকে নিয়ে কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলেন। এই মুহূর্তে কোনো সম্পর্কের হিসাব করার সময় নয়। একটা আতঙ্কিত মেয়ের নিরাপদ জায়গা খুঁজে নেওয়ার সময় এখন। কবিতা চৌধুরী এগিয়ে এসে শান্ত গলায় বললেন—
------“ও ঠিক আছে কাব্য, তেমন আঘাত পায়নি। কনুইয়ে শুধু একটু ছিলে গেছে, সেখানে ওষুধ লাগিয়েছে ইফতি। তবে সাফওয়ান সময়মতো না ধরলে হয়তো বড় কোন অঘটন ঘটতে পারতো।
কাব্য মায়ের দিকে তাকাল। তার চোখে উদ্বেগ। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল-
------“তাহলে কাঁদছে কেন ও?
প্রশ্নটা করার পরই যেন নিজেই বুঝতে পারল—
এমন একটা প্রশ্নের উত্তর হয় না। সব কান্না কি শুধু ব্যথার জন্যই হয়? রোদসী তখনও চুপ। কাব্য অপেক্ষা করল। একটু সময় দিলো তার বুকের সঙ্গে লেপ্টে থাকা মেয়েটার কান্না কমে আসার জন্য।
ঘরের মধ্যে কয়েক মুহূর্তের নীরবতা। প্রায় দশমিনিট কেটে গেল এভাবে, কবিতা চৌধুরী বেরিয়ে গেলেহ ঘর থেকে এরপর রোদসী কথা বলল -
------“আপনি কই আছিলেন মন্ত্রীমশাই?
কাব্য স্থির হয়ে গেল। রোদসী ধীরে ধীরে মুখ তুলল।
তার চোখ দুটো লাল। কাব্যের দিকে তাকিয়ে সে আবার বলল—
-----“আমারে এইহানে ক্যান রাইখা গেছিলেন? আমি তো আইবার চাই নাই। আপনি লইয়া আইছেন।আনার সময় কইছিলেন কেউ কিছু কইবার পারবো না, আপনি আমারে আগলায়া রাখবেন। তাইলে অহন সবাই আমারে আঘাত দিতাছে ক্যান?ক্যান কয় আমার বাচ্চার বাপ নাই, আমার বাচ্চা নাকি ভালো নয়, জারজ?
শেষ কথাটা বলে আবারও ফুঁপিয়ে উঠলো রোদসী।
কাব্যের নিঃশ্বাস থমকে গেল কিন্তু কোনো উত্তর দিতে পারল না সে।
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মাত্র পনেরো বছরের একটা মেয়ে। যে নিজের জীবনে এত অল্প বয়সেই স্বামী হারিয়েছে। বাবার ঘরে জায়গা হয়নি। নিজের মায়ের কাছেও থাকতে পারেনি। অপরিচিত একটা বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছে। যে মেয়েটা কাউকে বিশ্বাস করতে পারেনা, এখন সেই মেয়েটাই তার বুকে মুখ লুকিয়ে প্রশ্ন করছে—
“আপনি কই আছিলেন মন্ত্রীমশাই?”
কাব্যের বুকের ভেতরে অদ্ভুত এক অনুভূতি জমে উঠল। অপরাধবোধ? রাগ? নাকি দায়িত্বের থেকেও গভীর অন্য কিছু? সে জানে না সেসব কি,শুধু জানে—
কাব্য চৌধুরী কাউকে কথা দিলে, সে কথা সে কখনো ভাঙে না। নিজের জীবন দিয়ে হলেও তা রক্ষা করে।
সে যখন কথা দিয়েছে যে সে রোদকে আগলে রাখবে, তারমানে অবশ্যই রাখবে। আর এই কথাটা এই বাচ্চা মেয়েটাকে বুঝিয়ে দিতে হবে। কাব্য ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে রোদসীর গাল বেয়ে নেমে আসা চোখের পানিটা মুছে দিল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল—
-----“আমার দিকে তাকাও।
রোদসী তাকাল না।
কাব্য আবার বলল—
-----“রোদ, আমার দিকে তাকাও।
এবার ধীরে ধীরে মুখ তুলল মেয়েটা। কাব্য তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর বলল—
-----“আমি ভুল করেছি। তোমার মন্ত্রী মশাই ভুল করেছে, তাকে কি ক্ষমা করা যায় না রোদ?
রোদসী থমকে গেল। কাব্যের কণ্ঠে কোনো অজুহাত নেই। কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনও নেই। শুধু একটা অদ্ভুত শান্ত স্বীকারোক্তি।
-----“তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি আমি। তোমাকে বলেছি, ভয় পেও না। বলেছি, আমি আছি। তারপর তোমাকে একা রেখে চলে গেছি। আজ যা হয়েছে, সেটা হওয়ার কথা ছিল না। তোমাকে কেউ আঘাত করবে, আর আমি দূরে বসে থাকব—এটা হওয়ারও কথা ছিল না। কিন্তু তবুও হয়েছে আর তার জন্য যদি সম্ভব হয়, এই অধম মন্ত্রী মশাইকে তুমি ক্ষমা করে দিও।
রোদসীর ঠোঁট কেঁপে উঠল।
-----“আমি তো কুনো ঝামেলা চাই নাই মন্ত্রীমশাই। আমি কারও বাড়িতে আইয়া কারও লগে ঝামেলা করবার চাই নাই। তবুও সবখানেই আমার লাইগা ঝামেলা হইতাছে।
কাব্য মাথা নাড়ল।
-----“উঁহু, তোমার জন্য কোথাও ঝামেলা হচ্ছে না। তারা নিজেরা নিজেদের নিয়ে ঝামেলায় মেতে উঠেছে, এখানে তোমার কোন দোষ নেই।
রোদসী কিছু বুঝল কি না বোঝা গেল না। সে শুধু অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইল। কাব্য এবার ওকে টেনে বেডের উপরে বসিয়ে দিয়ে, ওর সামনে হাটু গেঁড়ে বসলো। তারপর নরম গলায় বলল -
-----“তুমি আমার কাছে আসতে চাওনি। আমি তোমাকে নিয়ে এসেছি। তাই তোমাকে এখানে নিরাপদ রাখার দায়িত্বও আমার ছিলো কিন্তু আমি ব্যর্থ হয়েছি। তবে আর নয়, এবার থেকে আমি তোমাকে আর এভাবে একা রেখে কোথাও যাব না।
রোদসীর চোখ বড় হয়ে গেল। কাব্য শান্ত গলায় বলতে লাগল—
-----“যেখানে তোমাকে রেখে যাব, সেখানে তোমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই যাব। আর সত্যি যদি সেখানে আমার উপস্থিতি দরকার হয়—তাহলে অবশ্যই আমি থাকব। তোমার পাশে ছায়ার মতো থাকব।
রোদসীর চোখ থেকে আবার পানি গড়িয়ে পড়ল।
কাব্য ধীরে ধীরে বলল—
-----“আর তোমার বাচ্চাকে নিয়ে কেউ আর কোনো কথা বলবে না। কেউ বলবে না ওর বাবা নেই। কারণ তোমার সন্তানের বাবার পরিচয় নিয়ে কারও কথা বলার অধিকার নেই।
রোদসীর ঠোঁট কেঁপে উঠল। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর সে আস্তে বলল—
-----“আমি এইহানে আর থাকুম না মন্ত্রী মশাই।
-----“কেন?
----“আমি আমার বাড়ি যামু।
-----“কোন বাড়ি?
প্রশ্নটা শুনে রোদসী চুপ করে গেল। কাব্য নরম স্বরে বলল—
-----“তোমার বাবা কি তোমাকে নিয়ে যেতে রাজি?
রোদসীর চোখ নেমে গেল। —“না।”
-----“তাহলে?
রোদসী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। চোখ দুটো নিচু। কাব্যের শার্টের যে জায়গাটা একটু আগেও সে শক্ত করে ধরে রেখেছিল, সেদিকেই যেন স্থির হয়ে আছে তার দৃষ্টি। তারপর খুব আস্তে বলল—
-----“আমি অন্য কোন জায়গায় থাকুম। এইহানে আর ভালো লাগে না, হগ্গলে অপমান করে আমারে।
কাব্য কিছুক্ষণ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর শান্ত গলায় বলল—
-----“তাহলে সেই অপমানের পথ বন্ধ করে দাও। এমন কিছু করো যাতে করে লোক তোমাকে অপমান নয় সম্মান করে।
কাব্য কথাটা এমনভাবে বলল যে, রোদসী সঙ্গে সঙ্গে মুখ তুলল। চোখে বিস্ময়।
কাব্য মৃদু হেসে উঠল ওর চাহনি দেখে বুঝলো, কথাটা মেয়েটার মাথার উপর দিয়ে চলে গেছে। তাই ধীরে ধীরে বলল—
-----“তুমি তো গ্রামের মানুষ, তোমাদের গ্রামে কুমোরও আছে শুনেছি।
-----"হুম আছে।
-----"তাহলে সেখানে নিশ্চয়ই মাটির তৈরি জিনিস দেখেছো? মানুষ নরম মাটি পেলেই তা দিয়ে নানারকম শিল্পকর্ম করে, তাই না? মাটির হাঁড়ি বানায়, ফুলদানি বানায়, মাটির গয়না—আরও কতকিছু। এসব কোন বানাতে পারে বলো তো? কারণ মাটি তখন নরম থাকে। তাই যে যেভাবে চায়, সেটাকে সেভাবেই গড়ে নেয়। কিন্তু ইট দিয়ে কি কিছু হয়?
রোদ মাথা নেড়ে বোঝালো, হয়না।
-----"হয়না এটা তো জানো কিন্তু কেন হয়না, সেটা কি জানো?
একটু থামলো কাব্য, তারপর বলল-
-----"হয়না কারণ, সেটা আগুনে পুড়ে শক্ত হয়ে গেছে। মানুষ চাইলেই কিন্তু সেটাকে আর নরম করতে পারে না। উল্টো বালু সিমেন্ট দিয়ে সেটাকে আরও শক্ত মজবুত করে অট্টালিকা বানানো হয়।
কাব্য কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—
-----“তাহলে তুমিও এমন হও, তাহলেই তো হয়ে যায়।
রোদসীর ভ্রু কুঁচকে গেল।
-----“কেমন?
-----“এই যে, শক্ত ইটের মতো। এতটা শক্ত হও, যেন কেউ চাইলেই তোমাকে নিজের মতো করে গড়ে নিতে না পারে।
কথাগুলো খুব ধীরে বলল সে। প্রতিটি শব্দ যেন রোদসীকে বুঝে নেওয়ার সময় দিচ্ছে। প্রায় মিনিট খানেক চুপ থেকে আবার বলল কাব্য -
-----“দেখো জীবন তো একটাই, এই জীবনে আমাদের সমস্যার শেষ নেই। সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্না দিয়ে গড়া আমরা। কিন্তু সুখ আর হাসিটা সহজে আমাদের জীবনে আসে না, ওদেরকে নিমন্ত্রণ করে আনতে হয়। কিন্তু দুঃখ, ওকে কিন্তু আনতে হয়না ও যেন আমাদের নিত্যসঙ্গী। সবসময় ছায়ার মতো লেগে থাকে আমাদের সঙ্গে। কিন্তু সে লেগে থাকবে বলেই যে সারাজীবন তোমাকে দুঃখ পেতে হবে এমন কোন নিয়ম নেই।
বরং মাঝেমধ্যে দুঃখ পাওয়া ভালো। কারণ দুঃখ মানুষকে বাস্তবতা শেখায়, ম্যাচিউর বানায়, যে কোনো পরিস্থিতিতে মনের জোর বাড়ায়।
আবারও থেমে গেল কাব্য।
তার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, যেন এতক্ষণ একনাগাড়ে কথা বলতে বলতে সে খানিকটা হাঁপিয়ে উঠেছে। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে সে রোদের দিকে তাকাল।
মেয়েটা শান্তভাবে বসে আছে। চোখ দুটো স্থির কাব্যের মুখের ওপর। যেন তার বলা প্রতিটা কথা মন দিয়ে শুনছে এবং পরের কথাগুলো শোনার অপেক্ষায় আছে। তা দেখে মৃদু হাসল কাব্য। তারপর শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
-----"রোদ - মানুষ কী বলল, কে তোমাকে পছন্দ করল না, কে অপমান করল—এসবের ওপর যদি তুমি প্রতিবার ভেঙে পড়ো, তাহলে সবাই তোমাকে আরও ভাঙতে চাইবে। কিন্তু তুমি যদি একবার শক্ত হয়ে দাঁড়াও? তাহলে যারা আজ তোমাকে দুর্বল ভেবে কথা বলছে, একদিন তারাই তোমাকে নিয়ে কিছু বলার আগে দশবার ভাববে।
এতক্ষণ পরে কথা বলে উঠলো রোদ।
-----“আমি কি পারুম?
কাব্যের মুখে এবার সত্যিকারের একটা হাসি ফুটে উঠল।
-----“অবশ্যই পারবে।
-----“কেমনে?
-----“একদিনে পারবে না। আজকে একটু শক্ত হবে। কালকে আরেকটু, পরশু আরেকটু। এভাবে শক্ত হতে হতে তারপর একদিন দেখবে, মানুষ তোমাকে কিছু বলছে আর তুমি আগের মতো আর ভেঙে পড়ছো না।
রোদসীর চোখে জল জমে উঠল আবার। এভাবে কেউ তো কখনো বোঝায়নি তাকে, সবাই সবসময় দুরছাই করেছে। অথচ আজ এই মানুষটা কি সুন্দর করে কথাগুলো বলছে।
কাব্য এবার নরম গলায় বলল—
-----“রোদ, তুমি এখন শুধু নিজের জন্য শক্ত হবে না।
তোমার ভেতরে আরেকটা ছোট্ট মানুষ আছে। ও আজ না হোক কাল আল্লাহর হুকুমে দুনিয়ায় তো আসবেই। তখন কিন্তু ও তোমার কাছ থেকেই শিখবে। কিন্তু সেই তুমিই যদি প্রতিটা কথায় ভেঙে পড়ো, প্রতিটা অপমানে পালিয়ে যেতে চাও, নিজেকে শক্ত করে গড়ে তুলতে না পারো - তাহলে ওকে কি শেখাবে বলো তো?
রোদসী অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর খুব আস্তে বলল—
-----“কিন্তু আমার যে ডর করে?
-----“ভয় লাগবেই, সবাই ভয় পায়। এই যে আমি আছি, তোমার মন্ত্রীমশাই - আমিও ভয় পাই। কিন্তু ভয়ের মাঝেও পার্থক্য আছে। কেউ ভয় পেয়ে পিছিয়ে যায়, আর কেউ ভয় নিয়েই সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। এই দুটো ভয়ের মাঝখানে তুমি দ্বিতীয়টা হবে।
রোদসীর ঠোঁটের কোণে খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটল।
কাব্য সেটাই লক্ষ্য করল। তারপর ধীরে বলল—
-----“আর একটা কথা। আজকের মতো কখনো অন্য কোথাও চলে যাওয়ার কথা ভাববে না। কারণ তুমি যদি চলে যাও, তাহলে সমস্যাটা তোমার পেছনেই যাবে।একটা জায়গা থেকে পালালেই সমস্যা শেষ হয়ে যায় না। তাই পালিয়ে যাওয়ার আগে দাঁড়াতে শেখো।
রোদসী ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে এখনও ভয় আছে। কিন্তু সেই ভয়টার ভেতরে যেন এবার সামান্য কিছু একটা জন্ম নিচ্ছে। হয়তো ভরসা। কাব্য মৃদু হেসে প্রশ্ন করলো—
-----“এতক্ষণ যা যা বললাম, সব করতে পারবে তো?
রোদসী কিছুক্ষণ চুপ থেকে খুব আস্তে মাথা নাড়ল।
-----“চেষ্টা করুম।
-----“এই তো। গুড গার্ল। তবে সবার আগে তোমার এই ভাষাটা চেঞ্জ করতে হবে।
------"আমি ভালো করে কথা বলতে পারি মন্ত্রীমশাই কিন্তু গ্রামের ভাষাই ভালো লাগে। তবে আপনি যখন বলছেন, তখন আজ থেকে ভালো করেই কথা বলবো - কথা দিলাম আপনাকে।
কাব্যের মুখে প্রশান্তির ছাপ ফুটে উঠল। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু রোদসীর চোখের ভয়টা তখনও পুরোপুরি যায়নি। কাব্য সেটা বুঝতে পারল। তাই দরজার দিকে যাওয়ার আগে আবার তার দিকে ফিরে বলল—
-----“আমি নিচে যাচ্ছি। তবে ভয় পেও না, তোমাকে একা করে কোথাও যাবো না। নিচে আমার বাবার সঙ্গে কিছু বোঝাপড়া বাকি আছে।
তার চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠল।
-----“ আর মাহার সঙ্গেও।
রোদসীর চোখে সঙ্গে সঙ্গে ভয় ফিরে এলো। কাব্য সেটা দেখে দ্রুত বলল—
----“ একদম ভয় পেও না। তোমাকে নিয়ে আর কেউ কিছু করবে না। ভরসা রাখো আমার ওপর, তোমার মন্ত্রীমশাই সব ঠিক করে দেবে।
রোদসী আর কিছু বলল না। শুধু নিজের পেটের ওপর হাত রেখে ধীরে মাথা নাড়ল। কাব্য কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।
কিন্তু দরজার ওপাশে বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই বদলে গেল কাব্যের মুখের অভিব্যক্তি। কয়েক মিনিট আগেও যে মানুষটা একটা ভীত, অসহায় মেয়েকে শক্ত হতে শেখাচ্ছিল—
এখন তার চোখে সেই নরমতা নেই। তার সামনে এখন আর রোদসী নেই। সামনে আছে বাবা, ফুপির মতো মানুষ আর তার পরিবার।
আর সেই মানুষগুলো—
যাদের সঙ্গে আজ তার কিছু কথা বলা সত্যিই বাকি।
.
চলবে,
[গঠনমূলক মন্তব্য করিও সবাই। তাহলে বুঝতে পারব, গল্পটা কেমন লেগেছে তোমাদের। ]