অনুর বুকের ভেতর তখন তাণ্ডব চলছে। ফুসফুস ভরে একটা নিশ্বাস নেবে, সেই উপায়টুকুও যেন নেই। চারপাশের এই জমকালো আলো, মানুষের অবিরাম হাসির আওয়াজ—সবকিছু এক মুহূর্তে তার শ্রবণসীমার বাইরে চলে গেল। তার কেবল মনে হচ্ছিল, এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে সে নিজেকে কীভাবে রক্ষা করবে? অনামিকার হাত ছেড়ে অনু বলে উঠল,
— "দাঁড়া, রিদ মনে হয় পথ হারিয়ে ফেলেছে। আমি আসছি।"
কোথায় গেল রিদ? একটা উপহার নিয়ে আসতে এতক্ষণ লাগে? রিদ পাশে থাকলে অন্তত একটা ভরসা পাওয়া যেত। এহসানের ওই তীক্ষ্ণ চাউনি থেকে বাঁচতে অনু ব্যাকুল হয়ে দরজার দিকে তাকানোর চেষ্টা করল। আড়চোখে এদিক-ওদিক তাকিয়ে যখন সে রিদকে খুঁজছে, তখনই ভিড় এড়াতে পা বাড়াল হলের এক কোণায়—যেখানে আলোটা কিছুটা আবছা আর লোকজনের আনাগোনা কম। যদি ওদিক থেকে রিদকে আসতে দেখা যায়! ঠিক তখনই ঘটল কাণ্ডটা।
অনু কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ একটি শক্ত হাত এসে তার কবজিটা শক্ত করে চেপে ধরল। প্রতিবাদ করার বা কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়েই এক ঝটকায় তাকে টেনে নিয়ে গেল দেওয়ালের আড়ালে, আলো-আঁধারিতে ঢাকা এক নির্জন কোণায়। জায়গাটা মূল হলরুম থেকে কিছুটা দূরে, বাড়ির দরজার শেষ মাথায় হওয়ায় সেখানে তখন কোনো মানুষজন ছিল না।
আকস্মিক এই আক্রমণে অনু শিউরে উঠল। তার মুখ থেকে একটা চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে আসতেই আরেক হাত এসে চেপে ধরল অনুর মুখ। অবরুদ্ধ হয়ে গেল তার কণ্ঠ।অনু ভয়ে তার বড় বড় চোখ মেলে তাকাল।চোখ মেলতেই দেখল তার সামনে এহসান দাঁড়িয়ে আছে।
এতটাই কাছে দাঁড়িয়ে আছে এহসান যে তার তপ্ত নিশ্বাস অনুর কপালে এসে আছড়ে পড়ছে। এহসানের হাতের আঙুলগুলো অনুর কবজিতে এতটাই জোরে বসে গেছে যে সেখানে রক্ত চলাচল যেন বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
অনুর পুরো শরীর কাঁপতে লাগল। সে ছটফট করে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই এহসানের হাতের পাকড়াও আরও শক্ত হলো। এহসান আরো ঝুঁকে এল অনুর কানের কাছে ; তার কণ্ঠে ছিল বরফশীতল গাম্ভীর্য। অনুর কানের কাছে ঝুঁকে সে ফিসফিস স্বরে বলল,
"চুপ! একদম চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবি। একটা শব্দও যেন তোর মুখ থেকে না বের হয়। যদি একটা চিৎকার দেওয়ার চেষ্টা করিস, তবে এই ভরা মজলিসেই এমন কিছু করব যা তুই কল্পনাও করতে পারবি না। তখন লোক হাসাহাসি কাকে বলে, হাড়ে হাড়ে টের পাবি "
এহসানের রাগ দেখে অনুর সমস্ত শরীর অসাড় হয়ে গেল। এমনিতেই তার শরীর দুর্বল, তার ওপর এই আকস্মিক ভীতি তাকে পুরোপুরি ভেঙে ফেলল। সে অশ্রুসজল চোখে এহসানের দিকে তাকিয়ে রইল —
"ছাড়ুন আমাকে! বলছি ছাড়ুন! আমার হাতে খুব লাগছে!"
কিন্তু এহসান সিদ্দিকীর পাথুরে হৃদয়ে অনুর সেই আকুতি বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলল না। তার রক্তাভ চোখদুটো অনুর ভীতসন্ত্রস্ত মুখে স্থির। সেই দৃষ্টিতে ছিল দাউদাউ করে জ্বলা অভিমান, তীব্র ক্ষোভ আর হারিয়ে ফেলার অসহ্য যন্ত্রণা।
চোয়াল শক্ত করে এহসান ধীরে ধীরে বলল,
— "লাগছে? তোর হাতে ব্যথা লাগছে?" এহসান নিজের বুকের বাঁ পাশটায় আঙুল ঠেকিয়ে অনুর দিকে তাকিয়ে বলল,
— "তোর হাতে ব্যথা লেগেছে... কিন্তু এখানে? আমার এখানে লাগছে, এখানে যে প্রতিদিন একটু একটু করে সবকিছু ভেঙে যাচ্ছে, সেই ব্যথাটা কি কখনো অনুভব করেছিস?"
অনুর ফ্যাকাশে মুখটা ভয়ে আরও ছোট হয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে এহসানের দিকে তাকিয়ে রইল। এহসান তাকে 'তুই' করে সম্বোধন করল? এই প্রথম! এহসানের মুখে 'তুই' শব্দটা শুনে সে এতটাই অবাক হলো যে কয়েক মুহূর্তের জন্য তার ছটফটানিও থেমে গেল। কিন্তু অবাক ভাবটা কাটতে না কাটতেই তার ভেতর আবার ভয় ও অস্বস্তি ফিরে এলো। এহসানের শক্ত মুঠোয় তার কবজিটা এখনো বন্দি। অনু আবার মরিয়া হয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। সে মোচড়া-মুচড়ি করে তার হাতটা এহসানের গ্রিপ থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু এহসানের গায়ের শক্তির সামনে তার দুর্বল প্রচেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হলো।
অনু আকুতিভরা চোখে এহসানের দিকে তাকিয়ে, খুব ক্ষীণ স্বরে বলে উঠলো,
—"আমাকে ছেড়ে দিন... কেউ দেখে ফেলবে।"
কিন্তু এহসানের কোন ভাবান্তর হলো না। তার জ্বলন্ত চোখ দুটো অনুর ওপর নিবদ্ধ রইল, যেখানে কেবলই তীব্র ক্ষোভ আর এক চরম অধিকারবোধ খেলা করছে।এহসান অনুর মোচড়া-মুচড়ি দেখে একটু বাঁকা হাসল। সে আরও একটু ঝুঁকে এসে অনুর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
—"ছাড়ব না। কিছুতেই ছাড়ব না। তুই কী ভেবেছিস? আমাকে এড়িয়ে চলে যাবি? কাকে বলে পালিয়ে গিয়েছিলি? কোথায় ছিলি এতদিন?আর ওই ছেলেটার সঙ্গে তোর কীসের এত সম্পর্ক? কে সে? কেন ওর সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছিলি? উত্তর দে,আমি সব জানতে চাই।"
এহসানের প্রশ্নগুলো শেষ হতেই অনুর বুকের ভেতর জমে থাকা রাগ যেন এক মুহূর্তে বিস্ফোরিত হলো। সে ঝটকা দিয়ে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। চোখ দুটো ক্রোধে লাল হয়ে উঠেছে।
"রিদকে নিয়ে কী ভেবেছেন আপনি? ও আমার ছোট ভাইয়ের মতো! আপনার মাথায় যা আসে তাই ভাববেন?"এক মুহূর্ত থেমে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এহসানের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
"আর আমি কোথায় ছিলাম, কার সঙ্গে ছিলাম, কেন ছিলাম— তার জবাব আপনাকে দিতে আমি বাধ্য নই।কোন অধিকারে এসব প্রশ্ন করছেন আপনি, মিস্টার এহসান সিদ্দিকী? আপনি আপনার অধিকার অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছেন।"
অনুর কথা শুনে আর ছটফটানি দেখে এহসানের ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। সে হাতটা না ছেড়ে বরং আরও একধাপ এগিয়ে এসে অনুকে দেয়ালের সাথে পুরোপুরি চেপে ধরল।
—"এত ছটফট করছিস কেন, হ্যাঁ? এই পালানোর স্বভাবটা তোর কবে যাবে ? তখনো মাঝপথে না বলে পালিয়ে গেলি, আজকে আবারো পালিয়ে যেতে চাচ্ছিস?"
এহসানের কথায় অনু মাথাটা সোজা করে এহসানের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার কণ্ঠে শত দুর্বলতার মাঝেও এক অদ্ভুত তেজ ফুটে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে স্পষ্ট গলায় বলল,
—" আমি বললাম না, আমি আপনার কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে আপনার কাছে বাধ্য নই, হাতটা ছাড়ুন আমার!"
—"তুই বাধ্য! তুই আমার প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য, তুই কী ভেবেছিস, এভাবে লুকিয়ে আর পালিয়ে তুই পার পেয়ে যাবি? তুই ভুলছিস কেন — তুই আমার বিবাহিত স্ত্রী"
'বিবাহিত স্ত্রী'—শব্দ দুটো কানে আসতেই অনু মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। চোখের পলক পর্যন্ত পড়তে ভুলে গেল সে। যেন কথাগুলোর অর্থ বুঝে উঠতে তার কয়েক সেকেন্ড সময় লেগে গেল।
বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল। জ্বরের ঘোরে এমনিতেই শরীরটা দুর্বল ছিল, তার ওপর এহসানের মুখে হঠাৎ এমন দাবি শুনে সে কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রইল।
বিস্ময় আর অস্বস্তি মিশ্রিত দৃষ্টিতে শুধু তাকিয়ে রইল এহসানের দিকে।কিন্তু পরক্ষণেই, এহসানের কথায় অনুর চোখেমুখে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ল। মুহূর্তেই ভয়কে ছাপিয়ে গেল তার জেদ আর অপমানবোধ। সে আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না । সমস্ত শক্তি একত্র করে দু'হাত দিয়ে এহসানের বুকে সজোরে ধাক্কা দিল।
অপ্রত্যাশিত এই ধাক্কায় এহসান সামান্য পিছিয়ে গেল। তার হাতের গ্রিপটা একটু ঢিলে হতেই অনু নিজের হাতটা এক ঝটকায় টেনে ছাড়িয়ে নিল। সে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে হাঁপাতে লাগল। তার গাল দুটো রাগে আর জ্বরের উত্তাপে লাল হয়ে উঠেছে, বুকের ভেতরটা ওঠানামা করছে প্রবলভাবে।অনু এহসানের চোখে চোখ রেখে কাঁপা অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
—"আপনি ভুলে যাচ্ছেন এহসান সিদ্দিকী... আমাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে! আপনি আর আমি সম্পূর্ণ দুজন আলাদা মানুষ। আমার ওপর জোর খাটানোর কোনো অধিকার আপনার নেই!"
অনুর মুখে 'ডিভোর্স' শব্দটা শুনে এহসান কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখে কোনো রাগ, বিস্ময় কিংবা প্রতিক্রিয়া ফুটে উঠল না। শুধু চোখ দুটো স্থির হয়ে রইল অনুর দিকে।
তারপর হঠাৎই ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক তাচ্ছিল্যভরা হাসি ফুটে উঠল।মৃদু হেসে মাথাটা সামান্য কাত করল সে। সেই হাসিতে উষ্ণতার লেশমাত্র ছিল না... বরং ছিল এক অদ্ভুত শীতলতা, যা অনুর বুকের ভেতর অকারণ অস্বস্তি ছড়িয়ে দিচ্ছিল ।
এহসান মাথাটা সামান্য কাত করে অনুর দিকে এগিয়ে এলো। তার চোখের সেই আক্রোশ যেন হাসির আড়ালে আরও তীব্র রূপ নিল।
"ডিভোর্স?" রূপকথা ... তুই সত্যিই অনেক সরল। তুই কি ভেবেছিস, একটা কাগজে সই করে পাঠিয়ে দিলেই আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে?এত সহজে এহসান সিদ্দিকী তার স্ত্রীকে ছেড়ে দেবে— এই বিশ্বাস তোর হলো কী করে?"
এহসান ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত, অর্থহীন হাসি। অনুর বিস্ময়ে জমে থাকা মুখটার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে সে শান্ত স্বরে বলল,
— "ডিভোর্স..."শব্দটা যেন ইচ্ছে করেই টেনে উচ্চারণ করল সে।একটা কথা বল তো, ডিভোর্সের কাগজে আমার সই করা কপিটা কোনোদিন তোর হাতে এসেছিল?"
উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে আবার বলল,
"একবারও কি খেয়াল করেছিলি, আমি স্বাক্ষর দিয়েছি কিনা ?"এবার তার কণ্ঠে দৃঢ়তা স্পষ্ট হয়ে উঠল।
"কারণ আমি কোনো কাগজে সই করিনি।আমার সম্মতি ছাড়া, আমার স্বাক্ষর ছাড়া... ডিভোর্সটা হলো কীভাবে?"
এহসানের কথাগুলো শুনে অনু একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল।তার ঠোঁট নড়ল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। বিস্ময়ে বড় হয়ে যাওয়া চোখ দুটো শুধু এহসানের মুখের দিকেই স্থির হয়ে রইল,
কথাগুলো মাথার ভেতর বারবার ঘুরে বেড়াতে লাগল।
এহসান... সই করেনি?
হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল সেদিনের কথা। বাবা শুধু বলেছিলেন, "সব শেষ হয়ে গেছে।" এরপর ডিভোর্সের কাগজ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু আর কোনোদিন সেই বিষয় নিয়ে একটি কথাও বলেননি। অনুও আর জানতে চায়নি। ভেবেছিল, সব আনুষ্ঠানিকতা নিশ্চয়ই শেষ হয়ে গেছে।
কিন্তু...যদি এহসানের কথাই সত্যি হয়?তাহলে...
তাদের আইনগতভাবে এখনো ডিভোর্সই হয়নি? এখনো তারা স্বামী-স্ত্রী....
অনু কিছু বলতে উদ্যত হতেই এহসান তাকে থামিয়ে দিল। ধীর পায়ে আরও কাছে এসে এক হাত বাড়িয়ে অনুর থুতনিটা দৃঢ়ভাবে তুলে ধরল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনুকে তার চোখের দিকে তাকাতে হলো।
দুজনের মাঝের দূরত্ব তখন প্রায় নেই বললেই চলে। এহসানের কঠিন দৃষ্টি অনুর চোখের গভীরে স্থির হয়ে রইল।
—"আর সবচেয়ে বড় কথা কী জানিস? সামান্য একটা মেয়ে হয়ে আমাকে ডিভোর্স দেওয়ার সাহস তোর হলো কীভাবে? এহসান সিদ্দিকীকে ছেড়ে চলে যাওয়ার স্পর্ধা তোকে কে দিল? এত বড় সাহস তুই কোথায় পেলি?"
অনুর চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়ল। এহসানের আঙুলের চাপ তার গাল বেয়ে নামা অশ্রুকে ছুঁয়ে গেল। অনু এতক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে এহসানের দেওয়া প্রতিটা অপমানের আঘাত নিজের বুকে হজম করছিল। ভেতরে ভেতরে একটা প্রবল ক্ষোভ জমা হচ্ছিল তার, যা এবার আর সে চেপে রাখতে পারল না। অনু ঝটকা দিয়ে এহসানের হাত সরিয়ে দিল। এতক্ষণ যে ভয় আর অসহায়ত্ব তাকে গ্রাস করে রেখেছিল, সেগুলো যেন মুহূর্তেই চাপা পড়ে গেল তীব্র আত্মসম্মানের কাছে।
অনু হঠাৎ করে চেঁচিয়ে উঠল,
"লজ্জা করে না আপনার, এহসান সিদ্দিকী? 'আমার মতো মেয়ে' বলতে কী বোঝাতে চান? আমি সামান্য একটা মেয়ে আর আপনি বুঝি আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো মহাপুরুষ? নিজের চরিত্রটা একবার আয়নায় দাঁড়িয়ে দেখেছেন? নাকি নিজের দোষগুলো আপনার চোখে পড়ে ?"
অনুর বুকটা রাগে আর হাঁপানিতে প্রবলভাবে ওঠানামা করতে লাগল। সে আর এহসানের কোনো বাধা মানল না। আঙুল উঁচিয়ে সরাসরি এহসানের বুকে ধাক্কা মারতে মারতে বলতে লাগল,
“অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে রাত কাটিয়েছেন আপনি! একই বিছানায় তাকে জড়িয়ে ধরে সকাল করেছেন! কী ভেবেছিলেন? অনু কিছুই জানে না? অনু এতটাই বোকা যে সবকিছু ভুলে গিয়ে আবার আপনার কথায় বিশ্বাস করবে? নিজের সেই নোংরা চরিত্রের দাগ ঢাকতে আজ আমার ওপরই পুরুষত্ব দেখাতে এসেছেন? লজ্জা করে না আপনার, এহসান সিদ্দিকী? একটুও লজ্জা হয় না?”
অনুর প্রতিটি কথাই এহসানের কানে পৌঁছাচ্ছিল, কিন্তু কোনো কথারই অর্থ যেন মাথায় ঢুকছিল না। ও স্তব্ধ চোখে অনুর দিকে তাকিয়ে রইল। ভ্রু কুঁচকে গেল বিভ্রান্তিতে।
“কোন মেয়ে...? কী বলছ তুমি? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, রূপকথা। কোন মেয়ের কথা বলছ?”
কিন্তু অনু থামল না। তার ভেতরের দীর্ঘ ৯ মাসের জমে থাকা সব ক্ষোভ, অপমান আর ঘৃণা তখন বাঁধ ভেঙে বেরোচ্ছে।
“আপনি একজন চিটার, এহসান সিদ্দিকী। একজন প্রতারক!” অনুর কণ্ঠটা রাগে আর অপমানে কাঁপছিল। “আমার বেলায় ষোলো আনা নিয়ম! এটা করা যাবে না, ওটার সঙ্গে কথা বলা যাবে না, ওখানে যাওয়া যাবে না... অথচ নিজের বেলায়? নাইসার সঙ্গে রাত.... ”
শেষের কথাটা আর পুরো করতে পারল না অনু। গলা ভারী হয়ে এল। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু জোর করেও আটকে রাখতে পারল না।
দ্রুত পায়ে কয়েক কদম এগিয়ে গেল সে। তারপর হঠাৎ থেমে পেছন ফিরে তাকাল।
“ডিভোর্সের কাগজটা পাঠিয়ে দেবেন। আমি আর আপনার সংসার করব না।”
এহসানের মাথার ওপর দিয়ে যেন সবকিছু চলে যাচ্ছিল। অনুর বলা প্রতিটি শব্দ বারবার কানে বাজছিল।
নাইসা...! পরক্ষণেই এহসানের মনে হলো, সব রহস্যের জট যেন খুলে গেছে।
ওহ শিট! তাহলে নাইসা নিশ্চয়ই এমন কিছু বলেছে, যার কারণে রূপকথা ভুল বুঝেছে!
এহসানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে অনুর পেছনে ছুটে যেতে চাইল। কিন্তু ততক্ষণে অনু অনেক দূরে চলে গেছে। চারদিকে চোখ বুলিয়েও তাকে আর কোথাও দেখতে পেল না এহসান ।হতাশা আর ক্ষোভে এহসানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। মুঠোবদ্ধ হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। রাগে সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল।
এক মুহূর্তও আর সেখানে দাঁড়িয়ে রইল না সে। কাউকে কিছু না বলেই দ্রুত পায়ে পার্টি থেকে বেরিয়ে গেল সে। এখন তার মাথায় একটাই চিন্তা—যেভাবেই হোক, এই ভুল বোঝাবুঝির শেষ তাকে করতেই হবে। কিন্তু তার আগে সবকিছু জানতে হবে...
#নিভৃতে_যত্নে_রাখা_প্রিয়তমা
#মারিয়াম_ফুল
পর্ব ৩২