#অতৃপ্তির_মাঝে_তৃপ্তিময়_সে
#লেখিকা- সালসাবিল সারা
পর্ব -৯
___________
২১.
--"আমার সাথে কথা বলবে না,তৃপ্তি?বেশি বিরক্ত করি?"
শান্ত তবে গাম্ভীর্যতায় পরিপূর্ণ আদ্রিনের কণ্ঠস্বর।
তার এহেন বাক্য শুনে তৃপ্তির পা থমকে।গাড়ি থেকে নামতে গিয়েও নামলো না সে।আদ্রিনের বলা আজকের সকল বাক্যে সে একরাশ স্বস্তি পেলেও দমিয়ে ফেললো সে নিজস্ব পা'ষাণ মনকে।এমনকি অত্র ব্যাপারে কিছুই বলার সুযোগ দিলো না সে আদ্রিনকে।বিষয়টি লক্ষ্য করে আদ্রিনও তেমন কিছু ইঙ্গিত করলো না।তার ধারণা তৃপ্তির সময়ের প্রয়োজন।আর সেই নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে আদ্রিন অপেক্ষা করবে।কিন্তু,
বিদায়বেলায় মেয়েটা কিছু না বললে ঘাবড়িয়ে যায় নামহীন সেই প্রেমিক।তাই তো উপরোক্ত বাক্যটি ছুঁড়ে সে গোপন প্রেমিকার বিদায়বেলায়।
তৃপ্তি কিংকর্তব্যবিমূ়ঢ়।মানবটা তাকে বিরক্ত করে?নাহ।একদমই না।বৃষ্টিতে ভিজে নাজেহাল অবস্থা তৃপ্তির।সম্ভবত জ্বরের পূর্বাভাস।গলাটাও খুশখুশ করছে তার।বিনা মৌসুমের ঝর বাদল সহ্য হয় না।এছাড়াও আদ্রিনের বলা প্রত্যেক শব্দ বেসামাল করে মেয়েটার মন।এইযে আজ,নিজেকে না দমালে কি অঘটন ঘটতো!মায়ের মতো কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা নেই এই মেয়ের।তাই,সময় বুঝে চুপ করে ছিলো মেয়েটা।এইভাবেই একেবারে আদ্রিনকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয় তৃপ্তির।সামনে তৃপ্তি এবং আদ্রিনের জন্যে কি অপেক্ষা করছে এটাও তার অজানা।তৃপ্তির পাষাণ হৃদয়ে সবটাই এলোমেলো।তাই বলে আদ্রিন তাকে বিরক্ত করছে?ভুল,তা ইহকালে অসম্ভব!
--"নাহ,বিরক্ত কেনো করবেন?"
তৃপ্তি মিনমিনে সুরে প্রশ্ন করলো।
--"চলে যাচ্ছো কিন্তু,একটা বাই পর্যন্ত বললে না।ভাবলাম,আমার কারণে বেশ বিরক্ত হয়তো তুমি!"
আদ্রিনের অধরে তাচ্ছিল্যের হাসি।
মাথায় ভোঁতা যন্ত্রণা অনুভব হয় তৃপ্তির।ঠিক কেনো?আদ্রিন তার ব্যাপারে ভুল ভাবছে বলে নাকি শরীরের তাপমাত্রার নাজেহাল অবস্থা বলে?
--"ভুল ভাবছেন।আসলে আমার ভেজা কাপড়ের কারণে অস্বস্তি হচ্ছিলো।যতো দ্রুত বাসায় ফেরা যায়, আমার ততোই উত্তম।"
নিজের শরীর খারাপের কথা চেপে গেলো সে।
--"ঠিক আছে বাসায় যাও। যত্ন নিও নিজের।"
আদ্রিন গাড়ির ভেতরকার হলদেটে লাইটের আলো নেভালো।মেয়েটার মৃদু কম্পিত অধর সহ্য হচ্ছে না আদ্রিনের।
--"আসছি তবে।সময় নিয়ে একদিন আসবেন বাসায়।"
আদ্রিন নিরুত্তর।কেবল মাথা দোলালো।
তৃপ্তি পূর্বে নামার সময় আদ্রিনের কোট না খুললেও,
এইবার সে কোট খুলে পিছনের সিটে রাখলো,
--"থ্যাংকস কোটের জন্যে।"
আদ্রিন সম্মুখে তাকিয়ে।পাশে বসা বিদ্ধস্ত নারীর পানে তার নজর দেওয়া অসম্ভব।পাশে দৃষ্টি জ্ঞাপন না করেও মেয়েটার আবছা প্রতিচ্ছবি তার কর্নিয়ায় দৃশ্যমান।মুহূর্তেই বুকের ভেতরের উত্তাল শব্দ তার কানে স্পষ্ট।
--"বাসায় যাও।"
কেমন কম্পিত তার এই কণ্ঠ।তৃপ্তি গাড়ি হতে নেমে চলে যাওয়ার সময় সেই কণ্ঠ শুনে স্তব্দ।তবে পেছন ফেরার পূর্বেই শাঁ করে ছুটলো আদ্রিনের প্রাইভেট কার।তারপরও পেছন ফিরলো তৃপ্তি।খানিকটা দূরে লাল রঙের হেডলাইট জ্বলজ্বল করে উঠলো।তৃপ্তি এতোসেতো ভাবলো না আর।জ্বরের প্রকোপ বাড়ছে মেয়েটার।দ্রুত পায়ে সে গেইটে প্রবেশ করলো নির্বিঘ্নে।
.
তৃপ্তির এলাকা হতে বের হয়ে আদ্রিন গাড়ি সাইড করলো।আঁখিতে ভাসছে আজকের দিনের তার মেহেবুবার সকল রূপ।স্টিয়ারিংয়ে মাথা ঠুকে বসে সে।মেয়েটাকে তার বড্ড প্রয়োজন।এমন'ই তো একজনের খোঁজে ছিলো সে,যার মাধ্যমে তার অতৃপ্ত হৃদয় খুঁজে পাবে তৃপ্ততা।এই তৃপ্তি মেয়েটা তার জীবনে এসে সকল ঘাটতি পূরণ করলো।তৃপ্তির প্রতি আজ তার ভালোবাসার মাত্রা বাড়লো হাজারগুণ।শাড়িতে মেয়েটাকে এতোটা আ'বেদনময়ী লাগবে তা জানা ছিল না আদ্রিনের।তার কল্পনার চেয়েও মেয়েটাকে শাড়িতে প্রেয়সী বলেই মনে হচ্ছিলো তার।কেনো মেয়েটার এক কালো অতীত আছে?এই অতীতের কারণেই আদ্রিন তাকে সময় দিবে বলে ভেবেছে।তবে এখন তার রাগ হচ্ছে।প্রচুর রাগ। সিটে সোজা হয়ে বসলো সে পুনরায়।না তৃপ্তির কালো অতীত থাকতো,আর না তার এবং তৃপ্তির মাঝে এমন সময় নামক দূরত্বের সৃষ্টি হতো!
দুই আঙ্গুলের সমেত কপাল ঘষলো সে।আদ্রিন বেশ জানে,নিজের বাবা-মায়ের সম্পর্কের ফাটলের দরুণ মেয়েটা এমন পাথর হৃদয়ের অধিকারী।পরক্ষণে আদ্রিন কিছু একটা ভাবলো এবং হাসলো সন্তর্পনে।তৃপ্তির মনে ভালোবাসা সৃষ্টি করাটা আদ্রিনের নিকট এক রোমাঞ্চকর পর্ব হতে যাচ্ছে।আর সেই ভালোবাসা সৃষ্টি অতঃপর আগলিয়ে রাখতে আদ্রিন সব করতে প্রস্তুত।
তার ভাবনার ইতি ঘটে তন্ময়ের ফোনে।সন্ধ্যা সাতটার মিটিংয়ের পূর্বাভাস জানিয়ে দিয়েছে তন্ময়।সেই সুবাদে গায়ের অপরিপক্ক শুষ্ক শার্ট ঢাকতেই পেছন সিট হতে নিজের কোটটা নিলো সে।তৃপ্তির গায়ের উষ্ণতা এখনো এই কোটে বিদ্যমান।সেই সুবাসে নিজেকে হারিয়ে গায়ে জড়ালো কোটটি।একরাশ শিহরণ খেলে গেলো আদ্রিনের সারা সত্তা জুড়ে।মনে মনে সে এই সিদ্ধান্ত নিলো,কেবল সে একাই এখন এই সম্পর্কের পেছনে ছুটবে না।তৃপ্তিকেও তাদের ভবিষ্যতের প্রণয়ের সম্পর্কের পিছে ছুটতে এক প্রকার বাধ্য করবে স্বয়ং আদ্রিন।সম্পূর্ণ ব্যাপারটা ঘটবে আদ্রিনের পরিকল্পনায়, কিন্তু তা থেকে যাবে তৃপ্তির আড়ালে-আবডালে।
আঁধারে সন্ধ্যার বেশভূষা কৃষ্ণ।ঘটা করে বর্ষণ নামলো পুনরায়।পাশে অনুপস্থিত অপ্রেমিকার শূন্যতা গ্রাস করছে এই মানবকে।মিউজিক প্লেয়ারে নিজের পছন্দ অনুযায়ী গানের পসরা সাজিয়েছে আদ্রিন।তার কল্পনা জুড়ে কেবল সে আর তার মেহেবুবা।সেই প্রথম দিন হতে তাদের প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করছে গানের প্রত্যেক পংক্তি সমেত।অতঃপর কাঙ্খিত লাইন এলে তৃপ্তির কল্পনায় আদ্রিন ভরাট সুরে গুণগুণ করলো,
--"কেনো লাগে শূন্য শূন্য বলো,
তোমায় ছাড়া এত....
তুমি কি তা বলতে পারো?"
পরপর সে এক হাত স্টেরিয়াংয়ে রেখে অন্যহাতে মাথার অগ্রভাগের চুলে হাত বুলিয়ে অস্ফুট ভঙ্গিতে বিক্ষিপ্ত কণ্ঠে গর্জন করলো,
--"হুস!আই'ম মিসিং ইউ,তৃপ্তি।
২২.
জ্বরের কারণে এই সপ্তাহ তৃপ্তি ঘরের বাহিরে যায়নি।বাহিরে না বেরুলেও ইউনিভার্সিটি এবং ছোট্ট ব্যবসার সকল কাজ ঘরে বসেই সেরেছে সে।এই সপ্তাহখানেকের জ্বরে মেয়েটার গাল শুকিয়েছে।জ্বরের প্রথম দুদিন একেবারে বেখবর ছিলো মেয়েটা।তৃতীয় দিনে তার অবস্থার উন্নতি হলে সর্বপ্রথম তার স্মরণে এলো আদ্রিনের কথা।ছেলেটা গত দুইদিন তার একটাবার খবর না নেওয়ার কারণে কেমন এক চাপা কষ্ট অনুভব করলো তৃপ্তির পাষাণ হৃদয়।তারপরও ভেঙে যায়নি সে।কিন্তু পঞ্চম দিনেও আদ্রিনের কোনো হাদিস না পেলে বাধ্য হয়ে ফোন করে তাকে।মেসেজের উত্তরটাও আদ্রিন দেয়নি পঞ্চম দিনেও।হুট করে তার গায়েব হয়ে যাওয়াটা আয়ত্বে এলো না তৃপ্তির।তবে,তাকে ফোন দেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মাথায় আদ্রিনের কণ্ঠ শুনেছিলো তৃপ্তি।যেনো ফোন হাতে নিয়েই বসে ছিলো আদ্রিন।তার কণ্ঠ পূর্বের মতো গম্ভীর শোনালেও অপর পাশে উপস্থিত মানবের অধরের প্রাপ্য প্রশান্তির হাসি উপভোগ করতে পারেনি তৃপ্তি।মানুষটার পরিকল্পনা অনুযায়ী তৃপ্তির এই ফোন যেনো দুর্ভিক্ষের মাঝে মৃদু আহার।তৃপ্তি জানেও না,তার এই ফোনের কারণে তার প্রতি আদ্রিনের জিদ ঠিক কতটা বাড়লো!সেদিন তৃপ্তি রাগ করেনি আদ্রিনের লাপাত্তা হওয়াতে।সত্যিকার অর্থে আদ্রিন ব্যস্ত ছিলো নিজ কাজে,ঢাকায়।
এতদিন কাজে না ফিরলেও আজ তৃপ্তি বসে নেই।ড্রইং ক্লাস শেষ করিয়ে সে বেরুলো আলেয়ার বাসার উদ্দেশ্যে।রিক্সায় চড়ে ব্যস্ত শহরের অলিগলিতে ঘুরতে তৃপ্তির বেশ লাগে।এইযে এখনো বিকালের অন্তিম পর্যায়ে সূর্যের লাল আভায় জগৎ রক্তিম।স্নিগ্ধ পবন ছুঁয়ে যাচ্ছে তার দুর্বল সত্তায়।জ্বরের পর বেশ দূর্বলতা দেখা দিয়েছে মেয়েটার। তাও খুশি সে।বাহিরে ঘোরাফেরা করা তার সর্বপ্রিয়।
আলেয়ার বাসায় তার কাজের অন্ত ছিল না।তবে আলেয়া মেয়েটা আন্তরিক।তৃপ্তির অবস্থা পরখ করে সে শুধালো,
--"অসুস্থ হয়েও কি কাজ করবি?আমি আছি তো।দেখি বস।জিনিসপত্র গুছিয়ে দে বিছানায় বসে।অযথা দাঁড়িয়ে থাকবি না।"
--"দুইজনে একত্রে লাইভ করলাম।আর এইসব তুই একা সামলাবি?
তৃপ্তি ইশারা করলো ফ্লোরে ছিটিয়ে থাকা কাপড় এবং গয়নার পানে।
--"হ্যাঁ।আমি করবো।তুই আপাতত খাটের উপর রাখা কাপড় ভাঁজ কর বসে বসে।"
আলেয়ার ধমকে তৃপ্তি থামলো।এইভাবেও তার শরীরটা আবারও টলমলে।
রাত নয়টার দিকে তৃপ্তি নামলো আলেয়ার অ্যাপার্টমেন্ট হতে।নিচে সিএনজি অপেক্ষায়।বিভিন্ন অ্যাপে আজকাল রাতের বেলায়ও সুরক্ষার সাথে সিএনজি,মোটর সাইকেল বা কারের সুবিধা পাওয়া যায়।একা মেয়ে হিসেবে তৃপ্তি তাই এই সুযোগ হাতছাড়া করলো না।
সিএনজিতে উঠার জন্যে উদ্যত হতেই চিরচেনা কণ্ঠে স্তব্ধ হলো তৃপ্তি।
--"মেহেবুবা!"
বিচলিত নজরে পেছনে বাঁক ফিরলো তৃপ্তি। মোটা কাপড়ের ফুল হাতা গেঞ্জি পরিহিত কাঙ্খিত পুরুষটি দাঁড়িয়ে।অধর প্রসারিত।আঁখি তার জ্বলজ্বল।চাপা ঘন দাড়ি আজ মিহি।চুলের নকশা পরিবর্তিত।তৃপ্তির বুকের গভীরে শব্দ হচ্ছে তীব্র।লোকটা কাছে এসে দাঁড়াতেই ঝাঁঝালো মিষ্টি গন্ধ ভেদ করলো তৃপ্তির নসিকারন্ধ্রে।আদ্রিনের পুরুষালি সুবাস এবং পারফিউমের সুবাস মিলেই এমন সুবাসের সৃষ্টি।তৃপ্তির বেশ সন্নিকটে আদ্রিন।হুট করেই তার কপালে হাতের উল্টো পিঠ রেখে আদ্রিন প্রশ্ন করলো,
--"জ্বর সেরেছে পুরোপুরি?"
--"হ্যাঁ।আপনি এইখানে?"
তৃপ্তি কিঞ্চিৎ অবাক।
--"এইসব এলাকায় আমার আসা যাওয়া থাকেই।বেশিরভাগ বন্ধুদের আড্ডা জমে এইখানেই।"
আদ্রিন মিথ্যা বললো সাবলীলভাবে।রুদ্র তাকে তৃপ্তির ঘর থেকে বাহির হওয়ার সংবাদ দিলে কাজ শেষে আদ্রিন এইখানে পৌঁছে।রুদ্র পূর্ব হতেই এইখানে উপস্থিত ছিলো।আদ্রিনের নির্দেশে সে গাড়ি নিয়ে ফিরে গেলেও রয়ে যায় আদ্রিন তার মেহেবুবার অপেক্ষায়।
--"ওহ!চলে যাবেন এখনই?"
তৃপ্তি প্রশ্ন করলো হেসে।
--"হ্যাঁ,যাবো।গাড়ি গ্যারেজে।আজ এমনি বেরিয়েছি।তুমি একা যাচ্ছো?"
আদ্রিন এক হাত পকেটে পুরলো।
--"একাই যায়।আপনি যাবেন আমার সাথে?"
ফট করেই শুধালো সে আদ্রিনকে।তৃপ্তি নিজেই তার প্রশ্নে কিঞ্চিৎ অবাক।লজ্জা পেলো খানিকটা।
--"লজ্জা পেও না।যাবো।"
শেষ বাক্য আওড়িয়ে আদ্রিন নিজেই প্রথমে উঠলো।পরপর উঠলো তৃপ্তি।
দুজনার মাঝে কয়েক ইঞ্চির দুরত্ব।টুকটাক কথার ভান্ডারে ভালো সময়ই অতিক্রান্ত করছে মানব-মানবী।তবে,ব্যাঘাত ঘটলো অন্যথায়।
হুট করেই দুইটা বড় মাইক্রো তাদের সিএনজির সম্মুখে থামলো।সিএনজি কড়া ব্রেক কষতেই বিচলিত আদ্রিন মুহূর্তেই তৃপ্তির কোমর চেপে নিজের গায়ের সাথে মিশিয়ে নিলো তাকে।আতঙ্কিত তৃপ্তি আদ্রিনের গেঞ্জি খাঁমচে।
--"কি হলো?ভয় হচ্ছে।"
আদ্রিনের চোখের ভাষা অচেনা।ভাবভঙ্গি ভিন্ন।ধীর কণ্ঠে সে আশ্বাস দিলো,
--"ভয় পেও না,মেহেবুবা।আমি আছি তো।"
চলবে.....