ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিভৃতে যত্নে রাখা প্রিয়তমা

৩৬তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম ফুল

সন্ধ্যা নেমে এসেছে। দূরের কোনো মসজিদ থেকে ভেসে আসছে মাগরিবের আজানের শব্দ।

গাড়ির স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে রেখেছে এহসান। বাবার সাথে ঝগড়া করে মাকে তো বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে এলো, কিন্তু এখন কোথায় যাবে—তা আগে থেকে কিচ্ছু ভেবে রাখেনি। গাড়িটা অবশ্য তার নিজের উপার্জনের টাকায় কেনা; বিজনেস থেকে রশিদ সিদ্দিকী যে টাকা দিতেন, তা জমিয়েই এটা কিনেছিল সে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় সঙ্গে শুধু এই একটি জিনিসই নিয়ে আসতে পেরেছে।
পাশে বসে থাকা রুনা সিদ্দিকীর দিকে তাকাতেই এহসানের বুকের ভেতর একটা অপরাধবোধ কাজ করতে লাগল। গলার স্বর নিচু করে সে বলল, "মা... আমরা দু-একদিন কোনো হোটেলে থাকি? এর মধ্যে ভালো একটা বাসা দেখে নেব। তারপর ঘরের যা যা জিনিসপত্র লাগবে, তোমাকে নিয়ে গিয়েই সব কিনে ফেলব।"
ছেলের থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে রুনা সিদ্দিকী নিমেষেই তার ভেতরের দ্বিধাটুকু বুঝে ফেললেন। তিনি স্নেহের হাসি হেসে বললেন, "কোনো সমস্যা নেই তো বাবা। এত চিন্তা করছিস কেন তুই?"
এহসান মাথা নেড়ে চুপ করে রইল, কিন্তু মন থেকে অস্বস্তিটা গেল না।
রুনা সিদ্দিকী তাকে অভয় দিয়ে আবার বললেন, "চিন্তার কিছু নেই, দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। তবে বাবা, একটা বাসা ঠিক করার পরপরই কিন্তু আমাদের রূপকথাদের বাড়ি যেতে হবে। মাহবুব ভাই আর শিরিনের কাছ থেকে ওদের মেয়েকে একেবারে চেয়ে নেব... এভাবে একটা বিবাহিত মেয়েকে নিজের বাপেদের বাড়িতে ফেলে রাখা ঠিক না। এখন অনেকেই ব্যাপারটা জানে, আর মেয়েটাও তো যথেষ্ট বড় হয়েছে।"
মায়ের মুখে অনুর স্বীকৃতির কথা শুনে এহসান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এরপর চেনা একটা হোটেলের দিকে গাড়ি ঘুরিয়ে দিল সে।
আগামী দু-তিন দিনের মধ্যেই যেভাবেই হোক একটা বাসা খুঁজে বের করতে হবে। মাথার ভেতর একের পর এক চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। ভাবল, একটু পরেই আহিয়ান আর জেডকে ফোন দেবে। ওদের পরিচিত কারও কাছে হয়তো খালি কোনো বাসার খবর থাকতে পারে। নিজের একার পক্ষে এত অল্প সময়ে সব সামলানো সহজ হবে না।
ভার্সিটির ক্লাস তার ফাঁকে ফাঁকে বাসা খোঁজা....যত কষ্টই হোক, অনুর জন্য একটা নিরাপদ ঠিকানা তাকে খুঁজে বের করতেই হবে।
অন্যদিকে, বাড়ি ফেরার পর থেকেই অনুর মনটায় কেমন একটা অস্বস্তি লাগছে। মাথার রগ দুটো যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে—ভীষণ মাথা ধরেছে তার। সারাদিন যা যা ঘটে গেল, সেসব ভেবে সে কোনো কূলকিনারা পাচ্ছে না। নিজেকে খুব বোকা মনে হচ্ছে; নিজের এই ভুল সিদ্ধান্তের ওপর তীব্র বিরক্তি আসছে তার।
 মাগরিবের নামাজ শেষ করে সে জায়নামাজেই স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। মানুষ যখন সব দিক থেকে দিশেহারা হয়ে পড়ে, তখনই তো আল্লাহর কাছে মন খুলে প্রার্থনা করে। 
দুপাশে হাত তুলে দোয়ায় বসতেই অনুর চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল। ডুকরে কেঁদে উঠে বিড়বিড় করতে লাগল, "হে আল্লাহ... আমাকে পথ দেখাও। আমি কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না... মা যদি সত্যিটা জেনে যায়, তবে আবার আমাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হবে এহসান এখনো আমার স্বামী। কিন্তু কাউকে বলতে পারছি না। যদি সবাই আমাকে ভুল বোঝে? আমি এহসানকে ছাড়া থাকতে পারব না... আমাকে একটা উপায় দেখিয়ে দাও..."
দোয়া শেষ করার আগেই বাইরে থেকে মায়ের হাঁকডাক কানে এলো।
"অনু! ও অনু... কই তুই?"
মায়ের গলা পেয়ে জায়নামাজে বসেই চোখের পানি মুছে অনু জবাব দিল, "আসছি মা..." 
ঘরে ঢুকে মেয়েকে জায়নামাজে বসে থাকতে দেখে শিরিন সিদ্দিকী আলমারির দিকে এগোলেন। কেমন যেন ইতস্তত ভাব নিয়ে নিজের কপাল কিছুটা চুলকে নিয়ে, পরক্ষণেই নিজেকে স্বাভাবিক করার ব্যর্থ চেষ্টা করে বললেন, "রেডি হ তো মা..." 
অনু মায়ের দিকে চোখ তুলে শুধাল, "কেন? কোথায় যেতে হবে?"
শিরিন সিদ্দিকী মেয়ের দিক থেকে চোখ সরিয়ে তাড়াহুড়ো করে আলমারির একপাশ থেকে একটা নীল রঙের শাড়ি টেনে বের করলেন। শাড়িটা অনুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, "ছেলেপক্ষ দেখতে আসছে... রেডি হ। শাড়িটা পরতে পারবি, নাকি আমি পরিয়ে দেব?" 
এতক্ষণ চুপ করে থাকলেও এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না অনু। তার ভেতর থেকে যেন একটা চিৎকার বেরিয়ে এলো, "কাকে দেখতে আসবে?!"
এমনিতেই কান্নায় বুকের ভেতরটা দম আটকে আসছিল, এখন তা দ্বিগুণ হয়ে উপচে পড়তে চাইল।
শিরিন সিদ্দিকী শাড়িটা একপাশে রেখে এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, "পরে নে তো..." বলেই রুম থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলেন।
অনু এক ঝটকায় মায়ের হাত চেপে ধরল। ছলছল চোখে মাথা নেড়ে মিনতি করল—না।
শিরিন সিদ্দিকী নিজের অন্য হাত দিয়ে অনুর হাতটা আলগা করে ছড়িয়ে দিলেন। একটু ধমকের সুরেই বললেন, "পাগলামি করবি না অনু! অনামিকা বিয়ে করে ফেলেছে, তোর বয়সের সবাই এখন সংসারী হয়ে যাচ্ছে। জীবনটা কি ছেলেখেলা নাকি?"
অনু এক পা পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকালো। শক্ত গলায় বলল,
"কিন্তু আমি এখন বিয়ে করতে চাই না!"
কথাটা বললেও মায়ের মুখের অভিব্যক্তিতে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন এলো না। বরং তাঁর নীরবতা যেন আরও স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল, এ বিষয়ে আর কোনো আলোচনা হবে না। মুহূর্তেই অনু বুঝে গেল, মায়ের সাথে তর্ক করে কোনো লাভ নেই। যতই নিজের মনের কথা বলুক, মা আজ শুনবেন না।
অসহায় দৃষ্টিতে একবার মায়ের দিকে তাকিয়ে অনু ঠোঁট কামড়ে ধরল। তারপর হঠাৎ করেই ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রায় দৌড়ে ড্রয়িংরুমের দিকে চলে এলো। এখন যা বলার, বাবাকেই বলতে হবে। এই বাড়িতে যদি কেউ তার কথা বুঝে, তাহলে তিনি মাহবুব তালুকদার।
বাবার সামনে যেতেই অনুর পায়ের গতি কিছুটা শ্লথ হয়ে এলো। মনের কোণে ভয় উঁকি দিল—যদি আবারও পড়ালেখা বন্ধ করে দেন বাবা, এহসানের কথা শুনে? কিন্তু যা-ই হয়ে যাক না কেন, সে এখন অন্য কাউকেই বিয়ে করতে পারবে না।
কাঁপা গলায় সে ডেকে উঠল, "বাবা....."
মাহবুব তালুকদার চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া থামিয়ে একটু ঘুরে মেয়ের দিকে তাকালেন। অনু আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। বুক ভরে একটা দম নিয়ে এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল, "আমি... আমি এখন বিয়ে করতে চাই না! তুমিই তো বলেছিলে, আগে পড়াশোনা শেষ করতে। তাহলে হঠাৎ বিয়ের কথা কোত্থেকে আসছে?"
ততক্ষণে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন শিরিন সিদ্দিকী। মাহবুব তালুকদার কিছু বলতে যাওয়ার আগেই তিনি বলে উঠলেন, "কেন? বিয়ে করলে কি পড়াশোনা করা যায় না নাকি?"
অনু এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে মায়ের দিকে বেশ তর্কের ভঙ্গিতে তেড়ে এলো, 
"হুম, যায়! কিন্তু আমি করতে চাইছি না। তোমরা যদি আমার কথা না শোনো, তাহলে ঠিক আছে, আমিও নিজের ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে বসে থাকব। আর বের হব না। আমার প্রায়োরিটি লিস্টে এখন বিয়ে নেই, মা। যার যখন ইচ্ছে হলো, অমনি ধরে-বেঁধে বিয়ে দিয়ে দেবে নাকি?"
মাহবুব তালুকদার নিস্তব্ধ হয়ে শুধু মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।কথাটা বলেই অনু আর দাঁড়াল না, হনহন করে নিজের ঘরের দিকে হেঁটে চলে গেল। 
শিরিন সিদ্দিকী আবার কিছু একটা বলতে উদ্যত হতেই মাহবুব তালুকদার আলতো করে মাথা নেড়ে তাকে বারণ করলেন। মেয়ে ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দেওয়ার পর তিনি স্ত্রীর উদ্দেশ্যে শান্ত গলায় বললেন, "আহা... যদি এখন করতে না চায় তো না-ই করুক। আমার মনে হয় ওকে আর কয়েকটা দিন সময় দেওয়া উচিত।"
শিরিন সিদ্দিকী অসন্তুষ্ট মুখে হাত নেড়ে বললেন, "হ্যাঁ, তুমি তো মাথায় তুলে লাই দেবেই! দেখেছ দিন দিন কেমন মুখের ওপর তর্ক করছে?"
