ফন্ট সাইজ:
থিম:
অতৃপ্তির মাঝে তৃপ্তিময় সে

৩৭তম পর্ব

লেখক: সালসাবিল সারা

#অতৃপ্তির_মাঝে_তৃপ্তিময়_সে

#লেখিকা- সালসাবিল সারা

অন্তিম পর্ব(শেষাংশ)

_______________

--"বিস্কিটের সাথে সস্ কে খায়, তৃপ?"

পেছন হতে এই সুর তৃপ্তিকে বিচলিত করতে যথেষ্ট।ঘাড় না বাঁকিয়ে দ্রুত চিবানো শুরু করে সে। উদ্দেশ্য সস্ মাখা বিস্কিট গলধঃকরণ করা।আদ্রিনকে এই খবর নিশ্চয় রিয়ানা দিয়েছে।এত করে মানা করেও তৃপ্তি থামেনি এমন অহেতুক খাবারে।তাই চুপি চুপি রিয়ানা তার ভাইকে জানিয়েছে এই খবর!

তৃপ্তি মুখে শাড়ির আঁচল চেপে।পাশের চেয়ারে বসা সাফা বেখবর।সে এক হাতে বিস্কিট কামড় দিচ্ছে,

অন্যহাতে ড্রইং করছে।

আদ্রিন পাশাপাশি এসে দাঁড়ায় তৃপ্তির।টেবিলে একহাত রেখে তির্যক ভঙ্গিতে তৃপ্তির পানে এগোয়।মুখ হতে শাড়ির আঁচল সরায়। সস্ লেপ্টে রইলো ঠোঁটের কিনারায়।সেথায় বৃদ্ধাঙ্গুল স্পর্শ করে আদ্রিন।ফিচেল কণ্ঠে বলে,

--"ভালো খাবার পেটে পড়ে না তোমার। উল্টাপাল্টা কিসব খাও?ঘন ঘন বমি করো দেখো না!"

--"কিছু হবে না।"

তৃপ্তি বিরক্ত।এই লোক সবসময় তার খাবারের মাঝে বা হাত দেয়।তৃপ্তি নিজেও অবশ্য জানেনা,এমন উদ্ভট খাবারে সে কি মজা পায়!

--"হচ্ছে অলরেডি।তুমি আওফাও জিনিস খাও আর তোমার ফুড পয়জনিং হয়।"

আদ্রিন তৃপ্তির গাল সাফ করতে ব্যস্ত।

তৃপ্তি ভাবুক।এইসব তার মোটেও ফুড পয়জনিং মনে হয় না।তার ধারণা,নিজ অস্তিত্বের অভ্যন্তরে অন্য জান আছে।রিপোর্ট আসা পর্যন্ত আপাতত চুপ থাকতে চায় সে। তারপরও মুখ খুললো মেয়েটা,

--"ফুড পয়জনিং না।আমার এইভাবেই বমি পায়।"

--"আচ্ছা।কিন্তু,অতিরিক্ত সস্ খেও না আর।"

আদ্রিন সস্ এর বোতলে হাত রাখলে তৃপ্তি ক্ষীণ সুরে বলে,

--"আমি খাচ্ছি এটা।"

--"এমনি বিস্কিট খাও।"

আদ্রিন সোজা হয়ে দাঁড়ায়।তৃপ্তির নয়ন ঝলমলে, টলটলে। নাকটাও রক্তিম।দিনদিন মেয়েটা ছিঁচকাদুনে হচ্ছে।অথচ,মেয়েটা ছিল দুর্দান্ত। বড্ড সাহসী।হঠাৎ এমন পরিবর্তন ভাবায় আদ্রিনকে। সে কিছু ব্যক্ত করার পূর্বে সেথায় হাজির হয় রিয়ানা,

--"ড্রইং শেষ সাফার?"

--"আরেকটু বাকি, মা।"

সাফার উত্তর পেয়ে রিয়ানা তৃপ্তির পানে ফিরলে আঁতকে উঠে।ভাইকে জানিয়ে ভুল করেছে সে?আদ্রিন মেয়েটাকে বকেনি তো আবার!দ্রুত হেঁটে সে তৃপ্তির নিকট পৌঁছায়,

--"ওহমা, কাদঁছো কেনো?আদ্রিন বকেছে?এই আদ্রিন তোকে আমি বকা দিতে পাঠিয়েছি মেয়েটাকে?নাকি বুঝিয়ে শুনিয়ে অহেতুক সস্ খেতে মানা করার জন্যে পাঠিয়েছি।"

--"আপু,আমি ওকে বকিনি।এইযে বোতল সরাচ্ছি তাই এমন অবস্থা।"

বোতল দেখিয়ে হাসে আদ্রিন।ছলছল নয়নে তৃপ্তি সেই মানুষের পানে চেয়ে। তৃপ্তির এমন কান্নার মজা নিচ্ছে আদ্রিন। থ্রি কোয়ার্টার প্যান্টের সাথে ফুল স্লিভের কালো রঙের সোয়েটার পরনে তার আদ্রিন।সস্ এর দুঃখের মাঝেও এই ছেলের জন্যে তার মনের রোমাঞ্চকর অনুভূতি হানা দেয় মুহূর্তেই।নিজ কর্মকাণ্ডে নিজে চমকিত তৃপ্তি।চোখ বুজলে গাল গড়িয়ে অশ্রু ঝড়ে।

--"সুন্দরভাবে নিশ্চয় বলিসনি।নাহলে মেয়েটা কাঁদতো না। তোকে আসতে বল ভুল হয়েছে।সরি তৃপ্তি।আমি তোমার জন্যে চিন্তিত ছিলাম।"

তৃপ্তির হাত ধরে রিয়ানা।

দৃষ্টি ফেরায় তৃপ্তি। রিয়ানার হাতের উপর অন্যহাত রাখে,

--"সরি কেনো বলছেন আপু?আমি সরি।"

নাক টানে মেয়েটা।

আদ্রিন হেসে উঠে সশব্দে,

--"মেয়ে মানুষকে বুঝা কষ্টের।"

আদ্রিনের এহেন হাসি তৃপ্তি সত্তায় আগুন ধরায়।সে তীব্র ভাষায় বলে,

--"আপনার ভাই পাগলের মতো হাসছে কেনো আপু?"

--"ও তো পাগলই।তোমার জন্যে পাগল।"

রিয়ানাও যোগ দেয় আদ্রিনের হাসির সাথে পাল্লা দিয়ে।

তৃপ্তি বোকা বনে।এই দুই ভাইবোন সব দিক দিয়ে একই। সমমান।

পরক্ষণে রিয়ানা বলে,

--"সাফা চলো।গোসল করবে।স্কুল থেকে এসেই ড্রইং এ বসেছো।"

--"শেষ, মা।"

সাফা জবাব দেয়।

--"মামী দেখো।"

তৃপ্তি ড্রইং খাতায় নজর বুলায়।গ্রামের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে সাফা।মলিন হেসে তৃপ্তি জবাব দেয়,

--"সুন্দর অনেক।"

--"আমরা আসি।বাই বলো মামীকে।"

রিয়ানার কথায় তার মেয়ে বলে,

--"বাই মামী।"

তৃপ্তি হাত নাড়ায়।সাফা এবং রিয়ানা চলে উপরের কামরায়।

আদ্রিন তার হাতে বিদ্যমান বোতল স্টাডি টেবিলের উপর রাখে।তৃপ্তির বাহু নাড়িয়ে বলে উঠে,

--" মেহেবুবা!"

তৃপ্তি চোখ মেলায় না।সে রেগেছে এই লোকের সাথে।তার নিকট হতে উত্তর না পেলে আদ্রিন এক নিমিষেই তৃপ্তিকে উঠিয়ে নেয় কোলে।নিজে বসে পড়ে চেয়ারে,

--"কি হয়েছে?"

--"আপনি খারাপ।আমার উপর হাসছিলেন।"

তৃপ্তির আবারও আঁখি ভরে।

আদ্রিন তার নাক ঘষে তৃপ্তির গালে,

--"বারবার একই কথা বলা লাগবে?"

তৃপ্তি দুদিকে মাথা নাড়ায়। যার অর্থ "না"।নিজ থেকে এইবার তৃপ্তি বলে,

--"আপনার না বিকালে মিটিং আছে!একটু পরে বেরুবেন।গোসল সারেননি কেনো এখনো?আমি লাঞ্চের ব্যাপারটা দেখছি।"

--"আম্মি,মানা করেছে না রান্না নিয়ে ঝামেলা করতে!তাহলে জিদ করো না।সার্ভেন্ট দেখে নিবে রান্না।তুমি চলো।"

--"কই যাবো?"

তৃপ্তির ভ্রু জোড়া কুঁচকে যায়।

--"গোসলে।"

আদ্রিন দাঁত দ্বারা অধর চেপে অন্যরকম দৃষ্টিতে চেয়ে তার পানে।এই দৃষ্টিটা তৃপ্তির সহ্য হয় না।তার অস্থির লাগে।ইচ্ছা করে এই লোকের নেশায় এক মুহূর্তে হারিয়ে যাক সে এই পার্থিব জগৎ হতে।

তৃপ্তি তার কোল হতে নামে।শরীর ভালো নেই তার।আদ্রিনের আবদার রাখার শক্তি আছে কি?

--"নিজে যান।"

--"বউ ছাড়া সম্ভব না।চলো।"

তৃপ্তির হাত ধরে টান দিলে মেয়েটা আদ্রিনের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে থাকে।এক পর্যায়ে তাল মেলাতে হিমশিম খায় পেটের পীড়ায়।আদ্রিনের সোয়েটারের হাতা অন্যহাতে টেনে বলে,

--"আস্তে হাঁটুন।মাথা দুলছে আমার।"

আদ্রিন ঘাড় বাঁকিয়ে তার প্রেয়সীকে দেখে।মেয়েটা কেমন দূর্বল গত একমাস যাবত।ধীরে পা ফেলে আদ্রিন।যেতে যেতে নির্দেশ দেয়,

--"ডাক্তারের দেওয়া একটা ঔষধ যেনো মিস না যায়।"

মাথা নাড়িয়ে শায় দেয় তৃপ্তি।

ছেলেটার উদাম ভেজা শরীরে তৃপ্তির শ্বাস আটকে আসে প্রত্যেকবারই। খাঁজ খাঁজ দেহের মাঝে কি সুন্দর পানির বিন্দুকনা।আদ্রিন তার প্রেয়সীতে মত্ত।গরম পানিতে মেয়েটাকে ঠিকভাবে যত্ন নেওয়ার চেষ্টায় সে।এরমাঝে নিজের অবাধ্য স্পর্শ দিতে ভুলছে না আদ্রিন।মেয়েটার কোমর খুব অনায়াসে তার দুহাতের আড়ালে চলে আসে।গভীর চুম্বনে মুহূর্তকে আরো শ্বাসরুদ্ধকর পর্যায়ে নেয় এই যুগল।নিজ প্রাণ ভোমরার এলোমেলো ছোঁয়ায় তৃপ্তির জান যায় অবস্থা।

হঠাৎ শরীরে আর সায় দেয় না।আচমকা পেটে হামলা হয় যেনো,গড়গড়িয়ে তৃপ্তি বমি করে। থামে আদ্রিন।এখনো তার হৃদপিন্ড দ্রুত গতিতে চলছে।কোনোভাবে দম ফেলে সামলে নেয় সে তৃপ্তিকে।ক্লান্ত মেয়েটা সকল ভার আদ্রিনের সত্তায় ছাড়ে।আলগোছে আগলিয়ে ধরে তাকে নিজ বুক পিঞ্জিরায়।শরীর পুছে ঢোলা কাপড় পড়িয়ে বিছানায় শুয়ে দেয় সে তৃপ্তিকে। ভেজা কাপড় বদলে ট্রাউজার চড়িয়ে দ্রুত ফিরে সে তৃপ্তির নিকট।

ইতিমধ্যে অধর শুকিয়ে মেয়েটার। মায়া হয় আদ্রিনের।ললাটে স্পর্শ দেয় ভালোবাসার,

--"খারাপ লাগছে?"

তৃপ্তির আঁখি বুজে।দুইহাত মেলে সে।আদ্রিন অনেকটা সাবধানে মেয়েটার বাহুডোরে সঁপে দেয় নিজেকে।আদ্রিনের কান বরাবর তৃপ্তি দূর্বল কণ্ঠে বলে,

--"ঠিক আছি।অফিসে যাওয়ার আগে প্লিজ খেয়ে যাবেন।"

--"কেনো এমন কষ্ট পাচ্ছো তুমি?রিপোর্ট রাত নয়টার আগে দিবে না?"

আদ্রিনের এমন বিচলিত প্রশ্নে হেসে উঠে তৃপ্তি,

--"উহু দিবে না।"

--"মিটিং শেষে আমি যাবো হাসপাতালে।তুমি বাসায় থেকো।"

আদ্রিন তার প্রেয়সীর গালে অধর ছোঁয়।তৃপ্তির হদিস নেই।দুর্বলতায় সে তন্দ্রাসক্ত।মিনিট বিশেক পর আদ্রিন উঠে পড়ে।তৃপ্তিকে ঠিকভাবে কম্বলে জড়িয়ে দেয়।নিজ শার্ট, কোট, ফর্মাল প্যান্ট দ্বারা আবৃত করলো তনু। বউয়ের নিকট গিয়ে পুনরায় স্নেহময় আলিঙ্গনে বিনা শব্দে নিচে নামে।খবর শেষে বেরিয়ে পড়ে।

স্টিরিয়াংয়ে হাত রেখে গাড়ি ঘুরিয়ে নেয় সাবধানে।মস্তিষ্কের সবটা জুড়ে কেবল তার মেহেবুবা।রিপোর্ট জেনে তৃপ্তির অবস্থা কেমন হবে জানা নেই আদ্রিনের।এর পূর্বেই তার অবস্থা জর্জরিত।খুব করে দোয়া করছে সবটা যেনো ঠিক হয়।

------------

রাত আটটা দশ।মিটিং শেষে আদ্রিন নিজ কেবিনে বসে।হাসপাতাল তার অফিসের নিকটে। পাঁচ মিনিটের পথ।শীতের এমন কড়া প্রকোপে আদ্রিনের কানের দিকটায় ঘামের উৎপত্তি।তন্ময় ফাইল বুঝে নিচ্ছে আপন মনে।এক ফাঁকে আদ্রিনের পানে দৃষ্টি পড়লে তন্ময় ফাইল রাখে।চিবুকে হাত ঠেকিয়ে বলে,

--"স্যার,আপনি ঠিকাছেন?এসি চালু করবো?"

তন্ময় নিজের প্রশ্নে বিভ্রান্তে পড়েছে।যদি উত্তর হ্যাঁ হয়,এই রুমে বসা অসম্ভব হবে। হিম পরিবেশ।রীতিমত হাত তার বরফ।

--"কেনো?আমাকে অস্বাভাবিক লাগছে দেখতে?"

আদ্রিন গা এলিয়ে দেয় রোলিং চেয়ারে।গোছানো চুলে অযথা হাত বুলায়।

--"স্যার,আপনি ঘামছেন।কোনো টেনশনে আছেন?"

--"আজ এখনো নয়টা বাজছে না কেনো?"

হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে পুনরায় দেওয়ার ঘড়ির তাকায় আদ্রিন।

--"স্যার, কোথাও যাবেন?"

--"তন্ময়, আজ এত প্রশ্ন করছো কেনো?"

--"আপনাকে চিন্তিত লাগছে, স্যার।"

তন্ময়ের জবাবে আদ্রিন ঘাড়ে হাত ঘষে,

--"জীবনে প্রেম করলে,বিয়ে করলে টেনশন লেগে থাকবে।এর মূল কারণ বউ।বউ মানুষটা এমন যে তার যদি কিঞ্চিৎ অসুবিধা বা কষ্ট হয় তোমার মনে হবে দুনিয়া শেষ তোমার।পুরো পৃথিবী থমকে আছে।তৃপ্তির রিপোর্ট দিবে এই নিয়ে আমার চিন্তা।"

তন্ময় হাঁ হয়ে সবটা শুনে।এই লোকটার ভেতর অনুভূতিযুগল কি সুন্দর লুকিয়ে।অথচ তন্ময় বুঝেনি কোনোদিন।

তন্ময়ের জবাব শোনার পূর্বে আদ্রিন চিন্তিত ভঙ্গিতে উঠে পড়ে,

--"আমি বরং হসপিটালে ওয়েট করি।"

বহু সময় কাটলে নয়টা বাজে।সিরিয়ালে তৃপ্তির নাম ভেসে আসে।আদ্রিন সম্মুখে এগোয়। রিসিপশনে জানায় গাইনোকোলোজিস্ট স্নেহার সহিত দেখা করতে আদ্রিনকে। আকাশ সমান ভাবনা আদ্রিনের। যেতে যেতে ফাইল দেখার কথা ভাবলেও আবার ভাবনা বাতিল করে।যা বলবে ডাক্তারই বলুক।

তৃপ্তি বিহীন আদ্রিনকে অবলোকন করে ডাক্তার কিঞ্চিৎ বোকা বনে।তাকে বসতে নির্দেশনা দিয়ে ডাক্তার স্নেহা বলে,

--"আপনার মিসেস আসেনি?"

--"নাহ।সে অসুস্থ।"

ফাইল এগিয়ে দেয় আদ্রিন।স্নেহা ফাইল পর্যবেক্ষণ করে হাসে। রিপোর্টের একটা অংশে আঙ্গুল দিয়ে চিহ্নিত করে জবাব দেয়,

--"দেখুন পজিটিভ লিখা।আপনার ওয়াইফ প্রেগন্যান্ট।শুভকামনা।এখন থেকে ভালো যত্ন নিবেন।আমি ঔষধ প্রেসক্রাইব করছি।"

কানে কথাগুলো প্রবেশ করলো ঠিকই,কিন্তু মস্তিষ্ক সায় দিচ্ছে না।বড্ড বেশি সুখ অনুভব করলে কি মানুষ অনুভূতিহীন হয়?হয় তো।এইযে আদ্রিন।তার শরীরে উত্তেজনা,মনে সহস্র দৃশ্য ভাসছে।মেয়েটার সাথে ঘনিষ্ট হলে গত দেড় মাস যাবত একটু বেশি ব্যথা অনুভব করতো সে পেটে।কারণটা কি তাহলে এটাই ছিল!অথচ আদ্রিন ধরতে পারেনি আসল কথা।তার পায়ের নিচ হতে মাটি শূন্য যেনো। চোখ জোড়া জ্বলছে। কাঁদবে কি সে?কিন্তু,আদ্রিনের সহজে কান্না আসে না। দুঃখেও না।এই বাচ্চাটা আদ্রিনকে কিরূপে পরিবর্তন করবে জানেনা সে।ইচ্ছা করছে এখনই বাড়ি ছুটতে।তার মেহেবুবাকে নিজ সত্তায় মুড়িয়ে নিতে।এত বড় খুশির সংবাদ কিভাবে ব্যক্ত করবে আদ্রিন! তার নিকট ভাষা নেই কোনো।

গাড়ির পার্কিংয়ে এসে থামে আদ্রিনের পা।বুকের শব্দ তেজ।দ্রুত তার গতি।কোট খুলে কাঁধে ঝুলায়।বাম পকেট হতে মোবাইল বের করে।মাকে ফোন করে সর্বপ্রথম।

কয়েকবার ফোন বাজে।ইনায়া সহজভাবে জিজ্ঞাসা করে,

--"কই তুমি? বাড়ি আসছো না?তৃপ্তি চিন্তা করছে।মেয়েটার মাথা ব্যথাও বেড়েছে।তেল দিয়ে দিলাম মাত্র।"

আদ্রিন কয়েক বার জোরে শ্বাস নেয়। জিহ্বা দ্বারা অধর ভিজিয়ে বলে,

--"আম্মি... আম্মি আমি বাবা হচ্ছি।তুমি দাদু..তোমার আদ্রিনের অন্য অস্তিত্ব আসছে এই দুনিয়ায়।"

ইনায়া চমকে যায়।তৃপ্তি তার উরুতে দূর্বল ভাবে শুয়ে।সেথায় নজর দিলে আঁখি ভরে তার।শক্ত ব্যক্তিত্বের মহিলা সে দুনিয়ার নিকট।অথচ,ছেলের জীবনের বিশাল সুসংবাদ শুনে ইনায়ার চোখ ভিজে,

--"আলহামদুলিল্লাহ্ আব্বা।মেয়েটার জন্যে তেঁতুলের সস্ এনো।নালিশ করেছে তোমার নামে।"

আদ্রিন হাসলো।হাসির সাথে ভারী বুকটা এখনোও অশান্ত।ঠোঁট কামড়ে সে ফের বলে,

--"আনবো আম্মি।"

নিজেকে পরিপূর্ণ লাগছে আহানান শেখ আদ্রিনের।এতটা সুখ আসবে জীবনে ইহকালে ভাবেনি ।জীবনটা সত্যি সুখের যদি তা মনের মতো করে মেনে নেওয়া যায়।গাড়ির গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে।রাস্তাটা আজ বড্ড দীর্ঘ। স্টিরিয়াংয়ে সজোরে আঘাত করে বিড়বিড় করে,

--"রাস্তাটা শেষ হয় না কেনো?"

'

তেঁতুলের সস্ পেয়ে তৃপ্তি মহাখুশি। কাল রাতে আদ্রিন আসার পূর্বে সে ঘুমিয়ে যায়।তাই রাতে দেখা হয়নি। এখনো আদ্রিন ঘুমিয়ে।তৃপ্তি একাই বাহিরে আসে রুম হতে।পাউরুটিতে সস্ মাখিয়ে নেওয়ার সময় তার হাতের বালা পরিবর্তিত দেখে মনে আসে,গত রাতে তার মা হওয়ার সংবাদে খুশি হয়ে ইনায়া এই বালা তাকে উপহার দেয়।তার বাবাকে জানায় এই খবর।খুশি মনে অরিত্রন মিষ্টি সহিত এসে মেয়েকে দেখে যায় সকালেই।কাজ থাকার দরুন বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি এই বাড়িতে।

নাস্তা শেষে তৃপ্তি টক জাতীয় কিছু খুঁজে ফ্রিজে।ইনায়া সম্পূর্ণ তৈরি।তৃপ্তিকে এইভাবে ঝুঁকতে দেখে সতর্ক বার্তা শোনায়,

--"এমন করে না,মা।সোজা হাঁটাচলার চেষ্টা করবে।"

তৃপ্তি হাসে,

--"আচ্ছা,আম্মি।"

ইনায়ার মন ভরে। পান্নার কথা ভেবে কতো না কষ্ট দিয়েছে এই মেয়েকে সে।আগে পান্নার কথা ভাবলে ঘৃণা হতো তার।কিন্তু, এখন করুণা জাগে।এই মেয়ের জন্যে তার হৃদয় পুড়ে।সুশ্রী চেহারার এই মেয়েটাকে ছাড়া ইনায়ার ঘর এখন অপূর্ণ।মাথায় হাত বোলানো অবস্থায় ইনায়া ফের বাণী শোনায়,

--"বাবার বাড়ি যেতে ইচ্ছে করলে যেতে পারো।কয়েকদিন থেকে এসো।"

খুশিতে মনটা ছেয়ে যায় তৃপ্তির।ইনায়ার বাহুডোরে সঁপে নিজেকে,

--"অনেক শুকরিয়া,আম্মি।"

ইনায়ার প্রস্থান ঘটে।তৃপ্তি বেজায় খুশি। বাবার বাড়িতে যাবে সে বহুদিন পর।কামরায় আদ্রিন অনুপস্থিত।ওয়াশরুমে নিশ্চয়।তৃপ্তি মনের সুখে আলমিরা খুলে। জামা নির্ধারণ করতে ব্যস্ত।

বাথরুমের দরজায় শব্দ হলেও মেয়েটা সেদিকে ফিরলো না।কাপড় নির্বাচনে একটু বেশি মগ্ন সে।

আচমকা নিজ পিঠে আদ্রিনের হিম অবয়বের সংস্পর্শ হলে সে কেঁপে উঠে অনেকটা।আদ্রিনের নাক,অধর পৌঁছে তৃপ্তির ঘাড়,চুলের গভীরতায়।হাতের স্পর্শে ব্যাকুল হচ্ছে তার উদর।

--"গত রাতে,বাবুকে আদর করেছি।এখন বাবু মায়ের পালা।"

আদ্রিনের কণ্ঠে মাদকতা।তৃপ্তি ঘুরে দাঁড়ায়।লোকটার বুকে এখনো পানি কণা।সেথায় আঁচল চেপে তৃপ্তি মাথা উচিয়ে আদ্রিনের নজরে নজর মেলায়,

--"আম্মি বলেছে বাবার বাড়ি যেতে।আমি যাবো।"

--"তুমি যাবে না।ডাক্তার বলেছে তোমার বেড রেস্ট করা দরকার।এটলিস্ট তিন মাস।"

আদ্রিনের সোজা জবাব।

--"কিন্তু আম্মি বললো যেতে।"

--"আম্মি ডাক্তারি পাশ করলো কবে?"

কাছে টানে সে তার মেহেবুবাকে।

--"এমন হিংস্র মানুষ আমি আর দেখিনি।আমি যাবো মানে যাবো।"

তৃপ্তি ঘুরে দাঁড়াতে চাইলে আদ্রিন দেয়নি।সে শক্ত হাতে তৃপ্তির কোমর চেপে,

--"যাবে না তুমি।"

তৃপ্তির গা জ্বলে যায়।হামলা করে আদ্রিনের শক্ত বুকে।মাংসের খাঁজে দাঁত দেবে দেয়।তৃপ্তির ঘাড়ে হাত রেখে আলগোছে সরায় সে তৃপ্তির মাথা,

--"বাঘিনী একটা।"

তৃপ্তির নজর অশ্রু ঘেরা।এতক্ষণ জিদ লাগলেও আদ্রিনের বুকে ছোপ ছোপ রক্তের আস্তরণ দেখে হৃদয় খন্ড হয় মেয়েটার।এক প্রকার আর্তনাদ করে সে,

--"আল্লাহ্,রক্ত!আদ্রিন সরি। ব্যথা করছে?"

ঝরঝর করে অশ্রুতে গাল লেপ্টে যায় তৃপ্তির মুহূর্তে।

নাক টেনে এক ধনে শাড়ির আঁচল দ্বারা বুকে আলতো ভাবে স্পর্শ করছে তৃপ্তি।আদ্রিন নেশাক্ত দৃষ্টিতে চেয়ে রয় তার অর্ধাঙ্গিনীর পানে।মেয়েটা তার অর্ধাঙ্গিনীর পাশাপাশি এখন তার অস্তিত্বের মালকিন। পাজকোলা করে তুলে সে তৃপ্তিকে। অধরে অধর মেলায়।তির্যক হেসে বলে,

--"তোমার কামড় আমি সহ্য করে নিলাম।কিন্তু বরাবরের মতো আমার কামড় সহ্য হবে তোমার?"

............

অনার্সের চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ হয় তৃপ্তির গতমাসে।পরীক্ষা ভালো দিয়েছে।আলেয়া তার ভালো পরীক্ষা দেওয়ার অন্যতম কারণ।পঞ্চম মাসে তার পেট তেমন একটা বুঝা যায়নি পরীক্ষার সময়।তবে, এখন ছয়মাস চলাকালীন তার পেটের আকার বেড়েছে।অত্যধিক রূপবতী মনে হয় মেয়েটাকে।হাসলে গালের দুদিকে উঁচু হয়।বাড়িতে রিয়ানা এসেছে।সাফা আসবে স্কুল হতে।

ঐ বাড়িতে আজ হলুদের অনুষ্ঠান।রাফির হলুদ।তাই রিয়ানা এই বাড়ি হতে হবে সেথায়।তৃপ্তি হলুদের অনুষ্ঠানে যাবে বাড়িতে হওয়ার সুবাদে।কিন্তু,বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়া তার জন্যে মানা।আদ্রিন মানেনি একদণ্ড।তৃপ্তির জন্য তার চিন্তা,যত্ন,স্নেহ সব যেনো আকাশ ছুঁয়ে।পূর্ব হতেও বেশি ক্ষিপ্ত থাকে এখন সে।তৃপ্তির কিঞ্চিৎ অসুবিধে হলে সে মাথায় তুলে পুরো ঘর।

ইনায়া গত রাতে সেই বাড়িতে ফিরে।

পরিবেশে উত্তাপ বেশ।বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেও রোদের উত্তাপ এখনো অনুভব করা যায়।

তৃপ্তিকে শাড়ি পড়তে সহযোগিতা করে রিয়ানা। কাঁচা হলুদ রঙের শাড়ি।রিয়ানা বেশ পরিপাটি সাজিয়ে দেয় তৃপ্তিকে।ঠোঁটে কড়া খয়েরী লিপস্টিক।সুন্দর সাজগোজ। হাতে রজনীগন্ধার টাটকা মালা।নিজের অবয়ব দেখে নিজে সন্তুষ্ট তৃপ্তি।আদ্রিন অফিসে যাওয়ার পূর্বে সতর্ক করেছে,ঠিকভাবে যেনো সবটা গুছিয়ে রাখে।

রিয়ানা তৃপ্তিকে সাজিয়ে নিজ রুমে ফিরে।তৃপ্তি আয়রন করে রাখা আদ্রিনের পাঞ্জাবি বের করে আলমিরা হতে।অনুষ্ঠানে যেতে এই লোকের জন্যে দেরী হবে।তাই আদ্রিন জানিয়েছে তার জন্যে পাঞ্জাবি যেনো প্যাকেটে নেয়। ঐ বাড়িতে তৈরি হবে সে।

রাত সাড়ে দশটায় আদ্রিন ফিরে বাড়িতে।ততক্ষণে তৃপ্তির একবার ঘুম খতম।আদ্রিন গাড়িতে হর্ন দিলে রিয়ানা ডাকে তৃপ্তিকে।অতঃপর তারা তিনজন গাড়ির পানে যায়।

গাড়িতে বসতেই রিয়ানা বলে,

--"এত দেরী করে এসেছিস।তোর বউয়ের একবার ঘুম তামাম।"

তৃপ্তি আদ্রিনের পাশের সিটে।হেলান দিয়েছে সন্তর্পনে।ডান হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং সামলে বাম হাতে সে তার প্রেয়সীর গালে হাত রাখে,

--"ঘুম হয়েছে?"

--"জ্বী।"

স্বর বসেছে তার।দক্ষ হাতে স্টিয়ারিং সামলে গাড়ি সম্মুখে এগোচ্ছে আদ্রিন।একা অবস্থায় যেমন গাড়ি চালায়,এখন তার প্রাণের জন্যে সেই কায়দায় বিরাট পার্থক্য।

বাড়ির সম্মুখে বিরাট আলোর মিছিল।রাতকে দিন বানিয়ে ছাড়লো।রিয়ানা,সাফার সাথে নামে।প্রধান ফটকের সামনে রিয়ানার স্বামী দাঁড়িয়ে।সাফা বাবার নিকট দৌড়ে পৌঁছায়।আদ্রিন তৃপ্তিকে সাবধানে নামতে সাহায্য করে।রিয়ানার স্বামী তাদের সাথে কুশল বিনিময় শেষে সকলকে নিয়ে ভেতরে যায়।তৃপ্তির হাত চেপে আদ্রিন। এতটুকু পথ অতিক্রম করছে তার মাথায় আগুন ধরিয়ে।আশেপাশের কেউ কেউ তাদের পানে তাকানোটা তার নিকট অসহ্য ঠেকছে।

বাড়ির সকলের সাথে দেখা হলে তৃপ্তির ক্লান্তি পালায়। প্রিয়, রূপমও এসেছে।ভাইবোনের সাথে মধুর আলাপে ব্যস্ত তৃপ্তি।আদ্রিনের রুমে সে।আত্মীয় স্বজনদের অনেকে এই রুমে এসে সাক্ষাৎ করছে তৃপ্তির সহিত। দাদীও দুবার দেখে গেলো মেয়েটাকে।দাদীর প্রতি ক্ষোভ নেই তৃপ্তির।সন্তান আসছে শুনে দাদী ছুটে এসেছিল বাড়িতে।স্বর্ণের চেইন উপহার দিয়েছিল সেইবার।

আদ্রিন রাতের খাবার নিয়ে রুমে আসে।নিচে খায়নি সে।

তৃপ্তির মুখ মলিন।অনুষ্ঠানে সে এসে কি লাভ হলো?আদ্রিন তাকে বেরুনোর নির্দেশনা দিচ্ছে না।এক লোকমা মুখে পুরে তৃপ্তির নিকট অন্য লোকমা এগিয়ে দেয় সে,

--"ডিনার করেছো অনেক আগে।খাও আবার।"

তৃপ্তি হাত সরিয়ে দেয় আদ্রিনের,

--"আপনি খান।অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ দিচ্ছেন না।আবার কিসের খাবার?"

তৃপ্তির কথায় পাত্তা দেয়নি আদ্রিন।দ্রুত লোকমা পুরে দেয় মুখের অভ্যন্তরে,

--"কথা কম।খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে।তোমার শরীর কাঁপছে এখনো।আমি দেখছি জান।"

--"নাহ। ঘুমাবো না।"

তৃপ্তি জিদ করে।

--"আচ্ছা ঘুমাইস না।আমি ঘুমাবো।আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিবি।"

আদ্রিন রেগে যায়।তৃপ্তি আবেগপ্লুত হয় সন্তর্পনে।লোকটার হাত চেপে ধরে।অধর এগিয়ে গাল ছুঁয়ে দেয়,

--"দিবো তো।"

আদ্রিন হাসলো না।মেয়েটাকে ঘুম পাড়ানোর ফন্দি এঁকেছে সে।

হাত ধুয়ে আদ্রিন পাঁচ মিনিট হাঁটে রুমে।পাঞ্জাবি খুলে।তৃপ্তির দৃষ্টি এই মানুষটার উপর হতে সরে না কখনো। সুঠামদেহী মানুষটার মাঝে তৃপ্তির সুখ দুঃখ সব আটকে।

তৃপ্তির শাড়ি হতে পিন খুলে আলগোছে।যত্ন করে শুইয়ে দেয়।

--"আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও।আমি টায়ার্ড।"

তৃপ্তি তার কথা রাখে।ধীরে স্পর্শ করে আদ্রিনের পরিপাটি চুলে।দেখা গেলো,মিনিট দশেকের মাথায় তৃপ্তি ঘুমিয়ে কাঁদা।

আদ্রিন তার গায়ে চাদর টেনে,দুপাশে বালিশের আস্তরণ দিয়ে রুম ত্যাগ করে।আদ্রিন জানতো মেয়েটা ঠিকই ঘুমাবে।

তৃপ্তির আজ কি হলো জানেনা।আদ্রিন যাওয়ার বিশ মিনিটে তার তন্দ্রা ছুটে।উঠে বসে দম ফেললে দেখে রুমে দাদী আসলো। হাতে বাহারি খাবার।তৃপ্তি লোভ সামলাতে পারেনি।কয়েক আইটেম অনায়াসে খেতে শুরু করে।দাদী খাবারের ট্রে দিয়ে চলে যায়। দাঁড়ায়নি এক পল।

-----

নিচের পরিবেশে আনন্দের জোয়ার।ভাই ব্রাদার সকলে পানীয় খেতে ব্যস্ত। রাফি ভাইয়ের দিকে এক বোতল এগিয়ে দেয় হাসিখুশি মুখে।আদ্রিন মাথা নাড়ে,

--"একদম না।তোর ভাবী সিক।ওকে রাতে সামলাতে হবে।"

--"বাহ ভাই।তুমি সেরা।"

রাফি ঠাট্টা করে।

আদ্রিনও সায় দেয়।হাসে সে।শুধু রাফি কেনো!পুরো পরিবার জানে তৃপ্তির জন্যে আদ্রিন ঠিক কতটা উন্মাদ।

ভারী গান বাজনায় অনুষ্ঠানে জান এসেছে।আদ্রিনের চিন্তা হয়।ব্যালকনির দরজা বন্ধ করেছে নাকি এই নিয়ে সন্দেহ।অতিরিক্ত শব্দ তৃপ্তির শরীরের জন্যে ক্ষতিকর।

লম্বা কদমে হাঁটে সে।তৃপ্তিকে ছেড়ে এসেছে বেশিক্ষণ হলো না।

রুমের দরজা সটান খোলা।আদ্রিন ঘাবড়িয়ে।দরজা খোলা কেনো!রুমের আঙিনায় পা রাখতেই তার জগৎ ঘুরলো,মাথা কাজ করা বন্ধ করলো।তৃপ্তির পুরো মুখ রক্তিম। পেটে হাত রেখে কাঁদছে সে। এক প্রকার চিৎকার করছে।রিয়ানা,ইনায়া দুজনে তাকে সামলাতে বেগ পাচ্ছে যেনো।

--"ও আদ্রিন একা ফেলে কেনো গিয়েছিলে ওকে রেখে?মেয়েটার কি হয়েছে?"

ইনায়ার আর্তনাদে কান ভারী হয় আদ্রিনের।

দ্রুত ছুটে এসে তৃপ্তির পানে।তৃপ্তিকে কোলে তুলে নেয় সে সাবধানে। হাঁক ছাড়ে সে,

--"আপু,ভাইয়াকে বলো গাড়ি বের করতে।"

তৃপ্তির শক্তি ফুরিয়েছে। কান্নাটা আর আসছে না। গাড়িতে সে একেবারে নিস্তেজ।আদ্রিনের বুকের সাথে লেপ্টে আছে মেয়েটা।ভয় পাচ্ছে আদ্রিন।থরথর করে কাঁপছে তার শরীর।মেয়েটার কানে কানে বিড়বিড়িয়ে যাচ্ছে সে সমানতালে,

--"কিছু হবে না,জান।আমি আছি,আল্লাহ্ আছে। একটু সাহস রাখো। একটু ধৈর্য ধরো।"

তৃপ্তির সমস্যা হয়েছিল এলার্জিগত কারণে।আপাতত সে অবজারভেশনে।আদ্রিনের অবস্থা পাগলপ্রায়।সে তৃপ্তির হাত চেপে বসে।রিয়ানা আসেনি।ইনায়া বাহিরে।ডাক্তার কথা বলছিলো তার সহিত।এক মুহূর্তের জন্যে আদ্রিনের নিজেকে সর্বহারা মনে হয়েছে।দুনিয়ায় সবচেয়ে অসহায় যেনো এই আদ্রিন নামের ছেলেটা।

দুদিন যাবত তৃপ্তি হাসপাতালে।হাতের ক্যানেলার কারণে রক্ত উঠে ফুলে থাকে হাত সর্বদা।আদ্রিনের দাদীর আগমনে সে ঔষধ আনতে বেরোয়।সকালে ফুরিয়েছে।তৃপ্তির অবস্থা এখনো নড়বড়ে।দাদীর ফোনে কল আসলে মহিলা বাহিরে যায়। একজন নার্স আছে ভেতরে।কথা শেষে বলে,

--"মারতে পারলাম কই?রিয়ানা আর ইনায়া সর্বদা লেগে থাকে।আর আদ্রিনের কথা কি বা বলবো!সে পারেনা মেয়েটাকে গলায় ঝুলিয়ে রাখতে।সমস্যা নেই।একটা বিহিত আমি করবো।"

--"কার সাথে কথা বলছো দাদী?"

আদ্রিনের হাসিমুখ।সবে ফিরেছে সে।দাদী ব্যাপক ভয়ে।শুনেছে কি কিছু?হয়তো না।শুনলে নিশ্চয় রিয়েক্ট করতো।

--"কেউ না।পরিচিত একজন।মেয়েটার খেয়াল রাখিস।আমি আসছি।"

দাদী চলে যায়।

আদ্রিন কেবিনে ঢুকে।সবে বাথরুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তৃপ্তি।তাকে সাহায্য করছে নার্স।

----------

পরদিন তুমুল বৃষ্টিতে ধরণী জর্জরিত। তৃপ্তি জানালার ধারে দাঁড়িয়ে।কি সুন্দর বর্ষণ!একেবারে সমান্তরাল।মানুষের ছোটাছুটি স্পষ্ট দৃশ্যমান।তৃপ্তির ইচ্ছে করলো একটু বৃষ্টিতে নিজেকে সাজাতে।পরক্ষণে হাত পৌঁছায় পেটে।তার বাড়ন্ত অংশটার কারণে সে শঙ্কিত।বড় বিপদ হতে রক্ষা পেয়েছে বাচ্চাটা।আড়ষ্ট হয়ে তৃপ্তির তনু। তখনই প্রবেশ ঘটে আদ্রিনের।নার্স কেবিন ত্যাগ করে।প্রথম দিন হতে নার্স বুঝেছে এই লোকটা এই মেয়ের প্রতি বড্ড আসক্ত।সেদিন কি চিল্লানো না চিল্লিয়েছিলো লোকটা।দোষ ছিলো ওয়ার্ড বয়ের, হুইল চেয়ার আনতে দেরী করছিলো।

তৃপ্তির কি হয় জানেনা।সে হুট করে জড়িয়ে ধরে আদ্রিনকে।অনেকটা ঝুঁকে যায় আদ্রিন,

--"বিছানায় বসো।এরপর জড়িয়ে ধরছি।ব্যথা পাবে তো।"

--"পাবো না।"

তৃপ্তি নাক ঘষে ছেলেটার বক্ষে।

--"বসো না রে বাবা।"

আদ্রিন অনুরোধ করে।

তৃপ্তি মাথা উঠায়।লোকটার পানে চায়।একটু ভিজেছে কি আদ্রিন?আঁখি পল্লব ভিজে কেনো?

--"ভিজেছেন?"

--"অল্প।এইযে লবিতে আসতে আসতেই।"

তার কোমরে হাত পেঁচায় আদ্রিন।

তৃপ্তি ইশারায় আরো ঝুঁকতে বলে আদ্রিনকে।আলগোছে দুহাত রাখে সে আদ্রিনের গালে,

--"আপনি অনেক সুন্দর।"

হাসে আদ্রিন।তার শরীর দুলে,

--"শুনে খুশি হলাম।বসো এবার।"

তৃপ্তি দ্বিমত করেনি। বেডে বসলে আদ্রিন তার উরুতে শুয়ে পড়ে,

--"আগামীকাল ডিসচার্জ দিবে।বাসায় খুব সাবধানে থাকবে।তুমি আমার সব রে জান।আমি পারছি না তোমাকে আমার অভ্যন্তরে আটক করি।"

তৃপ্তি শব্দ করে হাসে।মেয়েটার এই হাসি আদ্রিনের

অতিপ্রিয়।

--"সারাজীবন এইভাবে হাসবে,আমার সাথেই বাঁচবে।"

ছেলেটার একেকটা বাণীতে তৃপ্তির সর্বসুখ।মনে মনে সে আওড়ায়,

--"আপনি ছাড়া আমার জীবনটা অপরিপূর্ণ,আদ্রিন।"

__________

বাসায় ফিরে তৃপ্তি।হাসপাতালের স্যাভলনের গন্ধ হতে পরিত্রাণ পেয়ে সে খুশি। ঐ এক গন্ধ অসহ্য লাগে তৃপ্তির।তার বাড়ির সকলে এসেছে তাকে দেখতে।

কিছুদিনে নিজের পূর্বের জোর খুঁজে পায় সে শরীরে।বাগানে হাঁটাচলার করে নিয়ম মাফিক।অনেকটা সময় সে সার্ভেন্টের সহিত থাকে,অনেকটা সময় ইনায়ার।মাঝে মাঝে রিয়ানাও আসে।

তৃপ্তির মনে বিষাদ চেপে।গত রাতে সে আদ্রিনকে দেখেছে এরপর আর দেখা হয়নি। এখনো সন্ধ্যা হতে চলছে।অথচ লোকটার হদিস নেই।ইনায়া পার্টি অফিসে।তৃপ্তি ফোন করলে আদ্রিনকে সে জানায় পনেরো মিনিটে আসছে।

ঠিকই সময় সময়ে কথা মিলে তার।আদ্রিনের মেজাজ ফুরফুরে। সার্ভেন্টকে সে পাঠায় খাবারের ব্যবস্থা করতে।আজ তারা গার্ডেনে নাস্তা সারবে।

--"আজ বড্ড খুশি লাগছে আপনাকে!"

--"কই?"

আদ্রিন নিজের রূপ পরিবর্তনের চেষ্টায়।

তৃপ্তি কিছু বলতে চায়।এর পূর্বে ফোন আসে রিয়ানার।তৃপ্তি জানতে পারে দাদী স্ট্রোক করেছে।প্যারালাইসিস হয়েছে সারাজীবনের জন্য উনার পুরো শরীর।আদ্রিন এতক্ষণ যাবত হাসপাতালে ছিলো।

তৃপ্তি অবাক বনে।লোকটা তাকে কিছু বলেনি!

ফোন রাখলে তৃপ্তি প্রশ্নবোধক চেহারায় ফিরে আদ্রিনের পানে,

--"দাদী স্ট্রোক করেছে।উনি আজীবনের জন্যে প্যারালাইসিস হয়েছে।আপনার স্যাড থাকার কথা।অথচ আপনি হাসছেন!"

--"কান্না করার কথা আমার?"

আদ্রিন উল্টো প্রশ্ন করে।

তৃপ্তি জবাব না দিলে,আদ্রিন তার কাঁধে হাত রাখে।মাথার কিনারায় অধর ছুঁয়ে দেয়,

--"ভেতরে নাস্তা করবে।এইখানে খাওয়ার মুড নেই।"

--"দাদীর এমন অবস্থা আপনি করেছেন?"

তৃপ্তির প্রশ্নে থমকে যায় আদ্রিন।আঁখি তার রক্তিম।হ্যাঁ,সেই করেছে এমন অবস্থা।সেদিন হাসপাতালে দাদীর বুলি শুনতে ভুল করেনি আদ্রিন। রাগে শরীর জ্বললেও,মস্তিষ্ককে স্থির রেখে সবটা সামলেছে।কৌশলে বাড়িতে গিয়ে দাদীর ঔষধের কৌটায় একই রকমের বিষাক্ত বড়ি রেখেছে।অথচ কেউ জানে না।না কোনোদিন জানবে।নিষ্পাপ মেয়ে আর তার ভ্রূণকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন দাদী।তার প্রাপ্য কি এমন হওয়া উঠিত নয়?

--"সেদিন দাদীর সেই কথা আমিও শুনেছিলাম আদ্রিন।বাথরুমে যাচ্ছিলাম।দরজার নিকট গেলে দাদীর কথা শুনি ।আপনাকে জানায়নি কারণ আপনি নিশ্চয় উনাকে ছেড়ে দিবেন না।তাই বলে এমনটা করবেন?"

তৃপ্তির প্রশ্নে আলতো হাতে তার গাল চেপে ধরে আদ্রিন।চোখ মুখ তার করুণ।পরক্ষণে সে হাসে। ব্রিভান্তকর হাসি।কাছে টানে তার প্রেয়সীকে।ঘাড়ে হাত বুলায়,

--"বারবার সতর্ক করেছি সবাইকে।তোমার ক্ষতি কেউ করলে তার অস্তিত্ব আমি রাখবো না।দাদী কাছের মানুষ আমার।তাই বাঁচিয়ে রেখেছি।"

--"এমন পাগলামি কেনো করেন?"

তৃপ্তির প্রশ্নে তাকে বাহুডোরে আবদ্ধ করে আদ্রিন,

--"তোমার জন্যে আমার পাগলামি কখনো কমবে না।হাজারো অতৃপ্তির ভিড়ে আমার একমাত্র তৃপ্তি তুমি।আমার সুখ,শান্তি,প্রশান্তি সব তোমাকে ঘিরে।এই আদ্রিন তার সবকিছুর বদলে তোমাকে চায়।সেই তৃপ্তির দিকে কেউ হাত বাড়ালে, হাতটা রাখবো না আমি,

মেহেবুবা।দুনিয়াটা খুব ছোট,এই ছোট জীবনে সর্ব পরিসরে আমার কেবল তুমি নামক তৃপ্তিকে চাই।"

তৃপ্তি পিঠে হাত রাখে আদ্রিনের।

এই প্রেমিক পুরুষকে তার কি বা বলার আছে?কিছু বলার মতো ভাষা নেই তৃপ্তির।

অতঃপর তৃপ্তি হাঁটতে আরম্ভ করে আদ্রিনের সহিত।আদ্রিনের হাত মেয়েটার কাধ চেপে,অন্যহাত তার অস্তিত্বের বাড়ন্ত অংশে।অধর স্পর্শ করে মেয়েটার কপালের কিনারায়।

তৃপ্তি নিশ্চুপ।মনে তার হাজারো ভাবনা। কিছু মানুষের ভালোবাসা প্রকাশ হয় অন্যরকম,একেবারে বা ব্যতিক্রম।তৃপ্তি আদ্রিনের অন্যরকম ভালোবাসায় মগ্ন।তৃপ্তি জানে হাজার কিছু বিনিময়ে আদ্রিন কেবল তৃপ্তিতে চায়।কয়জনই বা পায় তার জীবনের তৃপ্তিকে?যে প্রশান্তি রূপে নেমে আসে তাদের ধরণীতে,রাঙিয়ে দেয় তাদের পুরো পৃথিবী!

আদ্রিনের ভালোবাসা তার তৃপ্তির প্রতি ব্যতিক্রম,

উন্মাদনায় ঘেরা।আদ্রিনের শার্টের অংশ খাঁমচে ধরে মেয়েটা।খুব করে দোয়া করে,অতৃপ্তির মাঝে নিজ তৃপ্তিকে খুঁজে নেওয়া সকলের নসিবে যেনো সার্থক হয়।

-সমাপ্ত

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন