ফন্ট সাইজ:
থিম:
নীল জোছনা

৮ম পর্ব

লেখক: ইসরাত জাহান এশা

#নীল_জোছনা | ৮ |

#ইসরাত_জাহান_এশা

ভোরের প্রথম আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে পুরো গ্রামজুড়ে। পূর্ব আকাশে লালচে কমলা আভা ফুটে উঠেছে। রাতের শিশিরে ভেজা ঘাসগুলো মুক্তোর মতো ঝিলমিল করছে। দূরে মসজিদ থেকে ভেসে আসছে ফজরের আজান। সেই সুরেলা ধ্বনি ভোরের শান্ত বাতাসে মিশে চারপাশকে আরও পবিত্র করে তুলেছে।

উঠোনের একপাশে থাকা শিউলি গাছের নিচে সাদা ফুল বিছিয়ে আছে। হালকা বাতাসে ফুলের সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে গরম ভাত আর ভাজা পেঁয়াজের গন্ধ।

এদিকে ফারিহা ঘুম থেকে উঠেই শুরু করেছে তার চিরচেনা কাণ্ড। ফাতেমা বেগম তখন রান্নাঘরে সকালের নাস্তা তৈরিতে ব্যস্ত। ঠিক সেই সময় পিছন থেকে এসে ফারিহা তার হাত জড়িয়ে ধরে বললো,

" বড় আম্মা, প্লিজ আজকে আমাকে সুন্দর করে শাড়ি পরিয়ে দিবা "

— "এখনই শুরু করলি? সকাল সকাল ।"

— " বড় আম্মা প্লিজ। আজকে কিন্তু অনুষ্ঠান। আমি নিজে পরলে একপাশ ছোট হবে, আরেকপাশ বড় হবে।"

— "তোর বয়স হয়েছে। এখনো শাড়ি পরতে শিখলি না?"

— "শিখবো পরে। আজকে আগে তুমি পরিয়ে দাও ।"

ফাতেমা বেগম বিরক্ত মুখে তাকালেও মেয়ের আবদার শেষ পর্যন্ত ফেলতে পারলেন না। ঘণ্টাখানেক পর ফারিহা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখছে। সাদা শাড়ির লাল পাড়। হাতে কাঁচের লাল চুড়ি। কপালে ছোট্ট লাল টিপ। কোমর অব্দি নেমে আসা কালো চুলগুলো সুন্দর করে বেণী করা।

ফাতেমা বেগম একবার তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন,

— "মাশাআল্লাহ। একদম পুতুল লাগছে।"

ফারিহা খুশিতে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরলো।

খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ব্যাগ হাতে বেরিয়ে পড়লো স্কুলের উদ্দেশ্যে। রাস্তার মোড়ে যেতেই দেখা হয়ে গেল মৌয়ের সাথে। মৌ চোখ বড় বড় করে বললো,

— "ওই ফারিহা! তুই নাকি আজকে নাচবি? নাকি কারোর সাথে ডেটে যাবি কোনটা? "

— " কীসব বলছিস তুই? এমনিতেই নার্ভাস লাগছে।"

দুজন গল্প করতে করতে স্কুলের দিকে এগিয়ে গেল।

★

স্কুলে আজ উৎসবমুখর পরিবেশ। রঙিন কাগজ, ফুল আর ব্যানারে সাজানো হয়েছে পুরো মাঠ। চারপাশে ছাত্র-ছাত্রীদের কোলাহল। ফারিহার বুকের ভেতর ধুকপুকানি ক্রমসই বাড়ছে। মঞ্চের পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে সে বারবার নিজের হাতের তালু ঘষছে।

হঠাৎ শিক্ষিকা এসে বললেন,

— "ফারিহা, প্রস্তুত তো? এরপর তোমার পালা। "

— "জি ম্যাম।"

কিন্তু তার গলা কাঁপছিল। কিছুক্ষণ পর ঘোষণার সাথে সাথে শুরু হলো নৃত্য পরিবেশনা। মঞ্চে উঠে প্রথমে একটু অস্বস্তি লাগলেও গান শুরু হতেই যেন সব ভয় উড়ে গেল। তাল মিলিয়ে নাচতে লাগলো সে।

শেষ হওয়ার সাথে সাথে চারদিক হাততালিতে ভরে উঠলো। ফারিহার ঠোঁটে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠলো।

অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে বিকেল গড়িয়ে গেল।

স্কুল ক্যান্টিনে বসে ঠান্ডা পানি খাচ্ছিল ফারিহা।

জানালার বাইরে আকাশের রঙ ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে।

নীল আকাশের গায়ে জমছে কালো মেঘ। দূরে বিদ্যুতের চিকচিক আলো দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেকোনো সময় বৃষ্টি নামবে। মৌ অনেক আগেই বাড়ি চলে গেছে। ফারিহাও ব্যাগ কাঁধে নিয়ে একা রওনা দিলো বাড়ির পথে।

★

বিকেলের দিকে নাহিয়ান, সায়ন আর রেহান শহর ঘুরতে বের হয়েছে। রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ তাদের কানে ভেসে এলো মাইকের শব্দ আর গানের সুর। সায়ন বললো,

— "মনে হয় কোনো স্কুলে অনুষ্ঠান হচ্ছে।"

রেহান বললো,

— "চল দেখি।"

নাহিয়ান বিরক্ত মুখে বললো,

-" দরকার কী এসবের? ঘুরতে বের হয়েছি কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য না। "

রেহান মুখ বেকিয়ে বললো,

-" ঢং করিস না। চল দেখবো আমি। গ্রামের অনুষ্ঠান দেখা হয় না আমাদের। "

তিনজন স্কুলের সামনে এগিয়ে গেল। কিন্তু ভেতরে ঢোকার আগেই নাহিয়ানের চোখ আটকে গেল।

স্কুলের গেটের পাশে কয়েকজন বখাটে ছেলেকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে এক মেয়ে। মেয়েটি বারবার সরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। নাহিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকালো।

পরক্ষণেই তার মুখ শক্ত হয়ে গেল। মেয়েটিকে চিনলো কি নাহিয়ান? নাহিয়ান এগিয়ে যায় সেদিকে। আকাশ চিরে বজ্রপাত হলো। মুহূর্তের মধ্যে ঝুম বৃষ্টি নেমে এলো। ফারিহা দ্রুত পাশ কাটিয়ে যেতে চাইছিল।

কিন্তু ছেলেগুলোর একজন পথ আটকে দাঁড়ালো।

— "এত তাড়া কিসের সুন্দরী?"

আরেকজন হেসে উঠলো। ফারিহার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়ালো নাহিয়ান। ফারিহা হয়তো এই সময় নাহিয়ানকে আশা করে নি। ফারিহার চোখ দুটো নাহিয়ানের দিকে নিবন্ধ। তার চোখ দুটো রাগে লাল। সায়ন আর রেহানও পাশে এসে দাঁড়ালো। নাহিয়ান ঠান্ডা গলায় বললো,

— "রাস্তা ছাড়ো।"

ছেলেগুলো প্রথমে হাসাহাসি করলেও নাহিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে সেই হাসি মিলিয়ে গেল। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলো। বৃষ্টির পানি ঝরছে চারপাশে। এক ছেলে এগিয়ে এসে বললো,

-" যদি না যেতে দেই কী করবি তুই? "

-" তুই তুকারি না করে রাস্তা ছাড়ো। একটা মেয়েকে উত্তপ্ত না করে সম্মান দিতে শিখো। তোমাদের বাসায় মা বোনের আছে। "

নাহিয়ান এহেন কথায় সব ছেলেরা হেসে উঠলো। একজন এগিয়ে এসে নাহিয়ানের কলার ধরে বললো,

-" এখানে এসে নাটকির কথা কস তুই। আমাদের চিনিস তুই আমি কে? "

মুহূর্তেই নাহিয়ানের মাথায় রক্ত উঠে যায়। ছেলেকে সজোরে এক থাপ্পড় মারে। ছেলে ছিটকে সরে যায়। ছেলেটি নোংরা ভাষায় গালি দিয়ে ফারিহার আঁচল ধরে টান দিল। ফারিহা ভারসাম্য হারিয়ে পিছিয়ে গেল।

সেফটিপিন ছিঁড়ে শাড়ির অংশ সাথে ব্লাউজ ছিরে যায়। ফারিহা আতঙ্কে দুহাত দিয়ে আঁচল চেপে ধরলো।

সেই দৃশ্য দেখে নাহিয়ানের মাথার রগ ফুলে উঠলো।

পরের মুহূর্তেই ছেলেটার কলার চেপে ধরে সজোরে ঘুষি মারলো সে। বৃষ্টির মধ্যে ছেলেটা মাটিতে পড়ে গেল। সায়ন আর রেহানও বাকি ছেলেদের সরিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর বখাটেরা হুমকি দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল।

চারপাশ তখনও বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে। ফারিহা কাঁপা হাতে শাড়ির আঁচল ঠিক করার চেষ্টা করছে।

নাহিয়ান একবার তাকিয়ে আবার মুখ ফিরিয়ে নিল।

তারপর নিজের শার্ট খুলে ফারিহার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,

— "এটা পরে নাও।"

ফারিহা বিস্মিত চোখে তাকালো।

নাহিয়ান শুধু বললো,

— "তাড়াতাড়ি।"

কাঁপা হাতে শার্টটা নিল ফারিহা।

বৃষ্টির শব্দের মাঝেও তার বুকের ধুকপুকানি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। দূরে আবার মেঘ গর্জে উঠলো।

আর ঠিক সেই সময় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন বয়স্ক মানুষ পুরো ঘটনাটা না বুঝেই নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলতে শুরু করলো।

•••••

আকাশজুড়ে তখনও কালো মেঘের আনাগোনা। ঝুম বৃষ্টি একটু কমেছে বটে, তবে টুপটাপ করে এখনো পানি পড়ছে। কাঁচা রাস্তার দুই পাশে জমে আছে বৃষ্টির পানি। দূরের গাছপালাগুলো ভিজে আরও গাঢ় সবুজ হয়ে উঠেছে। ফারিহা চুপচাপ হাঁটছে। তার গায়ে নাহিয়ানের দেওয়া শার্ট। ভেজা চুলগুলো কাঁধ বেয়ে লেপ্টে আছে। মুখে কোনো কথা নেই। পাশে হাঁটছে নাহিয়ান। সায়ন আর রেহান কিছুটা দূরে।

কিছুক্ষণ পর নিকুঞ্জ ভিলার সামনে এসে দাঁড়ালো তারা। কিন্তু বাড়ির সামনে দাঁড়াতেই সবার মুখ থমকে গেল। বাড়ির উঠোনে আজ অস্বাভাবিক ভিড়।

গ্রামের বেশ কয়েকজন মুরব্বি, মাতব্বর আর কৌতূহলী লোকজন জড়ো হয়েছে। সাথে ছিলো সেই বখাটে ছেলে গুলো। সবার মুখ গম্ভীর। কেউ ফিসফিস করছে। কেউ আবার চোখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে। জয়নুল হক উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখ কঠিন। পাশেই রাজিয়া বেগম।

চোখেমুখে রাগ আর অপমানের ছাপ স্পষ্ট।

সামির এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। তার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি। যেন এই মুহূর্তটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। ফারিহা কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাজিয়া বেগম ঝড়ের বেগে এগিয়ে এলেন। ফারিহার গালে ঠাস করে থাপ্পড় মারে। পুরো নিঃশব্দ উঠোন কেঁপে উঠলো থাপ্পড়ের শব্দে। মায়ের আঘাতে ভারসাম্য হারিয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। পড়ে যেতে নিলেও শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল। শ্যামলা গাল দুটো মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠলো। উঠোনে নীরবতা নেমে এলো।

নাহিয়ান, সায়ন আর রেহান হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। ফারিহা নিজের গালে হাত দিয়ে মায়ের দিকে তাকালো। চোখে স্পষ্ট বিস্ময়। রাজিয়া বেগম কাঁপা গলায় বললেন,

— "এইদিন দেখার জন্য তোকে মানুষ করছি আমি? গ্রামের মানুষ আজ আমার মুখ দেখাইতে দিতেছে না!"

— "আম্মা..."

— "চুপ! একটা কথাও বলবি না।"

ফারিহা ভয়ার্ত চোখে চারপাশে তাকালো। কিছুই বুঝতে পারছে না সে। জয়নুল হক নরম গলায় বললেন,

— " আম্মা আজ গ্রামের মানুষ যেইসব কথা কইতাছে, সেগুলা কি সত্যি?"

ফারিহা অশ্বাস নিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,

" আব্বা কী কথা শুনেছেন? আম্মা আমায় কেন মারলো? আমি কী করেছি? আর বাসায় এতো মানুষ কেনো? "

জয়নুল কিছু বলার আগেই ভিড়ের মাঝখান থেকে গ্রামের এক লোক সামনে এগিয়ে এলো।

সে নাহিয়ানের দিকে আঙুল তুলে বললো,

— "এই যে ব্যাটা ছেলের লগে তোমাগো মাইয়া ঘুরাঘুরি করতেছিল!"

আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে সায় দিল,

— "আমরাও দেখছি।"

লোকটা গলা আরও উঁচু করে বললো,

— "আরে ভাই, এইডা তো অইল না! মইদ্দে বৃষ্টির ভিতর দুজনেরে যেই অবস্থায় দেখলাম, লজ্জায় চোখ নামাই ফেলছি। মাগো, কী সাংঘাতিক কান্ডকারখানা রে বাবা!"

কথাটা শুনে ফারিহা যেন জমে গেল। নাহিয়ানও কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারলো না লোকটা কী বললো। রেহান বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। সায়ন তো প্রায় হাঁ হয়ে গেছে।

নাহিয়ান কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। চোখদুটো ভয়ংকর শান্ত। যে শান্তি ঝড়ের আগের নীরবতার মতো।

সে চারপাশে তাকিয়ে বললো,

— "আপনারা কি পুরো ঘটনাটা জানেন?"

লোকটা বললো,

— "আমাগো জাননের দরকার নাই। আমরা যা দেখছি তাই কইতাছি।"

— "তাহলে শুনেন।"

নাহিয়ানের কণ্ঠ এবার কঠিন হয়ে উঠলো।

— "আপনাদের গ্রামের কয়েকটা ছেলে একটা মেয়েকে রাস্তার মধ্যে বিরক্ত করছিল। আমরা গিয়ে তাকে সাহায্য করেছে দ্যাটস ইট ।"

— "এইসব কথা এখন কে বিশ্বাস করবো?"

— "বিশ্বাস না করলে সমস্যা নাই। কিন্তু মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার আগে সত্যিটা জানবেন।"

মুরব্বিদের মধ্যে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। কেউ কারও মুখের দিকে তাকাচ্ছে। কেউ আবার চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

ফারিহার আর বুঝতে বাকি থাকলো না। মোরলের সামনে গিয়ে কান্না ভেজা স্বরে শক্ত কন্ঠে বললো,

" এই যে আপনারা এসে না জেনে শুনে আসছেন৷ বিচার করতে। বিচার কী সেটা আপনারা জানেন? গ্রামের মোরল দেখে কী মাথা কিনে নিয়েছেন। আপনাকে কে অধিকার দিয়েছে আমার ব্যাপারে বাজে মন্তব্য করার। যে মা আমার গায়ে হাত তুলে নাই কখনো আজ সেই মা ভরা মজলিসের মাঝে আমার মারলো। মা মেরেছে সেটা কোনো ফ্যাক্টর না। আপনি কোন সাহসে আমার সম্মান নিয়ে কথা বলছেন। সাথে আরেজন অচেনা মানুষের সম্মান নিয়ে কথা বলছেন। মনুষ্যত্ব আছে আপনাদের। উত্তর দিন আমার প্রশ্নের।

সামির ঠোঁট বাঁকিয়ে মুচকি হেসে বললো,

— "তাই নাকি?"

সবাই তার দিকে তাকালো। সামির ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়ালো। চোখে কুটিল হাসি।

— "তাহলে ওই ছেলেটার শার্ট তোর গায়ে কেন?"

প্রশ্নটা উঠোনজুড়ে বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে পড়লো।

ফারিহা থমকে গেল। নাহিয়ানের চোয়াল পুনরায় শক্ত হয়ে উঠলো। সায়ন বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করলো।

আর সামিরের ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও প্রশস্ত হয়ে উঠলো। সামিরের প্রশ্নের পর পুরো উঠোন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। বৃষ্টির পানি তখনও কার্নিশ বেয়ে টুপটাপ করে পড়ছে। দূরে কোথাও মেঘ গর্জে উঠলো।

ফারিহা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার গায়ে এখনো নাহিয়ানের দেওয়া ভেজা শার্ট। মুরব্বিদের মধ্যে আবার ফিসফাস শুরু হয়ে গেল।

— "কথাডা তো ঠিক কইছে।"

— " রাইত হইতাসে , আবার ছেলের শার্ট গায়ে..."

একজন আরেকজনের দিকে তাকাতে লাগলো।

ঠিক তখন গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক মোরল গলা খাঁকারি দিলেন। চারপাশ আবার চুপ হয়ে গেল। মোরল ধীর গলায় বললেন,

— " হুনো মাইয়া মুখ সামলিয়এ কথা কইবা। তোমারসম্মান নাও থাকতে পারে কিন্তু গ্রামের মান-সম্মানের একটা ব্যাপার আছে।"

জয়নুল হক মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন।

রাজিয়া বেগমের চোখে উদ্বেগ।

মোরল আবার বললেন,

— "আজ যা রটাইছো, কাল আরও বাড়াইবা। মানুষ মুখ বন্ধ করাইতে পারবা না।"

তারপর ফারিহার দিকে তাকিয়ে বললেন,

— "মেয়েটার গায়ে কলঙ্কের দাগ লাগছে—এইটাই গ্রামের কথা।"

ফারিহা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না এসব কথা তার সম্পর্কে বলা হচ্ছে।

মোরল কঠিন স্বরে বললেন,

— "এই অবস্থায় দুইটা পথ আছে।"

উঠোনের সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে।

— "এক, গ্রামের মানুষ যেই অপমানের কথা কইতাছে, সেইমতো শাস্তি দেওনের দাবি উঠতে পারে।"

কথাটা শুনে রাজিয়া বেগম আঁতকে উঠলেন।

— "না! এসব কী কইতাছেন?"

মোরল হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন।

— "আর দুই নম্বর পথ..."

তিনি এবার নাহিয়ানের দিকে তাকালেন।

— "এই ছেলেটা যদি মেয়েটারে নিজের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে, তাইলে অনেক কথা থাইমা যাইব।"

কথাটা শেষ হতেই উঠোনে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লো।

কেউ সম্মতি জানালো। কেউ মাথা নাড়লো। ফারিহার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো। সে কাঁপা গলায় বললো,

— "আমি কি কোনো অপরাধ করেছি?"

কেউ উত্তর দিল না।

— "আমি কি চুরি করেছি? আমি কি কারও ক্ষতি করেছি?"

ফারিহার চোখ ভিজে উঠেছে।

— "আমাকে কয়েকজন ছেলে রাস্তায় বিরক্ত করেছে। আমি বিপদে পড়েছিলাম। আর যারা সাহায্য করেছে, তাদের জন্য আজ আমাকে বিচার করা হচ্ছে? বাহ কী সুন্দর সমাজের নিয়ম। আজ যদি ওই ছেলেরা আমার কোনো ক্ষতি করে দিতো তখন কী আপনি ওই ছেলেদের শাস্তি দিতেন মোড়ল সাহেব? "

চারপাশে অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়লো। অনেকেই চোখ নামিয়ে নিল। এতক্ষণ চুপ থাকা নাহিয়ান ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। তার ভেজা চুল থেকে এখনো পানি পড়ছে। চোখদুটো অস্বাভাবিক শান্ত। সে মোরলের দিকে তাকিয়ে বললো,

— "একটা প্রশ্ন করতে পারি?"

— "করো।"

— "যারা মেয়েটাকে উত্ত্যক্ত করছিল, তাদের বিচার হয়েছে?"

মোরল চুপ।

— "যারা তার কাপড় টান দিয়েছে, তাদের কিছু বলা হয়েছে?"

আবার ফিরে নীরবতা।

— "যারা অপমান করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলছে?"

কেউ উত্তর দিল না। নাহিয়ান এবার চারপাশে তাকালো।

— "অদ্ভুত না?"

তার কণ্ঠে চাপা ক্ষোভ।

— "অপরাধ করেছে একদল ছেলে। কিন্তু বিচার বসেছে একটা মেয়েকে নিয়ে।"

উঠোনের কয়েকজন বৃদ্ধ বিব্রত হয়ে একে অপরের দিকে তাকালেন। সামির বিরক্ত হয়ে বললো,

— "তুমি বাইরের মানুষ। গ্রামের নিয়ম বুঝবা না।"

নাহিয়ান ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালো।

সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল যে সামির বাকিটা বলতে পারলো না।

— "আমি বাইরের মানুষ হতে পারি। কিন্তু অন্যায় আর ন্যায়ের পার্থক্য বুঝি। আর যেহেতু সেখানে এই নাহিয়ান চৌধুরীর সম্মান জড়িয়ে কথা উঠেছে সেটা আমি সলিউশন না করে যাচ্ছি না। "

মোড়লের দিকে তাকিতে আবার বললো,

-" দেখুন চাচা আমি ভদ্র ভাবেই কথা বলছি। আমায় অভদ্র বানাতে বাধ্য করবেনা না। আমায় যদি অভদ্র বানান তাহলে মুখ আর এই হাত দুটোই চলবে। দুই একটা লা*শ ফেলতেও হাত কাপবে না। ঠিকাঠাক বিচার করুন নাহলে সবার আগে আমি আপনার নামে কেস থুকে দিবো। আই নাহিয়ান চৌধুরী কী জিনিস সেটা আপনারা কেউ জানেন না। "

নাহিয়ানের এরুপ কথায় সবাই চুপ হয়ে গেলো। মোড়ল একটু ভয় পেলো। ভিতু চোখে ওই ছেলেদের দিকে তাকাতেই দেখলো তারা আস্তে আস্তে পিছিয়ে যাচ্ছে৷ মোড়ল এই ছেলেদের কথা বিশ্বাস করে এখানে এসেছে। কিন্তু এসে সে নিজেই বপদে পড়েছে৷ কিন্তু তাকেতো আর হাড় মানায় না। তার একটা আলাদা সম্মান আছে। এই গ্রামের মোড়ল সে। তাই গলা খাখারি দিয়ে বললো,

-" দেহো পোলা, তোর পরিচয়-টরিচয় দিয়া আমার কুনো কাম নাই। তুই এই মাইয়াডারে এহনই বিয়া করবি। নইলে এই মাইয়াডারে ন্যারা কইরা, মুখে চুন-কালি মাইখ্যা, জুতার মালা পিন্দাইয়া গেরামের এক মাথা থেইকা আরেক মাথা পর্যন্ত ঘুরাইতাম। এহন সব তোর হাতে। কী করবি, হেইডা তুই ভাব।"

ফারিহা চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনছিল। মোড়লের কথা শেষ হতেই চোখের পানির বাধ ভেঙ্গে গেলো জোরে কেদে দিলো। নাহিয়ান এবার মোড়লের চামচার নাক বরাবর ঘুষি মেরে বললো,

" ভালো ভালোই বলছি এসব বন্ধ করুন নাহলে আমি কী করবো ভাবতেই পারবেন না। "

মোড়লে নাহিয়ানের উপর খ্যাকিয়ে উঠে বললো,

"এই পোলা, তোর এত সাহস আইলো কইত্তন? তুই আমার সাজুর গায়ে হাত তুলছস ক্যান? এইডার হিসাব তরে দিত্তে অইবো!"

নাহিয়ান কপালে ভাজ ফেলে বললো,

" আমি এতো সাজু গাজু বুঝি না। আজগুবী কথা বার্তা বন্ধ করে এখান থেকে চলে যান। মানুষদেরকে আপনি এতো অসম্মান কইরেন না। "

মোড়লের অপমান মনে হলো এটা। মোড়লের হাতে থাকা লাঠি দিয়ে মাটিতে আঘাত করে বললো,

“এই নষ্টা মাইয়াডারে তোরে বিয়া করতেই অইবো। এই যা, কাজি ডেইকা আন। আজকেই এই মূহুর্তেই ওদের বিয়া অইব। "

চলবে.......

( 🦋🦋🦋 বাসায় ২০ জন মেহমান। বহু কষ্টে লিখেছি। কাল থেকে মেহমান বাসায়। আজ এতটুকু থাকুক কেমন। রেসপন্স কইরো ময়নারা। ঈদ মোবারক 🦋🦋🦋

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন