ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিভৃতে যত্নে রাখা প্রিয়তমা

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: মারিয়াম ফুল

উইন্ডশিল্ডের ওপর দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি জমতে শুরু করেছে। লুকিং গ্লাসে এহসানের তীক্ষ্ণ চোখজোড়া আটকে গেল পেছনের সিটে। অনু জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। ভেতরে ভেতরে মেয়েটা যে কতটা ভয় পাচ্ছে, তা ওর কুঁকড়ে থাকার ভঙ্গিটাই বলে দিচ্ছিল। এহসানের রাগী রূপটার সামনে পড়ার পর থেকে ও এতটাই আড়ষ্ট হয়ে গেছে যে একবারের জন্যও মুখ ফিরিয়ে লুকিং গ্লাসের দিকে তাকাচ্ছে না; যেন তাকালেই ওই জ্বলন্ত দৃষ্টির মুখোমুখি হতে হবে।

এহসান গাড়ি চালাতে চালাতেই বেশ কিছুক্ষণ ধরে আয়নায় অনুকে খেয়াল করল। পেছনের সিটের এক কোণে একদম গুটিসুটি মেরে বসে আছে অনু, যেন নিজের অস্তিত্বকে যতটা সম্ভব ছোট করে এহসানের নজর থেকে লুকিয়ে রাখতে চায়।
হুট করেই এহসান কোনো সংকেত ছাড়াই রাস্তার এক পাশে গাড়িটা ব্রেক কষে থামাল। তীব্র ঝাঁকুনিতে অনুর শরীরটা একটু সামনের দিকে হেলে পড়ল। ও বেশ ভয় পেয়ে তটস্থ চোখে তাকাল এহসানের দিকে। এহসান সিটে হেলান দিয়ে খুব ধীরস্থিরভাবে ওর দিকে ঘুরল, 
এহসান কিছুটা সময় নিল, অনুর ভয়ার্ত মুখের প্রতিটি রেখা, ওর ভেতরের ছটফটানি খুব খুঁটিয়ে পরখ করল সে। গাড়ির ভেতরের নিস্তব্ধতায় অনুর দ্রুত চলা নিশ্বাসের শব্দটাও এহসানের কান এড়াল না।
 হঠাৎ এহসান নিচু গলায় প্রশ্ন করল"ভয় পাও আমাকে?"
এমন একটা অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে অনু পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেল।কী উত্তর দেবে বুঝতে না পেরে ও শুধু বোকার মতো দু-দিকে মাথা নাড়ল, যার অর্থ—'না'।
অনুর এই মিথ্যে চেষ্টা দেখে এহসানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। ও আরও কিছুটা ঝুঁকে এসে অনুকে নিজের পুরুষালি গাম্ভীর্যের জালে পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে ফেলল।
"না...?" এহসান শব্দটা এমনভাবে উচ্চারণ করল যেন ও অনুর ভেতরের সবটুকু লুকোচুরি এক নিমেষে ধরে ফেলেছে। ও তীব্র দৃষ্টিতে অনুর দিকে তাকিয়ে বলল, 
"তাহলে কাঁপাকাঁপি করছ কেন? যদি ভয়ই না পাও, তাহলে আমার সামনে এলে তোমার নিশ্বাস এভাবে আটকে যায় কেন, রূপ...কথা?"
অনুর বুকটা ধক করে উঠল। এহসানের এত কাছের উপস্থিতি আর তার গায়ের পারফিউমের পরিচিত গন্ধ তাকে আর কোনো মিথ্যা বলার সুযোগ দিল না। ও জড়সড় হয়ে সিটের সঙ্গে নিজেকে সেঁটে রাখল। চোখ দুটো নিচু করে নিজের ওড়নার কোণটা শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরল।
এহসান আরও কয়েক সেকেন্ড অনুর এই অসহায়, ভয়ার্ত রূপটা দেখল। মেয়েটার কাঁপতে থাকা ঠোঁট আর অস্থিরতা ওর চোখ এড়াল না।কিন্তু পরক্ষণেই ক্যাম্পাসের সেই দৃশ্যটা এহসানের মনে পড়ে গেল। নীল যেভাবে অনুর কাছে এগিয়ে এসেছিল, তার সঙ্গে কথা বলেছিল, আর অনুর সঙ্গে এতটা সহজভাবে মিশেছিল, সেই দৃশ্য মনে পড়তেই এহসানের ভেতরে জমে থাকা চাপা রাগটা যেন ফেটে পড়ল,বিরক্তিতে কপাল কুঁচকাল। এক ঝটকায় নিজের সিটে ফিরে গিয়ে বসল এহসান। স্টিয়ারিং হুইল আঁকড়ে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
"নীল তোমার কে হয়, হ্যাঁ? কতদিন ধরে ওকে চেনো?"
অনু ধীরে ধীরে মুখ তুলে এহসানের দিকে তাকাল। হঠাৎ নীলের প্রসঙ্গ কেন উঠল, তা ওর মাথায় এল না। মুখের ওপর নেমে আসা কয়েক গোছা চুল আঙুলের ডগায় কানের পেছনে সরিয়ে বলল,"উনি আমার পূর্বপরিচিত।"
এহসান এক মুহূর্তও দেরি করল না। চোখ স্থির রেখেই আবার প্রশ্ন করল,"কবে থেকে চেনো?"
"ছোটবেলা থেকেই। উনারা আমাদের পাশের বাড়ি থাকেন। নীল ভাইয়ার বাবা আর আমার বাবা খুব ভালো বন্ধু। তাই ছোট থেকেই দুই পরিবারের যাওয়া-আসা। সেই সূত্রেই উনাকে চিনি।"
এহসান দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "নীল ভাইয়া! প্রতিবেশী! তা—ক্যাম্পাসে ও যেভাবে তোমার আঁচল আগলে দাঁড়িয়ে থাকে, তাতে তো মনে হয় তোমার ছায়াও ওর পারমিশন নিয়ে চলে। ছোটবেলা থেকে পাশে থেকেছে বলে ও কি নিজেকে তোমার অভিভাবক ভাবতে শুরু করেছে?"
অনু একবার রাস্তার দিকে তাকাল। তারপর আবার এহসানের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বলল,
"কেন? তাতে আপনার সমস্যা কী? নীল ভাইয়া সব সময় আমাকে আগলে রেখেছেন। আমার প্রতিটি বিপদে তিনি আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁকে নিয়ে আপনি এমন কথা বলছেন কেন?
গলার ঢোক গিলে অনু গভীর শ্বাস নিল। ভেতরের জড়তাকে কাটিয়ে সাহস সঞ্চয় করে আবার বলতে শুরু করল,"আপনি কি একটু বেশি বলে ফেলছেন না? আপনিই তো বলেছিলেন, আমাদের মধ্যে কোনো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হবে না। তাহলে এখন এসব কথা বলছেন কেন? আপনিই বলেছিলেন, আমরা কেউ কারও জীবনে হস্তক্ষেপ করব না, কেউ কারও ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলাব না। তাহলে আজ হঠাৎ আপনার নিজের কথাই ভুলে গেলেন?উনি আমার সঙ্গে কথা বলেছেন বলে কি আপনার জ্বলছে?
"জ্বলছে?" শব্দটা যেন এহসানের দম্ভে সোজা কুঠারাঘাত করল। এক মুহূর্তের জন্য সে স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর চোয়াল শক্ত করে গম্ভীর স্বরে বলল,
"হ্যাঁ, জ্বলছে। আমার জিনিসে অন্য কেউ হাত দেবে তো দূরের কথা, কারও ছায়াও পড়ুক, সেটাও আমি সহ্য করতে পারি না। আমি যা-ই বলি না কেন, মানুষের চোখে তুমি এখন এহসান সিদ্দিকীর আমানত। নীল যদি তোমার শৈশবের বন্ধুও হয়, তবু আজ থেকে ওর সঙ্গে ওই ঘনিষ্ঠতা আমি আর দেখতে চাই না।"
চোয়াল শক্ত করে এহসান ধীর স্বরে বলল,
"তোমার ওই ভাইয়াকে বলে দিও, সীমা ছাড়ানোটা এহসান একদম পছন্দ করে না। আর যতদিন তুমি আমার জিম্মায় আছ, ততদিন বাবা আর আপন ভাই ছাড়া পৃথিবীর সব পুরুষই তোমার জন্য নিষিদ্ধ। এটা আমার কথা।"
এহসানের ধমকে বলা কথাগুলো অনু আর সহ্য করতে পারল না। চোখ দুটো মুহূর্তেই টলমল করে উঠল। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টটা যেন গলা পর্যন্ত এসে আটকে গেল। গলার ঢোক গিলে নিজেকে সামলে নিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলল,"আপনি... আপনি আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলতে পারেন না। আজ পর্যন্ত কেউ আমার সঙ্গে এত রাগ করে কথা বলেনি।"
চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু মুছেও লাভ হলো না। কথার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো গড়িয়ে পড়তে লাগল।
"আপনি আমাকে কোনো কিছুরই বাধা দিতে পারেন না। আপনিই তো বলেছিলেন, আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দেবেন। তাহলে... তাহলে এখন এত অধিকার দেখাচ্ছেন কেন? এত পসেসিভ হচ্ছেন কেন?আমি আপনার হাতের পুতুল নই যে, আপনি যেভাবে চাইবেন সেভাবেই চলব। আমার যা ইচ্ছা হবে, আমি সেটাই করব। যেখানে কোনো সম্পর্কই নেই, সেখানে আপনার কথা আমি কেন শুনব?"শেষ কথাটা বলেই অনু মুখ ফিরিয়ে নিল। চোখের পানি আর আটকে রাখতে পারল না।
এহসান এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। অনুর এই সরাসরি প্রশ্নে ওর ভেতরের দম্ভটা যেন একটু কেঁপে উঠল। কিন্তু ও খুব দ্রুত নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনল। ও অনুর প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে বরং এড়িয়ে গিয়ে কর্কশ গলায় বলল, "অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করাটা তোমার পুরনো অভ্যাস। আপাতত চুপ থাকো।"
অনু ছাড়ার পাত্রী নয়। ও আবার বলল, আমাদের মধ্যে তো কোনো সম্পর্ক নে..ই... 
অনু নিজের কথাটা শেষ করতে পারল না। এহসান হঠাৎ এক ঝটকায় গাড়িটা স্টার্ট দিল। এমনভাবে স্টিয়ারিং ঘুরাল, যেন অনুর প্রতিটি প্রশ্নকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চায়।গাড়ির ভেতর নেমে এল এক ভারী নীরবতা। শুধু ইঞ্জিনের শব্দ আর রাস্তা চিরে এগিয়ে চলার আওয়াজ। এহসান একবারও অনুর দিকে তাকাল না।তাকিয়েই বা কী বলবে?
অনুর করা প্রশ্নগুলোর উত্তর তো ওর নিজের কাছেই নেই। কেন এত অধিকার দেখাচ্ছে? কেন নীলকে সহ্য হচ্ছে না? কেন ডিভোর্সের কথা বলা মানুষটা আজ অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে অনুকে দেখলেই ভেতর থেকে জ্বলে উঠছে? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর ওর কাছে নেই।
শুধু এটুকুই জানে, নীলের সঙ্গে অনুকে দেখার পর থেকে বুকের ভেতরটা অসহনীয়ভাবে পুড়ছে।
কিছু ক্ষণের মধ্যেই এহসানের গাড়ি এসে পৌঁছালো অনুদের বাড়ির গেটের সামনে। এহসান অনুর দিকে না তাকিয়েই দরজা খুলে দিয়ে বলল, "রাতে আমি তোমাকে কল দেব। চুপচাপ কলটা ধরবে।"
অনু যেন এক মুহূর্তে বোকা হয়ে গেল! মাথায় হাজারটা প্রশ্ন একসঙ্গে ভিড় করে এলো—এহসান তার নাম্বার পাবে কীভাবে? আর সবচেয়ে বড় কথা, এহসান তাকে নিজে থেকে কল দেবে? বিষয়টা এই মুহূর্তে অনুর কাছে পুরো অবিশ্বাস্য শোনাল।
অনুর ভাবনার জালে ছেদ পড়ল হুট করেই। তার কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ইতিমধ্যে এহসানের গাড়ি চলতে শুরু করেছে। অনু কিছু বলতে চেয়েও পারল না, গাড়িটা এক সেকেন্ডের জন্যও দাঁড়াল না। ধুলো উড়িয়ে চোখের পলকে রাস্তা দিয়ে মিলিয়ে গেল।
গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অনু শুধু চেয়ে রইল সেই চলে যাওয়া গাড়ির দিকে। মনের ভেতর তখন এক অদ্ভুত অস্বস্তি আর কৌতুহল জন্ম নিয়েছে....
এহসান চলে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে পা বাড়িয়ে অনু বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। পা দুটো যেন নিজের অজান্তেই ভারী হয়ে এসেছে।
লিভিং রুমে ঢুকতেই তার চোখ আটকে গেল। নীল সোফায় চুপচাপ বসে আছে নীল। তার পাশেই বসে আছেন শিরিন সিদ্দিকী।
চলবে
#নিভৃতে_যত্নে_রাখা_প্রিয়তমা 
  #মারিয়াম_ফুল।
 "
পর্ব সংখ্যা : ৩(ক)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন