ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিভৃতে যত্নে রাখা প্রিয়তমা

২৯তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম ফুল

#নিভৃতে_যত্নে_রাখা_প্রিয়তমা
#মারিয়াম_ফুল
পর্ব :২৯
সেই রাতের পর থেকে জেড আর অনামিকার সম্পর্কটা যেন এক নতুন পূর্ণতা পেয়েছে। তাসের ঘরের মতো ভাঙা-গড়ার খেলায় যে সংসারটা একদিন প্রায় তলিয়ে যেতে বসেছিল, সেখানে এখন আলতো রোদের ওম। অনামিকা নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করছে এই নতুন জীবনটাকে গুছিয়ে নিতে, সংসারের খুঁটিনাটি মায়ায় জড়িয়ে নিতে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, সংসারের এই একরাশ দায়িত্বের সাথে নিজের পড়াশোনা সামলাতে গিয়ে তাকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।
জেড অবশ্য শুরুতেই কড়া গলায় বারণ করে দিয়েছে, "রান্নাবান্না নিয়ে তোমাকে একদম মাথা ঘামাতে হবে না। ওসব হেনা খালা দেখবে। তুমি শুধু পড়াশোনায় মন দাও।"
মুখ ফুটে জেডের কথা মেনে নিলেও, অনামিকা কি আর তা শোনার পাত্রী? সে মনে মনে পাকা রাঁধুনির মতো কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে। একেক দিন একেক রকম নতুন পদ রেঁধে সে জেডকে চমকে দিতে ভালোবাসে সে। আসলে জেডকে আগে প্রায়ই বাড়ির কাজের লোক হেনা খালা রান্না করে দিত। আর সিলেটি মানুষ হয়ে সকালবেলার গরম-গরম পাতলা খিচুড়ি পছন্দ করবে না, এমন লোক তো টিলাগড় কেন, পুরো সিলেট খুঁজলেও মেলা ভার! জেডও এর বাইরে নয়।আজও সকাল-সকাল ঘুম থেকে উঠেই অনামিকা সোজা কিচেনে চলে এসেছে। আজ জেডের প্রিয় পাতলা খিচুড়ি রাঁধবে সে। চুলোয় চাল-ডাল ফুটে ওঠার সুবাস যখন পুরো কিচেনে ছড়িয়ে পড়েছে, তখন অনামিকা আনমনে ভাবছিল—আজ ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস আছে কি না?ঠিক তখনই ঘটে গেল কাণ্ডটা। অনামিকা খেয়ালই করেনি জেড কখন বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে এসে তার পেছনে দাঁড়িয়েছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজোড়া শক্ত হাত অনামিকাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। জেড তার চিবুকটা অনামিকার কাঁধের ওপর রেখে অলস ভঙ্গিতে চোখ বন্ধ করল।
হুট করে এই অতর্কিত আক্রমণে অনামিকা সামলে উঠতে পারল না। জেডের শরীরের সুবাস আর গায়ের উষ্ণতায় তার বুকটা ধক করে উঠল তবে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার ভান করে, জেডকে একটু জ্বালানোর জন্যই অনামিকা বলে উঠল। , "ভাইয়া, সরুন না! তরকারি পুড়ে যাবে তো!"
'ভাইয়া' শব্দটা শুনতেই জেডের কপাল কুঁচকে গেল। সে অনামিকার কাঁধের খাঁজে মুখ গুঁজে একটুখানি কামড় দেওয়ার মতো করে ফিসফিসাল, "তোমার কোন জন্মের ভাইয়া আমি, হ্যাঁ?"
অনামিকা শরীরটা একটু দোলা দিয়ে জেডকে কনুই দিয়ে ঠেলার চেষ্টা করে বলল, "ভুলে গেলেন? প্রতিদিন বেশি বেশি করে বাদাম খাবেন ভাইয়া, স্মৃতিশক্তি ভালো হবে। আপনি যে আমার ইউনিভার্সিটির সিনিয়র ছিলেন, সেটা এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন?"
কথা বলতে বলতেই জেড অনামিকাকে নিজের বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি হেসে বলল , "নিজের স্বামীকে 'ভাইয়া' ডাকতে তোমার লজ্জা করে না, অনামিকা?"
অনামিকা মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, "সরুন তো! লজ্জা কেন লাগবে?"
"দাঁড়াও, দেখাচ্ছি লজ্জা কেন লাগবে!" বলেই জেড যখন অনামিকাকে আরও গভীরভাবে জাপটে ধরতে যাবে — ঠিক তখনই যেন রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন জেডের বাবা!
ভদ্রলোক কিচেনে ঢুকেই চোখের সামনের দৃশ্য দেখে একদম থমকে গেলেন। এই বয়সে এসে ছেলে আর ছেলের বউকে সাতসকালে এমন ঘনিষ্ঠ অবস্থায় আবিষ্কার করাটা ওনার জন্য বেশ লজ্জাজনক ব্যাপার। উনি অস্বস্তিতে আমতা আমতা করে কিছু একটা বলতে যাবেন, তার আগেই অনামিকা প্রায় মরিয়া হয়ে জেডের বাঁধন থেকে ছিটকে সরে এলো। লজ্জায় লাল-নীল হয়ে সে এক নিঃশ্বাসে বলে উঠল, "না বাবা! না, এমন কিছু না... আপনি যেমন ভাবছেন মোটেও তেমন কিছু না!"
জেড অবশ্য বিন্দুমাত্র লজ্জিত নয়। সে নির্লজ্জের মতো ঠোঁট টিপে হাসছে আর চোখের কোণ দিয়ে অনামিকার ওই টমেটোর মতো লাল হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকাচ্ছে।
জেডের বাবা কাঁচুমাচু মুখে নিজের চশমাটা ঠিক করতে করতে বললেন, "এ্যাঁ... মানে, আমি একটু পানি নিতে আসছিলাম আর কী। আমার রুমের ফ্লাস্কের পানি শেষ হয়ে গেছে..." বলেই ভদ্রলোক আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালেন না, তাড়াহুড়ো করে উল্টো পায়ে নিজের ঘরের দিকে হেঁটে চলে গেলেন।অনামিকার তখন ইচ্ছে করছে রান্নাঘরের মেঝেটা ফাঁক হলে সে তার ভেতর সেঁধিয়ে যায়। লজ্জায় তার কান-মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে। মনে মনে ভাবছে, বাবা না জানি কী ভাবলেন! এরপর ওনার সামনে সে মুখ দেখাবে কীভাবে?
তীব্র রাগে অনামিকা জেডের দিকে চোখ কড়মড় করে তাকাল। জেড অবশ্য সেসবের তোয়াক্কাই করল না। সে হঠাৎ জানালার বাইরে আঙুল উঁচিয়ে বলে উঠল, "ওই দেখো পাখি ...."
অনামিকা অবচেতনভাবেই যেই না জানালার দিকে তাকিয়েছে, অমনি জেড সুযোগ বুঝে টুপ করে অনামিকার নরম গালে একটা চুমু খেয়ে এক দৌড়ে কিচেন থেকে পালিয়ে গেল।গালে হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল অনামিকা। জেড যে তাকে এমন বোকা বানিয়ে, গালে একটা চুমু এঁকে দিয়ে চলে যাবে—তা ও ভাবতেও পারেনি। ও শুধু নিস্পলক চোখে জেডের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। অনামিকা নিজের গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর গাল মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকেই চিৎকার করে বলল, "এই অসভ্য লোক! একটা আস্ত অসভ্য লোক আপনি..."
ওদিকে তালুকদার বাড়িতে সকাল থেকেই বেশ ব্যস্ততা।
কালরাত -ই অনু চট্টগ্রাম থেকে রিদকে সাথে নিয়ে সিলেটে ফিরে এসেছে। বুকটার ভেতর কেমন একটা চেনা-অচেনা তোলপাড় চলছে তার। এতগুলো মাস পর সে আবার ইউনিভার্সিটির বারান্দায় পা রাখতে যাচ্ছে। ভেতরে ভেতরে একটা সূক্ষ্ম ভয় কাজ করলেও, স্বস্তির বিষয় হলো ইউনিভার্সিটির যাবতীয় ফরমালিটিজ এবং রি-অ্যাডমিশনের ঝামেলাগুলো তার বাবা মাহবুব তালুকদার আগেই পূরণ করে রেখেছিলেন।
আজ রিদেরও সাস্টে প্রথম দিন। সে ভীষণ এক্সাইটেড। মেধা তালিকায় নাম থাকায় সে চুয়েট ছেড়ে সাস্টেই মাইগ্রেশন করে চলে এসেছে। ঠিক হয়েছে, রিদ এখন থেকে অনুদের বাড়িতে থেকেই পড়াশোনা করবে।দুজনে গল্প করতে করতে গাড়িতে গিয়ে বসল। গাড়ি যখন সাস্টের ক্যাম্পাসের দিকে ছুটছে, অনু তখন রিদকে বুঝিয়ে বলছিল—কোন বিল্ডিংটা কোথায়, কোথায় কী হয় না হয়। কথা বলতে বলতেই হঠাৎ অনুর মনে পড়ে গেল 'কেমিক্যাল বিল্ডিং'-এর কথা। বুকটা যেন এক নিমিষে খালী হয়ে গেল তার।এহসানের সাথে এই বিল্ডিংয়ের দ্বিতীয় তলায় দেখা হতো তার।
অনু চোখ বন্ধ করে মাথাটা নাড়ল। না, সে আর পুরনো কথা মনে করতে চায় না। বাবাকে সে কথা দিয়েছে, অতীতকে পেছনে ফেলে সে নতুন করে বাঁচবে। নিজের কারণে বাবা-মাকে সে আর কোনো চিন্তায় ফেলতে চায় না সে। তার মা, শিরিন সিদ্দিকী অবশ্য অনুর সাথে খুব বেশি যে কথা বলছেন এমন না, আবার একদমই যে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন তাও না। যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই কথা হচ্ছে মা-মেয়ের।
আজ অনু একটা সাদা রঙের সালোয়ার-কামিজ পরেছে, সাথে ম্যাচিং করে মাথায় জড়িয়েছে একটা ব্রাউন কালারের হিজাব। গত কয়েকদিন ধরেই সে হিজাব পরা শুরু করেছে। আয়নায় নিজেকে দেখে তার নিজেরই মনে হয়েছে—খারাপ না, বেশ ভালোই লাগছে দেখতে।
এসব ভাবতে ভাবতেই গাড়ি এসে থামল ইউনিভার্সিটি করিডোরের সামনে। গেটে নামল রিদ আর অনু। ক্যাম্পাসের বাতাস গায়ে লাগতেই অনুর বুকের ভেতরটা কেমন দুরুদুরু করে কাঁপতে লাগল। যদি হঠাৎ এহসানের সাথে দেখা হয়ে যায়? যদি এহসান সামনে এসে দাঁড়ায়? কিন্তু অনুর সমস্ত জল্পনা-কল্পনা, আশঙ্কাকে এক নিমেষে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়ে হুট করে একটা চেনা কণ্ঠস্বর তীব্র ক্ষোভে চিৎকার করে উঠল—
"বেইমান! কোথায় মরে গিয়েছিলি তুই? তুই এখনও বেঁচে আছিস?"
অনু চমকে উঠে তাকিয়ে দেখল, সামনে অনামিকা দাঁড়িয়ে।রাগে, ক্ষোভে অনামিকার মুখটা লাল হয়ে গেছে। ক্যাম্পাসের চারপাশের দু-চারজন ছাত্রছাত্রী ইতিমধ্যেই কৌতূহলী চোখে তাদের দিকে তাকাতে শুরু করেছে।
অনু চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে নিচু গলায় বলল, "প্লিজ অনামিকা, এখানে সিন ক্রিয়েট করিস না। চল, আমরা কোথাও একটা আড়ালে গিয়ে কথা বলি।" 
অনামিকা যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো তেতে উঠল। সে ঝাঁঝালো গলায় বলল, "কেন? কেন সিন ক্রিয়েট করব না? আর আপনি আমার কে হন যে আপনার কথা বলতে হবে? সরি, আমারই ভুল হয়েছে। আপনার মতো মানুষের সাথে ভুলে কথা বলে ফেলেছি"
বলেই অনামিকা হনহন করে উল্টো পায়ে চলে যেতে উদ্যত হলো। অনু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, সে চট করে গিয়ে অনামিকার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল, "শোন প্লিজ, অনামিকা... যাস না।"
ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ একজন এসে প্রচণ্ড এক ঝটকায় অনুর হাত থেকে অনামিকার হাতটা ছাড়িয়ে নিল।
"হাত ছাড় অনু! অনামিকার হাত ছাড়!"
অনু চোখ দুটো গোল গোল করে তাকিয়ে দেখল—অভি দাঁড়িয়ে আছে।
মেঝেতে পা ঠুকে অনু বিড়বিড় করে ডাকল, "অভি..."
অভি তীব্র ঘৃণায় অনুর দিকে তাকিয়ে বলল, "তোর মুখে আর কোনোদিন আমাদের নাম নিবি না অনু। আমাদের কাছে তুই অনেক আগেই মরে গেছিস। যদি জ্যান্তই থাকতিস, তাহলে এতদিনের মধ্যে অন্তত একটা বার আমাদের খোঁজ নিতি"
কথাটা বলেই অভি অনামিকার দিকে ইশারা করে বলল, "চল অনামিকা, এখানে আমাদের কোনো কাজ নেই।"
অনু স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের কোণ বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। হ্যাঁ, ভুলটা তো তারই ছিল। বিগত নয়টা মাস সে নিজেকে এমনভাবে গুটিয়ে রেখেছিল যে কারও সাথে কোনো যোগাযোগ রাখেনি। বন্ধুদের এই রাগ, এই অভিমান তো খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু অনু যে পরিস্থিতির শিকার হয়ে, কোন নরকযন্ত্রণা সহ্য করে এতদিন আড়ালে ছিল - সেটা কি ওরা একবারও জানতে চাইবে না?
অভি আর অনামিকার চলে যাওয়ার দিকে অনু অপলক চোখে তাকিয়ে রইল। রিদ আলতো করে অনুর কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনার সুরে বলল, "শান্ত - হ। সব ঠিক হয়ে যাবে।"
অনু কোনোমতে চোখ মুছে মাথা নাড়ল। একসময় ওরা একই ক্লাসে, একই বেঞ্চে বসে কত স্বপ্ন দেখত। আর আজ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস—তাদের গন্তব্য আলাদা, ক্লাস আলাদা, চেনার জগৎটাই আলাদা হয়ে গেছে।
অনু বুকভরে কয়েকবার লম্বা লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। ঠিক তখনই রিদ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, "জানডুবাম! আর মাত্র ৬ মিনিট বাকি আছে ক্লাসের। তাড়াতাড়ি চল, প্রথম দিনই লেট করতে চাই না "
রিদের টানে অনুও পা চালাল। দৌড়াতে দৌড়াতে দুজন এসে যখন সিএসই ডিপার্টমেন্টের ক্লাসরুমের দরজায় দাঁড়াল, তখন তাদের দম প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। তাড়াহুড়ো আর উত্তেজনার চোটে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষকে দিকে তাদের কারোরই চোখ গেল না ।
রিদ আর অনু যখন ক্লাসরুমের ভেতরের দিকে এগিয়ে গিয়ে মাঝারি সারির একটা বেঞ্চে নিজেদের ব্যাগ দুটো রাখছিল, ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা ভারী, গম্ভীর আর গমগমে গলার শব্দ ভেসে এলো —"ইউনিভার্সিটিতে উঠে গেছ, অথচ ক্লাসে ঢোকার ন্যূনতম ভদ্রতাটুকুও শেখোনি?"
কথাটা শোনার সাথে সাথেই রিদ আর অনু দুজনেই থমকে গেল। তারা বুঝতে পারল, ঠিক কোথায় তাদের ভুলটা হয়ে গেছে। করিডোর দিয়ে দৌড়ে আসার উত্তেজনায় তারা ক্লাসরুমে শিক্ষক আছেন কি না, তা দেখার বা অনুমতি নেওয়ার কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিল। রিদ পেছনের দিকে না তাকিয়েই চোখের ইশারায় অনুর দিকে তাকাল, মুখটা কিঞ্চিৎ বাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করতে চাইল 'এখন কী করবে ম্যাডাম?' অনুও কথা না বলে কেবল চোখের ইশারায় রিদকে ইশারা করল আগে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য।
রিদ গভীর একটা শ্বাস নিয়ে প্রথম ঘুরে দাঁড়াল। আর ঘুরে দাঁড়াতেই তার সামনের দৃশ্যপটে ভেসে উঠল এক সুঠাম দেহের পুরুষ। পরনে নিখুঁত ইন করা ধবধবে সাদা শার্ট। কিন্তু সেই শার্টের ভেতরের মানুষটার অবয়ব এখন ভীষণ থমথমে। রাগে আর বিরক্তিতে তার কপালের রগগুলো স্পষ্ট ফুলে উঠেছে, এমনকি হাতের পেশিগুলোও টানটান হয়ে আছে। রাগটা যে তার একদম মাথা পর্যন্ত চড়ে গেছে, তা বুঝতে কোনো বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
রিদ যখন ভদ্রলোকের আপাদমস্তক দেখছিল, তখন অনুও নিজেকে শক্ত করে ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল সেই আগন্তুকের দিকে। আর তাকানো মাত্রই অনুর পায়ের তলার মাটি যেন এক ইঞ্চি সরে গেল। বুকের ভেতরের হৃৎস্পন্দনটা কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল তার।
এহসান? এহসান সিদ্দিকী!
এ কাকে দেখছে অনু? যার কাছ থেকে বাঁচতে সে বিগত নয়টা মাস নিজেকে বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ আড়াল করে রেখেছিল, যার স্মৃতি থেকে পালিয়ে বেড়াতে সে নিজের শহর ছেড়ে চট্টগ্রামে গিয়ে চার দেয়ালের বন্দিত্ব বেছে নিয়েছিল—আজ সেই মানুষটা তার 
 চোখের সামনে দাঁড়িয়ে! তার প্রাক্তন স্বামী? যে তাকে এতটা নির্মমভাবে ধোঁকা দিয়েছিল, যে তাকে এক অতলান্তিক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছিল ?
ঠিক এই সময়টায় রিদও অনুর দিকে তাকাল। রিদ অবশ্য এহসানকে চিনতে পেরেছে, তার জন্য এহসান সিদ্দিকীকে চেনা খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। সে একবার এহসানের দিকে তাকাচ্ছে, আবার পরক্ষণেই অনুর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকাচ্ছে। পরিস্থিতি যে কতটা জটিল আর থমথমে রূপ নিতে যাচ্ছে, তা রিদে আন্দাজ করতে পারছে। অনু নিজেও কখনো কল্পনা করেনি, এহসানের মুখোমুখি তাকে এভাবে হতে হবে, তাও আবার নিজের ক্যাম্পাসের ক্লাসরুমে, শিক্ষকের আসনে থাকা এহসানের সামনে ! 
ওদিকে এহসান যখন অনুর দিকে তাকাল, তখন তার নিজেরও চোখের ওপর বিশ্বাস হচ্ছিল না। তার সমস্ত চিন্তাভাবনা ও যুক্তি যেন এক নিমেষে লোপ পেয়ে গেল। রূপকথা! তার রূপ! তার জীবনের প্রথম ভালোবাসার মানুষটা আজ তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ নয়টা মাস... দীর্ঘ নয়-নয়টি মাস পর সে তার সেই চেনা মুখটা আবার দেখতে পাচ্ছে। তার বিবাহিত স্ত্রী, তার সমস্ত স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু—যার চোখের দিকে তাকিয়ে সে একসময় পুরো একটা জীবন পার করে দেওয়ার স্বপ্ন বুনেছিল। 
এহসান নিজের চোখের পাতা দুটো জোরে বন্ধ করল, তারপর আবার খুলল। না, কোনো ভুল দেখেনি সে। কোনো বিভ্রম নয় এটা। তার চোখের সামনে সত্যিই দাঁড়িয়ে আছে মিসেস এহসান সিদ্দিকী। কিন্তু পরক্ষণেই, মিলনের সেই আকস্মিক আনন্দের রেশটুকু কেটে যেতেই এহসানের মনে পড়ে গেল পেছনের অতীতটা। মনের গভীরে জমে থাকা ক্ষতগুলো দগদগে হয়ে উঠল। এই সেই রূপকথা, যে কোনো কিছু না বলে, কোনো অপরাধ বা কারণ না দর্শিয়ে হুট করে একদিন নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। একটা ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিয়ে যে একটা জলজ্যান্ত মানুষকে জীবন্ত লাশের মতো ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল।
স্মৃতিগুলো মনে আসতেই এহসানের ভেতরের রাগটা তিরতির করে বাড়তে লাগল। অপমানের আর অবহেলার সেই তীব্র আগুন তার চোখের মণি দুটোকে লাল করে তুলল। তার ওপর অনুর পাশে এই রিদ নামের ছেলেটাকে দেখে তার ভেতরের সহ্যশক্তি যেন পুরোপুরি লোপ পেল। 
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না এহসান। সে হাতের ডাস্টারটা টেবিলের ওপর সশব্দে নামিয়ে রেখে তীব্র কর্কশ গলায় চিৎকার করে উঠল—"আউট ফ্রম মাই ক্লাস! কোনো ম্যানার্স জানা নেই তোমাদের? এই মুহূর্তে আমার ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাও!"
রিদ চারদিকের গম্ভীর পরিবেশটার দিকে একবার তাকাল। সাধারণত রিদের মতো ছেলেদের জন্য শিক্ষকের বকুনি খেয়ে ক্লাস থেকে বের হওয়াটা খুব একটা বড় কোনো ব্যাপার নয়। এর আগেও কলেজে থাকতে কতবার যে তাকে শিক্ষকরা এভাবে ঘাড় ধরে বের করে দিয়েছেন, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। সে এসব লোকলজ্জা বা অপমানের থোড়াই কেয়ার করে! কিন্তু রিদ যখন পাশে দাঁড়ানো অনুর দিকে তাকাল, তখন তার ভেতরের চঞ্চলতাটুকু দমে গেল।
অনুর পুরো মুখটা তখন অপমানে আর লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ ধারণ করেছে, কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেখানে কোনো জল নেই; কান্নার জল যেন চোখের কোণেই শুকিয়ে পাথর হয়ে গেছে। ক্লাসের এত এত চেনা-অচেনা সহপাঠীর সামনে নিজের প্রাক্তন স্বামীর কাছ থেকে এভাবে গলা ধাক্কা খাওয়ার মতো অপমান অনু নিজের জীবনে কোনোদিন কল্পনাও করেনি। সে ভীষণ লজ্জিত বোধ করল।
ক্লাসের ভেতরে থাকা বাকি ছাত্রছাত্রীরা ইতিমধ্যেই নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কানাঘুষো শুরু করে দিয়েছে। কেউ একজন একটু চড়া সুরেই বলে উঠল, "দেখ দেখ, মেয়েটা প্রথম দিন এসেই কেমন অপমানিত হলো! স্যার তো একদম ধুয়ে দিলেন!"চারপাশের এই ফিসফিসানি আর অপমানের তিরগুলো অনুর কানে তীরের মতো এসে বিঁধল। সে সেখানে আর একটি মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পেল না। মাথা নিচু করে, নিজের সমস্ত আত্মসম্মানটুকু কুড়িয়ে নিয়ে সে তপ্ত পায়ে তক্ষুণি ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে করিডোরের দিকে চলে গেল।
অনু ক্লাস থেকে একরকম প্রায় ছুটে বেরিয়ে যাওয়ার পর, এহসানের ভেতরের সেই তীব্র রাগের ঝিলিকটা যেন হুট করেই নিভে গেল। তার মনের ভেতরের মতিভ্রমটা কাটল। এতক্ষণ সে রাগের মাথায় কী করল? ওটা কি সত্যিই অনু ছিল? দীর্ঘ নয়টা মাস পর যাকে সে দিন-রাত খুঁজে বেড়িয়েছে, সে আজ এত কাছে এসেও এভাবে আবার চোখের আড়াল হয়ে গেল? এহসানের পা দুটো যেন আর শরীরটার ভার সইতে পারল না। সে পেছনে থাকা চেয়ারটায় ধপাস করে বসে পড়ল। তার দুই হাত দিয়ে সে নিজের মুখটা ঢাকল। ক্লাসরুমের নিস্তব্ধতা আর চারপাশের কৌতূহলী চোখগুলো তখন তাকে গ্রাস করতে আসছিল, অথচ তার মন তখন করিডোর ধরে ছুটে চলা ওই ব্রাউন হিজাব পরিহিত মেয়েটার পেছনেই পড়ে রইল। 
চলবে 

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন