#নীল___জোছনা___পর্ব___৩৩
#ইসরাত__জাহান__এশা
রাত প্রায় দুটো ছুঁইছুঁই। হাসপাতালের করিডোরজুড়ে থমথমে নীরবতা। মাঝে মাঝে শুধু আইসিইউর মনিটরের ক্ষীণ শব্দ আর চিকিৎসাকর্মীদের দ্রুত পদচারণা সেই নীরবতাকে ভেঙে দিচ্ছে।
করিডোরের বেঞ্চে মাথা নিচু করে নিশ্চুপ বসে আছে নাহিয়ান। দুই হাত একসঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে। চোখ স্থির হয়ে আছে মেঝের দিকে। মুখে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু তার নীরবতাই বলে দিচ্ছে—ভেতরে ভেতরে সে কতটা ভেঙে পড়েছে। জীবনে বহু কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, কিন্তু নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে আইসিইউর ভেতরে দেখে আজ নিজেকে বড় অসহায় লাগছে।
করিডোরের এক পাশে বসে অঝোরে কাঁদছে লিপি । দুই হাত তুলে বারবার আল্লাহর কাছে মিনতি করছেন,
“হে আল্লাহ... আমার আম্মুকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেবেন না। তাঁকে ছাড়া আমি কল্পনাও করতে পারি না।”
নীরা তাঁর কাঁধে হাত রেখে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। অথচ তাঁর নিজের চোখও অশ্রুতে ভিজে উঠেছে। শাশুড়ি নয়, আমেনা চৌধুরী তাঁকে নিজের মেয়ের মতো আগলে রেখেছেন বিয়ের পর থেকেই । আজ সেই মানুষটিকে এমন অবস্থায় দেখে বুকটা ফেটে যাচ্ছে।
তূর্য চৌধুরী হাসপাতালের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। বাইরে শীতের শেষ রাত। কুয়াশার চাদরে ঢাকা চারপাশ। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠছে একের পর এক স্মৃতি। বাবার মৃত্যুর পর মায়ের সংগ্রাম, ছেলেকে মানুষ করার জন্য অসংখ্য ত্যাগ। আজ সেই মাকেই জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে দেখতে হচ্ছে তাঁকে।
সময়ের কাঁটা যেন এগোতেই চাইছিল না। প্রতিটি সেকেন্ড আজ বড় দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। প্রায় চল্লিশ মিনিট পর আইসিইউর দরজা খুলে একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ বাইরে এলেন। সবাই একসঙ্গে উঠে দাঁড়াল। ডাক্তার সবার দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ, এখন রোগীর অবস্থা আগের তুলনায় অনেকটাই স্থিতিশীল। আপাতত ভয় পাওয়ার মতো কিছু নেই। সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল বলেই দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়েছে।”
কথাটা শুনেই সবার বুক থেকে যেন একটা ভার নেমে গেল। নীরা চোখ বন্ধ করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। লিপিও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। ডাক্তার আবার বললেন,
“আপনারা জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগে রোগীর একবার স্ট্রোক হয়েছিল। সেই ইতিহাসের কারণে তাঁর রক্তনালী এবং হৃদ্যন্ত্র দুটোই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। এছাড়া বয়সের কারণে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যাও রয়েছে। শীতের শেষ সময়ে তাপমাত্রার ওঠানামার ফলে রক্তনালী সংকুচিত হয়ে যায়, এতে হৃদ্যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। সম্ভবত এসব কারণ একত্রিত হওয়ার ফলেই তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করলেন,
“তবে আপাতত আশার কথা হলো, রোগী চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছেন। আগামী চব্বিশ থেকে আটচল্লিশ ঘণ্টা আমাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। এই সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ধরনের মানসিক চাপ দেওয়া যাবে না। ইনশাআল্লাহ, সবকিছু এভাবেই ভালো থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁকে সাধারণ কেবিনে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে।”
ডাক্তারের কথা শুনে করিডোরজুড়ে জমে থাকা ভারী বাতাসে যেন একটু স্বস্তির পরশ বয়ে গেল। কিন্তু প্রত্যেকের মনেই একটি উপলব্ধি স্পষ্ট হয়ে উঠল।
★
★
কেটে গেল পুরো একটি সপ্তাহ। এই সাতটি দিন যেন চৌধুরী পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্যের জন্য ছিল দীর্ঘ এক পরীক্ষা। আমেনা চৌধুরীকে চিকিৎসকদের পরামর্শে পুরো এক সপ্তাহ হাসপাতালেই ভর্তি রাখা হয়েছিল। হার্ট অ্যাটাকের পর তাঁর শারীরিক অবস্থা অনেকটাই স্থিতিশীল হলেও বয়স, পূর্বের স্ট্রোকের ইতিহাস এবং দুর্বলতার কথা বিবেচনা করে চিকিৎসকেরা কোনো রকম ঝুঁকি নিতে চাননি। নিবিড় পর্যবেক্ষণেই কেটেছে প্রতিটি দিন। এই এক সপ্তাহে নীরা যেন হাসপাতালকেই নিজের দ্বিতীয় ঘর বানিয়ে ফেলেছিলেন। তাঁর সঙ্গে পালা করে ছিলেন পরিবারের বাকি চার জা। কেউ খাবার নিয়ে এসেছেন, কেউ ওষুধের সময় মনে করিয়ে দিয়েছেন, কেউ আবার রাত জেগে আমেনা চৌধুরীর পাশে বসে থেকেছেন। সংসারের সব ব্যস্ততার মাঝেও কেউ তাঁকে এক মুহূর্তের জন্যও একা অনুভব করতে দেননি। অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটল। আজ আমেনা চৌধুরীকে হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হবে।
সকালের কোমল রোদ জানালার কাঁচ ভেদ করে কেবিনের ভেতর এসে পড়েছে। নীরা, রুশা, নাহিয়ান । তারা সকাল দশটা নাগাদ হাসপাতালে চলে এসেছে । নীরা নিজের হাতে শাশুড়িকে গরম পানি দিয়ে মুখ-হাত মুছিয়ে দিয়েছেন। ধীরে ধীরে পরিষ্কার কাপড় পরিয়ে দিয়েছেন, চুলগুলো যত্ন করে আঁচড়ে দিয়েছেন। তারপর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হালকা নাস্তা নিজের হাতে খাইয়ে ওষুধও খাইয়ে দিলেন।
সব প্রস্তুতি শেষ হতেই হাসপাতালের একজন ওয়ার্ডবয় একটি হুইলচেয়ার নিয়ে কেবিনে প্রবেশ করল। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আমেনা চৌধুরীকে হুইলচেয়ারে বসানো হলো। বয়সের ভার আর অসুস্থতার ক্লান্তি তাঁর মুখে স্পষ্ট হলেও চোখেমুখে আজ একটুখানি প্রশান্তির ছাপ ফুটে উঠেছে। দীর্ঘ সাত দিন পর তিনি আবার নিজের ঘরে ফিরবেন।
ধীর গতিতে হুইলচেয়ারটি হাসপাতালের করিডোর পেরিয়ে লিফটের দিকে এগিয়ে চলল। পরিবারের সবাই নীরবে তাঁর পাশে পাশে হাঁটছে। কারও মুখে তেমন কোনো কথা নেই, তবু প্রত্যেকের চোখেমুখে স্বস্তির আলো স্পষ্ট। হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে এসে হুইলচেয়ার থামতেই নাহিয়ান দ্রুত এগিয়ে এল। এক হাঁটু গেড়ে বসে দাদির মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“চলো দাদি, এবার তোমার নিজের ঘরে ফিরতে হবে ।”
আমেনা চৌধুরীও স্নেহভরা চোখে নাতির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। পরম যত্নে নাহিয়ান দুই হাতে দাদিমণিকে কোলে তুলে নিল। যেন কাঁচের তৈরি অমূল্য কোনো সম্পদ বুকে আগলে রেখেছে। আমেনা চৌধুরী এক হাত দিয়ে নাতির কাঁধ জড়িয়ে ধরলেন।
নাহিয়ান ধীর পায়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গিয়ে অত্যন্ত সাবধানে আমেনা চৌধুরীকে পিছনের সিটে বসিয়ে দিল। মুহূর্তেই সবার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। টানা এক সপ্তাহের দুশ্চিন্তার পর সেই হাসিটুকু যেন নতুন করে স্বস্তির নিশ্বাস এনে দিল পুরো পরিবারে।
••••
ফারিহা সকাল থেকেই ব্যস্ত। হাতে নরম একটি ধুলোমোছার কাপড় নিয়ে আমেনা চৌধুরীর ঘরটা যত্ন করে গুছিয়ে দিচ্ছে। বিছানার চাদর বদলে নতুন, পরিষ্কার সাদা চাদর বিছিয়ে দিল। বালিশগুলো সুন্দর করে ঝেড়ে সাজিয়ে রাখল। পাশে এক জগ হালকা গরম পানি, গ্লাস, টিস্যু আর প্রয়োজনীয় সব জিনিস হাতের নাগালে রেখে দিল। ঘরের এক কোণে রাখা ছোট্ট ফুলদানিতে শুকিয়ে যাওয়া ফুলগুলো সরিয়ে সেখানে টাটকা সাদা রজনীগন্ধা আর গোলাপ সাজিয়ে রাখতেই পুরো ঘরটা মিষ্টি সুবাসে ভরে উঠল। নিজের কাজেই মনোযোগী ছিল ফারিহা। ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে ভেসে এলো একটি ইতস্ততভরা, কাঁপা কণ্ঠ ডেকে উঠলো,
“বউ... বউমণি...”
ডাকটা শুনে ফারিহার হাত থেমে গেল। বিস্মিত চোখে ধীরে ধীরে পেছন ফিরে তাকাতেই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা বর্ষাকে দেখতে পেল।
আজ বর্ষাকে অন্যরকম লাগছে। মুখে কোনো অহংকার নেই, চোখেমুখে নেই আগের সেই তীক্ষ্ণতা। বরং ভীষণ অস্বস্তি আর অপরাধবোধে মাথাটা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে। দুই হাতের আঙুলগুলো বারবার মুচড়ে ধরছে।
ফারিহা মৃদু হেসে বলল,
“আরে আপু! বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ভেতরে আসুন।”
বর্ষা ধীরে ধীরে কয়েক পা এগিয়ে এল। কিন্তু কিছু বলতে গিয়েও যেন কথাগুলো গলায় আটকে গেল। কয়েক মুহূর্ত নীরবে ফারিহার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর হঠাৎ করেই কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই ফারিহাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। অপ্রত্যাশিত এই আচরণে ফারিহা কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গেল। বর্ষার গলা কেঁপে উঠল।
“আমি... আমি খুব করে সরি, বউমণি। আমার তোমার সঙ্গে ওরকম ব্যবহার করা একদমই উচিত হয়নি।”
ফারিহা কিছু বলল না। শুধু শান্তভাবে বর্ষার কথা শুনতে লাগল।বর্ষা ধীরে ধীরে বলল,
“জানো... নাহিয়ান ভাইয়ার প্রতি আমার একটা ভালো লাগা ছিল। হয়তো সেটা ভালোবাসায় রূপ নেওয়ার আগেই তুমি ভাইয়ার জীবনে চলে এলে। তোমাদের বিয়ের খবরটা আমি সহজভাবে মেনে নিতে পারিনি। খুব রাগ হতো... খুব কষ্টও লাগত। আর সেই রাগটাই অকারণে তোমার ওপর ঝাড়তাম। অথচ তুমি কখনো আমার কোনো ক্ষতি করোনি।”
একটু থেমে চোখের কোণের জল মুছে আবার বলল,
“কিন্তু দিন যত গিয়েছে, তত বুঝতে পেরেছি আমি কত বড় ভুল করছিলাম। নাহিয়ান ভাইয়ার প্রতি সেই একরোখা অনুভূতিটাও ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে। এখন মনে হয়, আল্লাহ যাকে যার জন্য লিখে রেখেছেন, তাকেই তিনি মিলিয়ে দেন। আর তুমি... তুমি সত্যিই ভাইয়ার জন্য একদম উপযুক্ত মানুষ।”
বর্ষা নিচু গলায় বলল,
“আমাকে ক্ষমা করে দিও, প্লিজ।”
ফারিহার ঠোঁটের কোণে কোমল এক হাসি ফুটে উঠল। সে কোনো দ্বিধা না করে বর্ষাকেও আপন করে জড়িয়ে ধরল। মমতাভরা কণ্ঠে বলল,
“আমি তো কিছুই মনে করে রাখিনি, আপু। মানুষ ভুল করতেই পারে। কিন্তু নিজের ভুল বুঝে ক্ষমা চাইতে পারাটা অনেক বড় গুণ। আপনি আমাকে ছোট করেননি, বরং আজ আমার কাছে আরও সম্মানিত হয়ে গেলেন।”
বর্ষা ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। চোখেমুখে যেন অনেক দিনের জমে থাকা ভার নেমে গেছে। ঠোঁটে ফুটে উঠল নির্মল একটি হাসি। হেসে বলল,
“জানো, নাহিয়ান ভাইয়া সবসময় বলত—‘ফারিহা খুব সহজ-সরল আর ভীষণ মিশুক একটা মেয়ে। ওর ওপর কেউ বেশিদিন রাগ করে থাকতে পারবে না।’ তখন বিশ্বাস করতাম না। আজ বুঝলাম, ভাইয়া একটুও ভুল বলেনি।”
ফারিহা লজ্জায় মুচকি হেসে মাথা নিচু করে ফেলল। বর্ষা আবার দুষ্টুমিভরা হাসি দিয়ে বলল,
“তুমি তো আমার নাহিয়ান ভাইয়ার বউ। হিসেবে তুমি আমার ভাবি। কিন্তু জানো, ‘ভাবি’ ডাকটা আমার মুখে কেমন যেন লাগে! তাই ঠিক করেছি, সুনায়রার মতো আমিও তোমাকে ‘বউমণি’ বলেই ডাকব।”
•
চলবে.......
#বিঃদ্র রেসপন্স করবেন আশা করি।
#বিঃদ্রঃ আর মাত্র দুইদিন সময় আছে #রাগে_অনুরাগে_তুমি বইটার প্রি অর্ডার এর সময়। যারা করেন না দ্রুতই করে ফেলুন। অর্ডার করলেই পাচ্ছেন.....
১। লেখকের অটোগ্রাফ নাম লিখে নেওয়ার সুযোগ।
2। লেখকের চিঠি।
3। চাবির রিং
যারা করেন নাই #স্বরবিন্দু_প্রকাশক এ অর্ডার করুন ৩৯০ টাকায়।