চট্টগ্রামের শীতের সকালটা সিলেটের চেয়ে কিছুটা অন্যরকম। ভোরের হালকা কুয়াশা ভেদ করে যখন পতেঙ্গা সৈকতের দিক থেকে ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে আসছিল, অনু তখন তার ঘরের জানালার গ্রিল ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। বিগত নয়টা মাস সে নিজেকে বাইরের পৃথিবী থেকে কতটা আড়াল করে রেখেছে, তা কেবল তার চারপাশের চারটে দেয়ালই জানে।
টেবিলে রাখা ক্যালেন্ডারটার দিকে চোখ যেতেই অনুর বুকটা খানিক কেঁপে উঠল —নভেম্বর মাসের ! মনে মনে হিসাব কষল সে, এহসানের এতদিনে গ্র্যাজুয়েশন শেষ হয়ে গেছে। ডিভোর্স পেপারটা পাওয়ার পর সে কি তাকে খুব ঘৃণা করছে? নাকি এতদিনে সব ভুলে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছে জীবনটা? অনু চোখ বন্ধ করল। চোখ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ার আগেই নিজেকে শক্ত করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
নিজের পরিবারের সাথে যে অনুর খুব বেশি যোগাযোগ হয়, তা নয়। যদিও সেই রাতে বিয়েটা তার নিজের ইচ্ছাতে হয়নি, কিন্তু ও এই পুরো ব্যাপারটা নিজের পরিবারের লোকজনের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল, এটা ভাবলে নিজের কাছেই কেমন যেন অস্বস্তি লাগে তার নিজের। নিজের ছোট ভাইটার সাথে কতদিন হলো দেখা হয় না! বাবা তাকে বেশ কয়েকবার বলেছিলেন সে যেন সিলেটে চলে যায়, সেখান থেকে না হয় বাইরের কোনো দেশে গিয়ে পড়াশোনা করবে।
অথচ অনু তো শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম স্থান নিয়ে ভর্তি হয়েছিল। পড়াশোনায় সে এতটা বেখেয়ালি হয়ে গেল কীভাবে? কত দিন-রাত পরিশ্রম করেছে শুধুমাত্র সাস্টে পড়ার জন্য! আর সেখানে পড়ার অন্যতম বড় কারণও ছিল এহসান।প্রথম যেদিন সে এহসানকে দেখেছিল, তখন অনু সম্ভবত ইন্টারমিডিয়েটে পড়ে। অবুঝ মন, কিশোরী জীবনের প্রথম ভালো লাগা। কত কষ্ট করে সে খোঁজ নিয়ে জেনেছিল এহসান সাস্ট-এ পড়ে। ব্যস, তারপর থেকেই মাথায় ভূত চাপল—তাকেও সাস্টে-পড়তে হবে। তখন তো আর জানত না, এহসান নামের মানুষটা তার শিকড়ের সাথে এভাবে জড়িয়ে যাবে।
আজও মনে পড়ে পহেলা বৈশাখের সেই দিনটার কথা। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে গম্ভীর স্বভাবের মানুষটা একগুচ্ছ বেলী ফুল দিয়ে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করেছিল। অথচ জীবন বড়ই নিষ্ঠুর, বড়ই বিচিত্র। আজ তাদের মধ্যে আকাশছোঁয়া দূরত্ব।
জীবন তো আর থেমে থাকে না, জীবন গতিময়। এহসান নিশ্চয়ই এতদিনে সংসার শুরু করে দিয়েছে? এহসানের বাচ্চা কাচ্চার প্রতি ভীষণ শখ ছিল। ওরা যখন কোথাও ঘুরতে যেত, রাস্তায় কোনো বাচ্চা দেখলেই এহসান বুকে টেনে আদর করত, টুকিটাকি জিনিস কিনে দিত। অনু- কে কথায় কথায় লজ্জা দিত "রূপ আমার, কিন্তু আমার এগারোটা বাচ্চা চাই! একটা আস্ত ক্রিকেট টিম বানাব। দেশে যুদ্ধ লাগলে অন্তত এগারোটা সৈন্য তো পাওয়া যাবে।"
তখন অনু লজ্জায় মাথা নিচু করে বলত,
“আপনি ভীষণ অসভ্য, সিদ্দিকী সাহেব ”
এহসান মৃদু হেসে উত্তর দিত,
“পৃথিবীর প্রতিটি পুরুষই তার নিজের প্রিয় নারীর কাছে অসভ্য। সেই সহজ ঘনিষ্ঠতা না থাকলে প্রজন্মের ধারাই বা এগিয়ে চলত কীভাবে?”
সেই কথাগুলো মনে পড়তেই অনু মৃদু হেসে ফেলল। এহসানার তার নেই, তাদের বিচ্ছেদের চার মাস হতে চলল খাতা কলমে। মন না চাইতেও নিজের জায়গায় নাইসার কথা মনে পড়ে গেল অনুর —হয়তো নতুন কাউকে নিয়ে এতদিনে ফ্যামিলি প্ল্যানিং-ও করে ফেলেছে এহসান !
চোখের কোণে কান্নার দলা পাকিয়ে আসতেই মুখের সামনে থেকে চুল সরানোর বাহানায় চোখের জল মুছে নিল অনু। আবার নিজেই নিজেকে দেখে হাসল—নিজের কাছ থেকেই কি নিজের কান্না লুকানো যায়? জানালার পাশ থেকে সরে এসে টেবিলের কাছে দাঁড়াল অনু। সিলেটের জন্য মনটা কেমন যেন হু হু করে উঠল তার। দ্বিধা আর ইতস্তত বোধ কাটিয়ে বাবার নাম্বারে কল দিল সে। ওপাশ থেকে কল রিসিভ করে মাহবুব তালুকদার বললেন, "অনু, ভালো আছিস মা?"
অনু বরাবরের মতোই নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলল, "খুব ভালো, বাবা। মা কেমন আছে?"
"ভালো আছে। কথা বলবি?"
অনু কথাটা এড়িয়ে গিয়ে বলল, "বাবা, একটা কথা ছিল।"
"হুঁ, বল মা। টাকা লাগবে?"
অনু আমতা আমতা করে বলল, "না বাবা... আগে বলো, যা বলব তা তুমি ফেলে দেবে না?"
মাহবুব তালুকদার আশ্বস্ত করলে অনু গভীর একটা শ্বাস নিয়ে বলল, "বাবা, আমি আমার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনাটা আবার শুরু করতে চাই। প্লিজ বাবা, না কোরো না। জীবন তো থেমে থাকে না, আর ওই মানুষটাও যখন থেমে নেই, তাহলে আমি কেন থেমে থাকব? আমার ওপর কি তোমার এতই রাগ যে আমি আর পড়াশোনা করতে পারব না?"
ওপাশ থেকে মাহবুব তালুকদার এবার হেসে উঠলেন, "এই না হলে আমার মেয়ে! তোমাকে সিলেটে আসতে না দেওয়ার একমাত্র কারণ ছিল যদি ওই ছেলেটা তোকে বিরক্ত করে।আর তুমি যদি ওই ছেলের জন্য জন্য কান্নাকাটি করো? আমি চাই না একটা লাফাংগা ছেলের জন্য আমার মেয়ে কষ্ট পাক। আমি খুব খুশি হয়েছি এটা ভেবে যে তুমি তোমার জীবনটা আবার নতুন করে শুরু করতে যাচ্ছ, মা।আমি তো এই মুহূর্তে আসতে পারছি না, আর নতুন সেমিস্টারও শুরু হতে যাচ্ছে। তুমি এক কাজ কর, রিদকে নিয়ে চলে আসো।"
বাবার কথায় অনুর মনটা হালকা হয়ে গেল। তার বাবা যে এত তাড়াতাড়ি রাজি হয়ে যাবেন, সেটা সে ভাবতেও পারেনি। অনু যদি কোনোদিন ফোন করে বলত,
“বাবা, সিলেটে আসি?”
উনি নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিতেন,না, আসার প্রয়োজন নেই।" অথচ আজকে কত সহজেই রাজি হয়ে গেলেন। হয়তো অনুর বাবা রাজি হয়েছেন এই ভেবে যে, তার মেয়ে অবশেষে অতীতকে পেছনে ফেলে জীবনে এগিয়ে যেতে পেরেছে। অনু একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।
ঠিক তখনই দরজার দিকে চোখ গেল অনুর। রিদ সেখানে কাঁধ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।অনু ভ্রু কুঁচকে ডান হাতের তর্জনী উঁচিয়ে বলল, "কী রে? দরজায় দাঁড়িয়ে আড়ি পাতা হচ্ছে? অন্যের পার্সোনাল কথা গিলতে লজ্জা করে না তোর?"
রিদ নির্বিকার ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকল। তারপর অনুর পরিপাটি করে রাখা বিছানায় ধপাস করে শরীরটা ছেড়ে দিয়ে বলল, "আহারে! বাপের বাড়ি যাওয়ার গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছিস বলে মুখে একদম খই ফুটছে। বিগত নয়টা মাস বোম মারলেও তো এত কথা বের হত -না মুখ দিয়ে। যাক, ভালোই হয়েছে। তবে এখন থেকে আর খোঁচা মেরে নিজেকে বড় বোন দাবি করতে পারবি না, সাবধান করে দিলাম"
অনু অবাক হয়ে রিদের দিকে এগিয়ে গেল, "কেন? কেন পারব না শুনি?"
"মিস রূপকথা তালুকদার অনু , আপনার তো একটা বছর মাঝখান থেকে হাওয়া হয়ে গেছে, টেকনিক্যালি আপনার এক বছর লস। অর্থাৎ, ম্যাডাম এখন আমার সাথে একই ব্যাচে স্ক্র্যাচ থেকে শুরু করবেন।" রিদ সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে পা দোলাতে দোলাতে বলল।
অনু চেঁচিয়ে উঠল,
"এই, আগে বিছানা থেকে ওঠ! পা নামা বলছি। আর কার সাথে কে এক ক্লাসে পড়বে? তুই তো ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বি চুয়েটে, আর আমি সাস্টে দুই মেরুর দুই ইউনিভার্সিটি, হা হা"
রিদ এবার উঠে বসল। মুখটা কিঞ্চিৎ বেঁকিয়ে বলল, "জ্বী না, আপুমণি! তোমার কপাল খারাপ। প্ল্যান চেঞ্জ করেছি। চুয়েট ছেড়ে আমিও এখন সাস্টে- যাচ্ছি। মেধা তালিকায় নাম তো জ্বলজ্বল করছেই, জাস্ট একটা মাইগ্রেশন ফর্ম তুলব। তোকে চব্বিশ ঘণ্টা জ্বালানোর জন্য হলেও এখন থেকে আমি তোর ক্যাম্পাসের ছায়া হয়ে থাকব।"
অনু আলতো করে মুখ ভেঙচিয়ে বলল, "যা যা, যেখানে ইচ্ছা যা! না হয় গিয়ে কোনো কুয়োর ব্যাঙ হ, আমার কী"
তাদের দুজনের কথার মধ্যেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঘরটায় নীরবতা নেমে এলো। রিদের মুখের চঞ্চল ভাবটা হুট করেই উধাও হয়ে গেল "তোর কি সত্যি একটুও মন খারাপ হচ্ছে না রে অনু? তুই তোর পুরনো ব্যাচমেট, বন্ধুদের সাথে আর ক্লাস করতে পারবি না... ভাবতেই কেমন লাগে না?"
অনু জানালার ওপারে তাকিয়ে একটা তপ্ত, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভেতরের শূন্যতাটা লুকিয়ে বলল,
"না রে, হচ্ছে না। জীবন যখন জোর করে কাউকে একটা ধাক্কা দেয়, তখন পেছনের দিকে তাকিয়ে আফসোস করার বিলাসিতাটা আর থাকে না। কপালে যা ছিল, তা তো কেউ খণ্ডাতে পারবে না... হয়তো এটাই হওয়ার ছিল।"
.........
রাত তখন দশটা।
জেড আর অনামিকার বেডরুম থেকে তখন তুমুল চিৎকারের আওয়াজ আসছিল। ঘটনার সূত্রপাত কয়েক ঘণ্টা আগে। জেড একটা নামকরা লাইভ টকশো-তে গিয়েছিল। সেখানে একপর্যায়ে উপস্থাপিকা বেশ হেসে জিজ্ঞেস করলেন,
"কিশোরী-তরুণীরা তো আপনার জন্য একদম পাগল। দর্শক ও ভক্তদের পক্ষ থেকে একটা পার্সোনাল প্রশ্ন করি—আপনি কি ব্যক্তিগত জীবনে এখনো সিঙ্গেল? সবাই কিন্তু এটা জানতে চায়।"
জেদ কোনো দ্বিধা ছাড়াই এক কথায় উত্তর দিয়ে দিল,
"হ্যাঁ, আমি সিঙ্গেল। আর বিয়ে-সংসার এসব নিয়ে এই মুহূর্তে ভাবার মতো কোনো ইচ্ছে বা সময় কোনোটাই আমার নেই।"
উপস্থাপিকা সুযোগ বুঝে আবার বললেন, "তার মানে কি জেড সারা জীবন একাই থেকে যাবেন?"
জেড মৃদু হেসে বলল, "হ্যাঁ, তেমনই ইচ্ছে।"
ড্রয়িংরুমে বসে টিভির পর্দায় কথাগুলো শুনছিল অনামিকা। জেডের প্রতিটি শব্দ তীরের মতো এসে তার বুকে বিঁধল। দীর্ঘ ১১টা মাস ধরে তারা এক ছাদের নিচে থাকছে, অথচ এই লোকটা একটা ন্যাশনাল টিভিতে কোটি মানুষের সামনে অবলীলায় নিজেকে সিঙ্গেল বলে দাবি করে দিল! বুক ঠেলে একটা কান্না আর তীব্র অভিমানী রাগ দলা পাকিয়ে উঠল অনামিকার।
কিছুক্ষণ পর জেড বাড়ি ফিরে ক্লান্ত হয়ে সোফায় এসে বসল। অনামিকা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে সটান জেডের সামনে এসে দাঁড়াল। কাঁপানো গলায় প্রশ্ন করল, "টিভিতে ওসব কী বললেন আপনি? আপনি নাকি সিঙ্গেল?"
জেড ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ করে কপাল কুঁচকাল। নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কেউ ঘাঁটাঘাঁটি করুক, এটা সে একদম পছন্দ করে না। বিরক্ত হয়ে বলল, "অনামিকা, প্লিজ! ওটা একটা মিডিয়া শো ছিল। ওসব নিয়ে এখন নাটক কোরো না তো।"
অনামিকা এবার জেদ ধরে বসল, "নাটক? আপনি নিজেকে সিঙ্গেল না বললে কি আপনার ভিউস কমে যেত? নাকি আমাকে সবার সামনে নিজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিতে আপনার লজ্জা হয়? আপনি আমাকে আপনার স্ত্রী বলে মানতে পারেন না, তাই তো?"
জেড সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো তখন রাগে জ্বলজ্বল করছে, "তোমাকে তো আমি মনে-প্রাণেও স্ত্রী হিসেবে মানি না! তাহলে এই অধিকার খাটানোর প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে? আশ্চর্য"
জেডের এই একটা কথায় অনামিকার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল। সে স্তব্ধ হয়ে গেল। ফিসফিস করে বলল, "তাহলে আসলেই মানেন না...। তাহলে এই এগারোটা মাস আমি কার জন্য এই চার দেয়ালে পড়ে আছি? কার অপমানের অপেক্ষা করি রোজ? মানলাম এই বিয়েটা আপনার অনিচ্ছায়, পরিস্থিতির চাপে হয়েছিল। কিন্তু তাই বলে একটা মাত্র সুযোগও কি দেওয়া যেত না আমাকে? আমি বারবার চেয়েছি আমাদের একটা সুন্দর সংসার হোক। কত অপমান করেছেন, মুখ বুজে সহ্য করেছি। একটা কথার উত্তর দিইনি কখনো "
জেড আচমকা অনামিকার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখের দিকে তাকিয়ে হিসহিস করে বলল, "তোমাকে কে বলেছিল এই সংসারের স্বপ্ন দেখতে? আমি একবারও বলেছি? যখন আমি কোনো আশা দিইনি, তখন কেন এই স্বপ্ন দেখলে? সহ্য না হলে চলে যাও এখান থেকে! কে আটকে রেখেছে তোমাকে?" কথাটা শেষ করেই সে রাগে অনামিকার হাতটা ঝটকা দিয়ে ছেড়ে দিল।
অনামিকার চোখের পানি এবার বাঁধ ভাঙল। সে তীব্র অভিমানে চিৎকার করে বলল, "সব পুরুষ মানুষ আসলে একই রকম নিষ্ঠুর! যাচ্ছি আমি, চলে যাচ্ছি। এত অপমানের পর এই বাড়িতে থাকার কোনো ইচ্ছে আমারও নেই "
বলেই অনামিকা হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।জেড ধপাস করে আবার সোফায় বসে পড়ল। হাত দিয়ে নিজের চুলগুলো খামচে ধরল সে। রোজ রোজ এই অশান্তি আর ভালো লাগে না। সে কি অনামিকাকে বলেছিল তার জীবনে আসতে? সে খুব ভালো করেই জানে, সে অনামিকাকে ভালোবেসে ফেলেছে। কিন্তু তার ভয় হয়—অনামিকাকে মনের কথা বলার পর যদি সে-ও তাকে ছেড়ে চলে যায়? ঠিক যেমন ছোটবেলায় তার মা তাকে ফেলে চলে গিয়েছিল। আজও মনে পড়ে, মায়ের আঁচল ধরে জেড কত কেঁদেছিল, বলেছিল, "আমাকে ফেলে যেও না মা, সাথে নিয়ে যাও।" অথচ তার মা শোনেনি।
নিজের জীবনের এই এলোমেলো অতীত আর বর্তমানের হিসেব কষতে কষতে জেদ খেয়ালই করেনি যে ঘড়িতে তখন রাত ১১টা বেজে গেছে।
বর্তমান
ঘরটা একদম নিঝুম, জেডের মনে হলো, অনামিকা হয়তো ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসে আছে। ভাবল, আজ সব কথা খুলে বলে মনের সব ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নেবে। সে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল, তারপর ড্রয়িং রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
কিন্তু ড্রয়িংরুমে গিয়ে কাউকে না পেয়ে জেড বাড়ির কাজের লোক হেনা খালাকে জিজ্ঞেস করল, "খালা, অনামিকা কোথায়? দেখেছেন ওকে?"
খালা কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, "বৌমুনি তো কিছুক্ষণ আগে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।"
কথাটা শোনামাত্র জেডের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে ভেবেছিল অনামিকা রাগ করে অন্য ঘরে আছে। এই ১১ মাসে তাদের মধ্যে কত ঝগড়া হয়েছে, কিন্তু অনামিকা কখনো বাড়ি ছেড়ে যায়নি। তারা যে এলাকায় থাকে, সেটা সিলেটের টিলাগড় , বয়েজ হোস্টেলের কাছাকাছি। এখানকার রাস্তাগুলো দিনের বেলাতেই মেয়েদের জন্য খুব একটা নিরাপদ নয়, আর এখন রাত ১১টা! চারপাশ একদম জনমানবহীন, অন্ধকার।
জেড আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। একটা তীব্র আতঙ্কে তার বুক কাঁপতে লাগল। সে এক দৌড়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল।পাগলের মতো হাঁটতে হাঁটতে জেড এমসি কলেজের রোডের দিকে এগিয়ে চলল। দূর থেকে কয়েকটা ছেলেকে জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার বুকের ভেতরটা দমে গেল। ভয় আর আশঙ্কায় তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। বেশ কিছুক্ষণ চারপাশ খোঁজাখুঁজি করার পর কোথাও অনামিকাকে না পেয়ে জেড মাঝরাস্তায় একদম অসহায় মানুষের মতো হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
সে দুই হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠল, "আই অ্যাম সরি অনামিকা! প্লিজ ফিরে আসো। আমি আর কখনো তোমার সাথে ঝগড়া করব না... প্লিজ ফিরে আসো...প্লিজ"
পাশ দিয়েওয়ার সময় দুটো ছেলে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল, "জানিস, কিছুদিন আগে এই জায়গায় রাতের বেলা একটা মেয়ের সাথে কি ঘটে গেছে?এই রাস্তাটা একদম ভালো না, চল তাড়াতাড়ি পা চালাই।"
কথাটা কানে আসতেই জেড পুরোপুরি ভেঙে পড়ল। তার মাথায় তখন নানা রকম কুৎসিত চিন্তা ভর করতে শুরু করেছে। বুকটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে এক অজানা আতঙ্কে। যদি অনামিকার কিছু হয়ে যায়, সে নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবে না। নিজের সব অহংকার, রাগ আর জেদ এক নিমেষে ধুলোয় মিশিয়ে সে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল—
"আই লাভ ইউ অনামিকা! আই লাভ ইউ! তোমাকে ছাড়া আমি আমার জীবনের আর কিচ্ছু চিন্তা করতে পারি না। প্লিজ ফিরে আসো "
আচমকা পেছন থেকে জেডের কাঁধে একটা হাতের স্পর্শ এসে পড়ল, জেড চমকে উঠে অবিশ্বাস্য চোখে পেছনে ঘুরল। অনামিকা দাঁড়িয়ে আছে। কুয়াশার মাঝে তার শরীরটা কাঁপছে, চোখ দুটো কান্নায় লাল হয়ে ফুলে গেছে।
জেড আর একটা মুহূর্তও নষ্ট করল না। সব বাধা ভেঙে সে অনামিকাকে শক্ত করে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল, যেন এক সেকেন্ডের জন্য হাতছাড়া করলে সে আবার এই কুয়াশায় হারিয়ে যাবে। অনামিকার গলার ভাঁজে মুখ লুকিয়ে জেড ভাঙা গলায় বলল, "আমাকে এভাবে মেরে ফেলার জন্য কোথায় গিয়েছিলে, হ্যাঁ? জানো আমার কি কি বাজে চিন্তা আসছিল মনে?"
অনামিকা প্রথমে জেডকে জড়িয়ে ধরল না। সে অভিমানী চোখে চেয়ে কাঁপা গলায় বলল, "চলে যেতেই তো বলেছিলেন। গলা ধাক্কা দিতে বাকি রেখেছিলেন শুধু। তাহলে আবার এই মাঝরাতে খুঁজতে এলেন কেন?"
"চুপ! একদম চুপ!" জেদ অনামিকার কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। তার চোখ দিয়ে তখন জল গড়িয়ে পড়ছে অনামিকার গালে। "তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না, অনামিকা। তুমি আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে, আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে প্রবেশ করেছ অনেক আগেই । এখন চাইলেও তোমাকে আমি আমার জীবন থেকে আলাদা করতে পারব না। চলো, বাড়ি চলো।"
অনামিকা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, "যাব না আমি আপনার বাড়ি। ওটা আপনার বাড়ি, আমার কোনো অধিকার নেই সেখানে।"
"ভুল কথা! ওটা শুধু আমার নয়, ওটা আমাদের বাড়ি।" জেড অনামিকার দুই গালে নিজের ঠান্ডা হাত দুটো রাখল, পরম যত্নে বুড়ো আঙুল দিয়ে তার চোখের জল মুছে দিল। জেডের চোখের সমস্ত তীব্র ভালোবাসা এই প্রথম অনামিকা এত কাছ থেকে দেখল।
জেড ফিসফিস করে বলল, "তুমিই আমার সব, অনামিকা। তুমি ছাড়া আমার এই শূন্য জীবনে আর কেউ নেই, কোনোদিন ছিলও না। এই এগারোটা মাস আমি শুধু ভয় পেয়েছি তোমাকে হারানোর। এবার আমাদের একটা সত্যিকারের সংসার হবে। আমাদের ঘর আলো করে ছোট ছোট বাচ্চাকাচ্চা আসবে, সারাটা ঘর আমাদের ভালোবাসার শব্দে মেতে থাকবে।"
জেড অনামিকার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন তাদের দুজনকে এক অদ্ভুত মায়াজালে বন্দি করে ফেলেছে। জেদ আলতো করে অনামিকার চিবুকটা স্পর্শ করে তার মুখটা একটু ওপরে তুলল। অনামিকার ভেজা চোখের পাতা আর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই কম্পনটুকু জেডের ভেতরের সমস্ত সংযম এক নিমেষে ভেঙে দিল।জেদ আর কোনো কথা বলল না। সে ধীরে ধীরে অনামিকার আরও কাছে এগিয়ে এলো। দুজনের তপ্ত নিঃশ্বাস একে অপরকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। ঠিক পরের মুহূর্তেই জেড অনামিকার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।মুহূর্তের মধ্যেই এগারো মাসের জমে থাকা অভিমান, অবহেলা আর দূরত্ব সবই একসাথে গলে যেতে যেন শুরু করল।
অনামিকা চোখ বন্ধ করে ফেলল, তার হাত দুটো জেদের শার্টের কলারটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। কুয়াশাঘেরা সেই জনহীন রাস্তায় সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে সাক্ষী রইল তাদের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মিলনের। জেড যখন অনামিকার ঠোঁট থেকে নিজের ঠোঁট সরিয়ে নিল, অনামিকার গাল দুটো তখন লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। সে জেডের বুকের মাঝে নিজের মুখটা লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করলাম । জেড অনামিকার চুলে বিলি কেটে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, "বাকি রাতটুকু আর এই ঠাণ্ডা রাস্তায় কাটানোর কোনো মানে হয় না। চলো, এবার আমাদের ঘরে ফিরি।"
টিলগড়ের কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তা ধরে তারা যখন বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল, তখন দুজনের মনেই এক অন্যরকম মাদকতা। একে অপরের হাত ধরে তারা যখন অবশেষে নিজেদের শোবার ঘরে এসে পৌঁছাল, তখন চারপাশের চেনা ঘরটাকেও কেমন যেন অচেনা আর নতুন মনে হতে লাগল। এতদিনের ছমছমে নীরব ঘরটা আজ যেন এক পরম উৎসবের অপেক্ষায় সেজে উঠেছে।
জেড ঘরের দরজাটা আলতো করে বন্ধ করে দিল। অনামিকা খাটের একপাশে গুটিসুটি মেরে বসে রইল। বুকের ভেতরটা তার অকারণেই দুরুদুরু করে কাঁপছিল। এতদিনের চেনা মানুষটাকে আজ যেন নতুন করে চিনছে সে।
জেড ধীর পায়ে এগিয়ে এসে তার পাশে বসল। মৃদু আলোয় অনামিকার লাজুক মুখখানি আরও শান্ত, আরও স্নিগ্ধ লাগছিল। সে আলতো করে অনামিকার হাত দুটো নিজের মুঠোয় নিল। তাদের মধ্যে কোন কথা হলো না, শুধু নীরবতার ভেতরেই জমে থাকা অসংখ্য না-বলা অনুভূতির আদান-প্রদান চলতে লাগল।
একসময় জেড তাকে নিজের কাছে টেনে নিল। দীর্ঘ এগারো মাসের অভিমান, দূরত্ব আর না-পাওয়ার কষ্ট ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। রাতের নিস্তব্ধতাকে সঙ্গী করে দুটি ক্লান্ত হৃদয় অবশেষে একে অপরের আশ্রয় খুঁজে পেল, আর নতুন করে শুরু হলো তাদের একসঙ্গে পথচলার গল্প।
চলবে....
#নিভৃতে_যত্নে_রাখা_প্রিয়তমা
#মারিয়াম_ফুল
পর্ব :২৮