এহসান চলে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে পা বাড়িয়ে অনু বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। পা দুটো যেন নিজের অজান্তেই ভারী হয়ে এসেছে।লিভিং রুমে ঢুকতেই তার চোখ আটকে গেল। নীল সোফায় চুপচাপ বসে আছে নীল। তার পাশেই বসে আছেন শিরিন সিদ্দিকী। নীল অনুকে দেখেই উৎকণ্ঠা নিয়ে উঠে দাঁড়াল। ও যেন অনুর জন্যই অপেক্ষা করছিল।
অনুর সারা শরীর তখনো এহসানের সেই তীব্র উপস্থিতির আবেশে কাঁপছে। এহসানের বলা প্রতিটি কথা, তার চোখের ভাষা, আর হঠাৎ করেই অনুর প্রতি ওর অদ্ভুত অধিকারবোধ—সবকিছুই বারবার ফিরে আসছে অনুর মনে। নীল ঠিক অনুর সামনেই বসে আছে, কিন্তু সেদিকে অনুর কোনো খেয়ালই নেই। সে যেন নিজের ভাবনার গভীর সাগরে ডুবে গেছে।
শিরিন সিদ্দিকী মেয়েকে দেখতে পেয়েই মমতাভরা কণ্ঠে ডাক দিলেন, "অনু!"
অনু ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে এসে হালকা কেঁপে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য চারপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারল, শিরিন সিদ্দিকী আর নীল ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।অনু ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছিল না ও কী করবে। নীল ওর দিকে এক পা এগিয়ে আসতেই ওর মনে হলো, কয়েক মিনিট আগে এহসানের জিপের ভেতরে কাটানো সেই মুহূর্তগুলো ওর চারপাশকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। এহসানের সেই উডি পারফিউমের ঘ্রাণ যেন এখনো ওর নীল ওড়নায় মিশে আছে।
নীল উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে উঠল "অনু, তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন যেন কোনো ভূত দেখেছ! তোমাকে কি কেউ কিছু বলেছে?"
শিরিন সিদ্দিকী ধীর ভঙ্গিতে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। অনুর মুখের দিকে একবার তাকাতেই তাঁর ভ্রু কুঁচকে উঠল। ফ্যাকাশে মুখ, অন্যমনস্ক দৃষ্টি—মেয়েটাকে দেখে তাঁর মনে হলো, হয়তো আবারও শরীরটা খারাপ লাগছে। মায়ের মন তো সন্তানের সামান্য অস্বস্তিও এড়িয়ে যেতে পারে না।
তিনি আর কিছু না ভেবেই নীলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
" নীল বাবা, অনুর বোধহয় শরীরটা আবারও খারাপ লাগছে। একটু দম নিতে দেও। ল্যাব থেকে ফিরেছে, শরীরটাও তো ভালো না। "
তারপর অনুর দিকে ইশারা করে শিরিন সিদ্দিকী বললেন,অনু, তুই নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নে, মা। খাবার নিয়ে আসছি তোর জন্য।মায়ের কথা শুনে অনু আর নীল- কে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিল না। অনু কোনোমতে মাথা নেড়ে নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দিল।
কিন্তু ওর পেছনে নীলের সেই সন্ধানী দৃষ্টি ও অনুভব করতে পারছিল। ঘরে ঢুকে দরজাটা আটকে ও আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকিয়ে ও ফিসফিস করে বলল,
"আপনি আমাকে এভাবে নিজের জালে কেন জড়াচ্ছেন, এহসান সিদ্দিকী? আমাদের মাঝের বিয়েটা তো স্রেফ একটা চুক্তি... তাই না?
তাহলে কেন এমন করছেন? ইচ্ছে করেই কি আমাকে এভাবে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছেন?
আপনি তো বলেন, আমাকে আপনার পছন্দ নয়। অথচ আমার পাশে অন্য কাউকে দেখতেও পারেন না। আপনার চোখে সেই রাগ, সেই অধিকার—যেটার কোনো নাম নেই।বলুন তো... আপনি অদ্ভুত, নাকি আমাদের নিয়তিটাই এমন অদ্ভুত?"
ঠিক তখনই বিছানায় রাখা ফোনটা সশব্দে কেঁপে উঠল। হঠাৎ শব্দে অনু চমকে তাকাল। কপালের ভাঁজ আরও গাঢ় হয়ে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে একটি অপরিচিত নম্বর। কয়েক সেকেন্ড দ্বিধায় তাকিয়ে থেকে অবশেষে কলটি রিসিভ করল সে।
— "হ্যালো...?"
ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা, সেই নীরবতার মাঝেই অনুর বুকের ভেতরটা কেমন অকারণে ধুকপুক করে উঠল।তারপর কোনো ভূমিকা ছাড়াই ভেসে এল একটা গম্ভীর কণ্ঠস্বর—
"অপরিচিত নম্বর দেখে কলটা কেটে দিতে পারতে। দিলে না কেন, রুপ ?"
মাত্র একটুকরো বাক্য। কিন্তু সেই কণ্ঠস্বর শুনেই অনুর আঙুল শক্ত হয়ে এল, নিঃশ্বাস আটকে যাওয়ার উপক্রম হলো, এই কণ্ঠস্বর ভুলে যাওয়ার মতো নয়।
"এহসান সিদ্দিকী "?
অনুর ঠোঁট শুকিয়ে গেল, গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না।সে অবাক হয়ে ফোনটা কানের সঙ্গে চেপে ধরে রইল। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ ওপাশের মানুষটা যেন সবকিছুই বুঝতে পারছে। কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে আবারও কর্তৃত্বমাখা কণ্ঠে বলল,
— "এত চুপ কেন? নাকি আমার কণ্ঠস্বর শুনে কথা বলতে ভুলে গেছ?নাকি তোমার সেই 'নীল ভাইয়া'র সাথে... "
অনু ধরা গলায় "আপনি কেন ফোন করেছেন? আমি তো ঘরে ঢুকেছি।"
"আমি ফোন করেছি এটা মনে করিয়ে দিতে যে,এই মুহূর্তে তুমি কার সীমানায় আছো। নীল কি এখনো তোমার সামনে বসে আছে? ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কি একবারও বলতে পেরেছ যে তুমি এখন 'মিসেস সিদ্দিকী'? নাকি এখনো তুমি ওর সেই পুরনো রূপকথা হয়েই থাকার নাটক করছ?"
অনু এহসান এর এমন কোথায় হক- চকিয়ে গেল "প্লিজ, মা আছে বাইরে। আপনি এমন কেন করছেন?"
"এমনই করব!আর হ্যাঁ, আজ রাতে ঘুমানোর আগে আমাকে একটা টেক্সট করবে। আমি তোমার 'জানেমন' হিসেবে নয়, তোমার স্বামী হিসেবে হুকুম দিচ্ছি। মনে থাকবে, বেগম?"
কথাটা বলেই এহসান কলটা কেটে দিল।গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে বসে থাকা এহসানের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। পরমুহূর্তেই সেই হাসি সশব্দে ছড়িয়ে পড়ল গাড়ির নিস্তব্ধ কেবিনজুড়ে।
— "পাগলি একটা…" নিজের মনেই বিড়বিড় করল সে।কিন্তু পরের মুহূর্তেই হাসিটা মিলিয়ে গেল। চোয়াল শক্ত করে চোখ বন্ধ করল এহসান। এক হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরে নিজেকেই ধমক দিল, "এহসান সিদ্দিকী, তুমি কী করছ? দূরে রাখার কথা ছিল… অথচ প্রতিটা মুহূর্তে নিজেই ওর কাছে চলে যাচ্ছ।"
এক মুহূর্ত নীরব থেকে সামনের উইন্ডশিল্ডের দিকে তাকাল সে। তারপর যেন নিজেকেই বোঝাতে চাইল, "এটা শুধু একটা জোরপূর্বক বিয়ে… আর মাত্র ছয় মাস। তারপর আমি ওকে ডিভোর্স দিয়ে দেব।"
কিন্তু কথাটা উচ্চারণ করার পরও বুকের ভেতর অদ্ভুত এক টান অনুভব করল সে। অনুর নামটা যেন অদৃশ্য কোনো সুতো হয়ে তার সমস্ত সংযমকে বারবার জড়িয়ে ফেলছে।
"বেগম...?"
শব্দটা বারবার কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। জানালার গ্রিল ধরে বাইরের নিকষ কালো অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ছিল অনু। কিছুক্ষণ আগেই এহসান তাকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে গেছে। জিপের সেই বিকট শব্দটা এখনো অনুর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। অনু ভেবেছিল, এহসান হয়তো রাগ করেই কোনো কথা না বাড়িয়ে, তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চলে গেছে।
অনুকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়ার সময় বাড়ির সামনে রাখা নীলের বাইকটা চোখে পড়েছিল এহসানের। বাইকটা দেখামাত্রই তার ভেতরে চাপা রাগটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। নীলের কথা মনে হতেই মুখটা আরও কঠিন হয়ে উঠেছিল। কোনো কথা না বলেই দ্রুত গাড়ি চালিয়ে সেখান থেকে চলে গিয়েছিল সে।
বেশ কিছুটা পথ পেরিয়ে যাওয়ার পরও মনটা অস্থির হয়ে ছিল। বারবার নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, অনু যার সঙ্গে ইচ্ছা কথা বলুক, যার সঙ্গে ইচ্ছা দেখা করুক। তাতে তার কী? কিন্তু কথাগুলো যতবার নিজেকে বলেছিল, ততবারই সেগুলো মিথ্যে মনে হয়েছিল। মন কোনোভাবেই তা মানতে রাজি হচ্ছিল না। অনুর জীবনে কী হচ্ছে, সেটা নিয়ে ভাবার কোনো অধিকার তার নেই। তবু অদ্ভুত এক অধিকারবোধ বারবার তাকে গ্রাস করছিল। যতই নিজেকে বুঝিয়েছিল, ততই অস্থিরতা বেড়ে গিয়েছিল।
শেষমেশ মনকে আর সামলাতে পারেনি এহসান। গাড়ি ঘুরিয়ে আবার অনুদের বাড়ির রাস্তায় ফিরে এসেছিল। তবে এবার বাড়ির সামনে নয়, একটু দূরে রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়েছিল। কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে বসে থেকে নিজের সঙ্গেই লড়াই করেছিল। কিন্তু সেই লড়াইয়েও হার মেনেছিল সে।
অবশেষে ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে অনুর নম্বরে কল করেছিল এহসান।
এহসানের কল কেটে যাওয়ার পর অনু এসে বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ করেই কেন জানি তার মনটা ভীষণ হালকা লাগতে শুরু করল নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল, "আপনি আসলে কী চান, এহসান সিদ্দিকী...?এই কি সেই এহসান সিদ্দিকী? যে ক্যাম্পাসে আমাকে দেখা মাত্রই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে মুখ ঘুরিয়ে নিত? সুযোগ পেলেই যে আমাকে অপদস্থ করত, আজ তার গলায় এত তীক্ষ্ণ অধিকার কেন?"
এসব ভাবতে ভাবতেই অনু কখন ঘুমিয়ে পড়ল, সে নিজেও বুঝতে পারল না। কিছুক্ষণ পর দরজায় মৃদু টোকা পড়ল। বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল নীল। বেশ কয়েকবার দরজায় নক করেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পেল না সে। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মন খারাপ করেই সেখান থেকে চলে গেল।
রাতে অনামিকা আর অভির সঙ্গে কনফারেন্স কলে গত সাত দিনের পড়া বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছিল অনু। কিন্তু পড়ায় মন বসছিল না তার। বইয়ের পাতায় চোখ থাকলেও মনটা বারবার ছুটে যাচ্ছিল সেই অপরিচিত নম্বর থেকে ভেসে আসা তপ্ত, ভারী কণ্ঠস্বরটির কাছে। অদ্ভুত এক অস্থিরতা বারবার গ্রাস করছিল তাকে।হঠাৎই অনু বইটা বন্ধ করে গলার স্বর শক্ত করল। এতক্ষণ ধরে মনের ভেতর ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নটা আর চেপে রাখতে পারল না, "তোদের মধ্যে আমার নম্বরটা এহসান ভাইয়া কে দিয়েছিস? সত্যি করে বল তো?"
ফোনের ওপাশে মুহূর্তের জন্য নেমে এলো অস্বস্তিকর নীরবতা। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে অনামিকা তড়িঘড়ি পাশে বসা অভির দিকে আঙুল তুলে ইশারা করল, যেন সব দোষ ওর।
অভি চোখ বড় বড় করে ফিসফিসিয়ে বলল,
"এই! আমি আবার কী করলাম?"
অনু গম্ভীর গলায় বলে উঠল, "থাম তোরা! সত্যিটা না বললে আমি কিন্তু এখনই কল কেটে দেব।"
অনামিকা আর লুকোতে পারল না। ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে বলল, "আচ্ছা বাবা... আমিই দিয়েছি। আর তুই যে অসুস্থ, সেটাও আমিই বলেছি। কিন্তু শোন না... ওরকম একটা শ্যেনচক্ষু, গ্রিক গডদের মতো লম্বা-চওড়া হ্যান্ডসাম ছেলে যখন নিজে থেকে নম্বর চায়, তখন তাকে না করাটাই তো পাপ! তাই দিয়ে দিয়েছি।"তারপর অনামিকা মুখ তুলে নিজের দাঁত দেখিয়ে হেসে উঠে গুনগুন করে গেয়ে উঠল—
"লুকিয়ে লুকিয়ে কার কথা যে, সারাক্ষণ ভাবিস তুই,বল না সখী, প্রেমের নদীতে ভাসছিস নাকি তুই?.... আচ্ছা অনু তুই কি এহসান ভাইয়ের সঙ্গে প্রেম করছিস নাকি রে?"
অভি তখন বললো অনামিকা, তুই তো আস্ত একটা বলদ এহসান ভাইয়ের মতো কাঠখোট্টা ইঞ্জিনিয়ার কি আর প্রেম বোঝে? ও বড়জোর ল্যাবের কোনো প্রজেক্টের জন্যই নম্বর নিয়েছে।
প্রথমে আমিও তেমনই কিছু ভেবেছিলাম। পরে অনেক ভেবেছি, বুঝলি? কিন্তু দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে পারলাম না। ডিপার্টমেন্টের কোনো দরকারে নিয়েছিল, মেবি। কিরে অনু, তাই না?
অনু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যাক, অন্তত বন্ধুরা কিছু বুঝতে পারেনি। বুকের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তিটা আড়াল করে অভির প্রশ্নের উত্তরে ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি টেনে বলল, "হ্যাঁ... ল্যাবের কাজের জন্যই হয়তো।"
অন্যদিকে, নিজের ঘরের জায়নামাজে বসে মোনাজাত শেষ করে দুই হাত তুলে পাথর হয়ে বসে ছিল এহসান। বাইরের জগত তাকে কঠোর হিসেবে চিনলেও, নিজের নিভৃতে সে ভীষণ অসহায়। ও নিজের অস্তিত্বের সাথে লড়াই করছে।
"ইয়া আল্লাহ, আমার সাথে এসব কী হচ্ছে? কেন ওই মেয়েটা আমার কেউ না হয়েও আমার মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরনে গেঁথে যাচ্ছে? আমাকে তুমি ওর এই মোহ থেকে মুক্তি দাও। যদি মুক্তি দাও, আমি সারাজীবন ওর মঙ্গলের জন্য দোয়া করে যাব। আমি দিন দিন অসহায় হয়ে পড়ছি। যতবার ওকে দেখি, ততবারই মনে হয় কেউ যেন আমার ভেতরটা এলোমেলো করে দিচ্ছে। নিজের ওপর থেকেও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছি।হে আল্লাহ... আমাকে এই অনুভূতি থেকে মুক্তি দাও। ওর থেকে আমাকে মুক্তি দাও। আমার হৃদয়কে শান্তি দাও।"
পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে এক অপ্রীতিকর নিস্তব্ধতা ভাঙলেন এহসানের বাবা রশিদ সিদ্দিকী । তিনি খবরের কাগজ থেকে চোখ না সরিয়েই গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করলেন, "মুক্তার মেয়ে নাইসাকে তোমার কেমন লাগে এহসান?"
হঠাৎ এই অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে এহসান চমকে উঠল। মুক্তা চৌধুরী তার বাবার দীর্ঘদিনের বিজনেস পার্টনার। আর নাইসা এহসানের কেবল ভালো বন্ধু। কিন্তু রশিদ সাহেবের কণ্ঠের সেই প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত এহসানের নজর এড়াল না। তিনি হয়তো নিজের ব্যবসার স্বার্থে কোনো নতুন বন্ধনের জাল বুনছেন, যা এহসানের অগোচরেই তৈরি হচ্ছে।এহসান উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ মনে করো না। বাবার প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল এহসান। কোনো রকমে খাবার শেষ করে চেয়ারটা সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ভার্সিটির উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল সে।
ক্যাম্পাসে আজ এক অভিনব চাঞ্চল্য। নতুন এক প্রফেসর জয়েন করছেন। ক্যাফেটেরিয়ার এক কোণে এহসান, নীল, সাজিদ, তামরিন আর জেড বসে আড্ডা দিচ্ছিল। হঠাৎ পেছন থেকে আহিয়ান উদয় হয়ে সাজিদের মাথায় এক গাট্টা মারল!
আহিয়ান এই গ্রুপের সেই 'প্লে-বয়', যার ডিকশনারিতে 'সিরিয়াসনেস' বলে কিছু নেই। চোখে রঙিন চশমা আর ঠোঁটে হাসি নিয়ে সে সবসময় কোনো না কোনো নারী হৃদয়ে ঝড় তুলতে ব্যস্ত।
আহিয়ান: "কী রে করলার ছেলে! একদিন ক্যাম্পাসে আসিনি বলে আমাকে ভুলেই গেলি?"
তামরিন সাজিদের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে বলে উঠল, ইশ! আমার এই হাবাগুবাটাকে মারছিস কেন?
আহিয়ান বলে উঠল , রাখ তোর হাবাগুবা! হাবাগুবা বলেই তো মারছি। বলদের ওপর পিএইচডি করেছে? শালা, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চান্স পেলি কীভাবে? ফ্যাকাল্টির মনে হয় সেদিন অন্ধ-টন্ধ হয়ে গিয়েছিল "
মাঝখান থেকে জেড তখন বলে উঠলো কাল কেন এলি না! আগে এটা বল।
আহিয়ান পকেট থেকে একটা টুথপিক বের করে দাঁতের মাঝে রেখে জবাব দিল,বড় ভাইয়ের জন্য মেয়ে দেখতে গিয়েছিলাম, তাই আসতে পারিনি। উফ, তারপর নিজেরটা... জাস্ট ভাব, আমি বিয়ে করেছি। আমারও একটা বউ হবে, আর আমি এক্সের সামনে বউয়ের হাত ধরে হাঁটব। আর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেব— ‘কালনাগিনীকে হারিয়ে মহারানীকে পেয়েছি।’
তামরিন ঠোঁট বাঁকা করে হেসে বলল, "তোর দিনে বত্রিশ বার বিয়ে হয়ে এগুলো বাদ দে এখন, জানিস কে আসতে যাচ্ছে? তারপর তামরিন আবার চোখ বড় বড় করে বলল,নিউ প্রফেসর... নিউ প্রফেসর!"
আহিয়ান খুশিতে ডগমগ হয়ে জেডের দিকে ভ্রু নাচিয়ে ইশারা করল। ও ভেবেছিল হয়তো কোনো সুন্দরী নারী প্রফেসর আসছেন,কিন্তু জেডের কথা শুনে ওর প্লে-বয় ইগোতে যেন চোট লাগল।
জেড: "সরি ম্যান! তোর সব প্ল্যান ভেস্তে গেছে। উনি পুরুষ, মহিলা নন।"
এহসান আহিয়ানের কাঁধে হাত রাখল, যেন এক বিমর্ষ যোদ্ধাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে।"আহারে বেচারা! তবে আহিয়ান, তুই চাইলে এখনো লাইন মারতে পারিস, যদি তোর ইন্টারেস্ট বদলে যায় আরকি!"
আহিয়ান এহসানের কথায় চোখ-মুখ কুঁচকে বলল, "ছিঃ! মুখ সামলে কথা বল, এহসান। আমি পিওর লেডিস লাভার।"
তামরিন তখন বলে উঠে "তোদের মনে আছে সেইবার সাবিহা ম্যামের কথা? আমাদের এই 'আশিক বয়' আহিয়ান তো ওনাকে অবিবাহিত ভেবে কী সব রোমান্টিক ডায়ালগই না ঝাড়ল!শেষে যখন জানল ম্যাম দুই বাচ্চার মা, তখন এহসান আর নীল গিয়ে ম্যামের হাত থেকে ওর মান-সম্মান বাঁচিয়ে এনেছিল ।"
সবাই হো হো করে হেসে উঠল, সেই পুরোনো কেলেঙ্কারির কথা মনে পড়তেই। ক্যাফেটেরিয়ার পরিবেশটা মুহূর্তের মধ্যেই হাসি-ঠাট্টায় ভরে গেল।
ঠিক তখনই ক্যাফেটেরিয়ার মূল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন একজন দীর্ঘদেহী, অত্যন্ত আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী মানুষ। পরনে গাঢ় নীল রঙের ফিটেড শার্ট, চোখে রূপালি ফ্রেমের চশমা। তাঁর চলাফেরায় ছিল এক ধরনের স্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস, আর ব্যক্তিত্বে এমন এক আভিজাত্য ছিল, যা অনায়াসেই সবার নজর কেড়ে নিল।
জেড হঠাৎ ফিসফিস করে বলল, "গাইস, চুপ কর! ইনিই মনে হয় সেই নতুন প্রফেসর—হুমায়ূন কবির।"
মুহূর্তেই সবাই একটু শান্ত হয়ে গেল। হুমায়ূন কবিরের শান্ত অথচ ভেদকারী দৃষ্টি একবার এহসানদের টেবিলের ওপর দিয়ে ঘুরে গেল।
চলবে
#নিভৃতে_যত্নে_রাখা_প্রিয়তমা
#লিখনিতে_মারিয়াম_ফুল।
পর্ব সংখ্যা : ৩(খ)