#প্রণয়ের_ঘ্রাণ
#লেখিকা_Irfa_Mahnaj
#পর্ব_১৭
রুমে এসেই হাতের ব্যাগ টা রুমের ছোটো সোফাটায় ছুঁড়ে মারে প্রভা। রাগ লাগছে তার প্রচুর।
আর লাগবে না। তখন সেইখান থেকেই প্রভাদের কে টেনে নিয়ে এসেছে রুদ্ধ।
ব্যাপারটায় প্রচুর বিরক্ত লেগেছে। সমানতালে রাগও। না সহ্য করার মতো নয়। এর কিছু একটা করতেই হবে।
রাগের কারণে কতক্ষণ ফ্লোরে পা বাড়ি দিয়ে তারপর ফোস ফোস করতে করতে ড্রেস নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায় প্রভা।
মনে মনে ভাবে,
--- কথাই বলবো না। দেখি কি করে থাকে ও।
দারাম করে ওয়াশরুমের দড়জা লাগায় প্রভা। যার আওয়াজ রুমের বাইরে থেকে দরজার সামনে দাড়ানো রুদ্ধও স্পষ্ট শুনতে পায়।
মিটিমিটি হেঁসে বিড়বিড় করে,
--- ম্যাডাম তো সেই ক্ষেপেছে। এখন যাওয়ার আর রিস্ক নেয়ার দরকার নেই। পরে নাহয় আসা যাবে।
বলেই দুইহাত পকেটে গুঁজে মুখ চোখা করে শিস বাজাতে বাজাতে চলে যায় নিজের রুমের দিকে।
যতোই রাগ করুক আর যাই করুক পারলে দড়জা ভেঙ্গেও ফেলুক তবুও রুদ্ধের কিছু এসে যাবে না। কারণ পরিষ্কার রুদ্ধ প্রভাকে না দেখে এক মুহুর্তও থাকতে পারবে না।
***************
পরীক্ষা শেষ হয়েছে আভার। আজ গাড়ি নিতে আসবে না। সেই মানা করেছে। ইচ্ছে হলো ওই বদ্ধ গাড়ি করে না গিয়ে আজ খোলা মেলা রিকশায় অথবা অটোতে যাওয়ার।
বাইক হলে তো কথাই ছিলো না কিন্তু আভার ভাগ্যও তো এতো ভালো না যে রুদ্ধ ভাই তাকে নিতে আসবে।
বুক চিড়ে এক দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে প্রভার। কাঁধের ব্যাগটা ভালো করে তুলে নিয়ে হাটা লাগায় সামনের দিকে।
সেখান থেকেই কিছু একটা নিয়ে যাবে এই আশায়। তবে তার আশায় এক বালতি জল ঢালতে আগমন ঘটলো বৃষ্টির।
প্রভা আর আভার এই দিক দিয়ে ভীষণ মিল। দুজনেরই বৃষ্টি অপছন্দ। প্রথমত এতে করে দু বোনই মাথা ব্যথার শিকার হয়। সাথে তো ঠান্ডা আছেই।
আর দ্বিতীয় টি হলো বিদুৎ চমকায় সাথে কাদা পানি পুরো বিষয়টাই বিরক্তি ঠেকে দুজনের কাছে।
বেশি কিছু আর না ভেবে দ্রুত পাশে থাকা একটা দোকানের মধ্যে আশ্রয় নেয় আভা।
***************
--- আমায় ডেকেছিলে বাবা?
রুমের ভিতরে থাকা ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে বসেছিলেন আদ্রিক রায়ান। বুজে থাকা চোখ জোড়া খুলে তাকালেন দরজার পানে।
মেয়েকে দেখেই অধর কোণে হাসি মিলল ভদ্রলোকের। বললেন,
--- দরজায় দাড়িয়ে কেনো ভিতরে এসো।
গুটি গুটি পা ফেলে বাবার কাছে এগিয়ে যায় প্রভা। জিজ্ঞেস করে,
--- কিছু কি হয়েছে?
হাসলেন ভদ্রলোক। সেভাবেই প্রশ্ন করলেন,
--- কেনো কিছু না হলে বুঝি মেয়েকে ডাকা যাবে না?
--- এমা তা বলিনি আমি।
হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন রায়ান। পাশ থেকে টুল দেখিয়ে দিয়ে সেখানে বসতে বললেন।
প্রভাও বাধ্য মেয়ের মতো তাইই করলো। এবার রায়ান বলতে আরম্ভ করলো,
--- তোমাকে আসলেই কিছু দরকারের জন্য ডেকেছি আমি। মন দিয়ে শুনবে আমার কথা
--- জি।
--- আমার বয়স হয়েছে। এখন ভালো করে বিজনেসের দেখাশুনাও করতে পারিনা। আমি চাই এখন থেকেই তুমি বিজনেসের কাজে হাত লাগাও।
--- আমি!
--- হ্যাঁ তুমি। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
--- কিন্তু বাবা আমার পড়াশুনা?
--- পড়াশুনা করতে থাকবে আমি তো বারণ করিনি। তাছাড়া তোমার ভার্সিটি শেষের পথে এখন থেকে টুকিটাকি কাজে সাহায্য করবে পরে ভার্সিটির গন্ডি পেরিয়ে ফুল হাত লাগাবে।
--- তবুও...
হাত দিয়ে থামিয়ে দিলেন আদ্রিক রায়ান। বললেন,
--- দেখো প্রভিকা তুমি এ বাড়ির বড়ো মেয়ে তাই তুমি চাইলেও আর না চাইলেও তোমাকে বিজনেস দেখতেই হবে। আস্তে ধীরে বাকিদেরও তাদের ভাগ আর কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
--- ঠিক আছে বাবা তুমি যা বলবে তাই।
তারপর সেখান থেকে চলে যায় প্রভা।
***************
পায়চারি করছে রুম জুড়ে রুদ্ধ। কারণ সকালের সেই ঘটনার পর থেকে একবারের জন্যও প্রভা রুদ্ধের সামনে পড়েনি।
অস্থির অস্থির লাগছে রুদ্ধের কাছে। আচ্ছা তার প্রভাত কি কোনোভাবে তাকে ইগনোর করছে?
কথা টা মনে হতেই আতকে উঠে রুদ্ধ। তড়িঘড়ি করে প্রভার ঘরের দিকে ছুটে রুদ্ধ।
প্রভার ঘরের সামনে গিয়ে হতাশ হয়ে যায়। কারণ রুমের দড়জা সম্পূর্ণ খোলা আর ভিতরে কারো অস্তিত্ব নেই।
কিছু একটা মনে হতেই ছুটে লিফটের দিকে। নিচে আছে নিশ্চই। এ সময় তো প্রভা নিচেই থাকে।
মা চাচিদের কাজে হেল্প করে। নিচে গিয়েই বরং দেখা যাক। যেই ভাবনা সেই কাজ।
****************
ড্রয়িং রুমে এসেই উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করে রান্নাঘরে প্রভা নামের রমণীটি আছে কিনা।
ওড়না আর কামিজের একাংশ নজরে আসতেই বিশ্বজয়ের হাসি দেয় রুদ্ধ। হ্যাঁ ওইতো আছে প্রভাত।
বুদ্ধি আটে কি করা যায়। ত্বরিত মাথায় আসে কফির কথা। গলা খাঁকারি দিয়ে চেঁচিয়ে ডাকতে আরম্ভ করে,
--- মা,,,ও মা। মা। আমাকে এক কাপ কফি দিয়ে যাও তো।
কথা শেষ করে গিয়ে সোফায় বসলো। পায়ের উপর পা তুলে দিয়ে দুই হাত সিঙ্গেল সোফাটার হাতলের দুই পাশে দিয়ে আয়েশের সঙ্গে বসেছে রুদ্ধ।
একটু পরেই তার প্রভাত আসবে। সারাদিনের তৃষ্ণার্ততাও প্রভাতকে দেখে গায়েব হয়ে যাবে।
চোখ বুজে নিলো রুদ্ধ। অধরে খেলে গেলো এক চিলতে হাসি।
তবে ওর সেই হাসি নিমিষেই উবে যায় যখন প্রভার জায়গায় রিয়ানা আসে।
--- এই নে তোর কফি।
--- ছোটো মা তুমি আসলে যে?
কপাল কুঁচকে গেলো রিয়ানার। বললেন,
--- তো?
--- না মানে আর কেউ ছিলো না?
--- ছিলো। বড়ো বুবু রান্না করছিলো আর মেজো বুবু তরকারি কুটছিলেন। আমি ফ্রি ছিলাম তাই নিয়ে এসেছি।
--- আর কেউ?
--- আশ্চর্য আর কে থাকবে। কার কথা বলছিস তুই?
--- কারো না তুমি যাও।
হতাশ গলায় বলে উঠলো রুদ্ধ।
রিয়ানাও কিছু না বলে হাটা ধরলেন। দুই কদম গিয়েই কিছু একটা বুঝতে পারলেন।
পিছন ফিরে হেসে বলে উঠলেন,
--- আর কেউ ব্লেন্ডার করছিলো।
রুদ্ধ নিজের মুখটাকে অসহায় করে ছোট করে শুধু বলে,
--- ওহ!
****************
রাতের খাবারের সময়~
সকলেই উপস্থিত থাকলেও প্রভা নেই। বার বার লিফটের দিকে তাকাচ্ছে রুদ্ধ।
কিন্তু প্রভার আসার কোনো নাম নেই। যদিও সিঁড়ি দিয়ে তারা উঠা নামা করে না কিন্তু তাও বার কয়েক সেদিক পানেও তাকিয়েছে রুদ্ধ।
ফলাফল প্রত্যেকবার একই। ভাতের প্লেটে আঙুল দিয়ে নাড়াচাড়া করতে দেখে রায়ান্দ্রো বলে,
--- কি ব্যাপার রুদ্ধ খাচ্ছ না কেনো?
--- হা.. হ্যাঁ। হ্যাঁ হ্যাঁ খাচ্ছি ছোটো বাবা।
অবাক হলেন রায়ান। জিজ্ঞেস করলেন রুদ্ধকে
--- কি এতো ভাবছো রুদ্ধ?
--- কোই কিছু না তো বড়ো বাবা।
মুখে এটা বললেও মনে মনে বলে আরেক কথা,
--- ভাবছি তোমার মেয়ের কথা বড়ো বাবা। মেয়ে খেতে কেনো আসছে না এখনো জিজ্ঞেস করলেই তো পারো।
রুদ্ধের কথাটা বোধহয় শুনতে পেলেন রুদ্র। তিনিই প্রসঙ্গটি উঠালেন।
--- আমরা সবাই আছি প্রভা মামুনি কোথায়?
এতক্ষণে টনক নড়লো সবার। রুহানি জিজ্ঞেস করলো,
--- আসলেই তো প্রভা কোথায়?
এদিকে বাবার কথা শুনে প্রথম বারের মতো ভালো লাগলো রুদ্ধের। মনে মনে নিজের বাবাকে বাহবাও দিয়ে দিলো।
--- এই না হলে রুদ্ধের বাপ। পিতা মহোদয় এই প্রথম একটা কথার মতো কথা বলল।
তরকারির বলটা আনতে আনতে এলিনা বলে,
--- আয়েলিন খাবে না নাকি।
--- সেকি কথা খাবে না মানে।
অতি উত্তেজিত হয়ে রুদ্ধ জিজ্ঞেস করে।
--- কি জানি। ওর মতিগতি তো কিছু বুঝি না।
সবাই ভাবলো হয়তো খিদে নেই তাই খাবে না। কিন্তু রুদ্ধ বেশ বুঝতে পারছে প্রভা কেনো খাবে না।
এবার তার রাগ লাগলো। শব্দ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালো রুদ্ধ।
তারপর কোনো কিছু না বলেই চলে যেতে নেয়। তাকে এভাবে যেতে দেখে রুহানি জিজ্ঞেস করে,
--- একি রুদ্ধ খাবার না খেয়ে কোথায় যাচ্ছো?
খুব শান্ত গলায় উত্তর দিলো রুদ্ধ,
---- খিদে নেই আমার।
***************
গিটার হাতে নিয়ে ছাদের রেলিংয়ের উপর বসে আছে রুদ্ধ।
রুদ্ধদের ছাদের রেলিংটা বেশ প্রশস্ত। রুদ্ধের মতো মানুষও আরামে বসতে পারে।
দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে এক সোজা করে আর আরেকপা হাঁটু বরাবর ভাঁজ করে রেখে বসেছে রুদ্ধ।
হাত দিয়ে গিটারের তারে টুংটাং করে ছন্দ তুলে। গান গায় না শুধুই গিটার বাজাচ্ছে।
চোখ বুজে আকাশের দিকে মুখ করে রাখে কিছুক্ষণ। তারপর ঠোঁট এলিয়ে বিষাদময় হাসি দেয়।
পূর্ণ চাদ দেখা যাচ্ছে আকাশ জুড়ে। জোৎস্না রাত আজ। তাই চাঁদের আলোটাও একটু বেশিই।
সেই চাঁদের আলো এসে পড়ছে রুদ্ধের মুখচোখ জুড়ে আর তার লেয়ার কাট চুলে। চিকচিক করছে তার চুল আর মুখ।
রুদ্ধের এই অপরূপ সৌন্দর্য একমনে দেখে যাচ্ছে আভা। যে নিজের মাইন্ড ফ্রেশ করতে ছাদে এসেছিলো।
কি মনে করে যেনো এগিয়ে গেলো রুদ্ধের দিকে। তারপর কোমল গলায় ডাকলো,
--- রুদ্ধ ভাই।
নিজের নাম শুনতেই চোখ মেলে রুদ্ধ। পাশে ফিরে তাকায় আভার পানে। হেসে বলে,
--- তুই?
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ছাদের দরজার কাছে এসে দাঁড়ায় প্রভা। সামনের এই দৃশ্য দেখে কেনো জানি মেয়েলি মনে অভিমানটা আরো বেরে যায়।
প্রভা এসেছিলো রুদ্ধের রাগ ভাঙ্গাতে। অনেক্ষন কথা না বলে নিজেই পাগল হয়ে গিয়েছিল। সারাদিন না দেখে এখন আর থাকতে পারলো না তাই চলে এসেছিলো।
কিন্তু এখানে এসে তো দেখে ভিন্ন চিত্র। রুদ্ধতো দিব্যি ভালোই আছে। দিন তাহলে তার ভালোই গেছে। শুধু প্রভাই তড়পেছে।
যেভাবে এসেছিলো সেভাবেই চলে যায় প্রভা। যেতে যেতে বিড়বিড় করে শুধু বলে,
--- বাহ ভালোই তো আছিস তুই তাহলে।সারাটাদিন আমি শুধুই কষ্ট পেলাম।
চলবে....
📌📌( আচ্ছা গল্পটা কি গাঁজাখুরি লাগে?)
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। রেসপন্স করবেন। লাইক, কমেন্ট, ফলো করবেন।]