রিদ আগে থেকেই গাড়িতে গিয়ে বসেছিল। গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে অনুর বুকের ভেতরে নানা অনুভূতির ঝড় বইছিল।
সে নিজেকেই মনে মনে বকছিল—সত্যিই সে একটা বোকা! এহসান তাকে ভুল কিছু বলে না। কীভাবে সে এহসানকে বিশ্বাস না করে এত বড় ভুলটা করতে পারলো? তবে আবার মনকে সান্ত্বনা দিল, সে তো বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে চলে যায়নি; সে তো শেষ চেষ্টা হিসেবে এহসানদের বাড়িতে গিয়েছিল। কিন্তু এহসানের বাবা-ই তো তাকে অপমান করে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন.... চোখের জল মুছতে মুছতে এসব চিন্তায় নিমজ্জিত অনু গাড়ির দরজার কাছে পৌঁছাল। রিদ সামনের সিটে বসে ছিল। অনু নিজের অস্থিরতাটুকু চেপে, যতটা সম্ভব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পেছনের সিটে গিয়ে বসল।
ঠিক তখনই গাড়ির ড্রাইভার রিদের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, "মামা, গাড়ি কি তালুকদার বাড়ির দিকে নিয়া যামু?"
ঠিক তখনই, হঠাৎ গাড়ির কাঁচে মৃদু টোকার শব্দ হলো। রিদ অবাক হয়ে পেছনে ফিরে তাকাল—বাইরে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কাঁচ নামাতে বলছে। রিদ আশপাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল এই অপরিচিত মেয়েটি কে। অনু তখন দুই হাতের তালুতে মাথা গুঁজে বসে নিজের ভেতরে জমে থাকা মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করছিল। টোকার শব্দে সে-ও মাথা তুলে জানালার দিকে তাকাল।
বাইরে নাইসা দাঁড়িয়ে আছে।
নাইসাকে দেখা মাত্রই অনুর শরীরের রক্ত যেন টগবগ করে ফুটে উঠল! নয়টি মাসের অপমান, নিঃসঙ্গতা আর যন্ত্রণার কথা মনে পড়ে তার দাঁত কিড়মিড় করে উঠল। আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে সে এক ঝটকায় গাড়ির দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো।
রিদ ব্যস্ত হয়ে বলল, "অনু! কোথায় যাচ্ছিস?"
অনু হাত তুলে রিদকে থামিয়ে দিয়ে বলল, "তুই ওখানেই বস। এর সাথে আমার কিছু কথা আছে।"
অনুর এই রণমূর্তি রূপ দেখে রিদ আর কিছু বলার সাহস পেল না, চুপচাপ বসে রইল।
নাইসা কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই অনু রাগে ফেটে পড়ল, "তুমি এতটাও নিচে নামতে পারলে, নাইসা? যদি তুমি এই চক্রান্ত না করতে, তবে আজ দুটো মানুষের জীবন এভাবে তছনছ হতো না! দুটো মানুষকে নয়টা মাস ধরে এভাবে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়তো না! কী লাভ হলো এত কিছু করে ? বলতে পারো?"
নাইসা চোখমুখ উল্টে জুড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, যে সে অনুর কোন কোথায় পাত্তা দিচ্ছে না। তারপর আবার নিজের মুখের অবয়ব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল, "আমি কোনো কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই, রূপকথা।"
"কিসের এত অহংকার তোমার, নাইসা?" অনুর কণ্ঠস্বর আরও চড়া হলো, "তুমি কী ভেবেছিলে? এসব ছলচাতুরি করে এহসানকে নিজের করে পাবে? এভাবে ভালোবাসাকে জোর করে পাওয়া যায় না! কারও মনের দখল জোর করে নেওয়া যায় না। আমি যদি মরেও যেতাম, তাও এহসান কোনোদিন তোমাকে ভালোবাসতো না! বিয়ে তো অনেক দূরের কথা।"
নাইসা তার দু-হাত বুকের ওপর আড়াআড়ি করে বাঁধল। চোখের পাতা সামান্য কুঁচকে অনুকে দেখে নিয়ে বলল, "জ্ঞান দেওয়া শেষ? এবার আমার কথাটা শোনো। পৃথিবীতে সবাই ভালোবেসে ভালো হয়ে যায় না। আমি আবার ইউকে চলে যাচ্ছি। কেন এসেছিলে জানো? এহসানকে পাওয়ার অন্ধ লোভে।"
কথাটা বলতে বলতে নাইসার গলার স্বর কিছুটা ভেঙে আসছিল। সে চট করে গলা ঝেড়ে নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করল, "শোনো রূপকথা, এহসানকে আমি ভীষণ ভালোবাসতাম। আজ তাকে পেলাম না বলে যে তার প্রতি আমার অনুভূতির পরিবর্তন হয়ে যাবে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।"
নাইসার কথা শুনে অনুর চোখের ভেতরের ক্রোধ যেন কিছুটা শমিত হয়ে এলো। সে স্তম্ভিত হয়ে নাইসার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
নাইসা অস্বস্তিতে নিজের নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে বলতে লাগল, "আমি কী করেছি, কেন করেছি—তার কোনো সাফাই বা ক্ষমা আমি তোমার কাছে চাইব না। শুধু এটুকু জেনে রাখো, এহসান তোমাকে সত্যি অনেক পছন্দ করে... না, ভুল বললাম, ভালোবাসে। আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা আজ তোমাকে দিয়ে দিলাম। ওকে একটু সুখে রেখো। ভীষণ রাগী মানুষ সে, তবে তোমার ব্যাপারে বড্ড যত্নশীল ।"
অনু হতবাক হয়ে গেল। নাইসার এই আকস্মিক রূপান্তর সে যেন মেলাতে পারছিল না। তার মনে হচ্ছিল, এই মেয়েটাকে এখন সে কী বলবে? সান্ত্বনা দেবে? কিন্তু সান্ত্বনা দিতে গেলেও বা কীভাবে দেবে?
অনু শুধু ধীরস্বরে বলল , "তুমি... থেকে যাও"
নাইসা ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিদ্রূপের হাসি ফুটিয়ে তুলল, "এটা তোমার বাহ্যিক রূপকথা বলছে। তুমি ভেতরে ভেতরে চাইছ আমি যেন চলে যাই। আর এটা তোমার দোষ নয়, সবাই নিজের জীবনে ভালোবাসা পেতে চায়, তুমিও চেয়েছ। তুমি তো জানো না, ছোটবেলা থেকে আমি মায়ের ভালোবাসা পাইনি। এহসানের মা-কে নিজের মায়ের মতো মনে করতাম, ওই বাড়িতে আমার অবাধ যাতায়াত ছিল। ভেবেছিলাম এহসানকে পেলে একটা সংসার আর একজন মা—দুটোই পেয়ে যাব। কিন্তু তা আর হলো না।"
নাইসা নিজের ঘাড়ে ও কপালে হাত বুলিয়ে একটু থমকে দাঁড়াল। গলার ভেতর কান্নার দলা আটকে আসায় স্বর জড়িয়ে আসছিল, "ভালোবাসার মানুষকে পেতে ভাগ্য লাগে। আমার সেই ভাগ্যটাই হয়তো নেই। তুমি হয়তো ভাবছ আমি থেকে গেলেই পারতাম, কিন্তু এহসান আমার মন রক্ষা করার জন্যও থাকতে বলবে না। যে রাখতে চায় না, তার কাছে থেকে যাওয়া মানে একটা জীবনহীন পুতুলের মতো বেঁচে থাকা। ফেলনা হয়ে গেলাম একেবারে ।" এটা বলেই নাইসা খানিকটা হাসলো...
নাইসার এই আকুলতা, আক্ষেপ শুনে অনুর মনের ভেতরের রাগটা যেন কোথায় মিলিয়ে গেল। কেন জানি নাইসার ওপর এখন আর কোনো রাগ ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
নাইসা হঠাৎ এগিয়ে এসে অনুর হাত দুটো চেপে ধরল। অনু চমকে উঠে কিছুটা কেঁপে উঠলেও হাত ছাড়িয়ে নিল না।
"শোনো," নাইসা অনুর দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করে বলল, "ওকে ভালো রেখো। এর বেশি কিছু বলব না। আজ রাতেই আমার ফ্লাইট। আর হ্যাঁ, তোমরা দুজন মিলে সুন্দর করে সংসারটা গুছিয়ে নিও। এতদিনের যত দূরত্ব, যত অভিমান সব মিটিয়ে ফেলো। জীবনটা নতুন করে শুরু করো।"
কথা শেষ করেই নাইসা আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। দ্রুত পায়ে হেঁটে গিয়ে নিজের গাড়িতে উঠে বসল।গাড়িতে বসেই ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে নাইসা প্রায় চিৎকার করে বলল, "গাড়ি চালান! আর প্লেয়ারের সাউন্ড ফুল বাড়িয়ে দিন "
ড্রাইভার মিউজিক সিস্টেমের ভলিউম বাড়িয়ে দিলেও নাইসা অসন্তুষ্ট কণ্ঠে বলল, "আরও বাড়ান! যেন বাইরের কোনো শব্দ ভেতরে না আসে, আর ভেতরের কোনো শব্দ বাইরে না যায়। আর বাহিরে যান,এক্ষুনি....এক্ষুনি যান "
ড্রাইভার সাউন্ড একবারে শেষ সীমানায় পৌঁছে দিয়ে দ্বিধাজড়িত গলায় বলল, "কিন্তু আপামণি..."
নাইসা রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে বলল, "বললাম তো গাড়ি চালিয়ে বাইরে যান! আমাকে একা থাকতে দিন!"
ড্রাইভার কিছুটা ভয় পেয়ে গাড়ি রাস্তার পাশে থামিয়ে বাইরে নেমে দাঁড়াল।
ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে যেতেই নাইসার সমস্ত আগল ভেঙে গেল। সে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। গাড়ির কানফাটা মিউজিকের আড়ালে তার বুকচেরা কান্না হারিয়ে যেতে লাগল।
"এহসান... এহসান! তুমি রূপকথাকে অতটা ভালোবাসতে পারলে, আমাকে কেন একটু ভালোবাসলে না? তুমি একবার শুধু বলতে পারতে—নাইসা, তুমি একটু বদলে যাও, আমি বদলে যেতাম! তুমি যদি বলতে রূপকথার মতো সাজতে, আমি তা-ই করতাম! তুমি যা বলতে, আমি তা-ই করতাম এহসান! আমার খুব কষ্ট হচ্ছে... ভীষণ কষ্ট হচ্ছে! রূপকথা আসার অনেক আগে থেকেই তো আমি তোমাকে ভালোবেসে এসেছি..."
বলতে বলতে নাইসা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ছোটবেলা থেকেই সে কখনো নিজের কষ্ট কাউকে দেখাতে পারেনি, অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেনি। আজ নিজের এই পরাজয় আর ভালোবাসার শূন্যতা তাকে ভেতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর সে নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল। অশ্রুসজল চোখে গাড়ির কাঁচের ওপর মাথা এলিয়ে দিল।
বিড়বিড় করে বলল, "আই অ্যাম সরি এহসান... আই অ্যাম সরি। আমি যদি জানতাম তুমি রূপকথাকে এতটা ভালোবাসো, তবে আরও আগেই আমি ইউকে চলে যেতাম। তোমাকে পাওয়ার লোভটা বড্ড বেশি হয়ে গিয়েছিল আমার। ইটস ওকে... ইটস ওকে, আমি সামলে নেব নিজেকে।"
চোখের পানি আলতো করে মুছে নিয়ে সে জানালার কাঁচ নামিয়ে বাইরের ড্রাইভারকে ডাকল, "চলুন, এয়ারপোর্টের দিকে গাড়ি চালান।"
নাইসার গাড়ির পেছনের লাল আলো দুটো একসময় রাস্তার ভিড়ে মিলিয়ে গেল। অনু তখনও পাথরের মূর্তির মতো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। বারবার দমকা হাওয়া এসে তার হিজাব এলোমেলো করে দিচ্ছিল, কিন্তু সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তার সমস্ত চেতনা যেন হারিয়ে গেছে অন্য এক জগতে—যেখানে শুধু প্রতিধ্বনিত হচ্ছে নাইসার বলা প্রতিটি কথা।
নাইসার শেষ কথাগুলো আর তার চোখের ভেতরের শূন্যতা অনুর মনের ভেতর এক অদ্ভুত তোলপাড় সৃষ্টি করছে।যে মেয়েটা ভালোবাসার তীব্র ক্ষুধায় অন্যের সংসার ভাঙার পথে এগিয়ে গিয়েছিল, দিনশেষে সে-ই নিজের সবটুকু হারিয়ে একা হয়ে ফিরে গেল।
নাইসার চলে যাওয়ার দৃশ্যটা অনুর মনের ভেতরে জমে থাকা রাগ আর ঘৃণাকে ধীরে ধীরে মুছে দিল। এতদিন যাকে শুধু নিজের জীবনের কষ্টের কারণ ভেবেছিল, আজ তার কষ্টটুকুও অনুর চোখে ধরা পড়ল। নাইসার ভুলগুলো ভুলই ছিল, কিন্তু তার ভেতরেও যে না-পাওয়ার যন্ত্রণা ছিল, সেটা আজ অনু বুঝতে পারছে ।
রিদ গাড়ি থেকে নেমে অনুর পাশে এসে দাঁড়াল। অনুর কাঁধে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে বলল, "অনু... সব ঠিক আছে তো?"
অনু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের চোখ দুটি বন্ধ করল। তারপর শুকনো গলায় বিড়বিড় করে বলল, "হুম... চল, বাড়ি যেতে হবে এমনিতেই লেট হয়ে যাচ্ছে ।"
অন্যদিকে, সিদ্দিকী ম্যানশনে মাত্রই এসে ঢুকেছে এহসান। নিজেকে যতটা সম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করছে সে। তবে সে খুব ভালো করেই জানে, তার বাবা রশীদ সিদ্দিকী চরম একগুঁয়ে আর জেদি মানুষ; রাগের মাথায় তিনি সহজে সত্যি কথাটা স্বীকার করবেন না।
এহসানকে ঘরে ঢুকতে দেখে রান্নাঘরের দিক থেকে দ্রুত এগিয়ে এলেন রুনা সিদ্দিকী।ছেলের বিধ্বস্ত চেহারাটা দেখেই মায়ের চোখেমুখে দুশ্চিন্তা ফুটে উঠল। মায়ের মুখের উদ্বিগ্ন ভাবটা এহসানের চোখ এড়াল না। তবু সে তা বুঝতে না দেওয়ার চেষ্টা করে স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল, “মা, বাবা কোথায়?”
রুনা সিদ্দিকী একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, "একটু বাইরে গেছেন । তুই বোস, আগে কিছু খেয়ে নে। দরকার আছে তোর সাথে কিছু কথা বলার। সকাল থেকে তো কিছু মুখে দিসনি, নিজের চেহারাটার কী অবস্থা করে রেখেছিস দেখ একবার!"
এহসান শুকনো গলার ঢোক গিলল। চোখ দুটো মেঝের দিকে স্থির রেখে শক্ত গলায় বলল, "এই বাড়ির খাবার আমার জন্য হারাম হয়ে গেছে, মা।"
কথাটা শোনামাত্রই রুনা সিদ্দিকী একদম থমকে গেলেন। নিজের ছেলের মুখ থেকে এমন কথা শুনে তিনি কী বলবেন ভেবে পেলেন না। ছেলে যে এমন কোনো কথা বলতে পারে, তা তাঁর চিন্তারও বাইরে ছিল। তিনি কিছুটা ধমকের সুরেই বলে উঠলেন, "এহসান! এসব কী ধরনের কথা বলছিস তুই? সকালে গেলি বাবার সাথে ঝগড়া করে, আর এখন ফিরে আবার যা তা শুরু করেছিস?"
এহসান মায়ের দিকে না তাকিয়েই বলল, "আমি যা তা বলছি না, মা। রশীদ সিদ্দিকীকে আসতে বলো, উনি তো সবই জানেন... আমি কোনো ভুল কথা বলছি না।"
ঠিক সেই মুহূর্তেই বাইরের দরজায় শব্দ হলো। সারাদিন অফিস শেষ করে রশীদ সিদ্দিকী মাত্রই বাড়ি ফিরেছেন। শরীর আর মন—দুটোই তাঁর বেশ ক্লান্ত। ড্রয়িংরুমে ঢুতেই ছেলের এই চেঁচামেচি আর বেপরোয়া কথা কানে যেতেই তিনি চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, "কী হয়েছে? চিল্লাচ্ছ কেন? নিজের বাবার নাম ধরে ডাকছ বেয়াদবের মতো?"
রশিদ সিদ্দিকীকে দেখেই এহসানের ভেতরে এতক্ষণ জমে থাকা রাগটা যেন মুহূর্তেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠল, কপালের রগ দুটো স্পষ্ট ফুলে উঠল। মায়ের সামনে এতক্ষণ নিজেকে স্বাভাবিক রাখার যে চেষ্টা করছিল, বাবাকে দেখামাত্রই সেটুকুও যেন ভেঙে গেল। তবু কোনো রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত বাবার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে। চোখেমুখে জমে থাকা প্রশ্ন আর ক্ষোভ লুকোনোর কোনো চেষ্টাই করল না।
অবশেষে গলা কিছুটা ভারী করে সরাসরি প্রশ্ন করল,
“আমি যখন হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম, তখন কি রূপকথা এই বাড়িতে এসেছিল?”
হঠাৎ এহসানের মুখে রূপকথার নাম শুনে মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা রুনা সিদ্দিকী কেমন অস্বস্তিতে উশখুশ করতে লাগলেন। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলেন না, তাঁর ছেলে হঠাৎ রূপকথার প্রসঙ্গ তুলল কেন। এহসান আসলে কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছে, কিংবা তার প্রশ্নের আড়ালে কী আছে, সেটাও তাঁর বোধগম্য হচ্ছিল না। বারবার একবার ছেলের দিকে, একবার স্বামীর দিকে তাকাচ্ছিলেন তিনি। ।
রশীদ সিদ্দিকী বুঝতে পারলেন আর লুকিয়ে কোনো লাভ নেই, ছেলে সব জেনে গেছে। তিনি গলার স্বর চড়া করে বললেন, "হ্যাঁ, এসেছিল।"
এহসান হাতের মুঠি এত শক্ত করে বন্ধ করল যে তার নখগুলো তালুর চামড়ায় গিয়ে বিঁধল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "আর তুমি তাকে তাড়িয়ে দিয়েছ?"
রশীদ সিদ্দিকী এহসানের প্রশ্নের কোনো জবাব দিলেন না। গম্ভীর মুখ করে একদম চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
এহসান আর ধৈর্য ধরে রাখতে না পেরে গর্জে উঠল, "বলো বাবা, কেন এমন করলে?"
রশীদ সিদ্দিকী কঠিন কণ্ঠে জবাব দিলেন, "আমি তোমাকে কোনো উত্তর দিতে বাধ্য নই।"
ঠিক আছে। আমি আমার উত্তর পেয়ে গেছি," এহসান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না, এক ঝটকায় ঘুরে মায়ের দিকে তাকাল। রাগে তার বুক জোরে জোরে ওঠানামা করছিল। সে স্পষ্ট গলায় বলল, "মা, যে বাড়িতে আমার বিবাহিত স্ত্রীর কোনো সম্মান নেই, যে বাড়ি থেকে তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই বাড়িতে আমি আর থাকব না। আমি চলে যাচ্ছি।" কথাটা বলেই এহসান হনহন করে দরজার দিকে পা বাড়াল।
ছেলের এমন সিদ্ধান্ত দেখে রুনা সিদ্দিকী একদম দিশেহারা হয়ে গেলেন। তিনি দ্রুত ছুটে গিয়ে এহসানের শার্টের হাতা শক্ত করে চেপে ধরলেন। কান কান্নাজড়ানো ব্যাকুল কণ্ঠে বললেন, "পাগল হয়ে গেলি নাকি এহসান? কেন যাবি? কোথায় যাবি তুই? তুই আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবি না! তোর বাবার ওপর রাগ করে তুই আমাকে ছেড়ে এভাবে চলে যাবি?"
এহসান ধীরেসুস্থে মায়ের হাতটা নিজের শার্টের হাতা থেকে আলতো করে ছাড়িয়ে দিল। এহসান মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় তাঁকে কান্না করতে নিষেধ করল। কিন্তু ছেলের এমন কাণ্ড দেখে রুনা সিদ্দিকীর বুকটা আরও ফুঁপিয়ে উঠল। ছেলেটা সত্যিই যদি রাগ করে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যায়? এই আশঙ্কাটা হঠাৎ করেই তাঁকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিল। ছেলেকে কীভাবে থামাবেন, সেটাই যেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না তিনি।
ছেলেকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে দেখে রশীদ সিদ্দিকী হাত দুটো পেছনে নিয়ে সামনে এগিয়ে এলেন। রাগে তার চেহারা কঠিন হয়ে উঠল। তিনি চেঁচিয়ে বললেন, "একটা সামান্য মেয়ের জন্য এত পাগলামি? বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছ? ওই মেয়ে কী এমন জাদু করেছে তোমাকে, এহসান?"
এহসান ঘুরে বাবার একেবারে মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। চোখেমুখে তখন তীব্র রাগ। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,“বাজে কথা বলবে না, বাবা...!”
'বাবার' শব্দটা উচ্চারণ করতে গিয়েও এহসানের গলা আটকে এলো। সে নিজের ভেতরের জমে থাকা সব ক্ষোভ আর তিক্ততা উগরে দিয়ে বলতে লাগল, "প্রতিদিনের এই অশান্তি আমার আর বিন্দুমাত্র ভালো লাগছে না। তুমি তোমার টাকা-পয়সা আর ধন-সম্পদ নিয়ে শান্তিতে থাকো, বাবা। আমি চললাম। তুমি যাকে অপমান করে বের করে দিয়েছ, সে এত মারপ্যাঁচ, রাজনীতি বোঝে না, বাবা! তখন তো আমাদের বিয়ের কথা কেউ জানত না। তারপরও সে সাহস করে, আমার খোঁজ না পেয়ে এই বাড়িতে এসে হাজির হয়েছিল। একবারও নিজের বাবা-মায়ের কথা চিন্তা করেনি? তাঁরা যদি জানতে পারেন, তাহলে ওর সঙ্গে কী হবে, সেটা কি একবারও ভেবে দেখেনি....আর তুমি তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলে? "
এহসান জোরে একটা নিঃশ্বাস ফেলে আবার বলে উঠল,
"তুমি ফুপিকেও তো এভাবে অপমান করে বের করে দিয়েছিলে, কারণ তোমাকে না জানিয়ে বিয়ে করেছিল বলে। কই, আমাকে দিলে না, নিজের সন্তানকে দিলে না। নিজের বেলায় বড্ড স্বার্থপর তুমি, বাবা। আজকে যদি রূপকথার জায়গায় তোমার মেয়ে থাকত, তাহলে ওকে এভাবে পাড়তে বের করে দিতে বাড়ি থেকে?এত কঠিন মানুষ কীভাবে হলে তুমি? সারাজীবন শুধু নিজের লাভ আর হিসাবটাই বুঝে এলে, মান-সম্মান আর সম্পদের বাইরে কি কোনো অনুভূতি নেই তোমার কাছে?"
কথাগুলো তীরের মতো গিয়ে বিধল রশীদ সিদ্দিকীর বুকে। তিনি নিজের জায়গায় একদম নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর মনের ভেতরটা হঠাৎ দুমড়ে-মুচড়ে উঠল। তিনি কার জন্য এত কিছু করলেন? ছেলের ভালোর জন্যই তো সব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, অথচ আজ সেই ছেলেই তাঁর দিকে আঙুল তুলে তাঁকে 'স্বার্থপর' বলছে?
এহসান আর একটা মুহূর্তও সেখানে অপেক্ষা করল না। দরজার দিকে দ্রুত পায়ে হেঁটে গেল।ঠিক তখনই রুনা সিদ্দিকী পেছন থেকে উচ্চস্বরে ডেকে উঠলেন, "দাঁড়া এহসান! আমাকে তোর সঙ্গে নিয়ে চল!"
কথাটা শুনে রশীদ সিদ্দিকী চমকে উঠে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
রুনা সিদ্দিকী স্বামীর দিকে একবার তীব্র অবহেলার চোখে তাকালেন। তারপর ছেলের দিকে চেয়ে বললেন, "তোর বাবা যা প্রাপ্য, তোর বাবা তা-ই পাক। সারাজীবন উনি সবাইকে পর ভেবে এসেছেন, উনি একাই থাকুন। নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কাউকে কোনোদিন কথা বলার সুযোগ দাওনি। নিজের ইচ্ছেমতো সিদ্ধান্ত নিয়েছ, আর সবাইকে সেটা মেনে নিতে বাধ্য করেছ। উনাকে উনার কাজের ফল ভোগ করতে দে। আমি কেন এই বাড়িতে একা পড়ে থেকে কষ্ট পাব? তুই আমাকে নিয়ে যাবি না তোর সাথে?"
এহসান চোখের ইশারায় মাকে সাথে আসার সায় দিল।
বেরিয়ে যাওয়ার আগে রুনা সিদ্দিকী শেষবারের মতো রশীদ সিদ্দিকীর দিকে ঘুরলেন। শক্ত গলায় বললেন, "আপনি সারাজীবন ধরে শুধু নিজেকে আর নিজের জেদকে ভালোবাসলেন। আপন মানুষদের ছাড়া একা থাকাটা কেমন যন্ত্রণার, এবার নিজে পুরো বাড়িতে একা থেকে সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝুন। "
রুনা সিদ্দিকীর চোখের কোণে জল জমে উঠল। এত বছরের সাজানো সংসার, নিজের ছেলে আর স্বামীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আজ তাঁকেই যেন একটা সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। কাঁপা গলায় তিনি আবারও বললেন,
“আর আমি আসব, অবশ্যই আসব। কিন্তু তার জন্য আমার ছেলের বউকে স্বীকৃতি দিতে হবে। আর যদি সেটা না পারেন, তাহলে এই যে যাচ্ছি, আর কোনোদিন আসব না। রেখে গেলাম আমার ঊনত্রিশ বছরের সাজানো সংসার।”
কথা শেষ করে তিনি এহসানের হাত শক্ত করে ধরে সোজা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলেন।বিশাল ড্রয়িংরুমে একদম একাকী দাঁড়িয়ে রইলেন রশীদ সিদ্দিকী। যে পরিবার, স্ত্রী আর সন্তানের জন্য তিনি সারাজীবন ধরে এই সম্পদের প্রাসাদ আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন, আজ তারাই তাঁকে একা ফেলে রেখে চিরতরে চলে গেল।
রশীদ সিদ্দিকী ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন। তাঁর মাথার ভেতর পুরোনো স্মৃতির পাতাগুলো একে একে উল্টে যেতে লাগল।
সেদিন যখন এহসানের ফুফু শিরিন সিদ্দিকী বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, সেদিন তো তার বিয়ে ঠিক ছিল। শিরিন সিদ্দিকী চাইলে অন্তত একবার বলতে পারতেন, তিনি মাহবুব তালুকদারকে পছন্দ করেন। মাহবুব তালুকদার তো রশিদ সিদ্দিকীরই বন্ধু ছিলেন। ছোটবেলা থেকে দুজন একসঙ্গে বড় হয়েছেন। অথচ বোন হিসেবে শিরিন, কিংবা নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হিসেবে মাহবুব, কেউই একবারের জন্যও রশিদ সিদ্দিকীকে কিছু খুলে বলেনি। বাড়িতে এত মেহমানের সামনে এসে হঠাৎ দুজনেই বলল, তারা বিয়ে করে ফেলেছে।কই, সেটা তো তার ভুল ছিল না! বাবা যখন মারা গেলেন, সেদিন শিরিন সিদ্দিকী সব অভিমান ভুলে ফোন করেছিলেন তিনি, অথচ সেদিন তো আভিজাত্য দেখেননি, বরং শিরিন সিদ্দিকী ফোনটাও ধরেননি। উনার কি নিজের একমাত্র বোনের জন্য মায়া হয় না? সব মায়া-মমতা কি শুধু মা আর ছেলের ?উনার কি কারও জন্য কোনো মায়া নেই? নিজের হাতে বোনকে বড় করেছেন, ছেলেকেও কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছেন। অথচ সেই ছেলেই আজ মুখের ওপর উনাকে স্বার্থপর বলে চলে গেল! এত বছরের ত্যাগ কি তাহলে এক মুহূর্তেই সব শেষ?
তিনি বিড়বিড় করে নিজেকেই শোনালেন, "আমি ওইদিন ওই মেয়েকে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম... উচিত হয়নি আমার। তাই বলে আমার নিজের ছেলে হয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাবে?"
সোফায় বসে তিনি দরজার দিকে চুপচাপ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। “বুকের কাছে ভীষণ ব্যথা করছে আজকে... যাদের জন্য সারাজীবন এত কিছু করলাম, তারাই কেন আমাকে ছেড়ে চলে যায়? আমি কি এতটাই খারাপ ছিলাম?”
চলবে....
#নিভৃতে_যত্নে_রাখা_প্রিয়তমা
#মারিয়াম_ফুল
পর্ব :৩৫