ক্রাশ কনফেশন
লেখাঃ আফিয়া আপ্পিতা
পর্ব-১৩
"শ্যামবতা প্লিজ! আমি আর জীবনে ও হাঁসের মতো প্যাঁকপ্যাঁক করবো না। এবারের মতো ছেড়ে দিন। আমি হাঁসের খামারে যাবো না। প্লিজ শ্যামবতা!"
অনুরোধের ভান্ডার খালি করে বললাম শ্যামবতাকে। চিড়িয়াখা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় দাঁড়ানোর পর আমি শ্যামবতাকে জিজ্ঞেস করলাম,
"শ্যামবতা আমরা কোথায় যাচ্ছি?"
রাস্তার দিকে তাকিয়ে থেকেই শ্যামবতার সাবলীল উত্তর,
"হাঁসের খামারে যাচ্ছি।"
শ্যামবতার কথা শুনে তার কুটনৈতিক বুদ্ধির আন্দাজ করে ফেললাম আমি। বুঝতে পারলাম,শনি আবার প্রকট হচ্ছে আমার উপর। তাই এই জোরালো অনুরোধ। আমার অনুরোধভরা কথায় শ্যামবতা আমার দিকে চাইলেন। আমি চেহারায় একরাশ অসহায় আর আকুতি ঢেলে দিয়ে কান ধরে শ্যামবতার দিকে তাকিয়ে বললাম,
"সরি। আর কখনো আপনার কথার অবাধ্য হবো না। তাও আমাকে খামারে নিবেন না। প্লিজ শ্যামবতা! প্লিইজজ!"
শ্যামবতা তার চেহারায় রাগ ঢেলে দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। যেন ম্যাগি নুড়লসের মতো ঝটপট রেঁধে খেয়ে ফেলবেন। আমি ঢোক গিললাম। ভয়ে হাত পা কাঁপছে আমার। কান থেকে হাত ছাড়িয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি জানি এখন শ্যামবতা আমাকে মারবেন তারপর টেনে নিয়ে যাবেন খামারে। আমার অনুভূতির মূল্য তার কাছে নেই কিনা! চড়ের অপেক্ষাকালীন সময়েই শ্যামবতার কর্কশ গলা ভেসে আসলো,
"হ্যা আসছি । বললাম তো আসছি। "
কোথায় যাবেন শ্যামবতা! খামারে! ভেবেই অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো আমার। আমি মাথা তুলে শ্যামবতার দিকে অসহায় চোখে চাইলাম। দেখলাম শ্যামবতা ফোন কানে দিয়ে কথা বলছে। আমাকে তাকাতে দেখে ফোন রেখে শ্যামবতা বিরক্ত কন্ঠে বললেন,
"চল।"
আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম,
"ক্কোত্থায়ায়ায়?"
"বাসায় চল । কল আসছে বলে বেঁচে গেলি। না হয় আজ খামারে বুকিং দিয়ে আসতাম। তোকে দিয়ে ডিম পাড়িয়েই ছাড়তাম। ডেম ইট।"
বলে রেগে হনহন করে হাটা ধরলেন। আমি ও শ্যামবতাকে অনুসরণ করলাম। গাড়িতে উঠে কেউ কারো সাথে কথা বললাম না। শ্যামবতা চোখ তার ফোন আর আমার চোখ কখনো কাচের গ্লাসটা দিয়ে বাইরে তো কখনো শ্যামবতার শ্যামবর্ণের মায়াভরা চেহারায় আবদ্ধ। ফেরার পথে ড্রাইভারকে বলে গাড়ি থামিয়ে কি কি জানি কিনে আনলেন। প্যাকেট করা বিধায় বুঝতে পারলাম না। গাড়ি শ্যামবতাদের বিল্ডিংয়ের পার্কিং লটে পার্ক করলো ড্রাইভার। আমি গাড়ি থেকে নেমে আমার বাসার উদ্দেশ্যে হাটা ধরলাম। দু'কদম বাড়াতেই শ্যামবতা আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমি ভ্রু কুঁচকে তাকালাম তার দিকে। শ্যামবতা বাঁকা হেসে বললেন,
"কিরে বিয়ে করে সংসার না করে বাপের বাড়ি চলে যাবি? তোর স্বাদের সংসার করবি না? দেনমোহর নিবি না?"
আমি অসহায় চেহারায় শ্যামবতা দিকে তাকালাম। শ্যামবতার সাথে সংসার করবো! ইম্পসিবল! আমি মরেই যাবো। পরে মরা থেকে আগে মরা ভালো। এই ভেবেই আমি মিনমিনে গলায় বললাম,
" চারদিন পর থেকে আমার টেস্ট এক্সাম। প্রিফারেশন নেয়া বাকি এখনো। তাই আমার বাসায় যাওয়া জুরুরি। আমি বাসায় যাবো।"
" চল শ্বশুর বাসায়। সংসার আর বিয়ের স্বাদ মিটিয়ে নে। সবচেয়ে বড় কথা হলো আমি দ্রুত দেনমোহর ক্লিয়ার করতে চাই। তার জন্য তোকে দরকার। তুই আমার বাসায় থাকলে ক্লিয়ার করতে সুবিধা হবে। তোর এক্সাম শেষ হতে হতে দেনমোহর ক্লিয়ার হয়ে যাবে। তারপর আমি ধুমধাম করে বিয়ে করবো। নিজের বিয়েতে তো দাওয়াত পাস নি। আমার বিয়েতে মজা করার সুযোগ পাবি। তার জন্য হলেও বাসায় চল। আর রইলো পড়াশোনা, তার জন্য তো বেত আর হাত নিয়ে আমি রেড়ি আছি। দেখবি এবার তুই প্লাস পাবি। "
বলে আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে টেনে নিয়ে গেলেন। সদর দরজার কাছে এসে কলিংবেল বাজাতে বাজাতে আমার দিকে ফিরে বললেন,
"বাসায় আসছিস ভালো কথা। উল্টোপালটা কোন কান্ড করবি তো সোজা খামাবে দিয়ে আসবো। আর কোন এক্সকিউজ শুনবো না। আমার সব কথা মেনে চলবি। মনে থাকবে?"
আমি মেঝের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ালাম। যার অর্থ থাকবে। তখনি শ্যামবতার ধমক কানে এলো।
" পঞ্চাশ কেজি ওজনের নারিকেলের মতো মাথা কেনো নাড়াচ্ছিস! মুখ দিয়ে উত্তর দিতে পারিস না? বড়দের সাথে বেয়াদবি করিস? চল তোকে এক্ষুনি খা....
বাকিটা বুঝে গিয়ে আমি সাথে মাথা তুলে মিনমিন গলায় বললাম,
"আপনার বলা সব কথা মনে থাকবে আমার। আমি আপনার সব কথা মেনে চলবো। বড়দের সাথে কোন বেয়াদবি করবো না। এবং আর কখনো মাথাও নাড়াবো না। "
আমার কথার উত্তর শ্যামবতা ভ্রু কুঁচকে কিছু বলতে নিলো ঠিক তখনি খট করে দরজা খোলার আওয়াজ আসলো কানে। আমি হাফ ছাড়লাম। এই যাত্রায় খামারে যাওয়া থেকে বেঁচে গেছি।
"আরে ভাইয়া ভাবি এসেছিস তোরা? কেমন কাটলো দিন?" এক রাশ হেসে বলল আমার একমাত্র ননদ ওরফে বান্ধবী দিতিয়া। আমি দিতিয়াকে দেখতেই কাঁদোকাঁদো চেহারা বানিয়ে দিতিয়াকে জড়িয়ে ধরতে গেলাম। কান্নারা যেন দল পাকিয়ে আসছে। এতক্ষণের সব কষ্টরা এবার কান্না হয়ে ঝরবে। কিন্তু সেখানেও স্বাধীনতা নামক শব্দটা নেই। শ্যামবতাকে রাগী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমাকে থেমে যেতে হলো সেখানেই। আমি আবারো রোবটের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। দিতিয়া আমাকে ঝাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
"আর ইউ অভিহা! তুই এত শান্ত হয়ে গেলি কিভাবে! "
জবাবে আমি মাথা তুলে ওর দিকে অসহায় চোখে তাকালাম। দিতিয়া কিছু বলতে গেলো তার আগেই এক রাশ বিরক্তি নিয়ে শ্যামবতা বললেন,
"মাকে বলিস তার ডিমপায়ী পুত্রবধূকে তার বাসায় এনেছি। আমাকে যেন আর ব্ল্যাকমেইল না করে। জরিনারা অপেক্ষা করছে। আমি যাচ্ছি। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। যত্তসব বিরক্তিকর।"
বলে যাবার জন্য পা বাড়ালেন শ্যামবতা। এদিকে শ্যামবতার কথা শুনে দিতিয়া অবাক হয়ে বলল,
"ডিমপায়ী পুত্রবধূ! কার কথা বলছে ভাইয়া?" দিতিয়া থামলো তারপর খানিক ভেবে বলল,
" মায়ের পুত্রবধূ মানে তো অভি...এই অভি তুই ডিম পাড়িস? ভাইয়া তোকে ডিমপায়ী বলল কেনো!"
আমি রেগে বললাম,
"এ আই ডিম হাইতাম জানি। তুই হাইবিনি? হিকবি আঁর তুন? আই এগান লোই টেনিং ও দিই। আঁর তুন টেনিং নিবি? নো নিলি বকবকাইবিনা। বেশি বোইকলে তোর ভাইর ঘিন তোর উচে উয়ামু। উল্লুক ভাল্লুক মতো মাইনষের লগে কিল্লাই যে বিয়া দিছে। মন চায় আঁচা মারি মাতার হর তুন। বেডা হিয়লের নায়ায়ানি থায় কেন্নে! লাগে কেচ্ছা? নিজেরে কিয়া মনে করে হে বেডায়? ভাব দেখলে ঘিনে গা খিতখিতায়। মন চায় ইজ্ঞা উন্ডানি দি। দেনমোহর হেতে নো আই দিমু হেতেরে। ধোরি ধোরি খালি চোবামু। চোবাইতে চোবাইতে দাঁত বেজ্ঞুন হালাই দিমু। হানি খাইবের দাঁত ও রাইখতাম নো। হিয়লের বাভাল,উল্লুক, বিলাই, হাপ, বিচ্ছু। "
দিতিয়ার দিকে তাকিয়ে রাগে গজরাতে গজরাতে নিজ ভাষায় শ্যামবতাকে কচকো সাবান দিয়ে ধোয়া হাত দিয়ে ধুয়ে দিচ্ছিলাম। শ্যামবতার রাগ সব ঝেড়ে ফেলছি। আমার রাগত চেহারার দিকে তাকিয়ে ভীত কন্ঠে দিতিয়া বলল,
"বইন দোহাই লাগে অনুবাদ কর। বুঝিনি আমি তোর এই ভাষা। জাস্ট দুটো শব্দ বুঝেছি, ভাই আর ভাল্লুক। তুই কি ভাইয়াকে গালি দিয়েছিস? ভাইয়া জানতে পারলে তোকে মিক্সার মেশিনে মিক্স করে ফেলবে। কি বলেছিস?"
আমি ভেংচি কেটে বললাম,
"তোর ভাইরে কনে ডরার? আই ডরাইনা। তোর ভাই কোন বাঘ না ভাল্লুক যে আই ডরামু? বেডারে তো হাইল্লে শীলেত্তে রাই দি উতা দি পিষি আলামু। লগে লাতি উন্ডানি তো ফিরিতে দিমু। উল্লুকের সর্দার আঁরে আইজ্জা যা ডর লাগাইছে কয় ডিম হাইবেল্লাই। হেতে হাইতো হারেন্না? আঁরে কিল্লাই কয়? আই কি কইছি? খালি ইক্কিনি কতা কইছি হিল্লাই খামারেত্তে থুই আইবের ডর লাগার। আঁতির মতো গতর লোই টো টো করে। হেতে থাইকতো হারেন্না?....
" বলা শেষ? "কোন পুরুষ কন্ঠে বলা এই দুটো শব্দ কানে আসতেই থেমে গেলাম আমি। দিতিয়ার দিকে তাকিয়ে বললাম?"
"এই দিতু তোর গলা এইচ্ছা বেডা বেডা লাগের কারে?"
দিতিয়া ইশারায় পিছন ফিরতে বলল। আমি ভ্রু কুঁচকে পিছন ফিরে ঢোক গিললাম। শ্যামবতা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। আমি মনে করতে লাগলাম এতক্ষণ আমি কি বলেছি। সব মনে করে ঢোক গিললাম আবার। কারণ আমি এতক্ষণ যা যা বলেছি তা যদি শ্যামবতা শুনে তবে আমি শেষ। আমাকে কাবাব বানাবে নিশ্চিত। মনে মনে দোয়া পড়ছি। যেন না শুনে। শ্যামবতা বললেন,
"এতক্ষণ কি বলছিলি? আর এটা কোন ভাষা!"
আমি হাফ ছাড়লাম। যাক শ্যামবতাও তবে নোয়াখালী ভাষা বুঝে না! না হয় আজ গিয়েছিলাম আমি। তবে একটা বিষয় ভাকো হলো এবার যখন তখন নোয়াখালী ভাষাতেই শ্যামবতাকে বকতে পারবো। শ্যামবতা বুঝবে না আর না ধরতে পারবে। ভেবেই মুচকি হাসলাম। শ্যামবতা আবারো বললেন,
"কী রে হাসছিস কেনো? উত্তর দে? আর কি বলছিলি অনুবাদ কর। আমি নিশ্চিত তুই আমার ব্যাপারে কোন বাজে কথা বলছিলি। "
আমি শান্ত কন্ঠে বললাম,
"কোনটা অনুবাদ করবো?"
"প্রথমে দিতিয়াকে যেটা বলেছিলি সেটা। হুবহু অনুবাদ করবি। " বললেন শ্যামবতা। আমি স্বাভাবিক গলায় বললাম,
"হ্যাঁ, আমি ডিম পাড়তে জানি। তুই পাড়বি? শিখবি আমার থেকে? আমি এই নিয়ে প্রশিক্ষণ ও দেই। আমার থেকে প্রশিক্ষণ নিবি তুই?"
"তারপর কি বলছিলি? উল্লুক ভাল্লুক, তোর ভাই, দেহমোহর। এই টাইপ কিছু। পুরোটা অনুবাদ করবি। বুঝেছিস? আবারো প্রশ্ন ছুড়লেন শ্যামবতা। আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম,
" তোর ভাইকে আমি ভয় পাই ভীষণ ভয় পাই। তুই আবার ভাবিস না তোর ভাই উল্লুক ভাল্লুক ভাবি বলে ভয় পাই। ছোটবেলা থেকে ভয় পেতাম। সেই ভয় এখনো কাটেনি। তবে তোর ভাই খুব ভালো মানুষ জানিস? কাল তো আমাকে দেনমোহর দিয়ে দিতে চাচ্ছিলো। আমিই নিই নি। স্বামী স্ত্রীর মাঝে এত ফর্মালিটি কিসের বল? এসবই বলছিলাম আমি। "
শ্যামবতা আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
"সত্যিই তুই আমার এত সুনাম করেছিস! তোর মুখে এত সুনাম ঠিক হজম হচ্ছে না। কোথাও তুই আমাকে বোকা বানাচ্ছিস না তো! এমন না তো যে তুই আমাকে বাজে কথা বলেছিস কিন্তু আমি বুঝিনা বিধায় তুই আমাকে উল্টাপাল্টা অনুবাদ করে বুঝাচ্ছিস? "
আমি ধরা পড়া থেকে বেঁচে যেতে বললাম,
"আরে না না শ্যামবতা। আমি কোন উল্টাপাল্টা কিছু অনুবাদ করিনি। সব ঠিকঠাকই বলেছি। আপনি যা তাই বলেছি। "
থেমে গিয়ে সুপারিশের জন্য দিতিয়াকে ঝাকিয়ে বললাম,
"কি রে দিতিয়া বল?"
আমার ঝাকির অর্থ বুঝতে পেরে দিতিয়া দ্রুত বলল,
"হ্যাঁ ভাইয়া ও ঠিক বলছে। তুই কোথাও গিয়েছিলি না? ফিরে এলি যে?"
শ্যামবতা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
"দেনমোহর দিতে আই মিন ফোন নিতে এসেছি। বাসায় ফেলে গিয়েছিলাম। "
শ্যামবতার মুখে 'দেনমোহর শুনে দিতিয়া ভ্রু কুঁচকালে ও আমি কথার অর্থ বুঝে ঢোক গিললাম। আর মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম আজ এক বালতি পানি রাখবো নিজের কাছে। তাহলে আর বদহজম হবে না। আমার ভাবনার মাঝেই আন্টি মানে আমার শ্বাশুড়ি এলেন সদর দরজায়। আমাকে দেখেই মুচকি হেসে বললেন,
" আরে বউমা যে আয় আয়! বাইরে দাঁড়িয়ে কেনো! ভিতরে আয়। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে। "
এই মহিলাই ছলনা করে আমাকে যমের হাতে তুলে দিয়েছিলেন ভেবে রাগ হলেও নিজেকে দমালাম। সামনে শ্যামবতা আছে কিনা। মা ভক্ত ছেলে মায়ের অপমান সইবে না। আমার উপরই শনির প্রকোপ ঘটাবে। তারচেয়ে বরং স্বাভাবিক থাকি ভেবেই শান্ত কন্ঠে বললাম,
"দিতিয়ার সাথে কথা বলছিলাম। যাচ্ছি ভিতরে। "
জবাবে আন্টি বললেন,
"যা দিপ্তর রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়। "
আমি সায় জানিয়ে হাটা ধরলাম। তাদের মা ছেলের কথা কানে এলো।
"এই দিপ্ত তুই কোথায় যাচ্ছিস?"
"হ্যাঁ একটু বাইরে যাচ্ছি। তোমার কথামতো তোমার বউমাকে ঘুরিয়ে এনেছি আর কিছু পারবো না। কোন আবদার করো না। আমার ফিরতে রাত হবে। চিন্তা করো না। "
"লাঞ্চে তোর শ্বশুর বাড়ির সবাই আসবে। কিছু বাজার করে দিয়ে যা।"
"তোমার বউমাকে বলো। সে ডিম এনে দিবে। ডিম যত রেসিপি আছে সব করো। আর ডিনার মেন্যুতে ইলিশ মাছ যেন থাকে। আমার প্লেটে আমি দুইটা ইলিশ মাছের মাথা দেখতে চাই।"
"ইলিশ মাছে মাথা! তাও দুটো! তোকে তো হাতে পায়ে ধরেও ইলিশ মাছের মাথা খাওয়ানো যায় না। আজ খাবি? "
"হ্যাঁ খাবো। শাদী নামক দিল্লীর লাড্ডু যেটা আমার কাছে চরম অখাদ্য ছিলো সেটা যেহেতু খেতে পেরেছি মাছের মাথা কেনো পারবো না? অবশ্যই পারবো। আর ইলিশ মাছে দুটো মাথা হবে তোমার পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করার ট্রিট।"
এটুকুর পর আর কিছু শুনিনি। কারণ আমি অলরেডি রুমে চলে এসেছি। রুমে এসে চোখ বুলাতে গিয়ে টেবিলের উপর তাকাতেই আমার ভয়ে অন্তর আত্মা কেঁপে উঠলো। টেবিলের উপর দুটো বেত,তিনটা স্কেল, দুইটা কম্পাস, একটা বিছানার ঝাড়ু, একটা ছেড়া সেন্ডেল, একটা হাত পাখার কাঠের হাতল। সব সাজানো পাশাপাশি। এই ভয়ংকর হাতিয়ার গুলোর উপরে একটা কাগজে লেখা,
"বউ সোজা করার জন্য মারের উপর কোন মেডিসিন নেই। খাইতে উইঠতে বসতে খালি মাইর আর মাইর। দেখবেন এক সপ্তাহে বউ কেঁচোর মতো সোজা হয়ে গেছে।
( পাগলা বাবা)"
এটা পড়ে আমি আরো ক্লিয়ার হলাম যে এইসব অস্ত্র আমার উপরই প্রয়োগ হবে। আমি চোখের সামনে নিজের দিকে আগত শনি দেখতে পাচ্ছি। আমি দোয়া পড়তে পড়তে ওয়াশরুমে চলে গেলাম।
**
দুপুরের মা বাবা আভান এলো। হাসি মজায় কাটলো সময়। বিকেলে তারা চলে যেতে আমি রুমে গিয়ে ঘুম দিলাম। সেই ঘুম ভেঙে বেশ রাতে শ্যামবতার ঝাকিতে। আমি চোখ ফিটফিট করে তাকিয়ে উঠে বসলাম। দেখলাম শ্যামবতা আমার পাশে একটা প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি এক মুহুর্তের জন্য নিজেকে সুখী মনে করলাম এই ভেবে যে শ্যামবতা আমার জন্য খাবার নিয়ে এসেছেন। হয়তো শুনেছেন আমি খাইনি। এখন নিশ্চয়ই শ্যামবতা সকালের বিহেভের জন্য সরি বলে আমাকে খাইয়ে দিবেন? ভেবেই মুচকি হাসলাম। আমার হাসি দেখে শ্যামবতা বাঁকা হেসে বললেন,
"শুনলাম রাতে নাকি খাস নি। উঠ গরম গরম কয়েকটা চড় আর প্লেটের খাবারটা শেষ কর। "
শ্যামবতা বাঁকা হাসি দেখে আমি ঢোক গিললাম। এটা মুগ্ধতার হাসি নয় এটা ঝড়ের পূর্বাভাস। আবার শনি আসবে ভেবেই সব ঘুম উবে গেলো। আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম,
"কক্কি কখাববার?"
শ্যামবতা আবারো বাঁকা হেসে বললেন,
"বেশি কিছুনা। জাস্ট দুই ইলিশ মাছের মাথা কাটা বেছে খাবি। এক চিমটি মাছ ও রেখে দিতে পারবি না। সময় মাত্র দশ মিনিট। এই টাইমের মধ্যে যদি খাবার ফিনিশ করতে না পারিস তো.....
বলে আবারো বাঁকা হাসলেন। আমি আমার চুপসে যাওয়া মুখ নিয়ে তাকিয়ে রইলাম শ্যামবতার দিকে। মাছের কাটার ভয়ে আমি টাকি মাছ অব্দি খাইনা। আর সেই আমি কিনা ইলিশ মাছের মাথা বেছে খাবো! তাও দশমিনিটে! ইম্পসিবল! যদি না পারি তো শ্যামবতা আবার কি শনি নিয়ে হাজির হবে সেই জানে। টেবিলের ভয়ংকর অন্ত্রগুলোর একটা অস্ত্র ও প্রয়োগ করলেও আমি শেষ। আমার ভাবনার মাঝেই শ্যামবতা নিজের হাতে পরে থাকা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন,
" ইউর টাইম স্টার্ট নাও।"
বলে তার হাতে থাকা প্লেটটা আমার সামনে রাখলেন। চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে থাকা মাছের মাথা দু'টোর দিকে তাকিয়ে আমি ঢোক গিললাম। আর শ্যামবতা বাঁকা হাসছেন অনবরত.....
চলবে...