ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কিন্ত আমি

১১তম পর্ব

লেখক: মীরা রায়াদ

#তুমি_কিন্তু_আমি

মীরা_রায়াদ

পর্ব–১১

🚫অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ🚫

-লুক অ্যাট মি, আরীবা। কিপ লুকিং অ্যাট মি। যতক্ষণ আমার সাথে থাকবেন, আপনার দৃষ্টি আমি ছাড়া অন্য কোথাও দেখতে চাই না।

হাড় কাঁপানো শীতল কণ্ঠ। ঝুমের অন্তর পর্যন্ত কেঁপে উঠলো। শাইয়ানের ফ্যাকাশে চোখ দুটি মারাত্মক সুন্দর। ওই চোখের দৃষ্টিও মারাত্মক। অযথাই ঝুম কেঁপে কেঁপে উঠলো। কিছু একটা বুঝেও বুঝলো না যেন। বুঝতে চাইলো না মেয়েটা। বুকের ভিতর হাঁসফাঁস করছে। এই কথার মানে কি? কি অর্থ বহন করে? শাইয়ান তাকে ঠিক কি বোঝাতে চাইছে? কাঁপা কাঁপা গলায় কোনো রকমে কৌতূহল মেটাতে প্রশ্ন করলো,

-মানে?

শাইয়ানের দৃষ্টি নড়েনি। এত সময়ে একবারও তার চোখের পলক পড়েনি। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নাজুক গড়নের রমণীকে অপলক দেখে যাচ্ছে সে। কি এত দেখে সেই ভালো জানে।

-বসুন।

মানের ধার ধারলো না সে। বোঝাতেও গেলো না। উত্তর দেয়ার তো প্রশ্নই ওঠেই না। উল্টো ঝুমকে আরো একধাপ চমকে দিয়ে গাঢ় গলায় উক্ত কথাটি বলে উঠল। ঝুম কি করবে বুঝলো না। তবুও শাইয়ানের কথা শুনল। শাইয়ানের থেকে দূরত্ব রেখে বসতে চাইলো। কিন্তু বিষয়টি সহ্য হলো না শাইয়ানের। কণ্ঠ খাদে নামিয়ে সম্মোহনী গলায় বলল,

-কাছাকাছি বসুন।

পিলে চমকে উঠলো ঝুম। মেয়েটা বসতেও পারেনি ঠিক ভাবে। বড় বড় চোখ দুটির চাহনি ঠিক শাইয়ানের চোখে স্থির। হয়তো বুঝতে চাইছে ঠিক শুনলো নাকি ভুল। শাইয়ান নিরুত্তাপ। তার মুখভঙ্গি দেখে মনে হলো না সে মজা করছে। বরং বড্ড সিরিয়াস লাগছে তাকে। ঝুম শুনলো না শাইয়ানের কথা। বরং নিজের মতো বসতে বসতে আমতা আমতা করে বলল,

-এখানেই ঠিক আছি।

ঝুমের কথায়, কাজে শাইয়ান বড় রুষ্ট হলো। অবাদ্ধতা তার একদম পছন্দ না। সে যা বলবে সকলে তা শুনতে বাধ্য। এত কাল এমনটাই তো হয়ে এসেছে। তবে এখন থেকে যে কেউ একজন প্রতিনিয়ত তার অবাদ্ধ হবে বুঝতে সংকোচ রইলো না। মনে মনে নাখোশ হলেও মুখে তা প্রকাশ করলো না। অথচ শাইয়ানের কুঁচকে যাওয়া কপাল, তাকানোর ধরণ দেখেই ঝুম ওর মনোভাব বুঝে ফেললো। তবুও সে কথা বাড়ালো না। বরং শাইয়ানের সেই দৃষ্টিকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে নিজের কাঁধ ব্যাগ খুলে ছোট হাত দুটি তার মাঝে চালান করে কিসব বের করে আনলো। এতে যেন শাইয়ানের কুঁচকে যাওয়া কপাল আরো কুঁচকে গেল। ঝুমের সেদিকে ধ্যান নেই। সে নিজের ছোট খাটো ব্যাগ হাতড়ে রাজ্যের জিনিস বের করলো। শাইয়ান লক্ষ্য করলো ঝুম তার ছোট ব্যাগটা থেকে একে একে একটি ট্রাইপড, দুটি ওয়ারলেস ক্লিপ মাইক, নোটবুক, ও একটি ফোন বের করে আনলো। এরপর ব্যাগ রেখে ট্রাইপড ও ফোন নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে শাইয়ানের থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে গিয়ে ট্রাইপডের সাথে ফোন এডজাস্ট করে সেটি সেট করলো। ফোনের ক্যামেরাতে সবটা ক্যাপচার হচ্ছে কি না সেটাও চেক করতে ভুললো না মেয়েটা। শাইয়ান নীরবে ঝুমের বিচক্ষণতা পর্যবেক্ষণ করলো। সে কল্পনাও করেনি মেয়েটা সাথে করে এসব বয়ে নিয়ে আসবে এতটা দূর। ঝুমের প্রফেশনালিজমে অভিভূত না হয়ে পারলো না ছেলেটা। ঝুম ভীষণ দক্ষ হাতে পরনের শাড়িটি কিছুটা পরিপাটি করে এগিয়ে গিয়ে বসলো নিজের স্থানে। ব্যাগের পাশে পরে থাকা ক্লিপ মাইক দুটি হাতে তুলে নিয়ে একটি খুব সাবধানে বুকের কাছের শাড়ির সাথে লাগিয়ে অন্যটা শাইয়ানের উদ্দেশ্যে বাড়িয়ে দিয়ে মিহি হাসি সমেত বলল,

-এটা শার্টের সাথে লাগিয়ে নিন।

শাইয়ান কিছুটা ঝুঁকে মাইকটি হাতে নিলো, কিন্তু ঝুমের কথা মতো সে লাগালো না। বরং খুব মনোযোগের সাথে মাইকটি পর্যবেক্ষণ করলো। শাইয়ানের হাতের ছোট বস্তুটি ডিজিআই মাইক। এব্যাপারে শাইয়ানের মোটামুটি ধারণা রয়েছে। কোয়ালিটি দেখে মনে হচ্ছে প্রো ভার্সন এটা। আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ হাজার অনায়াসে দাম পরবে। সে নিজের হাতের মাঝে মাইকটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দৃষ্টি ঝুমের দিকে দিয়ে জানতে চাইলো,

-আপনার?

-জ্বি।

শাইয়ান নিজের উত্তর পেয়ে এবার শিরদাঁড়া সোজা করে বসলো। পরনের কালো শার্টটির গলার দিকে মাইকটি লাগিয়ে দু পা ছড়িয়ে আয়েশ করে বসে বললো,

-বেশ ভালোই প্রস্তুতি নিয়ে এসেছেন।

ঝুম অপ্রস্তুত হলো। শাইয়ান খোঁচা মেরে বললো নাকি প্রশংসা করলো ধরতে পারলো না। অন্য কারো সামনে ঝুম এতটা অসহায় অনুভব করে না, যতটা না শাইয়ানের সামনে করে। লোকটা এমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় যে রূহ অব্দি কেঁপে ওঠে। ঝুম জোরপূর্বক হেসে বলল,

-সাংবাদিক বলে কথা। এটাই আমাদের কাজ। এবার তাহলে ইন্টারভিউ শুরু করা যাক?

শাইয়ান স্পষ্ট বুঝলো ঝুম ওকে এড়িয়ে যেতে চাচ্ছে। সম্ভবত নিজের কাজের জন্যই মেয়েটা এখনো ওকে সহ্য করছে। এবার সে পিছনের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বলল,

-এখন মুড নেই।

ঝুম তাজ্জব বনে গেল। মুড নেই মানে? সে কি কথা? ইন্টারভিউ দিতে এসে বলছে মুড নেই! অদ্ভুত লোক তো?

-কিন্তু আমরা তো এখানে ইন্টারভিউয়ের জন্যই এসেছি তাই না?

-হ্যাঁ, কিন্তু এখন আমার ভালো লাগছে না এসব।

ঝুমের নাক কুঁচকে গেল। এখানে মারাত্মক গরম। মৃদু মন্দ বাতাস এলেও মেয়েটা বিশ্রী ভাবে ঘেমে যাচ্ছে। এখন তো রাগের দরুন নাকটাও কেমন ঘেমে গিয়েছে। লাল লাল নাক নিয়ে ভয়ানক ভাবে তাকিয়ে আছে শাইয়ানের দিকে। শাইয়ান ভয় পাচ্ছে কি? হ্যাঁ পাচ্ছে তো। এটা আরো ভয়ানক কথা। যাকে সকলে ভয় পায়, সে কি না এই পুচকে মেয়েকে ভয় পাচ্ছে? লজ্জাজনক।

-আপনার সমস্যা কি বলুন তো? মুড সুইং এর সমস্যা আছে? গতকাল ৩০ মিনিট বসিয়ে রাখলেন। আজ আবার এত গরমের মাঝে নিয়ে এসে বলছেন মুড নেই। প্রেগনেন্ট আপনি?

-কিহ!

শাইয়ান বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল। কি ভয়াবহ কথা বলে মেয়েটা? সে নিজের পেটের দিকে একবার তাকিয়ে আবারো ঝুমের দিকে চাইলো। মেয়েটার চোখমুখ জুড়ে থমথমে ভাব। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সাংঘাতিক রেগেছে। শাইয়ান এই মেয়েকে কিভাবে সামলাবে? কম কথা বলা মেয়েটা এমন ভয়াবহ কথা কিভাবে শিখলো? মান-সম্মান সবটা শেষ করতে চায় নাকি?

-কি সব বাজে কথা বলছেন হ্যাঁ?

শাইয়ান দু কদম এগিয়ে গেলো ঝুমের দিকে। সে এই অপমান কিছুতেই মানবে না। ঝুম নিজেও এবার উঠে দাঁড়ালো। শাইয়ানের দিকে তেড়ে গিয়ে বলল,

-বাজে কথা কি? প্রেগনেন্ট মেয়েদের মতো যেভাবে আপনার মুড চেঞ্জ হয় তাতে আপনাকে প্রেগনেন্ট ভাবা অন্যায়? সমস্যা কি?

ঝুমকে তেড়ে আসতে দেখেই শাইয়ান সাথে সাথে নিরাপদ দূরত্ব নিয়ে পিছিয়ে গেল। ছেলেটা একদম বসেই পরলো নিজের জায়গাতে। ঝুমকে এত কাছে আসতে দেখে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। জ্ঞান হারাবে নাকি? তাহলে তো সমস্যা।

-দূরে দূরে, আপনি দূরে সরুন আগে।

ঝুম চোখমুখ কুঁচকে রেখেই সরে গেল। শাইয়ান যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। সাংঘাতিক মেয়ে। এই মেয়েকে শান্ত ভেবে সে চরম ভুল করেছে। বড় শিক্ষা হয়েছে। বেঁচে থাকতে আর এমন বিপদ কাঁধে নেবে না। বুকে হাত দিয়ে বড় একটি নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো,

-বলুন কি জানতে চান?

এবার ঝুমের মুখের ভাব নরমাল হলো। সে নিজের জায়গায় বড় খুশি মনে গিয়ে ব্যাগ থেকে টিস্যু নিয়ে শাইয়ানকে দিয়ে বলল,

-নিজেকে পরিপাটি করে নিন, আমিও ক্যামেরা চালু করে আসছি।

শাইয়ান টিস্যুটি নিলো কিন্তু ব্যবহার করলো না। উল্টো নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রান নিলো। বেলি ফুলের সুন্দর একটি নরম সুবাস। তার দৃষ্টি ঠিক ঝুমের ওপর। মেরুন রঙের শাড়ির আঁচল কাঁধে তুলে মেয়েটা মনোযোগ দিয়ে ফোনে কিছু করছে। হেলে পড়া সূর্যের শেষ বিকেলের এক গুচ্ছ আলো মেয়েটার চোখে, গালে পড়ছে। ঢিলা করা খোঁপা থেকে কয়েক গাছি চুল অবলীলায় ঝুমের ঘামে ভেজা গালের সাথে লেপ্টে আছে।

-আপনি তৈরি?

ইতোমধ্যে ঝুম নিজের জায়গায় বসে পড়েছে। হাতে তার ছোট একটি নোটবুক। সেখানে সম্ভবত সে শাইয়ানকে উদ্দেশ্য করে কিছু প্রশ্ন লিখে রেখেছে। শাইয়ানের ডান হাতে তখনো ঝুমের দেয়া সেই একটিমাত্র টিস্যু। খুবই নরম হাতে আগলে রয়েছে যেন ভাঁজ না পরে।

-হুম।

-ওকে, তাহলে শুরু করা যাক?

-হুম।

একটা ঝাড়ি খেয়ে ছেলেটার মুখ একদম বন্ধ। ঝুমকে রাগিয়ে দেয়া যে নিজের জন্য ক্ষতিকর বেশ বুঝতে পেরেছে সে।

-আসসালামু আলাইকুম, আমি দেশ বার্তা সংবাদ মাধ্যম থেকে আরীবা ঝুম বলছি।

আজ আমার সাথে রয়েছেন পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক শাইয়ান রেহমান আনসারী। আমরা দেখেছি সাম্প্রতিক সময়ে তার নেতৃত্বে দল দারুণ পারফর্ম করছে, বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাদের অসাধারণ জয় ছিল প্রশংসনীয়। কথা না বাড়িয়ে চলুন, তার কাছ থেকেই শুনি পুরো গল্পটা। কেমন আছেন শাইয়ান?

‘শাইয়ান’! ঝুমের মুখে নিজের নাম শুনেই ছেলেটার গলা শুকিয়ে এলো। এই রমণীকে নিয়ে সে কি করবে? ঝুমের প্রতিটি রূপে শাইয়ান বার বার পিছলে পড়ছে।

-আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন?

ঝুম মুচকি হাসি দিয়ে বলল,

-জ্বি আলহামদুলিল্লাহ। শুরুতেই অভিনন্দন জানাই আপনাকে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই জয়ে অনুভূতি কেমন আপনার?

-অবশ্যই অসাধারণ।

-পূর্বে পাকিস্তান দল কিছুটা ইনকন্সিস্টেন্ট(সঙ্গতিহীন) ছিল, কিন্তু এখন অনেক ইম্প্রুভ করেছে। আপনার মতে এই পরিবর্তনের মূল কারণ কী?

-আমার মতে কিছুটা নয়, অনেকটাই ইনকন্সিস্টেন্ট ছিল। যদি ইম্প্রুভের কারণ জানতে চান তবে বলবো, সঠিক দিক নির্দেশনা, অধ্যাবসায়, নিজের প্রতি আস্থা, ও টীম ওয়ার্ক।

ঝুম ঠিক শাইয়ানের দিকেই তাকিয়ে ছিল। ছেলেটার চোখের তীক্ষ্ণতা, দৃঢ়তা ঝুমের দারুন লাগলো। শাইয়ানের গলার স্বর বলে দিচ্ছে তার উত্তর কতটা সত্যি।ঝুম এবার দৃষ্টি নোটবুকে দিয়ে পরের প্রশ্নটি দেখে নিলো।

-একসাথে ক্যাপ্টেন, উইকেটকিপার ও ব্যাটসম্যান, এই তিনটা দায়িত্ব সামলানোটা কতটা চ্যালেঞ্জিং?

-ভীষণ চ্যালেঞ্জিং।

-যেমন?

-যখন আমরা কোন ম্যাচ খেলি তখন আমার মাথায় একই সাথে অনেকগুলো দায়িত্ব থাকে। একজন ক্যাপ্টেন হিসাবে টিম ম্যানেজমেন্ট, সাথে নিজের পারফরমেন্স ধরে রাখা কিছুটা কষ্টসাধ্য।

ঝুম মাথা নাড়িয়ে আবারো নোটবুকে দৃষ্টি দিলো। এতক্ষন যে প্রশ্নগুলো সে করেছে এগুলো ছিল সৌজন্যতা বজায় রাখতে। আসল প্রশ্নের খেলা তো এখন শুরু হবে। যদিও মনে মনে ঝুম অনেকটা বিচলিত। তার এক মন এসব করতে বারণ করছে। অন্য মন বারবার উস্কে দিচ্ছে। ঝুম ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজেকে শক্ত করলো। নিজের কাজের বাইরে সে আর কিছু ভাবতে চায় না। ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে পরবর্তী প্রশ্ন ছুড়লো।

-প্রাক্তন ক্যাপ্টেনের কাজের ব্যাপারে আপনার কি ধারণা? হাওয়ায় ভাষা গুঞ্জন রয়েছে, তার সাথে নাকি আপনার পার্সোনাল দ্বন্দ্ব রয়েছে? সেই দ্বন্দ্বের উৎস কি?

এতোক্ষন শাইয়ানের নরম দৃষ্টি আর নরম রইলো না। ঝুমের ঠোঁটে তখনো একটি মিষ্টি হাসি ঝুলে আছে। শাইয়ান এক নিমিষে বুঝে ফেললো প্রফেশোনাল লাইফে ঝুম আরো বেশি ভয়ানক। নয়তো এমন প্রশ্ন করার সাহস কেউ করে? সে ঝুমের এই প্রশ্নটি পুরোপুরি এড়িয়ে গিয়ে বললো,

-আপনি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন রাইট?

ঝুমের হাসি হারিয়ে গেলো। বুঝতে পারলো শাইয়ান তার প্রশ্নের উত্তর দেবে না। সেক্ষেত্রে ঝুম শাইয়ানকে জোরও করতে পারবে না। প্লেয়ারদের ওপর জোর করার অনুমতি নেই। নয়তো ঝুম এত সহজে ছাড়তো বুঝি? এই ব্যাপারে নিশ্চয়ই কোনো গুরুতর কাহিনী রয়েছে। নয়তো উত্তর কেন দিলো না? জানার জন্য ঝুমের মন উশখুশ করলেও সে নিজেকে দমিয়ে নিলো। জোরপূর্বক হাসি টেনে বলল,

-জ্বি, বাংলাদেশের ঢাকা থেকে এসেছি।

-ওয়েল। ম্যারিড?

ঝুম থতমত খেলো কিছুটা কিন্তু একটুও বুঝতে দিলো না শাইয়ানকে। উল্টো কনফিডেন্সের সাথে বললো,

-এনগেইজড।

-হোয়াট?

এতটা চমকে গিয়েছে শাইয়ান যে তার চোখগুলো রীতিমত ডিম্বাকৃতি ধারণ করেছে। ঝুম এনগেইজড? কিভাবে সম্ভব? শাইয়ান বড় বড় পা ফেলে ঝুমের সম্মুখে এসে দূরত্ব রেখে দাঁড়ালো।

-এনগেইজড? কবে? কার সাথে?

ঝুম অবাক হলো শাইয়ানের এরূপ প্রতিক্রিয়ায়। সে কিছুটা বিরক্তও বটে। ব্যক্তিগত ব্যাপারে কাছের কারো সাথে কথা বলতেও সে পছন্দ করে না। সেখানে শাইয়ান তো অপরিচিত।

-জ্বি, আমি এনগেইজড।

-ফ্যামিলি থেকে?

-না। উই হ্যাভ বিন ইন আ রিলেশনশিপ ফর লাস্ট টু ইয়ার্স।

-টু ইয়ার্স?

শাইয়ান আকাশ থেকে পড়লো। অকল্পনীয় কথা। সামনে বসা মেয়েটার প্রেমিক আছে? ঝুম অন্য কাউকে ভালোবাসে? বিষয়টি যেন শাইয়ানের একদম সহ্য হলো না। সারা শরীর জ্বলে যাচ্ছে। রাগে পায়চারি করতে শুরু করলো। ঝুম নিষ্পলক শাইয়ানের অস্থিরতা দেখে গেলো। টু শব্দটি করলো না। শাইয়ানের দুনিয়া নড়ে গিয়েছে। সে কিছুতেই এতবড় সত্যিটা মেনে নিতে পারছে না। অস্থির হয়ে আবারো ঝুমের নিকট এগিয়ে এসে জানতে চাইলো,

-ইজ ইট ট্রু?

যেন সে জোরপূর্বক এই সত্যিকে মিথ্যা করতে চায়। একবার শুধু না শুনতে চায় ঝুমের মুখ থেকে। কিন্তু শাইয়ানকে একেবারে ভেঙে দিয়ে ঝুম বলল,

-ইয়েস।

-ডু ইয়্যু লাভ…

শাইয়ানের গলা ভয়ানক ভাবে কাঁপছে। বাকি শব্দটুকু উচ্চারণ করতে পারছে না। শাইয়ান শেষ না করলেও ঝুম বুঝলো। চোখে চোখ রেখে কাটকাট গলায় জানালো,

-ভীষণ।

সেই মুহূর্তে শাইয়ানের মনে হলো দম বন্ধ হয়ে সে মা*রা যাবে। এত কষ্ট হলো ওর যে আর একবারও সে ঝুমের দিকে ফিরে চাইল না। একবারের জন্যও না। শুধু মুখ থেকে উচ্চারণ করলো,

-আমাকে যেতে হবে।

এরপর সে আর দাঁড়ালো না। বড় বড় পা ফেলে ঝুমকে ফেলেই চলে গেল। এদিকে ঝুম তাজ্জব বনে তাকিয়ে রইলো। মানে কি এসবের? তাকে একা ফেলে চলে গেল লোকটা? কি অভদ্র আল্লাহ! ঝুম সময় অপচয় করলো না। যত দ্রুত সম্ভব নিজের জিনিসগুলো ব্যাগে ভরে ছুটলো শাইয়ানের পিছনে। মেয়েটা ভাবলো শাইয়ান হয়তো এই অপরিচিত স্থানে তাকে ফেলে রেখেই চলে গিয়েছে এতক্ষনে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে শাইয়ান গেলো না। সিঁড়ির মাথায় পকেটে হাত ভরে দাঁড়িয়ে রইলো স্থির। দৃষ্টি সিঁড়ির ধাপে। চোখমুখের বেহাল অবস্থা। মাথার পাশের নীল রঙের রগগুলো ফুলে স্পষ্ট উঁকি দিয়ে আছে। মনে হচ্ছে আর একটু হলেই ছিড়ে যাবে। কি ভয়ানক ব্যাপার! ঝুম কাছাকাছি এসেছে বুঝতে পেরে শাইয়ান সিঁড়ির ধাপে পা ফেলে সামনে এগিয়ে গেল। ওর ওই বড় বড় পায়ের গতির সাথে ঝুমের ছোট পা দুটি তাল মিলাতে পারলো না। একহাতে কুচি সামলে মেয়েটা পায়ের গতি বাড়াতে গিয়ে কয়েকবার উষ্টা খেয়ে পড়তে গিয়েও নিজেকে বাঁচিয়েছে। তবুও শাইয়ান ঝুমের দিকে ফিরে চায়নি। ঝুম অবশ্য শাইয়ানের এমন ব্যবহারে রুষ্ট। মনে মনে শাইয়ানকে নিয়ে তার মনে যতটুকু পজিটিভ চিন্তা ছিল সবটা ভ্যানিস হয়ে গেল। ভেবেই নিল শাইয়ানের মাঝে নূন্যতম দায়িত্ববোধ নেই। থাকলে অবশ্যই একটা মেয়েকে এত দূরে নিয়ে এসে এমন আচরণ করতো না। আবার ইন্টারভিউটাও সম্পূর্ণ হলো না। আবারো এই অভদ্র লোকের আগেপিছে ঘুরতে হবে। বিষয়টি ভেবেই ঝুমের মেজাজ খারাপ হলো। শাইয়ান, ঝুম আবারো একই পথ ধরে বাড়ি ফিরলো। পুরোটা পথ শাইয়ান একটা কথাও বলেনি ঝুমের সাথে। এমনকি ফিরেও তাকায়নি। বেচারা এমন শক পেয়েছে যে সেখান থাকে বের হতে বেশ অনেকটা দিনই লেগে যাবে তার। তারা যখন ফিরল তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। মুসল্লিরা মসজিদের পথে যাচ্ছে নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে। শাইয়ান ঝুমকে গলির মোরে নামিয়ে দিয়ে আগপিছ না তাকিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে গেলো। রাস্তার দুপাশে হলুদ রঙের স্ট্রিট লাইট জ্বলছে। তার নিচে দাঁড়িয়ে ঝুম বেশ অনেকটা সময় দাঁড়িয়ে রইলো। কালো রঙের গাড়িটা দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে যাওয়ার সাথে সাথে ঝুমের ঠোঁটের কোনে একটি নরম হাসি উঁকি দিলো। ঠোঁট নাড়িয়ে ধীরে ধীরে বলল,

-পাগল লোক।

—---------

কালো শার্ট, প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় শাইয়ান মসজিদের চকচকে সাদা টাইলস বসানো মেঝেতে সিজদাহরত অবস্থায় রয়েছে। মাগরিবের নামাজ শেষ হয়েছে বেশ অনেকটা সময় হয়েছে। মসজিদের অভ্যন্তর এখন প্রায় ফাকা। সেই নামাজ শেষ হওয়ার পর থেকে ছেলেটা এভাবেই পরে আছে, নড়চড় নেই। কাঁধে কারো হাতের অস্তিত্ব পেয়ে এবার সে মাথা তুললো। মাথায় তার সাদা টুপি, যেটা সে সর্বদা নিজের সাথে নিয়ে ঘোরে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের অভ্যাস সেই ছোট বয়স থেকে রয়েছে তার। তাই তো যেখানে যে পরিস্থিতেই থাকে না কেন নামাজ মিস দেয় না। তবুও দেখা যায় কখনো কখনো ম্যাচ চলাকালীন অসম্ভব হয়ে পরে। তখন অবশ্য সেই নামাজ সে পরে কায়েম করে নেয়।

-ঠিক আছেন আপনি?

সম্মুখে সাদা আলখাল্লা পরিহিত মাওলানাকে দেখে শাইয়ান উঠে বসলো। চোখ, নাক তার ভয়াবহ লাল। দেখে বোঝা যাচ্ছে না কেঁদেছে কি না। তবে ছেলেটার মনের অবস্থা যে বিশেষ ভালো না তা ভালোই বোঝা যাচ্ছে। শাইয়ান মুখে কিছু উচ্চারণ করলো না, শুধু মাথা নাড়িয়ে বোঝালো ঠিক আছে। শাইয়ান বললেও মাওলানা সাহেব স্পষ্ট দেখতে পেল ছেলেটা ঠিক নেই। সে শাইয়ানকে ছোট থেকে চেনে। শাইয়ানদের বাড়ির কাছে এই মসজিদ হওয়ায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ শাইয়ান এখানেই পড়তে আসতো। তাছাড়া পাড়ার বাচ্চাদের সাথে বাচ্চাকালে শাইয়ান, আহিরও তার কাছে আরবি শিক্ষার জন্য আসতো। তখন থেকেই সে শাইয়ানকে চেনে। বড্ড ভালো ছেলে। সে স্নেহ করে ছেলেটাকে। মাওলানা সাহেব এবার শাইয়ানের সামনে হাটু ভেঙে বসলো। তার বুক সমান সাদা দাড়িগুলো বাতাসের তালে কিছুটা নড়ছে হয়তো। শাইয়ান নাক টানলো। মাওলানা সাহেব পরম স্নেহে শাইয়ানের কাঁধে হাত বুলিয়ে বলল,

-নিরাশ হবেন না। আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী। তার ওপর ভরসা রাখুন। তার কাছে চান। সে তার বান্দাদের খালি হাতে ফেরায় না।

-আমি যদি অসম্ভব কিছু চাই?

-সেটা যদি আপনার জন্য উত্তম হয় অবশ্যই দিবেন। শুধু মন থেকে চান আর তার ওপর ছেড়ে দিন।

শাইয়ান কি বুঝলো বোঝা না গেলেও ছেলেটা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। আবারো নাক টেনে বলল,

-কেমন আছেন? শরীর সুস্থ আছে আপনার?

মাওলানা সাহেব তার নূরানী চেহারায় বিদ্যমান দাড়িতে হাত বুলিয়ে হাসলেন। লোকটির বয়স প্রায় ৭০ এর বেশি। বয়সের ভারে নুয়িয়ে পড়েছে। তবুও সে এই মসজিদে ইমাম হিসাবে নামাজ পড়ান। শাইয়ান এখন আর এই মসজিদে নামাজ পড়ার সময় পায় না। তবুও সে যখন বাড়িতে থাকে এখানে আসে। শৈশবের মিষ্টি এক অংশ যে এখানে কেটেছে তার। চাইলেও কি সেই সোনালী সময় ভোলা যায়?

-আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ পাকের দয়ায় ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?

-আলহামদুলিল্লাহ।

এবার শাইয়ান উঠে দাঁড়াল। বলল,

-আমি এখন যাচ্ছি। আপনি নিজের খেয়াল রাখবেন।

মাওলানা সাহেব মুখে হাসি নিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল,

-আপনিও।

শাইয়ান মাথা দাঁড়িয়ে বেরিয়ে এলো। মসজিদের সামনেই তার গাড়ি রাখা। গাড়িরই সাথেই আহির ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শাইয়ান ওকে এখানে আশা করেনি। এখানে কি করছে তাও বুঝতে পারলো না। কখন এলো? নাকি এখানেই ছিল?

-তুমি?

শাইয়ান কাছাকাছি এগিয়ে জানতে চাইলো। আহির এত সময় ফোন ঘাটছিল। শাইয়ানের কথায় এবার সে মাথা তুললো। আহির ফোন পকেটে চালান করতে করতে জানালো,

-নামাজে এসেছিলাম।

-তুমি ভিতরে ছিলে?

-হুম।

-ডাকলে না কেন?

আহির উত্তর করলো না। তাকিয়ে রইলো শাইয়ানের মুখের দিকে। অতঃপর এগিয়ে এসে দুহাতে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিলো ভাই নামের বন্ধুটিকে। শাইয়ান অবাক হলো না। আহির প্রায়ই এমন করে। যখন যখন শাইয়ানের মন খারাপ থাকে ছেলেটা কিভাবে যেন বুঝে যায়। আহিরের পিঠে ছোট ছোট চাপড় কেটে মায়া মায়া গলায় শাইয়ান বললো,

-আমি ঠিক আছি আহির।

আহির যদিও বিপরীতে কিছু বললো না, আবার ছেড়েও দিলো না। সে ছাড়লো অনেকটা সময় পর। ততক্ষনে শাইয়ানের কষ্টটাও কিছুটা কমে এসেছে। বুকের ভারী ভাবের কিছুটা লাঘব ঘটেছে। এরপর দুই ভাই গাড়িতে উঠে বসলো। চলমান গাড়িতে বসেই শাইয়ান একে একে খুলে বললো সকল কিছু। সব শুনে আহিরের কপালে বিশাল কয়েকটি ভাঁজের উদয় হলো।

-তুমি চিন্তা করো না শাইয়ান। এনগেইজড, বিয়ে তো আর হয়নি তাই না।

-হুম।

-কি করবে ভেবেছো?

-জোর করে রেখে দিলে কেমন হয় আহির?

শাইয়ান দক্ষতার সাথে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। আহির পাশ ফিরে বড়বড় চোখে তাকালো। শাইয়ান আহিরের দিকে তাকিয়ে এক ভ্রু নাচালো। অর্থাৎ সে জানতে চায়?

-সিরিয়াস?

-হোয়াট ডু ইয়্যু থিঙ্ক?

-তোমার নামে কেস করে দেবে শাইয়ান।

-দিতেই পারে। আজ যা রূপ দেখালো!

-মজা করছো? সিরিয়াসলি! তোমার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে।

-আর তাকে না পেলে যে আমি শেষ হয়ে যাবো আহির।

-তাই বলে…আচ্ছা কি করবে ভেবেছো?

-কিডন্যাপ করে বন্দি করে রাখবো।

আহির এবার বুঝলো শাইয়ান মজা করছে। খামোখাই সে এত ভয় পেল। রেগে সে বলল,

-যা ইচ্ছা করো।

-কে সেই ছেলে খোঁজ নাও আহির। আমি তার ব্যাপারে জানতে চাই। দেখতে হবে তো আমার পাখি কাকে ভালোবাসে।

শাইয়ানের ঠোঁটে ভয়ানক এক হাসি। আহির বেশ বুঝতে পারলো ঝুমের রক্ষা নেই এবার। এই এক মেয়ে তার ভাইটার কি হাল করে ছেড়েছে। তারই তো মন চাচ্ছে ধরে বেঁধে শাইয়ানের সাথে বিয়ে দিয়ে দিতে। আহির সিটের সাথে মাথা এলিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বললো,

-পাখি?

শাইয়ান বড় গর্বের সাথে বলল,

-হুম, আমার পাখি।

চলবে___

[লিখতে আর মন চায় না আজকাল। এতবেশি টায়ার্ড লাগে যা বলার মতো না। ব্রেইনের অবস্থা ভয়াবহ। ভেবে রাখি কত কিছু কিন্তু ভুলে যাই। একটা প্রশ্ন করি আপনাদের কাছে? আমি কি আপনাদের সাথে কখনো খারাপ আচরণ করেছি? কষ্ট দিয়ে কথা বলেছি? তাহলে আপনারা আমাকে কষ্ট দিয়ে কথা বলেন কিভাবে? একটা মানুষ গল্প দিতে দেরি করতেই পারে, তাই বলে এভাবে রেগে বকা দিবেন? বোঝার চেষ্টা করুন অনেক কিছু বদলে যায়। মানুষ, সময়, ব্যস্ততা অনেক কিছু বদলায়। আমি আপনাদের আমার পরিস্থিতি বোঝাতে পারছি না। একদিন সময় করে বলবো না হয়। শুধু একটা রিকোয়েস্ট, আমি আহামরি কিছু লেখি না। কি লেখি তাও জানি না। লেখার যোগ্যতাও নেই আমার। নগণ্য একটা মানুষ আমি। আমার লেখা পড়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। দয়া করে আমাকে পঁচা কথা বলে কষ্ট দিবেন না। সবাইকে আমার তরফ থেকে ভালোবাসা। আমার জন্য একটু দোয়া করুন। আল্লাহ যেন আমার মনের ইচ্ছা পূরণ করে দেয় এই দোয়া করে দিবেন।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন