#নিভৃতে_যত্নে_রাখা_প্রিয়তমা
#মারিয়াম_ফুল
পর্ব :২০
স্টেজের ওপর তখন নিয়ন আলোর তীব্র ঝলকানি। গিটারের প্রতিটি চড়া স্ট্রোক আর হাজারো মানুষের গগনবিদারী কণ্ঠের সেই উন্মাদনা যখন পুরো ইউনিভার্সিটি মাঠকে এক ঘোরের মধ্যে রেখেছিল, ঠিক তখনই গিটার বাজাতে বাজাতে এহসানের চোখ দুটো হুট করেই চলে গেল স্টেজের একদম ডান পাশের এক অন্ধকার কোণায়। সেখানে এক জোড়া অতি পরিচিত, মায়াবী চোখ ভিড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।
"রুপ এখানে"? এহসানের বুকের ভেতরটা এক পলকের জন্য কেঁপে উঠল। কপালে সামান্য চিন্তার ভাঁজ পড়ল। অথচ আজ দুপুরেই এই মেয়ে ওর সাথে রেস্টুরেন্টে চরম রাগারাগি করে, ডিভোর্সের হুমকি দিয়ে হনহন করে চলে গিয়েছিল। যাওয়ার সময় স্পষ্ট বলে গিয়েছিল, ও আজ রাতের কনসার্টে কোনো অবস্থাতেই আসবে না। তাহলে কাউকে কিছু না জানিয়ে ও একা একা এই রাতে এত বড় একটা ক্রাউডের মাঝে কেন এলো?
কিন্তু ঠিক তার পরের মুহূর্তেই এহসানের চোখের মণি দুটো রাগে ও বিস্ময়ে সংকুচিত হয়ে এলো। অনুর ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সুঠাম দেহের এক অপরিচিত তরুণ। ছেলেটা অনুর বেশ কাছাকাছি দাঁড়িয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে কনসার্ট দেখছে আর মাঝে মাঝে অনুর সাথে নিচু স্বরে কী যেন বলছে।" এই ছেলেটা আবার কে? অনুর সাথে এখানে ওর কী কাজ? "
এহসানের নিজের স্ত্রীকে অন্য একটা পুরুষের সাথে....কনসার্টের কোণায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওর ভেতরের পুরুষালী অহংকার আর তীব্র পজেসিভনেস মুহূর্তের মধ্যে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। গিটারে একটা ভুল কর্ড পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। এহসান নিজের রাগটা কোনোমতে চেপে রেখে পারফরম্যান্স শেষ করার দিকে মনোযোগ দিল, কিন্তু ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তখনো ওই কোণাটাতেই স্থির রইল।
কনসার্ট শেষ হতেই চারপাশের দর্শকেরা যখন উল্লাস করতে করতে মাঠ ছাড়তে শুরু করেছে, অনুও তখন ভিড় এড়ানোর জন্য চুপচাপ চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে উল্টো ঘুরে হাঁটা ধরল। ও চাচ্ছিল না এহসান ওকে এই অবস্থায় দেখে ফেলুক। কিন্তু ও মাত্র দু-পা বাড়িয়েছে, ঠিক তখনই পেছন থেকে অত্যন্ত শক্ত এক জোড়া পুরুষালী হাত এসে ওর নরম কবজিটা খামচে ধরল। মুহূর্তের মধ্যে এক তীব্র ও আকস্মিক হেঁচকা টানে অনু ছিটকে পেছন দিকে ফিরে এলো। সামলাতে না পেরে সরাসরি আছড়ে পড়ল এক চওড়া, শক্ত পুরুষালী বুকের ওপর।
আচমকা ধাক্কা খেয়ে অনুর মুখ থেকে একটা তীব্র ব্যথাতুর শব্দ বের হয়ে এলো, “আহ্”
ও দুই হাতে নিজের কপালটা চেপে ধরে চোখ তুলে তাকাতেই থমকে গেল। চেনা সেই পারফিউমের কড়া সুবাস আর জ্বলন্ত চোখ দুটো দেখেই ও ফিসফিস করে উঠল,
“এহসান... আপনি?”
এহসান অনুর দিকে এক রাশ তীব্র রাগ আর গম্ভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইল।
অনুর এই অবুঝপনা দেখে এহসানের রাগ আরও চড়ে গেল। ও দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আমি না হলে কে হবে মানে? এই রাতে অন্য কার বুকের ওপর আছড়ে পড়ার আশা করছিলে তুমি, রূপ?”
কথাটা শুনে অনুর অভিমানী মনটা আবার বিষিয়ে উঠল। রেস্টুরেন্টের সেই ঝগড়া আর ডিভোর্সের কথা এক লহমায় ওর মাথায় চড়া দিয়ে উঠল। ও এহসানের শক্ত মুঠো থেকে নিজের হাতটা ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“না মানে... ছাড়ুন আমাকে! আমি আপনার সাথে কোনো কথাই বলব না।”
এহসান অনুর হাত ছাড়ল তো না-ই, উল্টো আরও শক্ত করে চেপে ধরল। অনু আসলে এহসানকে হঠাৎ সামনে দেখে রেস্টুরেন্টের সেই ঝগড়ার কথা এক মুহূর্তের জন্য ভুলেই গিয়েছিল, কিন্তু এহসানের এই আচরণ দেখে ওর সব রাগ আর
অভিমান আবার দ্বিগুণ হয়ে ফিরে এলো।
এহসান এবার নিজের মুখটা অনুর কানের একদম কাছাকাছি নিয়ে এসে অত্যন্ত ধারালো ও গলায় বলল, “ঢং মারাও ঢং! ডিভোর্স চাওয়া হচ্ছে, হুম? একদম ঠ্যাং ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখব, তারপর মনের সুখে সংসার করব। আসছে আমার বড় ডিভোর্স দিতে ”
এহসানের রাগ দেখে অনু এবার একদম চুপ মেরে গেল। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আগে হলে ও হয়তো ভয়ে কেঁদে ফেলত, কিন্তু এখন আর ও ওভাবে ভয় পাচ্ছে না। ও নিজের ভেতরের ভয়টা কোনোমতে ঢোক গিলে হজম করে নিল এবং নিজের সেই ডাগর ডাগর অভিমানী চোখ দুটো তুলে একদম সরাসরি এহসানের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
এহসানের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অনু আবার হনহন করে চলে যাওয়ার জন্য যেই না দ্রুত পা বাড়াল, অমনি অন্ধকারের মধ্যে মাটিতে পড়ে থাকা একটা ইটের টুকরোর সাথে ওর হাই হিলটার মারাত্মক ধাক্কা লাগল। ও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামনের দিকে হোঁচট খেয়ে পড়তে গেল।
“রুপ” এহসান এক পলকও দেরি না করে বিদ্যুৎ গতিতে হাত বাড়িয়ে অনুকে মাঝপথেই শক্ত করে ধরে ফেলল। ও নিজের বুকের সাথে অনুকে জড়িয়ে না ধরলে অনু আজ নিশ্চিতভাবেই মেঝেতে আছড়ে পড়ত। কিন্তু পায়ে উঁচু হিলস পরার কারণে গোড়ালিটা একদম বিশ্রীভাবে মচকে গেল এবং অনু তীব্র ব্যথায় চোখ-মুখ কুঁচকে এহসানের শার্টের কলারটা খামচে ধরল। এত কিছুর পরও ওর ভেতরের জেদ আর অভিমান কমল না। ও তীব্র যন্ত্রণার মাঝেও মুখ ফিরিয়ে রইল, এহসানের সাথে একটা কথাও বলল না।
এহসান ওকে আলতো করে সোজা করে দাঁড় করিয়ে ব্যাকুল গলায় বলল,
“দেখি, দেখি... কোথায় লেগেছে? পা-টা দেখি!”
অনু নিজের পা-টা টেনে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে জেদ ধরে বলল, “দেখতে হবে না আপনাকে! ছাড়ুন আমাকে।”
এহসান এবার রাগী দৃষ্টিতে অনুর দিকে তাকাল, যা দেখে অনুর মনের সমস্ত জেদ এক নিমেষে উড়ে গেল। ও একটু আমতা আমতা করে, গলা কাঁপিয়ে বলে উঠল,
“এই... না, না... পা ছুঁবেন না প্লিজ।”
“পা ছুঁবেন না মানে কী? কী হয়েছে শুনি, বেগমের আমার এত তেজ কোত্থেকে আসে?” এহসান আর কোনো কথা না বাড়িয়ে অনুকে এক প্রকার জোর করেই পাশ থেকে একটা চেয়ার টেনে এনে বসিয়ে দিল। পরের মুহূর্তেই এহসান যেন নিজের সব গাম্ভীর্য নামিয়ে রাখল। কোনো দ্বিধা না করে হাঁটু গেড়ে অনুর সামনে মেঝেতে বসে পড়ল। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক কাজ এটাই।
অনু থম মেরে এহসানের নিচু হয়ে থাকা মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। এ সেই এহসান? যে কিনা পুরো ইউনিভার্সিটির ক্রাশ… সেই মানুষটাই এখন ওর পায়ের জুতার ফিতা খুলছে। বুকের ভেতরটা হঠাৎ অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল ওর।
এহসান জুতোর হিলটা এক পাশে সরিয়ে রেখে অনুর পা-টা নিজের হাতের তালুর ওপর তুলে নিল। ও অনুর মচকানো পায়ে আলতো করে হাত দিতে দিতে নরম গলায় বলল,
“তুমি ব্যথা পেলে আমার মেজাজ কেন খারাপ হয় রুপ... তোমার ওপর রাগ করে থাকাও আমার পক্ষে অসম্ভব। তুমি আমার ধৈর্যের সবচেয়ে সুন্দর পরীক্ষা, রূপ।”
অনু এহসানের এই আকস্মিক রূপের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরেবলল, “ইয়ে মানে... আমি আসলে আপনার মতো লম্বা হতে চেয়েছিলাম। তাই হিল পরেছি।”
অনুর এই অদ্ভুত আর বোকা বোকা যুক্তি শুনে এহসান নিজের কপাল আরও কুঁচকে ফেলল। ও অনুর পায়ের পাতার মচকানো জায়গাটা আলতো করে চেপে পরীক্ষা করতে করতে জিজ্ঞেস করল,
“কেন? তোমাকে হুট করে লম্বা হতে হবে কেন?”
অনু তখন দুই হাত দিয়ে নিজের গাল দুটো ছুঁয়ে বলে উঠল,
“ওমা! আমি যখন আপনার সামনে দাঁড়াই, আমি তো একদম আপনার বুকের কাছে গিয়ে পড়ি, আপনি আমার থেকে কত্ত লম্বা, খেয়াল করেছেন কখনো?”
এহসান অনুর এই সরল স্বীকারোক্তি শুনে নিজের ভেতরের সমস্ত রাগ মুহূর্তের মধ্যে ভুলে গেল। ও কনসার্ট ভেন্যুর পানির বোতল থেকে কিছুটা ঠান্ডা পানি হাতের তালুতে নিয়ে অনুর মচকানো পায়ে আলতো করে লাগিয়ে দিতে দিতে বলল,
“আপনাকে মোটেও লম্বা হতে হবে না, রূপ। আমি কি কখনো আপনাকে বলেছি লম্বা হতে? আপনি ঠিক যতটুকু আছেন, ততটুকুই পারফেক্ট । আমার বুকে মাথা রাখলে আপনি যখন আমার হার্টবিট পরিষ্কার শুনতে পান, এইটুকু কি আমার স্ত্রীর জন্য যথেষ্ট নয়?”
এহসানের মুখ থেকে এমন কথা শুনে অনু একদম হকচকিয়ে গেল। ও যেন নিজের কথা বলাই ভুলে গেল। চারপাশের হট্টগোল ছাপিয়ে শুধু এহসানের ভারী গলার স্বরটা ওর কানের কাছে আছড়ে পড়তে লাগল। ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় লাল টমেটোর মতো হয়ে উঠল। ও বড় বড় চোখ করে এহসানের দিকে তাকিয়ে রইল...
এহসান অনুর পায়ের পাতার ফোলা অংশটা আলতো করে ম্যাসাজ করে দিতে দিতে হঠাৎ আবার গম্ভীর হয়ে গেল। ও চোখ তুলে সোজা অনুর চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“মিসেস সিদ্দিকী! আর ওই ছেলেটা কে?”
অনু এহসানের ‘মিসেস সিদ্দিকী’ ডাকটা শুনে ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করল। ও একটু ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলল, “কোন ছেলেটা?”
“ কোন ছেলে মানে? ওই যে তোমার সাথে দাঁড়িয়ে ছিল। আর তুমি তো বললে আসবে না, তাহলে কেন এলে?” এহসানের গলার স্বর আবার কঠোর হয়ে উঠল।
অনু তখন চোখ দুটো পিটপিট করে তড়িঘড়ি করে বলে উঠল, “আরে... ও তো... ও তো আসলে আপনাদের পারফরম্যান্স দেখতে এসেছিল। মানে,তাই ওকে সাথে নিয়ে এসেছি। ও... ও আসলে আমার ফুফাতো ভাই, রিদ।”
ফুফাতো ভাই শুনে এহসানের চোখের চাউনিটা কিছুটা শান্ত হলেও ওর ভেতরের পজেসিভনেস বিন্দুমাত্র কমল না। ও অনুর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট গলায় বলল,
“আমার ব্যক্তিগত জিনিস অন্য কারোর কাছে আমানত হয়ে এই গভীর রাতে কনসার্টে আসবে—এটা আমার মোটেও পছন্দ না, রূপ। আজকে এসেছ, এটাই যেন শেষ আসা হয়। আমি একদমই চাই না তুমি অন্য কোনো পুরুষের সাথে এভাবে রাতের বেলা বাইরে বের হও। দরকার পড়লে আমি নিজে তোমাকে নিয়ে আসব।”
অনু এহসানের এই কথা শুনে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই সেই থমথমে পরিবেশটা ভেঙে হঠাৎ কোথা থেকে নীল হন্তদন্ত হয়ে সেখানে চলে এলো।
“অনু”
নীল এসেই অনুকে চেয়ারে বসা অবস্থায় দেখে বেশ হকচকিয়ে গেল। আর তার থেকেও বড় ধাক্কা ও খেল যখন দেখল এহসান তখনো নিচে হাঁটু গেঁড়ে বসে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে অনুর পা ম্যাসাজ করে দিচ্ছে। নীল দেখে মনে মনে প্রচণ্ড বিরক্ত ও রাগান্বিত হলো, কিন্তু কিছুই বলতে পারল না। ও নিজের ভেতরের ক্ষোভটা কোনোমতে চেপে রেখে অনুর দিকে এগিয়ে গিয়ে ব্যাকুল গলায় বলল, “কী হয়েছে , অনু?”
অনু নীলের আকস্মিক উপস্থিতিতে প্রচণ্ড লজ্জা আর আড়ষ্টতায় জবুথবু হয়ে গেল। ও একবার এহসানের গম্ভীর মুখের দিকে তাকাল, তারপর নীলের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “ইয়ে... মানে, নীল ভাইয়া...”
এহসান ততক্ষণে নিজের জায়গা থেকে ধীরস্থিরভাবে উঠে দাঁড়িয়েছে। স্বাভাবিক গলায় বলে উঠল, “ও পায়ে বেশ ভালো রকম চোট পেয়েছে।”
নীল অনুর আরও কাছে এগিয়ে এসে বলল, “কীভাবে অনু... এখন বাড়ি কীভাবে যাবে? তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে?”
অনু তাড়াহুড়ো করে বলল, “না, না, ভাইয়া... চলে যাব।”
ঠিক তখনই অনুর ফুফাতো ভাই রিদ ওখান থেকে দৌড়ে ওদের কাছে চলে এলো। রিদ এসেই অনুকে উদ্দেশ্য করে উচ্চ স্বরে বলে উঠল, “ওই রূপ! কী হয়েছে রে তোর?”
রিদ যখন “রূপ” বলে ডাকল, মুহূর্তের মধ্যে এহসানের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। “রূপ” নামটা ওর কাছে ভীষণ ব্যক্তিগত। অন্য কারও মুখে এই ডাকটা শুনতে ওর কেন যেন অসহ্য লাগছিল। ওর চোখ দুটো রিদের দিকে স্থির হয়ে রইল।
অনু পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রিদকে বলল, “কিছু না, ব্যথা পেয়েছি পায়ে।” এই বলে ও যেমনই উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, অমনি ব্যথায় ওর মুখটা আবার নীল হয়ে গেল। সেখানে উপস্থিত নীল, রিদ আর এহসান তিনজনেই একসাথে খেয়াল করল—অনু আসলে হাঁটতে পারছে না। ওর পায়ের যে জায়গায় ব্যথা পেয়েছে, সেই অংশটা ততক্ষণে বেশ ভালো রকম ফুলে উঠেছে।
এহসান আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। ও কাউকে কিছু বলার বা ভাবার সুযোগ না দিয়ে, এক ঝটকায় অনুকে নিজের দুই বাহুর মাঝে তুলে নিয়ে কোলপাঁজা করল। আচমকা এহসানের কোলে উঠে যাওয়ায় অনু ভয়ে আর লজ্জায় এহসানের গলাটা দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
নীল আর রিদ দুজনেই এই দৃশ্য দেখে একদম থমকে গিয়ে তাকিয়ে রইল। নীল কোনোমতে নিজের গলা পরিষ্কার করে বলল, “আমার বাড়ি ওই দিকে এহসান, আমি ওকে বাড়ি পৌঁছিয়ে দিচ্ছি।”
এহসান অনুকে কোলে শক্ত করে ধরে রেখেই নীলের দিকে এক বরফশীতল দৃষ্টি দিয়ে বলল, “লাগবে না, আমি গাড়ি এনেছি, আমি ওকে দিব।”
রিদ তখন কিছুটা আমতা আমতা করে মাঝখান থেকে বলে উঠল, “সরি আপানাদের চিনি না আমি... আমাদের গাড়ি আছে।”
এহসান রিদের কথার মাঝখানেই অত্যন্ত ভারী আর ধমকের সুরে বলে উঠল, “তাহলে ওটাতেই চলুন, ও হাঁটতে পারছে না।”
কাউকে কোনো প্রকার প্রতিবাদ বা কথা বলার সুযোগ না দিয়ে এহসান তড়িৎ গতিতে অনুকে কোলে নিয়েই গাড়ির দিকে হেঁটে গেল। রিদ পেছন থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে এসে বলল, “এই আমিও যাব, আমিও যাব।”
এহসান ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ির স্টার্ট করতে করতে রিদের দিকে তাকিয়ে বলল, “কেউ না করেছে কি? বসো গিয়ে।” এহসানের সেই রাগান্বিত চোখ পরখ করে রিদের আর উল্টো কোনো কথা বলার সাহস হলো না। ও চুপচাপ গিয়ে বসে পড়ল।
গাড়ি যখন অনুর বাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, এহসান বেশ কয়েকবার আড়চোখে অনুর ফোলা পা আর ওর মুখটার দিকে তাকাল। গাড়ি যখন অনুর বাড়ির সামনে এসে থামল, তখন চারপাশটায় নীরবতা নেমে এসেছে।
দরজা খুলে নামতে গিয়েও অনু থেমে গেল। এহসানের আঙুল তখনো ওর কবজির ওপর আলতোভাবে রাখা। যেন ছেড়ে দিতে চাইছে না। অনু কোনোমতে মাথা নেড়ে নিজের হাতটা আলতো করে ছাড়িয়ে গাড়ি থেকে নেমে গেল।
অনু আর রিদ গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার পর এহসান দূর থেকে অনুর ল্যাংচানো হাঁটাটা দেখল। ও অনুকে বিদায় দিয়ে আবার গাড়িতে উঠল। নিজের স্ত্রীর খেয়াল রাখতে গিয়ে ও যে এতক্ষণ ধরে ভেন্যুর ভেতরে ওর কলিজার টুকরো বন্ধুদের কথা একদম ভুলেই গিয়েছিল, তা এতক্ষণে ওর মাথায় এলো। এহসান তড়িঘড়ি করে পকেট থেকে ফোন বের করে আহিয়ানকে কল দিল।
কল রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে আহিয়ান রাগে চেঁচিয়ে উঠল, “কই তুই শালা?”
“আমায় একটু বিশেষ কারণে হুট করেই চলে আসতে হয়েছিল রে ভাই। তোরা প্লিজ তামরিনকে ঠিকঠাক মতো সাবধানে বাড়িতে পৌঁছে দিস। আর কাল সকালে তোদের সবার সাথে এক্সাম হলের সামনে দেখা হচ্ছে।”এই বলে ও কলটা কেটে দিল।
পরের দিন সকাল। অনুর পায়ের অবস্থা রাতের থেকে আরও বেশি খারাপ হয়ে গেছে। মচকানো জায়গাটা কাল রাতের তুলনায় আজ সকালে আরও বেশি ফুলে গেছে, যার কারণে ও বিছানা থেকে পা নামিয়ে মাটিতে এক চুলও ভর দিতে পারছে না। ফলস্বরূপ, আজ ইউনিভার্সিটিতে যাওয়া ওর পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হলো না। ও ব্যথায় ছটফট করতে করতে বিছানায় শুয়ে রইল।
কিন্তু ফুফাতো ভাই রিদ কি আর এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র? ও মোটেও দমে যাওয়ার ছেলে না। ও সকাল সকাল অনুর ঘরের দরজা বন্ধ করে একদম অনুর বিছানার পাশে এসে জাঁকিয়ে বসল। ওর চোখে-মুখে এক দুনিয়ার কৌতূহল....
চলবে.....