ক্রাশ কনফেশন
লেখাঃ আফিয়া আপ্পিতা
পর্ব- ২৭
সকাল উঠে দেখলাম শ্যামবতা তৈরি হচ্ছেন অফিসের জন্য। আমি দ্রুত উঠে ফ্রেশ হয়ে এলাম। ট্রলি বের করে কাপড় গুছাতে লাগলাম। শ্যামবতা গলায় টাই প্যাচাচ্ছিলেন। প্যাচানো থামিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললেন,
" সকাল সকাল ব্যাগ প্যাক ঘুচিয়ে কই চললি? পাগলাগারদ থেকে ফোন এসেছে? গল্পের নায়কদের মত মিটিং আর ডিল সাইন করবি বলে ছুটছিস?"
আমি শ্যামবতার কথা না শুনার ভান করে কাপড় গুছানোয় মনোযোগ দিলাম। শ্যামবতা আবার বললেন,
"পাগলাগারদে যাওয়ার জন্য এত কাপড়ের দরকার পড়ে না রে পাগলী । দু'টো কাপড় নে। কাপড় গুলোকে মাটিতে গড়াগড়ি খাইয়ে পরে নিবি। চুলগুলোকে পাখির বাসার রূপ দিবি। পাতিলের তলার কালি ব্যবহার করবি মেক আপ হিসেবে। হাতে রাখবি পুরোনো ভাঙা বোতল, রাস্তার পাথর, পলিথিন। জিহ্বাটাকে ব্যবহার করবি ক্যাসেটের ফিতা হিসেবে। যা টেপ রেকর্ডার অন করার সাথে সাথে চালু হবে। আর থামার নাম নিবে না। তুই তো এটা ভালো পারিস। সব শেষে ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার মতো লাফালাফি শুরু করবি। ব্যাস হয়ে গেলো, পারফেক্ট পাগল। এত হাবিজাবি না নিয়ে আমার দেয়া রেসিপি ফলো করে পাগলাগারদে যা, সম্মান পাবি। "
এবারো নিরুত্তর আমি। এমন একটা ভাব ধরলাম যেন এই মুহুর্তে কাপড় গুছানোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আর নেই। বালিশের নিচে থাকা ফোনটা বেজে উঠল। আমার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটলো। একদম মোক্ষম সময়ে কল এসেছে। আমি এক প্রকার দৌড়ে গিয়ে ফোন হাতে নিলাম। মুচকি হেসে রিসিভ করে ফোন কানে দিলাম। ওপাশের কথায় কান না দিয়ে বললাম,
"আমি রেড়ি, মিনিট খানেকের মধ্যে বের হচ্ছি। হ্যাঁ, সব গুছানো শেষ। একতারা লাগবে? কেনো? সন্ন্যাসী হতে গেলে একতারা কেন লাগবে?
ওহ, আচ্ছা আমি ও বাউল শিল্পীদের মত পথে ঘাটে হেটে হেটে গান গাইবো? তোমরা একতারা বাজাইয়ো না। টেন টেডে টেং, তোমার দো'তারা বাজাইয়ো না। টেন টেডে টেং। একতারা বাজাইলে মনে পইড়া যায় আমার, একতারা বাজাইলে মনে পইড়া যায় আমার। একদিন বাক্সাল ছিলাম রে... এটা গাইবো?
আচ্ছা সে না হয় গাইলাম। কিন্তু একতারা তো বাবার বাসায় আছে সম্ভবত। ওখানে যাওয়া লাগবে। এবার কী হবে? বাবার বাসায় গিয়ে একতারা খুঁজে বের করতে করতে ট্রেন মিস করবো। আমাদের ট্রেন তো বিশ মিনিট পর। পনেরো মিনিট লাগবে স্টেশনে পৌঁছাতে। একতারা রেখেছি কোথায় মনে পড়ছে না। খুঁজে দেখতে হবে। আর খুঁজতে গিয়ে দেরি হবেই। এবার কী হবে?"
থামলাম আমি। রুমময় পায়চারি করে ভাবছি। কানে তখনো ফোন। হুট করেই একটা ভাবনা মাথায় আসতেই বললাম,
"আচ্ছা শুনো? আমরা না হয় কাল সকালের ট্রেনে যাই? এখন আমি বাবার বাসায় যাবো। একতারা দো'তারা সব খুঁজে রেড়ি রাখবো। তুমি ও তোমার সব কাজ সেরে নিলে। কাল সকালে ঠিকঠাক ভাবেই চলে যেতে পারবো। ভালো হবে।
কেউ আটকাবে না আমাকে। আটকানোর জন্য প্রিয় মানুষের প্রয়োজন হয়। আমার তো কোন প্রিয়মানুষই নেই। আমি মরি কি বাঁচি কারো কিছু আসে যায় না। লাইফটা হেল হয়ে গেছে আমার। এত অপমান সইতে পারে কেউ? আমি যে আর পারছিনা। এবার আমি একটু শান্তি চাই। শান্তিতে মরতে চাই। টাকা থাকলে আমি ডেথ ফরেস্টে গিয়ে শান্তিমতো মরতাম। টাকা নেই তাই সেই ভাবনাকে বাদ দিয়েছি। জীবনটা শান্তি চায়, ভালোবাসা চায়। অবশ্য তার জন্য ও কপাল লাগে। আমার তো সেই কপাল নেই। এখন আমি নিজে নিজের শান্তি খুঁজবো সন্ন্যাসী হয়ে। তুমি শুধু সন্ন্যাসীদের একটা গ্রুপ ঠিক করে দিও,আমি তাদের সাথে থাকবো। তবু এখানে আর থাকবো না। চলে যাবো সব ছেড়ে। আমি তো দোয়া করি, আমি মারা গেলে আমার লাশ ও যেন এখানে নিয়ে না আসে।"
গলা কেঁপে উঠলো আমার । চোখের কোণে বেয়ে দু'ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। অন্যদিকে ফিরে চোখ মুছে নিলাম। তারপর বললাম,
"আচ্ছা রাখছি। সব ঠিকঠাক করে নিও। ওখানে গিয়ে না আবার কোন সমস্যা হয়! কাল সকালে দেখা হচ্ছে তবে! বাই।"
বলে ফোন রাখলাম। ট্রলির চেইন লক করে হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। আকস্মিক শ্যামবতা এসে সামনে দাঁড়ালেন।
"কোথায় যাচ্ছিস? সকাল সকাল রুমটাকে স্টার জলসার সিরিয়াল বানানোর মানে কী বলবি?"
শ্যামবতার গম্ভীর কণ্ঠ কানে বাজলো। আমি শ্যামবতার কথার উত্তর কিংবা তার দিকে না তাকিয়ে পাশ কাটিয়ে সরতে নিলাম। আচমকা হেচকা টানে আমাকে নিজের বুকে নিয়ে ফেললেন শ্যামবতা । রাগত স্বরে বললেন,
" সত্যি করে বল কোথায় যাচ্ছিস তুই? লিগ্যালি আমরা স্বামী স্ত্রী। তুই কোথাও গেলে সবাই আমাকেই জিজ্ঞেস করবে। তখন আমি কী বলবো? তুই পাগলাগারদে গিয়েছিস নাকি হাঁসের খামারে গিয়েছিস? কী বলবো?"
শ্যামবতার উদ্ধিগ্নতা দেখে মনে মনে হাসলাম। প্ল্যান কাজে দিচ্ছে তবে! মুখে গম্ভীরর্য টেনে মাথা নিচু করে বললাম,
"বলবেন, অভিহা চলে গেছে চিরতরে। আর কখনো ফিরবে না।"
"চিরতরে চলে যাচ্ছিস মানে কী? তুই চলে গেলে ডিভোর্স কীভাবে হবে? আর ডিভোর্স না হলে আমি আমার জরিনাকে কিভাবে বিয়ে করে আনবো? তুই এখন কোথাও যেতে পারবি না। আগে ডিভোর্স হবে তারপর যাবি। ততদিন পর্যন্ত এখানে বসে ডিম পাড়। ডিভোর্সের পর নিজের চলার জন্য ও তোর একটা ইনকামের দরকার আছে। সেই জন্যই বলি, তুই এখন থাক, ডিম পাড়। আমি তোর ডিম সাপ্লাইয়ের একটা ব্যবস্থা করে দিব। "
এখনো শ্যামবতা ডিভোর্সের কথা বলবেন! আমি চলে যাচ্ছি সেই চিন্তা না করে ডিভোর্সের সাইনের চিন্তা করছেন! ভাবতেই কান্না ফেলো আমার। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকালাম। এই মানুষটার জন্য কেঁদে লাভ নেই। চোখের পানির দাম নেই ওর কাছে। সেরে এক টাকাও না। আমি কান্না গিলে কপট রেগে বললাম,
"চলে যাচ্ছি আমি, আর কখনো বিরক্ত করবো না আপনাকে। আপনি আপনার মতো থাকুন আমি আমার মত থাকি। আপনি জরিনাকে নিয়ে সুখে থাকুন। সাথে থাকুক আপনার অজগরমার্কা জীবন। আর ডিভোর্স পেপারের চিন্তা করবেন না। আমি মন থেকে আপনাকে মুক্তি দিচ্ছি। জীবনে কখনো এসে আপনার স্ত্রীর দাবি করবো না। কখনো না। আমি এটা মনেই রাখবো না যে আপনি আমার জীবনে ছিলেন। আমি চলে যাওয়ার পর চাইলেও আমাকে কেউ খুঁজি পাবে না। হারিকেন কিংবা মশাল দিয়ে খুঁজলে ও। আমি ডিম পেড়ে নিজের কর্মসংস্থান নিজে করে নিবো। এর চিন্তা ও আপনাকে করতে হবে না।"
শ্যামবতা আমার বাহু চেপে বললেন,
"তুই সত্যিই চলে যাবি? "
আমি শ্যামবতার চোখে চোখ রেখে বললাম,
"কেন থাকবো আমি? কোন কারণে? "
"কারণ, এখানে থাকলে তোর ডিম পাড়ার প্রতিভা বিকাশিত হবে। গিনেসবুকে নাম লেখার সুযোগ হবে। পেপারে আসবে, ডিম পেড়ে সব দেশকে পিছনে ফেলে গিনেসবুকে নাম লেখানো। বাংলাদেশের প্রতিভাবান ডিমপায়ী নারী অভিহা বিনতে ফারুকী। চারদিকে তোর জয়জয়কার হবে। প্রেস, মিডিয়া, অটোগ্রাফ এসবে দিন যাবে তোর। 'ম্যাম আপনার এই ডিম পাড়ার শুরুটা কবে থেকে? কিভাবে হয়েছিলো? কিভাবে বুঝলেন আপনার পেটে ডিম উৎপাদন হচ্ছে?'এই প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে তুই স্যান্ডউইচের মেয়নিজ হয়ে যাবি। রীতিমতো ছেলারপ্যালার বেটি আই মিন সেলিব্রিটি হয়ে যাবি রে অভিহা। এত ব্রাইট ফিউচার রেখে তুই চলে যাচ্ছিস! পাগল হয়ে গেলি নাকি তুই?"
আমি ভেবেছি শ্যামবতা এবার তার ভালোবাসার কথা বলে দিবেন। কিন্তু না, এই লোকের মনকে তো কিডন্যাপ করে বেধে রেখেছেন। যে চাইলেই মন মুক্ত ভাবে ভাব প্রকাশ করবে! অবাক লাগে আমার। এই মুহূর্তে ও তার ডিমের চিন্তা মাথায় আসছে! রাগ হলো আমার। অনেক রাগ। আমি রাগত কন্ঠে বললাম,
"থান আন্নে আন্নের ডিম আর জরিনা লোই। আই যামু গোই। থাইকতান্নো এট্টে। কিল্লাই থাকুম? আন্নে আঁরে ভালা হান নি? হান না। আরো আঁরে দেখতে হারেন না। আন্নেরে আঁর মনের কথা কইছি। আন্নে কিচ্ছেন? জরিনারে টানি আইনছেন। আই বো ওই বাইররা মাইয়্যার লগে আন্নের ইটিসপিটিস দেখতাম হাইতান্নো। সহ্য অয় না আঁর। আই সহ্য কইত্তাম হারি না আন্নের অবহেলা আর আন্নেরে ওইন্য মাইয়্যার লগে। আন্নে হারাদিন আঁরে চিল্লান, কতায় কতায় হিট্টেন আইয়েন। আঁর দুঃখ লাগে। আই সইতাম হারি না। এই দুঃখতুন বাইচবেল্লাই আই যামু গোই। থাইকতাম নো। কিল্লাই থাকুম?"
(থাকুন আপনি আপনার ডিম আর জরিনাকে নিয়ে। আমি চলে যাবো। থাকবো না এখানে। কেন থাকবো? আপনি আমাকে ভালোবাসেন? বাসেন না। উল্টো আমাকে ঘৃণা করেন। আপনাকে আমার মনের কথা বলেছি। আপনি কী করেছেন? জরিনাকে টেনে এনেছেন। আমি স্ত্রী হয়ে বাইরের মেয়ের সাথে আপনার ইটিস পিটিস দেখতে পারবো না। সহ্য হয় না আমার। আমি সহ্য করতে পারি না আপনার অবহেলা আর আপনাকে অন্য মেয়ের সাথে। আমাকে সারাদিন বকেন আপনি। কথায় কথায় মারতে আসেন। আমার দুঃখ লাগে। আমি সহ্য করতে পারি না। এই দুঃখ থেকে বাঁচার জন্য চলে যাবো আমি। থাকবো না। কেন থাকবো?)
আমার নোয়াখালী ভাষা শ্যামবতা বুঝলেন না। ভ্রু কুঁচকালেন। যার অর্থ, বুঝিনি, ট্রান্সলেট কর। আমি এই মুহুর্তে ট্রান্সলেট করার অবস্থায় নেই। শ্যামবতা থেকে চোখ ফিরিয়ে সরে আসতে চাইলাম। শ্যামবতা আমার গাল চেপে ধরলেন শক্ত করে। দাঁত কিড়মিড় করে শাসানোর ভঙ্গিতে বললেন,
"কিউকি,তাঙশিনুল সারাঙ হা ইয়ো। কিউকি, নান্নু নিনান্নু প্রীতিসুথিন। কিউকি,ইস লিবে দিস। কিউকি, অ্যাঁই সাঁইতে। কিউকি, দুস্তাত দারাম। কিউকি, ইনবিগ কিটা। "
বলে আমাকে ঝাকিয়ে সরিয়ে দিলেন। রাগে শ্যামবতার শরীর কাঁপছে। চোখ মুখ পাশের বাসার আন্টির পছন্দের রঙের মত লাল টকটকে হয়ে গেছে। শ্যামবতার কথা মাথার উপর দিয়ে গেলো আমার। বিন্দুমাত্র ও বুঝিনি। আমাকে গালি দিয়েছেন নাকি কিছু বলেছেন সেটাই বুঝে আসছে না আমার। কী এমন বলেছেন যা শ্যামবতাকে এমন রাগিয়ে দিলো! ব্যাপারটা জানতেই হয়। ঘটনা বুঝার জন্য শ্যামবতার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালাম। শ্যামবতার কটমট দৃষ্টি আমার দিকেই নিবদ্ধ। আমার চোখে চোখ পড়তেই শ্যামবতা চোখ সরিয়ে নিলেন। টেবিলের উপর থেকে ফোন আর ওয়ালেট পকেটে রাখলেন। আমার দিকে কটমট দৃষ্টিতে চেয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। যাবার সময় দরজাটা ধরাম করে ভেজিয়ে গেলেন। আমি ভেংচি কেটে যেই না ব্যাগ হাতে নিয়ে বেরুতে যাবো অমনি খট করে বাইরে থেকে লক হয়ে গেলো দরজা। দরজাটা শ্যামবতা আটকিয়েছেন সেটা বুঝতে সময় লাগলো না। আমার রাগ হলো, আমাকে আটকানোর জন্য এতকিছু অথচ ভালোবাসি বলার বালাই নেই! ওই একটা শব্দ শোনার জন্যই তো আমি এত কিছু করছি। তাও উনি কেন মুখ ফুটে বলছেন না! যাই হোক, আমি ও দেখি শ্যামবতা কিভাবে আমাকে ভালোবাসি না বলে থাকতে পারে! থাকবো না এখানে। সত্যিই চলে যাবো আমি। পারলে আটকাও। বলে ভেংচি কাটলাম। ব্যাগ হাতে নিয়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেলাম। উদ্দেশ্য টপকে নিজের বাসায় যাওয়া। বারান্দায় গিয়ে নিচে তাকাতেই একটা দৃশ্য চোখে পড়লো। শ্যামবতা আর প্রদীপ কিছু একটা ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করছেন। শ্যামবতা মুখ চেপে দাঁড়িয়ে আছেন আর প্রদীপ শ্যামবতার কাধে হাত দিয়ে কিছু বুঝাচ্ছেন। সম্ভবত সান্ত্বনা দিচ্ছেন। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আমার চলে যাওয়া কেন্দ্রিক ব্যাপার। জনাব মানতে পারছেন না, আবার বলতেও পারছেন না। দরজার চিপায় হাত পড়ার মত ফেঁসেছেন। ভাবতেই হাসি ফেলো। আরো লুকাও, আমাকে কষ্ট দাও এমনি হবে। আমি চললাম বাপের বাড়ি। মনের কথা বলার আগ অব্দি যাবো না ফিরে। থাকো তুমি। হুহ! আবারো ভেংচি কাটলাম। আজ ভেংচি কেটে রেকর্ড গড়বো। ভেংচি স্পেশালিষ্ট অভিহা। বাহ, চমৎকার তো! রেকর্ডের আশায় আবারো ভেংচি কাটলাম। নিচে তাকালাম। নাহ, শ্যামবতারা চলে গিয়েছেন। আমি হাফ ছাড়লাম। এবার শান্তিমতো বাপের বাড়ি যেতে পারবো।
শ্যামবতার রুমের বারান্দা থেকে আমার বারান্দা খানিক দূরে। তাই প্রথমে শ্যামবতার পাশের বারান্দা অর্থ্যাৎ দিতিয়ার বারান্দায় লাফ দিলাম। তারপর দিতিয়ার বারান্দা থেকে আমার বারান্দায় লাফ দিলাম। ব্যাগ ট্যাগ সহ আসতে গিয়ে হাফিয়ে উঠেছি। রুমে এসে ফ্যান ছেড়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। খানিক বিশ্রাম করে রুম থেকে বের হলাম। ঘড়ির কাটায় তখন বেলা দশটা। পুরো বাসা খুঁজে মা বাবা আভান কাউকেই পেলাম না। সম্ভবত মা আভানকে স্কুলে নিয়ে গেছে আর বাবা অফিসে। যাক কেউ নেই ভালোই হয়েছে। না হয় হাজারো প্রশ্নের সাগরে ডুবে মরতে হতো। প্রথমে কিচেনে গেলাম। ক্ষিধে পেয়েছে। সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। পাতিল উল্টিয়ে পাল্টিয়ে বুঝতে পারলাম। আজ নাস্তার মেন্যু জুড়ে আছে ম্যারা পিঠা। নোয়াখালীর বাসায় যাকে বলে, ছাইয়্যা হিডা। ম্যারা পিঠায় চোখ যেতেই শ্যামবতার কথা মনে পড়ছে। তার কথার উত্তর দিতে দেরি হলেই ম্যারা পিঠাকে টেনে আনতো। আহ, কবে যে শ্যামবতা মনের কথা বলবে আর আমি তার কাছে যাবো! এইটুকু সময়ে তার শূন্যতা আমার মন মলিন করছে। বাকি সময়টা কী হবে! মনটা খারাপ হয়ে গেলো। খেলাম না ম্যারা পিঠা। কেবিনেট খুলে কটকটি রাখার বৈয়াম বের করে কটকট করে কটকটি খেতে শুরু করলাম। আহ, কতদিন পর খাচ্ছি! আই মিস ইউ কটকটি। একটু খেয়ে বুঝতে পারলাম এটাও ভালো লাগছে না। শ্যামবতার চেহারা ভাসছে চোখের সামনে। সব এলোমেলো লাগছে। আমাকে শ্যামবতার পেট থেকে কথা বের করতে হলে এখানে থাকতে হবে। থাকার জন্য শ্যামবতার ভাবনা মাথা থেকে ঝাড়ু দিয়ে ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে। এর জন্য চাই ব্যস্ততা। আমাকে কোন কাজে ব্যস্ত হতে হবে। কাজে ডুবে থাকলে শ্যামবতার কথা মনে পড়বে না। কিন্তু কী কাজ করবো? চারদিকে খুঁজে কোনো কাজ পাচ্ছি না।হঠাৎ দাদুর কথা মনে পড়ল। দাদু বলতেন, আনগো যেসমে কাম কইরবেল্লাই মন চাইতো কিন্তু কোন কাম থাইকতো না। হেসমে আন্ডা ডাইলে চাইলে মিয়াই লোইতাম। হিয়ার ডাইল চাইল আলাদা কইত্তাম লাগি যাইতাম।
অর্থ্যাৎ, আমাদের যখন কাজ করতে ইচ্ছে হতো কিন্তু কোন কাজ পেতাম না তখন আমরা ডাল চালে মিশিয়ে নিতাম। তারপর ডাল চাল আলাদা করতে লেগে যেতাম।
ব্যাস, আমি ও ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসে গেলাম দাদুর সেই কথা অনুযায়ী কাজ করতে। ডাল চাল দু'টো একসাথে মিশিয়ে লেগে গেলাম আলাদা করতে। কাজে পুরোপুরি ডুবে গেলাম। চারদিকের খেয়াল নেই। ধ্যান ভাঙলো কারো চিৎকারে। চমকে উঠে তাকিয়ে দেখি মা আর আভান চিৎকার করছে। আমার মাথায় দুষ্ট বুদ্ধির উদয় হলো। আমি তাদের দিকে তাকিয়ে বিকট শব্দে হাসলাম। মাথার চুল এলোমেলো করে মোটা কন্ঠে বললাম,
"তোরা এসে গেছিস? আমি তোদের অপেক্ষা করছি। বড্ড ক্ষিধে পেয়েছে। তিনদিন ধরে কিছু খাই না। এখন তোদের খাবো। যা মুখ ধুয়ে আয়। আমি আবার ময়লা খাবার খাই না। " বলে আবারো ভূতুড়ে হাসলাম। মা আর আভান ভয়ে ছিটকে গেলো। আভান বলল,
" ভূত আপু আমাকে ছেড়ে দিন। আমি আপনাকে আমার সব শাড়ি, আর শাড়ির মানুষকে দিয়ে দিবো। "
'আমার সব শাড়ি' কথাটা শুনে মা ভ্রু কুঁচকে বললেন,
"তোর শাড়ি মানে! তুই কোথায় পেয়েছিস শাড়ি? কার জন্য কিনেছিস! এটুকু ছেলে প্রেম করছিস? প্রেমিকার জন্য আবার শাড়িও কিনে দিয়েছিস! কত বড় সাহস ছেলের! এই তুই টাকা পেয়েছিস কোথায়? বল?"
বলে আভানের পিঠে দু'ঘা লাগালেন মা। আমি ও বিস্মিত ভূতনীর মত আভানের দিকে তাকিয়ে আছি। জন্মের দেড়যুগ পেরোলে ও এখনো প্রেম ভালোবাসা বুঝিনি। আর এই ছেলে জন্মের অর্ধযুগ পুরাবার আগেই প্রেম ভালোবাসা বুঝে নিয়ে গার্লফ্রেন্ড ও জুটিয়ে ফেলেছে কপালে! কত কিছু আবার গিফট ও করছে! কী করলাম জীবনে! এই জীবন না রেখে কচু গাছের সাথে ফাঁস দিলাম না কেন! ভাবতেই কান্না পাচ্ছে। কান্না গিলে মা ভাইয়ের ঝাগড়া দেখায় মন দিলাম। মায়ের মার খেয়ে আভান ঠোঁট উল্টিয়ে বলল,
"তিফিনের তাকায় কিনেছি। "
মা আভানের পিঠে আরেক ঘা বসিয়ে রাগত স্বরে বললেন,
"আমি তোকে এই জন্য টাকা দিই? মানুষ টিফিনের টাকা দিয়ে নাস্তা করে না হয় আবেগ কিনে। আর তুই টিফিনের টাকা দিয়ে শাড়ি কিনে গার্লফ্রেন্ডকে গিফট করছিস! হায় খোদা কী দিলে এই সন্তান আমায়! আমি একটা ম্যাসেজ ৪০জনকে ফরওয়ার্ড করিনি এই অপরাধে এমন ছেলে দিয়েছো? ৪০ জনকে ম্যাসেজ ফরওয়ার্ড করলে আমার ও সুখবর আসতো সাতদিনের মাঝে। সেই সুখবর এখনো চলতে থাকতো। কেন যে আমি ম্যাসেজ ফরওয়ার্ড করলাম না! "
বলে মা কপালে মারলেন। মায়ের অবস্থা দেখে আমি ভাবনায় লেগে গেলাম। আমার কাছে ও এমন ফরওয়ার্ড ম্যাসেজ আসে। আমি তো কখনো কাউকেই ফরওয়ার্ড করিনি, কোথাও এইজন্য কোন সুখবর আসছে না! শ্যামবতার মনের কথা বলছে না! হতে পারে। এমন হলে তো বিপদ। আমি এক্ষুনি ভূত চরিত্র থেকে বেরিয়ে ফোন হাতে নিয়ে ফরওয়ার্ড ম্যাসেজ ৪০জনকে ফরওয়ার্ড করবো। এতে কাল সকালের মধ্যে সুখবর আসবে। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত।
মার খেয়ে আভান কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
"ভূত আপু মাকে বলো না? আমার কোন তেমিকা নেই। আমি কাউকে বাড়ি দিই নি। আমি বলেছি তোমাকে শাড়ি দিবো। আমার খেলনা শাড়িগুলো। ওই যে বাস, তাক, মিকশা, বাহাজ। ওগুলো আরকি। "
মা আবারো তেড়ে আসল আভানের দিকে। আভানের কান্নামাখা চেহারা দেখে মায়া হলো।
"আমি তোদের খাবো।"
মায়ের মার থেকে আভানকে বাঁচাতে আবারো হেসে বলে উঠলাম। মা থামলেন। ভয়ে ছিটিয়ে গেলেন। এতক্ষণ বোধহয় ভুতের কথা ভূলে গিয়েছিলেন। হুট করেই আভানের কথা মাথায় বাড়ি খেলো। কী বলল আভান? খেলনা শাড়ি?তাস তাক, মিকশা? আভানের তো ভুল কথা বলার রোগ আছে। কোথাও আভান গাড়িকে শাড়ি বলছে না তো! হতে পারে। পুরো ব্যাপারটা ভাবতেই বুঝতে পারলাম আসলেই আভান ভুল বলেছে। মা শুধুই ওকে মারলো। আমি প্রতিবাদ করে উঠলাম,
"মা আভান বলতে চেয়েছে ও গাড়ি আর গাড়ির মানুষ অর্থাৎ ড্রাইভারকে দিয়ে দিবে। টিফিনের টাকা দিয়ে গাড়িই কিনেছে। তাশ মানে বাস, তাক মানে ট্রাক, মিশকা মানে রিকশা। ওর ভুল কথা বলার রোগ আছে জানো না?"
মা আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালেন। আমি ধরা পড়ে গিয়েছি এবার! এইবার আভানের মার আমার কপালে জুটবে। ইশ! এবার কী হবে! মা রাগত স্বরে বললেন,
"এটা তো অভিহার গলা। তার মানে অভিহা তুই আমাদের ভয় দেখাচ্ছিস!"
ধরা পড়ে আমি চুল ঠিক করে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম।আত্মপক্ষ সমর্থনে বললাম,
"হুট করেই তোমাদের দেখতে ইচ্ছে করলো তাই বারান্দা দিয়ে চলে এসেছি। এসে কাউকে না পেয়ে কাজ করতে লেগে গেলাম। তোমরা আসায় ভয় দেখাতে ইচ্ছে হলো। তাই...
বলে আবারো ইমপ্রেসমূলক হাসি দিলাম। কিন্তু মা ইমপ্রেস হলেন না। উল্টো তেড়ে এলেন। আমি দৌড়ে রুমে ডুকে দরজা লাগালাম। ফোন হাতে নিয়ে প্রথমেই ফরওয়ার্ড ম্যাসেজ সবাইকে ফরওয়ার্ড করলাম। ঘড়ির কাটায় তখন বারোটা। দিতিয়াকে কল দিলাম। সকালে বেচারি কল দিয়েছিলো কলেজে যাবো কিনা জিজ্ঞেস করতে। আর আমি শ্যামবতাকে শুনিয়ে উল্টোপাল্টা যা বলেছি বেচারি কিছু বুঝতে না পেরে কী কী করেছে। এখন সব কথা খুলে বললাম। দুজনে মিলে হাসিঠাট্টায় আড্ডা জুড়ে দিলাম। মাকে কনভেন্স করে লাঞ্চ করলাম।
চলবে....