ফন্ট সাইজ:
থিম:
অতৃপ্তির মাঝে তৃপ্তিময় সে

৩৬তম পর্ব

লেখক: সালসাবিল সারা

#অতৃপ্তির_মাঝে_তৃপ্তিময়_সে

#লেখিকা- সালসাবিল সারা

পর্ব -৩৬(অন্তিম পর্ব)

প্রথম অংশ

------------------------

৭৮.

--"তৃপ্তি,তুমি ভেতরে যাও।সবার সাথে থাকো।"

কণ্ঠে ব্যাকুলতা আদ্রিনের।

ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয় মুহূর্তেই।সঠিক সময়ে তৃপ্তি নিজেই সরে যায়।যার দরুণ বিরাট বিপদ হতে রক্ষা পায় সে।তৃপ্তিকে আগলে নেয় আদ্রিন।খুব করে বলে ভেতরে যেতে।বাড়ির বাকি সবাই নিজের সুরক্ষার পানে ছুটে।ঘর নিরাপদ।তৃপ্তি ঝাপটে ধরে আদ্রিনকে।সে একা যাবে না।ক্লান্ত সুরে তৃপ্তি তার বাহু খাঁমচে বলে,

--"আপনিও বাসায় আসবেন।"

দু'হাত তৃপ্তির মুখমণ্ডলে ঠেকে আদ্রিন।তৃপ্তি কেঁদে অস্থির।তারা পিলারের আড়ালে।আদ্রিন তৃপ্তিকে শান্ত করার দৃশ্য অবলোকন করলে পরিবারের লোকেরা সেথায় যায়নি আর।

আদ্রিনের আঁখি বেজায় লাল।মুখশ্রী রক্তিম।ছেলেটা শঙ্কিত।ভাগ্যিস ঠিক সময়ে তৃপ্তি নিজেই সরেছিলো।নাহলে আজ যা হতো,এরপর কি ছেলেটা বেঁচে থাকতো?তৃপ্তির কোমরে হাত পেঁচিয়ে নেয় সে।অন্যহাতে গাল মুছে দেয় সে তৃপ্তির,

--"ভেতরে যাও।ডিনার সেরে ঘুমাবে।আমি আসবো।"

তৃপ্তি মাথা নাড়ায়।শক্ত করে আগলিয়ে নেয় আদ্রিনের পিঠ তার হাতের বাঁধনে। আদ্রিন কিছু বলেনি।মিনিট এক পরে তৃপ্তিকে জোর করে রুমে নিয়ে আসে।

উপস্থিত ঘরের সদস্য আদ্রিন এবং তৃপ্তিকে চিন্তিত দেখে নিজেরা আর কথা বাড়ালো না।তাদেরকে নিজেদের মতো থাকার জন্যে ছাড়লো।রিয়ানা মাকে ফোন করে সবটা জানালে,ইনায়া দ্রুত পার্টি অফিস হতে বেরোয়।আদ্রিনের নির্দেশে ঘটনার সাথে সাথেই গার্ড এবং সংরক্ষিত অফিসার সেই হামলাকারীর উপর অ্যাকশন নিয়েছে।বাকি খবর হতে আদ্রিন বেখবর।তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব এখন তৃপ্তিকে সামলানো।

আদ্রিন তৃপ্তিকে বিছানায় বসায়।চারিদিকের পর্দা ঠিক করে।কেমন ভার হয়েছে তার হৃদয়।তৃপ্তির কান্না থামেনি।দুহাতে মুখ ঢাকে সে।আদ্রিন মেঝেতে বসে।তৃপ্তির কোলে মাথা রাখে।দুইহাতে মেয়েটার কোমর টেনে দূরত্ব ঘুচায়।তৃপ্তি হাত সরিয়ে আদ্রিনের মাথায় হাত রাখে,

--"কি হয়েছে?খারাপ লাগছে?"

হেঁচকি উঠে যায় তৃপ্তির।আদ্রিন মাথা তুলে,হাঁটুতে ভর দেয়।কান্নারত তৃপ্তির কাঁপা অধরে নিজ অধর স্পর্শ করে। ঘাড়ে আঙ্গুল চাপে দৃঢ়ভাবে। তৃপ্তি তার কাঁধ ঠেলে সরাতে চায়।কিন্তু পারেনি।আদ্রিন অনেকটা উন্মাদ।রাগে সে জ্বলে যাচ্ছে,তৃপ্তির অজানা নয়।পরক্ষণে তৃপ্তিকে ছাড়লে,মেয়েটা শ্বাস নেয়।

আদ্রিনকে পাথর দেখাচ্ছে। দুজনের দৃষ্টি মিললে তৃপ্তি শাড়ির আঁচল ঠিক করে।আদ্রিনের ছোঁয়ায় সবটা এলোমেলো।

--"আপন মানুষের দ্বারা আর কতবার আমি প্রতারিত হবো?"

কন্ঠস্বরে বেজায় উত্তাপ আদ্রিনের।তৃপ্তি উল্টো হাতে গাল মুছে।প্রশ্ন করার পূর্বেই আদ্রিন জবাব দেয়,

--"তোকে মারলে,আমি শেষ হবো এটা চাচা জানতো।চাচাকে আমি শাস্তি দিবো কিভাবে?"

তৃপ্তির পা হতে জমিন সরে।অতীতের এবং আজকের সকল ঘটনার সাথে রাফির বাবা জড়িত?কি ক্ষতি করেছে তৃপ্তি তার?কোনোদিন মেয়েটা তাদের সাথে নজর মিলিয়ে কথা বলেনি।তাহলে!নিজের ভাইয়ের ছেলের সর্বনাশের জন্যে একজন নিরীহ মানুষের প্রাণ নিতে তার দ্বিধা হয়নি?বিবেকে বাঁধা দেয়নি?

--"রাফির বাবা সবটা করেছে?আপনার ক্ষতির জন্যে আমাকে মারতে চেয়েছে!"

--"মেহেবুবা,কাঁদে না আর।দেখি,চোখ লাল হচ্ছে রে জান।"

আদ্রিন সযত্নে তৃপ্তির চোখের পানি মুছে।মস্তিষ্কে উন্মাদনা কমে এখন প্রশ্ন উত্তরের খেলা ঘুরছে তার।পরপর তৃপ্তির ভেজা গালে অধর ছোঁয়ায়,

--"আপুকে বলছি তোমার সাথে থাকতে।আমি বেরুচ্ছি।"

আদ্রিন উঠে পড়ে দ্রুত।নিজের এলোচুলে হাত বুলায়।

তৃপ্তি দূর্বল দৃষ্টিতে তার পানে চেয়ে।লম্বা কদমে আদ্রিন দরজার নিকট পৌঁছায়।দরজা খুললে তার মা,বোন, চাচিরা,তৃপ্তির বাবা,অর্ক সকলকে আসতে দেখে।আদ্রিন ঠাই দাঁড়িয়ে।তাকে উপেক্ষা করে সকলে তৃপ্তির ধারে যায়।ইনায়া তাকে বুকে টেনে নেয় মোলায়েম ভঙ্গিতে।তৃপ্তির সুমিষ্ট ব্যবহার,আদ্রিনের প্রতি,তার প্রতি,সেই পরিবারের প্রতি যত্ন,ভালোবাসায় সিক্ত হওয়া পর্যবেক্ষণ করে ইনায়া।বর্তমানে,তৃপ্তিকে সে রিয়ানার মতো স্নেহভরা, মাতৃত্বের নজরে দেখে।

তৃপ্তিকে একপাশ হতে জড়িয়ে ইনায়া প্রশ্ন করে,

--"এইসব কিভাবে হয়েছে?"

--"চাচু করেছে। রাফি বললো।শুরু থেকে এখন অব্দি সব রাফির বাবা করেছে।উনাকে চাচার খেতাব থেকে আমি বঞ্চিত করলাম।"

আদ্রিন কথা শেষে হাত মুঠ করে।অদ্ভুত ক্রোধ তার শরীর চেপে।

--"সে এখন কই? রাফি কিভাবে জানলো?"

--"বাড়িতে তার বাবার অফিসে যাচ্ছিলো রাফি।দরজায় দাঁড়ালে তৃপ্তিকে শুট করার প্ল্যান,আগেও মারার প্ল্যানে ফেইল হওয়া,আমার কোম্পানিতে জালিয়াতি করানো,ইন দা এন্ড আমাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার সকল পরিকল্পনা শুনে রাফি।"

মিনা সকল কিছু শুনে সশব্দে কেঁদে উঠে।লোকটা পাষাণ ছিলো বিয়ের পর হতে।গায়ে হাত উঠাতো,মিনা সব সহ্য করতো।সবকিছু একদিকে থাকলেও,সেই লোক ঘরের মানুষকে মারতে চেয়েছে এটা অবিশ্বাস্য তার নিকট।

রাফি রুমে এলে,সম্পূর্ণ ঘটনা ব্যাখ্যা করে সকলের নিকট।

রাফির বাবাকে বাড়ির গার্ডরা বন্ধী করেছে ইনায়ার নির্দেশে।

--"আম্মি,তুমি আমার সাথে এসো।আপু,তৃপ্তিকে কিছু খেতে দাও।আমার জন্যে ডিনারে অপেক্ষা করে সে কিছু খায়নি আমি জানি।"

দৃষ্টি দেয় আদ্রিন তৃপ্তির সত্তায়।মেয়েটা বুকের সাথে হাঁটু মুড়ে রেখেছে। নাক,চোখ একেবারে মরিচের রং তার।

--"মিনা,অপরাধীকে শাস্তি দিতেই হবে।হোক না সে পরিবারের কেউ।"

অহেতুক উক্তি দেয় ইনায়া।এটা কেবল যুদ্ধের আগমন বার্তা ছিলো।মিনা মাথা নেড়ে সায় দেয়।এতদিনের পাপের জন্যে মিনা শাস্তি না দিলেও আদ্রিন,ইনায়া দিক তাকে উচিত শিক্ষা।

--"কাঁদবে না আর।খেয়ে ঘুমিয়ে যাবে।"

তৃপ্তিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আদ্রিন বেরিয়ে যায় মায়ের সাথে।ইনায়া ছেলের মস্তিষ্ক সচল রাখতে নানান বাণী শোনাচ্ছে।তবে, আদ্রিন সেসব কিছু পালন করবে নাকি জানেনা ইনায়া।মহিলার মন দুরুদুরু।এই প্রথম ঘরের মাঝে অপরাধীর সম্মুখীন হবে সে,যে কিনা তার মানিকের হৃদয়কে হ'ত্যা করতে চেয়েছে!

আদ্রিনরা যেতেই রিয়ানা খাবার আনে। রাফি তার মাকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে।বাবার জঘন্য রূপে সে বাকহীন।মাকে সামলানো তার কাছে প্রধান।

অরিত্রন নিজ হাতে মেয়েকে খাবার খাইয়ে দেয়।রিয়ানা তৃপ্তিকে শোয়ার জন্যে উদ্যত হলে অরিত্রন বলে,

--"তৃপ্তি,বাড়ি চল মা।তোকে এইখানে রাখতে আমার অন্তর সায় দিচ্ছে না।"

কান্নার ফলে তৃপ্তির আঁখি এখনো জ্বলছে।তার চোখ সমানে ভার। ঘুমও আসছে হঠাৎ।বাবার কথায় বিচলিত হয় সে।আদ্রিন বাড়ি এসে তাকে না পেলে বাবার সাথে কেমন ব্যবহার করবে জানেনা তৃপ্তি। অস্পষ্ট স্বরে সে জবাব দেয়,

--"বাবা আমার প্রচুর ঘুম পাচ্ছে।তোমরা সবাই খেয়ে যেও।আমি এইখানে ঠিক আছি।"

অরিত্রন মেয়ের কষ্ট,ভয়,শঙ্কা বুঝে।মেয়ের পানে এসে তার কাঁধে হাত রেখে বলে উঠে,

--"ঘুমিয়ে পড় তাহলে।আজ আর নিমন্ত্রণ খেলাম না।বাড়ি ফিরবো।অন্যদিন নাহয় আনন্দের সাথে সব হবে।"

--"খেয়ে যাও বাবা,প্লিজ।"

তৃপ্তি অনুরোধ করে বাবাকে।বাবার মন মেয়ের দুঃখ দেখতে অপ্রস্তুত।তাই মেয়েকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে নিচে নামলেও,খেলো না কিছু।পরিবার নিয়ে বাড়ি ফেরত যায়।সকলের মন আজ বড্ড নিষ্প্রাণ।

তৃপ্তির আর খবর হয়নি।সে আধ শোয়া অবস্থায় ঘুমে হেলে পড়লে রিয়ানা তাকে ধরে শোয়ায়।এর মাঝে আলেয়া আসে রুমে,

--"তৃপ্তি ঘুমিয়ে?"

--"হ্যাঁ,আলেয়া।ওর বাবারা চলে গিয়েছে?সকলে খেয়েছে?"

--"তৃপ্তির বাড়ির কেউ খায়নি।বাদবাকি আপনার বাড়ির,শ্বশুরবাড়ির সকলে খেয়েছে।দাদু চেঁচামেচি করছে জাস্ট।"

আলেয়া জবাব দেয়।

--"ওহহ।"

ভাবুক হয় রিয়ানা। হাসিখুশির মাঝে এমন দুঃখকর পরিবেশ সহ্যের বাহিরে। রাতের খাবারে তার মন নেই।মন তার মা এবং ভাইয়ের নিকট।কি হচ্ছে সেথায় জানেনা মেয়েটা।ফোন করেও লাভ কি!

সাফা আসে রুমে।রিয়ানা তাকে কোলে তুলে।আলেয়া হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে শুধায়,

--"আমি বাড়ি ফিরছি আপু।"

সাফার পিঠে হাত বুলিয়ে রিয়ানা উত্তর দেয়,

--"গাড়ি আছে নিচে।যেকোনো একজন ড্রাইভারকে বলবে ড্রপ করে দিতে তোমাকে।রাতের বেলা একা যাওয়া সেফ না।"

--"ঠিক আছে আপু।"

আলেয়ার প্রস্থান ঘটে।রিয়ানা সাফাকে নিয়ে শুয়ে পড়ে তৃপ্তির সন্নিকটে।তৃপ্তির দূর্বল মুখশ্রী রিয়ানার সত্তাকে আরো চিন্তিত করছে।

৭৯.

বিচারকার্য সম্পূর্ণ সামলায় ইনায়া।কতবার যে আদ্রিন উত্তেজিত হয়ে রাফির বাবাকে আক্রমন করতে চেয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।ভাগ্যিস,ইনায়া ছিলো সাথে।নাহলে তৃপ্তির এই উন্মাদ প্রেমিক পুরুষের দ্বারা আজ বিরাট পাপ হওয়ার শতভাগ নিশ্চয়তা ছিলো।নিজেদের পরিচিত অফিসার এবং এডভোকেটকে কেসের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।শুটার এবং সীনুর বিভিন্ন স্বীকারোক্তি অনুযায়ী রাফির বাবাকে গ্রেফতার করা হয়।মামলা টুকে দেয় সহস্র।ইনায়া সহজেই দমে যাবে না।নিজের ছেলে এবং ছেলের বউকে নিঃশেষ করতে চেয়েছে যে জন,তাকে কিভাবে ছাড় দিবে!

মায়ের কাজে আদ্রিন খুশি।তবে নিজ হাতে শাস্তি না দিতে পারায় আপাতত মায়ের সাথে কথা বন্ধ করেছে সে।

বাড়ি ফিরছে দুইজন একসাথে।ছেলের গম্ভীর মনোভাব লক্ষ্য করে ইনায়া বলে,

--"মন খারাপ করবে না।"

--"করবো না কেনো?আমি পানিশমেন্ট দিতে পারিনি।"

আদ্রিনের কণ্ঠ আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত।কপালে দুই আঙ্গুল ঠেকে হালকা ঝুঁকে বসে।ক্রোধে তার মস্তিষ্কে অন্যরকম উত্তেজনা।

--"তুমি তার ক্ষতি করলে উল্টো তোমার উপর কেইস হবে। ধৈর্য্য ধরো।তোমার এখন কিছু হলে,তৃপ্তির কি হবে?মেয়েটা ভয় পেয়েছে দেখো নি?তুমিও জানো,মেয়েটা জগতের সামনে অনেক স্ট্রং হলেও;তোমার বেলায় মেয়েটা সবচেয়ে দূর্বল।"

ইনায়া ছেলেকে বুঝানোর চেষ্টায়।আদ্রিন আর কিছু আওড়ায়নি। চুপটি করে বসে।তৃপ্তির কথা স্মরণে এলে আজকের দৃশ্য ভাসে স্মৃতিতে।আরেকটু অসচেতন হলে তৃপ্তির অবস্থা কেমন হতো? ভাবতে চায় না আদ্রিন। ঘাড় বাঁকিয়ে বাহিরের তিমিরের পানে চেয়ে সে।ঘর ফিরে তৃপ্তির মাঝে নিজ অস্তিত্ব বিলীনের অপেক্ষায় সে।

বাড়িতে ফিরে ইনায়ার সহিত রাতের খাবার সাড়ে আদ্রিন।দাদী ব্যতীত বাকি সকলে ঐ বাড়িতে ফিরেছে।খাবার শেষে আদ্রিন নিজ কক্ষে যায়।সাফা এবং রিয়ানা তৃপ্তির সাথে তন্দ্রাসক্ত। রুমে জ্বলন্ত সোনালী আলোয় জ্বলজ্বল করছে বিছানার কিনারায় শোয়ারত তৃপ্তির অবয়ব।আদ্রিন হাত মুখ ধুয়ে আসে।তৃপ্তির ধারে যায়।তার বরফ হাত মেয়েটার গালে স্পর্শ করলে তৃপ্তি নড়ে উঠে।আদ্রিন নাক ছোঁয়ায় তৃপ্তির গলায়।আরো কুকিয়ে যায় মেয়েটা।তবে,ঘুম ভাঙলো না।এমন গভীর ঘুমে তৃপ্তি খুবই কম থাকে।ভাবুক আদ্রিন মেয়েটাকে আর জ্বালায়নি,নিজে কাপড় বদলে সোফায় গা এলিয়ে দেয়।তার বলিষ্ঠ শরীর সোফায় ফিট না হলেও, অন্যরুমে যায়নি সে। তৃপ্তির অবয়বে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বসে রয় আদ্রিন।সময়ের পাল্লার সাথে তার আঁখি পল্লবও ভারী হয়।ঘুমিয়ে পড়ে আদ্রিন সোফায়।

...........

ভোরের দিকে রিয়ানার ঘুম ছুটলে সে আদ্রিনকে আড়ষ্ট অবস্থায় দেখতে পায়।মুহূর্তেই অপরাধ অনুভব করে রিয়ানা।তার রাতে ঘুম কেনো ভাঙলো না! ভাইটা নিশ্চয় সোফায় বেশ অস্বস্তিতে মুড়িয়ে ছিলো রাতভর।সোফায় তার অবয়ব মোটেও স্বস্তি লাভ করবে না। সর্বপ্রথম রিয়ানা সাফাকে অন্য কামরায় রাখে।পরপর সে এসে আদ্রিনকে ডাকে,

--"ভাই,উঠে পড়।বিছানায় গিয়ে ঘুমা।"

এক ডাকে আদ্রিন উঠে। ঘাড়ে চিন চিন পীড়া।

বিছানায় সাফাকে দেখতে না পেয়ে আদ্রিন বলে,

--"ঘুমিয়ে নিলে পারতে। সাফাকে সরিয়েছো কেনো?"

--"যা যা বিছানায়।আমি গেলাম।"

রিয়ানা দরজা বন্ধ করে।

আদ্রিন আড়মোড়া ভাঙে।পরিহিত টি শার্ট একটানে খুলে।অবশেষে শায়িত হয় তার প্রাণ ভোমরার সংস্পর্শে।ভোরের দিকে শীতের আবাস বেশি অনুভব হয়।উষ্ণতা পেয়ে তৃপ্তি আরো লেপ্টে যায় আদ্রিনের অবয়বে।আদ্রিন হাসে সাথে শঙ্কিত।তার প্রাণকে জড়িয়ে নেয় সন্তর্পনে।চুলের ভাঁজে মুখ গুঁজে শান্তির নিঃশ্বাস টানে আদ্রিন।বিড়বিড় করে আওড়ায়,

--"আমার প্রশান্তিকে কখনোই কষ্ট পেতে দিবো না,মেহেবুবা।তুমি সুখী হও সারাজীবন আমার সাথে।"

----------------

গায়ে চাদর জড়ানো তৃপ্তির।শীতের অবস্থা করুণ।এক দিনেই যেনো হুহু করে শীত বেড়েছে।তৃপ্তির সত্তা নড়বড়ে।মাথাটা ভার।গতরাতের ক্লান্তিতে হয়তো তার এমন কাহিল অবস্থা।ক্লান্ত হাতে নাস্তা তৈরিতে মগ্ন।আদ্রিন এখনো ঘুমে বেখবর।উঠলে নিশ্চয় অফিসে যেতে তাড়া দিবে!সাফা উঠেছে কেবল।সে মামীর পিছে পিছে হাঁটছে।তৃপ্তি চায়ের ফ্লাস্কে চা ঢালে,নাস্তার প্লেটে নাস্তা সাজায়।সার্ভেন্ট সেসব টেবিলে নিয়ে যাচ্ছে নির্দেশনা অনুযায়ী।

কাজ শেষে সাফাকে নিজ কোলে উঠায় তৃপ্তি।অল্পতে হাপিয়েছে সে।দুজনে নাস্তার টেবিলে যায়,খেতে আরম্ভ করে।হুট করেই যেনো তৃপ্তির সকল খিদে ভর করেছে উদরে।

--"খাও,মন ভরে খাও।আমার ছেলে কি অবস্থায় আছে আল্লাহ্ জানে।শুরু থেকে যদি নাতির কথা না ভেবে তোমাকে মেনে না নিতাম তাহলে আজ আমার পরিবার ঠিক থাকতো।"

আদ্রিনের দাদী বেশ জোরে চিৎকার করে।তৃপ্তি হাত কাঁপে। হাতে থাকা পরোটা টেবিলে পড়ে। ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে ফিরলে দাদী ফের বলে,

--"এই মেয়ে তুমি যাও।এই বাড়ি থেকে যাও।"

তৃপ্তি কিংকর্ত্যবিমূঢ়।দূর্বল কণ্ঠে শুধায়,

--"কই যাবো দাদী?আপনি কিসব বলছেন?"

--"শুনো মেয়ে,শুরু থেকে তোমাকে আমার পছন্দ না।কিন্তু,আমার নাতির জন্যে মেনে নিয়েছিলাম।এখন দেখছি সব ভুল আমার।তুমি মেয়েটা ভালো না।তোমার কারণে আমার পরিবারের এমন অবস্থা।"

দাদীর কথা কর্ণগুচর হয় ইনায়ার।সে থামেনি। চিল্লিয়ে বলে,

--"আপনি যা তা বলছেন এখন।তৃপ্তি কি করেছে? যা করেছে আপনার ছেলে করেছে।পরিবারের এমন অবস্থার জন্যে আপনার ছেলে দায়ী। কাল তো মেয়েটা মরেই যেতো।তখন আমার ছেলের কি হতো?নিষ্পাপ মেয়েটার প্রাণই বা কেনো খোয়াতো?"

--"আমি এই মেয়েকে আর আমার ঘরে নিবো না।এই মেয়ের জন্যে আমার অন্য নাতি বাবা হারা হয়েছে।তার বাবা এখন জেইলে।"

আদ্রিনের দাদী খেঁকিয়ে উঠে।

--"আচ্ছা।যাবে না আমার বউ তোমাদের বাড়িতে।আমার বউ আমার বাড়িতে থাকবে।এতো নাতি নাতি করছো,তোমার এই নাতির কষ্টের ব্যবসায় রাফির বাবা শেষ করতে চেয়েছে সব।আল্লাহ্ এর রহমত বলতে পারো,আমি দমে যায়নি।বাদ বাকি,আমার বউকে যেনো কিছুতে দোষ না দাও।"

আদ্রিন দাঁড়িয়ে।পড়নে টিশার্ট, স্পোর্টস প্যান্ট।

সেদিকে একনজর তাকিয়ে তৃপ্তি মাথা নিচু করে।আঁখিতে জল তার।আজকাল তার ইচ্ছে করে না প্রতিবাদ করতে।

--"হ্যাঁ,এখন বউয়ের পেছনে থাকবে তুমি।এই মেয়েকে ছাড়ো।অন্য মেয়ে দেখবো তোমার জন্যে।যে মেয়ে আমাদের পরিবারকে বেঁধে রাখবে।"

দাদীর কথায় আদ্রিন বাঁকা হাসে।হেঁটে যায় তার মেহেবুবার পানে।ঝুঁকে মেয়েটার গালে অধর ছোঁয়ায়। দাদীর নজর বিস্ফোরিত। তৃপ্তি নিজেও হতবাক। গালে হাত রাখে। যদিও সে দাদীর কথায় চিন্তিত,তবে আদ্রিনের এহেন কাজে সে লজ্জিত। মায়ের,দাদীর সম্মুখে কিসব কাজ?

তৃপ্তির মাথা আদ্রিন নিজের উদরের একপাশে চেপে ধরে বলে,

--"এই মেয়ে ছাড়া আমি শেষ। একদম ফিনিশ।তোমার অন্য মেয়েকে তোমার অন্য নাতিকে বিয়ে দাও।আমার সারাজীবনের জন্যে এই মেয়ে যথেষ্ট।এইখানে মেহমানের মতো আসবে,খাবে,থাকতে মন চাইলে থাকবে।কিন্তু,আমার বউকে কিছু বলা যাবে না।আমি সহ্য করবো না।"

--"এই মেয়ের জন্যে আজ আমাকে....!"

দাদীর কথা সম্পূর্ণ হতে না দিয়ে আদ্রিন ফের বলে,

--"বাধ্য করেছো তুমি। আম্মি আমি চাই,আমরা এই বাড়িতে থাকি। ঐ বাড়ি হতে আমার মন উঠেছে।"

তৃপ্তি ছটফট করে।তবে,আদ্রিনের হেলদুল নেই।সে আয়েশী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে কর্কশ ভাষায় কথা বলছে।

--"তুমি যা বলো তাই হবে,আদ্রিন।মা,আপনি খেয়ে যাবেন।"

ইনায়ার কণ্ঠে তাচ্ছিল্য।শাশুড়ি কিভাবে পারলো তার ছেলেকে অন্য মেয়ের কথা বলতে?ব্যাপারটা হজম হচ্ছে না তার।

দাদীর স্থায়ীকাল তখনই ফুরিয়ে যায়।হনহনিয়ে প্রবীণ মহিলার প্রস্থান ঘটে।বুকের মাঝে তার শত প্রতিহিংসা।

--"এইবার ছাড়ো মেয়েটাকে।খেতে দাও।"

হাসে ইনায়া।তৃপ্তির গাল তখনো জলে ভিজে।সে জানে আদ্রিন তার জীবনের সবকিছু।দাদী কিভাবে পারলো এমন বাক্য বলতে?

--"কাদঁছো কেনো?ইদানিং বেশি কান্নাকাটি করছো তুমি!"

আদ্রিন চেয়ার টেনে বসে।

তৃপ্তি নিজেও জানে না এর কারণ।এটা সত্যি,আগে থেকে সে অতিরিক্ত কান্নাকাটি করে।সাথে নিজের শক্তপোক্ত তৃপ্তির রূপটাও কোথায় বিলীন হয়েছে।

--"আহহ,অনেক হয়েছে।মেয়েটাকে আর কিছু বলো না।"

ইনায়ার কথা শেষ হতে না হতে রিয়ানার আগমন ঘটে।সে মাকে জিজ্ঞাসা করে,

--"দাদী কই?পরিবেশ এমন কেনো?"

--"আজ থেকে তোমার বাবার বাড়ি,ভাইয়ের বাড়ি,মায়ের বাড়ি সব এটাই। ঐ বাড়িতে আমরা শুধুই মেহমান।"

ব্রেডে বাটার লাগানো অবস্থায় জবাব দেয় আদ্রিন।

_________________

রিয়ানা শ্বশুরবাড়িতে ফিরেছে দুদিন।তৃপ্তি ঘরে একা।ইনায়া আজ ফিরবে না।সে কক্সবাজারে নিজেদের পার্টির কাজে।আদ্রিন অফিসে।নিচের ঘরে অবশ্য সার্ভেন্ট আছে।তৃপ্তি ক্লাসের নোট বানায়।সামনে তার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা।এইসবের পাশাপাশি ছোট্ট ব্যাবসার কিছু টুকটাক কাজ সারছে।তীব্র পেট ব্যাথায় সবকিছু গুলিয়ে আসছে তার।কিছুক্ষণ রুমে হাটাহাটি করে।রাতের খাবারও খেয়েছে বিনা আদ্রিনের উপস্থিতিতে।এমন খিদে তার কয়েকদিনের সাথী।রাজ্য খেয়ে ফেলবে তৃপ্তি,এমন অবস্থা হয় তার।রুমে কিছুক্ষণ পায়চারি করে সে।হঠাৎই,মাথায় ভূত চাপে। রুমে বিদ্যমান বইয়ের শেল্ফ গোছাতে উদ্যত হয়।এইদিকে শীতও বেশ।গায়ে চাদরটুকু নেয়নি।একে একে সব বই নামাতে আরম্ভ করে।

মেঝেতে ছড়িয়ে রাখে বইসমূহ।পরপর সাজিয়ে রাখছে শেল্ফে।

আদ্রিন অফিস হতে ফিরে। হাতে হাত ঘষে।বাহিরে প্রচুর কুয়াশা।তৃপ্তির এমন করুণ রূপ দেখে ভ্রু কুঁচকে যায় তার।মেয়েটার কি শীত নেই?

--"এই?চাদর কই?শীত লাগছে না?"

তৃপ্তি পেছনে বাঁক ফিরে।আদ্রিন অফিসের ব্যাগ আলমিরায় রাখে।কালো সবুজ রঙের সোয়েটশার্টে লোকটাকে কি মনোরম লাগছে! তৃপ্তি স্নেহভরা নজরে চেয়ে রয়।

এদিকে বারংবার তৃপ্তি নড়াচড়া করার কারণে তার শাড়ির আঁচল সামলাতে বেগ পাচ্ছিলো।তাই আঁচল উঠিয়ে রাখায় তার শুভ্র উদর দৃশ্যমান।মেয়েটার চমকিত রূপ আদ্রিনের সত্তায় আগুন ধরায়।

--"লাগছে না তো।"

তৃপ্তি হাসে।পরক্ষণে আদ্রিনের দৃষ্টি অনুসরন করলে সে দ্রুত শাড়ি ঠিক করে বলে,

--"কাজ করছিলাম।তাই খেয়াল ছিলো না।"

আদ্রিন তার গায়ের সোয়েটশার্ট খুলে।হাত দ্বারা বাতাস করে,

--"তোমাকে দেখে আমারই গরম লাগছে।"

তার কণ্ঠে মাদকতা।বড্ড রোমাঞ্চকর।তৃপ্তি পেছালে আদ্রিন এগিয়ে আসে।

হুট করে মেয়েটাকে কোলে তুলে।তৃপ্তি তার ঘাড় জড়িয়ে,

--"এইসব কি?কাজ আছে,দেখছেন আপনি।"

--"আমি তোমার কাছে এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।"

আদ্রিন তৃপ্তির ললাটে নিজ ললাট ঠেকায়।

--"আপনার কি খিদে নেই!"

--"তুমি ছাড়া এখন জরুরি কাজ একটাও নেই।"

তৃপ্তির কিছু বলার বাকি নেই।আদ্রিন সুযোগই দেয়নি।

তৃপ্তির ঘুমন্ত মুখশ্রী অবলোকন করা আদ্রিনের প্রিয় কাজ।দিনদিন মেয়েটা তার মাদকতার ফোয়ারা হচ্ছে।মেয়েটার মাঝে কি এমন আছে,এটাই আদ্রিনের অজানা।তবে,আদ্রিন এটা জানে,তৃপ্তি ব্যতীত তার কোনো অস্তিত্ব নেই।

মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে ঘুমিয়ে। পেরেশানিতেও তৃপ্তি মারাত্মক রূপবতী।ঘুমানোর আগে বলেছিলো তার পেটে ব্যথা হচ্ছিলো।স্বাভাবিক ভেবে আদ্রিন আর মাথা ঘামায়নি।এখনো ব্যাপারটা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে।তৃপ্তিকে টেনে নেয় নিজ বক্ষপিঞ্জরে।তৃপ্তির হাত উঠিয়ে নিজ উদরে রাখে।সেই হাত আবার উচুঁতে তুলে চুমু দেয়।ফিচেল কণ্ঠে বলে,

--"আমার সচক্ষে আমি প্রশান্তি দেখেনি তৃপ্তি,তবে তোমায় দেখেছি।"

চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন