ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কিন্ত আমি

২২তম পর্ব

লেখক: মীরা রায়াদ

#তুমি_কিন্তু_আমি

মীরা_রায়াদ

পর্ব–২২

🚫অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ🚫

বিয়ের পর পরই শাইয়ান হাসপাতাল ছাড়তে চাইলেও তার কথা কেউ আমলে নিল না। বরং ডাক্তারের পরামর্শে তাকে আরো কিছুদিন হাসপাতালে রাখা হল। এ নিয়ে তার চোটপাটের শেষ নেই। শাইয়ান অসুস্থ বলে আহির বেচারা চুপচাপ তার সকল নাটক সহ্য করলেও ঝুম চুপ রইলো না। পরপর দুটি বিশাল ধমক দিতেই শাইয়ান নিরীহ প্রাণীর মতো চুপটি করে হাসপাতালের বেডে পরে রইল। সেই মুহূর্তে তার মুখের করুন অবস্থা দেখে আহির না পারতে পেট চেপে খিলখিলিয়ে হেসে ফেলেছিল। ঝুমের সামনে কিছু বলতে না পারলেও মনে মনে শাইয়ান বেজায় চোটে ছিল আহিরের ওপর। এর শোধ যে সে পরে তুলবে সেটা আহিরের জানা আছে।

শাইয়ানকে হাসপাতাল থেকে ঝুমের ফ্ল্যাটে নিয়ে আসা হয়েছে কিছু মুহূর্ত পূর্বে। তাকে ঝুমের রুমে জায়গা করে দেয়া হলেও, ঝুম ফেরার পর থেকে তার রুমের ধারে কাছেও ঘেঁষছে না। সেই কখন থেকে শাইয়ান অস্থির হয়ে আছে ঝুমকে এক নজর দেখার জন্য। কিন্তু তার পাষাণী বউয়ের তার প্রতি দয়া-মায়া হলে তো! বিয়ের পর থেকেই মেয়েটা তার ধারে কাছে ঘেঁষছে না। কেমন অদৃশ্য এক দূরত্ব বজায় রেখে চলছে সর্বদা। যা শাইয়ানকে ভীষণ ভাবে পোড়াচ্ছে। রীতিমত অস্থির করে তুলেছে।

-কি অবস্থা ব্রো?

আহির কখন এলো? শাইয়ান বিন্দুমাত্র বুঝতে পারেনি। সে নিজের দৈত্যকৃতির শরীরটি ঝুমের ছোট বাচ্চা বাচ্চা বিছানার সবটা জায়গা জুড়ে হেলিয়ে শুয়ে আছে। দৃষ্টি রুমের দরজার পানে। ট্রান্সপারেন্ট কারুকাজ করা সুন্দর সাদা পর্দাগুলো ফ্যানের বাতাসে মৃদু দুলছে। তার পাশেই দরজা ছেড়ে কিছুটা ভিতরের দিকে কালো ট্রাউজারের পকেটে দুহাত ভোরে বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আহির। তার চোখমুখের চঞ্চলতা বলে দিচ্ছে লুকায়িত দুষ্টুমির কথা। শাইয়ান ওকে দেখেও বিশেষ পাত্তা দিলো না। এখন একে গুরুত্ব দেয়া মানে নিজের ওপর যেচে মুসিবত ডেকে আনা। আপাতত তার মেজাজের পারদ বিপদ সীমা অতিক্রম করেছে। বউকে দেখতে না পেয়ে এমনিতেই তার জান-প্রাণ, কলিজা, ফুসফুস সব অচল হয়ে আসছে। এই অবস্থায় আহিরের ফাজলামো সে একদমই নিতে পারবে না।

-তোমার ভাবি কোথায়?

আহিরের প্রশ্নটি শাইয়ান সরাসরি এড়িয়ে গেল। শাইয়ানের কণ্ঠ থমথমে, শান্ত। মেজাজ খারাপ কেন? আহির নড়েচড়ে দাঁড়াল। বড় ভাইকে সে খুব ভালো করে চেনে। এই ছেলের ভাব, ব্যবহার সে এক দেখায় বলে দিতে পারে।

-আমার ভাবি!

-আমার বউ।

আহির অবাক হলেও শাইয়ানের উত্তর ছিল স্পষ্ট। আহির সশব্দে হেসে ফেললো শাইয়ানের অধিকারবোধ দেখে।

-তোমার বউ চাচিআম্মার সাথে কিচেনে কাজ করছে।

শাইয়ান শান্ত, স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো আহিরের দিকে। এপর্যায়ে তার কিছুই করার নেই। বউ তার মায়ের সাথে রয়েছে মানে এখন আর তাকে পাওয়া যাবে না। বিষয়টি ভীষণ বেদনাদায়ক। পাষাণ মেয়ে একটা। অতঃপর কিছু একটা মনে পরতেই একদম আচমকা শাইয়ান হড়বড়িয়ে উঠে বসল। প্রথমে সে নিজের বাম হাত দেখল, এরপর ডান হাত। দুহাতই তার শুন্য। সে পরনের ঢোলা প্যান্টের পকেট হাতড়াল, কিন্তু নেই। কাঙ্খিত বস্তুটি তার কাছে নেই। সে এতটা ক্যারেলেস কিভাবে হলো? কীভাবে? তার তো পূর্বেই এই ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত ছিল, তাই না? শাইয়ান ব্যস্ত হয়ে বিছানার আশপাশ খুঁজল। কিন্তু নাহ, সে জিনিস নেই। আহির ওকে ওভাবে করতে দেখে কিছুটা চমকালো। দ্রুত পা বাড়িয়ে এগিয়ে গেলো শাইয়ানের কাছে।

-কি হয়েছে? কি খুঁজছো?

-আমার..ওই হেয়ার ব্যান্ডটা? তুমি দেখেছো? তোমার কাছে?

শাইয়ানের বুকের পাটা অস্বাভাবিক ভাবে ওঠানামা করছে। থেমে থেমে কথাটুকু বলে সে চাতক পাখির মতো আহিরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। হয়তো আহিরের মুখে সে হ্যাঁ উত্তরটি শুনতে চায়। আহির তাকে নিরাশ করলো না। ডানহাতের সাহায্যে পকেট হাতড়ে একটি কালো হেয়ার ব্যান্ড বের করে বাড়িয়ে দিলো শাইয়ানের দিকে। এটা সে হাসপাতাল থেকে নিজের কাছে, নিজের সাথে করে বয়ে বেরিয়েছে। হয়তো শাইয়ানের চেয়ে বসার অপেক্ষায় ছিল। শাইয়ান বিন্দুমাত্র অপেক্ষা করল না। চিলের মতো ছো মেরে আহিরের থেকে নিয়ে নিল। আহির এতে অবশ্য অবাক হলো না। এমন কিছু হবে বলে সে ধারণা করেছিল। হয়তো হেয়ার ব্যান্ডটা কার সে ব্যাপারেও কিছুটা ধারণা তার রয়েছে।

শাইয়ান হেয়ার ব্যান্ডটি তার দু হাতের মুঠোয় নিয়ে বুকে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে নিল। জিনিসটি সে এমন ভাবে বুকে জড়িয়ে ধরলো যেন বড় মূল্যবান কিছু। স্বস্তিতে সে বড় করে একটি নিঃশ্বাস ফেলল। অতঃপর ধীরে ধীরে চোখ খুলে ভীষণ যত্নের সাথে হেয়ার ব্যান্ডটি আবারও ডান হাতের কব্জিতে জড়িয়ে নিল। এই পুরোটা সময় আহির নির্বাক হয়ে সবটা পর্যবেক্ষণ করল। অথচ একবারের জন্যও শাইয়ানকে বিরক্ত করল না, বাধা দিল না।

-ফার্দার আমার জিনিস ধরবে না আহির।

হাড় হিম করা শীতল কণ্ঠ। অন্য কেউ হলে নির্ঘাত আতঙ্কিত হতো, কিন্তু আহিরের মাঝে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল না। সে যেন শুনতেই পায়নি এমন ভাবে সবটা হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে বলল,

-তোমার জিনিস নাকি আমার ভাবির জিনিস?

-সে আমার মানে তার সকল কিছু ও আমার।

একরোখা, জেদি উত্তর। আহির শান্ত হয়ে দেখলো। পূর্বে কখনো কোনো ব্যাপারে শাইয়ানকে এতটা অধিকার দেখাতে দেখা যায়নি। বরাবরই সে নিজেকে সকল কিছু থেকে দূরে রাখে, একা থাকে। অথচ আজ একটা মেয়ের জন্য কতই না পাগলামি।

-সিসিইউ -তে প্রবেশের পূর্বে রোগীর সাথে যা যা থাকে তা পরিবারের সদস্যদের কাছে দেওয়া হয়। তোমার সাথে যা ছিল সবটা আমার কাছে দেওয়া হয়েছিল। তার মাঝে ওই জিনিসটাও ছিল।

শেষের কথাটি আহির শাইয়ানের কব্জিতে জড়িয়ে থাকা হেয়ার ব্যান্ডটি কে ইঙ্গিত করে বলল। শাইয়ান শান্ত হলো এবার। এখনো সে বাম হাতে হেয়ার ব্যান্ডটি ছুঁয়ে আছে।

-যাই হোক, বিয়ে তো হয়ে গেল। এখন দেশে ফেরার কথা কি ভাবলে?

-ভাবিনি।

-সে কী? তোমার কি এদেশ ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছা নেই?

শাইয়ান নিরুত্তাপ। সে খুব ধীরে পিঠ এলিয়ে দিল বেডের হেডবোর্ডের সাথে।

-বউকে ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছা নেই।

-দারুণ।

আহির ওর হেঁয়ালি করায় পরিহাস করে বলে উঠল। অতঃপর খুবই দক্ষ হাতে কৌশলে নিজের ঝাঁকড়া ঘাড় সম বড় চুলগুলো মুঠোয় নিয়ে পিছনের দিকে একটি ছোট খোঁপা করে একটি আকারে ছোট ফুল আকৃতির মেটালের ক্ল-ক্লিপ দিয়ে বেঁধে ফেলল। শাইয়ান পূর্বে কখনো আহিরকে এমন জিনিস ব্যবহার করতে দেখিনি। এগুলো সাধারণত মেয়েরা ব্যবহার করে, তাই না! তবে আহির কোথায় পেল? বাসায় এসব ব্যবহার করার মতো মেয়ে একমাত্র ঝুম রয়েছে। তবে কি আহির ঝুমের জিনিস ব্যবহার করছে? কথাটি ভেবেই শাইয়ানের চোখমুখ আবারো শক্ত হয়ে এলো। মুখ ফুটে কড়া গলায় বলতে চাইলো, কেন তার বউয়ের জিনিস ব্যবহার করছে? কিন্তু তার পূর্বে শ্রাবণীর বাঁশ গলার চিৎকার ভেসে এলো। শোনা গেল মেয়েটার বাচ্চাদের মতো কান্নার শব্দ।

-আমার ক্লিপ পাচ্ছি না। তোর চোর দেবরকে ডাক।

ঝুমের ঘর থেকেও শ্রাবণীর গলা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে, ঠিক এতটাই জোর দিয়ে সে কথাগুলো বলল। শাইয়ানের কপালে কয়েকটি ভাঁজের উদয় হলো এবার। ভালো করে সে আহিরের দিকে তাকিয়ে দেখলো ছেলেটা কেমন কাচুমাচু করছে। শাইয়ানের পুরো ঘটনা বুঝতে সর্বোচ্চ ১০-১২ সেকেন্ড লাগলো। অতঃপর তার বিগড়ে যাওয়া মেজাজ পুনরায় নিজ থেকে ঠিক হয়ে গেল। আহির যে শ্রাবণীর ক্লিপ নিয়েছে বেশ বুঝতে পেরেছে। এখন সে দেখতে চায় এই দুই বাঁদর কি কাহিনী ঘটায়।

শাইয়ান হঠাৎ বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পা বাড়ালো রুমের বাইরে। আহির আঁতকে উঠে শাইয়ানকে থামিয়ে দিয়ে জানতে চাইল,

-কি হয়েছে? কোথায় যাচ্ছো? কিছু লাগলে আমাকে বলো।

শাইয়ান আড় চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আবারো পা বাড়িয়ে বলল,

-যে ঝামেলা বাধিয়েছো তার শেষ দেখতে যাচ্ছি। তুমিও আসো, এক সাথে মজা নিয়ে দেখা যাবে। সম্ভবত, তোমার সাহায্য দরকার পরবে।

শাইয়ান শব্দহীন পায়ে চলে গেল। এদিকে আহির পড়ল বড় বিপাকে। শ্রাবণীর চেঁচানোর কারণ আহির জানে। তার মাথার ক্ল-ক্লিপটা শ্রাবণীর ভীষণ প্রিয়। এটা সে সর্বদা নিজের সাথে নিয়ে ঘোরে। এই তথ্য আহির শ্রাবণের থেকে পেয়েছে। বিনিময়ে অবশ্য শ্রাবণকে ঘুষ দিতে হয়েছে। ঘুষ হিসেবে সে শ্রাবণকে গতকাল রাতে বেশ নামিদামি এক রেস্টুরেন্ট থেকে ডিনার করিয়ে এনেছে। তার বিনিময়েই শ্রাবন বাঘের মুখ থেকে খাবার ছিনিয়ে আনার মতো করে বোনের রুম থেকে ক্লিপ চুরি করে এনে আহিরকে দিয়েছে। এখানে আহিরের উদ্দেশ্য যে শ্রাবনীকে জ্বালানো তা বোঝার বাকি থাকে না। শ্রাবনী ও যে বুঝতে পেরেছে কাজটা আহির করেছে সেটাও আহির বুঝতে পারল। নয়তো শ্রাবনী সোজা এখানে এসে তাকে চোর সম্বোধন করবে কেনো? কত বড় সাহস মেয়েটার! তাকে কি না চোর বলছে?

-রাজাকারের বাচ্চা।

বিকট চিৎকারে আহিরের হৃদপিণ্ড লাফিয়ে উঠল। কি ভয়ানক গলা! তার মতো সুস্থ ছেলেটারই প্রাণ যায় যায় অবস্থা হয়ে এসেছে। শ্রাবণীর বেচারা স্বামীর জন্য আহিরের আজ মন থেকে করুণা অনুভব হচ্ছে। ইশ বেচারা হয়তো নিজেও জানে না কি জিনিস তার কপালে লেখা রয়েছে।

-এই রাজাকারের বংশধর চোর। আমার ক্লিপ নিয়ে কোথায় লুকিয়েছেন, হ্যাঁ? বের হন, বের হন কখনোই।

আহির বেরিয়ে এলো দাপটিয়ো ভঙ্গিতে। তার মাঝে কোনরূপ জড়তা নেই। থাকবে কেন? সে তো কাজটা জেনে শুনেই করেছে। শ্রাবনীকে এতটুকু জ্বালাইয়েও যেন আকাশ সম শান্তি অনুভব করছে ছেলেটা।

-কি হয়েছে কি? ফাটা বাঁশের মতো গলা দিয়ে চিল্লাচ্ছো কেন?

-আপনাকে বাঁশ দেওয়ার জন্য।

আহির থতমত খেয়ে গেল শ্রাবণীর উত্তরে। শাইয়ান একপাশে দাঁড়িয়ে ভ্রু-দ্বয়ের মাঝে ভাঁজ ফেলে আহিরের নাটক দেখছে।

বসারঘরে সকলে রীতিমত ভিড় জমিয়েছে সেদিনের মতো। পূর্ব হতেই সকলে এখানে ছিল শুধু শ্রাবণ ও শ্রাবনী ছাড়া। তারা দুজন নিজেদের ফ্ল্যাটে ছিল। মেহেরুন্নেসা, মিসেস বিথী ও ঝুম রান্না ঘরের কাজ শেষ করে ইব্রাহিম আনসারীর সাথে বসারঘরে বসে কথা বলছিলেন। এরই মাঝে শ্রাবণীর আগমন। পুরো মারকুটে ভাব নিয়ে সে শ্রাবণের কান টেনে নিয়ে এসেছে এখানে। এসেছে থেকে গলা চড়িয়ে আহিরকে বকেই যাচ্ছে।

-ভাইয়া কি করেছে আপু?

এই এত এত বিশৃঙ্খলার মাঝে ঝুমের শান্ত, শীতল, নরম গলা। শাইয়ান অপলক মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল তার বউয়ের দিকে। মেয়েটাকে যে কি আদুরে লাগছে! ঝটপট কয়েকটা চুমু খেতে ইচ্ছা করছে। বিয়ের পর দুই/তিনটা চুমু খাওয়া কি পাপ হবে? না তা কেনো হবে? ঝুম তো এখন তার বউ। বউকে চুমু খাওয়া অবশ্যই পাপ না। তবে চুমু খেতে গেলে যদি ঝুম থাপ্পড় মেরে বসে? বসুক। তার বউয়ের দেয়া চর-থাপ্পর সে হাসি মুখে হজম করে নিতে পারবে। তাতে সমস্যা নেই। একটা ঝুঁকি কি নেয়া উচিৎ? আদুরে ঝুমকে দেখেই তো তার মাথা ঝিমঝিম করছে।

-কি হয়নি তাই বল? তোর দেবর আমার ক্লিপ চুরি করেছে।

-ক্লিপ? ভাইয়া কেনো তোমার ক্লিপ চুরি করবে? ভাইয়া আপনি আপুর ক্লিপ চুরি করেছেন?

শেষের প্রশ্নটা ঝুম আহিরের উদ্দেশ্যে উর্দুতে করল। যদিও চুরির ব্যাপারটা বলতে তার বড্ড লজ্জা করেছে। এছাড়া শ্রাবণীর কথায় সে বাকরুদ্ধও বটে। এমন নামিদামি একজন ডাক্তার চুরি করবে কেন? আর সব ফেলে সামান্য একটা ক্লিপ চুরি করার কারণই বা কি?

-চুরি? আমি কেনো চুরি করবো? ভাবি আপনার মনে হয় আমার মতো ছেলে চুরি করতে পারে?

আহির নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চোখেমুখে দারুণ নিরীহ ভাব ফুটিয়ে তুলল। তার মুখ দেখে মনেই হবে না এই ছেলে ঠিক কতটা হাড়ে বজ্জাত। শাইয়ান ওর অভিনয় দেখে হতবাক। নিজের অবাকতা লুকিয়ে রাখতে না পেরে আপন মনে বিড়বিড়িয়ে বলল,

-এই ছেলে ভুল প্রফেশনে চলে এসেছে। এর ডাক্তার না হয়ে এক্টর হওয়া উচিত ছিল। ধুরন্ধর একটা।

-কি হচ্ছে কি শ্রাবনী? তারা আমাদের মেহমান, ঝুমের শ্বশুরবাড়ির লোক। বুঝে শুনে কথা বল।

মিসেস বিথী এত সময় চুপ থাকলেও এবার থমথমে গলায় মেয়েকে শাসিয়ে উঠলেন। একে তো আহিরের নাটক তারউপর মায়ের ধমকানি, না চাইতেও শ্রাবণীর রাগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সে শ্রাবণের কান মলে দিয়ে বলল,

-মুখ খোল হাতির বাচ্চা, দ্রুত মুখ খোল। নয়তো তোর খবর আছে।

-আহ্! লাগছে। আপু ছাড়ো। বলছি, বলছি।

শ্রাবনী ধরলে বাচ্চা শ্রাবণ তখন বোনের সাথে পেরে উঠে না। তবুও কেনো যে বোনের সাথে লাগতে যায়! বড্ড আফসোস হচ্ছে এখন তার।

-আপুর সেই ফেভারিট ক্ল-ক্লিপটা আহির ভাইয়া নিয়েছে। আমাকে বলেছিল এই কাজ করে দিতে পারলে ট্রিট দেবে। গতকাল রাতে ক্লিপ হাতে পাওয়ার পর আমাকে খেতে নিয়ে গিয়েছিল।

ঝুম মুখে হাত দিয়ে আহিরের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকাল। ওর ওই চোখ দেখে শাইয়ান দিন-দুনিয়া ভুলে বসলো মুহূর্তের জন্য। একটা মানুষ এত সুন্দর করে তাকায় কীভাবে? অবাক হলেও বুঝি কাউকে এতটা মায়াবী লাগে? শাইয়ান মেয়েটাকে যত দেখে ততই পাগল হয়ে যায়।

এদিকে আহির শ্রাবণের বাংলায় বলা কথাগুলো না বুঝলেও ঝুমের চাহনি আর শ্রাবনের ফিসফিসিয়ে বলা ‘সরি’ শুনে বুঝে ফেলল সে ফেঁসে গিয়েছে। মেহেরুন্নেসা হয়তো এসবে অভ্যস্ত। তার আহিরকে চেনা আছে। বাড়িতেও তো কারো না কারো পিছনে লেগেই থাকে। ওসব কিছু চুরি টুরির ব্যাপার না। ব্যাপার হচ্ছে ছেলেটা শ্রাবনীকে জ্বালাতে চায়। সুতরাং সে এসবে মাথা না ঘামিয়ে গিয়ে বসলেন স্বামীর পাশে। ইব্রাহিমকেও অবশ্য এসবে বিশেষ আগ্রহী দেখলো না। সেও নীরব।

-কী? ওভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?

আহির ঝুমের চাহনি হজম করতে পারছে না। মেয়েটার চোখ এত বড় কেন? মনে হচ্ছে গিলে খাবে ওকে। ঝুম বড় করে নিঃশ্বাস ছেড়ে হাঁপিয়ে যাওয়া গলায় বলল,

-শেষমেশ আপনি আপুর ক্লিপ চুরি করলেন ভাইয়া?

মেয়েটা বিরক্ত হয়ও সুন্দর করে, রাগও হয় সুন্দর করে। নরম, নরম গলা দিয়ে মিষ্টি মিষ্টি সুর বের হয়। আহিরের ভীষণ ভীষণ ভালো লাগে যখন ঝুম ভাইয়া বলে সম্বোধন করে। ছোট থেকে তার একটা নিজের বোনের শখ ছিল। যখন তার মা দ্বিতীয় বার গর্ভবতী হন, তখন আহির একটি বোন চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনায় আয়ান দুনিয়াতে আসে। আয়ানের পর তাদের অবশ্য একটি বোন হয়েছিল। যে দুনিয়ায় ছিল কয়েক মুহূর্তের জন্য। এরপর থেকেই একটা বোনের আফসোস তার কেমন যেন রয়ে গেল। এমন নয় যে সারা, ঈশাল, মিশালের সাথে তার সম্পর্ক খারাপ! তারাও আহিরের বোন। কিন্তু ওই যে একটা ব্যাপার থাকে না আত্মার টান বলে, আপন আপন ভাব, ওটা কখনো অনুভব করেনি। কিন্তু এখন করে ঝুমের প্রতি। তার মনে হয়, তার বোনটা যদি বেঁচে থাকতো তবে সে ঝুমের মতো নাজুক, মিষ্টি হতো। শাইয়ানের ভাগ্যকে সে তারিফ না করে পারে না।

আহির গলা পরিষ্কার করে বলল,

-আরে আমি চুরি করবো কেন ভাবি? আসলে আমার কাছে হেয়ার ব্যান্ড ছিল না তাই শ্রাবণকে ওর থেকে একটা এনে দিতে বলেছিলাম। কী শ্রাবণ ঠিক না?

নিখুঁত মিথ্যা, অথচ কেউ ধরতে পারবে? শ্রাবণটাও তাল মিলিয়ে মাথা নাড়ালো যেন কত বড় সত্যি কথা। শ্রাবনী রাগে ফুসে উঠল। ঝুম হতাশ ভঙ্গিতে বলল,

-আপনি আমাকে বলতেন, আমি নিজের একটা ব্যান্ড দিতাম।

-আপনি কেনো আপনার জিনিস ওকে দিবেন? ও নিজের ব্যবস্থা নিজে করে নিক। কে বলেছে এত বড় চুল রাখতে? আর রেখেছে যখন নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস সাথে করে নিয়ে আসবে না?

শাইয়ান প্রায় সাথে সাথে তেঁতে উঠে ঝুমকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলল। ঝুম আড় চোখে শাইয়ানকে একবার দেখে আর তাকালো না। পাগল লোক একটা। এর কথা ধরার থেকে না ধরাই ভালো। আহির চোখমুখ কুঁচকে তাকিয়ে শাইয়ানের দিকে। তার ভাই একটা বেইমান। মস্ত বড় বেইমান।

-ঠিক ঠিক। এতদিনে একটা মনের মতো কথা বলেছেন আপনি। আপনাকে আমার ভালো লেগেছে। পাকিস্তানি হলেও আপনার মাঝে রাজাকার রাজাকার ভাব কম। দুলাভাই হিসেবে আমি আপনাকে একসেপ্ট করলাম।

শ্রাবনী তার বাম হাতের বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে থাম্বস আপ এর মতো করে দেখল। সে বড্ড খুশি। কেউ তো তার হয়ে কথাটি বলল। এই লোক মোটামুটি ভালো আছে। অন্তত ওই চোরের বংশধর রাজাকারের বাচ্চাটার থেকে তো ভালোই। শাইয়ান ও চোখের ইশারায় সম্মতি জানাল। আহির এই বেইমানি মেনে নিতে পারল না। তার ভাই টিম স্যুইচ করেছে? এই কষ্ট মানা যায়? তার সাথে এত বড় গাদ্দারী?

-বেইমান। তুমি কি সত্যিই আমার ভাই?

-আমি কোনো চোরের ভাই না।

শাইয়ান সাফ সাফ না উত্তর দিল। আহিরের চোয়াল ঝুলে পড়ার জোগাড়। সে আশাহত। মনটা তার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। শাইয়ান নির্লিপ্ত চোখে ওর নাটক দেখলো শুধু। ঝুম এদের কাহিনী দেখে দেখে হতাশ, ভীষণ হতাশ। এরা এক একটা আস্ত ড্রামাবাজ।

-আরে ওই তো আমার ক্লিপ। চোর লোক! দিন আমার ক্লিপ দিন।

শ্রাবনী তেড়ে গেল আহিরের দিকে। তার ক্লিপ সে নিয়েই ছাড়বে। এদিকে আহিরও কি কম যায়? যে ক্লিপের জন্য এতকিছু সেই ক্লিপ সে ইহজনমে বেঁচে থাকতে শ্রাবনীকে দেবে না। আহির শ্রাবনীকে আগাতে দেখে প্রায় সাথে সাথে ছিটকে সরে গেল।

-দেবো না। চোর বলেছো না? কাজ হয়ে গেলে এমনিই দিয়ে দিতাম। এখন তো আর দিবোই না। দেখি কিভাবে নাও।

-ভালো হচ্ছে না কিন্তু বলে দিচ্ছি।

আহির যেদিকে যাচ্ছে শ্রাবনীও ওর পিছু পিছু সেদিকে ছুটছে। হঠাৎ দেখে মনে হবে ওরা দুজন ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছে।

-আহ্ আহির, মেয়েটাকে বিরক্ত না করে দিয়ে দিন।

এতক্ষণ পর মেহেরুন্নেসা মুখ খুলল। যদিও তার কথায় তেমন জোর ছিল না। বলার জন্যই বলা আর কি।

এদিকে মিসেস বিথী মাথায় হাত দিয়ে তার ধিরিঙ্গি মেয়ের কাজ দেখছে।

-আমি কিন্তু রেগে যাচ্ছি। আমার ক্লিপ দিন বলছি।

-তুমি রেগে যাচ্ছো? আল্লাহ আমি তো ভয় পাচ্ছি। এখন আমার কি হবে? আমি তোমাকে ভয় পাচ্ছি জংলি মেয়ে।

ভীষণ রকম ব্যঙ্গ করে বলল আহির। শ্রাবণীর রাগ তরতর করে বেড়ে গেল। আহিরকে হাতের কাছে পেলে কি করবে? ঘাড় মটকে দেবে না তো! রাগে, দুঃখে মেয়েটার নাক পিটপিট করছে। আহিরকে উদোম কেলানোর জন্য হাত নিশপিশ করছে।

-মজার ব্যাপার কি জানো? তুমি সব সময়ই রেগে থাকো। তোমার নাকটা ওমন বোঁচা কেনো জানো? কারণ ওখানে সবসময় রাগ জমে থাকে। যার কারণে তোমার নাকটা আর বড় হতে পারেনি তোমার মতো। নাক বোঁচা লিলিপুট।

ঘরের চারিপাশে ঘুরতে ঘুরতে আহির এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলল। সে শ্রাবণের থেকে অনেক কথা বের করেছে শ্রাবণীর ব্যাপারে। তার মাঝে একটি হলো এই নাকের বিষয়। নাক নিয়ে শ্রাবণীর ইন্সিকিউরিটির শেষ নেই। মেয়েটাকে নাক নিয়ে বললেই সে ক্ষেপে যায়। নাকটা বোঁচা কি না! তাই তো জেনে শুনে আহির খোঁচাটা মারল। সাথে আবার লিলিপুট ও যুক্ত করেছে। এখন শ্রাবনী কি করবে? রেগে চিৎকার করবে? নাকি কেঁদে দেবে? অথচ শ্রাবনী তেমন কিছুই করলো না। সে এক মুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়ে পড়ল। তখন আহির ফ্ল্যাটের দরজার অভিমুখে। শ্রাবনীকে থামতে দেখে সে নিজেও থেমে গেল। ঝুম ওর কাছাকাছিই ছিল। এখন কি হতে পারে তার জানা আছে। অতঃপর চুপচাপ সে নিরাপদ স্থানে সরে দাঁড়ালো। ঘটনা কি ঘটবে বা কি ঘটতে পারে তা বোঝার পূর্বেই শ্রাবনী এক ভয়ানক কাজ করে বসলো। আহির শুধু অনুভব করলো তার মুখের ঠিক সামনে থেকে একটি জুতা হাওয়ায় উড়ে তাকে টপকে চলে গেল। টার্গেট মিস। এক/দুই ইঞ্চি এদিক ওদিক হলেই জুতাটা ঠিক আহিরের মুখে লাগতো। আহির স্থির, বাকরুদ্ধ। তাকে অবাক হওয়ারও সময় দিল না শ্রাবনী। নিজের পায়ের দ্বিতীয় জুতাটি হাতে নিয়ে ছুটলো আহিরের দিকে।

-রাজাকারের বাচ্চা, আজ তুই শেষ।

শ্রাবনীকে আগাতে দেখে আহির অপেক্ষা করল না। নিজেকে ও নিজের মান সম্মান বাঁচাতে দিকবিদিক ভুলে ছুটলো যেদিকে পারল সেদিকে। বাকিরা শুধু শুনে গেল শ্রাবণীর বলা ভয়ানক ভয়ানক চিৎকার ও গালিগুলো।

চলবে___

[ কি অবস্থা সবার? চলে এসেছি আবারো জ্বালাতন করতে। রেগে থেকে লাভ নেই, ছুম্মা ছুঁড়ে মারো আমার জন্য। তোমাদের আমি ভীষণ মিস করেছি😭। ওহ হ্যাঁ, জুতা ছোড়াছুড়ির আইডিয়া জান্নাতের। পর্ব এবার থেকে ছোট ছোট হবে কিন্তু প্রতিদিন আসবে। আগের মতো বড় বড় পাবে না। যদি কখনো দিতে না পারি তাহলে পরের পর্ব বড় হবে। এখন কথা হলো ভালো ভালো কমেন্ট চাই। আর রিয়েক্ট ও। মনে থাকে যেন।

আমার ভালোবাসারা তোমরা অনেক ভালো। থ্যাংক ইয়ু আমাকে সহ্য করার জন্য। যাদের বইছবি এখনো পোস্ট হয়নি তাদের সবার বইছবি পোস্ট করা হবে। কষ্ট পেও না। আমি একটু সব কিছু থেকে দূরে সরে নিজের সাথে সময় কাটাতে চেয়েছিলাম। মীরা মোটা হয়ে গিয়েছে🫩।]

প্রচ্ছদ ছবি–জান্নাত

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন