#নীল_জোছনা | ১২ | #ইসরাত_জাহান_এশা
জানালার হালকা সাদা পর্দা ভেদ করে সূর্যের কোমল কিরণ এসে পড়েছে বিছানার ওপর। ভোরের সোনালি আলো ধীরে ধীরে ঘরের অন্ধকার সরিয়ে চারপাশে এক মায়াবী আবহ তৈরি করেছে। বাতাসে ভেসে আসছে ভেজা মাটির গন্ধ আর দূরের পাখিদের মিষ্টি কলতান।
নাহিয়ানের ঘুম ভাঙতেই সে অনুভব করল তার বাম হাতটা যেন কেউ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। চোখ মেলে তাকাতেই দেখল, ফারিহা তার বাহুর ওপর মাথা রেখে শিশুর মতো নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। ঘুমের ঘোরে আরও একটু কাছে সরে এসে তার শার্টের এক কোণা মুঠোয় চেপে ধরেছে মেয়েটা।
সকালের সোনালি আলো এসে পড়েছে ফারিহার মুখে। দীর্ঘ পাপড়ির ছায়া গাল ছুঁয়ে আছে, এলোমেলো চুলগুলো কপালের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে। ঘুমন্ত মুখখানার দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল নাহিয়ান।
অজান্তেই ভিতর থেকে বেড়িয়ে এলো দ্বীর্ঘ নিশ্বাস । ফারিহাকে নিজের হাত থেকে নামিয়ে বালিশে শুয়ে দিলো। ফ্রেশ হয়ে এসে দেখলো ফারিহাকে আগের মতোই শুয়ে আছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো ছয় টা বেজে ১৫ মিনিট। ভাবলো আরো কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিক। এই ভেবে বেড়িয়ে গেলো জগিং এর উদ্দেশ্যে।
বাড়ি এখনো ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। বাড়ির বাগান থেকে চড়ুই পাখিদের কিচির মিচিরে পরিবেশ আরো রাঙিয়ে তুলছে।
বাড়ি থেকে বের হতেই সায়নের সাথে দেখা হয়ে যায় নাহিয়ানের। দুই বন্ধু কথা বলতে বলতে যেতে থাকে। নাহিয়ান সায়নের উদ্দেশ্যে বললো,
-" এল এল এম শুরু করবি কবে?
-" দেখি নেক্সট মান্থ থেকে শুরু করবো। হঠাৎ এই প্রশ্ন কেনো? "
-" আমি এই সাপ্তাহ থেকে শুরু করবো ভাবছি। যত বেশি দেরি করবো তত ক্ষতি হবে আমার। "
পার্কের বেঞ্চিতে বসলো দুই বন্ধু। সায়ন নাহিয়ানের কাধে হাত রেখে বললো,
-" এনি প্রবলেম?
-" না কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমি ফারিহার দায়িত্ব নিতে চাই। এল এল এম এর সাথে বি সি এস শেষ করবো। যেহেতু বিয়েটা হয়েই গেছে বাবা মায়ের ঘাড়ে বসিয়ে নিজের বউকে খাওয়াতে পারবো না। দুই তিন বছরের মধ্যে নিজের পায়ে দাড়াতে হবে আমার। "
সায়ন হেসে বললো,
-" ত্যাহলে আমার বন্ধু তার অনাকাঙ্ক্ষিত বউকে মেনে নিয়েছে। "
" মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই আমার। ছোট থেকে বাবাকে দেখে এসেছি। আজ পর্যন্ত আম্মুকে অসম্মান করে নি। আর আমি তাদের ছেলে হয়ে একটা মেয়েকে অসম্মান করতে পারি না। "
" চিন্তা করিস না সব কিছু ঠিক হবে। তাহলে আমি বাকি তিন জনের সাথে কথা বলে দেখছি ওরা কবে থেকে শুর্য করবে। তাহলে আমরা এক সাথেই এল এল এম শুরু করবো। "
" আচ্ছা কথা বলে দেখ। "
★
ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে ফারিহার ঘুম ভাঙল বেশ দেরিতে। চোখ মেলে কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল সে। তারপর পাশ ফিরে তাকাতেই দেখল বিছানার অন্য পাশটা খালি। মুহূর্তেই ঘুমটা কেটে গেল তার। তাড়াতাড়ি উঠে বসে দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির দিকে তাকাল। সকাল সাতটা বেজে পয়তাল্লিশ মিনিট। ফারিহা অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। বিরবির করে বললো
—"এতক্ষণ ঘুমালাম আমি!"
বিছানা থেকে নেমে দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিল সে। বেরিয়ে এসে চারপাশে চোখ বুলাল। বিছানার চাদরটা ভাঁজ করে গুছিয়ে দিল, ছড়িয়ে থাকা বালিশগুলো ঠিকঠাক করে রাখল। তারপর আর কোনো কাজ খুঁজে না পেয়ে বিছানার এক কোণায় চুপচাপ গিয়ে বসে রইল। মেয়েটার চোখেমুখে অস্বস্তি স্পষ্ট।
এই বাড়িতে এখনো সবকিছুই তার কাছে নতুন। কার সামনে কীভাবে যেতে হবে, কী বলতে হবে—কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে ঘরে ঢুকল নাহিয়ান। জগিং শেষে ফ্রেশ বাতাসে তার মুখটা বেশ সতেজ দেখাচ্ছিল। ঘরে ঢুকেই বিছানার কোণায় গুটিসুটি মেরে বসে থাকা ফারিহাকে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলল সে।
—"কী হয়েছে?"
ফারিহা মাথা তুলে তাকাল।
—"নিচে যাবো।"
—"তো যান।"
কথাটা এত সহজভাবে বলল নাহিয়ান যে ফারিহা কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরস্বরে বলল,
—"আমার শাড়ি ভিজে গেছে। আমার তো কোনো জামাকাপড়ও নেই। কী পরে নিচে যাবো?"
নাহিয়ান এক মুহূর্ত ভেবে গম্ভীর মুখে বলল,
—"একটু অপেক্ষা করুন।"
এই বলে সে আলমারি থেকে কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল।
ড্রইংরুম পেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতেই উচ্চস্বরে ডাকল,
—"আম্মু! আম্মু!"
রান্নাঘরে সকালের নাস্তার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন নীরা চৌধুরী। ছেলের ডাক শুনে অবাক হয়ে বেরিয়ে এলেন।
—"কী হয়েছে? এভাবে চিৎকার করছিস কেন?"
নাহিয়ান মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মাথা চুলকে উসখুস করে বললো,
-" একটা কথা বলতাম তোমায়।
-" হ্যাঁ কী বলবি বল।
সোফায় বর্ষা, মেঘলা, রাতুল, আহিয়ানা, সুনায়রা বসে আছে। বর্ষা নাহিয়ানের দিকেই তাকিয়ে। নাহিয়ান নীরাকে নিয়ে একটু সাইডে গিয়ে বললো,
-" আম্মু ফারিহার কোনো জামা কাপড় নেই। কালকের শাড়ি পড়ে আছে এখনো।
নীরা তাকালো ছেলের পানে। নাহিয়ানের গালে হাত দিয়ে হাসি মুখে বললো,
-" পাগল ছেলে একটা। এটা বলার জন্য এরকম করছিস তুই। আমি যাচ্ছি ফারিহার কাছে।
-" যাও তাহলে আমি নিচে আছি।
" আচ্ছা।
নীরা উপরে চলে গেলো। নাহিয়ান এসে আহিয়ানার পাশে বসে কাধ জড়িয়ে বললো,
-" পুচ্চু কী হয়েছে?
আহিয়ানা গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
-" ভাইয়ু আমি বড় হয়েছি পুচ্চু বলে ডাকবে না। কেমন শুনায় এই ডাকটা।
নাহিয়ান আহিয়ানার কথা শুনে হাতের বাধন ঢিলে হয়ে গেলো। আহিয়ানার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
-" তুই আমার কাছে সেই ছোট নবজাতক পুচ্চুই আছিস। যাকে কিনা নার্স গোলাপি তোয়ালে জড়িয়ে আমার কোলে দিয়েছিলো। তুই সেই ছোট পুচ্চুই আছিস আমি স্কুল থেকে আসার পর আমার পা জড়িয়ে আদো আদো বুলিতে আমায় বলতি আমি তোর জন্য চকলেট চিপ্স এনেছি কিনা। আজ তুই বড় হয়েছিস। হ্যাঁ বড় হয়েছিস। "
আহিয়ানার কাধ থেকে হাত সরিয়ে এনে আবার বললো,
" দশটা মানুষের সাথে চলাফেরা করবি। আমায় আর মনে রাখবি নাকি তুই। আর ডাকবো না এই নামে ডোন্ট ওয়ারি। "
এই বলে উঠে চলে যেতে নিলে আহিয়ানা নাহিয়ানকে জড়িয়ে ধরে বললো,
" ভাইয়ু আমি কথাটা ওইভাবে বলতে চাইনি। আমি তোমার উপর ভিষণ অভিমান করেছি ভাইয়ু। তুমি ওই মেয়েকে বিয়ে করে এনেছো। কাল থেকে আমার সাথে একটা কথাও বলোনি। আমার রাগ হয়না বুঝি। তুমি না আমায় ভালোবাসো তাহলে আমার সাথে কথা না বলে ছিলে কীভাবে তুমি। তোমার কষ্ট হয়নি? "
নাহিয়ান হাসলো বোনের কান্ডে। আহিয়ানার সাথে সুনায়রাও নাহিয়ানকে জড়িয়ে ধরে বললো,
-" ভাইয়া এর জন্য তোমার পানিশমেন্ট পাওয়া উচিত। "
নাহিয়ান দুই বোনকে আগলে নিয়ে বললো,
-" কী পানিশমেন্ট পাওয়া উচিত আমার? "
আহিয়ানা আর সুনায়রা এক সাথে বললো,
-" শপিং এ যাবো আমরা। "
নাহিয়ান ভ্রু কুচকে বললো,
" এই না কিছুদিন আগে শপিং করলি তোরা? আবার শপিং? "
" হ্যাঁ যাবো। বলো নিয়ে যাবে আমাদের? "
নাহিয়ান দুই বোনের মাথায় চুমু দিয়ে বললো,
-" বেশ নিয়ে যাবো।
দুই বোন খুশি হয়ে ভাইয়ের গালে চুমু দেয়। আহিয়ানা নাহিয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
" ভাইয়ু পুচ্চু বলে ডাকো আবার। "
নাহিয়ান ভ্রু শিথিল করে বললো,
-" তুই না বড় হইছিস কিছুক্ষণ আগে আমায় বললি। "
-" ওইটা আমি বলিনি। আমার অভিমানি মন বলেছে। "
" পাগলি বোন আমার। "
তূর্য সিড়ি ঘর থেকে ছেলে মেয়ের কথা গুলো শুনছিলো। বাবার মন শান্ত হলো এবার। মেয়ের মুখ থেকে ওই কথা শুনার পর মনটা অস্থির হয়ে উঠছিলো। আস্তেধীরে নেমে আসলো। ছেলেমেয়েদের অপর পাশের সোফায় বসলো। দুইটা মেয়ে একটা মেয়েও বাবার দিকে তাকালো না। দুই বোন তার ভাইকে জড়িয়ে ধরে আছে। নাহিয়ান সেটা দেখে চোখ মেরে বুঝিয়ে দিলো ❝দেখো তোমার মেয়েরা এখন তোমায় পাত্তা দিচ্ছে না। ❞ তূর্য সেটা দেখে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে মেয়েদের উদ্দেশ্যে বললো,
" আমার আম্মাজানেরা। "
আহিয়ানা সুনায়রা দুইজনেই তাকালো বাবার পানে। দুই বোন এক সাথেই বললো,
" ডোন্ট ডিস্টার্ব পাপা বিজি আছি। "
এই বলে নাহিয়ানের দিকে ফিরে তাকালো। তূর্য অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো ছেলের পানে। কিন্তু তাকিয়ে লাভ আছে বুঝি। উহু নেই তো। আহিয়ানা চুপ থেকে বললো,
-" ভাইয়ু একটা কথা বলি? "
" হ্যাঁ বল এতো ফরমালিটি পালন করছিস কেনো তুই? "
আহিয়ানা এক পলক তার পাপার পানে তাকালো। নাহিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো,
-" তোমার ওয়াইফ আমার ছোট। আমি কী বলে ডাকবো? "
নাহিয়ান এই পর্যায় চুপ হয়ে গেলো। মেঘলা ছলছল চোখে তাকালো আহিয়ানার পানে। তূর্য উঠে এসে মেয়ের পাশে বসে বললো,
-" সারা মামুনিতো বউ মণি বলে ডাকছে। তোমার যেটা মনে চায় সেটাই বলবে তবে নাম ধরে ডাকবে না কেমন। "
"আচ্ছা "
" মাই গুড গার্ল। এখন চলো নাস্তা খাবে। "
তূর্য উঠতে যাবে তখনি কলিং বেল এর শব্দ আসতেই সুনায়রা বললো,
-" আব্বু তুমি বসো আমি দেখছি। "
সুনায়রা দরজা খুলতেই দেখে আদি এসেছে। সুনায়রা হেসে বললো,
-" কাকাই আমাদের কথা মনে পড়লো তাহলে। "
আদি সুনায়রার কাধে হাত রেখে বাসার ভিতরে প্রবেশ করে বললো,
" আমার বেবিডল বলেছে তারাতারি বাসায় আসার জন্য। আর আমি না এসে থাকতে পারি। "
আদি এসে নাহিয়ানের গা ঘেঁষে বসে বললো,
" কীরে কী অবস্থা তোর? আর এতো তারাতারি এসে পড়লি চট্রগ্রাম থেকে। "
নাহিয়ান সরে বসে বললো,
" আমি কি সারাজীবনের জন্য চট্রগ্রাম গিয়েছি নাকি। ঘুরতে গিয়েছিলাম। ঘুরা শেষ চলে এসেছি। "
" বাবাগো বাবা ছোট বাচ্চার মুখে দেখি খই ফুটেছে । "
নাহিয়ান কপাল কুচকে বললো,
" আমি ছোট বাচ্চা ? লাইক সিরিয়াসলি "
" না তুই ছোট বাচ্চা হবি কেনো? আজকে বিয়ে দিলে কাল বাচ্চার বাপ হয়ে যাবি। "
আদির এই কথায় তূর্য ওই জায়গা থেকে উঠে চলে যায়। নাহিয়ান আদির দিকে কটমট করে তাকালে আদি মাথা চুলকে ভ্যাবলা মার্কা হাসি দিয়ে বললো,
" ফান করছি আমি। "
আহিয়ানা হেসে বললো,
" তোমার ফান একটু পর ফুস হয়ে যাবে দেখে নিয়ো। "
" কেনো? "
" বলবো না। "
★
নীরা ফারিহাকে সাদা পায়ের গোলাপি শাড়ি পড়িয়ে দিয়েছে। সাথে মটর দানার মালা আর ছোট ঝুমকো পড়িয়ে দিলো। পড়ানো হলে ফারিহার দিকে তাকিতে বললো,
-" মাশাআল্লাহ। কারোর নজর না লাগুগ। "
ফারিহা একটু লজ্জা পেলো। ফারিহা নীরার পা ছুয়ে সালাম করে মাথা নিচু করে বললো,
" মা আমি সংসার বলতে কিছুই জানি না। মায়ের সংসারে এক গ্লাস পানি নিয়ে খেতাম না। বাবা মায়ের এক মাত্র মেয়ে আমি। আমি ভুল করলে আমায় দেখিয়ে দিয়েন। সব কিছু শিখিয়ে দিয়েন আমায়। "
নীরা হেসে ফারিহার কপালে চুমু দিয়ে বললো,
-" তুই আমার এক মাত্র ছেলের বউ। আমি যতদিন বেঁচে আছি তোর কিছুই করতে হবে না। তুই শুধু আমার ছেলেকে আগলে রাখিস তাহলেই হবে। এই দায়িত্ব দিলাম তোকে। কথা দে আমার ছেলেকে কষ্ট দিবি না কখনো। "
ফারিহা নিজ থেকে নীরাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
-" কথা দিলাম কখনো কষ্ট দিবো না। "
নীরাও আগলে নিলো তার পুত্র বধুকে। নীরা বললো,
-" এখন চল নিচে যাই। "
"আচ্ছা "
নীরা ফারিহাকে নিয়ে নিচে নামলো আস্তেধীরে। আদি তখন খাবারের টেবিলে সিমিন চৌধুরীর সাথে কথা বলছিলো। নীরাকে দেখে বললো,
" আমার বেবি গার্ল কেমন আছো তুমি। "
নীরা কপালে ভাজ ফেলে বললো,
-" বড় ভাবি আমি। এই ডাকা বন্ধ করো আদি। আজ বাদে কাল বউ আসবে তোমার। আর এখনো এই নামে ডাকছো আমায়। "
আদি চেয়ার থেকে উঠে নীরার কাছে যেতেই দেখলো গোলাপি শাড়ি পড়ে ঘোমটা দিয়ে দাড়িয়ে আছে। ফারিহার দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো,
--"তুমি কে গো রমণি? "
ফারিহা নীরার দিকে সেটে দাঁড়িয়ে বললো,
-"জ্বী আমি ফারিহা। "
আদি একটু ভাবুক ভঙ্গিতে বললো,
_"ফারিহা নামের কোনো মেয়ে আমাদের বাসায় কেউ থাকে না। কিন্তু তুমি কে? পরিচয় কী? "
আহিয়ানা রুটি মুখে পুড়ে বললো,
- "ওর নাম ফারিহা। মিসেস নাহিয়ান চৌধুরী। "
আদি চোখ বড় বড় করে তাকালো নাহিয়ানের দিকে। সে এখন দিব্বি নাস্তা খেতে ব্যাস্ত। নাহিয়ানের কাছে গিয়ে দাড়িয়ে বললো,
- "কী! কী চৌধুরী?"
নাহিয়ান চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বললো,
- "কানে কী তালা ঝুলিয়েছো তুমি চাচ্চু? বললো শি ইজ মিসেস নাহিয়ান চৌধুরী। "
আদি সিমিনের কাছে গিয়ে দাড়িয়ে বললো,
-" ও মা আমি বিয়ে করবো। তোমার ছেলে বুড়ো হয়ে গেলো মাগোওওও। আমি দুই দিনের মধ্যে বিয়ে করতে চাই। "
আদির কথায় সবাই হেসে ফেললো । আদি মাটিতে বসে বুক থাপড়াচ্ছে আর আহাজারি করছে। নাহিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো,
-- "তুই সার্থপর তুই আমার আগে শুভ কাজ করে ফেললি কী করে? তোর আত্না, কলিজা কাপে নাই। "
নাহিয়ান ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললো,
" না কাপে নাই। বিয়ে করতে মনে চাইছে এর জন্য করে ফেলসি। তোমার ইচ্ছা হলে তুমিও করে ফেলো। বাধা দিসি আমরা। তোমার বয়স যে ৩০ এর কোটায় সেটা তুমি ভুলে বসেছো আর আমায় দেখো ২৫ বছরে বউ ঘরে তুলেছি। শেইম অন ইউ চাচ্চু। "
আদি নীরার কাছে গিয়ে বললো,
-" বড় ভাবি এটা কী হলো? "
-" কী হলো? "
-" আমি বিয়ে করি নাই সেটা নিয়ে কারোর মাথা ব্যাথাই নেই আর যার বিয়ের বয়স হয় নাই তাকে কিনা বিয়ে করিয়ে দিলা। "
আহির খাওয়া শেষ করে আদির কাছে এসে বললো,
-" চলো চাচ্চু বাগানে যাই আর তোমায় সব খুলে বলছি। "
আদি নাক কুচকে বললো,
-" ইয়াক ছিহহ। "
"তুই লজ্জা সরমের মাথা খেয়েছিস আহির। তুই সব খুলে বলবি কেনো? জামা কাপড় পড়েই বল কী হয়েছে? "
আদির কথায় আহির থতমত খেয়ে বললো,
" আগে তোমার মাইন্ড ঠিক করো। নষ্ট মাইন্ড ওয়ালা মানুষ। তোমার এই মাইন্ড নিয়ে পুলিশের চাকরি দিসে কোন ছাগলে।"
আদি ফুসে উঠে বললো,
" ভাঙা ব্যাটারি তোর একদিন কী আমার একদিন। তুই আমার চাকরি নিয়ে কথা বলছিস কোন হিসেবে। "
আহিরকে আর পায় কে। সেতো দৌড়ে বাহিরে চলে গেছে। পিছু পিছু আদিও চলে গেছে।
নীরা ফারিহাকে নাহিয়ানের সাথেই বসিয়ে দিলো। নাহিয়ান ফারিহার দিকে তাকালো। মাথায় ঘোমটা দেওয়ায় মুখ দেখতে পারছে নাই।
তূর্য, রাজু, রিজবি, রিহান খাওয়া শেষ করে বেড়িয়ে যায় যার যার কর্মসংস্থানে। তূর্য যাওয়ার আগে নীরার উদ্দেশ্যে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
" আজকে তোমায় ভার্সিটি থেকে নিয়ে আসবো। একা একা বাসায় আসবে না। "
নীরা মুচকি হাসি দিয়ে সম্মতি জানায়।
★
বিকেলের নরম রোদ ধীরে ধীরে ক্যাম্পাসজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। দিনের তীব্রতা অনেকটাই কমে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো গাছগুলোর পাতার ফাঁক গলে সোনালি আলো এসে পড়ছে পাকা রাস্তার ওপর। হালকা বাতাসে দুলছে কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়ার ডালপালা। দূরে কোথাও শিক্ষার্থীদের হাসির শব্দ, কোথাও বা ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরার ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে এক শান্ত অথচ প্রাণবন্ত বিকেল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রেস্টরুমে বসে আছেন নীরা । সারাদিনের ক্লাস শেষে হাতে এক কাপ চা নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠেছে । টেবিলের চারপাশে বসে থাকা কয়েকজন শিক্ষক নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন—কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কার্যক্রম, কখনো শিক্ষার্থীদের দুষ্টুমি, আবার কখনো ব্যক্তিগত জীবনের মজার ঘটনা। একজন সহকর্মী হেসে বললেন,
—"ম্যাম, আপনাকে আজ বেশ খুশি খুশি লাগছে। কোনো বিশেষ কারণ আছে নাকি?"
নীরা চৌধুরীর ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
—"বিশেষ কিছু না।"
কথাটা শুনে সবাই অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলেন।
ঠিক তখনই নীরার ফোনে একটি মেসেজ আসে।
"আমি এসে গেছি। বাইরে আছি।"
মেসেজটা দেখেই নীরা বুঝে গেলেন, তূর্য এসেছে তাকে নিতে। তিনি ব্যাগটা গুছিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
—"আচ্ছা, আজ তাহলে উঠি। কাল আবার দেখা হবে।"
সবাইকে বিদায় জানিয়ে তিনি রেস্টরুম থেকে বেরিয়ে এলেন। ক্যাম্পাসের প্রধান ভবনের সামনে এসে দাঁড়াতেই দেখতে পেলেন, একটি কালো গাড়ির পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তূর্য। বিকেলের সোনালি আলো এসে পড়েছে তার ওপর। দূর থেকে নীরাকে দেখেই মুখে পরিচিত হাসি ফুটে উঠল তার। নীরাও অজান্তেই হাসলেন।
এত বছরের সংসার জীবনের পরও কিছু মানুষকে দেখলে মন ঠিক আগের মতোই শান্ত হয়ে যায়। তূর্যকে দেখলে নীরার ঠিক তেমনটাই লাগে। তূর্য গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে বলল,
—"ম্যাডাম, আজকের ক্লাস কেমন গেল?"
নীরা হেসে গাড়িতে উঠতে উঠতে বললেন,
—"ভালোই। তবে এখন আর ক্লাসের কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।"
—"তাহলে?"
—"চলুন বাসায় যাই আগে ।"
তূর্য মুচকি হেসে গাড়ির দরজা বন্ধ করে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল। ধীরে ধীরে গাড়িটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত প্রাঙ্গণ ছেড়ে বাড়ির পথে এগিয়ে গেল, আর বিকেলের সোনালি আলো তাদের পথজুড়ে ছড়িয়ে রইল। গাড়ি চলতে থাকলো নিজ গতিতে। খুব দ্রুত না আবার খুব আসতেও না। তূর্য সেই আগের বেহায়াপনা করলো। নীরর কোমড় টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। নীরা প্রথমে হকচকিয়ে উঠলো। একটু রাগ মিশিয়ে বললো,
" কি করছেন কি নাহিয়ানের বাবা। "
" কিছুই করছি না। চুপ চাপ থাকো তো। "
নীরা তার প্রিয় পুরুষের বাহুতে মাথা এলিয়ে দিলো। বাহু ধরে চোখ বন্ধ করে নিলো। কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর তূর্য নিস্তব্ধতা কাটিয়ে বললো,
" ফুল। "
নীরা চোখ বন্ধ রেখেই জবাব দিলো,
" বলুন "
" কয়েকদিন সংসার থেকে ছুটি নেওয়া যায় না। "
নীরা চোখ খুলে বাহুতে থুতনি রেখে বললো,
" ওমা হঠাৎ এই কথা কেনো? "
তূর্য গাড়ি থামিয়ে নীরাকে নিজের কোলে বসালো। নীরার কপালের সাথে নিজের কপাল লাগিয়ে বললো,
" তোমায় নিয়ে দূরে কোথাও যেতে ইচ্চে করছে। তোমায় নিয়ে একান্ত সময় কাটাতে ইচ্ছা করছে। আবার ফিরে তোমার ওই ছোট বুকে মাথা রেখে রাত পার করে দিতে ইচ্ছা করছে। চলো না কোথাও হাড়িয়ে যাই দুইজন মিলে। "
নীরা হেসে তূর্যের কপালে ঠোঁট ছুয়ে বললো,
" তিনটা সন্তান হয়েছে আর এখনো সেই বেহায়াপনা শুরু করছেন। বুড়ো বয়সে ঢং কতো। "
তূর্য নীরাকে জড়িয়ে ধরে প্রিয় নারির স্মেল নিয়ে বললো,
" আমি বুড়ো দেখে কী আমার ভালোবাসা কমে যাবে? উহু একটুও কমবে না। আমার ভালোবাসা আগের ন্যায় থাকবে। এই তূর্য চৌধুরী তার নুড়ি ফুলের প্রতি অবসেস্ট। মরে গেলেও ভালোবাসা কমবে না। তিনটা বাচ্চা কেনো ১০ টা বাচ্চা হলে ভালোবাসা এক ফোটাও কমবে না ম্যাডাম। "
নীরা তূর্যকে জড়িয়ে ধরে আছে। আজও তার চোখে পানি। তূর্য ২০ বছর আগে যেমনটি ভালোবাসতো আজও ঠিক একি রকম ভালোবাসে। এক বিন্দু ভালোবাসা কমেনি নীরার থেকে।
চলবে............🫧
( রিয়েক্ট দিয়ে সবাই মন্তব্য জানিয়ো প্লিজ 😊)