ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কিন্ত আমি

২৯তম পর্ব

লেখক: মীরা রায়াদ

#তুমি_কিন্তু_আমি

মীরা_রায়াদ
পর্ব–২৯
🚫অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ🚫
আজ পুরোটা সময়ে ঝুম চঞ্চল পাখির মতো উড়েছে। শাইয়ান শুধু ডাকার জন্য পাখি ডাকে না, বরং সে ঝুমকে পাখির মতো উড়তেও দেয়। শাইয়ানের সাথে বিয়ের পর থেকে ঝুমের একবারের জন্যও নিজেকে পরাধীন মনে হয়নি। বরঞ্চ সে আগে যেমন স্বাধীন ছিল তার থেকে বেশি স্বাধীন এখন। কথায় আছে না, হাতের মুঠোয় রেখেও স্বাধীনতা দেওয়া। শাইয়ান সেটাই ঝুমের সাথে করছে। এই যেমন ঝুম সামনে সামনে উচ্ছ্বল ভঙ্গিতে হেলে-দুলে, লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে হাঁটছে। এতে তাকে কেউ বাধা দিচ্ছে না। বরং শাইয়ান তার পিছে পিছে ধীর গতিতে এগিয়ে চলছে আর বউকে নজরে রাখছে।
সূর্য হেলে পরেছে অনেক আগেই। এখনো আকাশ কিছুটা পরিষ্কার। কিছু মুহূর্তের মাঝে চারিদিক আঁধারে ডুবে যাবে। শাইয়ান ঝুমকে নিয়ে সেই দুপুরে বেরিয়েছে, অথচ মেয়েটার মাঝে ক্লান্তির ‘ক’ ও নেই। সে দিব্যি প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করছে। আর শাইয়ান তার বউয়ের নতুন নতুন রূপ উপভোগ করছে। শন শন আওয়াজে বাতাস বইছে। ওরা এখন গল ফোর্টের প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসে ঝুমের শাড়ির আঁচল দিক-বেদিক উড়ে বেড়াচ্ছে। ঝুম কিছুক্ষণ সমুদ্রের দিকে তাকাচ্ছে, আবার কিছুক্ষণ পিছু ফিরে শাইয়ানকে দেখে হাসছে। এইতো মাত্র তারা সূর্যাস্ত দেখলো। ঝুম যখন অবাক, মুগ্ধ হয়ে সূর্যকে বিদায় নিতে দেখছিল শাইয়ান তখন চুপিসারে বউকে ক্যামেরা বন্দি করতে ব্যস্ত ছিল। 
-পাখি?
শাইয়ানের ডাকে ঝুম হাসি হাসি মুখে পিছু ফিরে চাইল। মেয়েটার চোখ দুটি কি নিষ্পাপ! শাইয়ান সতর্কতার সাথে এগিয়ে গেল ঝুমের কাছে। মেয়েটার মুখের সামনে উড়তে থাকা অসংখ্য বেইবি হেয়ারগুলো পরম যত্নের সাথে অযথাই গুছিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু অত্যধিক হাওয়ার দরুন চুলগুলো আবারো এলোমেলো হয়ে মুখের উপর পরছে।
-রাত হয়ে আসছে।
ঝুম খেয়াল করেছে বিয়ের পর থেকে শাইয়ান কখনো সরাসরি ঝুমকে কোনো কিছু নিয়ে জোর করে না। শুধু যতটুকু বলার ততটুকুই বলে। এরপর সিদ্ধান্ত ঝুমের উপর ছেড়ে দেয়। ঝুম তার বড়ো বড়ো চোখগুলোর পলক ঝাপটে বলল,
-যেতে হবে?
-আপনার থাকতে ইচ্ছা করছে?
ঝুম কিছু সময় নিরব থেকে আবারো চমৎকার সুন্দর হেসে বলল,
-না। চলুন ফেরা যাক।
মেয়েটা ভীষণ বুঝদার। শাইয়ানের একারণে ওকে আরো বেশি ভালো লাগে। ঠিক বুঝতে পেরেছে এই সময়ে বাইরে থাকা নিরাপদ নয়। তারউপর শাইয়ানের কিছুটা হলেও নাম-ডাক আছে। সতর্ক থাকাই উত্তম।
গল ফোর্ট থেকে যখন তারা হোটেলের কাছাকাছি এলো তখন রাত নেমে গিয়েছে। চারিদিকে অজস্র কৃত্রিম আলো। শাইয়ান চাইল দ্রুত হোটেল রুমে ফিরতে, কিন্তু ঝুম বায়না ধরলো আশপাশটা ঘুরে দেখবে, কিছু কেনাকাটা করবে সকলের জন্য। বউ পাগল শাইয়ান বউয়ের মুখের উপর না করতে পারল না। অগত্যা বউকে নিয়ে সে আশেপাশে টহল দিতে চলল। মেয়ে মানুষ শান্ত হোক বা চঞ্চল, এদের কিছু স্বভাব একইরকম। তার মাঝে একটি হলো এরা শপিং করার বেলা দুনিয়াবি সব ভুলে বসে। এই যেমন ঝুমকে দেখা যাচ্ছে। শাইয়ান এতকাল জানতো তার বউ অন্য মেয়েদের মতো না। কিন্তু আজ তার ভুল ধারণা ভঙ্গ হল। মেয়ে জাত মানেই শপিংয়ের পাগল। বিগত দুই ঘণ্টা ধরে ঝুম এটা-সেটা কিনে যাচ্ছে থামাথামির নাম নেই। শাইয়ান অসহায়ের মতো বউয়ের পিছু পিছু ব্যাগ নিয়ে ঘুরছে। বারণও করতে পারছে না। সাধের একটা মাত্র বউ তার, সে যদি জীবনের উপর দিয়ে টর্নেডো চালিয়েও যায় তাও শাইয়ান কিছু বলতে পারবে না। উল্টো উৎসাহ দিয়ে বলবে আরও করতে। এসব নিয়ে সে বড়োই ঝামেলায় রয়েছে। 
-দেখুন, আম্মাকে এটাতে মানাবে না?
এতক্ষনে কম করে হলেও ৭/৮ টা জিনিস মেহেরুন্নেসার জন্য ঝুম কিনে ফেলেছে। এখন যেটা দেখাচ্ছে সেটা আসল মুক্তার গয়না। মেহেরুন্নেসা এসব গয়না খুব পরে। তার ব্যক্তিত্বের সাথে দারুণ মানায়। 
-মানাবে।
ঝুম উৎসুক নয়নে তাকিয়ে ছিল এতক্ষন। শাইয়ানের কথা শুনে সে খুশিই হলো। ঝটপট বলল,
-এটা তবে আম্মার জন্য নিই?
অনুমতি চেয়ে মেয়েটা আদর আদর চোখে তাকালো। এভাবে তাকালে দুনিয়া উল্টে গেলেও তো শাইয়ান বারণ করতে পারবে না। 
-নিন।
ছোট্টো একটি শব্দ অথচ ঝুমের কি খুশি! সে আনসারী পরিবারের সকলের জন্য বহু জিনিস কিনেছে। এমন কি শ্রাবনী, মিসেস বিথী, শ্রাবনের জন্যও কিনেছে। কিন্তু নিজের জন্য কিছুই কিনেনি। কিনতে কিনতে মেয়েটার কার্ডের টাকা ফুরিয়ে যাওয়ার পর শাইয়ানের শার্টের এক কোনা টেনে ধরে মিনমিন করে বলেছিল,
-শুনুন না, একটা কথা বলার ছিল। যদিও বলতে আমার লজ্জা করছে কিন্তু উপায় নেই।
শাইয়ান তখন বউয়ের আদুরে গলার ডাকে গলে আইসক্রিম। সে গদগদ হয়ে বলেছিল,
-একটা কেনো, একশতটা বলুন। 
-আমাকে কিছু টাকা ধার দিবেন? বাংলাদেশে ফিরেই ব্যাক দেবো। পাক্কা প্রমিস।
তখন শাইয়ান হতভম্বের মতো তাকিয়ে ছিল ঝুমের মুখের দিকে। মেয়েটা তখন বড়ো বড়ো চোখ দুটি করুন করে রেখেছে। সে পূর্বেই বলেছিল তার কার্ড ব্যবহার করতে। কিন্তু জেদি মেয়েটা শুনলে তো শাইয়ানের কথা। শাইয়ান তখন ঢোক গিলে বলেছিল,
-আমার সব এখন আপনার পাখি। টাকা, সম্পদ, সুখ, নেকী আর আমি, এগুলোর হকদার শুধুমাত্র আপনি। এর মাঝে কোনোটাই আপনাকে ফেরত দিতে হবে না। যত ইচ্ছা খরচ করুন।
_____
শপিং শেষ করে ঝুমরা হোটেলে ফিরলো রাতের ৯ টার দিকে। তখন ঝুম ভীষণ ক্লান্ত। তার পা আর চলছে না। তারা দুজনই বাইরে থেকে ভরপুর খেয়ে এসেছে। যার কারণে ডিনার নিয়ে আর চিন্তা ছিল না। শাইয়ান ভেবেছিল এবার বউকে একান্তে পাবে। কিন্তু তার ভাগ্যে আরো অপেক্ষা লেখা ছিল। তাই তো হোটেলে ফিরতে না ফিরতে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের সকলে তাদের দুজনকে ঘিরে ধরল। 
খেলার মাঝে তারা ২/৩ দিন ব্রেক পেয়েছে। তাই সকলে মিলে ভেবেছিল কাছে পিঠে ডে ট্যুর দিবে। সে ব্যাপারেই লবিতে বসে আলোচনা করছিল। ঠিক সেই সময়ে শাইয়ান ঝুমকে নিয়ে ফিরল। শাইয়ানের দুহাতে তখন ঝুমের কেনা জিনিস ভর্তি ব্যাগ। আর ঝুম পাশেই শাইয়ানের শার্টের হাতা একহাতের মুঠোয় ধরে এগোচ্ছিল। শাইয়ানকে এই হালে দেখে সকলে হইহই করে উঠল। সাধারণত শাইয়ানের এই রূপ তারা কখনো দেখেছি। দেখবে বলেও আশা করেনি। তাদের মাঝে সব থেকে কোল্ড, রসকষহীন ব্যক্তি ছিল শাইয়ান। শাইয়ান যে কোনো দিন বিয়ে করবে তাও নিজ পছন্দে, এত কাহিনী করে এটাই তো তাদের কাছে স্বপ্নের মতো ছিল। 
সকলে শাইয়ানের সাথে মজা করছে। ঝুম একপাশে আলুথালু হয়ে দাঁড়িয়ে। তার বড়ো অস্বস্তি হচ্ছে। এদের সকলকে সে এর আগে বহুবার দেখেছে। কখনো টিভিতে, বা কখনো সরাসরি ইন্টারভিউয়ের ক্ষেত্রে। তবে সবটাই পেশাগত দিক থেকে। আজ হঠাৎ এভাবে মুখোমুখি হওয়ায় লজ্জায় পড়েছে মেয়েটা। তারউপর বয়সে বড়ো বড়ো মানুষগুলো বারবার ভাবিজী, ভাবিজী করছে। যা আরও বেশি অস্বস্তিকর। শাইয়ান বুঝলো এখন এদের হাত থেকে ছাড়া পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কারণ এখানে কোচরাও রয়েছে। ঘণ্টা এক/দুইয়ের আগে এরা কিছুতেই ছাড়বে না। সে একবার ঝুমের দিকে তাকালো। মেয়েটা লজ্জায় মুষড়ে গিয়েছে। তারউপর সারাদিন বাইরে যে পরিমাণ টইটই করেছে! ক্লান্তিতে চোখমুখ বসে গিয়েছে। হয়তো ঘুমাতে চাচ্ছে। 
-আরীবা! আপনি রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ঘুম দিন। আমি কিছুক্ষণ পর আসছি।
শাইয়ান হঠাৎ সকলের মাঝে বলে উঠল। ঝুম কয়েকবার পলক ঝাপ্টালো। এরপর মাথা নেড়ে শাইয়ানের হাতের ব্যাগগুলো দেখিয়ে বলল,
-আচ্ছা। ওগুলো তবে আমাকে দিন।
শাইয়ান বেশ ভালোই বাংলা বলতে পারে। ঝুমের সাথে সে সর্বদা বাংলায় কথা বলে। মাঝে মাঝে অভ্যাসবশত মাতৃভাষা উর্দুও চলে আসে। কিন্তু চেষ্টা করে ঝুমের অস্বস্তি না বাড়াতে। তারা এখনো বাংলায় কথা বলার দরুন বাকিরা কিছুই বুঝতে পারছে না। সকলে হা করে ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
-দরকার নেই। ভারী অনেক। আপনি যান, আমি নিয়ে আসবো।
-সমস্যা হবে না, আমি পারবো।
ঝুম নাকচ করলেও শাইয়ান শুনলো না। উল্টো জোর দিয়ে বলল,
-জানি পারবেন। কিন্তু যতদিন আমি আছি ততদিন আপনার সব ভার আমার।
কথার গভীরত্ব ঝুম বোঝে। সে এক দৃষ্টিতে শাইয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো অনেকক্ষন। অতঃপর সকলের থেকে বিদায় নিয়ে নিশ্চুপে চলে গেল। 
____
ক্লান্ত শরীরে, টলোমলো পায়ে শাইয়ান দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। দরজায় দুবার টোকা দিয়ে অপেক্ষা করল। এখন সময় কত সে জানে না। এত সময় সকলে তাকে অযথাই জ্বালাতন করেছে। হাবিজাবি কথায় তার একদম মন ছিল না। বউ তার রুমে, অথচ সে বাইরে এতক্ষন বসে ছিল! কথাটি ভেবেই শাইয়ানের বিরক্তি দ্বিগুণ বেড়ে গেল। শাইয়ান দরজার দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে। ঝুম দরজা খুলছে না কেন? ঘুমিয়ে পড়লো নাকি? শাইয়ান অস্থির হলো। বারবার দরজায় শব্দ করল। মিনিটের কাটা বাড়তে লাগলো কিন্তু ঝুম দরজা খুলল না। এবার শাইয়ানের রুহ্ শরীর ত্যাগ করার মতো অবস্থা হলো। দুশ্চিন্তারা তাকে ঘিরে ধরল। দরজায় বড়ো বড়ো আঘাত করার সাথে সাথে গলার স্বর বাড়িয়ে ঝুমকে ডাকলোও।
-আরীবা.. আরীবা? আরীবা দরজা খুলুন। কী হয়েছে আপনার? আরীবা? আপনি কী শুনছেন? আরী…।
খট করে শব্দ হওয়ার সাথে দরজা খুলে গেল। শাইয়ান এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করে আশ্চর্য হয়ে গেল। চোখ দুটো তার ছানাবড়া হয়ে গেল। হাতে থাকা ব্যাগগুলো অনাদরে পরে গেলো মেঝেতে। কানে ভেসে এলো তার শোনা দুনিয়ার সব থেকে মিষ্টি কণ্ঠটি।
-শুভ জন্মদিন আরীবার হাসব্যান্ড।
শাইয়ানের বুকটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। তার মাথা ঘুরাচ্ছে। চিন্তায় সে আর একটু হলেই হার্ট এ্যাটাক করে বসতো। যদি সে হার্ট এ্যাটাক করতো তবে বউয়ের এই রূপ সে কীভাবে দেখতো? হাবিজাবি চিন্তা ও বউয়ের এই ভয়ানক রূপ দেখে ছেলেটার বুকে ব্যথা শুরু হয়েছে। সে বুকের বাম পাশে হাত চেপে নড়বড়ে পায়ে গিয়ে বসলো সোফার উপর। তার শরীর ছেড়ে দিচ্ছে, অসুস্থ অনুভব হচ্ছে। অথচ মন-প্রাণ, চোখ শুধু ঝুমকে দেখতে চাইছে।
ঝুম শাইয়ানের এই অবস্থায় ব্যাকুল হলো। দ্রুত কাছে এগিয়ে জানতে চাইল,
-কী হয়েছে? এই যে, শুনছেন? কী হয়েছে আপনার?
মেয়েটা বড্ড ভয় পাচ্ছে। কী থেকে কী হয়ে গেল? শাইয়ানের কী হলো? শাইয়ান কথা বলতে পারছে না। সে ঝুমের দিকে বেহায়া মতো তাকিয়ে। মেয়েটাকে যত দেখে তার বুকে ব্যথা তত বাড়ে।
-কথা বলছেন না কেন? শাইয়ান, শাইয়ান? বেশি খারাপ লাগছে?
-পাখি, নাম ধরে ডাকবেন না। বুকে ব্যথা হয়।
বাকি কিছু ঝুমের কানে গেল কিনা বোঝা গেলো না। কিন্তু মেয়েটার কানে বুকে ব্যথা কথা ঠিক গেল। সে এবার ভয়ে, আতঙ্কে কেঁদে ফেলল। বড়ো বড়ো চোখ দুটিতে পানি থৈথৈ করছে। কয়েক ফোঁটা নরম, ফুলো গাল বেয়ে গরিয়েও পরল।
-আল্লাহ! একি বিপদ হলো? আপনি অপেক্ষা করুন আমি কাউকে ডেকে আনছি। একটু অপেক্ষা করুন।
মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠল। সাথে সাথে কাউকে ডাকার তাগিদে পা ও বাড়ালো কিন্তু তার আগেই হাতে টান পড়ল। পরপর নিজেকে শাইয়ানের কোলের উপর আবিষ্কার করল। শাইয়ান তখন অস্থির, পাগলপ্রায়। তার দুনিয়াবি চিন্তা-চেতনা লোপ পেয়েছে। সে ঝুমের চোখ ভর্তি পানির দিকে তাকিয়ে বলল,
-আমার কাউকে চাই না। আমার শুধু আপনাকে চাই পাখি। আপনি থাকুন, থাকুন না। দেখবেন আমি সুস্থ হয়ে যাবো। 
অন্য সময় হলে ঝুম নিজের অবস্থানে লজ্জা পেতো। কিন্তু আজ মেয়েটা চিন্তিত শাইয়ানকে নিয়ে। সে এখনো কাদছে। 
-আপনি অসুস্থ। কাউকে ডেকে আনি? ডাক্তারের কাছে যাই?
-আপনি আছেন তো।
-আপনার কিছু হলে আমি কী করবো তখন?
ঝুম কষ্টের কারণে কান্না থামাতে পারছে না। শাইয়ান নিজেও থামানোর চেষ্টা করছে না। জঘন্য হলেও সত্যি কথা হলো, তার চিন্তায় ঝুম কাদঁছে এটা দেখতে তার ভীষণ সুখ সুখ লাগছে। শাইয়ান পুরো ঘর চোখ বুলালো। পুরো ঘরময় গোলাপের পাপড়ি ছিটিয়ে রাখা। মেঝে থেকে শুরু করে সাদা বিছানা জুড়ে গোলাপের ছড়াছড়ি। টেবিলের উপর ফুল দানিতে থোকায় থোকায় গোলাপ ফুল। গোলাপের সুবাসে পুরো ঘর মো মো করছে। এছাড়া এতক্ষনে শাইয়ান লক্ষ্য করলো ঘরে কোনো বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানো নেই। তার বদলে অসংখ্য মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। মেঝের এক পাশে অনেকগুলো গিফট বক্স পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখা। সর্বশেষে দৃষ্টি গেল ঝুমের পিছনে ছোট টেবিলের উপর রাখা ছোটো লাল কেকের উপর। তাতে আবার সুন্দর করে লেখা—
      “HAPPY BIRTHDAY HUSBAND”
শাইয়ানের এখন কেমন অনুভূতি হওয়া উচিত? মেয়েটা এত কিছু তার জন্য করেছে? শাইয়ান ঝুমের দিকে তাকালো। সে হয়তো আজ চোখে কাজল দিয়েছিল। কিন্তু কান্নার দরুন কাজল সব লেপ্টে গিয়েছে। এতেও যেন মেয়েটাকে অন্যরকম মায়াবী লাগছে। এলোমেলো খোঁপা করা চুল, কানে বড়ো দুল, ঠোঁট ভর্তি লিপস্টিক, রেড ওয়াইন রঙের শাড়ি, শাড়ির সাথে আবার ম্যাচিং ব্লাউজ। কিন্তু ব্লাউজের গলাটা অন্যগুলোর থেকে একটু ডিপ না? তাইতো লাগছে শাইয়ানের। যার দরুন মেয়েটাকে বড়ো আবেদনময়ী লাগছে। তারউপর রুমের পরিবেশ বড় রোমাঞ্চকর। শাইয়ান বুঝলো আজ বড়ো অঘটন ঘটতে চলেছে। সে চাইলেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। আচ্ছা মেয়েটা কী বুঝে করেছে এসব?
-এসব আমার জন্য?
শাইয়ান এখন স্বাভাবিক। কিছু মুহূর্ত পূর্বে তার সত্যিই বুকে ব্যথা করছিল। ঝুমের এই রূপ তার চিন্তার বাইরে ছিল। এত লাস্যময়ী লাগলে কোন স্বামী নিজেকে ঠিক রাখতে পারে? 
শাইয়ান স্বাভাবিক হলেও ঝুম এখনো স্বাভাবিক হতে পারেনি। তার কান্না কমে এলেও এখন সে হিঁচকি তুলছে।
-কোন..কোনগুলো?
-এই সারপ্রাইজ আর আপনি।
ঝুম শাইয়ানের চোখে চোখ রাখল। মেয়েটার বড়ো বড়ো চোখ দুটি আজ স্বচ্ছ। তারউপর দিয়েছে কাজল। যা লেপ্টে চোখের নিচে ভিড় জমিয়েছে। শাইয়ানকে পুরোপুরি পাগল করার সব ব্যবস্থা করে এসেছে মেয়েটা। 
-পছন্দ হয়েছে আপনার?
-কোনটা? সারপ্রাইজ নাকি আপনি?
শাইয়ান কী বোঝাতে চাইলো বোকা মেয়েটা না বুঝেই বলল,
-দুটোই।
-পছন্দ হয়েছে। 
-কোনটা?
ঝুম প্রশ্নসিক্ত নয়নে তাকিয়ে শাইয়ানের দিকে। শাইয়ান সরাসরি উত্তর দিতে পারলো না। ইতিমধ্যে সে বেসামাল হয়ে গিয়েছে। সে আজ চূড়ান্ত অসভ্য হতে চায়। নিজের দেয়া কথা সে রাখতে পারবে না আর। ঝুম না চাইলেও সে আজ নিজেকে সামলে নিতে পারবে না। ছেলেটা হঠাৎ এক অদ্ভুত কাজ করলো। একহাতে ঝুমের কোমর পেঁচিয়ে অন্যহাতে আলতো করে ঝুমের গলা চেপে ঝুমকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলল,
-আরীবা! জান, পাখি? আপনি..আপনি আমাকে পাগল করে দিচ্ছেন।
ঝুমের তখন ম*রি ম*রি দশা। লজ্জায় মেয়েটা হাসফাস করল, কিন্তু শাইয়ানের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা করলো না। উল্টো আজ সে বড়ো সাহসিকতার সাথে শাইয়ানের কালো শার্টের বুকের কাছের কিছু অংশ হাতের মুঠোয় চেপে ধরে শাইয়ানের আরো কাছে মুখ নিয়ে বড়ো যত্ন করে শাইয়ানের কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো। কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে রেখেই বলল,
-শুভ জন্মদিন হাজব্যান্ড।
এত আদর, এত ভালোবাসায় শাইয়ান আজ ম*রে যাবে। ভালোবাসার তোপে সে পাগল হয়ে যাচ্ছে। সময় যত বাড়তে লাগলো শাইয়ানের হাতের শক্তি তত বাড়ল। ঝুমকে সে বুকের মাঝে ঢুকিয়ে নিতে চাইছে। এতটাই কাছে চাইছে যেন ঝুম তাকে ছেড়ে কোথাও যেতে না পারে। আচ্ছা এগুলো কী সব স্বপ্ন? সে কি স্বপ্ন দেখছে? নাকি সত্যিই ঝুম তার এত কাছে?
-এগুলো সব স্বপ্ন তাই না?
শাইয়ানের ঠোঁট ঝুমের কাঁধে, আর ঝুমের ঠোঁট শাইয়ানের কপালে। শাইয়ান চোখ বন্ধ করে কথাটি বলল। সে নিশ্চিত হতে চায়, এই সুখ ক্ষণিকের কিনা বুঝতে চায়। 
ঝুম শাইয়ানের কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে রেখেই এক পশলা নীরব হাসলো। একহাতে শাইয়ানের শার্ট খাঁমচে ধরে অন্যহাত ধীর লয়ে শাইয়ানের গালে রেখে জোর করে শাইয়ানের মুখ তুলে নিজের মুখের খুব কাছে টেনে নিল। অতঃপর চোখে চোখ রেখে কপালে কপাল মিশিয়ে বলল,
-সত্যি, বাস্তব।
শাইয়ানের হঠাৎ খুশিতে কান্না পেল। আবেগে আপ্লুত হয়ে বলল,
-আপনি আমার।
-আমি আপনার।
ঝুমের সহজ স্বীকারোক্তি। এরপর শাইয়ান নিজেকে কীভাবে সামলাবে? সে কি কান্না তার! এত কষ্টের ফল সে এক রাতে বুক ভরে পেয়ে গেল। এই সুখ সে সারা জীবন চায়। মৃ*ত্যুর পরও চায়। 
ঝুম নিজের দিক থেকে যথেষ্ট করেছে। সে প্রতিটা মুহূর্তে শাইয়ানকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু অধৈর্য শাইয়ান? সে তো পাগল প্রায়। ছেলেটা কী থেকে কী করবে বুঝতেই পারছিল না। পুরোটা রাত সে মুখস্থ পড়ার মতো করে বলে গিয়েছে,
-আপনি আমার। ভীষণ ভালোবাসি।
_____
শ্রীলঙ্কা থেকে ঝুম দেশে ফিরেছে আজ প্রায় দুই মাসের বেশি। সেবার তার শ্রীলঙ্কা বেশিদিন থাকা হয়নি। শাইয়ানের দ্বিতীয় ইনিংসের প্রথম ম্যাচের পরই ফিরে এসেছিল। এরপর আর ওই মানুষটির সাথে দেখা হয়নি। শাইয়ান যদিও বাংলাদেশে আসতে চেয়েছিল কিন্তু বিভিন্ন কারণে আর আসা হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া ঝুম নিজেও বারণ করেছে। আর তো কিছুদিন, তারপর পাকাপাকি ভাবে ঝুম পাকিস্তান যাবেই। আর তাছাড়া শাইয়ানকে সামলাতে ঝুমের হিমশিম খেতে হয়। ছেলেটা এত পাগলামি করে! শ্রীলঙ্কার বাকি দিনগুলো সে ঝুমকে একটুও শান্তি দেয়নি। একটুও না। সে কারণেই মূলত ঝুম ওকে আসতে বারণ করেছে। এ নিয়ে শাইয়ানের সে কি রাগ! রেগে সে মুখ ফুলিয়ে ছিল বাচ্চাদের মতো। ঝুমের সাথে কথাও বলছিল না। ঝুম অবশ্য পাত্তা দেয়নি। সে জানে শাইয়ানকে পাত্তা দেয়া মানে নিজের পায়ে কুড়াল মারা। শাইয়ান যখন বিশেষ ভাব পেল না তখন নিজেই সুড়সুড় করে ঝুমের কাছে ফিরে এসেছিল। 
ঝুম এখন প্লেনে বসে আছে। এই তো এখন সে বাংলাদেশের পাঠ চুকিয়ে পাকিস্তান চলে যাচ্ছে। আবার কবে দেশে আসবে জানা নেই। হয়তো কোনো দিন না। আবার আসতেও পারে। তার পাশেই শ্রাবনী বসে। মেয়েটাকে এক প্রকার টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। অবশ্যই উদ্দেশ্য প্রবণ ভাবে কিন্তু শ্রাবনী সে ব্যাপারে অবগত নয়। 
শাইয়ানের কথা ছিল ঝুমকে নিতে বাংলাদেশে যাওয়ার কিন্তু ক্রিকেট বোর্ডের হঠাৎ মিটিংয়ের কারণে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। সে জানিয়েছে এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করবে। ঝুম অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে শাইয়ানের সাথে দেখা করার জন্য। ওকে দেখে শাইয়ানের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? খুশি হবে, নাকি কান্না করবে? লোকটা তো আবার কথায় কথায় কেঁদে দেয়। কেঁদে দিলে ঝুম একদম অবাক হবে না। এতদিনে মেয়েটা বুঝে গিয়েছে ওই মানুষটা তাকে ভীষণ ভালোবাসে।
চলবে___
[ কারা যেন বলেছিল রেমেডি উপন্যাসে শাইয়ান চরিত্রটা ন্যাকা? তাদের জন্য এবার শাইয়ানকে ইচ্ছা মতো ন্যাকা বানাচ্ছি, হুহ। ভেবেছিলাম কড়া একটা রোমান্স দেবো। আফটার অল বেটা বহুত স্ট্রাগল করেছে। কিন্তু আমার সরম করে। সত্যিই সরম করে। একে তো ওসব লিখতে পারি না। মানে কী লিখবো ইমাজিনই করতে পারি না। এরপর যাও একটু লিখতে যাই তখন মনে পড়ে, এই বন্দরের লাখান চেহারাটা নিয়ে আমার আবারো হাজির হতে হবে। ট্যারিফাইং😑। 
যাই হোক, গানটা শাইয়ান শাইয়ান ভাইব দেয় না? ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন