ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কিন্ত আমি

১০ম পর্ব

লেখক: মীরা রায়াদ

#তুমি_কিন্তু_আমি

মীরা_রায়াদ

পর্ব–১০

🚫অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ🚫

শাইয়ান নির্নিমেষ তাকিয়ে ঝুমের দিকে। ঝুম একদম বেখেয়ালি মনে নিজের ডান হাতটি গ্লাসের উপর রাখলো। শাইয়ান তখনো ঝুমের চোখের দিকে তাকিয়ে। আর ঝুম? সে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে। শাইয়ান এবার নিজের বাম হাত তুলে ঠিক ঝুম যেখানে হাত রেখেছে সেখানেই নিজের হাতটি রাখলো। মুহূর্তে ঝুমের ছোটখাটো হাতটি শাইয়ানের দানবীয় হাতের ছায়ায় হারিয়ে গেলো। তবুও শাইয়ানের শান্তি লাগলো। বড্ড শান্তি লাগলো। মেয়েটা ঠিক তার বুকের কাছে পরে। এই ব্যাপারটা যেন তার আত্মাকে আরো পুলকিত করলো। স্বস্তি ও শান্তিতে আপনা থেকেই সে ঝুঁকে এলো। কোমর বাঁকিয়ে ঝুমের সমান মাথা এনে গ্লাসের সাথে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করলো। ইস, এ এক স্বর্গীয় সুখ। এই মেয়েটা, মেয়েটার উপস্থিতি তার মনটাকে শান্তি দেয়। চারিপাশ নরম উষ্ণতায় ভরিয়ে তোলে। শাইয়ানের নড়চড় নেই। সে চোখ বন্ধ রেখেই ট্রাউজারের পকেট হাতড়ে ডান হাতে ফোন বের করলো। এরপর নীরবে ফোনে কিছু করে কানে চেপে তার ও ঝুমের হাতের স্থানে তাকিয়ে রইলো। মাঝের দেয়ালটা না থাকলে সে ঝুমকে বুঝি স্পর্শ করতে পারতো! কথাটি ভেবেই শাইয়ানের নিঃশ্বাস দ্রুত গতিতে ছুটতে লাগলো। ভয়ানক অনুভূতি।

-রিপোর্টারকে চলে যেতে বলুন। গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের কারণে আজ সময় দিতে পারবো না। এক কাজ করুন, আপনি তার নাম্বার রেখে দিন। আমি নিজে তাকে পরবর্তী মিটিংয়ের ডেট ও টাইম জানিয়ে দেবো।

ঝুমের ঠিক পিছনে কিছুটা দূরে ডেস্কে থাকা ছেলেটি টেলিফোন কান থেকে নামিয়ে ডাকলো ঝুমকে।

-এক্সকিউজ মি।

ঝুম এতক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিজেকে দেখছিল। এবার সে মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো। শাইয়ান ঝুমের প্রতিটি গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে। ঘাড়ের কাছে ঢিলে হয়ে থাকা একগুচ্ছ চুলের বড় খোঁপা, চিকন সরু গলা, কাঁধ। কাঁধ গলিয়ে যাওয়া গাঢ় নীল রঙের শাড়ির আঁচল, সবটাই নিখুঁত চোখে দেখলো। যত দেখলো ততই যেন তার তৃষ্ণা বাড়লো। উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের গলায় ছোট চিকন স্বর্ণের চেইনটা যেন জ্বলজ্বল করে নিজের আধিপত্য জানান দিচ্ছে শাইয়ানকে। অদ্ভুত হলেও এই সামান্য চেইনটার প্রতি শাইয়ানের রাগ হলো। বুকে জ্বালা অনুভব করলো। ফোস করে নিঃশ্বাস নিয়ে নিজের এই অবাধ্য অনুভূতিকে সে লাগাম টানতে চাইলো। কিন্তু মন যে তার মানতে নারাজ। শাইয়ান সেই মুহূর্তে বুঝতে পারলো তার আর বাঁচার উপায় নেই। সে ভীষণ বাজে ভাবে ফেঁসে গিয়েছে। এই মেয়েটা তাকে নিজের মায়ায় বেঁধে নিয়েছে। কোথাও হয়তো সে নিজেই সেই মায়াকে প্রশ্রয় দিয়েছে। শাইয়ান আর দাঁড়ালো না সেখানে। দীর্ঘ আধাঘন্টা অপেক্ষা করানোর পর অবশ্যই তাকে ভালো কিছু বলবে না। শ্রাবনী যে তাকে ভীষণ ভাবে ধুয়ে দিবে সেটা বুঝতে পেরেই সে ওই কামরা ছাড়লো। আর যাই হোক সে ঝুমের চোখে নিজের জন্য রাগ, ক্ষোভ দেখতে পারবে না। সহ্য হবে না যে।

-জ্বি।

ঝুম হেঁটে এগিয়ে গেলো ছেলেটার কাছাকাছি। ছেলেটা এবার নরম গলায় বলল,

-দুঃখিত, শাইয়ান স্যার আজ দেখা করতে পারবে না। কিছুদিন পর ইন্টারন্যাশনাল টুর্নামেন্ট, আর্জেন্ট মিটিংয়ের কারণে আজ সম্ভব নয়। আপনার নাম্বারটি দিয়ে যান, স্যার নিজে যোগাযোগ করবে বলেছে।

এতক্ষন বসিয়ে রেখে এখন বলছে সম্ভব নয়? কি আশ্চর্য! এটা কেমন কথা? আগে বললেই হতো তাহলে এখানে বসে সময় নষ্ট তো হতো না তাদের। এরা নিজেদের কি মনে করে? মনে মনে ঝুম ভয়ানক রেগে গেলো। অভদ্র, ম্যানারলেস বলতেও ভুললো না। কিন্তু মুখে তা বিন্দুমাত্র প্রকাশ না করে করুন চেহারায় তাকিয়ে রইলো হালকা-পাতলা গড়নের ছেলেটির দিকে। কি যে বলবে বুঝতে পারলো না। বিরক্তিতে মাথা ধরে গেলো। এটাকে কি বলা হয়? অপমান? হ্যা, অপমানই তো। দুদিন আগে থেকে ঠিক করা সিডিউল চেঞ্জ করলো তাও কি না ৩০ মিনিট বসিয়ে রেখে। শরীর জ্বলে যাচ্ছে ঝুমের। অথচ সে নিজের রাগ দেখাতে পারছে না। কোথায় ভেবে ছিল আজ কাজ শেষ হলে দুদিনের মাঝে দেশে ফিরে যাবে। কোথায় কি? এখন আবার যাওয়ার সময় পেছালো।

-সময় দিতে পারবে না সেটা আপনার স্যার আগে বললেই পারতো। এভাবে এখানে এত সময় বসিয়ে রাখার কোনো মানে হলো?

ছেলেটা জানে এটা ঠিক না, কিন্তু তবুও সে তা স্বীকার করল না। এই সাংবাদিকগুলো ভীষণ তেরা। এদের লাই দিলে মাথায় উঠে যায়। এসবে সে অভ্যস্ত। তাইতো চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্ত নিয়ে ঝুমের দিকে তাকিয়ে বলল,

-কাজ থাকতেই পারে, এখানে আমাদের হাত নেই। ক্রিকেটাররা তো আর বসে থাকে না।

-আপনি কি বলতে চাচ্ছেন আমরা বসে থাকি?

ছেলেটা বেজায় বিরক্ত। বিরক্তিতে তার মুখ থেকে বিরক্তি সূচক শব্দ বেরিয়ে এলো। যার সাথে ইন্টারভিউ সে সময় না দিতে পারলে এখানে তার দোষ কোথায়?

-আপনি নিজের নাম্বার দিয়ে যান। যা বলার স্যার ফোন দিলে তখন বলবেন।

বড় রূঢ় ব্যবহার। ঝুম এবার রেগে যাচ্ছে। এটা তার স্বভাবসুলভ আচরণ নয়। কিন্তু এই ছেলের কথার ভাব একদমই ভালো না। এত অহংকার কেন থাকবে? প্রতিটি পেশার মানুষ নিজ নিজ দিক থেকে ব্যস্ত। কিন্তু এই সেলিব্রেটিরা নিজেদের যে কি মনে করে? মাটিতে পা পরে না একদম। এক একজনের আকাশ সমান নাক উঁচু। এদের এই ভাবের কারণেই ঝুমের ওদের সহ্য হয় না। কিন্তু এরপরও ঝুম নিশ্চুপ। কাজ যতক্ষন শেষ না হচ্ছে ততক্ষণ যে এসব সহ্য করে নিতে হবে তা ঝুম বেশ বুঝতে পারছে। অতঃপর রাগে নাকমুখ কুঁচকে নিজের নাম্বার দিয়ে যেতে যেতে ছেলেটিকে শুনিয়ে শুদ্ধ বাংলায় বলে গেলো,

-আপু ঠিকই বলে, পাকিস্তানিরা সব এক একটা রাজাকার।

এরপর সে আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালো না। ধুপধাপ পা ফেলে চলে গেল। এদিকে ছেলেটি বেকুবের মতো তাকিয়ে ঝুমের যাওয়ার পানে। কি বলল মেয়েটা? সে বুঝতে পারেনি।

বাইরে প্রচুর গরম। এতক্ষন এসি রুমে ছিল বলে ঝুম বুঝতে পারেনি। বেলা যত গড়াচ্ছে তত গরম বাড়ছে। পাকিস্তানে ভ্যাপসা গরম। আবহাওয়া ভীষণ রুক্ষ। যা ঝুমকে ভালই ভোগাচ্ছে। সে বেরিয়ে এসে দেখতে পেলো শ্রাবনী নিজের মতো ভিডিও রেকর্ড করছে। ভালই হলো, নতুন কিছু রিপোর্টে অ্যাড করা যাবে।

-চলো আপু।

শ্রাবনী মাত্রই ক্যামেরা বন্ধ করেছে। ঝুম অনেকক্ষন থেকেই দাঁড়িয়ে আছে। শ্রাবনীকে বিরক্ত করেনি। মেয়েটার এই গুনটা চমৎকার। কখনো কাউকে কাজ করতে দেখলে বিরক্ত করে না। চুপটি করে বিড়াল পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কাজ শেষ হলে কথা বলবে।

-একি রে! এভাবে ঘেমেছিস কেনো?

কিছুক্ষণ রোদে ছিল, এতেই ঝুম ঘেমে অস্থির। অথচ এদিকে শ্রাবনী দিব্যি রয়েছে। শুধু ওর ফর্সা মুখটা রোদের তাপে লাল হয়ে আছে। ঝুম শাড়ির আঁচল তুলে মুখের, গলার ঘাম মুছে বলল,

-ও কিছু না। এখানের আবহাওয়ার সাথে মানাতে পারছি না। তোমার কাজ শেষ হলে চলো।

-চলো মানে? ইন্টারভিউ নিবি না?

-জমিদারের পুত্র সময় দিতে পারবে না।

ঝুমের চোখমুখ বিরক্তিতে কুঁচকে আছে। শ্রাবনী থতমত খেলো। আজ পর্যন্ত ঝুমকে প্রোফেশনাল কাজে এতটা বিরক্ত হতে দেখেনি সে। তবে আজ এমন কি হলো?

-জমিদারের পুত্র? এটা আবার কে?

ঝুম পা বাড়াতে বাড়াতে বলল,

-যার ইন্টারভিউ নিতে এলাম সে।

শ্রাবনী নিজের ক্যামেরা হাতে ঝুমের পিছু ছুটতে ছুটতে বলল,

-ইন্টারভিউ হবে না?

-না, তার জমিদারি ভেসে যাচ্ছে। উদ্ধার করতে গিয়েছে।

শ্রাবনী একের পর এক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েই যাচ্ছে। তার শান্তশিষ্ট ঝুমিটা এমন রেগে আছে কেনো? সে কিছুতেই বুঝতে পারল না বিষয়টি। ইন্টারভিউ নিতে এসে এই প্রথমবার তারা ফিরে যাচ্ছে না। এর আগে এর থেকেও বড় বড় কাহিনী হয়েছে। একবার তো টানা ৪ ঘণ্টা বসে থাকার পর তাদের জানানো হয় ইন্টারভিউ ক্যান্সেল। সেবার ঝুম হেসে বেরিয়ে এসেছিল কিন্তু এরপর সেই বেচারার ভয়ানক হাল করে ছেড়ে ছিল। এবারও যে এই বেচারার সাথে তেমন কিছু হবে তার পূর্বাভাস পেয়ে গিয়েছে শ্রাবনী। কিন্তু কথা হচ্ছে মেয়েটা এত রেগেছে কেনো? সে এই কথা জিজ্ঞেস করলো না। উল্টো জানতে চাইলো,

-তা জমিদার ৩০ মিনিট পর জানালো কেনো?

শ্রাবনী হয়তো ভুল প্রশ্ন করে ফেলল এই সময়ে। ঝুম হঠাৎ তার হাঁটা থামিয়ে পিছু ফিরে শ্রাবণীর মুখোমুখি দাঁড়ালো। রাগে গাল দুটো ভয়ানক ফুলে গিয়েছে মেয়েটার। নাকের ডগা কিছু মুহূর্ত পরপর ঘামে ভিজে উঠছে।

-এটাই তো কথা। সম্ভব না আগে বললেই হতো। এত সময় বসিয়ে রাখার মানে কি? আবার ব্যবহারের কি শ্রী! জঘন্য, জঘন্য।

-তোকে কিছু বলেছে?

শ্রাবনী এবার ক্ষেপেছে। আগপিছ না ভেবেই সে আবারো বলল,

-চল শা*লাদের দেখে আসি বুকের পাটা কত বড়।

সে মুহূর্তে শার্টের হাতা গুটিয়ে ফেলেছে। এই মেয়েকে ঝুম খুব ভালো করে চেনে। মুখ চলার আগে হাত চলে এর। মুখ যে কম চলে তা বললেও ভুল হবে। দুটাই সমান মাত্রায় চলে। তবে প্রসঙ্গ যখন মারপিঠের আসে তখন শ্রাবণীর তুলনা হয় না। এখন যদি এই মেয়ে মারামারি করে তবে নির্ঘাত তারা পুলিশ কেসে ফেঁসে যাবে। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে ঝুম শ্রাবনী হাত টেনে আবারো পা বাড়ালো। কিন্তু আজ তার মুখ বন্ধ নেই। সবসময় চুপচাপ থাকা মেয়েটা আজ শ্রাবনীকে কিছু বলতেই দিলো না। পুরোটা পথ সে শাইয়ানকে রীতিমত বাংলাওয়াশ করলো। যেতে যেতে রেগে অস্থির হয়ে বারবার বলতে লাগলো,

-দেখবে আপু ওই লোক এই কাজের শাস্তি অবশ্যই পাবে। জীবন তেনা তেনা হয়ে যাবে। এক মুহূর্ত শান্তি পাবে না। আমাদের আজ এত সময় অপেক্ষায় রেখেছে না! উনিও অপেক্ষায় থাকবে। তখন বুঝবে অপেক্ষা করতে কেমন লাগে।

অথচ ঝুম জানে না, তার বলার অনেক আগে থেকেই শাইয়ান প্রতিনিয়ত কারো জন্য অপেক্ষা করছে? কেউ একজন সত্যিই তার শান্তি কেড়ে নিয়েছে সেই ব্যাপারে কি মেয়েটার ধারণা আছে? নেই, বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।

অপরদিকে সারাটা দিন শাইয়ান আজ হিচকি দিয়ে গিয়েছে। এত পানি খেলো কাজে দিলো না। হিচকির তাণ্ডবে অস্থির হয়ে ছিল পুরোটা দিন। একটু কমে আবারো শুরু হয়। এই যন্ত্রণায় সে আজ প্র্যাক্টিসটাও ঠিকঠাক করতে পারেনি। অতঃপর ঘুম থেকে ভোর ৩ টায় উঠে সেই যে প্র্যাক্টিসে নেমেছে এখনো তা বহাল রয়েছে। সবুজ-কালো মিশেলের জার্সি, কালো ট্রাক প্যান্ট, স্পোর্টস সু, হেলমেট, গ্লাভস পরে জান-প্রাণ লাগিয়ে নেট প্র্যাকটিস করছে একা একা। আহির বড় ফাঁকা যুক্ত নেটের ফাঁকে নিজের দুহাতের আঙুলগুলো ভরে দিয়ে উজবুকের মতো তাকিয়ে সে সব দেখছে। তার সাদা অ্যাপ্রনটা কিছুটা দূরে অবহেলায় লোহার রেলিংয়ের ওপর পরে আছে। আহির কিছু মুহূর্ত আগেই এখানে এসেছে। সে প্রায়ই এমন কাজ করে। আজ তার নাইট শিফট ছিল ৩ টা পর্যন্ত। কাজ শেষে সে সোজা এখানে এসেছে। শাইয়ান করাচিতে থাকলে প্রায়ই আহির ওর সাথে দেখা করতে চলে আসে। এখানে এসে সে শাইয়ানের মুখ থেকে বড় কষ্টে আজকের কাহিনী বের করেছে। তারপর থেকেই ওর মুখের অবস্থা খারাপ।

-তুমিই তো বলেছিলে ঝুমকে তোমার কাছে আসতে দিতে। সে আসলে তুমি আর তাকে যেতে দিবে না কোথাও। তাহলে দেখা করলে না কেনো?

আহিরের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে একটা বল ঠিক তার থেকে কয়েক ইঞ্চি দূরত্বে গিয়ে আবারো ফিরে গেলো। বলের গতি ভয়ানক। ঠিকঠাক লাগলে তার অবস্থা খারাপ হয়ে যেতো। আতঙ্কে আহির বাকরুদ্ধ। শাইয়ান নিজের বাম হাতে বড় প্যাশনেটলি হেলমেট খুলে ডান হাতে ব্যাটটি তুলে আহিরের দিকে তাক করে বলল,

-মিস হয়নি। আমি চেয়েছিলাম বলে টার্গেট মিস হয়েছে। এরপর থেকে তোমার মুখে ঝুম শব্দটি শুনতে চাই না।

-তুমি অদ্ভুত আচরণ করছো শাইয়ান। আমি তোমার ভাই।

-তো?

শাইয়ান ভাবলেশহীন। তার সম্পূর্ণ শরীর ঘামে চুপচুপে। আহির আহত হলো ওর কথায়। দুঃখী গলায় বলল,

-তাকে আমি ভাবির নজরে দেখি শাইয়ান। অথচ তুমি আমাকে নিজে জেলাস!

-ভাবির নজরে যখন দেখো তবে এবার থেকে ভাবি বলে ডাকবে।

-হাহ! কি?

-হুম।

আহির এতক্ষনে হয়তো কিছু বুঝতে পেরেছে। সে দ্রুত পা ফেলে নেটের মাঝে প্রবেশ করলো। শাইয়ান ততক্ষনে ঘাসের ওপর বসে পড়েছে। মাঠের চারপাশে লাইট জ্বলছে। যার দরুন রাত কি দিন বোঝা যাচ্ছে না।

-কাহিনী কি খুলে বলো। আর ভণিতা করো না প্লীজ।

আহির নিজেও শাইয়ানের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে। শাইয়ান ওর দিকে তাকিয়েই বলল,

-তোমার মনে হয় আরীবা না এলেও আমি তাকে কোথাও যেতে দিতাম?

আহির উত্তর দিলো না, বাধাও দিলো না। সে আজ শাইয়ানের মুখ থেকে সব শুনতে চায়। শাইয়ান গ্লাভস খুলতে খুলতে এক মনে বলে গেলো,

-প্রথমবার কাউকে দেখে আমি আটকে গিয়েছি আহির। ওই চোখ, ওই বড় বড় ভাসাভাসা চোখ দুটিতে তখন প্রথমবার দৃষ্টি পড়লো, তুমি বিশ্বাস করবে না আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়ে ছিল। আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলে ছিলাম। কেন, কি হয়ে ছিল আমি জানি না। শুধু জানি এরপর থেকে আমি একটা রাতও প্রপারলি ঘুমাতে পারিনি আহির। যখন যখন সে আমার আশেপাশে এসেছে আমি হাঁসফাঁস করেছি। অথচ এই যে দূরে থাকি তাতেও পুড়ে মরি। কিভাবে তাকে যেতে দিই বলো? সে না চাইলেও আমি তাকে জোর করে নিজের কাছে রাখবো।

-ভালোবাসো?

আহির প্রশ্নটি জেনে বুঝেই করলো। দৃষ্টি তার তীক্ষ্ণ শাইয়ানের উপর। শাইয়ান ওর দিকে তাকালো না। খালি হাত দুটো পিছনের দিকে ঘাসের ওপর ফেলে হেলে পড়ল। উত্তর না দিয়ে মাথা আকাশের দিকে দিয়ে ভয়ানক শীতল কন্ঠে বলল,

-জাস্ট ইম্যাজিন, শি ইজ মাই ওয়াইফ।

আহির দৃষ্টি নিচু করে হাসলো। তার উত্তর সে পেয়ে গেছে। ঝুমকে শাইয়ান ছাড়বে না এতটুকু নিশ্চিত। শাইয়ান থেমে নেই। সে তার কাল্পনিক জীবনের এক একটি স্বপ্ন আহিরকে আজ বলে যাচ্ছে।

-ভাবো তো, ছোট খাটো মেয়েটা শাড়ি পরে সারাক্ষন আমার বউ সেজে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে। ব্যাপারটা দারুণ হবে না? আমি যখন ম্যাচ খেলবো সে আমার বউ হয়ে মাঠের এক কর্নারে আমার জন্য অপেক্ষা করবে। এই ব্যাপারগুলো ভাবলেই শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায় আহির। সবটা স্বপ্ন স্বপ্ন লাগে।

-এত ভালো কবে বাসলে?

-জানি না। আমিও ভাবি জানো তো, মাত্র কয়েকদিনের পরিচয়ে কাউকে এত ভালোবাসা যায়? এইতো সেদিন দেখলাম তাকে। মেয়েটার জন্য বড্ড ভুগেছি আমি। হাসপাতালে পর্যন্ত পাঠিয়ে দিলো আমাকে।

এ যাত্রায় দুই ভাই হেসে উঠলো। শুনতে হাস্যকর লাগলেও মারাত্মক ব্যাপার। কাউকে প্রথম দেখায় জ্ঞান হারিয়ে বুঝি হাসপাতালে যাওয়া যায়? মেডিক্যালের ভাষায় এটাকে কি বলে?

-তোমার উচিত তার সাথে সময় কাটানো শাইয়ান। আজ বড় সুযোগ ছিল। তা না করে তুমি উল্টো ওনাকে অপেক্ষা করিয়ে দেখাও করলে না। লাভ হলো কি?

-লাভ অবশ্যই হয়েছে আহির।

-তাই?

-হুম। তুমি বুঝবে না। আগে কারো মায়ায় পরো তারপর বুঝবে।

আহির এবার আরাম করে ঘাসের ওপর বসলো। ছেলেটার নিজের পোশাক ময়লা হওয়ার বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই।

-ফালতু কথা বলো না তো। সব জেনেও অবুঝ সাজবে না। মায়া, ভালোবাসা কি সে ব্যাপারে আমার জ্ঞান তোমার থেকে বেশি।

-ওয়াও।

শাইয়ান ব্যঙ্গ করল তা বেশ বুঝতে পেরেছে আহির। সে এই প্রসঙ্গে কথা না বাড়িয়ে জানতে চাইলো,

-কেনো করলে এমন বললে না তো।

-সিম্পল ব্যাপার। তুমি কি বলেছিলে মনে আছে?

-কোন ব্যাপারে?

-আমার ইন্টারভিউটা হলে তারা দেশে ফিরে যাবে।

-হ্যাঁ।

-একারণেই আমি ইন্টারভিউ দিই নিই।

-সিরিয়াসলি!

-ইয়াহ। আমি চাইলেই আগে বারণ করতে পারতাম কিন্তু তাকে দেখার লোভ সামলাতে পারিনি। একদম কাছে ছিল জানো? আমার সামনে। এই পর্যন্ত হয় আমার।

শাইয়ান নিজের বুক বরাবর হাত নিয়ে দেখিয়ে বলল। আহির একটা বিষয় লক্ষ্য করেছে। অন্যান্য সময় শাইয়ানের মুখভঙ্গি যতটা রূঢ়, ভাবলেশহীন থাকে, ঝুমের কথা বলার সময় ঠিক তার বিপরীতটা দেখা যায়। নরম, যত্ন, ভালোবাসায় মাখানো থাকে শাইয়ানের প্রতিটি কথা। এই যে এখন এই আদুরে ভাব শুধু ঝুমের জন্যই তো নাকি!

-এত ছোট?

-হ্যাঁ। আচ্ছা কতটুকু উচ্চতা হবে? পাঁচ ফুট?

আহির মাথা নাড়িয়ে বলল,

-সম্ভবত। যেহেতু তোমার এত ছোট পাঁচ ফুট হতে পারে।

-এক ফুটের ছোট, ভাবা যায়! ওই পাঁচ ফুটের মেয়েটা কিছু না করেই আমাকে ফাঁসিয়ে ফেলল আহির।

শাইয়ান কথাটি এমন ভাবে বললো যে আহির নিজের হাসি থামাতে পারল না। শাইয়ান নিজেও পরপর হেসে উঠলো।

-তাহলে এখন কি করতে চাও?

-আমার হাতে সময় নেই আহির। সামনের সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়া যেতে হবে। এরপর আবারও কবে তার সাথে দেখা হবে জানি না। তাই যতটুকু সময় আছে আমি তার সাথে কাটাতে চাই। তার মনে নিজের জন্য কিছুটা ছাপ রেখে যেতে চাই। যেন আমি না থাকলেও সে আমার চিন্তা থেকে মুক্তি না পায়।

-কিন্তু তুমি চলে গেলে তো সেও নিজের দেশে ফিরে যাবে।

-এজন্যই তো ইন্টারভিউ দেবো না।

-তাহলে কি করবে?

শাইয়ান এবার উঠে দাঁড়ালো। আহিরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বলল,

-তার সময় নষ্ট করবো আর আমার সময় ভালো করবো।

এই কথার মানে আহির বুঝলো না। অথচ শাইয়ান ওকে সম্পূর্ণটা খোলসা না করেই যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছে। আহির এবার হম্বিতম্বি করে উঠে দাঁড়ালো। শাইয়ানের পিছু ছুটতে নিয়ে মনে পড়ল তার অ্যাপ্রনের কথা। অতঃপর অ্যাপ্রন নিয়ে আবারও শাইয়ানের পিছু নিল।

-মানে কি শাইয়ান?

আহির চেঁচিয়ে বলল। কিন্তু শাইয়ান উত্তর দিলো ধীরে, রয়ে সয়ে।

-কাল আমার তরফ থেকে ডেট।

-কার সাথে? ভাবির সাথে?

আহির ততক্ষনে শাইয়ানের পাশাপাশি এসে পড়েছে। দুই ভাইয়ের চওড়া কাঁধ, বলিষ্ঠ দেহ, লম্বা শরীর ভোরের আলোয় মোহনীয় লাগছে। পাশাপাশি তাদের আলাদা করা যেন ভীষণ কষ্টকর।

-তোমার মুখে ভাবি মানিয়েছে। আই লাইক ইট।

-আই আলসো লাইক ইট।

দূর থেকে আজানের ধ্বনির সাথে দুই ভাইয়ের মৃদু হাসি ও খুনসুঁটির শব্দ ভোরের বাতাসের সাথে মিলে মিশে গেল।

_______

-আমরা কোথায় যাচ্ছি?

ঝুম বর্তমানে শাইয়ানের গাড়িতে শাইয়ানের পাশের সিটে বসে আছে। ড্রাইভ করছে স্বয়ং শাইয়ান। সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠার পর ফোন চেক করে সে এক আশ্চর্যজনক জিনিস পায় নিজের ফোনে। একটি অপরিচিত নাম্বার থেকে তাকে বার্তা পাঠানো হয় বিকেল ৩:৪০ এ যেন সে তৈরি হয়ে গলির মাথায় অপেক্ষা করে। তাকে নিতে ক্যাপ্টেন আনসারী আসবেন। সাথে নোট করে লেখা ছিল, শুধু তাকেই আসতে হবে। সাথে দ্বিতীয় কেউ না। বিষয়টি তার খটকা লাগে। তৎক্ষণাৎ সে ম্যাসেজটা মেহেরুন্নেসাকে দেখালে, মেহেরুন্নেসা কিছু সময় নিরব থেকে জানায়,

-এটা শাইয়ানের পার্সোনাল নাম্বার। আপনি নিশ্চিন্তে যেতে পারেন। ভয়ের কিছু নেই।

তার চোখমুখ ছিল অস্বাভাবিক রকম শীতল। কারণ ঝুমের জানা নেই। সেসব নিয়ে সে ভাবার সময়ও পায়নি। সারাটা দিন তার মাথায় ছিল ক্ষুদ্র সেই বার্তাটুকু। শুরুতে ভেবেছিল সে যাবে না। কাল ওমন হওয়ায় ভীষণ রেগেছে সে। অতঃপর নিজের সাথে যুদ্ধ করে সে অবশেষে টকটকে মেরুন একটি শাড়ি পরে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল। ভাগ্যিস শ্রাবনী বাড়িতে ছিল না। থাকলে নিশ্চিত মেয়েটা প্রশ্ন করে করে ঝুমের মাথা খেয়ে ফেলতো। আজ যেহেতু শাইয়ানের সাথে ঝুমের ইন্টারভিউ ছিল তাই মেহেরুন্নেসা তাকে অফিস যেতে বারন করে দিলো। কিন্তু শ্রাবনীকে ঠিকই পাঠিয়ে দিল।

ঝুম ঠিক ঠিক ৩:৪০ এ গলির মাথায় এসে দাঁড়ালে দেখতে পেলো ছোট কালো কুচকুচে একটি গাড়ি সগৌরবে দাঁড়িয়ে। গাড়ির গ্লাসগুলো তুলে রাখার ফলে ঝুম বুঝতে পারল না ভিতরে কে। সে যদিও সেদিকে পাত্তা দিলো না। বরং রাস্তার দুপাশে তাকিয়ে কাউকে খুঁজতে লাগলো। মিনিট দুই কি তিন পর গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলো শাইয়ান। পরনে কালো শার্ট, প্যান্ট। উপরের একটি বোতাম খোলা থাকায় বুকের কিছু অংশ ও গলা দেখা যাচ্ছে। একমুহূর্তের জন্য মনে হলো ফর্সা ওই দৃশ্যমান অংশটুকু ঝুমের চোখ ঝলসে দিচ্ছে, এতটাই মোহনীয় লাগছে শাইয়ানকে। ছোট ছোট চুল, টাক ইন করা শার্ট, বাম হাতের কালো ওই ঘড়িটাও যেন আজ শাইয়ানকে কমপ্লিমেন্ট করছে। এমন মোহনীয় রূপের সামনে ঝুমের নিজেকে বড্ড ফিকে লাগলো। শাইয়ান গাড়ি থেকে বেরিয়ে কথা বলল না। ঘুরে গিয়ে অপরপাশে দরজাটা খুলে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ঝুম তাজ্জব বনে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ পিটপিট করে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করেও কয়েকবার হুমড়ি খেয়েছে। সে বিশ্বাস করতে পারছে না যে, শাইয়ান তার জন্য দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে।

-আরীবা, দ্রুত আসুন।

ঝুমের বুক ধড়ফড় করছে। প্রতিবার এই লোক তাকে আরীবা বলে কেনো ডাকে? কোনো এক বিপদ সংকেত তাকে আগাম সতর্ক করছে কিন্তু বেচারি এত কিছু বোঝার অবস্থায় নেই। সে বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে অপারগ। উত্তেজনায় হাতপা কাঁপছে।

-আরীবা।

শাড়ির কুচি সামলে ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো শাইয়ানের ঠিক পাশে। শাইয়ান সাথে সাথে দরজা ধরে রাখা হাতটা সরিয়ে ওকে জায়গা দিলো। ওই সামান্য সময়ে ঝুম দমবন্ধ করে ছিল। কান, গাল গরম হয়ে উঠছে বেচারির। কি হচ্ছে বুঝতে পারছে না ও। ঝুম বসতেই শাইয়ান নিজেও গিয়ে বসে পড়ল নিজের আসনে। এরপর আর কেউ কারো সাথে কথা বলল না। গাড়ি তারেক রোড ছাড়িয়ে শহরে-ফয়সালের পথ নিলো। এদিকে ঝুম কিছুই চেনে না। সে এই পথে কখনো আসেনি। তবে দেখে মনে হচ্ছে হাইওয়ে। বড় চওড়া রাস্তা জুড়ে বড় বড় গাড়ি যাচ্ছে। প্রায় ১৫-২০ মিনিট পর হঠাৎ ঝুম লক্ষ্য করলো একটি বড় বোর্ডে লেখা ক্লিফটন এরিয়া। এই নামটা তার পরিচিত। বাংলাদেশে থাকতে সে টুকটাক করাচি শহর নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছে। সেই সূত্রেই সে জানে ক্লিফটন সী-বিচের কথা। তারা কি তবে সী-বিচে যাচ্ছে? অতঃপর কৌতূহল মেটাতে না পেরে উক্ত প্রশ্নটি করলো। কিন্তু শাইয়ান উত্তর দিলো না। বরং আগের থেকেও বেশি শক্ত হাতে স্টিয়ারিং হুইল ঘোরাতে লাগলো। ঝুম অপমানিত বোধ করল। কেউ প্রশ্ন করলে উত্তর করতে হয় এটাও কি জানে না? অদ্ভুত লোক।

-আপনি সর্বদা এই পোশাকটি পরিধান করেন কেনো?

উত্তর না পেয়ে ঝুম জানালার বাইরে দৃষ্টি দিয়ে ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে শাইয়ান এই প্রশ্নটি করলো। ঝুম ঘাড় ঘুরিয়ে শাইয়ানের দিকে তাকালো। শাইয়ান একবারের জন্যও এদিকে তাকায়নি। ঝুম এই প্রশ্নের কি জবাব দেবে বুঝে উঠলো না। সে প্রশ্ন করলো উত্তর না দিয়ে উল্টো একটা প্রশ্ন ধরিয়ে দিয়েছে। এই মানুষটার মতিগতি ঝুম ধরতে পারছে না।

-শাড়ি?

-হুম।

-ভালো লাগে তাই।

উত্তর সে দিতে চাইছিল না। কিন্তু সে তো আর এই লোকের মতো অভদ্র না। তাই দিলো। কিন্তু সম্পূর্ণ সত্যিটা বলেনি। হ্যাঁ, শাড়ি পরতে তার ভীষণ ভালো লাগে, কিন্তু সর্বদা শাড়ি পরার পিছনে অন্য একটি বড় কারণ রয়েছে। মূলত তার উচ্চতা কম হওয়ার কারণে বয়সের তুলনায় তাকে ছোট লাগে। যা তার প্রফেশনে বাধা সৃষ্টি করছিল খুব। তাছাড়া সে যখন চাকরিতে প্রবেশ করে তখন সে ছোট ছিল। বাচ্চা বাচ্চা লাগতো বলে কেউ গুরুত্ব দিতো না। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে শাড়ি পরা। শাড়ি পড়লে তাকে কিছুটা বড় লাগে বলেই সে শাড়ি পরা শুরু করে। এক সময় তা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায় বলে আর ছাড়তে পারেনি।

শাইয়ান হয়তো তার উত্তরে খুশি হয়নি। ঠিক বোঝা গেলো না তার মুখের ভাবে।

-এরপর থেকে আর শাড়ি পড়বেন না।

ঝুম শাইয়ানের খোঁচা খোঁচা দাড়ি ভর্তি শক্ত চোয়ালের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল,

-কেন?

সাথে সাথে গাড়ি থেমে গেল। এবার শাইয়ান দৃষ্টি ফিরালো ঝুমের দিকে। ঝুমের দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে ফিসফিসিয়ে বলল,

-এক্সিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

-কিহ!

ভরকে ঝুম পিছিয়ে গেল। শাইয়ান তখনো ওর দিকে তাকিয়ে। মেয়েটাকে সে কীভাবে বোঝা তার বুকের মাঝে কি চলছে? কি ভীষণ অস্থিরতা নিয়ে সে ড্রাইভ করেছে তা সে কীভাবে বোঝাবে? কতবার যে হাত কেঁপেছে, নিয়ন্ত্রণ হারাতে হারাতে বেঁচেছে তার ইয়াত্তা নেই। শুরুতেই যখন গাড়ির ভিতর থেকে ঝুমকে শাড়ি পরিহিত অবস্থায় গিয়ে আসতে দেখলো, তখনই সে বুঝে গিয়ে ছিল আজ সে অঘটন একটা ঘটিয়েই বসবে। এতটা মায়াবী কে হতে বলে ছিল এই মেয়েকে? যত দেখে মনই ভরে না তার। গাড়িতে বসে অনেকক্ষন দেখার পরও যখন সামনে থেকে দেখলো, তখন মনে হলো এই রংটা শুধু ঝুমের জন্য তৈরি। কি ভীষণ স্নিগ্ধ লাগছিল। সাথে শাইয়ানের বুকে ব্যথা তুলে দিয়েছিল। ভয়ে আর শাইয়ান ফিরেও তাকায়নি ওর দিকে। এখনো বুকের বা পাশে অসম্ভব ব্যথা করছে। হার্টটা হয়তো বেরিয়ে আসতে চায়। আসুক, শাইয়ান নিজের হাতে ঝুমের কাছে তুলে দিয়ে বলবে,

-এবার আপনি সামলান। আমি আর পারছি না।

সে যদি পারতো অবশ্যই এমনটা করতো। অথচ সে তার এই অনুভূতি মেয়েটাকে বোঝাতে পারছে না। আহিরের মতো ঝুম কেন তার চোখের ভাষা বুঝতে পারে না? বড় আফসোস হচ্ছে শাইয়ানের। ৩১ বছরে এসে হঠাৎ করে তার বিয়ের জন্য মনপ্রাণ ছটফট করছে।

-কিছু না। চলুন এসে পড়েছি আমরা।

শাইয়ান সিট বেল্ট খুলে বেরিয়ে গেলো। ঝুম সামনে তাকিয়ে দেখলো, রাজারানীদের বাড়ির মতো বাদামী রঙের একটি বড় প্রাসাদ।

-নামুন।

ঝুম পাশে তাকিয়ে দেখলো লোকটা আবারো তার পাশের দরজাটি ধরে দাড়িয়ে আছে। ওহ তার মানে দরজা খোলার জন্য এত তোড়জোড় করে বেরিয়ে ছিল? এতটুকুতে বোঝা গেল মেনারলেস না, দায়িত্বজ্ঞান আছে তবে। কিন্তু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে সে নামবে কিভাবে?

-কি হলো আসুন।

ঝুম ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ল। আমতা আমতা করে বলল,

-সরুন।

এই একটা শব্দ শাইয়ানকে আরো পাগল করে দিল। একদম তার বউ বৌ লাগলো মাত্র। বেচারা সরলো তো নাই উল্টো মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো। ভাগ্যিস মাস্ক পরে আছে নয়তো আসে পাশের মানুষ এতক্ষনে কি ভাবতো?

-এই যে শুনছেন?

-হুম?

শাইয়ান হুম বললেও তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে এই দুনিয়ায় নেই। এমন সুন্দর করে ডাকলে বুঝি ঠিক থাকা যায়? প্রতিদিন অগণিতবার এই ডাক শুনতে হলেও তার ঝুমকে বিয়ে করতে হবে।

-সরুণ। আমি বের হবো।

বুকে পাথর রেখে শাইয়ান সরে দাঁড়ালো। মেয়েটার এত কাছে দাঁড়িয়ে থাকতেও যেন শান্তি। কি মিষ্টি একটা সু-ঘ্রাণ ঘুরে ফিরে বেড়ায় ঝুমের আশেপাশে! শাইয়ানের তো গিলে খেতে ইচ্ছা করে। অদ্ভুত, কি সব ভাবছে সে? শাইয়ান সরে দাঁড়াতেই ঝুম বেরিয়ে এলো। তার হাঁটার তালে তালে পায়ের নূপুর জোড়া শব্দ তুলল, যা মন দিয়ে শাইয়ান শুনল। এতটা মন দিয়ে সে আজ পর্যন্ত কাউকে পর্যবেক্ষণ করেনি। শাইয়ান গাড়িটা গেট থেকে পাশে পার্ক করেছিল। যার দরুন গেট পর্যন্ত যেতে তাদের সামান্য হাঁটতে হলো। এই সামান্য পথও শাইয়ানের কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এই যে মেরুন শাড়িতে জড়ানো জরাজীর্ণ শরীরটি কি সুন্দর তার পাশে তার সাথে তাল মিলিয়ে ছোট ছোট কদমে এগিয়ে যাচ্ছে, এভাবেই তো তারা সারা জীবন পথ পাড়ি দিতে পারে তাই না? পারে, অবশ্যই পারে। ঝুম না চাইলেও এমনটাই হবে।

সিকিউরিটি গার্ডদের সাথে কথা বলে শাইয়ান ঝুমকে নিয়ে বিশাল বড় গেট পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। ঝুম চারপাশ বড় বড় চোখে দেখছে। মনে হচ্ছে সত্যিকারের রাজাদের আমলে চলে এসেছে। বড় মাঠ পেরিয়ে একটি বড় প্রাসাদ। তার মাথায় বড় বড় মিনার। কিছু সংখ্যক কবুতর নিজেদের মতো উড়ে বেড়াচ্ছে। আশেপাশে অল্প সংখ্যক দর্শনার্থীদেরও দেখা যাচ্ছে। রোদের তেজ কমে যাওয়ায় নরম এক উষ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করছে চারিপাশে। ইন্ডিয়াতে এমন মোঘল আমলের অনেক রাজকীয় স্থাপনা রয়েছে, কিন্তু ঝুম কখনো স্বচক্ষে সে সব দেখার সুযোগ পায়নি। এটাই তার প্রথম অভিজ্ঞতা। অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। জানার ইচ্ছা তার চোখেমুখে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। শাইয়ান সেই চোখের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে মাস্কের নিচে ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলো। আজ যেন তার ঠোঁট থেকে হাসি সরার নামই নিচ্ছে না।

-এটা মোহাট্টা প্যালেস। করাচির অন্যতম ঐতিহাসিক ও রাজকীয় স্থাপনা বলতে পারেন। ১৯২৭ সালে শিবরতন চন্দ্ররতন মোহাট্টা নামের এক ধনী ব্যবসায়ী তার স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য গ্রীষ্মকালীন বাসভবন হিসেবে এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন। যদিও এখন এটি জাদুঘর হিসাবে পরিচিত। ইতিহাসে বলা হয়েছে সে ইন্ডিয়ার রাজস্থানের একজন হিন্দু ব্যবসায়ী ছিল।

ঝুম হা করে শাইয়ানের কথা গিল ছিল। তার হুশ নেই। শাইয়ান তাকে যেদিকে নিয়ে যাচ্ছে সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেদিকেই যাচ্ছে। ইতিহাস, রাজাদের আমল নিয়ে তার বিস্ময়ের অভাব নেই। তারা হাঁটতে হাঁটতে প্যালেসের মূল ফটকে এসে পড়লো। বিশাল এক কাঠের দরজা। পুরো প্রাসাদটি বাদামী রঙের হলেও ঝুমের কাছে মনে হলো এটা সাধারণ বাদামী রং নয়। মাঝে মাঝেই চোখে ধোঁকা লাগছে। মনে হচ্ছে গোলাপি রং।

-রংটা এমন কেনো? না বাদামী আর না গোলাপি।

শাইয়ান ঝুমকে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে করতে বলল,

-কারণ এটা দুই ধরনের পাথর দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। জয়পুরের গোলাপি যোধপুরী পাথর ও স্থানীয় গিজরি পাথর। দুটার সংমিশ্রণের কারণে এমনটা লাগে।

ঝুম মনোযোগ দিয়ে আশেপাশে দেখছে। বাইরের থেকেও ভিতরের দৃশ্য সুন্দর। রাজকীয় ব্যাপার। মনে হচ্ছে সত্যি কোনো প্যালেস। দুপাশে কাচের বক্সে বিভিন্ন প্রদর্শনীও জিনিস রাখা। সম্ভবত তখনকার রাজাদের জিনিস এগুলো। সেসবে ঝুমের তেমন একটা আগ্রহ নেই। সে দেয়ালে টানানো বড় বড় চিত্রকর্ম দেখতে ব্যস্ত। হাঁটতে হাঁটতে তারা সিঁড়ি দিয়ে একদম উপরের দিকে চলে এলো। খোলা ছাদ অথচ সাধারণ ছাদের মতো নয়। মনে হচ্ছে বড় বড় করিডোর করে একটা ছাদের সাথে অন্য ছাদ যুক্ত করা হয়েছে। বড় বড় গম্বুজগুলোর নিচে আবার বসার জায়গাও করা হয়েছে। শাইয়ান আগে হাঁটছে আর ঝুম তার পিছে পিছে চারিপাশ দেখতে দেখতে পা বাড়াচ্ছে। শাইয়ানকে দেখে মনে হচ্ছে সে এখানের নাড়িনক্ষত্র সব চেনে। ঝুম পাথরের রেলিংয়ে হাত দিয়ে দেখলো প্রতিটি নকশা কত নিখুঁত, সুন্দর। উপর থেকে নিচটা আরও বেশি সুন্দর লাগছে। এখানে আসার পর মনে হচ্ছে সে সত্যিই এখন ১৯২৭ সালে রয়েছে। ইস রোমাঞ্চকর ব্যাপার। শাইয়ান গিয়ে একদম কর্ণারের দিকের একটি গম্বুজের নিচে বসলো ঝুমের মুখোমুখি হয়ে। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, স্থির। ঝুম ঠিক ওর সামনে গিয়ে থামলো। ওমন ধারালো দৃষ্টি দেখে একটু থতমত খেলো। কাঁধে ঝুলানো বড় দড়ির ব্যাগটি দুহাতে জড়িয়ে হাঁসফাঁস করতে লাগলো। শাইয়ান মুখের মাস্ক খুলে দুপায়ের ওপর হাত রেখে ঝুঁকে পড়ে তাকিয়ে ঝুমের দিকে। ঝুমের দৃষ্টি স্থির নেই। বড় মনি দুটি এদিকে-ওদিকে ঘুরছে। হঠাৎ শাইয়ান একদম ভিন্ন গলায় ছটফটিয়ে বলল,

-লুক অ্যাট মি, আরীবা। কিপ লুকিং অ্যাট মি। যতক্ষণ আমার সাথে থাকবেন, আপনার দৃষ্টি আমি ছাড়া অন্য কোথাও দেখতে চাই না।

চলবে___

[গেস হোয়াট? ৪০০০+ শব্দ। সেকেন্ড লার্জেস্ট পর্ব এটা। প্রথমটা ছিল #আফসানায়ে_জ্বিনানের শেষ পর্ব। আজকের পর্ব লিখতে আমার অনেক কিছু রিসার্চ করতে হয়েছে। জানি না কতটা ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি। তবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। মোহাট্টা প্যালেস দেখতে চাইলে কমেন্ট করবেন আমি পিকচার অ্যাড করে দিবো। আজকের পর্ব কেমন হয়েছে জানাবেন। আমার ফাইনাল পরীক্ষা বলে লেখাতে মন দিচ্ছি না। সবাই একটু রেসপন্স করবেন। সুন্দর সুন্দর কমেন্ট করলে, বেশি রেসপন্স পেলে লিখতেও আগ্রহ লাগে। নয়তো মনে হয় ভালো হচ্ছে না বলে কেউ রেসপন্স করছেন না।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন