"আমার ডিভোর্স চাই!”
“ কিন্তু আমার বাচ্চা চাই!”
এহসান মোটেও ঘাবড়াল না অনুর ডিভোর্স চাওয়াতে । সে কফিতে আরেকটা চুমুক দিয়ে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে রাখল।
অনুর রাগে এবার দম আটকে যাওয়ার জোগাড়। ও চোখ বড় বড় করে এহসানের দিকে তাকাল, কিন্তু পরক্ষণেই তীব্র অভিমানে চোখ নামিয়ে নিল। ও টেবিলের এক কোণে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে কাঁপা গলায় বলল, “বাচ্চার মাকে ভালোবাসেন না, অথচ ওনার বাচ্চা চাই! বাহ রে ! কী অদ্ভুত আবদার। মুখ দিয়ে তো একবারও ভালোবাসার কথা বের হয় না, তাহলে বাচ্চা কেন চাইবেন শুনি? যে পুরুষ তার স্ত্রীকে বেঁচে থাকতে মৃত দেখতে চায়, তার সাথে আমি এক মুহূর্তও থাকব না।”
অনুর এই অভিমানী রূপ দেখে এহসান মনে মনে বেশ আনন্দ পাচ্ছে।এই ৫ মাসে অনুর রাগগুলো ওর কাছে ভীষণ চেনা এবং অসম্ভব রকমের প্রিয়। অনু এবার টেবিল চাপড়ে মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিল, যেন ও আর এহসানের মুখই দেখতে চায় না।
এহসানও সাথে সাথে গলার স্বর গম্ভীর করে বলল, “আমিও সিরিয়াস রূপ। তোমার কি মনে হচ্ছে আমি ইয়ার্কি করছি? বিয়ের এতগুলো দিন হয়ে গেল... মানলাম আমাদের কট ম্যারেজ হয়েছিল, কিন্তু বিয়ে তো হয়েছে, নাকি? আমাদের বিয়ের আজ পাঁচ-পাঁচটা মাস কেটে গেল, অথচ আমার বাচ্চাগুলোর এখনো স্কুল-কলেজে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে, বউ......তুমি কি চাও ওরা পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়ুক?"
অনু চোখ কপালে তুলে রেগে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “যারা এখনো দুনিয়াতেই আসে নাই , তাদের পড়াশোনায় আবার দেরি কিসের?”
এহসান একটা তুড়ি মেরে বলল, “এক্সাক্টলি বেগম সাহেবা, তারা দুনিয়াতে নেই বলেই তো দেরি হচ্ছে। তার জন্যই তো তাদের তাড়াতাড়ি দুনিয়াতে ডাউনলোড করতে হবে।”
অনু এবার একটু আমতা আমতা করে, লজ্জা আর রাগের মিশ্রণে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “ক. কয়.. কয়টা বাচ্চা চান শুনি?”
“১১টা বউ, জানো না? বাংলাদেশের ক্রিকেট টিমের যে পারফরম্যান্স, দিন দিন যা অবস্থা হচ্ছেমোটেও ভালো না। তাই দেশের কথা ভেবে এই টিম বানানোর দায়িত্ব আমি নিজেই কাঁধে নিতে চাই। পুরো একাদশ নামিয়ে দেব।”
অনু বেশ কিছুক্ষণ ‘হা’ হয়ে এহসানের দিকে তাকিয়ে রইল। এই লোক কি আসলেই আস্ত একটা পাগল? একটা না, দুটো না, একেবারে ১১টা বাচ্চা!
ও এবার সত্যি সত্যি রেগে গেল। ও নিজের আঙুলগুলো মুঠো করে টেবিলের ওপর চেপে ধরে বলল, “আমি ঠিকই ভেবেছি, আপনি আমাকে একটুও ভালোবাসেন না। ভালোবাসলে আগে আমার কথা, আমার কষ্টের কথা চিন্তা করতেন। তা না, ওনার ক্রিকেট টিম চাই। আমি আর এক মুহূর্তও এখানে থাকব না। অসভ্য লোক! মুখ ফুটে একবারও বলল না যে আমাকে ভালোবাসে, অথচ সাহেবের আবার বাচ্চা চাই”
এহসান আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। ও হু হু করে হেসে উঠল। রেস্টুরেন্টের শান্ত পরিবেশে ওর এমন হাসির শব্দে আশেপাশের বাকি মানুষজন ওদের দিকে তাকাতেই এহসান এক হাত মুখে চেপে হাসতে লাগল। কিন্তু ওর চোখের চাউনিতে অনুর জন্য এক বুক ভালোবাসা টলমল করছে।
অনুর কাছে তার রাগটা অযৌক্তিক না। ওর কাছে রাগ করার যথেষ্ট কারণ আছে।
কিছুক্ষণ আগে....
আজ শুক্রবার হওয়ায় ইউনিভার্সিটি বন্ধ ছিল। ছুটির দিনে এহসান আর অনু দুজনে মিলে বাইরে দেখা করতে এসেছিল একটা ছিমছাম রেস্টুরেন্টটায়। টেবিলে বসার পর অনু হুট করেই বলে ফেলেছিল, “এহসান ভাইয়া...”
কথাটা শেষ করার আগেই এহসান হঠাৎ রেগে গিয়ে বলেছিল, “আমি তোমার ভাইয়া? আমাদের বিয়ের পাঁচ মাস হয়ে গেল, আর তুমি এখনো আমাকে ভাইয়া বলে ডাকছ? আমার নাম ধরে ডাকো।”
অনু তখন আমতা আমতা করে কয়েকবার ‘এহসান’ ‘এহসান’ বলে ওর নাম ধরে ডেকেছিল। নাম ধরে ডাকার পর অনুর মনে হয়েছিল, এই মানুষটা আসলে ওর জন্য কী না করতে পারে! ওর ভেতরের সব জড়তা কেটে গিয়েছিল। ও একটু মায়া জড়িয়ে ডেকেছিল,
"এহসান"
এহসান উত্তরে নরম গলায় বলেছিল, “হুম, জানপাখি বলো।”
হুট করে ‘জানপাখি’ ডাকটা শুনে অনুর ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছিল। তারপর সে এহসানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছেন
“আচ্ছা, শাহজাহান তো মমতাজের জন্য তাজমহল বানিয়েছিলেন। আপনি আমার জন্য কী করবেন?”
আর তখনই এহসান রসিকতা করে বলেছিল,
“আমি??? তোমার বর তো এত বড়লোক না জান! তবে একটা কাজ করতে পারি, তুমি মারা গেলে আমি তোমার কবরে দামি টাইলস লাগিয়ে দিতে পারি ।”
ব্যস, এই একটা কথাতেই অনুর মনে হলো, এহসান বোধহয় তাকে সত্যি ভালোবাসে না। যে ভালোবাসে, সে কখনো তার প্রিয়তমার মৃত্যুর কথা মুখেও আনতে পারে না।এহসান যখন তাকে ভালোবাসে না তাহলে সে কেন থাকবে তার সাথে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে ফিরে আসা যাক, অনু রাগ দেখানোর জন্য নিজের ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে হনহন করে উঠে দাঁড়াল।অনু যখন রাগ করে হাঁটা ধরল, এহসান তখন হাসি থামিয়ে একটু সিরিয়াস হয়ে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি চলে যেতে চাইলে সমস্যা নেই রূপ... কিন্তু ভুলে যেও না, তোমার ফেরার জায়গাটা শুধু আমার কাছেই থাকবে।”
অনু একবার পিছন ফিরে এহসানের দিকে তাকাল। ওর তখনো অভিমান। ও মুখ বাঁকিয়ে বলল, “আমি আর আসছি না আপনার কাছে।”
বলেই ও হনহন করে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে কিছুটা দূরে চলে গেল। এহসান দূর থেকে অনুর চলে যাওয়া দেখতে দেখতে কফিতে শেষ চুমুক দিল। ও মনে মনে হাসল আর বলল, “তোমাকেই আসতে হবে রূপ। আমাকে ছাড়া তোমার যাওয়ার সব পথ যে অদৃশ্য।”
কিন্তু এহসান যখন কফির মগটা টেবিলে রাখল, হাসিটা হুট করেই মিলিয়ে গেল। রেস্টুরেন্টের কাচের জানালার বাইরে ল্যাম্পপোস্টের নিচে একটা কালো রঙের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গত এক ঘণ্টা ধরে গাড়িটা ওখানেই স্থির। এহসানের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সায় দিচ্ছে , ওদের ওপর কেউ কড়া নজর রাখছে।
অন্যদিকে....
