৮
তৃপ্তি অগোছালো চুলে আঙুল চালিয়ে বেরিয়ে পড়লো।ভেবেছিল কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিবে।তবে তা আর হলো কই!সিএনজি নেওয়ার পূর্বেই বৃষ্টির আগমন।ভিজে যাচ্ছে তৃপ্তির সত্তা। অস্ফূট কণ্ঠে "চ" উচ্চারণ করলো সে।এমন লম্বালম্বি যানবাহনের বেড়াজালে সে আটকে।আদ্রিন রেস্টুরেন্টে অপেক্ষারত।যদিও সে চেয়েছিল তৃপ্তিকে উঠিয়ে নিতে।তবে সেটা একেবারে বেকায়দা হওয়ায় তৃপ্তি বারণ করলো।
ভিড়ের মাঝে তৃপ্তি সিএনজি পেলো বহুকষ্টে। আঁচল সমেত মুখের পানিটুকু পুছলো সন্তপর্নে। শীতের শেষভাগে শীতের প্রকট হ্রাস পেলেও এই বর্ষণে হুট করেই সেটা বাড়ছে ক্রমাগত।ভেজা শাড়ির আঁচল অপর কাধেঁর অংশ ঢাকলো তৃপ্তি।ঠকঠক কাপছে তার অধর জোড়া।
মিনিট পাঁচেক পর পুনরায় আদ্রিনের ফোন আসলে তৃপ্তি কিছু বলার পূর্বেই অস্থিরতায় জর্জরিত আদ্রিনের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
--"সিএনজি পেয়েছো কি?আমি আসবো?"
--"পেয়েছি।আমি আসছি।"
তৃপ্তির শীতল স্বর।
--"আসো।আমি নিচেই দাঁড়িয়ে,তোমার অপেক্ষায়।"
.
সিএনজি থামলো।ভাড়া মিটিয়ে তৃপ্তির দৃষ্টি আকর্ষণ করলো রঙিন আলোয় ঝলমলে দুইতলা বিশিষ্ট রেস্তোরা।নিচের তলায় সোনালী রঙের আলোর নিচে সটান দাঁড়িয়ে আদ্রিন।চিন্তিত দেখাচ্ছে তাকে।বাহিরে এখনো তুমুল বর্ষণ।আদ্রিন তাকে লক্ষ্য করেনি।একটা ছোটখাটো জ্যাম সৃষ্টি হলো রেস্টুরেন্টের উন্মুক্ত পার্কিং লটে।ব্যাগ মাথার উপর ধরে বৃষ্টি আগলিয়ে হেঁটে যাচ্ছে তৃপ্তি।
সে খানিক সামনে যেতেই আদ্রিনের দৃষ্টি আটকিয়েছে তার মেহেবুবার অবয়বে।মেয়েটা ভিজে জুবুতুবু।শাড়িটা কেমন লেপ্টে রইলো তার তনুয়।অদ্ভুত শিহরণ জাগলো আদ্রিনের সত্তায়।শাড়িতে তার মেহেবুবাকে বড্ড মোহনীয় লাগছে।কেমন এক অজানা নে'শায় মেতে উঠলো তৃপ্তি দ্বারা বি'ক্ষি'প্ত আদ্রিনের হৃদয়।
তবে,আদ্রিনের হুঁশ ফিরলো।ভেজা শরীরে তার মেহেবুবার উপর সে ছাড়াও আরো কিছু পুরুষের দৃষ্টি।হাত মুঠো হয় তার।তৃপ্তি গাড়ি ডিঙিয়ে আসতে সময় নিচ্ছে।সাথে তার অবয়বে ঝপঝপ বৃষ্টির বর্ষণের স্পর্শ।শক্তহাতে কাঁচের দরজা ঠেলে বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে পড়লো আদ্রিন।চতুর দৃষ্টিতে গাড়ি ডিঙিয়ে সে মিনিটেই পৌঁছালো তৃপ্তির নিকট।আগলে নিলো তাকে। কাঁধে হাত দিয়ে আড়াল করলো তৃপ্তির আদ্র তনু।আদ্রিনের বিশাল দেহের আড়ালে তৃপ্তির তনু মুহূর্তেই নিরাপদে ঠাঁই পেলো।আদ্রিনের মুখশ্রী শক্ত।চারিদিকে রক্তিম আভাযুক্ত নয়ন বুলাতেই কাঙ্খিত মানুষগুলো নিজেদের দৃষ্টির হেফাজত করলো।
--"আদ্রিন!কি হলো?কই যাচ্ছি আমরা?"
আতঙ্কিত তৃপ্তি অবাকের অন্তিম পর্যায়ে।আদ্রিনের বুকে তার গাল লেপ্টে।ছেলেটা তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কোথাও।এই ভরা বর্ষণে তৃপ্তির মিনিমিন কণ্ঠ আদ্রিনের কর্ণ গভীরে প্রবেশ করলো না। নির্দিষ্ট দূরত্ব হতে সুইচ চাপ দিলেই গাড়ি আনলকের শব্দের পাশাপাশি হেড লাইট জ্বলে উঠলো।
তৃপ্তিকে বসিয়ে আদ্রিন নিজে ড্রাইভিং সিটে বসলো।সে এখনো নিশ্চুপ।তৃপ্তি এখন আর মৌন রইলো না।বেশ কড়া সুরে বললো,
--"আমরা এইখানে কেনো?"
আদ্রিন এখনো মৌন।তবে তৃপ্তি খেয়াল করলো স্টিয়ারিংয়ে রাখা তার হাত মুঠ।আদ্রিন লুকিং গ্লাসের পানে চেয়ে।পেছনের গাড়িগুলো সরে যাচ্ছে।মিনিট দুয়েক পরেই আদ্রিনের গাড়ি নির্দ্বিধায় বেরুতে সক্ষম হবে।
--"আদ্রিন?"
আদ্রিনের কাঁধে মৃদু ধাক্কা দিলো তৃপ্তি।এইবার আদ্রিন নিজের ক্রো'ধ দমাতে পারলো না।বেশ গম্ভীর মুখে প্রশ্ন করলো,
--"বৃষ্টিতে ভেজা কি খুবই দরকার ছিলো?"
এই যেনো অন্য আদ্রিন।তার চেহারার পরিবর্তন খুব করে লক্ষ্য করছে তৃপ্তি।রাগলে ছেলেটাকে দেখতে এতটাই মারাত্মক লাগে?রক্তিম আঁখি, গালের চাপা রীতিমত স্তব্ধ।এলোমেলো ভিজে যাওয়া চুল অযথায় স্পর্শ করছে আদ্রিন।
--"কিছু করার ছিল না।সিএনজি পেতে সময় লেগেছে।"
তৃপ্তি সরল ভাষায় জবাব দিলো।
--"আমাকে ফোন করা যেতো না?তোমাকে এমন ভেজা অবস্থায় কতজন দেখেছে ধারণা আছে তোমার!হুয়াই?কেনো তুমি এমনটা করলে?তুমি বৃষ্টিতে ভিজবে না।আর কখনো যেনো তোমার এমন রূপ বাহিরের কারো সামনে প্রকাশিত না হয়।আমার ভয়ং'কর রূপ ঠেলার ক্ষমতা নেই তোমার,মেহেবুবা।"
বোকা বনলো তৃপ্তি।কি তীক্ষ্ণ হু'মকি।তৃপ্তির গলার স্বর ফুরিয়েছে।আদ্রিনের স্থলে অন্য ছেলে হলে নিশ্চয় চুপ করে থাকতে পারতো না সে।কিন্তু কি হলো তার!আদ্রিনের সাথে তর্ক করার সাহস আজ কই?
২০.
--"আপনি আমাকে বকছেন?"
তৃপ্তি অসহায় ভঙ্গিতে প্রশ্ন করলো।
--"নাহ।"
আদ্রিনের শান্ত সুর।রাগ কমেছে তার।তৃপ্তির শুষ্ক মুখপানে চেয়ে রাগটা ঠেলতে পারলো না নামবিহীন প্রেমিকের মন।পুনরায় সে বললো,
--"আজ শাড়ি পড়লে হঠাৎ?"
--"প্রেজেন্টেশন ছিলো।"
--"শীত লাগছে?"
--"হ্যাঁ।"
--"পেছনের সিটে কোট আছে আমার।নাও।"
বাক্য ছুঁড়ে আদ্রিন নিজের প্রাইভেট কার স্টার্ট দিলো।পেছনে গাড়ির ভেজাল পরিষ্কার।পেছনের সিটে বাঁক ফেরার পূর্বে তৃপ্তি নিজের শাড়ি ঠিক করলো, ভেজা শাড়ি এবং চুল হতে পানি ছাড়ালো।নিজেকে সামলে পেছনে বাঁক ফিরে কোটের নাগাল না পেলে সে খানিকটা ঝুঁকলো সেথায়। যার দরুণ কোমরের দিকে লাগানো পিন ছুটে উন্মুক্ত হলো তার হলদেটে শুভ্র পিঠ এবং কোমরের কিছু অংশ।তৃপ্তির পানে ফিরতেই ভুল'বশত আদ্রিনের দৃষ্টি সেই নি'ষিদ্ধ স্থানে আটকালো।দৃষ্টি সংযত করলো আদ্রিন।ঠান্ডা ভাবখানার বদলে শরীরে ভর করলো উষ্ণতা।মুহূর্তেই নোনা ঘামের দেখা মিললো তার ললাটে।মেয়েটা আজ কেমন বেসমাল করছে তাকে।তবে মনের অবস্থা ব্যক্ত করার মতো সময় হয়নি এখনো।তৃপ্তিকে নিজের প্রতি দূর্বল হতে সে পর্যাপ্ত সময় দিতে চায়। আড় চোখে তৃপ্তির পানে পুনরায় দৃষ্টি আবদ্ধ হলো আদ্রিনের। কোট পড়তে গিয়ে মেয়েটা আবারও অগোছালো হচ্ছে।শাড়ি সরে উদরের নিষিদ্ধ স্থান দৃশ্যমান হওয়ার পূর্বেই আদ্রিন গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,
--"তুমি বড্ড অগোছালো।"
তৃপ্তি ইঙ্গিত বুঝলো কিনা তার বোধগম্য হলো না।সে দুই হাতে গলিয়ে কোট দ্বারা আবৃত করলো নিজেকে,
--"আমি কি করেছি?"
--"তুমি কিছু না করেই আমাকে বেসামাল করছো।আর কিছু করলে তো তোমারই বিপদ।"
কথাগুলো মনে মনে আওড়ালেও মুখে সে বললো,
--"ভার্সিটিতে শাড়ি পড়ে সাবধানে থাকো তো?"
--"হুম।সাবধানে থাকি।এইসব খোলামেলা আমার নিজেরই অপছন্দ। লাভি আমাকে ঠিকভাবেই শাড়ি পড়িয়ে দেয় সর্বদা।"
--"সাবধানে থাকায় ভালো।নাহলে তোমার কারণে অন্যর প্রাণ নিয়ে টানাটানি হবে।"
আদ্রিনের কথার সুর অন্যরকম।খুবই রহস্যময়ী গম্ভীরতা বিদ্যমান এই সুরে।অথচ কিয়ৎ পূর্বেই কতো না সুরেলা ছিলো এই কণ্ঠস্বর।
--"কার প্রাণ?"
উৎসুক তৃপ্তির মন।
--"তোমার পানে যার কুদৃষ্টি পড়বে তার।"
কথা শেষে হাসলো আদ্রিন।তার কথা ছলনা হিসেবে গ্রহণ করলো তৃপ্তি।সে একটাবার আদ্রিনের কথার গভীরতা আন্দাজ করতে সক্ষম হলো না।ভেজা শার্টে আঁটসাঁট আদ্রিনের বাহু পানে সে চেয়ে।লোকটা ব্যাপক আকর্ষণীয়।নিজের মনের নিষিদ্ধ কল্পনা জোর করে বন্ধ করলো তৃপ্তি।তার জীবনে সুপ্ত অনুভূতির কোনো মূল্য দিতে না চাইলেও বেহায়া মন বারংবার সেই লোভ সামলাতে পারে না।
বাহিরের দিকে দৃষ্টিবদ্ধ রেখে সে আদ্রিনকে প্রশ্ন করলো,
--"কোথায় যাবো আমরা?"
--"আজ কোথাও যাওয়া হবে না।আমি খাবার কিনবো, প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করে গাড়িতেই লাঞ্চ সারবো।"
আদ্রিন ভেজা সড়কে সাবধানতার সঙ্গে গাড়ি চালাতে ব্যস্ত।
--"কেনো?আজ কিন্তু আমি পেমেন্ট.."
--"তোমার সাথে আমি আর্থিক লেনদেনে ইন্টারেস্টেড না।আমি সাথে থাকলে সব খরচের দায়িত্ব আমার।"
তৃপ্তির কথার পিঠে বললো সে।
--"কিন্তু ব্যাপারটা কেমন যেনো না?আমাকেও তো সুযোগ দিন!"
--"তোমার সাথে টাকার লেনদেন আমার পক্ষে অসম্ভব।অন্য কোনোভাবে যদি তুমি আমাকে ট্রিট দাও,সেটা তোমার ব্যাপার।"
আদ্রিন হাসলো।সাথে হাসলো তৃপ্তিও,
--"আচ্ছা।বুঝলাম।সময় করে বাসায় আসবেন একদিন।"
--"দেখি।"
আদ্রিন ছোট্ট সুরে বললো।
গাড়ি থামলো কে.এফ.সি'র পার্কিং লটে।পূর্ব রেস্তোরায় আদ্রিনের মেজাজ বিগড়ে থাকার কারণে সে আর খাবার কিনেনি অত্র রেস্তোরা হতে।সুদূরে এই রেস্তোরাকে বেছে নিলো দুপুরের খাবারের পর্ব চুকাতে।তৃপ্তিকে বসার নির্দেশনা দিয়ে সে নামতে গেলে তৃপ্তি হঠাৎ বললো,
--"আমিও যাবো!"
আদ্রিন থামলো। তার সূচালো দৃষ্টি মিললো তৃপ্তির উৎসুক দৃষ্টির অন্তরালে।মেয়েটার গায়ে তার পড়নের কোট সাইজে বিশাল।বড্ড আদুরে লাগছে তৃপ্তির অবয়ব।আবার কোট খুললে তৃপ্তির অবস্থা হবে শোচনীয়,খুবই দৃ'ষ্টিকটু।তবে অবাকের বিষয় হলো,এই দুই অবস্থাতেই আদ্রিনের হৃদয় চঞ্চল,অন্তর বি'ক্ষি'প্ত।তার মেহেবুবাকে এই অবস্থায় বাহিরের মানুষ দেখবে?নাহ! কস্মিককালে না।
--"উহু,আমি যাবো।তুমি বসো।"
--"যায় না প্লিজ!আর আপনি আমার সাথে এমন ভঙ্গিতে কথা বলবেন না।মায়া হয় আমার।তবে জানেন তো!আমার মনে এইসব মায়ার আগমন নি'ষি'দ্ধ।"
--"এই নি'ষি'দ্ধতা একদিন আদ্রিনের কারণে পরিশুদ্ধতা খুঁজে পাবে।"
আদ্রিন খানিকটা ঝুঁকে বললো।
--"উহু,পাবে না।"
ডাহা মিথ্যে বললো তৃপ্তি। সে ইতিমধ্যে আদ্রিনের আচার আচরণে হারিয়েছে নিজেকে।পরপর নিজেকে ধাতস্থ করতে বললো,
--"আমি যাচ্ছি আপনার সাথে।"
তৃপ্তির পড়নে কোটের হাতা টেনে ধরলো আদ্রিন।
ধীর কণ্ঠে শুধালো,
--"মানা করেছি না?অন্য কারো বিষাক্ত নজরের ছোঁয়া তোমার অবয়ব ভেদ করা বারণ।"
চলবে.....