#রোদ্দুরের_রেশ [ ৫ ]
#আরশিয়া_নূর
[অনুমতি ব্যতিত কপিকরা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ 🚫]
মাঝখানে কেটে গেছে এক সপ্তাহ।
এই একটা সপ্তাহে একবারও রোদের সামনে যায়নি কাব্য। সারাক্ষণ নিজের ক্রীড়া বিষয়ক কাজ নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিল যে, নিজের বাড়িতেও ঠিকমতো সময় দিতে পারেনি। সকাল থেকে মন্ত্রণালয়, মিটিং, ফাইল, বিভিন্ন জেলার ক্রীড়া অবকাঠামো নিয়ে আলোচনা—সবকিছু মিলিয়ে দিনগুলো কখন যে রাত হয়ে যাচ্ছিল, নিজেও বুঝতে পারছিল না।
তবে লোকে বলে না, ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়? কাব্য যদি সত্যিই চাইত, তাহলে এই ব্যস্ততার মাঝেও রোদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারত। পাঁচ মিনিটের জন্য হলেও যেতে পারত। কিন্তু সে যায়নি।
ইচ্ছে করেই যায়নি। কেন যায়নি জানে না কাব্য। সেদিন শফিক মাস্টার কথাগুলো বলে চলে যাওয়ার পর থেকেই যেন ওর মাথার ভেতরটা কেমন গোলমেলে হয়ে আছে। বারবার শুধু ওই একটা কথাই কানে বাজছে—
“তাইলে তুমি নিজেই ওরে বিয়া কইরা নাও না?”
একটা বাচ্চা মেয়ে। মাত্র পনেরো বছরের। ওকে নিয়ে একজন বাবা হয়ে শফিক মাস্টার সেদিন এমন কথা কী করে বলতে পারলেন, সেটাই বুঝতে পারে না কাব্য। নিজের মেয়েকে সমাজের ভয়ে অস্বীকার করে দেওয়া, অথচ সেই মেয়েটা তখন হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিল।
ছোটবেলা থেকেই কাব্য শুনে এসেছে, গ্রামের মানুষ নাকি খুব সহজ-সরল হয়। শহরের মানুষ যতটা কূটবুদ্ধির, গ্রামের মানুষ নাকি ততটাই সোজাসাপ্টা।
কিন্তু শফিক মাস্টার সেদিন কাব্যকে একটা জিনিস খুব ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছেন—
সব সহজ মানুষ, সরল হয় না।
হয়তো গ্রামের অনেক মানুষ সত্যিই সরল। কিন্তু সবাই নয়। কারও কারও সরল মুখের আড়ালেও এমন কঠিন হিসাব লুকিয়ে থাকে, যার কাছে একটা মেয়ের জীবনও সমাজের কথার চেয়ে তুচ্ছ হয়ে যায়।
গতকালও অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছে কাব্য। শরীরটা এতটাই ক্লান্ত ছিল যে, পোশাক বদলানোর পর আর কিছু করার শক্তি পায়নি। এখন নিজের ঘরে বুকের নিচে একটা বালিশ জড়িয়ে উপুড় হয়ে ঘুমিয়ে আছে সে।
সকাল সাতটা পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগে।চৌধুরী বাড়ির নিচতলায় অবশ্য সকাল অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। রান্নাঘরের ব্যস্ততা, কাজের লোকজনের ছোটাছুটি, চায়ের কাপের শব্দ—সব মিলিয়ে বাড়িটা ধীরে ধীরে জেগে উঠেছে।
কবিতা চৌধুরী রান্নাঘরের পাশে দাঁড়িয়ে কাজের মেয়ে মমতাকে দিয়ে কাব্যের পছন্দের কয়েকটা খাবার তৈরি করাচ্ছিলেন। মাঝে মাঝেই নিজে দেখে নিচ্ছিলেন সব ঠিকঠাক হচ্ছে কি না।
এমন সময় ইরা হাই তুলতে তুলতে এগিয়ে এলো।
-----“আম্মু, কী করছো?
কবিতা চৌধুরী পেছন ফিরে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন
-----“এই তো, কিছু খাবার তৈরি করছিল মমতা। সেগুলোই দেখছিলাম।
ইরা এগিয়ে এসে টেবিলের ওপর সাজানো খাবার গুলোর দিকে তাকাল। সকালের জন্য নিয়মিত যেসব খাবার থাকে, সেগুলো তো আছেই। তার মাঝেই হঠাৎ একটা বিশেষ খাবারের দিকে চোখ পড়তেই ইরা ঠোঁট উল্টে তাকাল মায়ের দিকে। মেয়ের মুখ দেখে হেসে ফেললেন কবিতা চৌধুরী।
----“ছানার পায়েস দেখে লোভ হচ্ছে জানি কিন্তু চিন্তা করিস না, সবার জন্যই বানিয়েছি। যতই কাব্যের পছন্দের খাবার হোক না কেন, জানতাম তুই ভাগ বসাবি। তাই বেশি করে বানিয়েছি। এখন এভাবে ঠোঁট উল্টানোর কিছু নেই। ফ্রেশ হয়ে আয় তোকেও দিচ্ছি।
সঙ্গে সঙ্গে মুখটা স্বাভাবিক হয়ে গেল ইরার। খুশি হয়ে খাবারের দিকে তাকাতে তাকাতেই হঠাৎ কী মনে হতে বলল—
-----“রোদের জন্য আজ একটু ছানার পায়েস নেবে আম্মু ? আজ তো ওকে রিলিজ করে দেবে। তারপর মেয়েটাকে কোথায় রাখবে, ভাইয়া কী করবে, কে জানে! তাই বলছিলাম আরকি, একটু দেবে এসব খাবার ?
------“ওকে এত মাথায় তোলার কী আছে, সেটাই তো বুঝতে পারছি না আমি। তিনদিন হলো এই বাড়িতে এসেছি। অথচ আসার পর থেকে দেখছি, তোমরা মা-মেয়ে মিলে ওই গাঁয়ের মেয়েটার পেছনে পড়ে আছো। এমনভাবে ট্রিট করছো ওকে, যেন কাব্য সত্যিই বিয়ে করে নিয়েছে ওকে!
হঠাৎ করেই এমন কথা শুনতেই পিছনে ফিরে তাকালো ইরা। দেখলো সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসছে জাকিয়া চৌধুরী আর মাহা।
জাকিয়া চৌধুরীর এমন কথা শুনে ভেতরে ভেতরে বেশ বিরক্ত হলো ইরা। কিন্তু জাকিয়া তো তার ফুপি। তার ওপর মায়ের মতো একজন মানুষ। তাকে সরাসরি অসম্মান করা ইরার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই খুব একটা কথা বাড়াল না সে। তবে একেবারে চুপ করেও থাকল না। শান্ত গলায় বলল—
-----“দেখো ফুপি, রোদসী গ্রামের বলেই যে তাকে অবহেলা করতে হবে, এটা কোথায় লেখা আছে? গ্রামের মানুষরা কি মানুষ না? নাকি ওরা কোনো জন্তু-জানোয়ার? আব্বু তো কখনো আমাদের এভাবে শিক্ষা দেয়নি, যে কেউ শুধু গ্রামের বলে তাকে ছোট করতে হবে বা অবহেলা করতে হবে।
ইরার কথায় যেন আগুনে ঘি পড়ল। তেতে উঠলেন জাকিয়া চৌধুরী।
------“কবিতা, তোমার মেয়েকে সামলাও। ও কি আদব-কায়দা ভুলে গেছে নাকি? আমি যে ওর বাবারও বড়, সেটা কি ও জানে না? ওর বাবাও আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলার সাহস পায় না, আর ও আমাকে কীভাবে কথা শোনাচ্ছে?
ইরা আর কথা বাড়াল না। ও বেশ ভালো করেই জানে, এই মানুষটার সঙ্গে যুক্তি দিয়ে কথা বলে কোনো লাভ নেই। বরং যত কথা বলবে, ততই বিষয়টা বাড়বে।
তবুও মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।
ফুপিরা যেন তাড়াতাড়ি চলে যায়। বছরে ছয় মাসে একবার আসে, তাও দশ-পনেরো দিনের জন্য। অথচ এই কটা দিনেই যেন মায়ের মাথার ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যায়। বাড়িতে এলেই একটার পর একটা বিষয়ে নাক গলানো, সমালোচনা করা, অশান্তি তৈরি করা—সব মিলিয়ে মায়ের হাড়-মাস জ্বালিয়ে খায় এরা।
ইরা আর কিছু না বলে সেখান থেকে সরে যেতে নিল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে কবিতা চৌধুরী ডাকলেন—
-----“ইরা শোন।
ইরা মায়ের দিকে তাকাল।
-----“কফিটা কাব্যের কাছে নিয়ে যা তো। নটার দিকে নাকি ওর একটা জরুরি মিটিং আছে। ডেকে কফিটা দিয়ে আয়। আর বলিস, আমি ব্রেকফাস্ট রেডি করছি।
—“আচ্ছা।”
ইরা কফির কাপটা নিতে এগোতেই তার আগেই মাহা এগিয়ে এলো।
-----“মামি, আমাকে দাও। আমি দিয়ে আসছি।
কবিতা চৌধুরী একটু অবাক হয়ে তাকালেন।
----“তুমি কেন যাবে? তুমি টেবিলে বসো, ব্রেকফাস্ট দিচ্ছি। ইরাই পারবে।
মাহা হেসে বলল—
-----“সমস্যা নেই। তিনদিন হলো এসেছি, কাব্যের সঙ্গে তো দেখাই হয় না। আজ যদি কফির সুযোগে একটু দেখতেও পাই ওকে! দাও না আমাকে।
কবিতা চৌধুরী আর কিছু বললেন না। হাতের কফির কাপটা মাহার দিকে এগিয়ে দিলেন। মাহা কাপটা হাতে নিতেই মুখে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল সে। একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না। সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে তার চোখেমুখের সেই হাসিটা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
তিনদিন ধরে কাব্যকে ঠিকমতো দেখাই হয়নি। আজ অন্তত কফির অজুহাতে একটু দেখা হবে। আর কাব্যকে দেখার সেই সুযোগটা কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চায় না মাহা। করিডোর পেরিয়ে কাব্যের ঘরের সামনে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে। দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ নয়, একটু ফাঁক হয়ে আছে।
ভেতরে উঁকি দিতেই তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল। ঘরের পর্দা টানা। সকালের নরম আলোটা পর্দার ফাঁক গলে এসে বিছানার একপাশে পড়েছে। সেই আলোতেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কাব্যকে।
খালি গায়ে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে মানুষটা। বুকের নিচে একটা বালিশ। ঘুমের কারণে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালের ওপর ছড়িয়ে আছে। মুখজুড়ে ক্লান্তির ছাপ, অথচ ঘুমন্ত অবস্থাতেও মানুষটাকে কেমন অসম্ভব শান্ত আর গম্ভীর লাগছে। মাহা দরজার কাছে দাঁড়িয়েই স্থির হয়ে গেল।
কতদিন পর এত কাছ থেকে কাব্যকে দেখছে! ঘুমন্ত কাব্যকে দেখে তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই মুগ্ধ একটা হাসি ফুটে উঠল। চোখ সরাতে পারল না কিছুতেই। ছোটবেলা থেকেই এই মানুষটাকে দেখেছে সে। বয়সে বড়, পরিবারের সবার প্রিয়, নিজের মতো করে থাকা সেই কাব্য।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাব্য তার কাছে শুধু মামাতো ভাই কিংবা পরিবারের একজন মানুষ হয়ে থাকেনি। কখন যে সেই শ্রদ্ধা, ভালো লাগা আর মুগ্ধতা গিয়ে ভালোবাসায় আটকে গেছে, মাহা নিজেও জানে না। এই মানুষটাকে ভীষণ ভালোবাসে সে, ভীষণ। জাকিয়া চৌধুরীও জানে এই বিষয়ে, তাই তো উনি বেশ আদর করে কাব্যকে।
তবে এই ভালোবাসার কথা কাব্য জানে না। সামনে কাব্যের জন্মদিন, সেদিন কাব্যকে নিজের মনের কথা বলবে বলেই ঠিক করেছো সে। মাহা ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে ঢুকল। কফির কাপটা পাশের টেবিলে রেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল বিছানার পাশে।
তার চোখ আটকে রইল কাব্যের মুখে। মনে হলো, মানুষটা জেগে থাকলে যতটা দূরের মনে হয়, ঘুমন্ত অবস্থায় ঠিক ততটাই আপন লাগে। মাহার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন নরম হয়ে গেল। ইচ্ছে করল হাত বাড়িয়ে কপালের ওপর পড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দেয়। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল।
না। এই অধিকার তার নেই। কাব্য তাকে কখনো সেই অধিকার দেয়নি। যখন দেবে তখন সে নিজে মনপ্রাণ উজাড় করে ভালোবাসবে কাব্যকে, ততদিন নয়তো নিজেকে একটু দূরে রাখলো সে। মুচকি হাসলো মাহা, বেডসাইড টেবিলে কফিটা রেখে এগিয়ে গিয়ে ঘরের পর্দাগুলো সরিয়ে আস্তে করে ডাকল—
—“কাব্য?”
কাব্য নড়ল না। মাহা এবার একটু জোরে ডাকলো—
-------“কাব্য,শুনছো তুমি? উঠো।
কাব্য ধীরে ধীরে নড়েচড়ে উঠল। ঘরের পর্দাগুলো সরিয়ে দেয়ার কারণে আলো চোখে পড়তেই কয়েক সেকেন্ড পর চোখ মেলে তাকাল সে। ঘুমজড়ানো চোখে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মাহাকে দেখে ভ্রু কুঁচকে গেল তার। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে উঠে বসে বলল—
------“মাহা তুই?
মাহা মৃদু হেসে বলল—
-----“হুম, আমি।
------“কবে এসেছিস তুই? আর একা এসেছিস নাকি? সাফওয়ান আসেনি?
মাহা একটু থেমে বলল—
------“ না, ভাইয়া হয়তো আগামীকাল আসবে। আর আমি একা আসিনি। গত পরশু রাতে আম্মুর সাথে এসেছি।
কাব্য পাশের টেবিলের দিকে তাকিয়ে কফির কাপটা দেখতে পেল।
------“এসেই আমার ওয়েটার হয়ে গেছিস?
মাহা মৃদু হেসে বলল—
-----“সেটা তো সবসময় হতে চাই কিন্তু তুমি তো আমাকে দেখই না।
কাব্য মাহার কথাটার বিশেষ কোনো অর্থ খুঁজল না। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল—
------“ কফি তো দেয়া হয়ে গেছে, এখনো দাড়িয়ে আছিস কেন? কিছু বলবি?
মাহা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মনে পড়তেই বলল—
------“তোমার নাকি নটার সময় মিটিং আছে?
—“হুম।”
-----“মামি বলল তৈরি হয়ে নিচে যেতে। ব্রেকফাস্টও রেডি করছে।
কাব্য ঘড়ির দিকে তাকাল।
-----“আচ্ছা যাচ্ছি। তুই যা এখন। আর ইরাকে একটু পাঠিয়ে দিস আমার ঘরে, বলিস এখনি যেন আসে।
খুব স্বাভাবিক কিছু কথা। কোনো বাড়তি আগ্রহ নেই।
কোনো অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন নেই। যেন মাহা তার পরিবারের আর দশজন মানুষের মতোই একজন—যার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা যায়, কিন্তু যার চলে যাওয়া বা থাকা কাব্যের মনে কোনো আলাদা রেখাপাত করে না।
মাহা হতাশ হলো। ভেবেছিল সবসময় ওয়েটার হয়ে থাকতে চাই বলায় কাব্য হয়তো কিছু বলবে। ওকে নিয়ে নিজের বিষয়ে নিশ্চয়ই কিছু বলবে কিন্তু কাব্য যেন ওর সকল আশায় এক বালতি পানি ঢেলে দিলো। তবে মন খারাপ হলেও মুখে হাসিটা ধরে রাখল সে।
------"কিরে এমন সং সেজে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? আমি তৈরি হবো, যা এখান থেকে?
------“আচ্ছা যাচ্ছি।
কথাটা বলেই দরজার কাছে গিয়ে আবার একবার পেছনে তাকাল মাহা। কাব্য তখনও বিছানায় বসে কফি খাচ্ছে। চোখে সেই চিরচেনা উদাসীনতা। তার পৃথিবীতে কত মানুষ আছে, কত দায়িত্ব আছে—মাহা জানে। কিন্তু সেই পৃথিবীর কোথাও যে তার জন্য আলাদা একটা জায়গা নেই, সেটাও সে জানে। তবুও ভালোবাসা কি আর হিসাব বুঝে আসে? যে মানুষটা তাকে কখনো নিজের করে দেখেনি, তাকেই এত বছর ধরে নিজের সমস্ত অনুভূতির কেন্দ্র করে রেখেছে সে।
তবুও মাহার ঠোঁটে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল। আর তো মাত্র চার মাস, এরপর কাব্যের জন্মদিন। সেদিন ও কাব্যকে ভালোবাসার কথা নিশ্চয়ই বলবে, তখন নিশ্চয়ই কাব্যও ওকে ভালোবাসবে। একদিন এই মানুষটাও আমার দিকে বোন নয়, অন্য কোনো চোখে তাকাবে? বেশ সুখের একটা সংসার হবে ওদের।
এসব ভেবে আবারও মুচকি হাসলো সে। তারপর খুশিমনে বেরিয়ে গেলো কাব্যের ঘর থেকে।
________________________________________
দুপুর বারোটা বাজে।
হাসপাতালের কেবিনে অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে আছে। জানালার পর্দা ভেদ করে দুপুরের তীব্র আলো এসে বিছানার একপাশে পড়ে আছে, অথচ সেই আলোতেও রোদসীর মুখে কোনো উজ্জ্বলতা নেই।
সাদা চাদর বিছানো বিছানা টায় চুপচাপ বসে আছে সে।
পরনে সুন্দর একটা গোল জামা। দুদিন আগে জামাটা কবিতা চৌধুরী ওকে দেখতে এসে পরিয়ে দিয়েছিলেন। শ্যামলা চেহারায় বেশ মানিয়ে গেছে ঢিলেঢালা জামাটা। কিন্তু এই সাতটা দিন কাব্য একবারও আসেনি। রোদসী জানে না কেন আসেনি সে কিন্তু মনে মনে বারবার চেয়েছে—একবার যদি মন্ত্রী মশাইকে দেখা যেত! একবার যদি মানুষটা এসে দাঁড়াত তার সামনে! কিছু বলত না, শুধু দূর থেকে দেখলেও হয়তো বুকের ভেতরটা একটু শান্ত হতো।
কিন্তু সে আসেনি। সেদিন বাবার সঙ্গে মন্ত্রী মশাইয়ের কী কী কথা হয়েছিল, তার সবটাই মায়ের মুখে শুনেছে সে। বাবা তাকে বাড়িতে নিতে চাননি। সমাজের ভয়, মানুষের কথা—সবকিছুই বাবার কাছে তার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেইজন্য কি মানুষটা আসেনা নাকি বাবার মতো তারও মনে হয়েছে রোদ তার জীবনে বোঝা হতে পারে - তাই সে আসেনি।
কোনো কিছু জানেনা সে। ওর মাও পরদিন চলে গেছে, মন্ত্রীমশাইয়ের ডাক্তার বোন ওকে বলেছে মন্ত্রী মশাই নিজেই ওর মাকে পাঠিয়ে দিয়েছে। এরপর থেকে ও একা, এই অচেনা জায়গায়, অচেনা এত মানুষের ভীড়ে মেয়েটা একা। আজ তাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু তারপর? কোথায় যাবে সে?
রিফাত তো আসেনি। যে মানুষটার হাত ধরে এতকিছু সহ্য করে, এত অপমান মাথায় নিয়ে, এত স্বপ্ন দেখে সে বিয়েটা করেছিল—সেই মানুষটাই আজ নাকি দুনিয়ায় নেই। আর কোনোদিন আসবেও না। ভেতর থেকে একটা চাপা কষ্ঠ যেন উথলে উঠছে। গলা পর্যন্ত এসে আটকে গেল কান্না।
রোদসী ধীরে ধীরে নিজের পেটের ওপর হাত রাখল।
তার ভেতরে একটা ছোট্ট প্রাণ ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে।
তার সন্তান। রিফাতের সন্তান। সেই অভিশপ্ত ভালোবাসার একটা ছোট্ট অংশ, কথাটা মনে হতেই
চোখের কোণে জমে থাকা পানিটা এবার গড়িয়ে পড়ল।
এই সাতটা দিনে কবিতা চৌধুরী তাকে কতটা আপন করে নিয়েছেন! নিজের হাতে খাইয়েছেন, মাথায় হাত বুলিয়েছেন, কথা বলেছেন। মায়ের মতো আদর স্নেহে ভরিয়ে তুলেছেন।
অথচ তার নিজের মানুষগুলো? তারা কেউ নেই।
একজন বাবা আছে, কিন্তু মেয়েকে নিজের ঘরে নিতে চায় না। একজন স্বামী ছিল, কিন্তু সে আর পৃথিবীতেই নেই। একজন মা আছে, কিন্তু তাকেও মেয়েকে একা রেখে চলে যেতে হয়েছে। আর সে?সে শুধু মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো দিকেই তার যাওয়ার জায়গা নেই।
রোদসী ধীরে ধীরে পেটের ওপর হাতটা একটু শক্ত করে রাখল। ঠোঁট কাঁপছে। তারপর খুব আস্তে, যেন সত্যিই পেটের ভেতরের ছোট্ট মানুষটার সঙ্গে কথা বলছে, এমনভাবে ফিসফিস করে বলল—
-----“বাজান? তুই কে? আমার রাজপুত্তুর নাকি রাজকন্যা?কে তুই? তুই কি আমার আন্ধার রাইতের চান? কে তুই?
কথাটা বলতে বলতে চোখের পানি আবার গড়িয়ে পড়ল। বুকের ভেতর জমে থাকা কত কথা যেন একসঙ্গে বেরিয়ে এলো ওর কন্ঠে।
------“কোন দুঃখে আইলি আমার পেটে? আল্লাহ তোরে দেওনের মতো আর কি কোন মানুষ পাইলো না? আমার মতো অভাগীরেই চোখে পড়লো তোর?
কথাটা বলেই থেমে গেল রোদসী। কান্নাটা গিলে ফেলার চেষ্টা করল। বুকের ভেতরটা শক্ত করে চেপে ধরে কয়েকবার গভীর শ্বাস নিল সে কিন্তু নিজেকে সামলাতে পারল না। কিছু কষ্ট থাকে যেগুলো গিলে ফেলা যায় না।
রোদসীর ঠোঁট কেঁপে উঠল। পরক্ষণেই বুকের ভেতর জমে থাকা কান্নাটা হঠাৎ বাঁধ ভাঙা পানির মতো বেরিয়ে এলো।
-----“আমি তো তোরে ভালা একটা জীবনও দিতে পারমু না রে। তোর বাপ নাই। তোর নানার বাড়ি নাই। তোর মায়ের নিজেরই কোনো ঠিকানা নাই, এই পোড়া কপালী কি দিবো তোরে? জানোস, মানুষ কয় বিয়া করা নাকি ফরজ? একবার বিয়া করলে মাইনষের জীবন নাকি ফুলে ভইরা ওঠে। স্বামী থাকে, সংসার থাকে, ম্যালা ভালোবাসা থাকে। কিন্তু! কিন্তু আমি তো অন্য কিছু জানলাম রে বাপ। দুনিয়াতে বিয়ার মতো জঘন্য জিনিস আর একটাও নাই।
কণ্ঠটা এবার আরও ভেঙে গেল। পেটটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো, মনে হলো পেটের অনাগত বাচ্চাটাকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরার চেষ্টা করছে সে।
------“হেইদিন তোর বাপরে ভালোবাইসা যদি আমি বিয়াডা না করতাম, তাইলে আইজ হয়তো আমিও একটু ভালা থাকবার পারতাম। তোর বাপরে আমি ভালোবাসছিলাম রে, অনেক ভালোবাসছিলাম। ভাবছিলাম, ও আমারে নিজের কইরা রাখবো। আমারে কেউ কুনোদিন কষ্ট দিবার পারবো না। কিন্তু দেখ, তোর বাপও রইলো না। আর তোর মাও কারও ঘরের ঘরণী হইবার পারলো না।
হঠাৎ নিজের কথাতেই থেমে গেল রোদসী। কপালটা নিচু করে পেটের ওপর ঠেকিয়ে দিল।
-----“তোর মা কত অভাগী জানস? যেই মানুষডা তোর মায়ের এত ভালা করলো, হেই ফেরেশতার মতো মন্ত্রী মশাইও তোর মায়ের লাইগা অপমানিত হইলো। তুই ক তো বাপ, কোন মুখে ওই মানুষডার কাছে মাপ চামু আমি? ক্যামনে খাড়ামু তার সামনে?
কথাটা বলেই আর এক মূহুর্ত শান্ত হয়ে থাকতে পারলো না, বিছানা থেকে নেমে মেঝেতে বসে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠল সে। এতক্ষণ কাঁদলেও নিজেকে সামলানোর যে চেষ্টাটা করেছিল, তা যেন এক মুহূর্তে তার সব বাঁধ ভেঙে দিল।
কাঁধ কাঁপছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। চোখের পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে পরনের পোশাক। আর ঠিক তখনই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না।
কাব্য। এতক্ষণ ধরে দরজার সামনে দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সে। এই সাতদিন আসেনি, কিভাবে দাঁড়াবে ওর সামনে এসব ভেবেই অস্বস্তি হচ্ছিল খুব। কিন্তু এরপর যখন দেখলো মেয়েটা পেটের ওপর হাত রেখে নিজের সন্তানের সঙ্গে কথা বলছিল। তারপর হঠাৎ কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে বসে পড়ল।
কাব্যের বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল।
আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। দ্রুত এগিয়ে এসে রোদসীর সামনে মেঝেতেই বসে পড়ল সে।
তারপর কোনো কথা না বলে দুহাত বাড়িয়ে মেয়েটাকে নিজের বুকের কাছে আগলে নিল। রোদ প্রথমে বুঝতেই পারল না কী হচ্ছে। কিন্তু কাঁদতে কাঁদতে মাথা তুলে তাকাতেই দেখলো কাব্যকে। মানুষটার চোখও ছলছল করছে।
মন্ত্রী মশাই। সাতদিন পর এসেছে, সত্যিই এসেছে।
এতদিন ধরে যে মানুষটাকে একবার দেখার জন্য বুকের ভেতরটা ছটফট করেছে, সেই মানুষটা এখন ঠিক তার সামনে। আর এই মানুষটাকে দেখেই এই সাতদিনের জমে থাকা সব কষ্ট একসঙ্গে বেরিয়ে এলো। কাব্যের শার্ট দুহাতে আঁকড়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল—
-----“আপনে আইছেন মন্ত্রীমশাই? শেষ পর্যন্ত আইছেন? মনে পড়ছে এই কালী মাইয়াডার কথা?
কাব্যের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। সে কোনো উত্তর দিল না। রোদসী এবার মুখ তুলে তাকাল। চোখ দুটো কান্নায় ফুলে গেছে। নাক লাল হয়ে আছে। ঠোঁট কাঁপছে।
-----“কই আছিলেন কনতো? ক্যান আসেন নাই এই কয়দিন? জানেন এই কয়দিন কতবার খুঁজছি আপনেরে? বারবার দরজার দিকে তাকাইছি। ভাবছি, এইবার বুঝি আপনে আইবেন। নার্স আইছে, ডাক্তার আইছে, ম্যালা মানুষজন আইছে কিন্তু আপনে আসেন নাই। আপনে তো কইছিলেন আমার বাপ, আমার স্বামী সবাইরে আইনা দিবেন। আপনে নাকি ম্যাজিক জানেন।
কথাগুলো বলতে বলতেই থামলো সে। তারপর কান্নার মাঝেও অসহায় একটা হাসি হেসে বলল-
------“সত্যিই ভালো ম্যাজিক জানেন আপনে! আমারে কথা দিয়া এমন এক ম্যাজিক করলেন যে তাগোরে আনবার যাইয়া আপনেই হাওয়া হইয়া গেলেন?
কথাটা শুনে কাব্যের বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারলো না মেয়েটার এই কান্না কেন তার সহ্য হচ্ছে না? মনে হচ্ছে এই মূহুর্তে ওকে যদি একটু হাসাতে পারতো! সব কষ্ট যদি সত্যি ভুলিয়ে দিতে পারতো। রোদের এত জোরে কান্নার শব্দে আশেপাশের হাসপাতালে আসা মানুষগুলো জড়ো হয়েছে দরজার সামনে।
সেদিকে কোন খেয়াল নেই রোদের, সে কাব্যের শার্টটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
-----“আমি কি ম্যালা ভারী, মন্ত্রীমশাই?যে সবাই আমারে ঘাড় থাইকা ঝাইড়া ফালানোর জন্য মগ্ন হইয়া গ্যাছে?
বাপ আমারে ঘরে নেয় না। স্বামী আমারে ফালাইয়া মইরা গেল। মা আমার লগে থাকতে পারলো না। আর আপনে”
কথাটা বলতে গিয়ে গলা আটকে গেল তার। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ফিসফিস করে বলল—
----“আপনেও আইলেন না। আমি কি সত্যি এত খারাপ মানুষ মন্ত্রীমশাই?
কাব্য কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। কোনো উত্তর দিতে পারল না। কারণ এই প্রশ্নের উত্তর যে তার কাছেও নেই। একটা পনেরো বছরের মেয়ে। যে নিজের জীবনের সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার বয়সই এখনো পায়নি, অথচ তাকে একসঙ্গে স্ত্রী, মা, বিধবা, পরিত্যক্ত মেয়ে—কতগুলো পরিচয়ের বোঝা মাথায় তুলে দেওয়া হয়েছে।
আর সে? সে কী করেছে? ওকে বাঁচিয়েছে ঠিকই। কিন্তু তারপর সাতটা দিন নিজেই দূরে থেকেছে। কাব্যের বুকের ভেতর অপরাধবোধটা আরও ভারী হয়ে উঠল।
সে ধীরে রোদসীর দুটো কাঁধ ধরে নিজের দিকে তাক করল।
-----“আমার দিকে তাকাও।”
রোদসী তাকাল না। কাব্য একটু নরম গলায় বলল—
-----“রোদ, আমার দিকে তাকাও।
ধীরে ধীরে চোখ তুলল মেয়েটা। কাব্য কয়েক মুহূর্ত ওর চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল—
----“তুমি কোনো বোঝা নও। তুমি কারও জন্য ভারী নও। তোমার সঙ্গে যা হয়েছে, তার কোনোটার জন্যই তুমি দায়ী নও।
কাব্যের গলায় অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।
-----“তোমার বাবা তোমাকে বাড়িতে নেয়নি, সেটা তোমার দোষ না। তোমার স্বামী মারা গেছে, সেটাও তোমার দোষ না। আর আমি সাতদিন তোমার সামনে আসিনি—সেটার জন্যও তুমি নিজেকে দায়ী করবে না।
শেষ কথাটা বলতে গিয়ে কাব্য নিজেই থেমে গেল।
রোদসী অবাক হয়ে তাকাল। কাব্য রোদের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিল।
----“আমি আসিনি কারণ...”
কথাটা শেষ করতে পারল না। কী বলবে? বলবে, যে সে নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে বুঝতে পারেনি? এটা বলবে, যে সেদিন শফিক মাস্টারের কথা তাকে অদ্ভুতভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল? নাকি এটা বলবে,
যে এই মেয়েটার সামনে দাঁড়ালে তার নিজের মনেই এমন কিছু প্রশ্ন জেগে উঠে, যার উত্তর সে দিতে প্রস্তুত নয়?
কিভাবে বলবে এসব?এসব কি বলা যায়! রোদ কতক্ষণ তাকিয়ে রইলো কাব্যের দিকে। তারপর খুব শান্তস্বরে বলল-
------“জানেন মন্ত্রীমশাই, আমার বাজানরে একদিন কইতে হুনছিলাম - আমি আমার শালুকরে একটা জ্যান্ত পুতুলের মতো বড় করছি, নিজের জীবনের সব রঙ দিয়া শালুকের জীবনডা রঙিন বানাইছি। হেরপর একদিন ভালো একটা পোলা দেইখা হ্যারে ভালো রাখার কথা দিয়া বিদায় করুম। আমার মাইয়া যদি কুনোদিন কাউরে পছন্দ করে তাইলে নিজে খারায়া হ্যারে বিয়া দিমু। মাইনা লমু সব কিন্তু আইজ দেহেন সেই বাজানের জ্যান্ত পুতুলের কোনো ঠাই নাই। বাজান দেহে নাই তার জ্যান্ত পুতুল, তার আইজ এই বিপদের সময় অসহায় হইয়া তার দিকে চাইয়া রইছে কিন্তু হেয় আমারে একবার দেখবারও আইলো না।
ওর কথা শুনে মন খারাপ হলো কাব্যের। ও আলগোছে রোদের চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল-
-------“দুনিয়ায় তো কত কিছুই ঘটে রোদ। কেউ বাবা হারায়, কেউ মা হারায়, কেউ সন্তান, কেউ সবকিছুই হারায় কিন্তু এতটা কি ভেঙে পড়ে বলো তো? কখনো পড়েনা। কারণ, ওই উপরে যিনি আছেন, তিনি ঠিক তাদের উপরে রহমত নাজিল করে। তাদের সামলানোর মতো কাউকে না কাউকে পাঠায়। তাহলে তুমি কেন এভাবে ভেঙে পড়ছো? তোমার কি ওই খোদার উপর ভরসা নেই?
তাচ্ছিল্যের হাসলো রোদ।চোখের কোণে তখনও পানি জমে আছে। তবু সেই পানির আড়ালেও যেন নিজের ভাগ্যের প্রতি একরাশ অভিমান।
------"ভরসা তো করি মন্ত্রীমশাই। কিন্তু আপনে যা গো কথা কইলেন, তাগোর সবকিছু হারায় যায় তাই হেরা কষ্ট সহ্য করে কিন্তু আমার তো কিছু হারায় নাই। আমার বাপ আছে, মা আছে, ছুডু একটা বইন আছে, তাইলে আমি কষ্ট করুম ক্যান? আমার যাওনের জায়গা লইয়া চিন্তা করা লাগবো ক্যান? হেয় তো বাপ, হেয় পারলো না আমার তার বুকে একবার টাইনা নিবার, ক্যান আইলো না? আমি কি হের মাইয়া নই?
কাব্যের বুকটা ধক করে উঠল। ও যত চেষ্টা করছে মেয়েটাকে শান্ত করার, তত যেন ওর কষ্টগুলো বাড়ছে - কমার কোন নামই নেই। কী বলবে বুঝতে পারল না সে।
একটা বাবার কাছ থেকে নিজের মেয়ের যে সামান্য আশ্রয়টুকু পাওয়ার কথা ছিল, সেটুকুও পায়নি মেয়েটা। অথচ কাব্য তাকে কীভাবে বোঝাবে—সব বাবা একরকম হয় না?
রোদসী আবার বলল—
-----“জানেন, রাইতে ঘুমাইতে গেলে বাজানের কথা মনে হইছে। সকালে উঠলে মনে হইছে রিফাত আইবো। দরজার দিকে তাকাইছি। কিন্তু কেউ আহে নাই।
কাব্য মন দিয়ে ওর সব অভিযোগ শুনলো। এরপর টেনে দাঁড় করিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বলল-
-----“রোদ, তোমার বাবা তোমাকে নেয়নি বলে তোমাকে কোথাও যেতে হবে না—এমন না। তিনি নেই তো কি হয়েছে আমরা তো আছি?
রোদসী সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
-----“না মন্ত্রীমশাই। আপনে খালি আমারে একবার গায়ে যাওনের ব্যসস্থা কইরা দেন, হেরপর বাকিডা আমি বুইঝা নিমু। আমি কারও ঘাড়ে বোঝা হইবার চাই না।
কাব্য কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল—
-----“তুমি বোঝা নও। আর কারো দয়ার পাত্রীও নও। তোমার বয়স মাত্র পনেরো। এই বয়সে তোমার মতো একটা মেয়ের নিজের থাকার জায়গা, খাবার, নিরাপত্তা—এসব নিয়ে চিন্তা করার কথা না। এগুলো বড়দের দায়িত্ব। আর তুমি কারও ঘাড়ে চড়ে বসতে যাচ্ছ না। তোমার পাশে দাঁড়ানো যদি কারও দায়িত্ব হয়, তাহলে সেটা দায়িত্ব হিসেবেই থাকবে। দয়া হিসেবে না।
রোদ কাব্যের কথাগুলো শুনলো, কিন্তু পুরোপুরি যেন বিশ্বাস করতে পারলো না। চোখের পানি মুছে ধীরে ধীরে মাথা তুলল সে।
----“কিন্তু আপনে আমারে সাহায্য করবেন ক্যান? এমনিতেই তো ম্যালা সাহায্য করলেন? আর কত করবেন? তাছাড়া আপনের পরিবার কী কইবো? সমাজের মানুষ কী কইবো? একটা পরের বাড়ির মাইয়ারে আপনে নিজের লগে রাখবেন, মানুষজন কি চুপ থাকবো?”
কাব্য কিছু বলার আগেই রোদসী আবার বলল—
----“আর আমি কোন পরিচয়ে থাকুম আপনের লগে?
কাব্য কিছু বলতে নিলো, ঠিক তখনই কেবিনের দরজার দিক থেকে নরম একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—
------“আমার মেয়ের পরিচয়ে থাকবে তুমি।
দুজনেই একসঙ্গে পেছনে তাকাল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন কবিতা চৌধুরী। তার হাতে কিছু কাগজপত্র। পাশে ইরা। হাসপাতালের রিসেপশনে এতক্ষণ রোদসীর রিলিজের কাগজপত্রের কাজই করছিলেন তারা। কবিতা চৌধুরী ধীরে ধীরে ভেতরে এসে রোদসীর পাশে দাঁড়ালেন।
-----“তুমি যদি এই বাড়িতে থাকো, তাহলে কারও দয়া নিয়ে থাকবে না মা। আমার মেয়ের পরিচয়ে থাকবে।
রোদসী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। কবিতা চৌধুরী মৃদু হেসে তার মাথায় হাত রাখলেন।
-----“তুমি কি মনে করো, মা হওয়ার জন্য শুধু নিজের পেটে সন্তান ধারণ করলেই হয়? না তা হয়না। মা হতে হলে আরও অনেক দায়িত্ব লাগে। মা হওয়া মানে কাউকে আগলে রাখা। তার খিদে লাগলে খেয়েছে কি না জিজ্ঞেস করা। রাতে ঘুমিয়েছে কি না দেখা। অসুখ হলে পাশে বসে থাকা। তোমার জীবনে এই যত্নগুলোর বড্ড অভাব রয়েছে। কিন্তু তাই বলে তুমি সারাজীবন এই অভাব নিয়েই পড়ে থাকবে, এমন তো না।
রোদসীর চোখ আবার ভিজে উঠল। সে কবিতা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল—
------“কিন্তু সমাজের মানুষ কি কইবো? তারা তো থুথু দিবো আপনেরে? তহন কেমনে সামলাইবেন হেগোরে?
কাব্য এবার কথা বলল। এতক্ষণ চুপ করে থাকা মানুষটার গলায় এবার অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।
-----“সমাজ? তুমি তো এতদিন সমাজের মাঝেই বড় হয়েছো রোদ কিন্তু সমাজ কী দিয়েছে তোমাকে?
তোমার বাবা তোমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে সমাজের ভয়ে। মানুষ কী বলবে, সেই ভয়ে তোমার জীবনটাকে শেষ করে দিতে চেয়েছে। তোমার স্বামী বিয়ে করে আনার পর যখন তুমি তার পায়ে পড়েছো, তখন কিন্তু সমাজ এগিয়ে আসেনি - তারা দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখেছে। এমনকি আজ তোমার স্বামী মারা যাওয়ার পরও সেই সমাজ কিন্তু তোমাকে এসে একবারও জিজ্ঞেস করেনি, তুমি কেমন আছ?
রোদসী মাথা নিচু করল। কাব্য আবার বলল—
-----“তাহলে এবার তুমিই উত্তর দাও। যে সমাজ তোমাকে ন্যায় দিতে পারলো না, সেই সমাজ দিয়ে কি করবে তুমি? তাদের কথা নিয়ে পড়ে থেকে নিজের এই ফুলের মতো জীবনটা নষ্ট করবে?
রোদসী খুব আস্তে বলল—
-----“কিন্তু মাইনষে তো কথা কইবো। আপনে একজন ম্যালা বড় মানুষ, আপনের বাপও ম্যালা বড় মানুষ। কত মাইনষের লগে মিশতে হয় আপনেগো, তারা যহন কথা তুলবো তহন কি কইবেন? তারা তো ছাইড়া দিবো না, কথা কইবো?
-----“বললে বলবে। কি হবে তাতে?
কাব্যের উত্তরটা এত সহজ ছিল যে রোদসী অবাক হয়ে তাকাল।
-----“মানুষ কথা বলবেই। তুমি চুপ থাকলেও বলবে, কথা বললেও বলবে। তুমি বাড়িতে থাকলেও বলবে, বাইরে থাকলেও বলবে। তুমি ভালো থাকলেও বলবে, কাঁদলেও বলবে। তাদের কাজই এটা। আর একটা কথা। সমাজ তোমার কি পরিচয় দেবে নেবে, সেটা নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না।
তোমার পরিচয় তোমার জন্মের সঙ্গে এসেছে। তুমি কারও অবৈধ সন্তান নও। তুমি কারও বোঝা নও। তুমি একজন মানুষ। একজন মেয়ে। একজন অনাগত সন্তানের। আর এটাই তোমার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
রোদসীর চোখ আবার নিজের পেটের দিকে চলে গেল। তা দেখে কাব্য হয়তো বুঝলো ওর মনে ভেসে ওঠা প্রশ্নগুলো, তাই সে মুচকি হেসে বলল-
------“তোমার সন্তানের কথা ভাবছো? এটা নিয়েও ভাবতে হবে না, তোমার সন্তানও কারও দয়ার ওপর জন্ম নিচ্ছে না। তার বাবা-মায়ের বিয়ে হয়েছিল। তার একটা বৈধ পরিচয় আছে। কেউ সেটা অস্বীকার করলেই সত্যিটা বদলে যাবে না।
কবিতা চৌধুরী এবার রোদসীর হাতটা নিজের হাতে নিলেন।
-----“তুমি যদি আমাদের সঙ্গে থাকো, তাহলে তোমাকে কেউ প্রশ্ন করলে উত্তর আমরাই দেব। তোমাকে কারও সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়াতে হবে না। আমার কাছে ইরা, ইফতি যেমন, তুমিও ঠিক তেমনই থাকবে। আমার ওই বাড়িতে কারও দয়া মনে করে সেখানে থাকবে না তুমি । নিজের বাড়ি মনে করে থাকবে।
রোদসীর ঠোঁট কেঁপে উঠল। নিজের বাড়ি। এই দুটো শব্দ যেন তার কাছে বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া কোনো স্বপ্ন। সে আর কিছু বলতে পারল না। শুধু মাথা নিচু করে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। তবে এই কান্নায় আগের মতো অসহায়ত্ব ছিল না।
ছিল অদ্ভুত এক স্বস্তি।
হয়তো প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
পৃথিবীতে সত্যিই এমন কিছু মানুষ আছে, যাদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও তারা কাউকে নিজের মানুষ করে নিতে পারে।
চলবে,