জেডের রুমের ভেতর তখন এক অন্যরকম ব্যস্ততা। খাটের ওপর ছড়ানো-ছিটানো কয়েকটা ব্ল্যাক আর ডার্ক ব্লু রঙের শার্ট। ও ড্রয়ার টেনে একটা কালো সুতির ব্যান্ডানা বের করল। ঠিক তখনই খাটের ওপর রাখা ফোনটা অনবরত ভাইব্রেট করতে শুরু করল। স্ক্রিনটা জ্বলে উঠতেই দেখা গেল নোটিফিকেশনের বন্যায় ওটার দম আটকে যাওয়ার জোগাড়। ফেসবুক ওর শেষ গিটার কাভারটা এখন ট্রেন্ডিং পেজের একেবারে শীর্ষে।
মাত্র ঘণ্টাখানেক আগে যখন ও যখন বাড়িতে ফিরছিল, গলির মোড়ে রিকশা থেকে নামার সাথে সাথেই তিন-চারজন কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়ে এসে ওকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছিল। বেশ আমতা আমতা করে কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো একটা ছেলে বলেই ফেলল, “জেড ভাই, আপনার গানের আমরা হেভি ফ্যান। বিশেষ করে থিম টিউনটা জাস্ট জোস ছিল। ভাই, একটা সেলফি তোলা যাবে?”
এমনকি এখনো জানালার বাইরে কান পাতলে জুনিয়রদের গলার আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল ; ওরা গলির মোড়ে ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে গিটার হাতে জেডেরই একটা চেনা গানের লাইন তোলার চেষ্টা করছিল ।
আজ রাতে সিলেটের যে নামকরা ইউনিভার্সিটি মাঠে বিশাল কনসার্ট, সেটার ব্যাকস্টেজে ইতিমধ্যেই পুরো টিম পৌঁছে গেছে। একটু আগে ব্যান্ডের ড্রামার হন্তদন্ত হয়ে কল করে বলল,
“জেড ভাই, সিকিউরিটি গার্ডরা হিমশিম খাচ্ছে। গেট ভেঙে ফেলার অবস্থা মানুষের ধাক্কায়। টিকিটের জন্য বাইরে রীতিমতো মারামারি লেগে গেছে। ক্রাউড সামলানো যাচ্ছে না ভাই, আপনি তাড়াতাড়ি চলে আসেন।”
জেডের হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বভাব বরাবরই নতুন কিছু না। প্রথম বারের মতো এত বড় একটা স্বনামধন্য ইউনিভার্সিটির কনসার্টে পারফর্ম করার ডেট ও বুক করে ফেলেছিল বেশ কিছুদিন আগেই। কিন্তু তখন ও হিসাব করে দেখেনি যে ঠিক এই সময়েই ওদের সেমিস্টার ফাইনাল এক্সামটা পড়বে। এখন আর ডেট পিছানো বা কনসার্ট ক্যানসেল করার কোনো উপায়ই অবশিষ্ট নেই, কারণ টিকিট সব ‘সোল্ড আউট’ ! কাল সকালেই আবার এক্সাম। জেড ওর পুরো ব্যান্ড টিম আর বন্ধুদের গ্রুপ চ্যাটে একটা ফাইনাল টেক্সট পাঠিয়ে দিল, “কাল পরীক্ষা ঠিক আছে, কিন্তু আজ রাতের কনসার্টটা আমরা মিস করতে পারি না। তোরা সবাই ব্যাকস্টেজে রেডি থাকিস। আমি আসছি।”
আজকের কনসার্টে পারফেক্ট রকস্টার লুক আনার জন্য জেড আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাথায় সেই কালো ব্যান্ডানাটা বেশ কায়দা করে বেঁধে নিল। জেডের বাবা প্রথমে হলরুমে দাঁড়িয়ে একটু আপত্তি করেছিলেন, “সামনে পরীক্ষা জেড, এখন এই গানের ভূত মাথা থেকে নামাও।”
কিন্তু একমাত্র ছেলের খুশি,এক্সাইটমেন্ট দেখে তিনি আর শেষ পর্যন্ত ‘না’ করতে পারলেন না। মুচকি হেসে আলতো করে ছেলের কাঁধ চাপড়ে বললেন, “সাবধানে যাস। আর কালকের পরীক্ষা যেন কোনো অবস্থাতেই খারাপ না হয়।”
জেড যখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে পারফিউম স্প্রে করছিল, ঠিক তখনই অনামিকা গুটিগুটি পায়ে রুমে ঢুকল। জেডের এমন জমকালো প্রস্তুতি দেখে ও ড্রেসিং টেবিলের কোণায় আলতো করে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। নিজের চাবির রিংটা তর্জনীতে বনবন করে ঘোরাতে ঘোরাতে চোখ দুটো ছোট ছোট করে বেশ সন্দেহী গলায় জিজ্ঞাসা করল,
“কোথায় যাচ্ছেন এত সেজেগুজে?”
জেড আয়নাতেই অনামিকার প্রতিফলনটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। শার্টের কলারটা ঠিকঠাক করতে করতে অত্যন্ত নির্বিকার গলায় বলল, “পটল তুলতে।”
অনামিকা সাথে সাথে দুই গালে হাত দিয়ে কৃত্রিম বিলাপে ভেঙে পড়ল, “হায় হায়! জামাই আপনি একী কথা বলেন? এত তাড়াতাড়ি পটল তুললে আমাদের কী হবে? আমরা যে অনাথ হয়ে যাব!”
জেড চরম বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ওর দিকে সোজা ঘুরে তাকাল, “কাদের কী হবে? অনাথ আবার কে হবে? তোমার এই অসময়ের নাটক বন্ধ করবে প্লিজ?”
অনামিকা এবার ডান হাতের তর্জনী দিয়ে নিজের চিবুক ছুঁয়ে, চোখে এক আকাশ নাটকীয়তা ফুটিয়ে বলল,
“আমাদের বাচ্চাদের, স্বামী.... ওদের মুখ পানে চেয়ে হলেও আপনাকে বেঁচে থাকতে হবে। আপনি এভাবে পটল তুলতে যেতে পারেন না।”
জেডের চোখমুখের অভিব্যক্তি তখন দেখার মতো হলো। ও ভ্রু কুঁচকে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল,
“হোয়াট? স্বামী? আর বাচ্চা কই থেকে এলো? তোমার মাথা ঠিক আছে অনামিকা?”
অনামিকা বিন্দুমাত্র না দমে ড্রেসিং টেবিলের কাচে নিজের নখ দিয়ে আলতো করে ঠুকঠুক করল। ঠোঁট দুটো উল্টো করে ফুলিয়ে বলল,
“শুনুন, স্বামী মানে পাতি। পাতি মানে হাজব্যান্ড। হাজব্যান্ড মানে জামাই। আর আপনি যেহেতু আমার আইনত বিবাহিত জামাই, সেহেতু আপনিই আমার স্বামী। ডিকশনারি ভুল বলতে পারে, অনামিকা কখনো ভুল লজিক দেয় না।
আর স্বামী থাকলে বাচ্চা তো আজ হোক বা কাল হবেই, নাকি?”
জেড ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে ড্রয়ার থেকে নিজের ভারী গিটার কেসটা কাঁধে তুলে নিল, “আমি সব জানি। তোমার এই ফালতু আর অদ্ভুত লজিক আমাকে বোঝাতে হবে না।”
“তা কী জানেন শুনি?” অনামিকা কোমরে হাত দিয়ে চ্যালেঞ্জিং ভঙ্গিতে একদম দরজার মুখে গিয়ে দাঁড়াল। ও খুব সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করল জেডের কানের লতি দুটো হালকা লাল হয়ে উঠেছে। ও মনে মনে বেশ হাসল। ও খুব ভালো করেই বুঝে গেছে, জেডের এই রাগটা আসলে ওপর ওপর, ভেতরে ও এই কনসার্ট নিয়ে মারাত্মক নার্ভাস হয়ে আছে।
জেড দরজার দিকে আরও দু-পা বাড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “তোমাকে বলার প্রয়োজন বোধ করছি না। আমার কনসার্ট আছে, অলরেডি দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
অনামিকা এক লাফে জেডের একদম মুখোমুখি এসে ওর পথ আগলে দাঁড়াল। নিজের ওড়নার
খুঁটটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে বলল, “আমিও যাব...”
জেড সোজা সাপটা জবাব দিল, “আমি তোমাকে নিয়ে যেতে পারব না। ওখানে ওয়ান কাইন্ড অফ ম্যাডনেস চলছে, প্রচণ্ড ক্রাউড থাকবে। সিকিউরিটির সমস্যা হতে পারে।”
“কেন? আমি কি আপনার কোলে উঠে যাব নাকি? গাড়িতে চুপচাপ বসে যাব। ব্যান্ডের এক কোণায় অন্ধকার দেখে বসে আপনার গান শুনব। আমার খুব ইচ্ছা আপনার লাইভ পারফরম্যান্স দেখার। প্লিজ নিয়ে চলুন না। ”
“না।”
অনামিকা সাথে সাথে মাথা ডানে-বামে দুলিয়ে বলল, “হ্যাঁ।”
“আমি বলেছি না, অনামিকা।”
“আমিও বলছি হ্যাঁ”
“না।”
“হ্যাঁ!
দেখুন, মুখ ফুটে ‘না’ বলতে গিয়েও আপনার কিন্তু অলরেডি ‘হ্যাঁ’ বলে দিয়েছে। তার মানে মনে মনে আপনি এক পায়ে রাজি। জাস্ট দুই মিনিট দিন, আমি আলমারি থেকে একটা চাদর গায়ে দিয়ে আসছি।
জেড কোনো উপায় না পেয়ে একটা দীর্ঘ তপ্ত শ্বাস ফেলে মনে মনে বলল, ‘উফ! এই মেয়ের জেদের কাছে হিটলারও নিশ্চিতভাবে হেরে যেত!’ অগত্যা অনামিকাকে সাথেই নিয়ে ওকে গাড়ির পেছনের সিটে গিয়ে বসতে হলো।
কনসার্ট ভেন্যুর বিশাল স্টেজে যখন মাইকে জেডের নাম অ্যানাউন্স করা হলো, তখন পুরো অডিটোরিয়াম কাঁপিয়ে হাজারো মানুষের চিৎকার আর হুল্লোড় আছড়ে পড়ল। কিন্তু স্টেজের ভারী কালো পর্দার আড়াল থেকে জেড যখন মেইন পডিয়ামের দিকে পা বাড়াল, হঠাৎ করেই ওর চারপাশের চেনা পৃথিবীটা কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেল।
হাজারো নিয়ন আলো আর চোখের সামনে তীব্র ফোকাস করা স্পটলাইটগুলো হঠাৎ জেডের চোখে ঝাপসা লাগতে শুরু করল। সামনের সারির হাজার হাজার চেনা-অচেনা মানুষের মুখগুলো কেমন যেন ব্লার বা ঝাপসা হয়ে একাকার হয়ে গেল। জেডের মনে হচ্ছিল পায়ের নিচের শক্ত কাঠের স্টেজটা বুঝি প্রবল ভূমিকম্পে দুলছে। কানের পর্দায় আছড়ে পড়া হাজার মানুষের ‘জেড জেড’ চিৎকারটা কেমন যেন একটা অস্পষ্ট, কানফাটানো ভোঁ ভোঁ শব্দে রূপ নিল। জেডের নিজের হার্টবিট নিজের কানে এত জোরে বাজতে লাগল যেন বুকের ঠিক মাঝখানটায় কেউ হাতুড়ি দিয়ে তীব্র আঘাত করছে—ধক ধক, ধক ধক!
মাইকটা স্ট্যান্ড থেকে ডানহাতে শক্ত করে খামচে ধরতেই হাতের তালুর ঠান্ডা ঘামে ওটা পিছলে হাত থেকে ফস্কে যেতে চাইল। ওর গলাটা একদম শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, মুখের ভেতর এক ফোঁটা থুতু গিলার মতো শক্তিও যেন অবশিষ্ট নেই। গিটার বাজানোর জন্য পকেট থেকে প্লাস্টিকের ছোট পিকটা বের করতে গেল ও, কিন্তু আঙুলের তীব্র কাঁপুনিতে ওটা টুপ করে হাত থেকে ফসকে নিচের স্টেজের মেঝেতে পড়ে গেল।
হাজারো উন্মত্ত মানুষের সামনে জেড তখন মঞ্চের ঠিক মাঝখানে সম্পূর্ণ একা, একটা তীব্র ফিজিক্যাল নার্ভাস ব্রেকডাউনের মুখোমুখি। ও আজ প্রথম হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারল, অনলাইনের ক্যামেরার ওপাশে বসে এডিটেড অডিওর সাথে থাকা আর সামনাসামনি এই জীবন্ত বিশাল জনতার হাজারটা প্রত্যাশাভরা চোখের মুখোমুখি হওয়া এক জিনিস নয়। স্টেজের ঠান্ডা বাতাসেও ওর কপাল বেয়ে ঘাম ঝরতে শুরু করেছে।
ভিআইপি জোনের একদম সামনের চেয়ারে বসে অনামিকা জেডের এই ফ্যাকাশে মুখ, কপালে জমে ওঠা বিন্দু বিন্দু ঘাম আর কাঁপতে থাকা শরীরটা লক্ষ্য করছিল। ও এক মুহূর্তেই বুঝে গেল জেডের মারাত্মক রকমের স্টেজ ফেয়ার হচ্ছে, ও এক চুলও নড়তে পারছে না। অনামিকা ব্যাগ থেকে নিজের ফোনটা বের করল। হাত দুটো ওর নিজেরও কাঁপছে জেডের এই অবস্থা দেখে, তবু ও পরম মমতায় জেডের এই কঠিন মুহূর্তটার ফেসবুক লাইভ ভিডিও রেকর্ডিং চালু করল ওর পেজে। ও চাইল জেডের শ্রোতারা শুধু ওর সাফল্য না, ওর এই রিয়েল স্ট্রাগলটারও সাক্ষী থাকুক।
ঠিক একই সময়ে, নিজেদের ঘরের ড্রইংরুমে সোফায় একা বসে জেডের বাবাও ফোনে সেই লাইভস্ট্রিমটা অন করে ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে রইলেন ছেলের দিকে। টিভির রিমোটটা পাশে পড়ে আছে, ওনার নিজের বুকটাও দুরুদুরু কাঁপছিল ছেলের অবস্থা দেখে। তিনি ফোনের স্ক্রিনটা আলতো করে ছুঁয়ে মনে মনে বলতে লাগলেন, “ভয় পাস না বাবা, তুই তো আমার বাঘের বাচ্চা। তুই ঠিক পারবি। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখ।”
এদিকে পুরো অডিটোরিয়াম যখন জেডের এই দীর্ঘ নীরবতা আর নিশ্চলতায় এক অস্বস্তিকর, থমথমে স্তব্ধতায় ডুবে যাচ্ছিল, দর্শকেরাও যখন একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে ভাবছিল কী হলো, ঠিক তখনই হঠাৎ পুরো অডিটোরিয়ামের মেইন লাইটগুলো দপ করে নিভে গেল। চারপাশ অন্ধকারাচ্ছন্ন নিস্তব্ধতায় ঢেকে গেল।
ঠিক তখনই, সেই জমাট বাঁধা নিস্তব্ধতার বুক চিরে, ব্যাকস্টেজের অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা ভারী ড্রামসের চড়া বিট পুরো হল কাঁপিয়ে প্রতিধ্বনিত হলো— ধুপ!
দর্শক সারি এক মুহূর্তে শান্ত হয়ে গেল। সেই থমথমে পরিবেশের বুক চিরে হালকা কৃত্রিম ধোঁয়ার আড়াল থেকে একটা চেনা, চড়া এবং অত্যন্ত ধারালো গিটার রিফ বেজে উঠল।
জেড চমকে পিছন ফিরে তাকাল। অন্ধকারের বুক চিরে ব্যাকস্টেজ স্মোক আর নিয়ন লাইটের আলো ভেদ করে হাসিমুখে স্টেজ কাঁপিয়ে এগিয়ে আসছে এহসান আর আহিয়ান। এহসান এসেই জেডের কাঁধটা এক হাত দিয়ে শক্ত করে জাপটে ধরল, যেন চোখের ইশারায় অভয় দিয়ে বলল,
‘আমরা আছি তো বেটা, তোর কোনো ভয় নেই!’ অন্য হাতে আহিয়ান ওর পিঠ চাপড়ে দিল।
ওদের সেই অতি পরিচিত চেনা উষ্ণ স্পর্শ আর ভরসায় জেডের কাঁপতে থাকা হাত আর ঘামতে থাকা তালুটা মুহূর্তে ম্যাজিকের মতো স্থির হয়ে গেল। মনের ভেতরে এক ধাক্কায় রিলিজ হলো সব জমানো টেনশন। পরের সেকেন্ডেই সাইড স্টেজ থেকে মাইক্রোফোন হাতে আলোর গতিতে ছুটে এল নীল আর সাজিদ। সাজিদের কাঁধে হাত দিয়ে বাচ্চাদের মতো লাফাতে লাফাতে স্টেজ এন্ট্রি নিল তামরিন। বন্ধুদের এই আকস্মিক সারপ্রাইজ এন্ট্রিতে পুরো অডিটোরিয়ামের স্তব্ধতা ভেঙে এক গগনবিদারী উল্লাস ফেটে পড়ল। জেডের মনের সব জমাট বাঁধা অন্ধকার এক নিমিষে কেটে গেল।
জেডের ঠোঁটের কোণে এতক্ষণে সেই চিরচেনা আত্মবিশ্বাসী, রকস্টার সুলভ হাসিটা ফুটে উঠল। ও নিচ থেকে পিকটা কুড়িয়ে নিয়ে গিটারে একটা জোরালো স্ট্রোক দিল।
পুরো গ্রুপ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাইক্রোফোনে একযোগে সুর তুলল:
“একা লাগলে বলিস,
মনে মনে আমার নামটা নিস...”
জেড প্রথম লাইনটা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করার সাথে সাথেই যেন জাদুর মতো পুরো
অডিটোরিয়ামের হাজারো দর্শক এক হয়ে বিশাল কোরাসে গেয়ে উঠল। তাদের গলার সম্মিলিত আওয়াজে পুরো হলরুমের ছাদ যেন ফেটে পড়ার উপক্রম হলো:
লাগলে বলিস
জায়গায় বসে আওয়াজ দিস
কলিজাটা ছিঁড়ে তোকে দেবো
লবণ মাখিয়ে নিস
একা লাগলে বলিস
মনে মনে আমার নামটা নিস
তোর মুড অন করে দেবো
একটা ট্রিট দিয়ে দিস
উড়ি একসাথে নীলে নীলে
উড়ি একসাথে মিলে ঝিলে
চল বন্ধু চল
চল বন্ধু চল
চল বন্ধু … চল
উড়ি একসাথে নীলে নীলে
পড়ি একসাথে মিলে ঝিলে
চল বন্ধু চল
চল বন্ধু চল
চল বন্ধু … চল
চলবে.....
#নিভৃতে_যত্নে_রাখা_প্রিয়তমা
#মারিয়াম_ফুল
পর্ব :১৯