#নীল__জোছনা___পর্ব___৩৭
#ইসরাত__জাহান__এশা
.…
ফারিহা বিছানায় আধ শোয়া হয়ে ফুপাচ্ছে নাহিয়ান আয়নার সামনে রেডি হচ্ছে। সিমিন, আমেনা চৌধুরী, মুক্তা যাবেনা। তাদের সাথেই নাহিয়ান ফারিহাকে রেখে যাবে। সেটা শুনে ফারিহা মুখ ফুলিয়ে রেখে ফুপাচ্ছে।
নাহিয়ান আয়নার প্রতিবিম্বে তা দেখছে। ফারিহা ফুপাতে ফুপাতে বললো,
“ আমি রেহান ভাইয়ার ফ্লাটে শান্ত হয়ে থাকবো। বেশি তিড়িংবিড়িং করবো না। আমাকে নিয়ে যান সাথে করে। “
নাহিয়ান মুচকি হাসি দিয়ে বললো,
“ তুমি তাহলে স্বীকারোক্তি দিলে যে, তুমি তিড়িংতিড়িং করে উড়ে বেড়াও। “
ফারিহা নাক টেনে বললো,
“ হ্যাঁ অস্বীকার করিনিতো আমি । “
“ যতই স্বীকার করোনা কেনো নিয়ে যাবো না তোমায়। “
“ নিয়ে গেলে কী হবে? “
“ তাহলে আমি শান্তিতে প্রেম করতে পারবো না। তুমি সেখানে গিয়ে ঝামেলা সৃষ্টি করবে। “
ফারিহা তা শুনে কেদে কেদে বললো,
“ আপনার গার্লফ্রেন্ড আছে? “
নাহিয়ান মিটিমিটি হেসে বললো,
“ হ্যাঁ জানো না তুমি? আমার তো গার্লফ্রেন্ড আছে। আজকে রেহানের বাসায় আসবে। “
ফারিহা ফুপিয়ে বললো,
“ আপনি তাহলে আপনার গার্লফ্রেন্ডের কথা আজকে মা'কে বলবেন?”
“ হ্যাঁ তার জন্যই ডেকেছি। “
“ আপনার গার্লফ্রেন্ডের জন্যই তাহলে আমাকে ভালোবাসেন না? আপনার গার্লফ্রেন্ডের জন্য আমাদের মাঝে এতো দুরত্ব? এর জন্যই আমরা আর পাচ দশটা দম্পতির মতো না? “
নাহিয়ান যেনো স্তব্ধ হয়ে গেলো ফারিহার কথা শুনে। সেতো শুধু মজা করছিলো। নাহিয়ানের মনে গো ফারিহার বসবাস। সেতো ফারিহাকে ভালোবাসে। নাহিয়ান ফারিহার সামনে এসে বললো,
“ এইসব কী বলছো তুমি? আমি তো শুধু.. “
ফারিহা হাত উচিয়ে থামিয়ে দিলো। ফারিহা কোমর ধরে বিছানা থেকে নামলো। দরজা খুলে ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা আমেনা চৌধুরীর ঘরে গেলো। আমেনা চৌধুরী হচ্ছে তার সুখ দুঃখের সাথি। মন খারাপ হোক অথবা ঝগড়া করে আমেনা চৌধুরীর কাছে অভিযোগের ঝুড়ি নিয়ে বসবে। বিয়ের এই দশ মাসে এটাই চলে আসছে। নাহিয়ান এবার নিজের উপর রাগ হলো। কেনো সে এই কথাটা বলতে গেলো। সেতো জানে তার বউয়ের কিশোরী মন। সদ্য প্রেমে পরেছে তার কিশোরী বউ। একজন গার্লফ্রেন্ড তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে নিজের আপন বোনকে সহ্য করতে পারে না। আর এখানে তার নিজের স্বামীর পাশে অন্য নারির কথা শুনলে মনতো খারাপ হবেই। চোখ বেয়ে অশ্রুপাত হবেই।
ফারিহা চোখের পানি ফেলতে ফেলতে আমেনা চৌধুরীর রে প্রবেশ করলো। আমেনা চৌধুরীর রুমে নীরা, তূর্য, রাজু, রুশা ছিলো। রাজুকে জোর কপ্রে রাখা হয়েছে। যেহেতু এক কুটুম বাড়িতে যাবে কীভাবে কি নিতে হবে সেটা নিয়েই আলোচনা করছে । ফারিহার আগমনে সবাই ফারিহার দিকে তাকালো। ফারিহার চোখে পানি দেখে নীরা ভ্রু কুচকে তাকালো। ফারিহার সামনে গিয়ে আদুরি গলায় বললো,
“ ফারিহা তুই এখানে কেনো এসেছিস ব্যাথা নিয়ে? কিছু লাগতো বুঝি? “
ফারিহা আদুরি গলা পেয়ে আরো আহ্লাদে আটখারা হয়ে উঠলো। চোখ বেয়ে অনবরত পানি পরছে। ফারিহাকে মাথা নেরে না বুঝিয়ে আমেনা চৌধুরীর কোলে মাথা রেখে ফুপিয়ে উঠলো নিশব্দে। কারো বোধগম্য হলো না মেয়েটার হলো কী।
ফারিহা রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরই নাহিয়ান দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে আসে। তার জানা এখন সে কোথায় যাবে। তাই কোনোদিকে না তাকিয়ে আমেনা চৌধুরীর রুমের দিকে পা চালালো। আমেনা চৌধুরীর রুমে আসতেই দেখতে পায়। নীরা, তূর্য, রাজু, রুশা সবাই এই ঘরে উপস্থিত। তূর্য নাহিয়ানকে দেখে বললো,
“ নাহিয়ান তুমি কী ফারিহাকে কিছু বলেছো?”
নাহিয়ান পা বাড়িয়ে আমেনা চৌধুরির থেকে ফারিহাকে পাজা কোলে নিয়ে বললো,
“ নিয়ে যাবো না দেখে ফুলোনি ফুলেছি। আর কিছু না। তোমরা রেডি হয়ে নাও। “
আর কাওকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বের হয়ে গেলো। নাহিয়ান বেরিয়ে যেতেই তূর্য নীরার উদ্দেশ্যে বললো,
“ নিয়ে গেলে কী এমন ক্ষতি হবে তোমার ছেলের।”
নীরা চোখ ছোট ছোট করে বললো,
“ বুড়ো হয়েছো। চুল পেকেছে তোমার। এখনো বোধশক্তি কিছুই হয়নি নাকি। “
নীরার কথায় রাজু, রুশা হেসে ফেললো।
★
নাহিয়ান ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছিল। তার দুই বাহুর নিরাপদ আশ্রয়ে নিস্তব্ধ হয়ে ছিল ফারিহা। মেয়েটা ইচ্ছে করলেই নাহিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরতে পারত, কিন্তু সে তা করল না। দুই হাত বুকের কাছে গুটিয়ে শুধু চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে ফুঁপিয়ে কেঁদে যাচ্ছিল। তার উষ্ণ অশ্রুবিন্দুগুলো নাহিয়ানের শার্ট ভিজিয়ে দিচ্ছিল, অথচ সে যেন সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই করছিল না।
ঘরে ঢুকেই নাহিয়ান পা দিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর ধীরে ধীরে বিছানার কিনারায় বসে ফারিহাকে নিজের কোলেই বসিয়ে নিল। কোনো কথা না বলে তাকে আরও একটু কাছে টেনে নিয়ে নিজের প্রশস্ত বুকে জড়িয়ে ধরল। মুহূর্তেই ফারিহার কানে ভেসে এলো নাহিয়ানের বুকের ভেতরের তীব্র হৃদস্পন্দন। স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত কাঁপছিল তার হৃদয়। যেন বুকের খাঁচা ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সেই অস্থির স্পন্দনে মিশে ছিল ভয়, ভালোবাসা, হারিয়ে ফেলার আতঙ্ক আর হাজারো না বলা অনুভূতি। ফারিহা কান্না থামিয়ে নিশ্চুপ হয়ে রইল। চোখ বন্ধ রেখেই সে শুধু সেই হৃদস্পন্দন শুনতে লাগল। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব ভাষার চেয়ে এই শব্দটাই আজ সবচেয়ে সত্য, সবচেয়ে নির্ভরতার। নাহিয়ান আস্তে করে তার মাথার ওপর একটুখানি চুমু রেখে নরম স্বরে বলল,
“জানো, জানপাখি... আমার এই ছাব্বিশ বছরের জীবনে একজন নারীই এসেছিল। সে এসেই অজান্তে আমার পুরো মনটা নিজের করে নিয়েছিল। সেইদিনের সেই গোলাপি জামা পরা একটা মেয়ের সঙ্গে শুধু একটা আইসক্রিম ভুল করে ফেলে দেওয়াকে কেন্দ্র করে কী ভীষণ ঝগড়া হয়েছিল! তারপর সেই মেয়েটাই আবার সব অভিমান ভাঙাতে কত রকমের নাড়ু এনে দিয়েছিল। এরপর ভাগ্য এমনভাবে লিখল যে সেই মেয়েটাই আমার স্ত্রী হয়ে এলো। সত্যি বলতে, শুরুতে ভেবেছিলাম হয়তো তোমাকে কোনোদিন ভালোবাসতে পারব না। শুধু দায়িত্ববোধ থেকেই তোমাকে আমার স্ত্রী বলে পরিচয় দিতাম। কিন্তু দিন পেরোল, মাস পেরোল... কখন যে তোমার প্রতিটি অভ্যাস, প্রতিটি হাসি, প্রতিটি অভিমান আমার ভেতরে জায়গা করে নিল, আমি নিজেও বুঝতে পারিনি। একসময় আবিষ্কার করলাম, আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। বলো তো, আমার শ্যামাঙ্গিনী... শুধু শরীরের স্পর্শ না হলেই কি মানুষের মিলন অসম্পূর্ণ থেকে যায়? আমাদের শরীর হয়তো এক হয়নি, কিন্তু আমাদের মন তো অনেক আগেই এক হয়ে গেছে। আমাদের দুটি হৃদয় একে অপরকে চিনে নিয়েছে। ভালোবাসা, বিশ্বাস, অনুভূতি—সবকিছুই তো আমরা ভাগ করে নিয়েছি। বাকি আছে শুধু সময়ের অপেক্ষা। আমি কোনোদিন শুধু তোমার শরীরকে ভালোবাসতে চাইনি। আমি চেয়েছি তোমার মনকে, তোমার মানুষটাকে ভালোবাসতে। তোমার হাসি, কান্না, রাগ, অভিমান—সবকিছুকে নিজের করে নিতে। আর আজ আমি নিঃসংকোচে বলতে পারি… আমি পেরেছি।
আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি, ফারিহা। খুব, খুব বেশি।”
ফারিহা অবাক হয়ে নাহিয়ানের বলা কথা গুলো শুনছিলো। মাথা উচিয়ে নাহিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
“ তাহলে আপনার গার্লফ্রেন্ড? “
নাহিয়ান ফারিহার দুই গাল টেনে শব্দ করে চুমু খেলো ফুলে উঠা ঠোটে। চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো,
“ আমি তোমায় রাগানোর জন্য বলেছিলাম। কিন্তু আমি বুঝতে পারি নাই আমার এই কথায় তোমার মনে এতটা আঘাত লাগবে। আমি শুধু তোমার আছি, থাকবো, আর ভবিষ্যতেও থাকবো। “
ফারিহা নাহিয়ানের গলা জড়িয়ে কান্নারত অবস্থায় বললো৷
“ওই কথা বলার জন্য আপনাকে কিন্তু শাস্তি পেতেই হবে, মিস্টার অ্যাডভোকেট।”
ফারিহার কথায় নাহিয়ানের ঠোঁটের কোণে দুষ্টু এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। কোনো উত্তর না দিয়ে ফারিহাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। মুহূর্তেই দু'জনের মাঝের দূরত্বটুকু মিলিয়ে গেল। নাহিয়ান ধীরে ধীরে শুয়ে পড়ল, আর ফারিহাও তার বুকেই মাথা রেখে রইল। এক হাত দিয়ে ফারিহার এলোমেলো চুলগুলো কানের পেছনে সরিয়ে দিতে দিতে নাহিয়ান মৃদু স্বরে বলল,
“সেই শাস্তি যদি তোমার সান্নিধ্যেই কাটে, তবে এমন দণ্ড আমি আজীবন হাসিমুখে মেনে নিতে প্রস্তুত।”
কথাটা শুনে ফারিহার চোখের কোণে লাজুক হাসির ঝিলিক ফুটে উঠল। ঠোঁটের কোণ সামান্য কেঁপে উঠলেও সে কিছু বলল না। শুধু আরও একটু গুটিসুটি মেরে নাহিয়ানের বুকের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে নিল। ঘরের নীরবতায় তখন শুধু দু'জনের নিঃশ্বাসের শব্দ আর নাহিয়ানের বুকের ধীর, স্থির হৃদস্পন্দন—যেন সেই শব্দই ফারিহার সমস্ত অভিমান গলিয়ে দিয়ে তাকে এক অদ্ভুত শান্তির আশ্রয়ে জড়িয়ে রাখল।
চলবে.......!!
#বিঃদ্র আমার প্রচুর মাথা ব্যাথা। জ্বল কমলেও ঠান্ডা কমেনি। অনেক কষ্ট করে লিখেছি। রেসপন্স না পেলে আমার লেখাটাই বৃথা।