কথা শেষ করে বিরক্তি নিয়ে তিনিও রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালেন।আগের রাতে নীলের বাবা নিজেই ফোন করে অনুরোধ করেছিলেন, বাড়িতে এসে একবার অনুকে দেখে যেতে চান। মাহবুব তালুকদার খবরটি শুনে বিশেষ আপত্তি জানাননি। তবে মনে মনে তাঁর এক অজানা আতঙ্ক কাজ করছিল—যদি অনুর আগের বিয়ের কথা শুনে তিনি মুখ ফিরিয়ে নেন? আবার এ-ও মনে হয়েছিল, নীলের বাবা আর নীল যখন নিজ থেকেই আসতে চাইছে, তখন এখানে এলে সব সত্যি খোলাখুলি বলে দেওয়াটাই শ্রেয় হবে। নীল ছেলেটা তো বেশ ভালো, হয়তো পরিস্থিতিটা সুন্দরভাবে বুঝতে পারবে।
সবদিক ভেবে মাহবুব তালুকদার নিজের ফোনটি হাতে নিয়ে নীলের বাবার নম্বর ডায়াল করলেন। হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। আগে অনুকে একটু সময় দিতে হবে, বিষয়টা বুঝিয়ে বলতে হবে। মেয়েটা হঠাৎ করে এমন একটা কথার সামনে পড়েছে, তাই তাকে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়াটাই ভালো।
কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে ফোন ধরতেই মাহবুব তালুকদার স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে কথা শুরু করলেন। নানা রকম অজুহাত দেখিয়ে বললেন, আজকে যেন তারা বাড়িতে না আসেন। জরুরি একটা কাজ পড়েছে, বাসায় একটু সমস্যা আছে, তাই আজকের দেখা করাটা অন্যদিন হলে ভালো হয়।
কথাগুলো বলতে বলতে তার গলায় অস্বস্তি ফুটে উঠছিল। তিনি জানতেন, হুট করে সবকিছু থামিয়ে দেওয়া যাবে না। তবে অন্তত কয়েকটা দিন সময় দরকার। সেই সময়ের মধ্যেই অনুকে বোঝাতে হবে, তার মনটা বুঝতে হবে। তারপরই না হয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।
পরদিন দুপুরের দিকে—
ভার্সিটির ক্লাসে এসে বসেছে অনু। আজকেও রিদ আসেনি; যথারীতি ফাঁকি দিয়েছে। ছেলেটার একটা ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ পেলেই হলো, পড়ালেখার ধারের কাছেও ঘেষবে না! আজ অবশ্য বেশি ক্লাস ছিল না, মাত্র দুটো। তার মধ্যে একটি শেষ হয়ে গেছে, আর দ্বিতীয় ক্লাসটি প্রফেসর এহসান সিদ্দিকীর।
গতকাল ডিপার্টমেন্টের ক্যাবিনে ডেকে এহসান যেভাবে তাকে রাগ দেখিয়ে অপমান করেছিল, তা মনে পড়তেই অনুর ভেতরে আবার ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠল। এহসান কি চাইলেই পুরো বিষয়টা ঠান্ডা মাথায় শান্তভাবে বুঝিয়ে বলতে পারত না?
এহসান ক্লাসরুমে ঢোকার সাথে সাথেই অনু সোজা নিজের ব্যাগ থেকে মোটা একটা উপন্যাসের বই বের করে মুখের সামনে তুলে ধরল। এহসানের দিকে যেন এক পলকও তাকাতে না হয়!
এহসান ক্লাসে ঢুকে প্রথম দিকে ইচ্ছে করেই অনুর দিকে তাকায়নি। সে চায়নি তাদের ব্যক্তিগত ঝগড়া কিংবা সম্পর্কের কথা ক্লাসের শিক্ষার্থীদের মাঝে জানাজানি হোক। কিন্তু লেকচার দেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে না চাইতেও চোখ দুটো বারবার অনুর দিকেই চলে যাচ্ছিল।
অনুকে একদম নিবিষ্ট মনে উপন্যাসে ডুবে থাকতে দেখে এহসান মনে মনে চরম বিরক্ত হলো। বিড়বিড় করে নিজেকেই বলল, 'এই মেয়ের সমস্যাটা কী? আমাকে এভাবে ইগনোর করছে? সব সত্যি জানার পরও এত বড় সাহস হয় কী করে আমাকে এড়িয়ে যাওয়ার? দাঁড়াও ম্যাডাম, দেখাচ্ছি মজা!'
অনু পেছনের সারির ডান দিকের বেঞ্চে বসে ছিল। জানালার মিষ্টি রোদ এসে পড়েছে তার ওপর। কিন্তু সে তখন উপন্যাসের কাল্পনিক দুনিয়ায় এতটাই হারিয়ে গেছে যে, সে যে একটা ভরা ক্লাসরুমে বসে আছে তা পুরোপুরি ভুলেই গেছে!
এহসান নিজের হাত দুটি বুকের ওপর আড়াআড়ি করে বাঁধল। সব সত্য জানাজানি হয়ে গেলে যাক, এখন আর তার কিচ্ছু যায়-আসে না! রূপকথা তাকে উপেক্ষা করার সাহস কীভাবে পায়? হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে থাকা ক্লাসের মাঝে এহসানের গভীর কণ্ঠস্বর ভেসে উঠল,"মিসেস সিদ্দিকী, ফোকাস অন মি। ইয়োর ম্যান ইজ স্ট্যান্ডিং হেয়ার! আপনাকে উপন্যাসের কাল্পনিক পুরুষ দেখতে হবে না।"
কথাটা কানে যেতেই তাড়াহুড়ো করে উপন্যাসের পাতা থেকে চোখ তুলে তাকাল অনু। ক্লাসের প্রতিটি শিক্ষার্থী ততক্ষণে মুখ ঘুরিয়ে হাঁ করে অনুর দিকে তাকিয়ে রয়েছে! অনু কপালে হাত দিয়ে দ্রুত চোখ ঘুরিয়ে চারপাশের অবাক হওয়া মুখগুলোর দিকে আরেকবার দেখল।
"এই লোকটা কী বলল সবার সামনে! এভাবে কীভাবে বলতে পারে?" মনে মনে ভেবে উঠল অনু।কয়েকবার শুকনো ঢোক গিলল সে। অসভ্য একটা লোক! ক্লাসের সবাই এখন তার দিকে একদম হা করে তাকিয়ে আছে। 
অনুর এখন মন চাইছে, এই মুহূর্তে উঠে গিয়ে এহসানের চুলগুলো টেনে এলোমেলো করে দিতে। এভাবে কী করে বলতে পারে সে, ভেবে ভেতরে ভেতরে রাগে ফুঁসছে অনু।
ঠিক তখনই ঘড়ির কাঁটা ছুঁয়ে ক্লাসের নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেল। এহসান আর দ্বিতীয় কোনো কথা বাড়াল না, টেবিল থেকে ল্যাপটপটা হাতে নিয়ে সশব্দে গটগট করে ক্লাস থেকে বের হয়ে গেল।
কিন্তু ক্লাসরুমের পরিবেশ তখন থমথমে! সবাই যেন কৌতূহলের পাহাড় নিয়ে অনুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
"ঐ অনু! তোকে প্রফেসর সিদ্দিকী 'মিসেস সিদ্দিকী' বললেন কেন রে?"
পাশ থেকে মৃদুলা নামের মেয়েটা ঝুঁকে এসে উৎসুক গলায় বলে উঠল, "তোরা কি হাজবেন্ড-ওয়াইফ? তাহলে সেদিন স্যার তোকে অমন অপমান করলেন কেন?"
চারপাশের অজস্র প্রশ্নের বাণ আর কৌতূহলী চোখের তোপ সহ্য করতে না পেরে ব্যাগটা এক টানে তুলে নিয়ে তড়িঘড়ি করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে এলো অনু। সে কী উত্তর দেবে এদের? সব বলে দেবে সবাইকে? এহসান কীভাবে সবার সামনে তার সাথে এমন করতে পারল!
বুকের ভেতর কান্নার দমকা হাওয়া আছড়ে পড়ছে অনুর। তার সাথেই কেন বারবার এমন হয়ে ? এখন তো পুরো ক্যাম্পাসে তাদের নিয়ে জোর মুখরোচক আলোচনা শুরু হয়ে যাবে!এসব আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে আর নিজের মনে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সামনের দিকে খেয়ালই করছিল না অনু। মাথার ভেতর তখন শুধু এহসানের কথাগুলোই ঘুরপাক খাচ্ছে। চারপাশে কে আছে, কে যাচ্ছে, সেদিকে কোনো মনোযোগই ছিল না তার।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করেই ধপাস করে কারো সঙ্গে জোরে ধাক্কা খেল অনু। ধাক্কার আকস্মিকতায় কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে কোনোমতে নিজের ভারসাম্য সামলে নিল সে।সামনে তাকাতেই অনুর মুখটা থমকে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন সিনিয়র । আর তাদের মধ্যেই একজনের সঙ্গে ধাক্কা লেগেছে তার।ধাক্কা তো খেলই, কিন্তু শেষমেশ কিনা এই অভদ্র সিনিয়র দলটার সামনেই এসে পড়তে হলো তাকে! মনে মনে বিরক্ত হয়ে উঠল অনু।
এই সিনিয়র গ্রুপটার রেকর্ড পুরো ক্যাম্পাসেরই জানা। খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থীই আছে, যারা কোনো না কোনোভাবে তাদের র‍্যাগিংয়ের শিকার হয়নি ।
নিজের অস্বস্তি লুকিয়ে তাড়াতাড়ি দুহাত সামনে বাড়িয়ে অনু বলল,
"আই অ্যাম সরি ভাইয়া, খেয়াল করিনি আপনাদের..."
কিন্তু তার ক্ষমা চাওয়ার পরও ছেলেটার মুখের বিরক্তির ভাব একটুও কমল না। চোখ-মুখ শক্ত করে কঠিন গলায় ধমক দিল উঠল, "চোখ কি জায়গায় থাকে না?!"
এমন বিকট জোরে ধমক দিল যে অনু এক পা পিছিয়ে গিয়ে ভয়ে পুরো কেঁপে উঠল। আমতা আমতা করে শুধু উত্তর দিল, "সরি ভাইয়া..."
ছেলেটি পাশ থেকে তার বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে এক বিশ্রী বিদ্রূপের হাসি দিল। তারপর ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে বলল, "আচ্ছা, তোমাকে মাফ করে দেব, যদি পুরো ক্যাম্পাসে কান ধরে হেঁটে বেড়াও।"
কথাটা শুনেই অনুর কপাল কুঁচকে গেল, চোখের কোণে ফুটে উঠল বিস্ময়। আশ্চর্য তো! ভুলবশত ধাক্কা লেগেছে বলে তো সরি বলেছে, তাহলে সে কেন অকারণে কান ধরে হাঁটবে? সে ভ্রূ জোড়া এক করে পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলল, "অদ্ভুত তো! বললাম না সরি, তাহলে কেন আমি কান ধরব?"
ছেলেটি আড়ম্বর ভঙ্গিতে হাত দুটি পেছনে নিল, আর বুকের ছাতি ফুলিয়ে বলল, "কী ম্যাডাম, নতুন নাকি? সিনিয়রদের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় জানো না?"
ঠিক সেই মুহূর্তে অনুরই ক্লাসের এক সহপাঠী নিহাদ সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। অনুকে সিনিয়রদের সাথে এমন ঝামেলায় জড়াতে দেখে সে নিজের ভয় চেপে দ্রুত এগিয়ে এলো। বিনয়ী গলায় বলল, "ভাইয়া, ছেড়ে দিন না। ভুল হয়ে গেছে ..."
রিয়াশ নামক সেই সিনিয়র ছেলেটি আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে হেসে উঠল, "আরে! তুই ফ্রি নাকি ,ওর সাথে?ওর সাফাই গাইছিস যে? ভালো ভালো, অনেক সাহস করে এসেছিস বুঝি? আচ্ছা, ওকে মাফ করে দেব যদি ওর সাথে তুইও কান ধরে দশবার উঠবস করিস।"
নিহাদ কি বলবে ভেবে না পেয়ে কিছুটা ইতস্তত করতেই অনু নিজের জায়গা থেকে তার দিকে তাকিয়ে দ্রুত মাথা নাড়ল—'একদম ধরবি না!'
তারপর অনু আবারও চোখের দৃষ্টি শক্ত করে বলল, "আপনারা অন্যায় করছেন! আমাদের যেতে দিন।"
পাশের আরেকজন সিনিয়র মুখ বাঁকিয়ে ফিক করে হেসে বলে উঠল, "অন্যায়ই তো ভালো লাগে রে মামণি! এবার জলদি কান ধরো, ফাস্ট ফাস্ট! না হলে কিন্তু ভিডিও বানিয়ে অনলাইনে ছেড়ে দেব!"
ফোন বের করে ভিডিও করার হুমকির কথা শুনে অনুর বুকের ভেতরটা ছাঁৎ করে উঠল, সে আতঙ্কে এবার কিছুটা কাঁপতে লাগল।
ঠিক তখনই নীরবতা চিরে এক গম্ভীর আর বেশ ভারী কণ্ঠ ভেসে এলো, "সাহস থাকলে ছাড়!"
অনু চমকে উঠে ঝটপট ঘুরে তাকাল, সাথে বাকিরাও চমকে সেদিকে ঘুরল।
তাকিয়ে দেখল, এক হাত পকেটে গুঁজে গম্ভীর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং প্রফেসর এহসান সিদ্দিকী!
এহসানকে চোখের সামনে এভাবে দেখতে পেয়ে অনু যেন এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে মনে মনে চরম এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এহসান চোয়াল শক্ত করে গম্ভীর পায়ে এগিয়ে এলো। অনুর ক্লাসম্যাটের দিকে হাতের দুই আঙুল উঁচিয়ে ইশারায় চলে যেতে বলল।ছেলেটি ইশারা বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল।
 নিহাদ চলে যাওয়ার পর এহসান চোখের কোণ তীক্ষ্ণ করে বাকি থাকা রিয়াশ নামক সিনিয়র ছেলেটার দিকে তাকাল।
 "আমার হাতে মার খেয়েছিলি না সেকেন্ড ইয়ারে থাকতে? ভাব তখন আমি তোদের কী অবস্থা করেছিলাম? ফ্যাকাল্টি মেম্বার না হয়েও ...এখন আমি তোর কী অবস্থা করতে পারি, ধারণা আছে? জানিস কাকে কান ধরতে বলছিস?"
কথাটা শুনেই ছেলেগুলোর গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল। তারা ভয় পেয়ে পরপর দু-তিনবার মাথা নাড়িয়ে 'না' সূচক সায় দিল।
"এহসান জোরে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,শি ইজ মাই ওয়াইফ!"
কথাটা শুনে অনু বড় বড় চোখ জোড়া আরও চওড়া করে হা হয়ে এহসানের দিকে তাকাল। এহসান আবার রিয়াশের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, "সাহস কীভাবে হলো ওর সাথে এভাবে কথা বলার?"
দাঁতে দাঁত চেপে, রাগ সামলে কিন্তু অনুর দিকে এক পলকও না তাকিয়েই এহসান শুধাল, "রূপ, তোমাকে কি কিছু বলেছে এরা?"
ছেলেগুলো তখন প্রচণ্ড ভয়ে হাত দুটো জোড় করে অনুকে ইশারা করতে লাগল যেন সত্যিটা না বলে। পেছনের একজন তো এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ল যে ভয়ে নিজের কানে হাতও দিয়ে ফেলল!
অনু এই দৃশ্যটা দেখে আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না, হালকা হেসে ছেলেগুলোর উদ্দেশ্যে শান্ত কণ্ঠে বলল, "আজকের মতো মাফ করে দিচ্ছি। তবে আর যেন কখনো কোনো মেয়ের সাথে এমন না হয়। এখন যান!"
ছেলেগুলো এহসানের রাগী মুখ আর অনুর মুখ নিঃসৃত কথা শুনে বাক্য পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই পেছন ফিরে প্রায় দৌড়ে পালিয়ে গেল।
এহসান ওদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলে নিজের এক হাতের ওপর আরেক হাত রেখে বেশ রাশভারী মুখে বলল, "আচ্ছা ম্যাডাম... আমাকে কিছু না বলতে দিয়ে ওদের সরিয়ে দিলেন? কই, আমার আসার আগে তো কাপাকাপি করছিলেন ঠিকই!"
অনু এহসানের উত্তর দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ করেই তার কপাল আর চোখ-মুখ মুহূর্তের মধ্যে কুঁচকে গেল। কিছুক্ষণ আগের ক্লাসরুমে এহসানের কাণ্ডকারখানা আর গতকাল কেবিনে ডেকে তাকে অপমান করার কথা মনে পড়ে গেল। এত সহজে সে কিছুই ভুলতে পারেনি।
রাগে মুখটা লাল হয়ে উঠল। সে ইচ্ছে করেই অভিমান মেশানো কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
"আপনার কোনো ক্ষমা নেই, প্রফেসর এহসান সিদ্দিকী! আপনি কাল আমার সাথে কী করেছেন, সেটা কিন্তু আমি ভুলে যাইনি। আমি আপনার সাথে কোনো কথা বলব না। আর আপনার লজ্জা করে না নিজের স্টুডেন্টের পেছনে এভাবে বখাটের মতো ঘুরঘুর করতে?"
এহসান অনুর রাগ আর অভিযোগ শুনেও যেন কিছুই শুনতেই পায়নি—এমন ভাব ধরে রইল। একদম স্বাভাবিক গলায়, সোজা অনুর দিকে হাত বাড়িয়ে মুখটা কিছুটা এগিয়ে এনে বলল, "আমার বাচ্চা কই? আমার বাচ্চা দাও।"
অনু পুরোপুরি ভ্যাবাচেকা খেয়ে হাঁ হয়ে গেল.... এই লোক কোন প্রসঙ্গ কোথায় এনে কথা জুড়ে দিচ্ছে! আশ্চর্য! সে চেঁচিয়ে হাত ছড়িয়ে বলল, "কিসের বাচ্চা? কার বাচ্চা?!"
এহসান বিন্দুমাত্র মুখ না বাকিয়ে একদম গম্ভীর মুখে বলল, "তোমার আর আমার বাচ্চা! এই নয় মাসে জমজ হলে তো দুটো বাচ্চা থাকত।"
অনু আর নিজের ভেতরের রাগ ধরে রাখতে না পেরে এহসানের বুকে দুই হাতে আলতো করে শক্ত একটা ধাক্কা দিল, "আমি আপনাকে মাফ করছি না, মি. সিদ্দিকী! আমি আপনার কেউ হই না। যতসব বাচ্চা বাচ্চা কথা... বাচ্চা কি অনলাইন থেকে অর্ডার করব নাকি?"
এহসান নিরলিপ্ত গলায় বলল, "যদি প্রয়োজন হয়, তা-ই দেবে।"
বলার পর সে একবার আড়চোখে ক্যাম্পাসের চারপাশের দিকে তাকাল। ব্যস্ত গলায় বলল, "এভাবে এখানে কথা বলতে… খারাপ দেখাচ্ছে , সবাই হেঁটে যাচ্ছে আর তাকাচ্ছে।"
কথাটা শেষ করেই এহসান সোজা হাঁটা শুরু করল। কয়েক পা যেতেই আবার পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, "আগের জায়গায় ১০ মিনিট পর দেখা করবে, যেখানে আমরা আগে দেখা করতাম। না হলে ঠ্যাং ভেঙে সংসার করব বলেছিলাম না? এবার কিন্তু সেই আশা পূরণ করব!"
অনু শুধু বিস্ফারিত আর হতভম্ব চোখে এহসানের হেঁটে চলে যাওয়া দৃশ্য দেখতে রইল। তার নাকি ঠ্যাং ভাঙবে?!
এহসানের ওপর অনুর রাগটা এবার যেন দ্বিগুণ হয়ে আরও এক ধাপ চড়ে গেল। গাল দুটো বেলুনের মতো ফুলিয়ে, ভারী নিঃশ্বাস ফেলে সে শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এহসানের লম্বা পায়ে হেঁটে দূরে চলে যাওয়ার দৃশ্যই চোখ বড় বড় করে দেখতে লাগল।
"যাব না! আমি একদম যাব না..."
মনে মনে নিজেকে হাজারবার বারণ করতে লাগল অনু। কিন্তু মন কি আর অত কথা শোনে? অবাধ্য মনটা বারবার হাতছানি দিয়ে যেন বলছে—একবার অন্তত যাওয়া দরকার, এহসানের ডাকে সাড়া দেওয়া দরকার। এই মানুষটাকে কিছুতেই যেন উপেক্ষা করতে পারছে না সে!
বিগত কয়েক দিনে নিজের চোখেই কতবার দেখেছে সে, ক্যাম্পাসের কত শত মেয়ে এহসানের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে, ওকে এক পলক দেখার জন্য চাতক পাখির মতো বসে থাকে। এসব কথা মনে পড়তেই বুক চিরে একরাশ অভিমান আর কষ্ট দলা পাকিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইল অনুর। 
হঠাৎ মনে মনে কী যেন একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে অনু নিজেই নিজেকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিড়বিড় করে উঠল, "যাব! দেখি উনি আমাকে এত ডেকে কী বলতে চান!"
লেক রোডের ভেতরের দিকে পুকুরপাড়ে..
 এখানেই আগে তাদের দেখা হতো। জায়গাটা একটু নির্জন, সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই দিকটায় তেমন একটা আসে না। এহসান তাকে ১০ মিনিটের মধ্যে এখানেই আসতে বলেছিল।
 পুকুরপাড়ে এসে অনু ইচ্ছে করেই মুখগুমড়া করে রাখল। দূর থেকেই খেয়াল করল, এহসান পুকুরের পানির দিকে চেয়ে পকেটে হাত গুঁজে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। 
হঠাৎই অনুর নিজের ভেতরের মনটা আবার দোটালায় পড়ে গেল। এগোবে, নাকি পিছ কেটে চলে যাবে? পা দুটো কেমন যেন ভারী হয়ে এলো। ক্ষণিকের জন্য দ্বিধায় পড়ে ভাবল, 'না না, যাওয়ার একদম দরকার নেই! লোকটাকে আর মাথায় উঠতে দেওয়া যাবে না।'
ভাবনা শেষ হওয়ামাত্রই যেই না অনু উল্টো ঘুরে পা বাড়াতে যাবে—ঠিক তখনই এহসান সামনের দিকে তাকিয়ে থেকেই গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
 "বাহ্‌! আসবে না আসবে না বলে নির্ধারিত সময়ের চার মিনিট আগেই চলে আসলে যে?"
হঠাৎ পিছন থেকে এহসানের কথায় অনু চমকে উঠে ঝটপট ঘুরে তাকাল। লোকটার পিঠে কি অতিরিক্ত দুটো চোখ বসানো আছে নাকি?!
না চাইতেও পা দুটো যেন নিজের অজান্তেই চুম্বকের মতো এহসানের দিকে এগোতে লাগল।
এহসান এবারও পেছনে না তাকিয়েই মৃদু হেসে হালকা সুরে বলে উঠল, " আসবে যখন, তাহলে আসার পর আবার পা বাড়িয়ে চলে যাওয়া হচ্ছিল কেন, ম্যাডাম?"
কথাটা শোনামাত্রই অনুর হাঁটার গতি থমকে গেল। চোখ দুটো গোল গোল করে অবাক হয়ে ভাবল—'কী অদ্ভুত! লোকটা এত কিছু বুঝল কী করে? আমি যে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিলাম, আর এখন যে আবার চলে যাচ্ছিলাম—তা ও না দেখে জানল কী করে?'
এবার এহসান ধীরে ধীরে পেছনে ঘুরে দাঁড়াল। অনুর বিস্ময় মাখা নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে একদৃষ্টে দেখতে দেখতে ধীরপায়ে অনুর একেবারে কাছে চলে এলো।
অনুর বুকের ভেতরে তখন ধুকপুকানি তুঙ্গে! সে আমতা আমতা করে তোতলা গলায় জিজ্ঞেস করল, "আ—আপনি... আপনি কীভাবে বুঝলেন যে আমি এসেছি?"
এহসান তার চোখের দিকে গভীর নজরে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে বলল,
 "তোমার উপস্থিতি আমি টের পাই, রূপ।"
অনুর চোখ দুটো আরও বড় হয়ে গেল,
 "কীভাবে?!"
"কাউকে খুব বেশি ভালোবাসলে, চোখের আড়ালে থাকলেও তার উপস্থিতি হৃদস্পন্দনে টের পাওয়া যায়, রুপ" এহসান ধীর গলায় উত্তর দিল।
অনুর কোমল গাল দুটো মুহূর্তে লজ্জায় হালকা লাল হয়ে উঠল, "মিথ্যা কথা! ভালোবাসেন না আপনি আমাকে! যদি এতই ভালোবাসতেন, তবে গতকাল ওভাবে আমাকে অপমান করতেন 
না... একটা অ্যাসাইনমেন্টের জন্য আমাকে 
কত কী শোনালেন!"
এহসান এক পা আরও এগিয়ে এসে অনুর মুখের দিকে তাকিয়ে আলতো করে বলল, "কেন? শোনাব না? একশ বার শোনাব! তুমি অন্যায় করলে তোমাকেই শোনাব।"
এহসানের মুখের ওপর এমন সাফ জবাব শুনে অনু বড় বড় চোখে ফুঁসে উঠে তাকাল, "বেশ! তাহলে আমি চললাম! থাকুন আপনার অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে... "
কথাটা বলেই অনু যেই না গাল ফুলিয়ে উল্টো দিকে পা বাড়াতে গেল—মুহূর্তের মধ্যে এহসান চট করে অনুর অন্য হাতটা নিজের মুঠোয় আলতো করে শক্ত করে ধরে ফেলল!
হাতের নরম স্পর্শ আর এহসানের এই হঠাৎ ধরায় অনুর পুরো শরীর যেন এক পলকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল! 
হাতের নরম স্পর্শ আর হাসনাতের এই হঠাৎ ধরায় অনুর পুরো শরীর যেন এক পলকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল!
"ছাড়ুন আমাকে!" অনু গলায় একরাশ রাগ আর অভিমান স্পষ্ট।
হাসনাত একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিছু হাত ছাড়ার কোনো লক্ষণ দেখা না, বরং ধরা হাতটা আরও একটু শক্ত করে ধরে শান্ত গলায় বলল, "বললাম না, দরকার হলে ঠাঁই ভেঙে সংসার করব? আমার কথা নিশ্চয়ই তোমার মনে আছে?"
অনুর রক্ত হুসে উঠল। সে এক হেঁচকা টানে হাত ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে নিজের ওড়নাটা কাঁধে ঠিক করতে করতে বলল, "আমি ভুল যাইনি কিছুই! কিছু না!"
হাসনাতও পাল্টা হালকা হাসি মুখে ফুটিয়ে চোখ বাঁকিয়ে বলল, "আমিও কিছু ভুলিনি, ম্যাডাম।"
"ভুলে গেছেন! আপনি আমাকে পুরো ভুলেই গেছেন!" অনু আবারও গলা ফুলিয়ে অভিযোগের সুরে বলে উঠল, "আমি বুঝি দেখি না? ক্লাসে আর ক্যাম্পাসে মেয়েরা কীভাবে হ্যাঁ করে আপনার দিকে তাকিয়ে থাকে?!"
হাসনাতের ঠোঁটের কোণে মুহূর্তেই এক চিলতে দুষ্টুমি ভরা হাসি ফুটে উঠল। সে এবার আসল কাহিনিটা বুঝতে পারল—অনুর আসলে গতকালের অপমানের চেয়েও ক্যাম্পাসের মেয়েদের চোখ জোড়ার উপর বেশি জ্বালা...
হাসনাত বুক ফুলিয়ে বেশ অহংকারের ভঙ্গিতে বলল, "হাসনাত ছেলেদের প্রতি একটু-আধটু দুর্বলতা মেয়েদের থাকবেই, মাই ডিয়ার মিসেস সিদ্দিকী! ওটা স্বাভাবিক।"
অনু রাগ দেখিয়ে মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে বলল, "হ্যাঁ, থাকুক! আপনার সাথে বাচ্চাদের মতো এসব বিষয় নিয়ে ঝগড়া করতে আমার একদম ইচ্ছে করছে না।"
হাসনাত এক পা ধীরে ধীরে অনুর আরও কাছে এগিয়ে এলো। তার একদম কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, "তাহলে তুমি কী চাও, বলো?"
কথাটা শুনেও এহসানের চেহারায় কোনো ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল না, বরং তার চোখ-মুখ একদম স্বাভাবিক আর শান্ত রইল। সে অনড় দৃষ্টিতে অনুর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, 
 
"সংসার করবে আমার সাথে?"
হঠাৎ এমন প্রশ্ন শুনে অনু ধক করে ওঠা বুকে এক দৃষ্টিতে এহসানের দিকে তাকাল। এ তো কেবল একটা প্রশ্ন নয়, এ তো অনুর মনের গহীনের একমাত্র ব্যাকুল চাওয়া! এই মানুষটার সাথেই তো সে নিজের জীবনের সমস্ত সুখ আর সংসারের স্বপ্ন বুনেছে। কত ভুল বোঝাবুঝির দিনে সে কত রাত কেঁদেছে, মনে মনে শুধু প্রার্থনা করেছে – এহসানের বিরুদ্ধে থাকা সব যেন মিথ্যা হয়! আজ যখন সব সত্য সামনে পরিষ্কার, এহসান সম্পূর্ণ তার – তখন আর কিসের দ্বিধা?অনু চোখের পাতা দু-তিনবার ওঠানামা করল। মুখে না বললেও চোখের ইশারায় সায় দিল – 'হ্যাঁ, করব।' সে নিজের মনকে বহু আগেই বুঝিয়ে নিয়েছে, এহসানকে ছাড়া বাঁধা মতো কোনো গল্প তার জীবনে আর সম্ভব নয়। তাকে 'না' বলা অনুর সাধ্যের বাইরে।এহসান মুখটা গম্ভীর করার ভান করে হাতের ভাঁজ আলগা না করেই বলল, "আমি প্রাণীদের চোখের ইশারা, ভাষা বুঝি না, রূপা। মুখে বলো!"কথাটা কানে পৌঁছাতেই অনুর মনে হঠাৎ ভেসে উঠল পুরোনো দিনের কথা। একসময় ঠিক এই কথাটাই সে এহসানকে বলেছিল! আজ সেই একই কথা এহসানের মুখে শুনে, না চাইতেও অনুর ঠোঁটের কোণে মিষ্টি এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।এহসান অনুকে হাসতে দেখে মুচকি হেসে বলল, 
"আর দু-দিনের মধ্যে একটা ভালো বাসা খুঁজে পেয়ে যাই, তারপর মা-কে সাথে নিয়ে সোজা তোমাদের বাড়ি যাব। আনুষ্ঠানিকভাবে তোমাকে চাইতে।"'বাসা' শব্দটা কানে পেতেই অনু গোল গোল চোখ করে এহসানের দিকে তাকাল। মাথায় যেন কিছুই ঢুকছে না! সে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
 "বাসা কেন?"এহসান শান্ত স্বরে জবাব দিল, "তোমার জন্য বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি, রূপ। মা-কে সাথে নিয়ে আপাতত একটা হোটেলে উঠেছি।"
অণু যেন এক বড়সড় ধাক্কা খেল! তার চোখের তারা দুটো স্থির হয়ে গেল। সে তোড়জোড় করে আবার প্রশ্ন ছুড়ল, "কেন?! বাড়ি ছাড়লে কেন?!"এহসানের মুখের মায়াবী ভাবটা এক মুহূর্তে গাম্ভীর্যে রূপ নিল। সে একটু থামল, তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, "বাবার সাথে কথা-কাটাকাটি হয়েছে..."এহসানের জবাব শুনে অণু একদম থ বনে গেল। হতভম্ব হয়ে সে খালি এহসানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, তার গলা দিয়ে আর কোনো শব্দ ফুটল না!
# নিভৃতে_যত্নে_রাখা_প্রিয়তমা
# মারিয়াম ফুল
  পর্ব :৩৬

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন