ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিভৃতে যত্নে রাখা প্রিয়তমা

২৭তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম ফুল

ক্যামেরার হালকা ফ্ল্যাশের আলোটা কেবিনের সাদা দেওয়ালে প্রতিফলিত হয়ে মিলিয়ে যেতেই বন্ধুদের হাসিমুখের আড়ালে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। সাজিদ, আহিয়ান, জেড আর নীল—সবাই একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখলেও প্রত্যেকের মনের কোণে একটা সূক্ষ্ম অস্বস্তি কাজ করছিল এসানের অবস্থা দেখে। এহসানের চোখ দুটো যেভাবে বারবার বন্ধ দরজার দিকে চলে যাচ্ছে, সেটা কারো চোখ এড়ায়নি। 

এহসান বালিশে মাথাটা একটু সোজা করে নেওয়ার চেষ্টা করল। কপালে জড়ো হওয়া সূক্ষ্ম ঘামের বিন্দুগুলো হাত দিয়ে মুছে সে সাজিদের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণের সেই প্রাণহীন হাসিটা মিলিয়ে গিয়ে সেখানে ভর করেছে এক গভীর আকুলতা। সে অত্যন্ত মৃদু, প্রায় ফিসফিসে গলায় জিজ্ঞেস করল, “সাজিদ... তুই কি ওকে ফোন করিসনি এখনো? তুই তো বললি তুই জানাবি...”
সাজিদ আমতা আমতা করে পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করল। কেবিনের ভেতরে উপস্থিত বাকি বন্ধুরা তখনো পুরো ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে কৌতূহলী চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। সাজিদ এহসানের বিছানার কাছাকাছি এগিয়ে গিয়ে নিচু গলায় বলল, “আমি... আমি কল দিয়েছিলাম রে এহসান। কিন্তু...”
“কিন্তু কী?” এহসানের কণ্ঠস্বর এক নিমেষে কঠোর হয়ে উঠল। হার্ট রেট মনিটরের গ্রাফটা আবার কিছুটা দ্রুত ওঠানামা করতে শুরু করল। তার বুকটা ধক করে উঠল, এক অজানা আশঙ্কায় যেন শরীরের প্রতিটি রক্তকণিকা জমে বরফ হয়ে যাচ্ছিল। 
সাজিদ শুকনো ঢোক গিলে বলল, নাম্বারটা বন্ধ দেখাচ্ছে। দিস নাম্বার ইজ কারেন্টলি নট ইন সার্ভিস বলছে। আমি তিন-চারবার ট্রাই করেছি দোস্ত।
এহসান স্তব্ধ হয়ে গেল, রূপকথার নাম্বার বন্ধ? যে মানুষটার জন্য সে মৃত্যুর দুয়ার থেকে টেনেহিঁচড়ে নিজেকে ফিরিয়ে এনেছে, তার একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যমটাও এভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল?এহসানের চোখের সামনে চারপাশের আলো যেন ফিকে হয়ে আসতে লাগল। সে সাজিদের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নেওয়ার জন্য আচমকা হাত বাড়াল, কিন্তু ক্যানুলা পরা হাতে তীব্র টান লাগায় একটা ধারালো যন্ত্রণার অনুভূতি তার পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। যন্ত্রণায় তার মুখটা বেঁকে গেল, কিন্তু মনের ভেতরের যন্ত্রণার কাছে এই শারীরিক কষ্ট তখন বড্ড তুচ্ছ। 
এহসান চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলে নিয়ে আকুল হয়ে বলল, “আহিয়ান... তুই একবার ট্রাই কর। তোর নাম্বার থেকে কর। হয়তো ও অচেনা বা অন্য কোনো নাম্বার দেখে ধরছে না... কিংবা... কিংবা ও আমার ওপর রেগে আছে, তাই আমার সাথে যুক্ত কারো ফোন ধরবে না। তুই তোর ফোন থেকে ট্রাই কর না প্লিজ ”
জেড এতক্ষণ চুপচাপ তাদের এই কথোপকথন শুনছিল। জেড আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে এহসানের বিছানার ওপর হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো , “কী হচ্ছেটা কী তোদের মধ্যে? এই ‘ও’ টা কে? হসপিটালে জ্ঞান ফেরার পর থেকে তুই কার জন্য উতলা হয়ে আছিস ? আঙ্কেল-আন্টিসহ আমরা সবাই তোর সুস্থ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি আর তুই এখানে কার জন্য এত ছটফট করিস? আমাদের কাছ থেকে কী লুকাচ্ছিস তোরা?” 
এহসান জেডের প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু শূন্য চোখে জানালার বাইরের অন্ধকার আকাশটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখের মণি দুটো কাঁপছিল, চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল বালিশে।
 ”রূপ, কোথায় তুমি রূপ? তুমি কি ঠিক আছো, তুমি কি জানো না তোমার এই এহসান সিদ্দিকী মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে শুধু তোমার নাম জপছে? ”
অন্য দিকে, মেঝেতে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের ভাঙা সিমকার্ডের টুকরো দুটোর দিকে অনু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল বেশ কিছুক্ষণ । তার চোখ থেকে জল পড়া এখন বন্ধ হয়ে গেছে, বাইরে থেকে তাকে দেখে মনে হচ্ছিল এক জীবন্ত পাথর। কিন্তু এই পাথুরে চাউনির আড়ালে, তার বুকের বাম পাশে যে তীব্র ভাঙন আর হাহাকার চলছিল, তা কেবল সে নিজেই জানত। রাগ, অভিমান আর প্রতারণার শিকার হওয়ার গ্লানি তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। এত সহজে একটা মানুষ ভালোবাসার নামে অভিনয় করতে পারে? অথচ, এই চরম ঘৃণার মাঝেও তার অবাধ্য মনটা কেন যেন বারবার এহসানের হাসিমুখ, তার সেই আকুল চাহনিটাই মনে করিয়ে দিচ্ছিল। অনু শক্ত করে নিজের কামিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরল, যেন নিজের ভেতরের দুর্বলতাকে সে কোনোভাবেই বাইরে প্রকাশ পেতে দেবে না। সে নিজেকে বোঝাল ....যে মানুষ তাকে শুধু একটা পুতুল ভেবেছে, তার জীবনে সেই মানুষের আর কোনো স্থান নেই। ওপর থেকে সে নিজেকে যতই শক্ত দেখাচ্ছিল, ভেতরের ক্ষতটা যে কতটা গভীর, তা প্রতিটা নিঃশ্বাসে টের পাচ্ছিল অনু
ঠিক তখনই দরজায় আবার হালকা টোকা পড়ল। অনুর ফুফু ঘরের ভেতর পা রাখলেন। ওনার হাতে এবার একটা নতুন সুতি শাড়ি। ওনার মুখে এক চিলতে ম্লান হাসি। তিনি খাটের পাশে এসে অনুকে আলতো করে ছুঁয়ে বললেন, অনু মা, সন্ধ্যা তো হয়ে এলো। রিদ আর তিয়া বাইরে গাড়িতে অপেক্ষা করছে। তুই এই শাড়িটা পরে একটু তৈরি হয়ে নে তো সোনা। ওরা তোকে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের দিকে নিয়ে যাবে বলেছে। একটু খোলা হাওয়া গায়ে লাগলে তোর এই দমবন্ধ ভাবটা কাটবে।
 “আমার কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না ফুপু। আমি এখানেই ঠিক আছি।”
“এমন করিস না মা,” ওনার ফুফু ওনার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে একটু অনুনয়ের সুরে বললেন, “তোর এই মলিন মুখটা দেখলে আমার নিজের বুকটা ফেটে যায় রে ? নিজের জীবনটাকে এভাবে শেষ করে দেওয়ার কোনো মানে হয় না রে মা। আমার কথা রাখ, লক্ষ্মী মেয়ে আমার, একটু ঘুরে আয়।”
ফুফুর জোরাজুরিতে 'না' করতে পারল না অনু। শেষমেশ বাধ্য হয়ে যাওয়ার জন্য 'হ্যাঁ' বলল। এক প্রকার যান্ত্রিক পুতুলের মতোই সে খাট থেকে নেমে দাঁড়াল। তার পা দুটো যেন তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। সে আলতো করে মাথা নাড়িয়ে বলল, “আচ্ছা... তুমি শাড়িটা রেখে যাও। আমি আসছি।”
মিনিট পনেরো পর, অনু একটা হালকা নীল রঙের সুতির শাড়ি জড়িয়ে ঘর থেকে বেরুলো। তার লম্বা চুলগুলো পিঠের ওপর আলগা করে ছেড়ে দেওয়া। মুখে কোনো মেকআপের ছোঁয়া নেই, এমনকি চোখের কাজলটাও আজ অনুপস্থিত ......এহসানের বারণ ছিল অনুর কাজল পরায়। অথচ অনু ঠিক এহসানকে দেখানোর জন্যই চোখে গাঢ় করে কাজল টানত। আজ সেই কাজল রাঙা চোখ দেখার মানুষটাই নেই...এহসান নেই। তাই অনুর চোখেও আজ আর কাজলের কালো দাগ বসেনি।অনূকে আজ দেখতে লাগছিল ঠিক এক ফালি শরতের মেঘের মতো। তবে সে মেঘে কোনো বৃষ্টির আভাস ছিল না, ছিল কেবলই এক বুক জমাট বাঁধা নিরেট নীরবতা আর অন্ধকার।
বাইরে বারান্দায় রিদ আর তার কাজিন তিয়া দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। অনুকে বের হতে দেখে তিয়া বেশ উৎফুল্ল হয়ে এগিয়ে এলো। তিয়া দেখতে বেশ চটপটে । সে অনুর হাত ধরে বলল, ওয়াও অনু! তোমাকে শাড়িতে এত কিউট লাগছে! চলো চলো, লেট করা যাবে না। সন্ধ্যার পর ওই জায়গাটা দেখতে অন্যরকম সুন্দর লাগে।
রিদ দূর থেকে অনুর দিকে একবার তাকাল। রিদের চোখ দুটো অনুর এই কৃত্রিম শান্ত রূপের পেছনের গভীর শূন্যতা আর বিষণ্ণতাটা পলকেই ধরে ফেলল। বাইরে থেকে নিজেকে যতই শক্ত করে ধরে রাখুক না কেন, মেয়েটা যে ভেতর থেকে একদম নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, তা স্পষ্ট বুঝতে পারল রিদ। তবে মুখে সে কোনো মন্তব্য করল না,পরিস্থিতি আর জটিল করার ইচ্ছে নেই তার। পকেট থেকে চাবিটা বের করে বলল, 'তাহলে বের হওয়া যাক?
গাড়ির পেছনের সিটে তিয়া আর অনু বসল, আর রিদ ড্রাইভ করছিল। পুরো রাস্তায় তিয়া একনাগাড়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গার গল্প করে যাচ্ছিল, কিন্তু অনুর কান পর্যন্ত সেইসব কথার একটা শব্দও পৌঁছাচ্ছিল না। সে শুধু গাড়ির কাচের জানালায় কপাল ঠেকিয়ে বাইরের ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলোর দ্রুত মিলিয়ে যাওয়া দেখছিল। বাইরের এই গতিশীল পৃথিবীর সাথে তার ভেতরের পৃথিবীটা বড্ড স্থবির। অনুর মনের ভেতর তখন একটা শব্দই বারবার আছড়ে পড়ছিল ....অভিনেতা! আপনি একজন চমৎকার অভিনেতা, এহসান সিদ্দিকী। কত সহজে আমার সরলতার সুযোগ নিয়ে আমাকে এই মরুভূমিতে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন!’
...........
নীল আর জেড, তামরিন ততক্ষণে বাড়ির পথে রওনা হয়েছে। হসপিটালের কেবিনের নিস্তব্ধতায় তখন শুধুই এহসান, সাজিদ আর আহিয়ান। আহিয়ান তার প্লাস্টার করা পা নিয়ে কোনোমতে সোফায় বসে ফোন থেকে বারবার কল করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু প্রতিবারই ওপাশ থেকে সেই একই যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে আসছিল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা কানের কাছ থেকে নামিয়ে এহসানের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল, “না রে দোস্ত। নাম্বারটা আসলেই বন্ধ। কোনোভাবেই রিচ করা যাচ্ছে না।”
আহিয়ানের কথা শেষ হতে না হতেই এহসানের ভেতরের সমস্ত বাঁধ যেন এক নিমেষে ভেঙে গেল। তার এতক্ষণের চেপে রাখা মানসিক যন্ত্রণা এক ভয়ঙ্কর রূপ নিল। সে বিছানার ওপর ছটফট করতে শুরু করল। তার চোখের দৃষ্টি তখন উন্মত্ত, যেন সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। ক্যানুলা পরা হাত দিয়েই সে বিছানার চাদরটা খামচে ধরল। তার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করতে লাগল, মুখ দিয়ে কোনো স্পষ্ট শব্দ বের হচ্ছিল না, কেবল এক অবরুদ্ধ আর্তনাদ কেবিনের বাতাসকে ভারী করে তুলল।
“এহসান! শান্ত হ! কী করছিস তুই?”
সাজিদ দ্রুত বিছানার কাছে এগিয়ে এসে এহসানকে চেপে ধরার চেষ্টা করল। আহিয়ানও তার প্লাস্টার করা পা নিয়ে কোনোমতে সোফা থেকে উঠে এহসানের হাত ধরার চেষ্টা করল।কিন্তু এহসান তখন গায়ের সব শক্তি দিয়ে তাদের হাত সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ক্যানুলা পরা হাত থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো নজরই নেই.... 
সে পাগলের মতো মাথা নাড়তে নাড়তে চিৎকার করে উঠল, আমি এখানে শান্তিতে নিশ্বাস নিতে পারছি না, ওর জন্য খুব টেনশন হচ্ছে... ও ভুলেও কখনো ফোন বন্ধ করে না! ও ঠিক আছে কি না আমার জানা নেই, আর তোরা আমাকে শান্ত হতে বলছিস....
এহসানের এই আকস্মিক ভাঙন আর উন্মাদনা দেখে সাজিদ আর আহিয়ান স্তব্ধ হয়ে গেল। যে এহসান সবসময় গম্ভীর, ধীরস্থির আর আত্মবিশ্বাসী থাকত, সে আজ একটা মেয়ের জন্য এভাবে হসপিটালের বিছানায় শুয়ে শিশুর মতো ডুকরে কাঁদছে।এহসানের এমন পাগলামি, এমন ছটফটানি ওর বন্ধুরা আগে কোনোদিন দেখেনি। ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে আড্ডার টেবিল—সবখানেই এহসান সিদ্দিকী মানেই ছিল এক চরম নির্বিকার, গম্ভীর আর ‘কাউকে পাত্তা না দেওয়া’ এক ব্যক্তিত্ব। যে ছেলেটার পাথুরে স্বভাবের সামনে কোনো মেয়ে সহজে ঘেঁষার সাহস পায়নি, আড্ডায় মেয়েদের প্রসঙ্গ উঠলে যে সবসময় উদাসীন চোখে তাকিয়ে এড়িয়ে যেত... আজ সেই এহসান হাসপাতালের বেডে শুয়ে একটা মেয়ের জন্য অবলীলায় কেঁদে চলেছে। তাও আবার ওদের সবার সামনে!  
সময় কারো জন্য থমকে থাকে না,সে তার আপন গতিতে বয়ে চলে অবিরাম। কিন্তু সেই বয়ে চলার পথে কিছু মানুষের সাজানো জীবনকে সে এক নির্মম মরুভূমি বানিয়ে দিয়ে যায়।
দেখতে দেখতে কেটে গেছে দীর্ঘ নয়-নয়টি মাস।
এই নয় মাসে এহসান সিদ্দিকী বুঝেছিল, মানুষের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর যুদ্ধগুলো কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, নিজের হৃদয়ের ভেতরেই লড়া হয়। হাসপাতালের চার দেয়াল ছেড়ে মুক্ত আকাশের নিচে ফিরেও সে যেন মুক্তি পায়নি। বরং ধীরে ধীরে এক চলন্ত লাশে পরিণত হয়েছিল। ধীরে ধীরে সে এক চলন্ত লাশে পরিণত হয়েছিল। নিঃশ্বাস চলছিল ঠিকই, কিন্তু বেঁচে থাকার সমস্ত রং যেন হারিয়ে গিয়েছিল।
তার অবাধ্য দুটো চোখ দিন-রাত কেবল একটাই মুখ খুঁজে ফিরত,"রূপকথা" ।
অনুকে সে কোথায় খুঁজেনি? ওদের ইউনিভার্সিটি, তার বান্ধবীদের বাড়ি, অনামিকা, অভি, পরিচিত-অপরিচিত সবার দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে সে। এমন কোনো মানুষ বোধহয় অবশিষ্ট ছিল না, যার সামনে দাঁড়িয়ে এহসান ভাঙা কণ্ঠে রূপকথার একটা খবর চায়নি।
সে নিজের সমস্ত অহংকার, সমস্ত আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়েছিল। শুধু একবার শুনতে চেয়েছিল, রূপকথা ভালো আছে। শুধু একবার জানতে চেয়েছিল, তার পৃথিবীটা ঠিক কোথায় হারিয়ে গেল।কিন্তু পৃথিবী বড় নিষ্ঠুর, এহসান কোনো উত্তর পাইনি । রূপকথা যেন একদিন হঠাৎ করেই মানুষের ভিড় থেকে নয়, এহসানের সমগ্র জীবন থেকেই হারিয়ে গিয়েছিল। 
প্রতিটি পরিচিত দরজায় কড়া নেড়ে সে শুধু শূন্যতা আর প্রত্যাখ্যান ছাড়া কিছুই পায়নি। মানুষ তাকে করুণার চোখে দেখত, কেউ কেউ আড়ালে ‘পাগল’ বলে হাসত। কিন্তু এহসানের সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ ছিল না। অথচ এহসান একবারের জন্যও জানতে পারেনি যে অনুর আসলে চট্টগ্রামে। সাজিদ আর আহিয়ানও নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে, দিন-রাত এক করে খুঁজেছিল বন্ধুকে বাঁচানোর তাগিদে। কিন্তু যে মানুষ নিজে থেকে পৃথিবীর বুক থেকে নিজেকে আড়াল করে নেয়, তাকে খুঁজে পাওয়া তো অসম্ভব.... 
দিনের পর দিন এই ব্যর্থতা এহসানকে ভেতর থেকে একেবারে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। রাতের অন্ধকারে যখন পুরো শহর ঘুমিয়ে পড়ত, এহসান তখন তার ঘরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে অন্ধকারের দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত। ঠিক যে জায়গাটাতে দাঁড়িয়ে অনুর সাথে শেষবারের মতো কথা হয়েছিল। অনুর কথা মনে পড়লেই এহসানের মনে হতো, বুকটা বুঝি ফেটে এখনই রক্তক্ষরণ শুরু হবে। শ্বাস নিতে কষ্ট হতো, অথচ বেঁচে থাকাও ছিল এক নির্মম বাধ্যবাধকতা।
মানুষ বলে, পুরুষের কাঁদতে নেই। অথচ এহসান সিদ্দিকী কেঁদেছিল। বারবার কেঁদেছিল, প্রতি রাত কেঁদেছিল । তার পাষাণ হৃদয়টা গলে গিয়েছিল শুধু তার রূপকথার জন্য। 
চাতক পাখির মতো সে অপেক্ষা করেছিল, একটিবার তাকে দেখার আশায়। একটিবার তার কণ্ঠস্বর শোনার জন্য। নাওয়া-খাওয়া, দিন-রাত, সময় আর নিজের অস্তিত্বের খেয়াল ভুলে অনুকে ফিরে পাওয়ার সেই অন্তহীন তৃষ্ণাই ধীরে ধীরে তাকে এক জীবন্ত কঙ্কালে পরিণত করেছিল। 
আজ থেকে আরো চার মাস আগে ঘটনা, 
এহসান সিদ্দিকীর কল্পনারও বাইরে অনেক কিছু ঘটে গিয়েছিল।ডাকপিয়ন একটি খাম দিয়ে গিয়েছিল। সাদা রঙের খাম। প্রাপকের নাম,রশীদ সিদ্দিকী।
সাধারণ একটা খাম মানুষের সমগ্র জীবন ওলটপালট করে দিতে পারে, এহসান আগে জানত না।ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে খামটা তার হাতেই এসে পড়েছিল।খাম খুলে প্রথমে সে কিছুই বুঝতে পারেনি। কয়েক মুহূর্ত লেগেছিল অক্ষরগুলোকে চিনতে। তারপর ধীরে ধীরে শব্দগুলো অর্থ খুঁজে পেল । 
'' ডিভোর্স পেপার...."
রূপকথা তালুকদারের পক্ষ থেকে পাঠানো বিবাহবিচ্ছেদের আনুষ্ঠানিক নোটিশ।
এহসান দীর্ঘক্ষণ কাগজটার দিকে তাকিয়ে ছিল। মানুষের বিস্ময়েরও একটা সীমা থাকে। সেই সীমা অতিক্রম করলে মানুষ আর চিৎকার করতে পারে না, কাঁদতেও পারে না। শুধু নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এহসানের সাথে এমন হয়েছিল.....
 
এহসান যেন হঠাৎ করেই কথা বলতে ভুলে গিয়েছিল।তার ঠোঁট নড়ছিল না, গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। কয়েক মুহূর্তের জন্য সে স্থির হয়ে বসে রইল। তারপর কাঁপা হাতে কাগজগুলো বারবার উল্টে-পাল্টে দেখতে লাগল,এটা কি সত্যি? 
নাকি সে ভুল দেখছে?
নাকি দীর্ঘদিনের ক্লান্তি আর যন্ত্রণায় তার চোখ তাকে প্রতারণা করছে? কিন্তু না।প্রতিটি অক্ষর সত্যি ছিল।প্রতিটি শব্দ নির্মম ছিল।
নিচে রূপকথার স্বাক্ষর।চেনা হাতের লেখা কাটাকাটা অক্ষর।যে হাত একদিন তার নাম লিখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন এঁকেছিল, আজ সেই হাতই বিচ্ছেদের কাগজে নিজের নাম লিখেছে ? 
বুক ভাঙার কোনো শব্দ হয় না। যদি হতো, তাহলে সেদিন সিদ্দিক মেনশনের প্রতিটি দেয়াল নিশ্চয়ই সেই শব্দে কেঁপে উঠত।এহসানের মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সমস্ত বাতাস হঠাৎ নিঃশেষ হয়ে গেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। অথচ মানুষ দুঃখে মরে না। তাকে বেঁচে থাকতেই হয়।যে মেয়েটির জন্য সে দিন-রাত পাগলের মতো খুঁজে ফিরেছে, যার একটি খবর পাওয়ার আশায় প্রতিটি পরিচিত মানুষের দরজায় কড়া নেড়েছে, সেই মানুষটাই একবার সামনে না এসে, কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে, এক টুকরো কাগজের মাধ্যমে সমস্ত সম্পর্ক শেষ করে দিল।
এত সহজ?ভালোবাসার সমাপ্তি কি সত্যিই এত সহজ?সেদিন রাতে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে এহসান মেঝেতে বসে ছিল কতক্ষণ সে নিজেও জানে না। ঘরের ভেতরের নীরবতা যেন তাকে গিলে খাচ্ছিল।তারপর হঠাৎ করেই তার কাঁপতে থাকা হাত দুটো শক্ত হয়ে উঠল। তার কণ্ঠে এবার তীব্র অভিমান আর কষ্ট স্পষ্ট হয়ে উঠলো, 
 "রূপকথা, তুমি আমার সঙ্গে এমনটা করার সাহস পেলে কোথায়? কোন অধিকারে তুমি আমার পুরো জীবনটাকে নিয়ে এভাবে খেলছো ?"
ঘরে তখন কেউ ছিল না। কিন্তু তার কণ্ঠের রাগ যেন দেয়ালে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
"আমি কি এত বড় অপরাধ করেছিলাম যে ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিলে? একবারও আমার সামনে এসে দাঁড়ানোর সাহস হলো না তোমার? একবারও না?তুমি নিজেকে কী ভাবো, রূপকথা? যখন ইচ্ছে হলো জীবনে এলে, আর যখন ইচ্ছে হলো একটা সই করে সবকিছু শেষ করে দিয়ে চলে গেলে? ভালোবাসা কি তোমার কাছে কোনো পুতুলখেলা ছিল?"
একসময় এহসান চরম আক্রোশে কাগজগুলো ছিঁড়ে ফেলল,খুব হিংস্রভাবে।যেন কাগজ নয়, রূপকথার দেওয়া সমস্ত নিষ্ঠুরতাকে সে টুকরো টুকরো করে ফেলছে। সাদা টুকরোগুলো মেঝের চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল।এহসান এবার মেঝের দিকে তাকিয়ে তীব্র হাসল। একটা তাচ্ছিল্যের হাসি। 
ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে, তুমি মুক্তি চেয়েছ তো? যাও, দিলাম মুক্তি। কিন্তু মনে রেখো রূপকথা, পেছন থেকে এভাবে ছুরি মেরে পালিয়ে যাওয়া মানুষকে আর যাই হোক, ক্ষমা করা যায় না। তুমি আমার ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্যই ছিলে না।
ইউ নো, এহসান সিদ্দিকী ইজ সো স্টুপিড। সো, সো স্টুপিড। হি'জ ডাইং ফর আ গার্ল। আ গার্ল? হাউ ক্যান আই ডাই ফর আ গার্ল? নো। দিস ইজ এহসান সিদ্দিকী, হু হ্যাজ নেভার ফলেন ফর এনি গার্ল। আই হেট ইউ। আই হেট ইউ, রূপকথা তালুকদার। আই হেট ইউ...
এই ঘটনার পরই এহসানের মা রূনা সিদ্দিকী তার ছেলের এই গোপন বিয়ের কথা জানতে পারেন। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া এহসানও আর কোনো কিছু লুকিয়ে রাখেনি। সে নিজে থেকে তার বাবা-মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে অনুর সাথে তার সেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ের সব সত্য এবং অনুর প্রতি তার হৃদয়ের গভীর ভালোবাসার কথা অকপটে স্বীকার করেছিল। 
রূনা সিদ্দিকী নিজের একমাত্র ছেলেকে তিল তিল করে নিঃশেষ হয়ে যেতে দেখে তাকে আর কোনো প্রশ্ন করার সাহস পাননি। যা ঘটেছে তা ইচ্ছাকৃত কোন কিছু ঘটেনি বরং পরিস্থিতির নির্মম পরিহাস আর ভুল বোঝাবুঝির ফল। উনার ছেলে অপরাধী নয়, সে নিজেও এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিকার।
অন্যদিকে রশীদ সিদ্দিকী কিন্তু পুরো ঘটনা শুনে এমন এক ভাব ধরলেন যেন তিনি এর বিন্দুমাত্র কিছুই জানেন না। অথচ তার ভেতরের অহংকার তখনো তাকে সত্যটা স্বীকার করতে দিচ্ছিল না, তিনি কেবল নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিলেন।
এই নয় মাসে এহসান পুরোপুরি বদলে গেছে..... আগের সেই একরোখা, প্রাণবন্ত আর জেদি ছেলেটাকে যেন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সে এখন আগের থেকে অনেক চুপচাপ। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না।
বন্ধুদের সাথে কোনো আড্ডা বা পার্টিতে আর যাওয়া হয় না । হাসতে যেন সে ভুলেই গেছে। তার পুরো অবয়বে এখন এক গম্ভীর, নীরব বিষণ্ণতার চাদর জড়ানো। ভাঙা মন আর এক বুক শূন্যতা নিয়েই সে নিজেকে পড়াশোনায় ডুবিয়ে দিয়েছিল, কেবল নিজেকে ব্যস্ত রেখে রূপকথার স্মৃতি থেকে একটু দূরে পালানোর ব্যর্থ চেষ্টায়। 
অন্য দিকে, পুরো বন্ধুমহলের জীবনটাও তাদের নিজস্ব নিয়মে বদলে যাচ্ছিল।
সবচেয়ে বড় সুখবরটা এসেছিল সাজিদের জীবনে। সে আমেরিকার একটা নামী মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে বেশ ভালো একটা পদে চাকরি পেয়েছে। আর মাত্র এক মাস হাতে সময় আছে, তারপরই সে দেশ ছেড়ে চলে যাবে। উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের এই বন্ধুমহলে সাজিদ একাই ছিল কিছুটা সাধারণ পরিবারের ছেলে, যার পক্ষে হুট করে এত টাকা জোগাড় করা অসম্ভব ছিল। তাদের বন্ধুত্বের গভীরতা এতটাই ছিল যে, সাজিদের স্বপ্নকে নিজের স্বপ্ন ভেবে সবাই মিলে মুহূর্তের মধ্যেই প্রয়োজনীয় সব টাকা-পয়সার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল।
আহিয়ানের পায়ের অবস্থা এখন অনেকটাই ভালো। তার প্লাস্টার কেটে ফেলা হয়েছে এবং সে এখন একদম স্বাভাবিকভাবেই হাঁটতে পারে। তবে তার পা ঠিক হলেও বাঁদরামি আর পাগলামি একটুও কমেনি....সে এখনো আগের মতোই সারাক্ষণ সবাইকে হাসিয়ে-মাতিয়ে রাখে।
আর জেড? এই নয় মাসে সে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে বেশ বড় একটা জায়গা করে নিয়েছে। তার গান এখন তরুণদের প্লেলিস্টের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কনসার্টে তাকে দেখার জন্য দর্শকদের ভিড় সামলানোই কঠিন হয়ে পড়ে। অনামিকার সঙ্গে তার সম্পর্কটা এখনও দাম্পত্যের রূপ না পেলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুজনেই একে অপরের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে।সময় যত গড়িয়েছে, জেড ততই বুঝেছে যে অনামিকাকে অস্বীকার করে থাকা সম্ভব নয়। তাই অজান্তেই সে তাকে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
নীল এখন তার বাবার বিজনেস একাই সামলাচ্ছে। তবে সে নিজে একা বড় হতে চায় না, সে সব বন্ধুদের স্পষ্ট বলে দিয়েছে, “মামা, তোরা যে যেখানেই থাকিস না কেন, আমরা বন্ধুরা মিলে খুব শীঘ্রই একটা নতুন বিজনেস শুরু করব।” এই তো, নভেম্বর মাস চলছে।ডিসেম্বর মাস থেকেই তাদের নতুন ব্যবসায়িক যাত্রার সূচনা হবে।
আর এহসান? ইউনিভার্সিটির শেষ সেমিস্টারে তার সিজিপিএ ছিল ৪.০০-এর মধ্যে ৪.০০। তার অসাধারণ ফলাফল আর মেধা দেখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চেয়েছিল, এমন একজন মেধাবী ছাত্র যেন ভবিষ্যতে একজন দক্ষ শিক্ষক হিসেবে গড়ে ওঠে। তাই নিজের যোগ্যতার জোরেই এহসান একই বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে.... 
আগামী সপ্তাহ থেকেই তার শিক্ষকতা জীবনের প্রথম ক্লাস শুরু হতে যাচ্ছে।বন্ধুরা সবাই এক এক করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল, কিন্তু এহসানের জীবনে অনুর শূন্যতা কোনো কিছু দিয়েই পূরণ হচ্ছিল না। 
চলবে.....
#নিভৃতে_যত্নে_রাখা_প্রিয়তমা
#মারিয়াম_ফুল 
পর্ব :২৭

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন