#নীল_জোছনা | ৭ |
#ইসরাত_জাহান_এশা
সন্ধ্যা নামতেই বুড়িগঙ্গা নদী যেন এক অন্য রূপে সেজে ওঠে। পশ্চিম আকাশে লালচে কমলা সূর্য ধীরে ধীরে ঢলে পড়ে নদীর জলে। দূরে সারি সারি লঞ্চ আর নৌকার ছোট ছোট আলো পানির ওপর ঝিকমিক করে জ্বলে ওঠে। নদীর বুকে ভেসে আসে ইঞ্জিনের মৃদু শব্দ, মাঝিদের ডাক আর পুরান ঢাকার ব্যস্ত জীবনের কোলাহল।
নদীর পাড়ে দাঁড়ালে হালকা বাতাস মুখ ছুঁয়ে যায়। সন্ধ্যার আকাশের রঙ আর পানির ঢেউ মিলেমিশে চারপাশে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে। পুরোনো ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর ছায়া তখন নদীর জলে পড়ে আরও সুন্দর লাগে। একসময় এই নদীর তীরকে মুঘল আমলেও অপরূপ সৌন্দর্যের জন্য বর্ণনা করা হতো।
যদিও আজকের বুড়িগঙ্গা দূষণের ভারে ক্লান্ত, তবুও সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে নদীটাকে দেখলে এখনও মনে হয়—ঢাকার প্রাণটা যেন এখানেই বেঁচে আছে।
সন্ধ্যার নরম আলো তখন ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে রাতের অন্ধকারে। বুড়িগঙ্গার পাড়জুড়ে এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ। নদীর কালচে জলের ওপর দূরের লঞ্চের আলো ছোট ছোট তারার মতো ঝিলমিল করছে। হালকা বাতাসে মুন্নির ওড়নার আঁচল বারবার উড়ে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে আদির হাত।
আদি ধীর পায়ে হাঁটছে নদীর পাড় ঘেঁষে। তার চোখে যেন অদ্ভুত এক প্রশান্তি। আদি মুচকি হেসে মুন্নির হাত নিজের হাতের আঙ্গুল এর ফাকে ঢুকিয়ে শক্ত করে ধরলো। মুন্নি এক পলক তাকালো। কিছু বললো না। লেকের পাশে কৃষ্ণচূড়া ফুল গাছের নিচে দাঁড়ালো দুই জনায়। মুক্ত বাতাশ এসে তাদের ছুয়ে দিচ্ছে। মুন্নি নদীর দিকে তাকিয়েই আদিকে বললো,
" কী মনে করে আজ এতো জরুরি তলব? "
" তোমার সাথে কথা বলার জন্য কী এখন কোনো জরুরি দরকার হতে হবে? "
" কীসের জন্য ডেকেছেন সেটা বলুন। "
" তুমি কী বুঝতে পারছো না আমি কি বলছি? আমার কী প্রয়োজন? "
" না বুঝছি না। "
" কী করলে বুঝতে পারবে? "
" এখন আপাতত বুঝতে চাচ্ছি না। পড়াশোনা শেষ করতে চাচ্ছি আপাতত। "
" তো বিয়ের পড়েও কী তোমার পড়াশোনা শেষ করা যায় না! আমি কি কোনো হস্তান্তর করবো? বড় ভাবি বিয়ের পড় পড়াশোনা শেষ করেছে এখন সে একজন ভার্সিটির লেকচারার। ভাইয়া সব সময় ভাবির পাশে থেকেছে। আমি তার ভাই অবশ্যই তোমায় কোনো কিছুতেই বাধা দিবো না। তুমি কেনো বুঝতে পারছো না। "
" তো কী করবো এখন? "
আদি মুন্নির একদম নিকটে এসে দাড়ালো।ইঞ্চিখানেক মতো ফাকা। মুন্নি আশপাশে তাকিয়ে বললো,
"কাছে এসে দাড়িয়েছেন কেনো ? দূরে গিয়ে দাড়ান। "
আদি মুন্নির হাত শক্ত করে ধরে বললো,
" আমার কষ্ট বুঝতে পারছো না লঙ্কা। "
মুন্নি কাটকাট গলায় বললো,
" না বুঝতে পারছি না। "
আদি মুখ বেকিয়ে মুন্নিকে ছেড়ে দিলো। মুন্নিকে সামনে দাড় করিয়ে আদি পিছনে এসে মুন্নিকে পিছন থেকে আগলিয়ে নিলো। মুন্নি লেকের রেলিং এর সাথে লেগে গেলো। মুন্নির যাতে কোনো অসস্থি না হয় তাই কোনো স্পর্শ করলো না। আদি গলায় আবেগ নিয়ে বললো,
" এই যে মিস লঙ্কা এতো ঝাল কেনো আপনি? "
মুন্নি একটু কঠোর গলায় বললো,
" শুনুন ইন্সপেক্টর, আপনার হয়তো ভুলে যাওয়ার রোগ আছে। "
" মানে? "
" মানে আপনিই তো বলেছিলেন আমায় আমি যাতে সব সময় এভাবেই থাকি। এমন থাকলে কোনো মিষ্টি পোকা আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। "
" সেটা তো আমি ছোট বেলায় বলেছিলাম। তাই বলে এখনো সেটা মানতে হবে? "
" আমি সবসময় সবার কথাই মানি। "
" তাহলে আমি আরো একটা কথা কত বছর ধরে বলে আসছি সেটা মানা হবে কবে? "
মুন্নি নিচু স্বরে বললো,
" জানি না"
আদি মুচকি হেসে বললো বললো,
" তোমার আর জানা লাগবে না। এবার যা করার আমি করবো। "
★
চট্টগ্রামের বাটালি পাহাড়—শহরের বুকের ভেতরেই যেন এক টুকরো উঁচু নিঃশ্বাস। সন্ধ্যার পর পাহাড়টা ধীরে ধীরে বদলে যায়। নিচের শহরের আলো ঝিলমিল করতে করতে যখন উপরে উঠে আসে, তখন মনে হয় পুরো চট্টগ্রামটাই যেন এক নরম কুয়াশার চাদরে মোড়া। বাতাসটা এখানে একটু আলাদা—লবণাক্ত সমুদ্রের ছোঁয়া মিশে থাকে তাতে। দূরে কর্ণফুলীর দিক থেকে ভেসে আসে জাহাজের হর্ণ, আর পাহাড়ের ঢালে থাকা গাছগুলোর পাতায় পাতায় হালকা বাতাস খেলে যায়। শহরের কোলাহল এখানে এসে একটু থেমে যায়, কিন্তু পুরোপুরি নীরব হয় না—যেন প্রকৃতি আর মানুষের শব্দ মিলেমিশে এক অন্যরকম সুর তৈরি করে। আজ বাটালি পাহাড়ে ছোট্ট একটা বার্বিকিউ আয়োজন। আগুনের পাশে লোহায় গাঁথা মাংসের টুকরো ধীরে ধীরে সেঁকা হচ্ছে, ধোঁয়া উঠছে আকাশের দিকে। সেই ধোঁয়ার গন্ধে মিশে আছে আড্ডা, হাসি আর কিছু পুরনো গল্পের টুকরো। নাহিয়ান, সায়ন আর রেহান—তিনজন এসে বসেছে একটা পাথরের ধারে। শহরের আলো পেছনে রেখে তারা যেন নিজেদের একটা ছোট জগৎ বানিয়ে নিয়েছে।
নাহিয়ান আসার পর থেকেই গোমড়ামুখ হয়ে আছে। রেহান বাকি সব মানুষের সাথে আড্ডায় মেতে উঠেছে। সায়ন এগিয়ে এসে নাহিয়ানের কাধে হাত রেখে বললো,
" কী হয়েছে তোর? চুপচাপ কেনো হয়ে আছিস? "
" না কিছু হয় নি আমার । "
" আমি কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকেই দেখছি। কি নিয়ে জানি ভাবছিস তুই। "
" ভাবছি ওই যে বিকেলের শেষে একটা মেয়ে রিসোর্টে আসলো না নাড়ু নিয়ে। "
সায়ন মিটিমিটি হেসে বললো
" ও আচ্ছা আপনার রামছাগল। "
নাহিয়ান ভ্রু কুচকে বললো,
" কি তখন থেকে আমার রামছাগল আমার রামছাগল বলছিস তুই। "
" আরে বাবা সিরিয়াস হচ্ছিস কেনো? বল কী হয়েছে? "
নাহিয়ান মাটিতে দৃষ্টি নিবন্ধ রেখে বললো,
" ও বললো ওর বাবার উপর সবাই কাঠাল ভেঙে খাবে। কেনো বললো এই কথা? আর বললোই বা কেনো আমাদের? "
" হয়তো কিছু একটা হয়েছে তাই বলেছে। তুই চাপ নিচ্ছিস কেনো? "
" না এমনি। আমায় ভাবাচ্ছে শুধু। "
" ভাবিস না এতো। চল ওইদিকে যাই। "
" আচ্ছা চল। "
★
★
রাত ধীরে ধীরে নেমে এসেছে পুরো গ্রামজুড়ে। পশ্চিম আকাশের শেষ লালচে আভাটুকুও মিলিয়ে গিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে নরম কালচে নীল অন্ধকার। দূরের বাঁশঝাড়ে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক রাতটাকে আরও গভীর করে তুলেছে। মাঝেমধ্যে হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে, সেই বাতাসে কাঁচা মাটির গন্ধ আর শিউলি ফুলের মিষ্টি সুবাস মিশে আছে।
গ্রামের সরু কাঁচা পথগুলো এখন প্রায় ফাঁকা। কোথাও কোথাও টিমটিম করে জ্বলছে কেরোসিনের বাতি। দূরে কোনো বাড়ির উঠোনে মৃদু স্বরে কথা বলার আওয়াজ ভেসে আসছে, আবার কোথাও রাতের নীরবতা এতটাই গভীর যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও স্পষ্ট শোনা যায়। পুকুরের পানিতে আধখানা চাঁদের আলো পড়ে চিকচিক করছে। মাঝে মাঝে ব্যাঙের ডাক আর রাতচরা পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ ভেসে আসছে চারপাশ থেকে।
এদিকে নিজের ঘরের জানালার পাশে রাখা কাঠের টেবিলের উপর হাত রেখে চুপচাপ বসে আছে ফারিহা। তার কোমড় অব্দি লম্বা চুলগুলো আজ খোলা। কালো ঘন চুল বাতাসে হালকা দুলে বারবার মুখের পাশে এসে পড়ছে। কিন্তু সেদিকে কোনো খেয়াল নেই তার।
বিকেলে নাহিয়ানের কথা বলার দৃশ্য। ব্যায়াম করার দৃশ্য চোখে অকপটে চলে আসছে। বহু চেষ্টা করেও সে পড়ায় মনোযোগ দিতে পারছে না।
ফারিহা সেসব রেখে আলিমারি থেকে কালকে স্কুলের অনুষ্ঠানের জন্য শাড়ি, চুড়ি সব কিছু বের করলো। কাল সে যৌথ নৃত্যকলায় নাচ দিবে। একবার প্রেকটিস করে ঘুমিয়ে পড়বে। এতো চিন্তা তার আর ভালো লাগছে না।
শাড়ি পড়ার জন্য যখন প্রস্তুতি নিবে তখন সামির না বলে ঘরে ঢুকে বললো,
“ কে সেই ছেলে যার জন্য নাড়ু নিয়ে গেলি৷ আর তার জন্যই কি আমায় রিজেক্ট করলি? “
ফারিহা কথাটি শুনেই মাথায় রক্ত উঠে যায়।
সামির দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে বললো,
“ যেই নাগরকে জুটাইছিস তার বুঝি অনেক টাকা। “
দরজা আটকানো দেখে ফারিহা ভিতু নয়নে টাকায়। আমতা-আমতা করে বললো,
“ সামির ভাইয়া দরজা খুলুন। “
সামির ঘাড় ডলে বললো,
“ আগে বল কে সেই নাগর। কীভাবে তাকে পটালি। নাকি তোর “ কথাটুকু বলেই বিশ্রি ভাবে হাসে।
ফারিহা চোখ বন্ধ করে শ্বাস নেয় জোরে। হাতে থাকা শাড়ি রেখে খাটের পাশে বড় আম গাছের ডাল দিয়ে বানানো লাঠি নিয়ে সামির কাছে এসে বললো,
“ আমার ঘরে অনুমতি ছাড়া আর একবার পা রেখে দেখো। পা ভেঙে হাতে ধরিয়ে দিবো। এতো সাহস কী করে পাও তুমি। তুমি কী ভাবছো এতো অকাজ করে বেরাবে আর আমি কিছুই বলবো না। “
সামির এক পা করে এগিয়ে আসতে আসতে বললো,
“ কী করবি তুই আমায়? আর তুই আমাকে কিছুই বলতে পারবি না। “
ফারিহা ভয় পায় একটু। কিন্তু ভয়কে আর প্রাধান্য দেয় না। হাতে থাকা লাঠি দিয়ে পায়ে আঘাত করে। হঠাৎ আক্রমণে সামির নিজেকে আর সামলাতে পারে না। হাটু মুরে বসে পড়ে। ফারিহা সামিরের থেকে সরে এসে বললো,
“ এই ফারিহা কী জিনিস তা তুমি জানো না সামির ভাইয়া। এই ফারিহার সাথে লাগতে এসো না। ফলাফল শূন্য পাবে। এই ফারিহা এক পিস। “
ফারিহা দরজার খুলে আবার বললো,
‘“ ভালোই ভালোই ঘর থেকে বেরিয়ে যাও। নাহলে আমি সিনক্রিয়েট করতে বাধ্য হবো। “
সামিরের রাগে শরীর কাপছে। কোনোমতে উঠে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
চলবে.....
( পাখিরা কালকে তো হাম্বা মোবারক 🐮। তাই কাল আর গল্প আসবে না। আর ঈদের পরের দিন আমার বাসায় অনেক মেহমান আসবে। তো আমি শিওরিটি দিতে পারছি না। তবে আমি চেষ্টা করবো গল্প দেওয়ার জন্য। আর গল্পে আমার ৫০ হাজার + রিডার তাহলে আপনাদের রিয়েক্ট দিতে এতো কীসের সমস্যা। একটা রিয়েক্ট তো চাচ্ছি দিয়ে দিন প্লিজ।)