ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিভৃতে যত্নে রাখা প্রিয়তমা

৩৩তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম ফুল

কাউকে কিছু না বলে পার্টি থেকে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে নিজের গাড়িতে এসে বসল এহসান। দুই হাতে স্টিয়ারিং হুইলটা শক্ত করে চেপে ধরে কপালে ঠেকিয়ে রাখল সে। অনুর কান্নায় ভেজা লালচে চোখ দুটো আর শেষ কথাগুলো তার মাথায় হাতুড়ির মতো আঘাত করছে।

"নাইসার সঙ্গে রাত..."
এই একটা নাম এহসানের মাথার ভেতরের সব সমীকরণ ওলটপালট করে দিল। এত মাস ধরে সে ভেবে এসেছে অনু তাকে ভালো না বেসে, কোনো এক অজানা অভিমানে বা অবহেলায় ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু আজ অনু যে অভিযোগ তুলল, তা শুধু গুরুতর নয়, এহসানের আত্মসম্মানে সরাসরি আঘাত করেছে।
গাড়ির রিয়ারভিউ মিররে নিজের চেহারাটার দিকে তাকাল এহসান। এতক্ষণ অনুর ওপর যে রাগ আর জেদ তাকে অন্ধ করে রেখেছিল, তা যেন নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠল অনুর সেই কাঁপতে থাকা দুর্বল শরীর, জ্বরের ঘোরে লাল হয়ে যাওয়া গাল আর চোখ ভরা জল।
অনু তাকে এতটা ভুল বুঝে, নিজের বুকে এত বড় একটা পাথর চেপে গত নয়টা মাস পার করে দিয়েছে? এহসান স্টিয়ারিং হুইলে আলতো করে কপাল ঠেকিয়ে নিজেকে মনে মনে বলল,
"অনেক পালিয়েছ রূপকথা, আর নয়। তুমি আমার স্ত্রী ছিলে, আছ আর থাকবে। তোমাকে এই নরক যন্ত্রণার মধ্যে আমি আর এক মুহূর্তও রাখতে চাই না। এই নোংরা খেলা যে-ই খেলে থাকুক, তার শেষ আমি দেখে ছাড়ব। তোমার চোখের প্রতিটা ফোঁটা জলের হিসাব আমি নেব।"
এহসানের দুই হাত স্টিয়ারিং হুইলে আরও শক্ত হয়ে বসল। দাঁতে দাঁত চেপে সে এক্সিলারেটরে চাপ দিল। গাড়িটা তীব্র গতিতে ছুটে চলল অন্ধকার রাস্তা চিরে, নাইসার অ্যাপার্টমেন্টের উদ্দেশ্যে। 
অন্যদিকে, অনু যখন টালমাটাল পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তার মনে হচ্ছিল চারপাশের জমকালো আলো আর মানুষের হাসির শব্দগুলো তাকে পিষে ফেলছে। ঠিক তখনই তার ঝাপসা চোখের সামনে ভেসে উঠল রিদের অবয়ব। রিদ হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে
 ঢুকছিল ।
রিদকে দেখামাত্রই অনুর ভেতরের এতক্ষণের চেপে রাখা ভয়, অপমান আর কান্নার শেষ বাঁধটুকু রাগে পরিণত হলো। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। দ্রুত পায়ে রিদের সামনে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ধরা গলায় বলল,
"কোথায় ছিলি তুই এতক্ষণ, হ্যাঁ? আমাকে একা ফেলে কোথায় চলে গিয়েছিলি? একটা সামান্য উপহার নিয়ে আসতে তোর এত সময় লাগে?"
অনুর কণ্ঠস্বরে রাগের চেয়ে বেশি ছিল অসহায়ত্ব, যা রিদের নজর এড়াল না। কিন্তু পরিস্থিতি হালকা করতে সে দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণ করার ভঙ্গিতে একটু রসিকতা করে বলল,
 "আরেহ মেরি মা! শান্ত হও। একটু নিশ্বাস তো নাও! গাড়ির চাবিটা পকেট থেকে কখন যে পড়ে গিয়েছিল, টেরই পাইনি। ওটা খুঁজতেই জান বেরিয়ে গেছে। তাই একটু লেট হলো। কিন্তু তুই এভাবে কাঁপছিস কেন? আর চোখ-মুখ এত লাল হয়ে আছে কেন?"
অনু রিদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিল না। তার মাথায় তখন কেবল এহসানের 'বিবাহিত স্ত্রী' দাবি করার তীব্র কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। অনু শুধু বলল 
— "আমি বাড়ি যাব,এখনই।"
রিদ বেশ অবাক হলো। মাত্র কিছুক্ষণ আগেই অনুকে নিয়ে সে এখানে এসেছে। সে কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
 "কেন? এই তো মাত্র এলি! অনামিকা কত আশা করে তোকে ডাকল..."
অনু রিদকে রাগ দেখিয়ে বলল, "আমি বাড়ি যাব মানে যাব, রিদ! আমার এখানে একদম ভালো লাগছে না। শরীরটাও খুব খারাপ লাগছে। তুই যদি না যাস, আমি একাই চলে যাব।"
রিদ লক্ষ্য করল অনুর ফ্যাকাশে ঠোঁট আর কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম। আসার পথে সে এহসানকে খুব রুদ্রমূর্তি ধারণ করে পার্কিংয়ের দিকে চলে যেতে দেখেছিল।
 এহসানের সেই ক্ষিপ্ত চেহারা আর এখন অনুর এই ছটফটানি—দুটো মিলিয়ে রিদ মনে মনে একটা আঁচ করতে পারল। তবে সে অনুকে আর ঘাঁটাতে চাইল না।
— "আচ্ছা বাবা, চল। তবে আসার পথে অনামিকা কত খুশি হয়েছিল তোকে দেখে। ওর থেকে অন্তত বিদায়টা নিয়ে চল, নইলে মেয়েটা কষ্ট পাবে।"
অনু বাধ্য মেয়ের মতো শুধু আলতো করে মাথা দোলাল।
ওদিকে অনামিকা গেস্টদের সাথে দাঁড়িয়ে বেশ হাসিমুখে গল্প করছিল। অনু তার কাছাকাছি গিয়ে খুব সন্তর্পণে তার হাতটা ছুঁল।
— "অনামিকা..."
গেস্টদের আড্ডার মাঝখান থেকে অনামিকা ঘুরে তাকাল। অনুর মুখটা দেখে তার হাসিটা একটু থমকে গেল। অনু কোনোমতে ঠোঁটে জোর করে একটা হাসি টেনে বলল,
— "তোর অনুরোধেই এসেছিলাম রে। কিন্তু আমার হঠাৎ শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। আমি আর থাকতে পারছি না, বাড়ি চলে যাচ্ছি।"
অনামিকা ভীষণ হতাশ হয়ে অনুর হাত দুটো চেপে ধরল। "এই, সে কী রে! এই তো মাত্র এলি, এখনই চলে যাবি? অভি তো এখনো এসে পৌঁছালই না! আমাদের কত প্ল্যান আছে আজ। প্লিজ, আর কিছুক্ষণ থাক না!"
কিন্তু অনু কোনোমতেই আর এক মুহূর্তের জন্যও এই দমবন্ধ করা ছাদের নিচে থাকবে না। তার মনে হচ্ছে এহসান যেকোনো সময় আবার দেওয়ালের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে তার হাত চেপে ধরবে। সে অনামিকার হাত ধরে প্রায় আকুতি করে বলল,
 "প্লিজ অনামিকা, আমাকে আর আটকাস না। শরীরটা আসলেই খুব খারাপ লাগছে। প্রমিস করছি, পরে ইউনিভার্সিটিতে তোর সাথে অনেক সময় কাটাব।"
ঠিক সেই মুহূর্তেই অনামিকাদের আড্ডার দিকে হেঁটে আসছিল জেড। কিন্তু অনুকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার পায়ের গতি আচমকা থমকে গেল। নিজের চোখ দুটোকে সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। দীর্ঘ নয়টি মাস! নয়টি মাস ধরে তারা যাকে হন্যে হয়ে খুঁজেছে, যে মেয়েটি এহসানের জীবনটাকে এক লহমায় বিষাদময় করে উধাও হয়ে গিয়েছিল, সে আজ তাদের এত কাছে দাঁড়িয়ে।জেডের মাথায় তখন হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
'অনু! এত দিন পর? এহসান কি জানে ও এখানে এসেছে? ও যদি অনুকে দেখে ফেলে তবে তো আজ এখানে কুরুক্ষেত্র হয়ে যাবে '
চিন্তাটা মাথায় আসতেই জেড অস্থির হয়ে চারদিকে চোখ বোলাতে লাগল। এহসানের দীর্ঘ দীর্ঘকায় শরীরটা ভিড়ের মাঝে খোঁজার চেষ্টা করল সে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, পুরো হলের কোথাও এহসানকে দেখা গেল না।অনামিকা জেডকে এভাবে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কনুই দিয়ে আলতো করে একটা ধাক্কা দিল।
— "কী হলো জেড? এভাবে হাঁ করে কী দেখছ? এই দেখো, অনু এসেছে।"
অনামিকার ধাক্কায় জেড যেন সম্বিৎ ফিরে পেল। সে কী বলবে, কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সব গুলিয়ে ফেলল। নিজের ভেতরের অস্থিরতা আড়াল করে কোনোমতে ঠোঁট কামড়ে স্বাভাবিক গলায় বলল,
— "হ্যাঁ... হ্যাঁ অনু। কেমন আছ তুমি?"
অনু শুধু সৌজন্যমূলক একটা মাথা নাড়াল। তার চোখ-মুখের অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছিল সে এখন এখান থেকে পালাতে পারলে বাঁচে। সে অনামিকাকে বিদায় জানিয়ে বলল, "আমি আসছি রে।"
জেড এবার একটু কৌতূহল আর সংশয় নিয়ে বলে উঠল, "কিন্তু অনু, এখনই চলে যাবে কেন? পার্টির তো এখনো বাকি!"
অনু বেশ অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে বলল, "আসলে ভাইয়া... শরীরটা হঠাৎ খুব খারাপ লাগছে। আমি বাড়ি যাচ্ছি। পরে কোনো একদিন কথা হবে।"
জেড আর জোর করল না। অনু আর রিদ যখন ধীর পায়ে হলের মূল দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ভিড়ের ওপাশ থেকে নীল দূর থেকে অনুকে দেখে ফেলল।
দীর্ঘ নয়টি মাস পর অনুর ওপর চোখ পড়তেই নীলের বুকের ভেতরটা যেন এক অজানা, তীব্র যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল। এতগুলো দিন ধরে সে নিজের ভেতরে যে ক্ষতটাকে লুকিয়ে রেখেছিল, আজ অনুকে দেখামাত্রই তা যেন আবার তাজা হয়ে উঠল। অনুকে খোঁজার জন্য সে-ও তো কম চেষ্টা করেনি! সে অবশ পায়ে অনুর দিকে এগিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু সে দু-পা বাড়াতেই পেছন থেকে আহিয়ান আর সাজিদ এসে তাকে জাপটে ধরল।
আহিয়ান বেশ উত্তেজিত গলায় বলে উঠল,
— "ওই নীল! ভেতরে চল, গ্রুপ ছবি তুলব। আর এহসান কোথায় বল তো? তোদের দুটোর কাউকেই খুঁজে পাচ্ছি না এতক্ষণ ধরে!"
নীল ছটফট করে বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল। কিন্তু ভিড়ের চাদর ভেদ করে সে দেখল, দরজার বাইরে অনুর অবয়বটা মিলিয়ে যাচ্ছে। অনু আর সেখানে নেই।
নীল তীব্র বিরক্তিতে সাজিদের হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল,"আরে ছাড় তোরা! আমার একটা জরুরি কাজ আছে।"
সাজিদ হেসে উঠে নীলকে টেনে ধরে বলল,
— "আরে রাখ তোর কাজ! আগে ছবি তোলা হবে, তারপর অন্য কিছু। চল।" তারা দুজনে একপ্রকার জোর করেই নীলকে ভেতরে টেনে নিয়ে গেল। এত দিন পর অনুকে চোখের সামনে দেখেও তার সাথে একটা কথাও বলতে পারল না—এই তীব্র আক্ষেপ আর এক বুক ভারী কষ্ট নিয়ে নীল ভিড়ের মাঝে হারিয়ে গেল।
এদিকে, জেড সুযোগ বুঝে ভিড় থেকে একটু আড়ালে চলে গেল। পকেট থেকে ফোনটা বের করে সে দ্রুত এহসানের নম্বরে ডায়াল করল। ফোনের ওপাশ থেকে রিং হয়েই চলল, কিন্তু এহসান ফোনটা ধরল না। জেড পরপর আরও দুবার চেষ্টা করল, কিন্তু ফলাফল একই।
ফোনটা কান থেকে নামিয়ে জেড অন্ধকার বারান্দার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে মনে মনে ভাবল,
'এহসান হয়তো অনুকে দেখেই পার্টি থেকে এভাবে কাউকেই কিছু না বলে চলে গেছে। কিন্তু ও এখন কোথায় গেল?
রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ঘড়ির কাঁটা তখন ঠিক বারোটার ঘর ছুঁয়েছে। শহরের পথগুলো যখন ক্রমশ জনশূন্য হয়ে আসছিল, ঠিক তখনই নাইসার অ্যাপার্টমেন্টের নিচে এসে থামল এহসানের গাড়ি। গাড়ি থেকে নেমে এহসান সোজা ওপরে উঠে গেল। তার ভেতরের জ্বলতে থাকা ক্ষোভ আর অস্থিরতা তখন এতটাই তীব্র যে, সে কোনো লৌকিকতার তোয়াক্কা করল না। নাইসার ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে অনবরত কলিংবেল চাপতে লাগল এবং একপর্যায়ে দরজায় সজোরে আঘাত করতে শুরু করল।
ভেতর থেকে চিৎকার আর চেঁচামেচির শব্দ পেয়ে নাইসা হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এলো। দরজা খুলতেই সে দেখল এহসান দাঁড়িয়ে আছে...চোখ দুটো রক্তাভ, নিশ্বাস তীব্র আর ভারী। এহসান কেন এত রাতে এভাবে চেঁচামেচি করছে, নাইসা প্রথমে তা বুঝতে পারল না।
গত দীর্ঘ নয়টি মাস ধরে নাইসা কতবার চেষ্টা করেছে এহসানের সাথে একটু যোগাযোগ করতে, কিন্তু এহসান প্রতিবারই তাকে চরম অবহেলায় এড়িয়ে গেছে। এমনকি নাইসা তার বাবাকে দিয়ে এহসানের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাবও পাঠিয়েছিল। কিন্তু রশীদ সিদ্দিকী সরাসরি জানিয়ে দিয়েছিলেন—এহসান এই বিয়েতে রাজি নয়। এহসান নিজে পরিষ্কার ভাষায় বলে দিয়েছিল, সে নাইসাকে কোনোদিন বিয়ে করবে না। এত কিছুর পর এহসানের ওপর নাইসার তীব্র ক্ষোভ আর বিরক্তি ছিল, তবুও এই অসময়ে তাকে নিজের দরজায় দেখে নাইসা কিছুটা সংযত হয়ে এগিয়ে গিয়ে বলল,
"কী হয়েছে এহসান? এত রাতে তুমি এখানে? এভাবে সিন ক্রিয়েট করছ কেন?"
এহসান নাইসার কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার বা তার মান-অভিমান শোনার প্রয়োজনই মনে করল না। সে শুধু নাইসার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বরফশীতল কণ্ঠে বলল,
— "তুমি রূপকথাকে কী বলেছ, নাইসা?"
নাইসা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের ভাবান্তর আড়াল করে, মুখে এক কৃত্রিম বিস্ময় ফুটিয়ে অবজ্ঞার ভঙ্গিতে বলল,
 "কে...? কে রূপকথা? আমি কোনো রূপকথা-টুপকথাকে চিনি না। তুমি কার কথা বলছ, এহসান?"
এহসানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে এক পা এগিয়ে এসে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
 "আমার লিগ্যাল ম্যারেড ওয়াইফ—আমার বিবাহিত স্ত্রীর কথা বলছি! ভালো করেই চেনো তাকে। স্পষ্ট করে বলো, তুমি আমাদের সম্পর্ক নিয়ে ওর কাছে কী বিষ উগরেছ?"
নাইসা এবার যেন আকাশ থেকে পড়ল। চোখ দুটো বড় বড় করে বলল,
"তুমি বিবাহিত, এহসান? ওহ গড! তুমি বিয়ে করেছ?"
এহসানের ধৈর্যের বাঁধ এবার পুরোপুরি ভেঙে গেল। সে ঘর কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল,
 "একদম চুপ! একদম চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবে। আমার সামনে এই ভালো সাজার নাটক করার চেষ্টা অন্তত করবে না, নাইসা! সত্যি করে বলো কী বলেছ তাকে? কী ভেবেছ তুমি? ওকে আমার জীবন থেকে সরিয়ে দিলে আমি তোমাকে সাদরে গ্রহণ করে নেব? তোমাকে বিয়ে করব? তোমার মতো একটা থার্ড ক্লাস মেয়েকে?"
'থার্ড ক্লাস' শব্দটা শুনতেই নাইসার ভেতরের ইগোতে তীব্র আঘাত লাগল। তার মুখের রূপটা বদলে গিয়ে সেখানে এক হিংস্র জেদ ফুটে উঠল। সে আর কোনো লুকোছাপা না করে চিৎকার করে বলে উঠল,
 "হোয়াট ডু ইউ মিন বাই থার্ড ক্লাস, হ্যাঁ? যা করেছি, বেশ করেছি! খুব ভালো করেছি! যে জিনিস আমার হতে পারল না, সেই জিনিস আমি অন্য কারও হতে দেব না। এতগুলো বছর ধরে আমি তোমাকে ভালোবেসে এসেছি, পছন্দ করে এসেছি। আর তুমি মাঝখান থেকে অন্য একটা মেয়েকে এনে বিয়ে করে সংসার করবে, আর আমি তা মুখ বুজে মেনে নেব? কক্‌খনো না!"
এহসান রাগে জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে লাগল। তার ইচ্ছে করছিল নাইসাকে একটা থাপ্পড় মারতে,কিন্তু কোনো নারীর গায়ে হাত তোলা তার নীতি, মূল্যবোধ আর বিবেকের বিরুদ্ধে।সে নিজেকে কোনোমতে সংযত করে বলল,
 "আমি কি তোমাকে আগেই পরিষ্কার বলে দিইনি যে আমি তোমাকে কোনোদিন বিয়ে করব না? তাহলে এই নোংরামি কেন করলে?"
নাইসা এবার এক অদ্ভুত, তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে উঠল। 
— "এখন আমার ইগো স্যাটিসফাইড হয়েছে, এহসান সিদ্দিকী!
ভালোবাসার বিনিময়ে কষ্ট পেলে মানুষ কতটা অসহায় হয়ে যায়, বুঝতে পেরেছ?তুমি তখন আমার মুখের ওপর 'না' করে দিয়েছিলে। আমার ভালোবাসাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলে। তুমি আমাকে বিয়ে করবে কি না, তা তো পরের কথা—আমিই তোমাকে আর বিয়ে করব না! কিন্তু একটা কথা ভেবে দেখেছ? তুমি কেমন মেয়েকে ভালোবেসেছিলে, যে তোমাকে ন্যূনতম বিশ্বাসটুকুও করল না? একটা সামান্য নাটক সাজিয়েছিলাম, আর তাতেই সে তোমাকে ছেড়ে পালিয়ে গেল" 
নাইসা দীর্ঘ একটা শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলে আবার বলল,
 "তোমার ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট একদম নষ্ট করে দিয়ে এসেছি তোমার ওই আদরের বউয়ের কাছে। শুনেছ তো সব? এবার যাও, গিয়ে ওকে সামলাও!"
নাইসার মুখে সত্যটা শুনে এহসান স্তব্ধ হয়ে গেল।রেগে গিয়ে সে পাশে থাকা কাঁচের ফুলদানি রাখা টেবিলটাতে সজোরে একটা লাথি মারল। বিকট শব্দে টেবিলটা ভেঙে একাকার হয়ে গেল। এহসান বুক ভরে একটা তপ্ত নিশ্বাস ফেলে বলল,
 "যা করেছ, একদম ঠিক করোনি নাইসা। কিন্তু তুমি আমাদের এই গোপন বিয়ের খবর জানলে কীভাবে? কে বলল তোমাকে?"
নাইসা হালকা ভ্রু কুঁচকে মাথাটা একপাশে কাত করল। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যমিশ্রিত হাসি টেনে বলল,
 "সুযোগ বুঝে একদিন তোমার ফোনের অ্যাক্সেস নিয়ে নিয়েছিলাম, এহসান। ওখান থেকেই সব জেনেছি।"
এতক্ষণ নাইসার ওপর রাগ থাকলেও, ধীরে ধীরে সেই রাগের জায়গা দখল করে নিল একরাশ করুণা।এহসান মুহূর্তের মধ্যেই শান্ত হয়ে গেল। কণ্ঠস্বর নরম করে বলল
— "কী লাভ হলো নাইসা? জেদের বশে এত বড় একটা নোংরা কাজ করে তোমার কী লাভ হলো? আমি কোনোদিন তোমার ছিলাম না, আর কোনোদিন তোমার হবও না। আমি তোমাকে কোনোদিন কোনো প্রতিশ্রুতিও দিইনি। ইউ ডিজার্ভ বেটার, নাইসা। সবাই সবার জন্য হয় না।"
এক মুহূর্ত থামল এহসান। তারপর নাইসার চোখের দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো বলল,
 "তোমার অনুভূতিতে আঘাত লেগেছিল, তার জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত। কিন্তু তুমি যে পথটা বেছে নিলে, তা কেবল আমাদের জীবন নয়, তোমার জীবনে কষ্ট বয়ে আনত.. .. ধরো, তুমি আমাকে বিয়ে করে নিলে... তারপর? তারপর সারাজীবন আমার চোখে ভালোবাসা খুঁজলে , বদলে শুধু অবহেলাই পেয়ে যেতে ..."
এইটুকু বলে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না এহসান। এতক্ষণ নাইসার সঙ্গে তার বলা প্রতিটি কথাই সে রেকর্ড করে রেখেছে, যাতে কোনো কিছু অস্বীকার করার সুযোগ না থাকে। পকেট থেকে ফোনটা বের করে রেকর্ডিংটা চেক করে নিল সে। তারপর আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরল। 
নাইসা স্তব্ধ হয়ে পেছনের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে আশা করেছিল এহসান হয়তো ফিরে তাকাবে, কিন্তু এহসান একবারের জন্যও পেছন ফিরে তাকাল না। নাইসার চোখ দিয়ে এবার টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে এহসানকে ভালোবেসেছিল, হয়তো তার ভালোবাসার পদ্ধতিটা ভুল ছিল, কিন্তু ভালোবাসাটা মিথ্যা ছিল না। যখন এহসান তার মুখের ওপর তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, সেই অপমান সে সহ্য করতে পারেনি। নাইসা যা করেছে, তার জন্য জন্য নাইসা মনে মনে বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত নয়। সে অশ্রুসজল চোখে এহসানের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
চলবে 
#নিভৃতে_যত্নে_রাখা_প্রিয়তমা
#মারিয়াম_ফুল।
পর্ব: ৩৩

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন