ফন্ট সাইজ:
থিম:
নীল জোছনা

১৭তম পর্ব

লেখক: ইসরাত জাহান এশা

#নীল_জোছনা | ১৭ |

#ইসরাত_জাহান_এশা

রাত বাড়ছে নিস্তব্ধতা বিরাজমান করছে ধরনীতে। রাতে সবাই শেখ বাড়ি থেকে খাওয়া দাওয়া শেষ করেই এসেছে। ফারিহার পরিক্ষা পরেই জানুয়ারি মাসেই আদি আর মুন্নির বিয়ে হবে। দুই পরিবার মিলে এই সিদ্ধান্তই জানিয়েছে। এতে কারোর সমস্যা নেই। শেখ বাড়ি থেকে সবাই চলে আসলেও নাহিয়ান আর বাসায় ফিরেনি এডভোকেট রফিকুল এর সাথে কেসের উদ্দেশ্যে চলে যায় সাথে অবশ্য সায়ন আর আয়েশা ছিলো। কেস মূলত ধ*র্স*ন নিয়ে। সেটা নিয়েই তারা চার জন খুব চিন্তিত। যুবতি মেয়েকে প্রথমে অপহরণ তারপর ধ*র্স*ন। বাবা মায়ের এক মাত্র মেয়েকে হারিয়ে তারা অনেক ভেঙে পড়েছে। সেটা নিয়েই নাহিয়ান ভরসা দিয়েছে ন্যায্য বিচার পাবেই।

নাহিয়ানের বাসায় আসতে আসতে রাত দশটা বেজেছে। নাহিয়ানা ঘরে ঢুকে দেখতেই পায় কম্বোল দিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে চোখ বন্ধ করে পড়ছে। ঘরে যে কেউ প্রবেশ করেছে সেদিকে তার ধ্যান নেই। নাহিয়ানও নিঃশব্দে ঘরে প্রবেশ করে ফ্রেশ হয়ে নিলো। সারাদিন বাসার বাহিরে থাকায় একেবারে গোসল নিয়ে নিলো। গোসল করে ফারিহার পাশে বসতেই ফারিহা চমকে নাহিয়ানের পানে তাকালো। চোখ বড় বড় করে বললো,

“ আপনি কখন আসলেন? “

“ এসেছি অনেক্ষণ আগেই। দেখলাম তুমি পড়ছো তাই আর কথা বলিনি। “

নাহিয়ান ভেজা চুল মুছেই শীতের জামা কাপড় পড়ে নিলো। ঘরে থাকা কফির ফ্লাক্স থেকে কফি ঢেলে খাওয়া শুরু করলো সাথে পড়তেও বসলো। ফারিহা পুরোটা সময় ধরে নাহিয়ানকেই দেখে গেছে। নাহিয়ান ফারিহার দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচালে ফারিহা মাথা দুই পাশে না বোধক করে নিজের পড়ায় মনোযোগ আনার চেষ্টা করলো। দুই জনেই নিরব হয়ে পড়ছে কেউ কোনো কথা বলছে না। ফারিহা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো ১১টা বেজে ৫৫ মিনিট। রাত পোহালে ১২ ডিসেম্বর নাহিয়ানের জন্মদিন। ফারিহা তার শ্বাশুড়ির থেকে এই খবর জেনেছে। নাহিয়ান পড়ছে দেখে ফারিহা নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। কিছুক্ষনের মধ্যে ফিরে আসে লাল সাদা মিক্স করা ফুলের তোরা।ফারিহা ঘরে এসে দেখলো ১২টা বেজে ৬ মিনিট। তাই গলায় আদুরে ভাব এনে নাহিয়ান কে বললো,

"শুভ জন্মদিন মিস্টার পারফেকশন "

নাহিয়ান চমকে পিছনে ফিরে তাকালো। ফারিহা হাতে ফুলের তোরা নিয়ে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। নাহিয়ান মুচকি হেসে ফারিহার মুখোমুখি হয়ে বললো,

" শুধু উইশ করবে আর কিছু দিবে না? "

ফারিহা দুই কদম এগিয়ে এসে বললো,

" কী চাই আপনার? "

" যা চাইবো দিবে আমায়? "

"সামর্থ্য হলে সব দিবো? "

নাহিয়ান ফারিহাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বললো,

" ক্যান আই কিস ইউ মায়াবিনি। শুধু এক বার অনুমতি দাও। "

"যদি অনুমতি না দেই? "

" অপেক্ষা করবো আমি যতদিন পর্যন্ত অনুমতি না দিচ্ছো। “

ফারিহা ফুলের তোরা বিছানায় রেখে নাহিয়ানের অতি কাছে এসে বললো,

" যদি কোনোদিনও অনুমতি না দেই? "

নাহিয়ান মুচকি হেসে ফারিহাকে জড়িয়ে ধরে। ফারিহা নাহিয়ানের পিঠ আকরে ধরলো। নাহিয়ান ফারিহার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,

" যার বুকে মাথা রেখে সারা রাত ঘুমাও তার থেকে কি পারমিশন নিয়েছিলে বুঝি! "

ফারিহা নাহিয়ানের বুকে নাক ঘষে বললো,

" আমার স্বামীর বুকে আমি মাথা রেখে ঘুমাই এতে কার বাপের কী সেটা আমার জানা দরকার নেই। শুধু জানি আমার স্বামীর বুকে মাথা না রেখে ঘুমালে আমার ঘুম হয়না। "

নাহিয়ান ফারিহার এরুপ কথা হাসলো। ফারিহা নাহিয়ানের বুকে চিবুক ঠেকিয়ে বললো,

" একটা কথা বলি? "

" হুম বলো। "

" আমি ভেবেছি আপনি আমায় কোনোদিনও মানবেন না। আমাদের অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে বিয়ে হওয়া। আমি গ্রাম্য মেয়ে তারউপর কালো। সব মিলিয়ে ভেবেছি আপনি হয়তো আমায় ছেড়ে দিবেন। আশা করে আপনার হাত ধরে অজানা দেশে পারি দিয়েছিলাম। মনের মধ্যে একটা কথাই বারি দিতো। আমি কি আপনাকে ভালোবাসতে পারবো? আমার কিশোরী মনে প্রথম প্রনয়নের পুরুষের জায়গা আপনি নিতে পারবেন তো? এসব কথা মাথায় সারাক্ষণ ঘুরতো। আপনারা সবাই ফর্সা এ বাসার কেউ আমার মতো গায়ের রঙ নেই। নিজেকে ছোট মনে হতো খুব। ছেলেরা সুন্দরের পুজারি হয়। আমাকে যদি আমার গায়ের রঙ দেখে ছেরে দিন কখনো। "

এসব বলে একটু থামলো। আবার বলতে নিলে নাহিয়ান আর বলতে দেয় না। ফারিহার ঠোঁটে নিজের তর্জনী আঙুল দিয়ে রাখে। ফারিহার পুরো মুখ অবলকন করে বললো,

" তুমি আমার শ্যামাঙ্গিনী। আমার মায়াবিনি তুমি। তোমার চোখের মায়ায় আমায় গ্রাশ করেছে। তোমার এই ফোলা ফোলা গাল, হরিণীর ন্যায় টানা টানা ঘন চোখের পাপড়ি যুক্ত চোখের মায়ায় পড়েছি আমি। গায়ের রঙ দিয়ে কী হবে শুনি। আমাকে তোমাকে এই বাড়ি প্রত্যেকে আল্লাহ নিজের হাতে সুন্দর করে বানিয়েছে। তোমায় মায়ায় পড়েছি আমি। এহজীবনে ছাড় পাবেনা। তোমার ওই টানা টানা চোখের গভীরতা বুঝার ক্ষমতা আমার নেই। তোমাকে আমার মনের রাজত্বে বসিয়েছি। ভালোবাসতে চাই তোমায়। শুধু কী বাঙালি মেয়েদের একবার বিয়ে হয়? ছেলেদের হয় না? আমি তো মুসলিম তিন কবুল বলে আল্লাহর বিধিমালা অনুযায়ী তোমায় নিজের সাথে জুড়িয়েছি। এই দেহে প্রাণ থাকা অবস্থায় তুমি শুধু এই নাহিয়ানের মায়াবতী শ্যামবতি হয়েই থাকবে৷ দুনিয়া এপার থেকে ওপার হয়ে যাবে আমি তোমায় ছাড়ছি না।"

ফারিহা নাহিয়ানের কথায় খুশি হয় অনেক। নাহিয়ানকে নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরলো। এভাবেই রাত পার হলো তাদের একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। তিন কবুলের জোর বড়ই জোর। যেখানে তারা একে অন্যকে চিনতোই না দূর্ঘটনার মাধ্যমে বিয়ে হয়েছে। একে অপরকে ভালোবাসতে পারবে কিনা সন্দেহ ছিলো কিন্তু আজ তারা একে অপরকে ভালোবাসতে পেরেছে। মনের অকপটে বলে দিয়েছে। একটা সম্পর্কে ভালোবাসা থাকলে আর কোনো কিছুর অভাব মনে হয়না। সম্পর্কের জোর হচ্ছে ভালোবাসা। ভালোবাসা না থাকলে বিশ্ব সুন্দরী রমণীর সাথে সংসার করে লাভ নেই।

★

শীতের সকাল লেপের নিচে ঢুকলে আর বের হতে মনে চায় না। কিন্তু উঠতেই হয় সারাদিনতো আর শুয়ে থাকা যায় না। কর্মসংস্থানে যেতে হয় স্কুল কলেজে যেতে হয়। শীতের সকাল মানেই গরম গরম পিঠে খাওয়ার সময়। পাখিরা ভোর থেকেই কিচিরমিচির শুরু করে দেয়। সকাল পেরিয়ে দুপুর হয়ে যাবে তবুও সূর্যি মামার দেখা মিলে না। কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে ধরনী।

••

ফারিহার ঘুম ভাঙে এলার্মের আওয়াজে। ফারিহা আড়মোড়া ভেঙে উঠবে কিন্তু উঠতে পারে না। ঘাড় উচিয়ে দেখে নাহিয়ান ফারিহাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে এক বালিশে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। ফারিহার হাত পা সব বাধা পরে আছে নাহিয়ানের কাছে। ফারিহা কিছুক্ষণ নাহিয়ানের ফিকে তালিয়ে থাকলো। মুখে চাপ দাড়ি হালকা বোচা নাক। ঠোঁট গুলো গোলাপি। যেখানে আজকালকার ছেলেদের ঠোট কালো হয়ে থাকে। নাহিয়ানের ভ্রু জোড়া কুচকে আছে ঘুমের মধ্যেই। ফারিহা হাসলো। নাহিয়ানের কিছু চুল কপাল পড়ে আছে। সেটা ফারিহা ফু দিয়ে সরিয়ে দিলো। নাহিয়ানের ভ্রু জোড়া আরো কুচকে যায়। ফারিহার বেশ লাগলো। তাই আরো বেশি করে ফু দিলো নাহিয়ানের মুখমণ্ডলে। নাহিয়ানের এক সময় ঘুম ছুটে যায়। পিট পিট করে তাকায়। চোখ খুলতেই ফারিহার হাসি মাখা মুখ দেখতে পায়। কুচকানো ভ্রু জোড়া শিথিল হয়। নাহিয়ান ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে ঘুম ঘুম কন্ঠে বললো,

“ কী হচ্ছে টা কী শুনি? এরকম করছো কেনো? “

ফারিহা মোচরাতে মোচরাতে বললো,

“ আমায় ছাড়ুন। এভাবে ধরে রেখেছেন কেনো?”

নাহিয়ান চোখ বন্ধ করে বললো,

“ তুমি ঘুমের মাঝে ফুটবল খেলো বউ সোনা। এই শীতে নিচে অথবা সোফায় ঘুমাতে মনে চায়নি এর জন্য তোমায় ধরে বেধে ঘুমাচ্ছিলাম শান্তিতে। “

ফারিহাকে ফুসে উঠলো নাহিয়ানের কথায়। মানছে সে ঘুমের মাঝে নড়াচড়া করে বেশি এর জন্য নাহিয়ানকে নিচে অথবা সোফায় ঘুমাতে হবে? আশ্চর্য! নাহিয়ান এক চোখ খুলে দেখলো আর বুঝার চেষ্টা করলো ফারিহার মনোভাব। যখন দেখলো তার বউ রাগে ফুসছে আর কিছুই বললো না ফারিহাকে ছেড়ে দিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ কম্বোল দিয়ে আবৃত করে নিয়ে বললো,

“ আজ কাল সত্য কতবার ভাত নেই। সত্য কথা বললে রেগে বোম হয়ে যায়। আজবতো! “

ফারিহা নাহিয়ানের মুখ থেকে কম্বোল সরাতে চাইলে নাহিয়ান সরাতে দেয় না। শক্ত করে ধরে রাখে। ফারিহা এক প্রকার চিল্লিয়ে বললো,

“ বেশ করেছি আমি ফুটবল খেলেছি। এখন ফুটবল খেলি সামনে হা-ডু-ডু, গোল্লাছুট, সব খেলবো। আপনার তাতে কী? আপনি থাকতে না পারলে নিচে ঘুমাবেন। “

ফারিহা কথা বলা শেষ হলেই চলে যায় ওয়াশরুমে ফ্রেশ হওয়ার জন্য। নাহিয়ান কম্বোলের নিচ থেকে উকি মেরে দেখলো বউ তার ঘরে নেই। হাসলো মন খুলে। বউ তার বাচ্চা হলে হেবি তেজ আছে বলতে হবে। পুরোই নাগা মরিচ একটা।

চলবে………🦋

🫧🫧 কাল ছুক্কুর বার কালকে বড় করে দিবো ইনশাআল্লাহ। আজ এইটুকুই থাকুক কেমন হ্যাপি রিডিং। আর মন্তব্য করবে সুন্দর সুন্দর। 🫧🫧

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন