ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কিন্ত আমি

২৮তম পর্ব

লেখক: মীরা রায়াদ

#তুমি_কিন্তু_আমি

মীরা_রায়াদ

পর্ব–২৮

🚫অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ🚫

খেলা আজ ভালোই জমেছে। শুরুর দিকে ধীরে চললেও এরপর বেশ ভালো এগিয়েছে। মাঠে নেমে শ্রীলঙ্কা আজ ৬০ রান করতে পেরেছিল। অর্থাৎ সর্বমোট ৩৩০ রানে শ্রীলঙ্কা অলআউট। যেহেতু প্রথম ইনিংসে পাকিস্তান ৩০ রানে এগিয়ে ছিল। তাই এখন তাদের জিততে হলে ৩০১ রান করতে হবে। পাকিস্তান দলের ব্যাটিংয়ের সময়টা বেশ ভালোই কেটেছে। তারা আশাবাদী ছিল জয় নিয়ে। তার ব্যতিক্রম অবশ্য দেখা যায়নি। জয় আসলেই পাকিস্তানের হয়েছে। আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম একেবারে শেষ করেই শাইয়ান ঝুমের সাথে দেখা করলো। যদিও খেলার মাঝে বেশ কয়েকবার ব্রেক টাইম দিয়েছিল। চাইলে তখন দেখা করা যেতো। কিন্তু মেয়েটা লজ্জায় নিজেকে একদম গুটিয়ে নিয়েছিল। ওই ঘটনার পর শাইয়ানের সামনে আর পরতে চায়নি। শাইয়ান হয়তো বুঝেছিল ব্যাপারটা। তাইতো সময় দিয়েছে। খেলা শেষ করেই দেখা করতে চেয়েছে। খেলা শেষ হতে হতে যখন তাদের আবারো দেখা হলো তখন প্রায় সন্ধ্যার কাছাকাছি। ঝুম তখন একপাশে নীরবে দাঁড়িয়ে। দৃষ্টি শাইয়ানের এগিয়ে আসার পানে। ছেলেটা তখন ঘামে ভিজে চুপচুপে। সারাদিন রোদে পোড়ার কারণে ফর্সা মুখটা সামান্য কালচে ভাব হয়েছে। তবুও ভীষণ সুদর্শন ও আকর্ষণীয় লাগছে ঝুমের নিকট। সে পলক ফেলতে পারল না। অপলক মুগ্ধ হয়ে স্বামী নামক মানুষটিকে দেখে গেল। শাইয়ান যখন ঝুমের কাছে এসে দাঁড়ালো তখন তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে পরছে। বোঝাই যাচ্ছে ছেলেটার কষ্ট হয়েছে খুব।

-বেশি ক্লান্ত লাগছে আরীবা?

ঝুমের চোখে তৃপ্তি, মায়া আর ভালোবাসা। ছেলেটা নিজের কষ্ট কী দেখতে পাচ্ছে না? প্রশ্নটা তো শাইয়ানের জন্য প্রযোজ্য। অথচ এতকিছুর মাঝেও ছেলেটার ঝুমের প্রতি কত খেয়াল। তাদের দুজনের মাঝে একহাতের মতো দূরত্ব। ঝুমের আজ সেই সামান্য দূরত্বটুকুও সহ্য হলো না। সে পা বাড়িয়ে দূরত্বটুকু মিটালো বড় নির্দ্ধিধায়। শাইয়ানের একদম কাছাকাছি গিয়ে বড়ো যত্ন নিয়ে নিজ শাড়ির আঁচল দিয়ে শাইয়ানের কপালের, নাকের ঘাম মুছে দিল। শাইয়ানের সেসব স্বপ্ন মনে হল। বেচারা হজম করতে পারল না বোধ হয়। ঝুমের এই পরিবর্তন রীতিমত ভিমড়ি খাওয়ানোর মতো ছিল। ছেলেটা হা করে রইল। যেন কিছুই মাথায় ঢুকছে না।

-পায়ে ব্যথা করছে। খুব ঘুমও পেয়েছে। হোটেল রুমে চলুন।

ঝুমের মাঝে নূন্যতম জড়তা নেই। তার কথা শুনে মনে হবে শাইয়ানের সাথে তার বহুদিনের সংসার। সে এসবে অভ্যস্ত। শাইয়ান এতকিছু মানতেই পারল না। বেচারা বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস নিতে নিতে ডান হাত তুলে বুকের বামপাশ খাঁমচে ধরে বলল,

-বুকে ব্যথা করছে আরীবা।

শাইয়ানের মুখ দেখে বোঝা যায় সে মিথ্যা বলছে না। কিন্তু ঝুমের মাঝে অস্থিরতা দেখা গেলো না। সে এসব মোটেও পরোয়া করলো না। ছেলেটার সব ঢং। একটু হলেই কিসের বুকে ব্যথা শুনি? মানুষের হার্ট এত দুর্বল হলে চলে? তাও আবার এমন শক্ত সামর্থ্য বান পুরুষ যদি এসব বলে! ঝুম শাইয়ানের কথায় বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে নিজের ডান হাতে শাইয়ানের বাম হাত আঁকড়ে ধরে সামনের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বলল,

-আপনার রুমে থাকতে দিবেন তো? আমি কিন্তু আপনার সাথে থাকবো।

শাইয়ানের কানে আদৌ সেসব গেলো কিনা সন্দেহ। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঝুম যেদিকে নিয়ে গেলো সেদিকে পা বাড়িয়ে চলতে লাগলো।

গল -এ শাইয়ানদের ল্য গ্র্যান্ড গল হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঝুম নিজেও সেখানে উঠেছে। সে পূর্ব থেকেই জানতো শাইয়ান কোন হোটেলে রয়েছে তাই নিজেও সেখানে উঠেছে। হোটেলে এসে হোটেল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে শাইয়ান ঝুমকে নিজের সাথে রাখার ব্যবস্থা করে ফেলল। যেহেতু তারা বিবাহিত দম্পত্তি, তাই বিশেষ সমস্যা হলো না। ঝুমের হোটেল রুমের কিকার্ডটি কর্তৃপক্ষের নিকট দিয়ে ঝুমের জিনিসগুলো শাইয়ানের রুমে পৌঁছে দেয়ার জন্য জানিয়ে শাইয়ান ঝুমকে নিয়ে চললো নিজের রুমে।

শাইয়ানের রুমটা ঝুমের রুমের তুলনায় অনেক বড়ো। লাক্সারি একটা ব্যাপার রয়েছে এই রুমে। তাছাড়া এই রুমের এক পাশটা সম্পূর্ণ কাঁচের। যার দরুন, এখান থেকে বাইরের দৃশ্য দেখা যায় খুব সুন্দর ভাবে। শাইয়ান ওকে নিয়ে রুমে ঢুকেই জড়িয়ে ধরতে গেলো। এরপর আবার কি ভেবে থেমেও গেল। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে কিছু একটা ভাবলো হয়তো। অতঃপর কাবার্ট হাতড়ে নিজের জন্য পোশাক নিয়ে কিছু না বলেই ওয়াশরুমে চলে গেল। এদিকে ঝুম বেআক্কেলের মতো শাইয়ানের গমন পথের দিকে তাকিয়ে। কি হলো সে বুঝতে পারেনি। তবে সেদিকে ঝুম বিশেষ আগ্রহ দেখলো না। পাগল লোকটার কখন কি হয় সে বুঝতে পারে না। বুঝতে চায়ও না। বেশি বুঝতে গেলে দেখা যাবে তখন সে নিজেও ওই লোকের মতো হয়ে যাচ্ছে। এমনি কী কম পাগল করেছে তাকে?

ঝুম ক্লান্ত পায়ে গিয়ে দাঁড়াল কাঁচের দেয়ালের সামনে। পুরোটা অংশ কালো, মোটা ও ভারী কার্টেন দিয়ে ঢাকা। ঝুম নরম হাতে কার্টেনের এক অংশ টেনে সরিয়ে দিল। সাথে সাথে তার দৃষ্টিতে ধরা দিলো ব্যস্ত শহর ও কমলা রঙ্গা আকাশ। সূর্য তার প্রতিদিনের নিয়ম মেনে অস্ত যাচ্ছে। আকাশ জুড়ে পাখি তার নিজ নীড়ে ফিরছে ঠিক যেমন ঝুম শাইয়ানের কাছে ফিরেছে। এই দৃশ্যটি এত মুগ্ধ করলো ঝুমকে যে সে নিজের স্থান, কাল সব ভুলে বসলো। নির্নিমেষ তাকিয়ে দেখতে রইল আকাশ। তার ধ্যান ভঙ্গ হলো বেলের শব্দে। ঝুম একবার ওয়াশরুমের দিকে তাকালো। ভিতর থেকে পানির শব্দ আসছে। শাইয়ান হয়তো গোসল করছে। ঝুম ওকে আর না ডেকে নিজেই গিয়ে দরজা খুলল। একজন বেলবয় ঝুমের লাগেজ নিয়ে দাঁড়িয়ে। ঝুম সৌজন্যতা দেখিয়ে একটু হাসলো। অতঃপর বিনয়ের সাথে ব্যাগটি নিয়ে লোকটাকে অপেক্ষা করতে বলে আবারো ভিতরে চলে গেল। ফিরে এলো হাতে কিছু রুপি নিয়ে। যেটা সে বেলবয়কে টিপস হিসাবে দিল। ছেলেটা অল্প বয়সী। ঝুমের কাজে সে খুশি হলো। মিষ্টি হেসে সে বিদায় নিলে ঝুম আবারো দরজা বন্ধ করে ভিতরে চলে এলো। এবার সে পুরো রুমে দৃষ্টি বুলালো। সবটা পরিপাটি, সুন্দর। দেখেই শান্তি লাগছে। দৃষ্টি নরম বিছানায় পড়তেই ক্লান্তিতে ঝুমের ঘুম পেলো খুব। সে অপেক্ষা করতে পারছে না। ফ্রেশ হয়ে ঘুম দেওয়ার জন্য তার শরীর ছেড়ে দিয়েছে। এরই মাঝে শাইয়ান বেরিয়ে এলো ওয়াশরুম থেকে। তার গলায় সাদা একটি তোয়ালে। চুলগুলো ভেজা। পরনে সাদা গোল গলার টি-শার্ট ও কালো স্পোর্টস ট্রাউজার। শরীরে এখনো বিন্দু বিন্দু পানি লেগে রয়েছে। ছেলেটা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে হয়তো কয়েক সেকেন্ড ঝুমের দিকে তাকালো। অতঃপর হাওয়ার বেগে ঝুমের কাছে এসে কোনো রকম সতর্কতা ছাড়াই শক্ত করে মেয়েটাকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিল। পুরো ব্যাপারটা ঘটতে এক মিনিট সময়ও ব্যয় হয়নি। এর মাঝে কি থেকে কি হলো ঝুম বুঝতে পারেনি। তার শুধু মনে হলো শাইয়ান তাকে জড়িয়ে ধরে চ্যাপ্টা করে দেবে। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হলো মেয়েটার। কিন্তু সে মুখে একটি বাক্যও উচ্চারণ করল না। উল্টো দুহাত তুলে আঁকড়ে ধরলো শাইয়ানের পিঠ।

-আপনি সত্যিই এখানে? আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না।

আবেগে শাইয়ানের কণ্ঠ কাঁপছে। তার কণ্ঠের উচ্ছ্বাস উপচে পরতে চাইছে। ঝুম জানতো এমন কিছু হবে। সে প্রস্তুতও ছিল কিন্তু তবুও সে লোকটাকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এমন বড়ো মানুষকে সামলানো কী চাট্টি খানি কথা?

ঝুম শাইয়ানের পিঠে ভরসার সাথে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

-আমি এখানে, আপনার পাশে, আপনার বুকে।

ঝুমের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে শাইয়ানের আলিঙ্গনের দৃঢ়তা আরো বাড়ল।

-মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছি। আপনি এভাবে আসবেন কল্পনাও করিনি। আমি খুব খুশি হয়েছি জানেন? খুশিতে আমার কান্না পাচ্ছে, বুক কাপছে, আদর করতে মন চাচ্ছে। আরীবা শুনছেন? এই শুনুন না?

-হুম শুনছি, বলুন।

-আমি আপনাকে আদর করি, মেরিজান?

শাইয়ানের কণ্ঠ অন্যরকম। ঝুম বুঝলো। ভয়ে তার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। নিজ অজান্তেই মেয়েটার দুহাত শাইয়ানের পিঠ খামচে ধরল। শাইয়ান হঠাৎ বেসামাল হয়ে পড়ল। দিক-বেদিক হারিয়ে সে ঝুমের কানে ঠোঁট লাগিয়ে একের পর এক চুমুর বর্ষণ ঝরাতে লাগলো। ঝুম স্থম্ভিত, বিমূঢ়। ভয়ে সে থরথর করে কাঁপছে। অথচ শাইয়ানকে সে বাধা দিতে পারছে না। ঠিক সেই মুহূর্তে ঝুমকে বাঁচিয়ে দেয়ার জন্য শাইয়ানের ফোন বেজে উঠল। ততক্ষণে শাইয়ান পুরোপুরি বেসামাল। তার নিঃশ্বাস ঝুমের কান, গলা, ঘাড়ে পরছে। ঝুমের নিঃশ্বাসও ভারী। এমন মুহূর্তেও বাধ্য হয়ে শাইয়ান সরে এলো। টেবিলের উপর পরে থাকা ফোনটির দিকে বিরক্তির সাথে তাকিয়ে মনে মনে ভয়ানক একটি গা*লি দিতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল। ঝুম তখন নিস্তেজ। তার কপাল শাইয়ানের বুকে। সম্পূর্ণ মুখটা সে শাইয়ানের বুকে লুকিয়ে রেখেছে। শাইয়ান এবার নরম চোখে মেয়েটার দিকে তাকালো। ইতোমধ্যে ঝুমের কানের আশপাশ সে লাল করে ফেলেছে। বড্ড বেপরোয়া হয়ে পরেছিল কিনা! কিন্তু তাই বলে এতটুকুতে এই হাল? কী করবে সে এই নাজুক মেয়েটাকে নিয়ে? কীভাবে সামলাবে তার নরম বউটাকে?

শাইয়ান ঝুমের মাথায় ধীরে হাত বুলিয়ে দিয়ে জানতে চাইল,

-ঠিক আছেন?

ঝুম লজ্জায় জুবুথুবু। মাথা তুলে তাকানোর সাহসও নেই। শাইয়ান উত্তর না পেও আর প্রশ্ন করল না। ওভাবেই ঝুমকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে আগালো টেবিলের দিকে। ততক্ষণে ফোন বেজে বেজে কেটে গিয়ে আবারো বেজে উঠেছে। শাইয়ান ঝুমকে নিয়ে গিয়ে বসলো বিছানার পাশে। অতঃপর টেবিলে থাকা পানি ভর্তি গ্লাসটি তুলে ঝুমের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

-খেয়ে নিন। কিছু হয়নি। সব ঠিক আছে।

ঝুম গ্লাস নিলো না। বরং শাইয়ানের সাথে আরো মিশে গিয়ে ঠোঁট টিপে হাসলো। শাইয়ান সেই হাসি দেখলো না। সে অতকিছু বুঝলোও না। বোকা স্বামীদের মতো একহাতে গ্লাস ও অন্যহাতে বউকে জড়িয়ে বসে রইল, ঝুমকে তাড়া দিলো না। কিন্তু দৃষ্টি তার ফোনের দিকে। কোচ ফোন দিয়েছে। জরুরি না হলে এতবার সে কল দেয় না।

-আরীবা!

-চুপ। ফোন ধরুন।

অর্থাৎ সে এখন কথা বলতে ইচ্ছুক নয়। শাইয়ান দ্বিরুক্তি করলো না। বউয়ের কথা শুনে গ্লাস রেখে ফোন তুলে কানে চাপলো। এপাশ থেকে শাইয়ানের সালাম আর জ্বি, আচ্ছা ছাড়া কোনো উত্তর পাওয়া গেলো না। অতঃপর ফোন কেটে ফোন আবারো টেবিলে রেখে ঝুমকে নিজের সাথে আরো একটু জড়িয়ে নিল। তবে এবার হালকা ভাবেই ধরলো সে।

-আমাকে একটু বাইরে যেতে হবে। হোটেল এরিয়াতেই থাকবো। কোচ ডেকেছে। যাই?

হঠাৎ ঝুমের কি হলো কে জানে! আকস্মিক সে শাইয়ানের কাঁধে শক্ত এক কামড় দিয়ে বসলো। এমন আক্রমনের জন্য শাইয়ান একদম প্রস্তুত ছিল না। ব্যথায় সে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরলো। কিন্তু বউকে সরালো না। ঝুম মনের ক্ষোভ মিটিয়ে তবেই শাইয়ানের থেকে সরলো। অতঃপর শাইয়ানকে কিছু বলতে না দিয়ে নিজ লাগেজ থেকে পোশাক নিয়ে ছুটলো ওয়াশরুমে। এদিকে শাইয়ান কাঁধে হাত চেপে বসে রইল বেশ কিছু সময়। খুব ব্যথা পেয়েছে সে। বউয়ের দাঁত ভালো শক্ত আছে বোঝা গেল। সাথে বউয়ের এই নতুন রূপ হজম করতেও কষ্ট হলো তার। তবে ঝুম যে তার সাথে সহজ হচ্ছে বিষয়টি ভেবে ভালোও লাগছে। মুচকি হেসে উঠে দাঁড়ালো শাইয়ান। টেবিল থেকে ফোন আর ওয়ালেট পকেটে ঢুকিয়ে এগিয়ে গেলো ওয়াশরুমের দিকে। আলতো হাতে দরজায় টোকা দিয়ে বলল,

-দরজা বাইরে থেকে লক করে যাচ্ছি। কিছুক্ষণের মাঝে চলে আসবো। ভয় পেলে আমাকে ফোন দিবেন। আসার পথে খাবার অর্ডার করে আসবো। কী খাবেন আপনি?

ওপাশ থেকে উত্তর এলো,

-কিছু না।

শাইয়ান কথা বাড়ালো না। ঝুমকে এখন কিছু বলে লাভ নেই তাই নিজেই আসার সময় কিছু একটা নিয়ে আসবে ভেবে বাইরে থেকে দরজা লক করে চলে গেল।

ঝুম বের হলো বেশ সময় নিয়ে। প্রথমে সে ওয়াশরুমের দরজা সামান্য ফাঁকা করে দেখলো শাইয়ান আছে কি না। পুরো রুমে কারো উপস্থিতি না পেয়ে সে এবার বেরিয়ে এলো। তার পরনে শুধু ব্লাউজ ও পেটিকোট। ওয়াশরুমে শাড়ি পড়া অসম্ভব ব্যাপার। ভিজে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে খুব। তাই রুমে পড়ার চিন্তা করেছে সে। ভাগ্যিস শাইয়ান নেই। নয়তো কী করতো? ঝুম আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দক্ষ হাতে খুব অল্প সময়ের মাঝে শাড়ি পরে নিল। ভেজা চুল সাথে কলা পাতা রঙের শাড়ি। এতটুকুতেই মেয়েটাকে কি দারুণই না লাগছে। শাইয়ান এই অবস্থায় দেখলে তার কী হতো? ঝুম সেসব ভাবলো না। গোসলের পর তার শরীর ছেড়ে দিয়েছে। আরামের একটি ঘুম চায় তার শরীর। পায়ের পাতা টনটন করছে। দুচোখের পাতায় ভর করা ঘুম নিয়ে সে নরম গদিতে শরীর এলিয়ে দিল। ভাবলো শাইয়ানের আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। কিন্তু তা আর সম্ভব হলো কই? মেয়েটা মুহূর্তে গভীর নিদ্রায় হারিয়ে গেল।

শাইয়ান যখন ফিরল তখন চারিদিকে আঁধার রাত। আকাশ ভর্তি তারার মেলা আর জমিনে কৃতিম আলোর ছড়াছড়ি। কিকার্ড প্রেস করে যখন রুমের ভিতর প্রবেশ করলো তখন রুম জুড়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শাইয়ান চিন্তিত গলায় দুবার ডাকলো ঝুমকে।

-আরীবা? পাখি?

সাড়াশব্দ না পেয়ে সে লাইট জ্বালালো। পরপর তার দৃষ্টি পরলো সাদা বিছানার ঠিক মাঝ বরাবর ছোট্টো নরম শরীরটির পানে। ঝুমের মাথা হেড বোর্ডের বিপরীত দিকে। বাচ্চাদের মতো দুই হাত মাথার কাছে মুঠো করে সোজা হয়ে শুয়ে পা দুটি বালিশের উপর দিয়ে রেখেছে। মাথার নিচে কোনো বালিশ নেই। ভেজা চুলগুলো বিছানা পেরিয়ে মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে। কলা পাতা রঙের শাড়িটি পায়ের কাছে বেশ কিছুটা উঠে আছে। যার দরুন মসৃণ পায়ে সোনালী রঙের নুপুর জোড়া দৃশ্যমান শাইয়ানের সামনে। তাছাড়া দুই পায়ের তর্জনী আঙুলে শাইয়ানের দেয়া সেই টো রিং দুটি এখনো শোভা পাচ্ছে। এমন দৃশ্য দেখে শাইয়ানের চোখ নরম হয়ে এলো। বুক ধড়ফড় করে উঠল। কত সাধনার পর এই দিনটি অবশেষে শাইয়ানের দরজায় কড়া নেড়েছে। অবশেষে সে ঝুমকে নিজের কাছে পেয়েছে। একদম নিজের করে, বউ করে। পুতুলের মতো মেয়েটি এখন তার সাথে একই রুমে। সে মেয়েটার পাশে থাকবে, মন চাইলে ছুঁয়ে দেবে। ইশ!

শাইয়ান মৃদু পায়ে হেঁটে ঝুমের মাথার কাছে এসে দাঁড়ালো। পরপর ঝুমের চুলে নিজের হাত রেখে আলতো হাতে বুলিয়ে দিয়ে ঝুঁকে পরে ঝুমের কপালে মোলায়েম একটি চুমু এঁকে দিল। এরপর ঘুরে এসে দাঁড়ালো ঝুমের পায়ের কাছে। কতক্ষণ ওই পায়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে হাত বাড়িয়ে ঝুমের আঙুলে থাকা একটি আংটি আলতো করে ছুঁয়ে দিল অবলীলায়। পরপর ঝুমের একটি আঙুল, অতঃপর সম্পূর্ণ পা ছুঁয়ে দিল। ধীরে ধীরে তার লোভ বাড়তেই রইল। শেষে নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে ঝুমের ঠিক পায়ের কাছে হেড বোর্ডের সাথে কাত হয়ে শুয়ে ঝুমের দু পা নিজের বুকে তুলে নিল। নরম, সুন্দর পা দুটি তার ভীষণ পছন্দ। সবসময় বুকের মাঝে আগলে রাখতে মন চায়। বুকের উপর পরে থাকা পা দুটি দুহাতে চেপে ধরে নিচু স্বরে নির্দ্বিধায় শাইয়ান বলে উঠল,

-আপনার পা, আপনি, আপনার সম্পূর্ণটা আমার এই বুকে থাকবেন। ভীষণ যত্নে, অজস্র ভালোবাসায়, আহ্লাদে।

_____

হোটেল রুমের ড্রেসিং টেবিলটাকে বর্তমানে ঝুম নিজের ভ্যানিটি টেবিল বানিয়ে নিয়েছে। সচরাচর সে সাজে না। কিন্তু এখানে আসার পূর্বে সাজের সব জিনিস সে নিজের সাথে করে নিয়ে এসেছে। সেগুলোই এখন টেবিলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসেছে সাজতে। তার পরনে আজ কমলা রঙের একটি ঝলমলে কাজ করা শাড়ি। চুলগুলো খোঁপায় বাধা হলেও আজ তাতে শোভা পাচ্ছে কাঁচা ফুলের গাজরা। কানে, গলায় ও হাতে মেহেরুন্নেসার দিয়ে যাওয়া কিছু স্বর্ণের অলংকার। সে এখন মন দিয়ে চোখে কাজল পড়ছে আর ফোনে মেহেরুন্নেসার সাথে কথা বলছে। এখানে আসার পূর্বে সে তার শাশুড়িকে জানিয়েছে। গতকাল এখানে আসার পর একবার কথা হয়েছিল। এরপর সেই যে হোটেল রুমে এসে ঘুম দিলো, সেই ঘুম তার আজ ভোরে ভেঙেছে। যার দরুন মেহেরুন্নেসার সাথে তার আর কথা হয়নি। এমনকি রাতে কিছু খাওয়াও হয়নি। শাইয়ানের খোঁজও নিতে পারেনি। তাই এখন সে মেহেরুন্নেসাকে একে একে গতকাল থেকে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা বলছে।

-আপনাকে সুন্দর লাগছে আম্মা।

টেবিলের এক পাশে ফোনটা এমন ভাবে রাখা যেন মেহেরুন্নেসা ঝুমকে দেখতে পারে। তারা দুজন ভিডিও কলে কথা বলছে। মেহেরুন্নেসার কথায় ঝুম লজ্জা পেল খুব। সাথে সাথে তার কাজলে আঁকা বড়ো বড়ো চোখ দুটি হেসে উঠল।

-ধন্যবাদ আম্মা।

-কোথায় যাচ্ছেন এখন আপনারা?

-গল ফোর্ট যাচ্ছি।

-এই অবেলায়? এখন তো দুপুর!

-আপনার ছেলে বলল আজ বাইরে লাঞ্চ করবে। এরপর গল ফোর্টে যাবে। সেখানে নাকি সূর্যাস্ত দেখা যায়। আপনি এখানে কখনো এসেছেন আম্মা? গল ফোর্টের সূর্যাস্ত দেখেছেন?

ঝুমের চোখ দুটি চঞ্চল কিশোরীর মতো উচ্ছ্বল। সে এখানের সময়টাকে উপভোগ করছে বুঝতে পারল মেহেরুন্নেসা। মনে মনে তৃপ্তিও পেলো এই ভেবে যে ছেলে-মেয়ে দুটোর একটা গতি হয়েছে।

-দুই/তিনবার কাজের সূত্রে যাওয়া হয়েছিল। তাও বহু বছর পূর্বে। তখন দেখেছিলাম।

-অনেক আগে? তাহলে তো ভুলে যাওয়ার কথা। আচ্ছা এরপর আমরা সবাই আবার এখানে আসবো ঠিক আছে? শ্রীলঙ্কা ভীষণ সুন্দর আম্মা। আমার খুব পছন্দ হয়েছে।

-তাহলে স্বামী নিয়ে ওখানেই থেকে যান।

ঝুম ঠিক যতটা উচ্ছ্বাস নিয়ে কথাটি বলেছিল, ঠিক ততটাই ঠেস দিয়ে আহির শেষের বাক্যটি উচ্চারণ করল। স্ক্রিনে আহিরের মুখ দেখা না গেলেও ঝুম ওর কণ্ঠ শুনেই বুঝতে পেরেছে এমন কথা কে বলতে পারে। ওই বখাটে আহির ছাড়া এমন কথা ওবাড়িতে কেউ বলবে না। ঝুম নাকমুখ কুঁচকে নিয়ে ভারী বিরক্ত গলায় বলল,

-ভাইয়া আপনার কী আর কোনো কাজ নেই?

ঝুমের প্রশ্ন করতে দেরি হলেও আহিরের মাথা স্ক্রিনে ভেসে উঠতে দেরি করল না। শুরুতেই ঝুমের দৃষ্টি কাড়ল আহিরের হালকা কোকড়ানো ঝাঁকড়া লম্বা চুলগুলো। এগুলো আগের তুলনায় আরও বড়ো হয়েছে বোধ হয়।

-আশ্চর্য ভাবি! আপনি আমাকে অবাক করে দিচ্ছেন। দুদিন স্বামীর সাথে থাকতে না থাকতে এরই মাঝে তার ভাষা রপ্ত করে নিয়েছেন?

ছেলেটা কি যে নাটক পারে! এমনভাবে বলছে যেন কি না কি হয়ে গিয়েছে।

-আপনি প্রচণ্ড ফালতু কথা বলেন ভাইয়া। আর এই অসময়ে বাড়িতে কী আপনার?

-এখন কী আমি আমার বাড়িতেও থাকতে পারব না? দূর থেকেই খবরদারি করছেন, হুম?

আহির মেয়েটাকে যত দেখছে তত অবাক হচ্ছে। কই আগে তো ঝুম এমন ছিল না। চুপচাপ থাকা মেয়েটার মুখে খই ফুটলো কীভাবে? সব শাইয়ানের দোষ। আহ্লাদ দিয়ে এই অবস্থা করেছে।

ঝুম এই ছেলের সাথে কথায় পারবে না জানে। এত দুষ্টু আর চালক ছেলেটা! কথার মার-প্যাচে ফেলে ঝুমকে নাজেহাল করে ছাড়ে। ঝুমের মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছা করে এদের দুই ভাইকে আমাজন জঙ্গলে ফেলে আসতে। তাহলে যদি সবাই শান্তিতে থাকতে পারে। দুটাই একই রকম দস্যু। একটা শান্ত বজ্জাত, অন্যটা দুষ্টু বজ্জাত।

-উফ ভাইয়া! আপনি আমাকে বিরক্ত করছেন এবার।

বিরক্তই তো করতে চাইছিল। তা আবার বলার কী আছে? আহির ঝুমের মুখের দিকে তাকিয়ে। মায়ামায়া মুখটা বিরক্তিতে কুঁচকে যাচ্ছেতাই অবস্থা হয়ে আছে। মেয়েটাকে জ্বালাতন করতে তার দারুন লাগে।

-কেমন আছেন ভাবি?

আহিরের সুর পাল্টেছে। নরম গলায় আদর ঢেলে প্রশ্ন করলো সে। ঝুমের মুখের অবস্থা এখন স্বাভাবিক। সে নির্মল হাসি দিয়ে বলল,

-আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি ভাইয়া। আপনি কেমন আছেন?

ওই হাসি দেখে আহির বড়ো তৃপ্তি পেল। বুঝলো ভাইয়ের সাথে তার ভাবি বেশ ভালোই আছে। মনে কোথাও শান্তিও কাজ করছে।

-আলহামদুলিল্লাহ আমিও ভালো আছি ভাবি। খাওয়া-দাওয়া করেন ঠিক করে? শাইয়ান আপনার খেয়াল রাখে তো? বকা দেয় নাকি? ও কিছু বললে আমাকে জানাবেন কেমন?

বকা দেয়ার কথা শুনে ঝুম খিলখিলিয়ে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে তার চোখের কোণে জল চলে এলো। এই পুরোটা সময় মেহেরুন্নেসা ও আহির নীরবে তাকে পর্যবেক্ষণ করেছে। ঝুমকে এখন সুখী বিবাহিত নারী লাগে। চোখেমুখে নিদারুণ মায়া ও স্বচ্ছতা।

-আপনার ভাইয়া আমাকে বকা দেবে? এটা আদৌ সম্ভব?

-অসম্ভব।

-তাই তো। উনি ভালো ভাইয়া। বকা দেয় না। আচ্ছা শুনুন না! আপনার জন্য কী আনবো এখান থেকে?

-একটা বউ নিয়ে আসেন ভাবি। আর কতকাল সিঙ্গেল থাকবো?

কত সুন্দর সব চলছিল, তার মাঝে আহিরের এমন কথায় ঝুমের আবার মেজাজ বিগড়ে গেল। দুম করে সে বলে বসল,

-আপনাকে শুধু দেখতেই বখাটে লাগে না ভাইয়া, আপনার কথাবার্তাও বখাটে ছেলেদের মতো।

আহির হতভম্বের মতো তাকিয়ে। সে প্রতিউত্তর দেওয়ার আগেই ঝুম চালাকি করে মেহেরুন্নেসার থেকে বিদায় নিয়ে কল কেটে দিল। অতঃপর নাকমুখ তুঙ্গে তুলে কন্ঠে বিরক্তি নিয়ে শব্দ করে বলল,

-বখাটে আহির।

-আমার ভাইকে বকা দিচ্ছেন?

ঝুম আয়নার দিকে তাকালো। তার ঠিক পিছনে কেবিনেটের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে শাইয়ান দাঁড়িয়ে। দৃষ্টি তার ঝুমের উপর। ঝুম পিছু ফিরল না। আয়নার মাঝ থেকে তাকালো শাইয়ানের চোখের দিকে। ছেলেটার পরনে কালো একটি শার্ট। যেটি সাদা প্যান্টের সাথে টাক-ইন করে পরিপাটি করা। দুহাত বুকের কাছে বেঁধে তাকিয়ে ঝুমের দিকে। মিনিট ৩০ আগে সে তৈরি হয়ে কোনো এক কাজে বাইরে গিয়েছিল। কিন্তু কখন এলো এখানে? ঝুম একদম বুঝতে পারেনি।

ঝুম শাইয়ানের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে খুবই হালকা রঙের একটি লিপস্টিক নিয়ে ঠোঁটে দেয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। খুব একটা দক্ষ নয় তবে সুন্দর লাগছে এখন তাকে। নিজেকে আরও একবার আয়নায় দেখে নিয়ে আবারো তাকালো শাইয়ানের দিকে। ভ্রু নাচিয়ে চোখের ইশারা করে মুখে জানতে চাইল,

-কী? কী দেখছেন ওভাবে?

শাইয়ান পলক ফেলছে না। স্তব্ধের ন্যায় বিবশ হয়ে বলল,

-আমার বউ, আমার সুখ, আমার দুনিয়াকে দেখছি।

চলবে__

প্রচ্ছদ ছবি– জান্নাত(মডু)

[ কী যেন বলতে চেয়েছিলাম? ভুলে গেছি🙃।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন