ফন্ট সাইজ:
থিম:
নীল জোছনা

৩৮তম পর্ব

লেখক: ইসরাত জাহান এশা

#নীল__জোছনা #পর্ব__সংখ্যা__৩৮

#ইসরাত_জাহান_এশা

….

বিকেলের শেষ আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিম আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে কমলা, আর হালকা নীল রঙের অপূর্ব মিশেল। চারপাশে বইছে মৃদু শীতল বাতাস, যেন সারাদিনের ক্লান্তি মুছে দিয়ে সন্ধ্যার আগমনী বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।

রেহানদের বাড়ির ছাদটা আজ যেন ছোট্ট এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত নাহিয়ানও ফারিহাকে নিয়ে এসেছে। যদিও আসার আগে তার মনে খানিকটা দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু ফারিহা নিজের দেওয়া কথা রেখেছে। সারাটা সময় সে একদম শান্ত, ভদ্র আর নিশ্চুপ ছিল। কোনো জেদ নেই, কোনো অভিমান নেই, কোনো দুষ্টুমিও না। ফারিহার এমন শান্ত স্বভাব দেখে নাহিয়ানের বুকের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তিটাও কেটে যায়। তূর্য আর কাউকে বাসায় রেখে না এসে সবাইকে একসঙ্গেই নিয়ে এসেছে।

ছাদের অন্য প্রান্তে বসেছে তরুণদের আড্ডা। নাহিয়ান, ফারিয়া, সায়ন, আহিয়ানা, বর্ষা, মেঘলা, সুনায়রা আর রেহান—সবাই মিলে গল্পে, হাসিতে আর খুনসুটিতে মেতে উঠেছে। কখনও কারও কথায় হো হো করে হাসি ভেসে উঠছে, কখনও আবার একজনকে নিয়ে বাকিরা মজা করছে। হাসির সেই উচ্ছ্বাস বাতাসে ভেসে গিয়ে সন্ধ্যার নীরবতাকেও প্রাণবন্ত করে তুলছে।

সুনায়রা গালে হাত দিয়ে ভাবছে। তা দেখে মেঘলা সুনায়রার মাথায় চাটি মেরে বললো,

“ কীরে তোর কি হয়েছে? “

সবাই সুনায়রার দিকে নজর দিলো। সুনায়রা মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,

“ ভাবছি। “

‘’ কী ভাবছিস?’’

“ ভাবছি আপুদের বিয়ে হতে আর মাত্র ১৪ দুন বাকি। তাহলে আমার দুলাভাইয়ের অভাব হবে না। রুশু আপুর জামাইকে কি বলবো আর বর্ষা আপুর জামাইকে কী বলবো?’’

ফারিহা বললো,

‘’ এতে ভাবার কি আছে সারা? বর্ষা আপুর জামাইকে বলবা মুলাভাই। আর আহিয়ানা বুবুর জামাইকে বলবা ফুলাভাই। ‘’

এই আজগুবি নাম শুনে রেহান আর সায়ন তব্দা খেয়ে গেলো। কি বললো তাদের? রেহান আর সায়ন বাদে সবাই হেসে ফেললো। সুনায়রা হাসি মুখে বললো,

“ বাহ বউমণি নাম গুলো সেই তো। মুলাভাই আর ফুলাভাই। আহা! “

নাহিয়ানকে হাসতে দেখে রেহান দাতে দাত চেপে বললো,

“ হাস আরো বেশি করে হাস তুই। তোর দাত পরে যাক হাসতে গিয়ে। তুই দাত ফোকলা হয়ে যা। “

রেহানের কথায় সবাই আরো দম ফাটা হাসিতে মত্ত হলো। তারা আরো কিছুক্ষণ গল্প করে নিচে নেমে গেলো।

____________

নাহিয়ানদের বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত বেশ নেমে এসেছে। সারাদিনের দৌড়ঝাঁপ শেষে চারপাশে নেমেছে এক শান্ত নীরবতা। দূরে কোথাও কুকুরের ক্ষীণ ডাক, আর মাঝেমধ্যে শীতের শেষে আসা ভ্যাপসা গরমে অলস বাতাস জানালার পর্দা আলতো করে দুলিয়ে দিচ্ছে।

শীতের তীব্রতা অনেকটাই কমে গেছে। দিনের শেষে বাতাসে যেন গরমের আগমনী বার্তা। সারাদিন বাইরে থাকার পর ফারিহার শরীরটা অস্বস্তিতে ভরে উঠেছিল। তাই ঘরে ফিরেই এক মুহূর্ত দেরি না করে বাথরুমে ঢুকে পড়েছিল সে।

কিছুক্ষণ পর ভেজা চুল পিঠজুড়ে ছড়িয়ে, হালকা রঙের সুতি পোশাক পরে ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো ফারিহা। সদ্য গোসলের কারণে তার মুখটা আরও সতেজ লাগছিল। ভেজা চুলের ডগা থেকে টুপটুপ করে জল ঝরে গালের পাশে গড়িয়ে পড়ছিল।

নাহিয়ান বিছানার পাশে রাখা টেবিলে বসে মনোযোগ দিয়ে বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা নোট, মোটা মোটা বই দেখে বোঝাই যাচ্ছিল, সে পড়ার মাঝখানেই আছে।

পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎই চোখ পড়ল ফারিহার দিকে। ভেজা চুল আর গোসল শেষে বেরিয়ে আসা মেয়েটাকে দেখে সে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। বইটা বন্ধ করে কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,

‘’ এখন গোসল করেছো কেন? ‘

ফারিহা তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে একদম স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিল,

“ গরম লাগছিল, তাই গোসল করেছি।”

“ কোমরটা এখনও ব্যথা করছে না?

নাহিয়ানের কণ্ঠে ছিল চিন্তার মিশেল। ফারিহা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল আলতো করে মুছতে মুছতে মৃদু স্বরে বলল,

“ অল্প।”

নাহিয়ান বই থেকে চোখ তুলে তার দিকে তাকাল। নরম গলায় বলল,

“ তাহলে ওইভাবে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকো না।”

ফারিহা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে বলল,

“ আচ্ছা।”

আবারও চুল মুছতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে। কিছুক্ষণ নীরবতা। নাহিয়ান বইটা বন্ধ করে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ফারিহার ঠিক পেছনে দাঁড়াল। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই আলতো করে তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। নিজের মুখটা তার ঘাড়ের কাছে এনে নরম করে নাক ঘষে ফিসফিসিয়ে ডাকল,

“বউ…”

শব্দটা কানে পৌঁছাতেই ফারিহার হাত থেমে গেল।

নাহিয়ান সচরাচর তাকে "বউ" বলে ডাকে না। আর যখনই ডাকে, সেই একটি শব্দ যেন বুকের গভীর কোথাও গিয়ে আলতো করে নাড়িয়ে দেয়। অদ্ভুত এক ভালো লাগা, লজ্জা আর আবেগ মিলেমিশে হৃদয়টাকে কাঁপিয়ে তোলে। ফারিহা কোনো উত্তর দিল না। নাহিয়ান আবারও আরও আদুরে স্বরে ডাকল,

“ ও বউ…”

এবার আর চুপ থাকতে পারল না ফারিহা। ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি ফুটে উঠল। মিনমিন করে বলল,

“ হুঁ... বলেন।”

নাহিয়ান আলতো করে তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। ফারিহা লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। নাহিয়ান দুই আঙুলে তার থুতনি তুলে মুখটা নিজের দিকে ফেরাল। লজ্জায় টকটকে হয়ে ওঠা মুখখানা দেখে নাহিয়ানের ঠোঁটে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরে করে ফারিহার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,

“ দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠো, বউ।”

কথাটার আড়ালের ইঙ্গিত বুঝতে একটুও সময় লাগল না ফারিহার। লজ্জায় গাল আরও লাল হয়ে উঠল। সে মুখ লুকিয়ে দিল নাহিয়ানের বুকের ভেতর। খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল,

“ আমিতো সুস্থই আছি।”

নাহিয়ান তাকে আরও একটু কাছে টেনে নিয়ে মৃদু হেসে বলল,

“ উঁহু... আমার এই সুস্থতায় হবে না। তোমাকে আরও স্ট্রং হতে হবে।”

ফারিহা হালকা করে তার বুকে এক চড় মেরে মুখ ফুলিয়ে বলল,

“চুপ করুন... বদলোক একটা।”

নাহিয়ান হেসে উঠল। আদর করে তার মাথায় একটা চুমু রেখে বলল,

“ আচ্ছা, কাল তো রেজাল্ট দেবে। ভয় লাগছে?”

কথাটা শুনতেই ফারিহার মুখের হাসিটা একটু ম্লান হয়ে গেল। রেজাল্টের কথা সে যেন একেবারেই ভুলে গিয়েছিল। মুহূর্তেই সেই দুশ্চিন্তা আবার ফিরে এল। ধীরে ধীরে নাহিয়ানের বুক থেকে মুখ তুলে তার চোখের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট গলায় বলল,

“ পাশ যদি না আসে তখন?”

নাহিয়ান স্নেহভরে তার গালে হাত রাখল। আঙুলের নরম স্পর্শে যেন আশ্বাস মিশে ছিল।

“ পাশ হবে। এত চিন্তা করো না। তোমার ওপর আমার পুরো বিশ্বাস আছে।”

ফারিহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,

“এখন কেন মনে করালেন? আমার তো আজ আর ঘুমই আসবে না।”

নাহিয়ান একটু ঝুঁকে এল। মৃদু স্বরে বললো,

“ আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমালেও ঘুম আসবে না... আমার শ্যামাঙ্গিনীর?”

লজ্জা আর ভালোবাসায় ভরে উঠল ফারিহার মুখ। সে মৃদু হেসে আবারও নাহিয়ানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

“ খুব করে আসবে।”

★★★

পরদিন সকাল থেকেই চৌধুরী বাড়ির পরিবেশটা অন্যরকম। ঘড়ির কাঁটা যেন আজ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক ধীরে এগোচ্ছে। বাড়ির প্রায় সবাই বারবার দেয়ালঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে, আবার কেউ মোবাইল হাতে সময় দেখছে। কারণ আজ সকাল এগারোটায় প্রকাশ হবে ফারিহার এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যার ফলাফল প্রকাশ হবে, তার মধ্যেই যেন কোনো উৎকণ্ঠা নেই!

ওই যে একটা কথা আছে না , — "যার বিয়ে তার হুঁশ নেই, পাড়া-প্রতিবেশীর ঘুম নেই।" ঠিক তেমনই অবস্থা হয়েছে আজ।

ফারিহা সকাল থেকেই দিব্যি নিশ্চিন্ত। তার চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি ফলাফল প্রকাশ হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে নাহিয়ান, তূর্য, নীরা—তিনজনের অবস্থাই সম্পূর্ণ উল্টো। বিশেষ করে নাহিয়ান। বাইরে থেকে যতই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করুক, ভেতরে ভেতরে সে বেশ অস্থির। মাঝে মাঝেই ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে, আবার মোবাইল হাতে নিয়ে ওয়েবসাইট খুলে দেখছে ফলাফল প্রকাশ হয়েছে কি না। অবশেষে বহু প্রতীক্ষার পর ঘড়ির কাঁটা এগারোটার ঘর ছুঁল।

মেঘলা তাড়াতাড়ি ল্যাপটপ খুলে ফলাফল প্রকাশের ওয়েবসাইটে ঢুকল। সবার দৃষ্টি তখন এক জায়গাতেই আটকে। নিস্তব্ধ ড্রইংরুমে শুধু কীবোর্ড চাপার ক্ষীণ শব্দ শোনা যাচ্ছে।

ফারিহার রোল নম্বর আর রেজিস্ট্রেশন নম্বর লিখে সার্চ বাটনে ক্লিক করতেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্ক্রিনটা লোড হতে লাগল। সেই কয়েকটা মুহূর্ত যেন কয়েক মিনিটের সমান দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। তারপরই স্ক্রিনে ভেসে উঠল ফলাফল।

GPA 4.78

মানবিক বিভাগ (Arts Group) থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ।

“ আলহামদুলিল্লাহ! বউ মণি পাশ করেছে! ৪.৭৮”

মেঘলার আনন্দভরা কণ্ঠে কথাটা বের হতেই পুরো ঘরজুড়ে হাসির রোল পড়ে গেল। নীরা খুশিতে হাততালি দিল। তূর্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। নাহিয়ানের মুখেও ফুটে উঠল তৃপ্তির হাসি। আর এই পুরো সময়টাতেই ফারিহা নিশ্চিন্তে সোফায় বসে মুড়ি-ভাজা আর নারিকেলের নাড়ু খেতে ব্যস্ত ছিল। সবার উচ্ছ্বাস দেখে সে অবাক হয়ে মুখ তুলে তাকাল।

“ কী হয়েছে?”

মেঘলা হেসে বলল,

“ আগে এসে নিজের রেজাল্টটা দেখো!”

ফারিহা হাতে থাকা নাড়ুটা তাড়াতাড়ি প্লেটে রেখে দৌড়ে গেল মেঘলার পাশে। স্ক্রিনে নিজের ফলাফল দেখে তার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। পরমুহূর্তেই মুখভরা হাসি ছড়িয়ে পড়ল। খুশিতে ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে বলল,

“ আমি পাশ করে গেছি! আমি তো ভাবছিলাম ভূগোলের জন্য ফেল করে যাব!”

কথাটা শুনে মুহূর্তের জন্য সবাই থমকে রইল। তারপর একসঙ্গে হেসে উঠল পুরো ঘর। নাহিয়ান এগিয়ে এসে আলতো করে ফারিহার মাথায় একটা চাপড় দিয়ে হাসতে হাসতে বলল,

“আমার বউ হয়ে ফেল করার চিন্তা মাথায় আনো কী করে?”

সে স্ক্রিনের দিকে একবার তাকিয়ে আবার ফারিহার দিকে চেয়ে গর্বভরা কণ্ঠে বলল,

“দেখো, কত ভালো নম্বর পেয়েছ। এটাতেই থেমে গেলে চলবে না। সামনে আরও ভালো করতে হবে। সব সময় নিজের আগের রেজাল্টকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। বুঝেছ?”

ফারিহা ঠোঁট ফুলিয়ে ভান করা বিরক্তি নিয়ে বলল,

“ হুহ! দেখা যাবে।”

চলবে…….

#বিঃদ্রঃ অনেক ভাবলাম আমি। মোহাব্বত কী দাস্তানের পরিচ্ছেদ দুই আনবো কিনা। এখন কথা হচ্ছে কোনটা আনবো রিমঝিম আর শাহবাজের প্রেম কাহিনি নাকি মাহনুর আর ফাইজের প্রেম কাহিনি। কোনটা লিখবো জানাবেন।

#বিদ্রঃ মন্তব্য করবেন দয়া করে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন